Home » বিশেষ নিবন্ধ » কবি হাসান হাফিজুর রহমান : অন্তরালের এক সংগ্রামী পুরুষ

কবি হাসান হাফিজুর রহমান : অন্তরালের এক সংগ্রামী পুরুষ

শাহ আহমদ রেজা ::

ভাষা আন্দোলনের মাসে শহীদ এবং বিখ্যাত নেতাদের পাশাপাশি সব ভাষা সংগ্রামীকেও সমান সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা দরকার। বিশেষ করে এমনজনদের, যাদের সাহসী ও সৃষ্টিশীল ভূমিকার কথা সাধারণ মানুষ জানে না বললেই চলে। কবি হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন তেমন একজন, কম আলোচিত হওয়ার কারণে যিনি আসলে অন্তরালে রয়ে গেছেন। অথচ শহীদ দিবস উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সম্পাদক হিসেবে শুধু নয়, ১৫ খন্ডে সংকলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস এবং জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছেন; যুক্ত থাকবেনও।

সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানিয়ে নেয়া যাক। মহান এই কবি ও ভাষা সংগ্রামীর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে। উপলক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচনা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্দেশে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছিল -এপ্রিল, ১৯৭৭-সালে। প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি পেয়েছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান। স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদক বা সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি ছিলেন তিনি। আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করেছিল। কারণটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি হাই কোর্টের সামনে তৎকালীন সরকার সমর্থক সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে দু’জনের মৃত্যু ঘটে। এই খবরকে কেন্দ্র করেই দৈনিক বাংলা সেদিনই একটি ‘টেলিগ্রাম সংখ্যা’ বের করেছিল। দৈনিক বাংলা ছিল ট্রাস্টের তথা সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা। সে কারণে ক্ষমতাসীনরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দুঃখ প্রকাশের আড়ালে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন শুভাকাংক্ষীরা। তার জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের শক্তিশালী যুক্তি ও অজুহাতও ছিল। কারণ, টেলিগ্রামটি বের করেছিলেন সাংবাদিকরা। হাসান হাফিজুর রহমান সে সময় অফিসে ছিলেন না। তিনি তাই সহজেই দায়িত্ব এড়াতে পারতেন। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকারের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এজন্যই সব দায়িত্ব তিনি নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলেন। ফলে তার চাকরি চলে গিয়েছিল।

হাসান হাফিজুর রহমান মাঝখানে কিছুদিন মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস কাউন্সিলর পদে চাকরি করলেও বহুদিন বেকার ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে সম্মানের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি দিয়েছিলেন। এই প্রকল্পের চারজন গবেষকের একজন হিসেবেই আমি হাসান হাফিজুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম বলে শুধু নয়, স্বাধীনতামুখী সংগ্রামে অংশ নেয়ার এবং যুদ্ধের দিনগুলোতে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার অতীত বা পটভূমি থাকার কারণেও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো; এখনো করে। এজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম স্থান নিয়ে এম এ পাস করার পর অন্য চাকরির চেষ্টা না করে রীতিমতো ইন্টারভিউ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলাম। প্রকল্পের অফিস ছিল ৮১/বি সেগুনবাগিচায়, এক ব্যক্তিমালিকের তিনতলা বাড়ির দোতলায়।

ইন্টারভিউ দিতে গিয়েই প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলাম কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। হাতে জ্বলন্ত হাভানা চুরুট ছিল তার। রসিয়ে পানও খেতেন তিনি। চা তো খেতেনই। সত্যি বলতে কি, নাম জানা থাকলেও তার কবিতা ও সাহিত্য সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না আমার। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক  দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে রচিত ‘আরও দুটি মৃত্যু’ নামের একটি গল্প অবশ্য পড়েছিলাম। ট্রেনের ভেতরে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটেছিল এক হিন্দু নারীর; সঙ্গে তার সন্তানেরও। হৃদয়বিদারক এ কাহিনীই গল্পে তুলে এনেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। অসাধারণ ছিল তার উপস্থাপনা।

অন্য একটি তথ্যও জানতাম তার সম্পর্কে। ১৯৫২ সালের ভাষা আান্দোলনে দুর্দান্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারি মিছিল করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারজন-চারজন করে ছাত্র বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কোন চারজনের পর কোন চারজন যাবেন- সেটা ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব ছিল হাসান হাফিজুর রহমানের ওপর। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সে দায়িত্ব ফেলে তিনি নিজেই গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন মিছিলে! শহীদ বরকত তার ক্লাসমেট ছিলেন। গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। গুলি ও হত্যার পর সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য সংবলিত লিফলেট লেখা ও ছাপানোর ব্যাপারেও সবার আগে ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালের শহীদ দিবস উপলক্ষে প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ও তিনিই বের করেছিলেন। নিজে এর সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা ও কোলকাতা থেকে একযোগে প্রকাশিত সংকলনটিকে পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই একটি বিষয়ে ‘দিশারী’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন হাসান হাফিজুর রহমান। সেই থেকে তাকে অনুসরণ করেই প্রতি বছর একুশের সংকলন প্রকাশিত হয়ে আসছে।

ইতিহাস প্রকল্পে যোগ দেয়ার পর হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে ধীরে ধীরে অনেক কিছু জেনেছি। যতো জেনেছি, মুগ্ধ ও বিস্মিতও ততোই হয়েছি। আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল তার ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞান ও পড়াশোনা। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তো বটেই, ১৯৬৭-৬৮ থেকে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত থাকার এবং স্বাধীনতার পর মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণেও ভেতরে-ভেতরে কিছুটা অহংকার ছিল। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার পর সে অহংকার হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। অবিশ্বাস্য ছিল তার জ্ঞানের গভীরতা- বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে। গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্ধারণী সব ঘটনা এবং ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি আলোচনা করতেন। ব্যাখ্যা করতেন ঠিক একজন শিক্ষকের মতো। তাই বলে ‘জ্ঞান’ দিতেন না; মনে হতো একজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছে। অসম্ভব আড্ডাবাজ ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে ‘বস’ ছিলেন তিনি, কিন্তু কোনোদিনই বন্ধুর চাইতে বেশি কিছূ মনে হয়নি তাকে। অন্য সরকারি অফিসের মতো ‘স্যার’ বলা নিষেধ ছিল আমাদের চার গবেষকের জন্য (অন্য তিন গবেষক ছিলেন প্রয়াত কবি সৈয়দ আল ইমামুর রশীদ, ড. আফসান চৌধুরী এবং জ আ ম ওয়াহিদুল হক)। আমরা তাকে ‘হাসান ভাই’ ডাকতাম; তার নির্দেশেই।

প্রতিদিন আড্ডা দিতে দিতে আর এটা-ওটা খেতে খেতে পার হয়ে যেতো অনেক সময়। শুনলে মনে হতে পারে যেন সমবেতভাবেই আমরা কাজে ফাঁকি দিতাম। অন্যদিকে যে কোনো বিচারে ইতিহাস প্রকল্পের অর্জন ও সাফল্য ছিল অতুলনীয়। তখন সরকারি অফিসের সময় ছিল সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত। কিন্তু আমরা, গবেষকরা কোনোদিনই অতো সকালে যেতাম না। জরুরি কোনো কাজ না থাকলে হাসান ভাইও যেতেন না। এটাই আমাদের জন্য হাসান ভাইয়ের তৈরি করা নিয়ম ছিল। ওদিকে আবার অফিস থেকে চলে যাওয়ারও নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। কতদিন যে বেরোতে বেরোতে রাত দশটাও পেরিয়ে গেছে-তার কোনো হিসাব রাখা হয়নি। এখানেই ছিল হাসান ভাইয়ের বৈশিষ্ট্য। চমৎকার কৌশলে তিনি কাজ করিয়ে নিতেন। বুঝতেও দিতেন না যে, কাজে ব্যস্ত রেখেছেন তিনি। এজন্যই আমাদের পক্ষে মাত্র বছর চারেকের মধ্যেই স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত চার লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিলপত্র এবং ১৫ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল।

এখানে ইতিহাস প্রকল্পের কাজের ধরন সম্পর্কে বলা দরকার। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, প্রকল্প থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লেখা হবে। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান নিয়েছিলেন অন্য রকম সিদ্ধান্ত। তার বক্তব্য ছিল, সমসাময়িককালে লিখিত ইতিহাসে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ কারো কারো ভূমিকাকে মহিমান্বিত করার নির্দেশ এবং চাপ ও তাগিদ থাকায় অনেকে অসত্য লেখেন। ভয়ের কারণেও কারো কারো সম্পর্কে সত্য লেখা যায় না। সুতরাং ইতিহাস লেখার পরিবর্তে বেশি দরকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও তার পটভূমি সংক্রান্ত তথ্য ও খবর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি, প্রচারপত্র ও পুস্তিকাসহ দলিলপত্র এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সেনাবাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য-বিবৃতি-বৃত্তান্ত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা, যাতে সেসবের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের গবেষকরা সঠিক ইতিহাস লিখতে পারেন। হোক ৫০ বা ১০০ বছর বা তারও পর, কিন্তু সেটা যাতে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস হয়। হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘ভূমিকা’য় লিখেও গেছেন, ‘এর ফলে দলিল ও তথ্যাদিই কথা বলবে, ঘটনার বিকাশ ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে, ঘটনা পরম্পরার সংগতি রক্ষা করবে।’

হাসান হাফিজুর রহমানের এই চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ইতিহাস প্রকল্প লেখার পরিবর্তে ইতিহাসের সোর্স বা উপাদান সংগ্রহ ও সংকলন করার নীতি অনুসরণ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. মফিজুল্লাহ কবিরকে চেয়ারম্যান করে নয় সদস্যের একটি অথেন্টিকেশন বা প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন করেছিলেন তিনি। অন্য আটজন ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। কমিটির নয়জনের মধ্যে মাত্র একজনকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে। তিনি ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক ড. এনামুল হক। অন্যরা প্রকাশ্যেই ছিলেন জিয়া, তার সরকার এবং বিএনপি’র কঠোর বিরোধী ও সমালোচক। তাদের একজন, প্রয়াত ড. শামসুল হুদা হারুন পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার সংবিধান বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন। অন্য একজন, প্রয়াত ড. সালাহউদ্দিন আহমদ বিশিষ্ট আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে ভূমিকা পালন করে গেছেন। আরেকজন, বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান- এখনো আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন। অর্থাৎ ওই প্রামাণ্যকরণ কমিটিকে দিয়ে কোনো ‘ফরমায়েশী’ ইতিহাস লেখানো সম্ভব ছিল না। চমৎকার কৌশলই নিয়েছিলেন বটে হাসান হাফিজুর রহমান!

এই কমিটির সদস্যরা প্রতিটি দলিলপত্র যাচাই-বাছাই করে তার সত্যতা ও সময়ের সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। তারা সত্যায়িত করলেই দলিলপত্রগুলো ছাপানোর যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত হতো। ইতিহাস প্রকল্প চার লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিলপত্র এবং ১৫ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করেছিল। সেগুলো থেকে বাছাই করা দলিলপত্র নিয়েই পরবর্তীকালে, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ১৫ খন্ডে দলিলপত্র এবং এক খন্ডে ফটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। দুর্ভাগের বিষয় হলো, সবকিছুর পেছনে যার চিন্তা, চেষ্টা ও পরিশ্রম ছিল সেই হাসান হাফিজুর রহমান প্রকাশনার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন (১ এপ্রিল, ১৯৮৩)। তিনি অবশ্য তিন-চারটি খন্ড বাঁধাই-পূর্ব অবস্থায় দেখে গেছেন। পর্যায়ক্রমে অন্য তিনজন ব্যক্তি পরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেও প্রতিটি খন্ডে সম্পাদক হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমানের নামই রাখা হয়েছে। কারণ, আমাদের মাধ্যমে সব কাজ আসলে তিনিই সেরে গিয়েছিলেন। বাকি ছিল শুধু ছাপানো এবং বাঁধাই শেষে বিক্রি ও বন্টনের ব্যবস্থা করা।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে আরো কিছু কথা না বললেই নয়। তিনি শুধু আড্ডাবাজই ছিলেন না, ছিলেন অতিথিপরায়ণও। বাংলাদেশের এমন কোনো বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম বলা যাবে না, যিনি ইতিহাস প্রকল্পের ওই অফিসে যাননি; গিয়েছেনও অসংখ্যবার। সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, ফয়েজ আহমদ, নির্মল সেন, ফজলে লোহানী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী- কতজনের নাম বলবো? এদের মধ্যে জনাকয়েক ছিলেন, যারা যেতেন দু-একদিন পরপরই। এর কারণ ছিল অফিসের ঠিক সামনে, উল্টোদিকে অবস্থিত ‘চিটাগাং হোটেল’-এর সুস্বাদু খাবার। রুই আর চিতল মাছের পেটি এবং বিরাট বিরাট কই মাছের ঝোল দিয়ে প্লেটের পর প্লেট ভাত গোগ্রাসে খেয়েছেন তারা। পকেট খালি হয়ে গেলেও হাসান ভাইয়ের মুখে সব সময় দেখতাম তৃপ্তি আর সন্তুষ্টির হাসি। অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পেতেন তিনি। সাধারণভাবেও কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের লোকজনকে সাহায্য করতেন হাসান হাফিজুর রহমান। যেমন শুধু সাহায্য করার জন্যই প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদারকে ইতিহাস প্রকল্পে চাকরি দিয়েছিলেন তিনি। হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার এবং তার পক্ষে এর-ওর কাছে যাতায়াত করার বাইরে ত্রিদিব দস্তিদারকে অফিসের তেমন কোনো কাজ করতে হয়নি। ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের স্মৃতিচারণে জেনেছি, ছাত্রজীবনেও একই রকম আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। দশ টাকা ধার করে বন্ধুদের পেছনে খরচ করার পর অন্য কারো কাছ থেকে দু’টাকা ধার করতেন তিনি, আবারও দশ-বিশ টাকা ধার করার জন্য কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে! ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনটিও তিনি ধার করেই ছাপিয়েছিলেন। ‘তাঁর স্মৃতি’ শিরোনামে এক নিবন্ধে ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, “…‘একুশে ফেব্রুয়ারী’- হাসানের মহত্তম অবদান- বের হল, প্রশংসিত হল, বাজেয়াপ্ত হল। আমরা উত্তেজিত হলাম। কিন্তু প্রেসের বাকি শোধ হল না। এ নিয়ে হাসান খুব বিপদগ্রস্ত হলেন। অপমানিত হয়ে একদিন বাড়ি চলে গেলেন। হয় জমি নয় গুড় বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরে এসে দায় থেকে উদ্ধার পেলেন।” (স্মারক গ্রন্থ ‘হাসান হাফিজুর রহমান’, ১৯৮৩; পৃ- ৩৯০-৯৩)

আসলেও মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিলেন ‘হাসান ভাই’, কবি হাসান হাফিজুর রহমান । বিশেষ করে ইতিহাসের ব্যাপারে তার সততা, আন্তরিকতা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম ছিল অতুলনীয়। একই কারণে ইতিহাসও তাকে অমর করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতামুখী সংগ্রামের প্রথম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একে কেন্দ্র করে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। ১৫ খন্ডে সংকলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সম্পাদক হিসেবেও তিনিই দায়িত্ব পালন করেছেন। এভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তো বটেই, জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছেন- কবি হাসান হাফিজুর রহমান।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

ই-মেইল: shahahmadreza@yahoo.com