Home » আন্তর্জাতিক » ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর : ট্রাম্পের জন্য উদাহরণ

ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর : ট্রাম্পের জন্য উদাহরণ

সুধা রামচন্দ্রন ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তার ভাষায় ‘দুর্বৃত্ত, মাদক ব্যবসায়ী এবং ধর্ষণকারীদের’ দূরে রাখতে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ৩,২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘মহা, মহা প্রাচীর’ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেটা মোটেই নতুন কোনো আইডিয়া নয়। আরো অনেক দেশ- এগুলোর কেউ কেউ ইসলামফোবিয়া বা  ইসলামভীতিতে তাড়িত হয়ে- অবৈধ অভিবাসী, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে তাদের প্রতিবেশীদের সীমান্তে বেড়া দিয়েছে।

এসব দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিলে ট্রাম্প ভালো করবেন। এসব বেড়া বা প্রাচীর কেবল বিশেষভাবে অকার্যকরই হয়নি, এগুলোর নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা করা অর্থ ও মানব-জীবনের দিক থেকে বিপুল ব্যয়বহুল।

ভারতের উদাহরণটি বিবেচনা করুন। দেশটি তার প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাচীর দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তে ভারতের প্রাচীর দেওয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা। প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্তটি সামনে আসে ১৯৮০-এর দশকে। তখন আসাম রাজ্যে বাংলাদেশীদের অভিবাসন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিস্ফোরক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ ৪,০৯৭ কিলোমিটার ‘ছিদ্রযুক্ত, ঝাঝরা’(পোরাস বর্ডার) সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত সমভূমি, নদী, পাহাড়, ধান ক্ষেত দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে। এই সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বাসকারী লোকজন নানাভাবে আন্তঃসীমান্তের বা এপার-ওপার মিলিয়েই সম্পর্কিত; এই সম্পর্ক কারো কারো কাছে কয়েক শ’বছরের, কারো কারো কাছে নতুন।

আট ফুট উঁচু কাঁটাতারের প্রাচীরের কোনো কোনো স্থান বিদ্যুতায়িত। এ ধরনের প্রাচীর  আছে সীমান্তের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায়; ভয়াবহ কাঠামো। কিন্তু এটা স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করা কিংবা জীবিকার নিরাপত্তার সন্ধানে দুর্গম সফর থেকে অভিবাসীদের বিরত রাখতে পারছে না। উভয় পক্ষের চোরাকারবারি, মাদক বাহক, আদম পাচারকারী, গরু কারবারিরা তাদের ব্যবসার জন্য নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে, অনেক সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের সম্মতিতেই।

হাওয়াই বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘ভায়োলেন্ট বর্ডার্স : রিফ্যুজিস অ্যান্ড দি রাইট টু মুভ’গ্রন্থের লেখক রিস জোন্স বলেন, ‘সীমান্ত বেড়া বলতে গেলে কখনোই অভিবাসন ঠেকাতে পারে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, বেশির ভাগ সীমান্ত খুবই দীর্ঘ এবং খুবই হালকাভাবে পাহারা দেওয়া। ফলে ফাঁকা স্থান দিয়ে লোকজনের চলাচলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

বাংলাদেশের এক আইনজীবী এবং অভিবাসন নির্গমনের গুরুত্বপূর্ণ সোর্স দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, প্রাচীরটা ‘পানি-নিরোধক’নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সীমান্ত যখন নদী দিয়ে চলে (সীমান্তের প্রায় ১,১১৬ কিলোমিটার হলো নদীপথে)- সেখানে কোনো প্রাচীর নেই। বাংলাদেশের সাথে আসাম সীমান্তের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার ব্র‏হ্মপুত্র নদীতে। এই নদী আবার প্রতি বছর গতি বদলায়। এই নদীতে স্থায়ী প্রাচীর দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য টহল নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে পারাপার তদারকি করা সম্ভব নয়। দুই দেশের লোকজন ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঠিকই পাড়ি দিয়ে দেয়। তাছাড়া প্রাচীরটার ‘অনেক ক্রসিং পয়েন্ট আছে, লোকজন ভুয়া কাগজপত্র কিংবা ঘুষ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে,’ জানান জোন্স। ফলে সীমান্ত প্রাচীর ‘[মানুষজনের] চলাচলের প্যাটার্ন পাল্টে দিলেও তাদের চলাচল কিন্তু থামাতে পারে না।’

ভারত থেকে সন্ত্রাসীদের দূরে রাখার ব্যাপারে প্রাচীরের সক্ষমতা প্রশ্নে জোন্স বলেন, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীরের ‘সম্ভব কোনো প্রভাব নেই।’তিনি উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসীর কাছে ‘ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করার মতো টাকা থাকে। সে সহজেই চেকপয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সে বৈধ কাগজপত্র দিয়েও ভ্রমণ করতে পারে।’

অভিবাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে প্রাচীর কেবল ‘ব্যাপকভাবে অকার্যকরই’নয়, অনেক সময় সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সহিংস ঘটনাও ঘটে। প্রাচীর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে চাওয়া লোকজনকে সীমান্তরক্ষীরা নৃশংসবাবে গুলি করে হত্যা করে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়স্কা বাংলাদেশী মেয়ে ফেলানির হত্যাকান্ড বিশ্বজুড়ে ক্রোধের সৃষ্টি করে। ২০১০ সালের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রমের সময় প্রায় ৯০০ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।

’এই সহিংসতার শিকার অনেকেই সীমান্ত বেড়া বা  প্রাচীরের  কাছাকাছি বসবাসকারীরা- তাদের জমিতে চাষ করার সময় নিহত হয়েছে,’ জানান ওই বাংলাদেশী আইনজীবী। এভাবে অনেকেই কয়েকদিন সীমান্তের ওপারে তাদের স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পর বাড়ি ফিরে আসার সময় নিহত হয়েছেন। প্রাচীর দেয়ার মতো যে কাজটি করে সেটা হলো পরিবার ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঝামেলা পাকানো। আগে লোকজন সহজেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের স্বজনদের সাথে দেখা করতে যেতে পারতো। কিন্তু প্রাচীর থাকায় এখন ‘তাদেরকে চোরকারবারিদের টাকা দিতে হয়, বিএসএফের সামনে তাদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়,’ জানান জোন্স।

তাহলে কেন বিশেষ করে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী, এমনকি বিদেশীভীতির ‘আবেদনসৃস্টিকারী’ ও এতেকরে সাফল্য লাভকারী সরকারগুলোর কাছে প্রাচীর এত জনপ্রিয়? সীমান্ত প্রাচীর আসলে ‘জাতীয়তাবাদী’ প্রতীক, জানান জোন্স। এগুলো ‘অন্য জনসাধারণকে বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত আইডিয়ার’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেলায় মুসলিম বাংলাদেশীদের কিংবা ট্রাম্পের পরিকল্পিত দেয়ালের বেলায় মেক্সিকানদের দূরে রাখার প্রতীক।

এসব প্রাচীর সরকাকে “কঠোর করে দেখায়, এমনভাবে যেন, তারা তথাকথিত ‘অবৈধ’ ও ‘বহিরাগতদের’ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী,” জানান ওই আইনজীবী। জোন্সের মতে, প্রাচীর কার্যত যা করে তা হলো, ‘ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জীবনকে আরো নিরাপত্তাহীন করে দেওয়া।’বস্তুত অভিবাসীদের দূরে না রেখে প্রাচীর ‘প্রায়ই লোকজনকে আরো বেশি সময় রেখে দেয়, সত্যিকার অর্থে সাময়িক শ্রম অভিবাসীদের স্থায়ী অবৈধ বাসিন্দায় পরিণত করে।’

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও ভারতের প্রাচীর-নির্মাণ এতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটা বাংলাদেশী জনসাধারণের চোখে ভারতের ইমেজকে ‘বড়ভাইসুলভ’ হিসেবে বিদ্রুপে পরিণত করেছে। প্রাচীর-নির্মাণকে বন্ধুসুলভ কাজ মনে করা হয় না। বরং প্রাচীরকে ‘অবিশ্বাসের প্রতীক’ বিবেচনা করা হয়, যা পারস্পরিক উপলব্ধিকে চাপা দিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাকি অংশে কাজটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত। ২০০৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ান ম্যাগাজিন হিমালের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, প্রাচীর ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রজুড়ে জনসাধারণের ঐতিহাসিক চলাচলের মুখে উড়ছে, আমাদের অতীত ও বর্তমান উভয়ের কাছে সম্প্রীতিপূর্ণ নয়, এমন কঠোর সীমান্তে পরিণত করেছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে মতবিনিময়, বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব দেশের মধ্যে বিরতিহীন ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের কাছে ছুটে গেছে। এটা ফলপ্রসূ করার জন্য আন্তঃজাতীয় সড়ক এবং রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাচীর বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রয়াসের চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী।

দীর্ঘ মেয়াদে প্রাচীর এই অঞ্চলে সাধারণভাবে এবং বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সমস্যা কেবল বাড়িয়েই তুলতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিচু দেশ। সমুদ্রের স্তর এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা সম্ভবত তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভারত তিন দিক দিয়ে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে, বেড়া এর জনগণকে কেবল ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত উপকূলীয় জেলা হলো খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট। এগুলো ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। তাদের বাড়িঘর ও শস্য পানিতে তলিয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে?

ভারত সমস্যাটির ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এটা কেবল অমানবিক হবে বলেই নয়, সমুদ্র স্তর বাড়লে বাংলাদেশের যে সমস্যা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভারতের জন্যও তা একই ধরনের বিপর্যয়কর হবে। বস্তুত, কোনো কোনো সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাথে ভারতও জলবায়ু পরিবর্তনে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের থেকে দূরে না থেকে ভারতের উচিত দেশটির সাথে সহযোগিতা করা। এ জন্য ভারতকে অবশ্যই প্রথমে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে, তা হলো- প্রাচীর তুলে ফেলা। অবশ্য প্রাচীর দেওয়ার চেয়ে তুলে ফেলা অনেক বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা স্বীকার করা দরকার, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর এসব দেশের জনগণের জন্য সামান্যই নিরাপত্তা বয়ে এনেছে; বরং এটা নিরাপত্তাহীনতার একটি উৎসে পরিণত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো ট্রাম্প কি দেয়ালের লিখন বুঝবেন?

লেখক : ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে লিখে থাকেন। (দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে বাংলা অনুবাদ)