Home » প্রচ্ছদ কথা » দিল্লির প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রস্তাবে আগ্রহী নয় ঢাকা

দিল্লির প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রস্তাবে আগ্রহী নয় ঢাকা

আমীর খসরু ::

কয়েক দফা স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে এপ্রিলে ভারত সফর করতে সম্মত হয়েছেন। এই সফরটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা জল্পনা ভাসছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, গঙ্গা ব্যারেজ এগুলোই খুব বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এগুলো স্রেফ হিমবাহের শৃঙ্গ। পানির নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালেই থেকে গিয়েছিল। আর সেটা হলো বাংলাদেশকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে  চাইছে ভারত।

দিল্লি চাচ্ছে, ২৫ বছর মেয়াদি একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। কিন্তু ঢাকা ভারতের সাথে ওই ধরনের কাঠামোগত চুক্তিতে থাকতে চাইছে না; তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকুক তা কামনা করে। বেশ শিথিল, কম আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের কথা ভাবছে বাংলাদেশ, এমনকি কোনো সময়-সীমা নির্ধারনের কাঠামোও রাখতে চাইছে না।

গত ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময়ই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর বাংলাদেশের সাথে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আইডিয়াটি প্রকাশ করেছিলেন। এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস. জয়শঙ্করের সফরের সময় এ নিয়ে আরো আলোচনা হয়। জয়শঙ্কর অবশ্য বলেছিলেন, বৈঠকটিতে ‘কানেকটিভিটি ও উন্নয়ন উদ্যোগের’ প্রতি নজর দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা  হয়েছে। তবে আসল কারণটি হতে পারে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি।

বাংলাদেশের এক শীর্ষ কূটনীতিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেছিলেন, ’ভারত চায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। আমরা চাই আরো ধীরে ধীরে ধাপে ধারে গ্রহণ করা পদক্ষেপ। সমঝোতা স্মারক হবে শুরুর জন্য ভালো বিষয়’। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘ভারতের সাথে আমরা বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চাই। আমাদের দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে, আমরা একসাথে সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলা করছি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সময় এখনো আসেনি।’ ভারতের প্রস্তাবিত চুক্তিতে দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি ও সরবরাহ এবং পারস্পরিক ধারণায় থাকা হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযানের কথা বলা হয়েছে।

দ্য হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত চাচ্ছে বাংলাদেশের কাছে ৫০ কোটি ডলারের ঋনে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-ও একই তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারত ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চাইছে বাংলাদেশকে।  বাংলাদেশ হয়তো এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে; তবে তা হবে ভিন্নভাবে অর্থাৎ উপকূল রক্ষা বাহিনীর জন্য টহল বিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষার জন্য রাডার কেনার কাজে ব্যবহার করবে।

ভারতীয় মিডিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স্টপোস্টের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাই ভারতকে ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে চীনই বাংলাদেশের বৃহত্তর অস্ত্র সরবরাহকারী। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে আসা অস্ত্রের ৮০ ভাগই সরবরাহ করেছে চীন।

এই ২০১৬ সালের নভেম্বরেও চীনের কাছ থেকে ঢাকা দুটি সাবমেরিন কিনেছে। এই ঘটনায় নয়া-দিল্লির অনেকের চোখ কপালে ঠেকেছে। তখন থেকেই ভারত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে বাংলাদেশকে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক কর্মকর্তাই ভারতীয় সামরিক সরঞ্জাম কিনকে আগ্রহী নয়। কারণ ভারত নিজেই অন্যান্য দেশের কাছ থেকে অস্ত্র আমদানি করে থাকে। তারা নেপাল ও মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের নিম্নমানের কথাও উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা চীন ও ভারতের সাথে তার দেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা অব্যাহত রাখতে চাইছেন। গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের ঢাকা সফরের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীন ও বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করে।

চীনের ‘মুক্তার মালা’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ। ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশে সামরিক স্থাপনার কৌশলগত স্থাপন হলো- এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

অবশ্য ২০১৫ সালে শেখ হাসিনার সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় তা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্বাস বেড়েছে। আবার চীনকে হতাশ করে হাসিনা সরকার চারটি প্রকল্পের অন্যতম সোনাদিয়া বন্দর পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইন্দ্রানি বাগচির মতে, সিদ্ধান্ত ছিল কৌশলগত এবং ভারতকে বিবেচনায় রেখেই তা করা হয়েছিল।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার সফর দুবার পিছিয়েছে, একবার ডিসেম্বরে, আরেকবার ফেব্রুয়ারিতে । দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারণ হিসেবে উভয় প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব-নির্ধারিত কর্মসূচির কথা উল্লেখ করলেও পানিবণ্টন চুক্তিসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে অচলাবস্থাই সফর স্থগিত হওয়ার মূল কারণ বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বাংলাদেশ পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান শামসুল আরেফিনের মতে, ‘বাংলাদেশ এখনো কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের জন্য নদীর পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘হাসিনার প্রয়োজন পানিবণ্টনের মতো কিছু চুক্তি নিয়ে ভারত থেকে ফিরতে। তিনি ভারতীয় বিদ্রোহীদের বিদায় করার মতো ভারতের নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটিবিষয়ক সব উদ্বেগ দূর করেছেন, ভারতের গোলযোগপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট দিয়েছেন। এখন ভারতের প্রতিদান দেওয়ার সময়।’ আরেফিন বলেন, নদীর পানিবণ্টনের মতো ইস্যুতে সমাধান পেতে ব্যর্থতা নিশ্চিতভাবেই পল্লীর ভোটাদের ওপর প্রভাব ফেলবে।

একটি ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশ সম্ভবত একই স্থানে রয়েছে। সেটা হলো সন্ত্রাসবাদ। শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা  জঙ্গীবাদ ও  সন্ত্রাসের উত্থান দেখেছে। বাংলাদেশে ঝামেলা সৃষ্টিতে ইন্ধন দেওয়ার জন্য ঢাকা দায়ী করেছে ইসলামাবাদকে। ফলে ঢাকা যখন ২০১৬ সালের ইসলামাবাদের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়, তখন তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না।

এছাড়া ১৯ সেপ্টেম্বর কাশ্মিরের উরি হামলার পরপরই পাকিস্তানকে নিন্দা করে। দ্য ইকোনমিক টাইমস জানায়, সন্ত্রাস দমনে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ সভাও করেছে।

অবশ্য এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যকার বৈঠকের ফলাফলই সব জল্পনা-কল্পনার সমাধান দিতে পারবে।

(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট ও ফার্স্টপোস্ট অবলম্বনে)