Home » প্রচ্ছদ কথা » ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন

ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন

সি আর আবরার ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুবার স্থগিত হওয়া ভারত সফর ৭ থেকে ১০ এপ্রিল হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে আস্থা রাখলে অনুমান করা যেতে পারে, বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা পানিচুক্তিটি এই সফরে চূড়ান্ত হচ্ছে না। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সইয়ের জন্য দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও নথি চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার চুক্তি। এটা হবে ‘বৃহত্তর কানেকটিভিটির অংশবিশেষ- যার আওতায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত মালামাল পরিবহনের ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট করতে পারবে।’

বাংলাদেশ ও ভারত- উভয় দেশের নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে ধারণা রয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার জোরালো প্রয়াসের অংশ হিসেবে ভারতের উদ্বেগ নিরসনে অন্য যেকোনো প্রতিবেশীর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক বেশি সাড়া দিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ- বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে- প্রশমিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক প্রয়াস ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। একইভাবে মূল ভূখন্ড এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে আরো ভালো কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠার জন্য নদী ও স্থল রুটগুলো খুলে দেওয়াটা ছিল ভারতের সম্প্রসারিত জাতীয় স্বার্থের জন্যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

এ ধরনের বড় বড় ছাড় সত্ত্বেও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি প্রধান উদ্বেগও দূর করেনি। সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে অতি সামান্য অগ্রগতি হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ের চেয়ে অনেক নিচে রয়েছে। যদিও ২০১৫ সালের বহুল প্রশংসিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি বর্তমান ভারতীয় নেতৃত্বের শুভেচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ চার দশক আগেই ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে দেশের সংবিধান সংশোধন করার মাধ্যমে চুক্তিটি সাথে সাথেই বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিল। এটাও স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, শুষ্ক মওসুমে পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তির আগে ফারাক্কা বাধের কার্যক্রম শুরু হবে না- ১৯৭৪ সালে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে এমন  সমঝোতা হয়েছিল ফারাক্কা বাধ নিয়ে। বাধটির ফিডার ক্যানেলগুলো পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ মাত্র ১০ দিনের জন্য অনুমতি দিলেও, ভারত বাধটি চালু করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা অব্যাহত রাখে।

সম্প্রতি চীন থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন কেনার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফরটিকে নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে। সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দল নিয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর; বহু বিষয়াদি-সংশ্লিষ্ট  দীর্ঘ মেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি আদায়ে সাউথ ব্লকের প্রবল আগ্রহের মধ্যে ভারতের আঙিনায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে দিল্লি যে কতটা উদ্বিগ্ন তা-ই  এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের নৌ বাহিনী সংশ্লিষ্ট ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়টি দিল্লির প্রভাবশালী কোনো কোনো মহলে বড়ভাইসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ভারতীয় রাজ্যসভার ‘ইন্ডিয়াস ওয়ার্ল্ড’ নামের টিভি শোয়ে রাষ্ট্রদূত কানওয়াল শিবাল বলেছেন, প্রতিবেশী গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে পা রাখার জায়গা লাভের চীনা কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে ভারত এবং ভারত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছে, ‘শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ এটা দিচ্ছে।’ তিনি এমন অযাচিত পরামর্শও দেন যে, চীনের বদলে রাশিয়ার কাছ থেকেও বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনতে পারতো, ‘কারণ তা ভারতের জন্য কম সমস্যার সৃষ্টি করতো।’ তার বক্তব্যের বোঝা যাচ্ছে, কোন সূত্র থেকে সাবমেরিন কিনবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাংলাদেশের উচিত ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

টকশোতে উপস্থিতি বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আশ্চর্য হয়ে গেছেন, বাংলাদেশ যখন ‘তার সব সমুদ্রসীমা বিষয়ক সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে’ তখন কেন দেশটি সাবমেরিন কেনার উদ্যোগ নিল? ফলে এই প্রশ্নটি মনে উদয় হতেই পারে, ভারত যদি তার নিজস্ব সীমানা সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলে, তখন কি তার নিজস্ব বিমানবাহী রণতরী এবং সাবমেরিনগুলো বিক্রি করে দেবে?

সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানের শিক্ষাবিদ বিনা সিক্রি আরো এক ধাপ এগিয়ে ঊদ্ধত্যপূর্ণ দাবি করেছেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে ‘শেখ হাসিনার আমলে চীনপন্থী আমলাদের অব্যাহত শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে!’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।’ বাংলাদেশের এই স্বঘোষিত মঙ্গলকামীর এ ধরনের তথ্যের সূত্র জানতে খুবই ইচ্ছা জাগে। হাই কমিশনার সিক্রি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল চীন এবং দেশটি ‘তার বাবাকে’ সমর্থন করেনি। বাংলাদেশী ও ভারতীয়দের মধ্যে জনগণ পর্যায়ের যোগাযোগের সাফাই গাওয়ার সময় এই অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক তার সব কূটনৈতিক প্রশিক্ষন ও শিষ্টাচার পাশে সরিয়ে রেখে বলেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সব মন্ত্রীকে ‌‌”নানাপন্থায় বশ মানিয়ে রাখা হতে পারে। তিনি শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, চীনের গভীর গভীর পকেট আছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার সফরের পরিকল্পনা করার প্রেক্ষাপটে তার তদারকিতে নিয়োজিতদের উচিত নয়া দিল্লিতে বিরাজমান মনোভাব সম্পর্কে যথাযথ অবগত থাকা। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটাই সময় হাতে থাকা শেষ কয়েকটি দরকষাকষির বস্তুকে ধরে রাখা এবং নয়া দিল্লি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত বিনিময় চুক্তি না করা পর্যন্ত ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট ও পরিবহণ চুক্তিতে অগ্রসর না হওয়া।

(লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)