Home » প্রচ্ছদ কথা » বরখাস্তের ‘মচ্ছব’ : আগামী নির্বাচনের কী ‘বার্তা’ পেয়েছে সরকার

বরখাস্তের ‘মচ্ছব’ : আগামী নির্বাচনের কী ‘বার্তা’ পেয়েছে সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ব্যবধান মাত্র পাঁচ দিনের। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের আটজন জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত। উচ্চ আদালতের আদেশ পেয়ে পুণর্বহাল হয়ে দায়িত্ব নিতে না নিতেই সরকার বরখাস্ত করছে সিটি মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান অথবা ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি। অভিযোগ একটিই, তারা কোন কোন মামলার আসামী এবং চার্জশীটভুক্ত। হাইকোর্ট অবশ্য ইতিমধ্যেই রাজশাহী, সিলেট সিটি মেয়র ও হবিগঞ্জের পৌর মেয়রের বরখাস্ত আদেশ স্থগিত করেছেন।

কুমিল্লা সিটির নবনির্বাচিত মেয়র মনিরুল হকের বিরুদ্ধেও আছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। ধরে নেয়া যায়, তার ভাগ্যেও সহসাই জুটতে পারে অমন বরখাস্তের আদেশ; হতে পারে গদিতে বসার সাথে সাথে। কারন মামলার ব্যাপারে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা একরকম শৈল্পিক দক্ষতা অর্জন করেছেন। এতটাই যে, সত্য ঘটনায় অনেক সময় মামলা বা অভিযোগ নেয়া হয় না। কিন্তু ঘটনা তৈরী করে মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার বিষয়ে তাদের সক্ষমতা ঈর্ষণীয়। যদি কখনও এদের বিরোধী পক্ষ ক্ষমতাসীন হয় তখন দেখা যাবে- এই বিষয়টিই শতগুন বুমেরাং হচ্ছে তাদের জন্য।

হত্যার অভিযোগে চার্জশীটভুক্ত আসামী হয়েও ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য পদ টিকে থাকে। দু’জন মন্ত্রী সর্বোচ্চ আদালতে শপথ ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত এবং দন্ডিত। কিন্তু এক যাত্রায় ভিন্ন ফল হিসেবে বরখাস্তের ‘মচ্ছব’ চলছে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। গত সাড়ে তিন বছরে মোটে ৩৮১ জন এরকম বরখাস্তের খাঁড়ার মধ্যে পড়েছেন। জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী বরখাস্ত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন শতাধিক জনপ্রতিনিধি (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ৪ এপ্রিল; মানবজমিন ৭ এপ্রিল)।

২০১৩ সালে পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিতদের মধ্যে গদিতে আছেন দু’জন। বরিশালের মেয়র এখনও বরখাস্ত হননি, কোন তরিকায় টিকে আছেন, জানা নেই। ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত খুলনার মেয়র সম্প্রতি ফিরেছেন উচ্চ আদালতের নির্দেশে। কিন্তু বরখাস্ত ‘মেলোড্রামা’র আরো নাটকীয়তা অপেক্ষা করছিল। রাজশাহী ও সিলেটের বরখাস্তবকৃত দুই মেয়র উচ্চ আদালতের নির্দেশে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু গদিতে ছিলেন যথাক্রমে আট মিনিট ও দুই ঘন্টা। অত:পর করিৎকর্মা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরখাস্ত আদেশ নিয়ে ফিরেছেন বাসায়। উচ্চ আদালতের শরনাপন্ন হতে হয় তাদের, স্বপদে ফিরে আসতে।

বরখাস্তকৃত দু’চারজন বাদ দিলে প্রায় সকলেই সরকার বিরোধী, বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত। রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার জন্য এই পথ বেছে নেয়া হয়েছে। এরফলে স্থানীয় পর্যায়ে কাঠামোগুলো অকার্যকর হয়ে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিনত হচ্ছে। এক্ষেত্রে আইন সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হলে প্রশ্ন উঠতো না। সরকারী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি হলে একরকম বিরোধী দলের হলে আরেক রকম- এই অবস্থায় ভরসা হয়ে উঠছে সর্বোচ্চ আদালত।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে; “আইনের ধারাগুলো সরকার খড়গ হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি হাতে থাকলে যে কোন গণপ্রতিনিধি সারাক্ষণ ভীত-সন্ত্রস্ত এবং সরকারী নিয়ন্ত্রনে থাকতে বাধ্য থাকেন। এ ধরনের আইনের সুযোগে রাজনৈতিক সরকারগুলো সামরিক শাসকদের মত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রন করছে”। তাহলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে- সরকারই মামলা করছে, তদন্ত করছে, চার্জশীট দিচ্ছে, সবশেষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বরখাস্ত আদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছে।

এভাবে ঢালাও বরখাস্ত যে একধরনের রাজনৈতিক অপকৌশল এবং অসহিষ্ণুতার স্থূল প্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, যদিও বিষয়টিকে আইনী খোলসের মধ্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি যে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ তা সকলে বুঝতে পারছে। এসব সিদ্ধান্ত বিকেন্দ্রীকরন বা স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি।

ফিরে যাই ২০১৩ সালের পাঁচ সিটি নির্বাচনের দিকে। তখনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মার্কা লাগেনি। নির্বাচন কমিশনও নতুন। ঐ সিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীদের একরকম ভরাডুবি ঘটেছিল। এমনকি এ্যাডভোকেট আজামত উল্লাহ’র মত ইমেজের প্রার্থী হেরে গিয়েছিলেন বিএনপি’র বিতর্কিত ইমেজের প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল মান্নানের কাছে।

সে সময়ে একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খেদোক্তি ছিল, অনেকটা স্বগতোক্তির মত; …“এত উন্নয়ন করার পরেও আমাদের সৎ প্রার্থীরা হেরে গেল, বিপরীতে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীরা নির্বাচিত হলো। তাহলে উন্নয়ন করে কি লাভ, কাদের জন্য উন্নয়ন …..”। মনে হচ্ছিলো প্রধানমন্ত্রী নিজেকেই প্রশ্ন করছিলেন! নাকি দলীয় লোকজন, নাকি জনগনকে?

অবশ্য জনগনকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কারন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে জনগনের মতামত প্রদানের একমাত্র মাধ্যম  ভোট। সেখানে সুযোগ পেলেই ভোটাররা তাদের সকল ক্ষোভ-ঘৃণা উগরে দেয় ভোটের মাধ্যমে। তাদের এই মতামত যে খুব ইতিবাচক এটি বলার সুযোগ কম। কারন তারা ভোট দেয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে; বাছ-বিচার করে না। এই জনগনই তো ঝাঁকের কৈয়ের মত ঝাঁক বেঁধে ২০০৮ সালে সংসদে তিন-চতুর্থাংশ আসনে শেখ হাসিনা ও তার দলকে জিতিয়ে ছিল। সেটি ছিল ২০০১ সালের পূণরাবৃত্তি!

২০১৩-র পাঁচ সিটি নির্বাচনে শেখ হাসিনা ‘বার্তা’ পেয়ে গিয়েছিলেন। এটি এখন পরিস্কার যে, সে সময়েই চূড়ান্ত হয়েছিল যে, বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে দেয়া যাবে না। ক্ষমতার রাজনীতিতে নব্বইয়ের পরে প্রথম মেয়াদে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বিএনপি ধরে রাখতে পারেনি, দ্বিতীয় মেয়াদের ব্যর্থতা অনুসরন করছে তাদের বিরোধী ভূমিকার রাজনীতিতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি শেষ মুহুর্তে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিলে কি হতো সে বিশ্লেষণ বিএনপি আজতক করতে সক্ষম হয়নি।

পাঁচ বছর গড়িয়ে কুমিল্লা সিটি নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখন দলীয় মার্কা লেগেছে। কুমিল্লার লড়াইটি ছিল দলীয় প্রতীকে, নৌকা বনাম ধানের শীষ। বিএনপির জন্য এই নির্বাচন ছিল ‘এসিড টেষ্ট’। দলটির রাজনীতি নেই, কর্মসূচি নেই, মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত, কিন্তু দলের ভোট আছে। দলীয় ভোট বা মার্কার ভোটের চেয়েও আওয়ামী লীগের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোট। যেটি মূলত: গত কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচনের বিজয়ের নির্ধারক।

প্রশ্ন উঠতে পারে নারায়নগঞ্জে ক্ষমতাসীনরা জিতলো কিভাবে? উত্তর হচ্ছে, সেখানে সরকারী দল বলতে ভোটাররা বোঝে একটি বিশেষ পরিবারকে। আইভি সেখানে আসলে ‘বিরোধী দল’ হিসেবেই বিবেচিত। সেজন্যই আইভি’র জয় ছিল আগের ধারাবাহিকতা এবং নারায়নগঞ্জে গডফাদার ও অর্গানাইজড ক্রাইমের বিপরীতে সাহসিকতা এবং ব্যক্তি ইমেজের ফলাফল। আইভি অকপট আচরন এবং সোজাসাপ্টা বক্তব্য তাকে গ্রহনযোগ্য করে তুলেছে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ততা থাকলেও তিনি জনগনের নেতা হয়ে উঠেছেন একেবারেই নিজস্ব ক্যারিশমায়।

পাঁচ বছর আগেও নির্বাচন কমিশন ছিল সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত। সেবারও একটি ‘সার্চ কমিটি’ খুঁজে নিয়েছিল ‘রকিব ধরনের নির্বাচন কমিশন’। সে সময় সিটি নির্বাচনের আগে তাদের তেমন কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। এবারেও সার্চ কমিটির সুপারিশে প্রেসিডেন্ট বর্তমান কমিশন নিয়োগ দিয়েছেন এবং কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে তাদেরও কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। দায়িত্ব নেয়ার পরে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তারা সফল হয়েছেন, কারন সরকার তাদের সফল হতে এক রকম বাধ্য করেছে।

নতুন নির্বাচন কমিশন খুবই আনন্দিতও উৎপফুল্ল! যেন সাফল্যের এভারেষ্টে চড়তে যাচ্ছেন। সিইসি তো বলেই ফেলেছেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’। কিন্তু এখনও তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, এই কমিশনকে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের পরে ‘রকিব কমিশনকে’ নিরপেক্ষ মনে হয়েছিল-যা শেষ পর্যন্ত টেকেনি অনিবার্যভাবেই। ঐ কমিশন ইতিহাস হয়ে গেছে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং পরবর্তীকালের রক্তাক্ত ও চর দখলের স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করে। তবে বিদায় নিয়েছেন নারায়নগঞ্জ সিটি নির্বাচনের কথিত ‘সুখস্মৃতি’ সাথে নিয়ে।

এখন অনেককিছুই খুব স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের আগে টান টান উত্তেজনা। নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। দিনভর অভিযোগ করে আসা বিএনপি প্রার্থী জয় পেয়েছেন। হারার জন্য ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী এবং কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক দলীয় কোন্দলকে দায়ী করে বলেছেন, সরকারের জয় হয়েছে। সব মিলিয়ে কেমন চমৎকার গণতান্ত্রিক সুবাতাস! এমনই সুবাতাস ২০১৩ সালে সিটি নির্বাচনের পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ভোটের গণতন্ত্রটা বুঝি ফিরে এলো!

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের পরে গণমাধ্যম পোষ্টমর্টেম করেছে এভাবে যে, নির্বাচনের ফলাফল ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি বড় বার্তা। যদ্দুর মনে পড়ছে, ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের পরে গণমাধ্যমগুলি ওরকমই বিশ্লেষণ দেয়ার চেষ্টা করেছিল। বার্তা ক্ষমতাসীনরা পেয়েছিলেন এবং বিএনপিকে বাদ দিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সেই ফাঁদে বিএনপি নির্বাচনের বাইরে চলে গিয়েছিল। সে সবই এখন ইতিহাস।

এবারেও একই বার্তা ক্ষমতাসীনদের কাছে রয়েছে। দেখার বিষয় হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি ধরনের লক্ষ্যভেদী কৌশল ক্ষমতাসীন দল নেবে? অন্যদিকে, বিএনপি কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, না তারাও লক্ষ্যভেদী কৌশল নির্ধারন করবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের লক্ষ্যে? আগামী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বলে দেবে, আগামী সংসদ নির্বাচনটি কেমন হবে।