Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 10)

Author Archives: আমাদের বুধবার

মাহাথির কী পারবেন প্রতিশ্রুতিপূরণ করতে?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

মালয়েশিয়ায় নির্বাচনের ফলাফল সাধারণভাবে অনুমান করা যেতো। সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে পর্যন্ত ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গ্যানাইজেশন (আমনো) ও কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত জোটটি সেই ১৯৫৫ সাল থেকে জিতে আসছিল। ক্ষমতায় থাকার জন্য বছরের পর বছর ধরে আমনো সম্ভাব্য সব ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেছে। কখনো তারা দেশটির জাতিগত গ্রুপগুলোর মধ্যকার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উস্কে দিয়েছে, কখনো সমালোচকদের জেলে ঢুকিয়েছে, কখনো নির্বাচনে কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে, কখনো ভোটারদের ঘুষ দিয়েছে, লোকরঞ্জক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কিংবা হেরে গেলে অশান্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে। গত ৯ মে অনুষ্ঠিত নির্বচানের সময়ও তারা এই কৌশলগুলোর সবই প্রয়োগ করেছে। কিন্তু তারপরও নাজিব রাজাকের সরকার বিরোধী দলের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগে ছিল। মালয়েশিয়ার ভোটারদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদায় ঘটে, বিরোধী জোট খুব সহজেই জয়ী হয়। আর এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তন ঘটল।

যে দেশে রাজনীতি সবসময় সাম্প্রদায়িক নীতিতে পরিচালিত হয়, সেই দেশে জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন বিশাল একটি ঘটনা। যে অঞ্চলের সহজাত স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে থাকেন, সেখানে গণতন্ত্রের বিজয় বিরাট কিছু। আর যে নাজিব মালয়েশিয়ার সরকারি সংস্থা থেকে ব্যক্তিগতভাবে ৬৮১ মিলিয়ন ডলার লুট করেছেন বলে মার্কিন বিচার দফতর অভিযোগ করেছে, তার জন্য এই ফলাফল একটি বেশ বড় ধরনের চপেটাঘাতই ছিল।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতা ও গণতন্ত্রের বিরল উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই মালয়েশিয়ার নামটি উচ্চারিত হয়ে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ক্রমাগতভাবে অন্যায় কৌশলের আশ্রয় নেওয়ায় এবং দেশটির মালয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্ষমতায় বহাল রাখার জন্য প্রবল উন্মাদনা সৃষ্টি করায় এই উভয় কৃতিত্বই ম্লান হয়ে পড়েছিল। এখন নতুন সরকারের বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে সত্যিকারের পরিবর্তন কতটা ঘটে।

সংশয়বাদীরা বলছেন, ক্ষমতায় থাকার জন্য নাজিব যেসব নোংরা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সে সবের উদ্ভাবক ছিলেন আমনো থেকে পাঁচবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এই মাহাথির মোহাম্মদই। এই ডা. মাহাথিরই মালয়েশিয়ায় ঘৃণ্য বর্ণবাদী বিভেদনীতির প্রচার করেছিলেন, যাতে মালয় ভোটাররা আমনোর প্রতি অনুগত থাকে। আরো বড় বিষয় হলো, পাকাতান হারাপান নাম দিয়ে গঠিত যে জোটটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে, তারাও কিন্তু আমনোর নির্বাচনী-জালিয়াতি ঠেকাতে লোকরঞ্জক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। তারা অজনপ্রিয় কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পণ্য-পরিষেবা কর প্রত্যাহার এবং নাজিবের প্রত্যাহার করা পেট্রোলে ভর্তুকি পুনর্বহাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

নতুন সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের নেপথ্যে আরেকটি বিষয় কাজ করেছিল তা হলো আমনোর দলছুট ও সরকার পরিচালনায় তুলনামূলক সামান্য অভিজ্ঞতা থাকা বর্ষীয়ান বিরোধী রাজনীতিবিদদের নিয়ে বিশালাকারের জোট গঠন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলা যায় মাহাথির মোহাম্মদের সাথে আনোয়ার ইব্রাহিমের আঁতাতের কথা। একসময় আনোয়ার ইব্রাহিম ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী। তিনি তখন ছিলেন মাহাথিরের স্নেহধন্য। কিন্তু পরে তার বিরাগভাজনে পরিণত হন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা পায়ুকামের অভিযোগ এনে জেল ঘাটিয়েছিলেন মাহাথির। যে দলগুলো নিয়ে পাকাতান হারাপান গঠিত, তার নেতা হলেন এই আনোয়ার ইব্রাহিম। নাজিব যদি তাকে আবারো জেলে না পুরতেন, তবে ৯২ বছর বয়স্ক মাহাথিরের বদলে তিনিই হতেন এখন প্রধানমন্ত্রী। ডা. মাহাথির ও আনোয়ার ইব্রাহিম যদিও দাবি করেছেন, তারা তাদের আগের বিবাদ মিটিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু তবুও পরিষ্কার নয়, কারামুক্ত আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে মাহাথির কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন।

এতসব সংশয়, সন্দেহের পরও কল্পনা করা কঠিন, আমনোর পরাজয়ের পরও মালয়েশিয়া আরো ভালো পথে এগিয়ে যাবে কি না। নতুন ক্ষমতাসীনদের জন্যই প্রয়োজন নির্বাচনীব্যবস্থাকে আরো সুষ্ঠু করা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে একটি ইতিবাচক দিক হলো, ভোটাররা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে আমনোর মালয় উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কট্টর ইসলামপন্থী পাসের, তারা পাকাতান হারাপানে যোগ দেয়নি, আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। আমনোর ক্ষমতায় থাকার সময় নতুন এমপিদের অনেকেরই নানা ধরনের সরকারি পক্ষপাতিত্বের শিকার হতে হয়েছে। ওই অভিজ্ঞতার আলোকে তারা আমলাতন্ত্রকে আরো নিরপেক্ষ করতে চাইবেন। মালয় ভোটারদের বিপুল ভোটারের কারণে তাদেরকে এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন কাজ। তবে পাকাতান হারাপান সম্ভবত তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কিছু অংশ হলেও পূরণ করে আমনোর দোসরদের দুর্নীতি উদঘাটন করবে। জোটটি ওয়াদা করেছিল, তারা নাজিবের বিরুদ্ধে থাকা কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে রাজনীতিকে কুলুষতামুক্ত করতে সহায়তা করবে।

সম্ভবত নতুন সরকার অর্ন্তদ্বন্দ্ধ সামাল দিতে পারবে না, খুব বেশি কিছুও করতে পারবে না। কিন্তু তবুও তারা যদি কেবল টিকেও থাকে, তবুও মালয়েশিয়ার জনসাধারণ ও তাদের প্রতিবেশীদের মনে করিয়ে দেবে যে মাঝে মাঝেই শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের পরিবর্তন হওয়া দরকার। কম্বোডিয়ান, সিঙ্গাপুরিয়ান, থাই ও ভিয়েতনামিরাও হয়তো চিন্তা করবে, ভাগ্য সহায় হলে একই ধরনের ঘটনা তাদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। (ইকোনমিস্ট অবলম্বনে)

মোহাম্মদ আলী : যুদ্ধ আগ্রাসন বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক

মোহাম্মদ আলী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন। ৩ জুন, ২০১৬ তিনি মৃত্যুবরন করেন। তাঁর প্রতি  বুধবার-এর অসীম শ্রদ্ধা।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’- এটাই তাকে বোঝানোর জন্য সবচেয়ে সহজ বাক্য। তার অনতিক্রম্য ৫৬-৫ রের্কড তাকে মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা পারফরমার প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। সামর্থের সর্বোচ্চ অবস্থায় তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি। লড়াইয়ে তার নজিরবিহীন দক্ষতা আর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস তাকে সত্যিকার অর্থেই ‘সর্ব যুগে সবার সেরা’ করেছে। মুষ্টিযুদ্ধের রিঙে ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য করে এবং মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে’ তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বিদের পর্যুদস্ত করতেন। তিন তিনবার হেভিয়েট শিরোপা জয় করে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানবে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে সনি লিস্টনকে হারিয়ে নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমিই বিশ্বের সম্রাট।’ তার সেদিনের সাম্রাজ্য কেবল হেভিওয়েট রিঙেই সীমিত ছিল। সেই রিঙও তিনি ডিঙিয়েছেন। তিনি কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই নয়, কিংবা সার্বিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, সর্বকালের সেরা মানুষদের একজনে পরিণত হয়েছেন। রিঙের ভেতরে ও বাইরে তিনি যে কৃতিত্ব স্থাপন করেছেন, তা তার আগে বা তার পরও দেখা যায়নি। হয়তো কোনো দিনই দেখা যাবে না। এমনকি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থায় থাকার সময়ও মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা, তার অনন্য মহাত্ম ফুটে ওঠতো। একজন শোম্যান, একজন প্রতিবাদী- বিদ্রোহী, একজন মানবাধিকার কর্মী, একজন সত্যিকার অর্থে ভালো মানুষ, একজন কবি- সব গুণেই তাকে অভিহিত করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, যুগ-নির্বিশেষে তিনি বিস্ময়কর ব্যক্তি, মহামানব। বস্তুত তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষে। এমনকি পৃথিবীর অনেক স্থান- যেখানে মুষ্টিযুদ্ধের কোনোই জনপ্রিয়তা নেই, সেখানেও তিনি মুকুটহীন সম্রাট। এক জন মুষ্টিযোদ্ধার নামও যদি কেউ জানে, তবে তিনি হলেন মোহাম্মদ আলী।

সেরা ফর্মের সময়ে তিনি ছিলেন এককথায় অপ্রতিরোধ্য। তবে তার লড়াই দেখতে যারা আসতো, তিনি তাদের পয়সা উসুল করিয়ে দিতেন। বহুদূর পৌঁছতে পারার সক্ষমতা, রহস্যময় সময় জ্ঞান, অসাধারণ পূর্বাভাস এবং চমৎকার আত্মরক্ষা কৌশল নিয়ে গড়ে উঠেছিল তার দুর্দান্ত দক্ষতা। তার ঘুষি মারার ক্ষমতাসহ যে সামান্য কিছু ঘাটতি ছিল, তা পুষিয়ে দিয়েছিল গতিময় ফুটওয়ার্ক এবং রিংকে ব্যবহারের সক্ষমতা।

তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, ‘আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ আর এই দাবি প্রমাণও করেছেন তিনি ভালোভাবে। আর তাকে ঘিরে থাকা কিংবদন্তিগুলো কেন হয়েছে, তার পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। তার মনমুগ্ধকর দৈহিক গড়ন এবং তারকা গুণাবলী তাকে পরিণত করেছিল, ‘সুন্দরতম’ হিসেবে। আর তার চাতুর্যপূর্ণ কথাবার্তা তাকে পরিণত করে ‘অনন্য’। তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তিনি তার জীবনীকার টমাস হাউসারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কখনো কি এমন কোনো যোদ্ধা ছিল যে কবিতা লিখতো, রাউন্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করতো, সবাইকে হারাতো, মানুষকে হাসাতো, মানুষকে কাঁদাতো এবং আমার মতো এতো লম্বা ও এতো সুন্দর ছিল? পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনা থেকে কখনো আমার মতো কোনো যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেনি।’ তিনি একবার তার এক প্রতিদ্বন্দ্বিকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমাকে হারানোর স্বপ্ন দেখে থাকো, তবে ঘুম থেকে উঠে ক্ষমা চাও।’ আর একবার তিনি মোহাম্মদ আলী নামক মুষ্টিযোদ্ধাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য যথার্থই নির্মম হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে শিরোপার দাবিদার আরনি টারেল বলেছিলেন, তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বির নতুন নামের স্বীকৃতি দেবেন না। আলী সেবার ইচ্ছে করেই লড়াইকে ১৫ রাউন্ড পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর বারবার অসহায় টারেলকে ঘুষিতে ঘুষিতে কাঁপিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘বল, আমার নাম কী? বল আমার নাম কী?’

ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় ফিট। আর তাই যেকোনো কঠিন আঘাতও সহ্য করে এগিয়ে যেতে পারতেন। অবশ্য এই সহ্য করার গুণের জন্য তাকে পরবর্তীকালে মূল্যটা দিতে হয়েছে বেশ চড়া। পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে তিনি অতীতের ছায়া হিসেবেই বেঁচে ছিলেন অনেক দিন। একসময়ের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটি মধ্য বয়সের পর ঠিকমতো হাতটিও নাড়াতে পারতেন না, কথাও ঠিকমতো বলতে পারতেন না। কিন্তু অসহায় অবস্থাতেও নানা কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন।

মুষ্টিযুদ্ধে তার শ্রেষ্ঠত্বের একটি নমুনা হলো তিনি ফলাফল কী হবে,তা চিন্তা না করেই জয়ের অদম্য ইচ্ছা নিয়ে লড়েছেন। তিনি জন্মেছিলেন লড়াই করার জন্য এবং জয়ের জন্য। তিনি যদি একটি আঘাত হজম করতেন, তবে দুটি কিংবা তিনটি আঘাত ফিরিয়ে দিতেন। আর এটাই এই মুষ্টিযোদ্ধার একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তার স্টাইল ছিল প্রথাসিদ্ধ নিয়মনীতির বেশ বাইরে। প্রচলিত নিয়মে তিনি তার হাত দুটি দিয়ে মুখকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে দুপাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য তিনি অসাধারণ রিফ্লেক্স এবং রিচ (৮০ ইঞ্চি) ব্যবহার করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিকে ক্লান্ত করে পর্যুদস্থ করার কৌশলের দিকে তিনি বেশি মনোযোগী থাকতেন।

মোহাম্মাদ আলী নামে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে। ক্যাসিয়াস (সিনিয়র) এবং ওডেসার প্রথম ছেলে ছিলেন তিনি। তার পিতা ছিলেন পেইন্টার। মোহম্মদ আলী ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তার ছোট ভাই রুডলফও মুসলমান হলেন। তার নাম হয় রহমান আলী। আলীর মেয়ে লায়লা আলী পরবর্তীকালে মুষ্টিযুদ্ধে সুনাম অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে আলী চারবার বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১৪ আগস্ট আল বিয়ে করেন সনজি রোইকে। দুটি সন্তান হওয়ার পর ১৯৬৬ সালে এই বিয়ে ভেঙে যায়। তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালিদা ‘বেলিন্দা’ আলীকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৭ আগস্ট। চারটি সন্তান হওয়ার পর তারা আলাদা হয়ে যান। ১৯৭৭ সালের ১৯ আগস্ট বিয়ে করেন ভেরোনিকা পোর্সে আলীকে। ১৯৮৬ সালে এই বিয়েও ভেঙে যায়। তার চতুর্থ ও শেষ স্ত্রী লনি উইলিয়ামস। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরের এই বিয়েটি টিকে থাকে। তারা আসাদ নামের এক ছেলেকে দত্তক নেন। আলীর সন্তানরা হলেন : রাশিদা, জামিলা, মরিয়ম, মিয়া, খালিয়াহ, হানা, লায়লা, মোহাম্মদ জুনিয়র ও আসাদ।

তার মুষ্টিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে একটি চমৎকার কাহিনী বলা হয়ে থাকে। দুই ভাইয়ের শিক্ষা জীবন শুরু হয় একইসাথে। দুভাই আমেরিকার ডুভাল জেনারেল হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। আলীর বয়স তখন ছিল ১২ বছর আর ভাইয়ের বয়স ১০ বছর। এ সময় তাদের বাবা ৬০ ডলার দিয়ে একটা সুন্দর বাইসাইকেল কিনে দেন। দু’ভাই সাইকেলে চড়ে খুব ফুর্তি করে বেড়াতেন। দু’ভাই পালাক্রমে সাইকেল চালাতেন। ১৯৫৪ সালের ঘটনা। সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায় দু’ভাই সাইকেলে করে এক প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলেন। সাইকেলটি রেখেছিলেন বাইরে। কিছুক্ষণ পরে এসে দেখেন, তাদের প্রিয় সাইকেলটি চুরি হয়ে গেছে। দু’ভাই তাতে বেশ দুঃখ পেয়েছিলেন। চোরকে পেটানোর বাসনায় মার্টিন (একইসাথে তিনি ছিলেন মুষ্টিযোদ্ধা প্রশিক্ষক) নামের এক পুলিশ অফিসারের কথাতেই আলী মুষ্টিযুদ্ধ শেখায় মনোযোগী হলেন। জন্ম হলো নতুন একজনের। পরবর্তী ২৭ বছর রিং মাতিয়ে রাখলেন তিনি।

১২ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় জিমে মুষ্টিযুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৬০ সালের অলিম্পিক্সের  জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ১০৮টি বাউট জেতেন, ৬ বার কেন্টাকি গোল্ডেন গে¬াভস চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দু’বার জাতীয় ‘এএইউ’ শিরোপাও জয় করেন।

রোম অলিম্পিকে তিনি লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জয় করেন। অ্যামেচার ক্যারিয়ারে এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ সাফল্য। কয়েকদিন পরই তিনি পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মাত্র ৮টি লড়াই এ জেতার পর তিনি ঠিক কত রাউন্ডে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেবেন, এমন ভবিষ্যদ্ববাণী করে রিঙে নামতে শুরু করলেন। ১৯৬০ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম পেশাদার লড়াইয়ে আলী তার প্রতিদ্বন্দ্বি পুলিশ অফিসার টানি হানসাকারকে পরাজিত করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সময়কালে আলী ১৯টি লড়াইয়ে নেমে ১৫টি নকআউটসহ সবগুলোতেই জয়ী হন। এদের মধ্যে আর্চি মুর, ল্যামার ক্লার্কের মতো দুর্ধর্ষ মুষ্টিযোদ্ধাও ছিল। এদের হারিয়েই তিনি হেভিওয়েট শিরোপার দাবিদার হন।

এর মাঝেই দেশে বর্ণবাদের বিষাক্ত বাস্পে তার হৃদয়-মন পুড়ে গেছে। অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী এই মুষ্টিযোদ্ধাকে একটি শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খাবার দিতে অস্বীকার করে । তিনি ওহিয়ো নদীতে তার পদক ছুঁড়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানান (যদিও অনেকে এটাকে সত্য বলে মনে করেন না; তারা মনে করেন পদকটি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন; ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাকে নতুন আরেকটি পদক প্রদান করে)। পরবর্তীকালের অনেক বড় বড় প্রতিবাদের এটিই ছিল প্রথম।

১৯৬৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব এক অবাক করা ঘটনা দেখলো। এদিন দানবীয় শক্তির অধিকারী সনি লিস্টনকে হারিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপা জয় করেন। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল এটি। বলা যায়, জীবনের অন্যতম জুয়া তিনি এখানেই খেলেছেন। পরবর্তীকালে তিনি যে আরো অনেকবার অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়বেন, তার ভবিষদ্বাণী যেন ছিল এতে। অথচ তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২২ বছর ৩৯ দিন। একদিকে তার বয়স কম। সেই সাথে মাত্র কিছুদিন আগে হেনরি কুপারের সাথে লড়তে গিয়ে চোয়াল ভেঙে ফেলেছিলেন। লিস্টনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আলী জিতবেন, এটা খুব কম লোকই ভাবতে পেরেছিল। লড়াইয়ের আগে আলী তাকে ‘কুৎসিত বুড়ো ভাল্লুক’ হিসেবে খ্যাপাতেন। আর বারবার করে বলতে থাকলেন, তাকে ৬ষ্ট রাউন্ডে নক আউট করবেন। এমনকি তিনি তার বাসার সামনে গিয়েও হৈচৈ করেছেন।

আলী তার কথা রেখেছিলেন। ৬ষ্ট রাউন্ডে এমন মার দিলেন, লিস্টন আর এলেন না পরের রাউন্ডে খেলতে। অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেলেন আলী। আলী রিঙে নেচে নেচে ঘোষণা করতে লাগলেন, ‘আমিই বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন।’ তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি, আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি।’ সত্যিই তিনি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কাঁপন এখনো থামেনি।

দুদিন পর বিশ্ব অবাক হয়ে আরেকটি সংবাদ শুনলো। লিস্টনকে হারানোর চেয়েও এটি ছিল চাঞ্চল্যকর। খবরটি হলো তিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছেন এবং নতুন নাম  নিয়েছেন মোহাম্মদ আলী। নতুন এক কিংবদন্তির জন্ম হলো। আলী তার ক্যাসিয়াস ক্লে নামকে অভিহিত করলেন, ‘দাসত্ব নাম’ হিসেবে। বিশ্বক্রীড়াঙ্গনে একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা হলো এভাবেই। প্রথমে তিনি এলিজা মোহাম্মদ ও ম্যালকম এক্সের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশন অব ইসলামের’ সাথে জড়িয়ে ছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি তাদের সংশ্রব ত্যাগ করেন।

যারা মনে করেছিল, আলীর লিস্টনকে হারানো স্রেফ একটি দুর্ঘটনা, তাদের জবাব দিতে বেশি দেরি হলো না। পরের বছরের (২৫ মে, ১৯৬৫) ফিরতি লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ডের প্রথম মিনিটেই আলী তার দানবীয় প্রতিদ্বন্দ্বি লিস্টনকে নকআউট করে দিলেন। তার শ্রেষ্ঠত্বের নিরঙ্কুশ স্বীকৃতি মিললো। আগের ম্যাচটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না বা পাতানো ছিল না, তাও প্রমাণিত হলো।

এরপর আলী তার শিরোপা রক্ষার জন্য আরো ৮টি লড়াই এ অবতীর্ণ হলেন (নভেম্বর, ১৯৬৫ থেকে মার্চ, ১৯৬৭ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত)- ফ্লয়েড প্যাটারসন, জর্জ শুভালো, হেনরি কুপার, ব্রায়ান লন্ডন, কার্ল মিল্ডেনবার্গার, ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস, আরনি টারেল এবং জোরা ফোলের বিরুদ্ধে। এতো অল্প সময়ে অন্য কোন মুষ্টিযোদ্ধাকে এতো বেশি লড়াইতে অবতীর্ণ হতে দেখা যায়নি।

তার থেকে কেউ শিরোপা নিতে পারেনি। বরং রিঙের বাইরেই তার প্রতিদ্বন্দ্বি সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় আলীর শিরোপা কেড়ে নেওয়া হলো। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর তার লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত রাখা হলো। অথচ এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ ফর্মে থাকার সময়। ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সে তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময়টি রিঙে নয়, কারাগারেই কাটিয়েছেন।

বিশ্ব মুষ্টিযোদ্ধা সংস্থা মার্কিন সরকারের ইচ্ছানুযায়ী একটি মিনি টুর্নামেন্টের আয়োজন করলো। আর তার মাধ্যমে জো ফ্রেজিয়ারকে হেভিওয়েট শিরোপা দিয়ে দেওয়া হলো। শিরোপা রক্ষার জন্য আলীকে সুযোগ দেওয়া হলো না। অর্থাৎ আলী তার শিরোপা কোনো রিঙে হারাননি। বরং হারিয়েছেন নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে।

কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৭০ সালে জেরি কোয়ারির বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে আলী তার প্রত্যাবর্তনের কথা জানিয়ে দিলেন। কিন্তু তদান্তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জো ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলায় সুবিধা করতে পারলেন না তিনি। ‘দি ফাইট অব দি সেঞ্চুরি’ নামে খ্যাত মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ১৯৭১ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ১৫ রাউন্ডের সেই লড়াইয়ে অল্প পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে গেলেন। এই লড়াইয়ের আগে পর্যন্ত দুজনই ছিলেন অপরাজিত। তাই এনিয়ে বেশ আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আলী হাল ছাড়ার পাত্র নন। অবশ্য ফিরতি লড়াইয়ে নামার সুযোগ পেলেন না। তত দিনে জর্জ ফোরম্যান হেভিওয়েট শিরোপা জিতে নিয়েছে। তবে পরবর্তীকালে দু’বার ফ্রেজিয়ারকে হারিয়ে সেই পরাজয়ের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। ফ্রেজিয়ারের কাছে পরাজয়ের পর আলী কেন নরটনের কাছেও হেরে গিয়েছিলেন। আলী শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছিলেন জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে।

জায়ারের (পরবর্তী নাম কঙ্গো) কিনসাসায় নক আউট করেন জর্জ ফোরম্যানকে। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। আলী-ফোরম্যান লড়াইটি মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা লড়াইগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এটির নাম দেওয়া হয় ‘রাম্বল ইন দি জাঙ্গল।’ আলীর বয়স তখন ৩২ বছর। বয়সের ভারে তার সেই ফুটওয়ার্ক আর হাতের কৌশল অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ফোরম্যান তার সর্বোচ্চ ফর্মে। মাত্র ২৬ বছরের তাগড়া যুবক ফোরম্যান ৪০টি লড়াইয়ে অপরাজিত। এই লড়াইয়ে ফোরম্যান সহজেই জয়ী হবে বলে মনে করছিল অনেকেই। তাছাড়া এর আগে মাত্র একজন দ্বিতীয়বার হারানো শিরোপা ফিরে পেয়েছিলেন। তাই ফোরম্যানের দিকেই পাল্লা ভারী ছিল। তবে আলীর অতি উৎসাহী মনোবল তার সমর্থকদের উজ্জীবিত করে তুললো। টান টান উত্তেজনার সৃষ্টি হলো।

আলী সেই লড়াইয়ে ‘দি রোপ-এ ডোপ’ কৌশল উদ্ভাবন করেন। আলী বুঝতে পেরেছিলেন আফ্রিকার তাপমাত্রার জন্য তিনি তার সেই নৃত্য অব্যাহত রাখতে পারবেন না। তাই তিনি ফোরম্যানকে ক্লান্ত করতে তাকে ঘুষি মারতে উদ্বুদ্ধ করেন। আলী ফোরম্যানের মারাত্মক ঘুষিগুলো হজম করেন অবলীলায়। ইতিপূর্বে আর কোনো মুষ্টিযোদ্ধাই আলীকে এতো বেশি আঘাত করতে পারেনি। কিন্তু দেখা গেল, আঘাত হজম করে আলী যতটা না কাহিল হয়েছেন, আঘাত করে করে ফোরম্যান তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। ৬ষ্ট রাউন্ডে ফোরম্যানের ঘুষির শক্তি কমে এলো। ৭ম রাউন্ডে আরো কম। ৮ম রাউন্ড শেষ হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে আলী তার চূড়ান্ড আঘাতটি হানেন। নিউট্রাল কর্নারে ফাঁদে ফেলে আলী অরক্ষিত ফোরম্যানকে ডান হাতে ঘুষি দিতে শুরু করেন। সম্ভবত তিনটি লেগেছিল। নিজ কর্নারে ফিরে আসার আগে ফোরম্যানের চোয়ালে ডান হাত সোজা চালিয়ে দেন । প্রতিরোধের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেন ফোরম্যান। রেফারি ১০ গোনার আগে পুরোপুরি উঠতে পারেননি ফোরম্যান। প্রায় এক দশক আগে জয় করা বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপাটি এভাবেই পুনরুদ্ধার করেন আলী। আলী আবার সম্রাট হলেন। এই লড়াইয়ের ধকল কাটাতে অনেক বছর লেগেছিল ফোরম্যানের। এমনকি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে মুষ্টিযুদ্ধ থেকে অবসর নিতে হয়েছিল।

এই লড়ায়ের এক বছর পর আলী ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলা করেন। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। নাম দেওয়া হয় ‘থ্রিলা ইন ম্যানিলা।’ অনেকের মতে, এটা মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লড়াই। আর তার মাধ্যমেই সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবার তাকে ১৪ রাউন্ড লড়তে হয়েছিল। সেই সাথে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় জয়ের পতাকা উড়ালেন। অর্থাৎ পুরো বিশ্ব জয় করলেন তিনি। তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ এমন জয় পাননি।

টানা ১০বার শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার পর ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শিরোপা খোয়ান তার থেকে ১২ বছরের ছোট অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন লিয়ন স্পিনসকের কাছে। এটাও ছিল আকস্মিক একটি ঘটনা। আলী যখন সর্বজয়ী, তখন অখ্যাত এই অখ্যাত যোদ্ধার কাছে হেরে গেলেন। তবে ৮ মাস পর ফিরতি ম্যাচে তিনি স্পিঙ্ককে হারিয়ে তৃতীয় বারের মতো শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন। এই প্রথম কেউ তৃতীয়বার হেভিওয়েট শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো। আলীর সেই লড়াইটি দেখতে সারা বিশ্ব টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। তখন তার বয়স ৩৬ বছর। এই জয়ের পরপরই তিনি অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। তবে দু’বছর পর (লাস ভেগাসে ১৯৮০ সালের ২ অক্টোবর) তিনি আবার ফিরে  আসেন ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপার পুনরুদ্ধারের জন্য। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর আলী পুরোপুরি ফ্যামিলিম্যানে পরিণত হয়েছিলেন। হোমস ছিল তারই ছাত্র। তারুণ্যে আলীকেই আদর্শ মেনে মুষ্টিযুদ্ধে এসেছিলেন হোমস। তিনি চাচ্ছিলেন না আলীর ক্ষয়িঞ্চু শক্তিকে সবার সামনে মেলে ধরতে। তাই তিনি একটু অস্বস্তি নিয়েই গুরুকে মোকাবেলা করতে নামেন। আলী হয়তো ভেবেছিলেন, অলৌকিক কোনো ঘটনায় তিনি হয়তো জিতে যেতেও পারেন। কিন্তু তা হয়নি। আলী হেরে যান করুণভাবে। ১১ রাউন্ডে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন আলী। তিনি সেদিন তার সেই জৌলুষ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে আলী এই বলে তৃপ্তি পেতে পারেন, তিনি নক আউট হননি। রিঙে তার শেষ দৃশ্যপট মঞ্চস্থ হয় আরো ১৪ মাস পর ১৯৮১ সালের ১১ ডিসেম্বর। এবারের প্রতিপক্ষ ছিলেন জ্যামাইকার ট্রেভর বারবিক। বাহামায় অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে এবারো হেরে যান। ৪০ বছর বয়সে শেষবারের মতো রিং থেকে বিদায় নেন। এই দুটি পরাজয় তার বিশালত্বে তেমন প্রভাবই সৃষ্টি করতে পারেনি। হয়তো চাঁদের কলংকের মতো একটু দাগ কেটে গেছে।

বিশ্ব ইতিহাসে সাড়া জাগানো আরো অনেক মুষ্টিযোদ্ধাই আছে। কিন্তু তবুও আলী একটি ব্যতিক্রম নাম। তিনি নিছক পেশিশক্তির জোরেই জয়ী হননি। রিঙে তিনি যে কৌশলের পরিচয় দিতেন, সেখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত। তিনি আগে নিজে আঘাত না হেনে, প্রতিপক্ষকেই উস্কানি দিতেন আঘাত করার। নানা উত্তেজনাকর কথা বলে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতেন। তার পায়ের কারুকাজ আর ঘুরে  ফিরে প্রতিপক্ষকে ঘুষিগুলোকে এড়িয়ে যেতেন। ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য আর মৌমাছির মতো হুল ফুটাতেন’ তারপর। খুব সহজেই লড়াই শেষ করতে দিতেন না। এ কারণেই যারা খেলা দেখতে আসতো, তারা উপভোগ করতে পারতো। মুষ্টিযুদ্ধ যে শুধু দানবীয় একটি খেলা নয়, এটিও একটি শিল্প, তিনিই প্রথম এবং শেষবারের মতো সবাইকে বুঝিয়ে দেন।

আলী মানেই প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে নতুনত্বকে আহবান করার একটি নাম। ইসলাম ধর্মগ্রহণ করাটা তার জন্য খুব একটা সহজ ঘটনা ছিল না। আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্ট ধর্মের জয়জয়কার। বর্ণবাদ সুগভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে তিনি খ্রিস্টধর্মকে ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণকে অভিহিত করলেন, ‘মূলে’ ফিরে যাওয়া হিসেবে। তিনি তার পূর্বের পরিচয়কে দাসত্বের দাসখত হিসেবেও অবহিত করলেন। তার এই ঘোষণায় অনেক দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেল। শুধু শ্বেতাঙ্গরাই তার শত্রু তে পরিণত হয়নি, তার স্বগোত্রের তথা কালো খ্রিস্টানরাও তার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলো। তবে তিনি সাহস হারালেন না। নতুন দুয়ার নিজেই খুললেন।

তার আফ্রিকা সফর ছিল একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা। এই প্রথম আমেরিকার কোনো ক্রীড়াবিদ আফ্রিকা নামে কোনো মহাদেশের কথা সরাসরি স্বীকার করলেন। সারা বিশ্বে যখন আধিপত্যবাদের শিকল ছেঁড়ার আন্দোলন চলছে, তখন তাদের মাঝে তার উপস্থিতি ছিল একটি বিরাট ঘটনা। আমেরিকার মিডিয়া তার এই সফরকে ঢেকে রাখতে চেষ্টার ক্রুটি করেনি। উপনিবেশিক যাঁতাকল থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আফ্রিকান দেশগুলোতে তার আগমন ছিল একটি অভূতপূর্ব বিষয়। তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অথচ তাদের মতো কালো একজনকে নিজেদের মধ্যে পেল। অধিকন্তু তিনি আফ্রিকায় তার পূর্বপুরুষের অস্তিত্বের কথাও জানালেন।  তিনি ঘোষণা করলেন, ‘মুষ্টিযুদ্ধ রক্তপিপাসু কিছু লোকের সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। আমি আর ক্যাসিয়াস ক্লে নই। কেন্টাকির এক নিগ্রো হিসেবে আমি বিশ্বের, কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্বের। পাকিস্তান, আলজেরিয়া, ইথিওপিয়ায় সব সময় আমার বাড়ি আছে। টাকার চেয়ে এটা অনেক বেশি।’ ঘানায় প্রেসিডেন্ট এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা কোয়ামে এনক্রুমা তাকে বরণ করে নেন। এটাই ছিল কোনো রাষ্ট্রনেতার সাথে তার প্রথম কোলাকুলি। মার্কিন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের আলীর সাথে হ্যান্ডশেক করতে আরো এক দশক সময়  লেগেছিল।

আলী আসলে রিঙের বাইরেই সবচেয়ে বড় লড়াইটিতে লড়েছেন। যে দেশে তিনি থাকেন, সে দেশের প্রভুদের বিরুদ্ধেই তিনি আন্দোলন করেছেন।

১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করা সামান্য কোনো ঘটনা ছিল না। ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করার জন্য তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হলো। তিনি ঘোষণা করেন, “তারা কেন আমাকে ইউনিফর্ম পড়ে বাড়ি থেকে এক হাজার মাইল দূরে যেতে বলবে এবং বাদামি লোকদের উপর বোমা ও বুলেট ফেলতে বলবে যখন লুইসভিলে তথাকথিত নিগ্রো মানুষদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করা হচ্ছে? ভিয়েতকঙের সাথে আমার কোনো বিবাদ নেই। কোনো ভিয়েতমানি আমাকে কখনো ‘নিগার’ বলে ডাকেনি।” তিনি অস্বীকার করলেন সরাসরি। এমনকি তিনি যদি সেদিন চুপচাপ থাকতেন, তবুও তার উপর এতো চাপ আসতো না। কিন্তু আলী তা করলেন না। আলীকে প্রথমে নিজ দেশে নিষিদ্ধ করা হলো। তিনি টরন্টো, ফ্রাংকফোর্ট, লন্ডনে (দুবার) শিরোপা রক্ষা করলেন। এতে তার লাভই হলো। তার ফ্যানের সংখ্যা বহির্বিশ্বে বাড়তেই থাকলো। কিন্তু দেশে তিনি এমন সমস্যায় পড়লেন, যা তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ পড়েননি। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র আমেরিকান হিসেবে তার অবস্থান পরাশক্তিটির জন্য ছিল এক মহা অস্বস্তিকর ব্যাপার। এক কৃষ্ণাঙ্গ  আর মুসলমান তরুণ বিশ্বের অন্যতম পরক্রমশালী, শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্টান দেশটির সমালোচনা করবে, আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তা কোনোমতেই সহ্য করা যায় না। তাই সামরিক বাহিনী তাকে যুদ্ধে পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো। আইনজীবীরা তাকে কারারুদ্ধ করার ফন্দি আঁটলো। মিডিয়া তাকে তরুণ আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে কদর্য উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত করলো। তাকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে আনার জন্য অনেক কিছুই করা হলো। অবশ্য ফাঁকে ফাঁকে লোভনীয় নানা প্রস্তাব দিয়ে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টাও কম করা হয়নি। এমনকি সামরিক বাহিনী থেকে এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, আলী যদি শুধু নাম লেখান, তবেই যথেষ্ট। তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন, প্রদর্শনী লড়াইয়ে নামতে পারবেন। এমনকি চাইলে পেশাদার লড়াইয়ে নামতে পারবেন। কিংবা অসুস্থতার ভান করে দুই কূলই রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু আলীর সেই এককথা, ‘যুদ্ধ করা আমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। আমার বিবেক সায় দিলে আমি সহজেই রণাঙ্গনে যেতে পারতাম।’ তিনি বললেন, ‘তারা যখন লুইসভিলের তথাকথিত নিগ্রোদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করছে, তখন কেন তারা আমাকে ভিয়েতনামের বাদামি মানুষের বিরুদ্ধে বোমা আর বুলেট বর্ষণ করতে বলছে? আমি আমার বিশ্বাস আর অবস্থানে অটল থেকে কিছুই হারাবো না। আমি চার শ’ বছরও কারাগারে থাকতে পারি।’

তার এই প্রত্যয়ে তার নিজের ভবিষ্যতই ফ্যাকাসে বলে মনে হলো। তিনি শিরোপা হারালেন, কারারুদ্ধ হলেন, কোটি কোটি ডলার থেকে বঞ্চিত হলেন। মনে হলো, আলী একটি বিস্মৃত নাম। কিন্তু তা তো হবার নয়। পরে আলীর কথাই ঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন যে ভুল ছিল, তা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আর তিনি ফিরেছেন রাজসিকভাবে। এটা যে কতবড় জয়, তা এককথায় কি প্রকাশ করা যায়?

অন্যদিকে ফ্রেজিয়ার ও ফোরম্যানের বিরুদ্ধে তার জয় কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই সীমিত থাকেনি। এসব লড়াইকে স্রেফ মুষ্টিযুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করা হলে ভুল হবে। চামড়ায় কালো হলেও এই দু’জন ছিলেন আসলে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সরকারের, খ্রিস্টান ধর্মের প্রতিনিধি (এখানে তা একটি বিশ্বাসের নাম নয়, এটা আগ্রাসী সংস্কৃতির প্রতিভূ বিবেচনা করেছেন অনেকে। আর আলীর ইসলাম ছিল সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা সংস্কৃতি)। ভিয়েতনামে আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানানোর কারণে আলীর শিরোপা কেড়ে নিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফ্রেজিয়ারকে। তাকে তখন মার্কিন সরকারের অনুকূলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। অধিকন্তু তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে পদকজয়ী দুই অ্যাথলেটিক-টমি স্মিথ ও জন কার্লোস কালো দাস্তানা পরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তখন মুষ্টিযুদ্ধে স্বর্ণজয়ী ফোরম্যান এফবিআইয়ের পরামর্শক্রমে মার্কিন পতাকা দুলিয়েছেন। তাই এ দুজনের বিরুদ্ধে তার জয় ছিল প্রচলিত ও পরাক্রমশালী শক্তি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই বিজয়। কিনসাসায় ফোরম্যানের বিরুদ্ধে লড়ার আগে মোহাম্মদ আলী টিভি ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘আমি আল্লাহর জন্য এবং আমার জনগণের জন্য লড়ছি। আমি টাকার জন্য বা খ্যাতির জন্য লড়ছি না। আমি আমার জন্য লড়াই করছি না। আমি কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উন্নতির জন্য, যেসব কৃষ্ণাঙ্গের ভবিষ্যত নেই, যেসব কৃষ্ণাঙ্গ মদ আর মাদকাসক্তিতে ডুবে রয়েছে, তাদের জন্য লড়ছি। আমি আল্লাহর হয়ে কাজ করছি।’

এটিও সহজ কোনো ঘোষণা ছিল না। তিন আরো বলেন, ‘এই ফোরম্যান খ্রিস্টানত্ব, আমেরিকা এবং সেই পতাকার প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি তাকে ছেড়ে দেব না। সে কুকুরের মাংসের প্রতিনিধিত্ব করছে।’

তিনি তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই তাকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে সবাই। যে আলীকে একদিন যে শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খেতে দেওয়া হয়নি, সেখানে তিনি হয়েছিলেন পরম আকাংখিত ব্যক্তি। যে দেশ তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, সেই আমেরিকাতেই আলী সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছেন। যে পদকটি তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন একদিন, সেটি আবার নতুন করে তাকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাদা কালো, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নাম হলো আলী। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিক গেমসের মশাল প্রজ্জ্বলনের সম্মানটি তাকেই দেওয়া হয়। আলী যখন মশালটি প্রজ্জ্বলন করেন, তখন অনেককেই আবেগে কেঁদে ফেলেন। তবে অনেকেই বলে থাকে, পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার পর আলী যখন করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন, তখনই সাদা আমেরিকা তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে।

চলৎশক্তি হারিয়ে ফেললেও সবাই তাকে কাছে পেতে চায়। আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, পোপ, দালাইলামা সবাই তাকে আগ্রহভরে গ্রহণ করে। তৃতীয় বিশ্বে তিনি ক্রমাগত ছুটে চলেছেন নানা মিশনে। এমনকি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকজন মার্কিন পণবন্দিকে মুক্তির জন্য তিনি আলোচনা জন্য সাদ্দাম হোসেনের কাছে যান।

আলীর মুষ্টিযুদ্ধ জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটিকে ধরা যেতে পারে, মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অলিম্পিক স্বর্ণলাভ এবং হেভিওয়েট শিরোপা বিজয়। তারপরের ধাপটি হলো এক মানবতাবাদী নেতার আত্মপ্রকাশ। এই পর্যায়ে তিনি আফ্রিকা জয় করেছেন, মূলে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন তথা সর্বগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন। তারপর তৃতীয় পর্যায়ে তিনি হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করেছেন, এক নতুন যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আর সব শেষে তিনি বিশ্ব নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া শান্তি, সামাজিক দায়িত্ব, সম্মান এবং ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য তিনি কেন্টাকির লুইসভিলে নির্মাণ করেছেন মোহাম্মদ আলী সেন্টার। প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই কেন্দ্রটি ২০০৫ সালে উদ্বোধন করা হয়।

আলী শেষ জীবনে বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেখানেই যান, বাঁধভাঙা সংবর্ধনা পেয়েছেন। এতোকিছুর পরও তীক্ষ্ন রসবোধ হারিয়ে ফেলেননি। মুষ্টিযুদ্ধে তার গড়া রেকর্ড অক্ষুন্ন থাকেনি। কিন্তু মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, উজ্জ্বল তারকা হিসেবে তিনি বিশ্বের যে উচ্চতায় উঠতে পেরেছেন, তা তার আগে  কেউ পারেনি, হয়তো পরেও কেউ পারবে না।  তিনি যে প্রত্যয় নিয়ে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছিলেন, তাতে এই সম্মান কেবল তারই প্রাপ্য।

মোহাম্মদ আলীর ফ্যাক্টফাইল :

পুরো নাম : মোহাম্মদ আলী

জন্ম নাম : কেসিয়াস মার্সেলাস ক্লে, জুনিয়র

ডাক নাম: দি গ্রেটেস্ট, লুইসভিল লিপ।

জন্ম : ১৭ জানুয়ারি, ১৯৪২; লুইসভিল, কেন্টাকি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মৃত্যু : ৩ জুন, ২০১৬; ফিনিক্স এরিয়া হাসপাতাল, অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র।

শিরোপার বিভাগ : হেভিওয়েট।

অলিম্পিক গেমস স্বর্ণপদক লাভ : লাইট হেভিওয়েট, ১৯৬০, রোম।

মোট লড়াই : ৬১টি; জয় ৫৬, নক-আউটে জয় ৩৭, পরাজয় ৫, ড্র ০।

বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপার লড়াই : ২৫টি (সবগুলোই হেভিওয়েট) জয় ২২, পরাজয় ৩।

মোহাম্মদ আলীর হেভিওয়েট শিরোপার লড়াইগুলো

২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৪ : সনি লিস্টন; মিয়ামি, জয় (প্রতিপক্ষের পরাজয় স্বীকার, ৬ষ্ট রাউন্ড)।

২৫ মে, ১৯৬৫ : সনি লিস্টন, লুইস্টন; মেইন, জয় (প্রতিপক্ষ নক আউট, ১ম রাউন্ড)।

২২ নভেম্বর, ১৯৬৫ : ফ্লয়েড পিটারসন; লাস ভেগাস, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১২তম রাউন্ড)।

২৯ মার্চ, ১৯৬৬ : জর্জ চুভালো; টরেন্টো, জয় (পয়েন্টে)।

২১ মে, ১৯৬৬ : হেনরি কুপার; লন্ডন, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ৬ষ্ট রাউন্ড)।

৬ আগস্ট, ১৯৬৬ : ব্রায়ান লন্ডন; লন্ডন, জয় (নক আউট, ৩য় রাউন্ড)।

১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৬ : কার্ল মিল্ডেনবারজার; ফ্রাংকফুর্ট, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১২তম রাউন্ড)।

১৪ নভেম্বর, ১৯৬৬ : ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস; হিউস্টন, জয় (পয়েন্টে)।

৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৭ : আরনি টেরেল; হিউস্টন, জয় (পয়েন্টে)।

২২ মার্চ, ১৯৬৭ : জোরা ফলি; নিউ ইয়র্ক, জয় (নক আউট, ৭ম রাউন্ড)।

৮ মার্চ, ১৯৭১: জো ফ্রেজিয়ার; নিউ ইয়র্ক, পরাজয় (পয়েন্টে)।

৩০ অক্টোবর, ১৯৭৪: জর্জ ফোরম্যান; কিনসাসা, জায়ার, জয় (নক আউট, ৮ম রাউন্ড)।

২৪ মার্চ, ১৯৭৫ : চুক ওয়েপনার; ক্লিভল্যান্ড, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১৫তম রাউন্ড)।

১৬ মে, ১৯৭৫ : রন লাইলি; লাস ভেগাস, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১১শ রাউন্ড)।

১ জুলাই, ১৯৭৫ : জো বাগনার; কুয়ালালামপুর, জয় (পয়েন্টে)।

১ অক্টোবর, ১৯৭৫ : জো ফ্রেজিয়ার; ম্যানিলা, জয় (প্রতিপক্ষের পরাজয় স্বীকার, ১৪তম রাউন্ড)।

২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ : জিন পিয়েরি কুপম্যান; স্যান জুয়ান, জয় (নক আউট, ৫ম রাউন্ড)।

৩০ এপ্রিল, ১৯৭৬ : জিমি ইয়ং; ল্যান্ডওভার, ম্যারিল্যান্ড, জয় (পয়েন্টে)।

২৪ মে ১৯৭৬ : রিচার্ড ডান; মিউনিখ, জয় (নক আউট, ৫ম রাউন্ড)।

২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬ : কেন নরটন; নিউ ইয়র্ক, জয় (পয়েন্টে)।

১৬ মে, ১৯৭৭ : আলফ্রেডো ইভানজেলিস্টা; ল্যান্ডওভার, জয়, (পয়েন্টে)।

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ : আরনি শ্যাভার্স; নিউ ইয়র্ক, জয় (পয়েন্টে)।

১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮ : লিওন স্পিনসক; লাস ভেগাস, পরাজয় (পয়েন্টে)।

১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ : লিওন স্পিনসক; নিউ অরলিন্স, জয় (পয়েন্টে)।

২ অক্টোবর, ১৯৮০ : ল্যারি হোমস; লাস ভেগাস, পরাজয় (লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানো, ১০ম রাউন্ড)।

 

 

সিদ্দিকুরের চোখ, ইউএনও’র হাতকড়া, অতি-উৎসাহী প্রশাসন আর ওবায়দুল্লাহরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সিদ্দিকুর এখন জেনে গেছেন, তার চোখে হয়তো আর আলো নাও ফিরতে পারে। তাকে সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত: এইটুকু করুণা করা হয়েছে যে, তার চোখের চিকিৎসায় ভারতের চেন্নাই পাঠানো হবে। পুলিশ কমিশনার তার চোখে টিয়ার সেল লাগার ঘটনায় ইতিমধ্যেই ‘রহস্যময়তা’ খুঁজে পেয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত করে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ঐ তদন্ত রিপোর্টে সন্তুষ্ট না হলে তিনি আবার তদন্ত করাবেন।

পুলিশি নির্মমতা বা রহস্যময়তার শিকার হয়ে এই ছাত্রটি যখন চোখের আলো হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় রয়েছেন, ঠিক সে সময়ে খুলনায় ‘ছিনতাইকারী’ অভিযোগে এক যুবকের চোখ তুলে নিয়েছে পুলিশ। এইসব ভয়াবহ ঘটনা স্বাভাবিকভাবে যেমনটা হয়ঠিক তেমনি চাপা পড়তে যাবার সময় একজন ‘‘ভাগ্যবান’’ ইউএনও’র প্রতি অন্যায় আচরনের প্রতিবাদে সকল মহলের তৎপরতা সত্যিই চেখে পড়ার মতো। তাকে নিয়ে এখন সকল মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। সে তোলপাড় পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও, অবশ্য প্রশাসনের কর্মকর্তা হবার সুবাদে সংগত কারনও যে নেই তা নয়।

সদ্য কৈশোর পেরোনো এজন তরুণ সিদ্দিকুর কী জানেন, আমাদের এই রাষ্ট্র-সরকার-সমাজ সাড়ে চার দশক ধরে কিছু খুবই সামান্য ব্যত্যয় ছাড়া এক অস্বাভাবিক পথে হাঁটছে? অর্ধসত্য- সত্য-মিথ্যের মিশেল দিয়ে যে কোন বিষয়কে ধামাচাপা দেয়ার ক্ষেত্রে এখন কোন দ্বিধা নেই, রাখ-ঢাক নেই। ধারাবাহিক পলিসি অব ডিনায়েল (প্রত্যাখান বা না বলার নীতি) ও অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং জনমানুষের মনোজমিনে জায়গা করে নিচ্ছে। এই রোগ একদিকে গণতন্ত্রের (?) প্রাতিষ্ঠানিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে, তেমনি শাসকশ্রেনীর বিভিন্ন অঙ্গকে লাগামহীন ও বেপরোয়া করে তুলছে।

দুই. ১৯৯৫ সালে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছিল। অমন বদলি আকছার হয়েই থাকে। কিন্তু ঐ বদলিটিকে কেন্ত্র করে পরবর্তীকালে অনেক ঘটন-অঘটন সৃষ্টি হয়েছিল। এটি ছিল প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র অফিশিয়ালদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের- ফলশ্রুতি। ড. কামাল সিদ্দিকী সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্যসচিব। আরেক সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ‘জেলা গেজেটিয়ার’ পদে বদলি আদেশের ফাইলটি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাক্ষরের জন্য তিনি উপস্থাপন করেন।

খানিকটা গুরুত্বহীন জেলা গেজেটিয়ার পদে সাধারনত অতিরিক্ত সচিবদের দেয়া হয়। স্বাক্ষরের আগে প্রধানমন্ত্রী তার মুখ্যসচিবের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সব ঠিক আছে কিনা এবং কোন সমস্যা হবে কিনা? মুখ্যসচিব তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, না, কোন সমস্যা নেই। এভাবে, সে সময়ের ‘‘জাদরেল’’ সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীর অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার হয়েছিলেন এবং তাকে কেন্দ্র করে যা যা ঘটেছিল, তা ইতিহাস। ঘটনার অভিন্ন বর্ণনা শুনেছিলাম সে সময়ের দু’জন কর্মকর্তার কাছে, যাদের একজন এখন প্রয়াত।

পরবর্তী ঘটনা অনেকের জানা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কিভাবে সরকারের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে পরবর্তীতে ‘জনতার মঞ্চ’গঠন করেছিলেন, সচিবালয়ে বিদ্রোহ ঘটেছিল এবং এসব ঘটনা সরকার পতনে কি ভূমিকা রেখেছিল- সেগুলি পরের সরকারগুলোর কাছে উদাহরন হয়ে আছে। নির্মোহভাবে বলা যায়, এর মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনের বারোটা বেজেছিল, রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে আমলাতন্ত্র  একেবারেই ‘পার্টিজান’ হয়ে যায়; যার মন্দ-ভাল ফল গত দেড়যুগ ধরে দেশের মানুষ ভোগ করছে।

ম.খা. আলমগীর জাদরেল সিএসপি, একাত্তরের ময়মনসিংহের এডিসি, লাইমলাইটে আসেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ এর একজন বাস্তবায়নকারী, খাল-কাটাখ্যাত এবং সিভিল-মিলিটারী সরকারের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে। প্রয়াত: জিয়ার প্রতি অনুরক্ত এই আমলা মূলত: ১৯৯৫ সালের ওই ঘটনার পর বিসিএস প্রশাসন সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগের গুডবুকে চলে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তার প্রাপ্তিযোগ এবং পুন:পুন নির্যাতনের শিকার হওয়া, সকলেরই জানা আছে।

তিন. তারিক সালমান সিভিল ব্যুরোক্রেসির জুনিয়র সদস্য। সৎ, নিষ্ঠাবান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে ধারনা পাওয়া যাচ্ছে। আগৈলঝড়া ও বরগুনা সদরে ইউএনও হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তার কৃত অনেক বিষয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে। তিনি বরিশালের সেরনিয়াবাত পরিবারের আর্শীবাদপুষ্ট ক্ষমতাসীন দলের কথিত হাইব্রিড ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি শক্ত অবস্থান বজায় রেখে চলেছিলেন। যেটি পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের, গ্রেফতার ও হাজতবাসকে ত্বরান্বিত করে।

কর্মকালে তিনি তার জেলা প্রশাসকদ্বয়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, এমনকি বিভাগীয় কমিশনারেরও। একথা সকলেই জানেন, ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে এসময়কালের প্রায় সব জেলার জেলা প্রশাসকগন, বিভাগীয় কমিশনারবৃন্দ ও উপজেলা নির্বাহী আফিসারগন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের প্রতি কতটা অনুগত এবং ‘পার্টিজান’। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা রয়েছে । তারিক সালমান এর বাইরে ছিলেন বলে ধারনা তৈরী হয়েছে।

তার বিষয়ে ঘটনাক্রম এরকম; আগৈলঝড়ার ইউএনও থাকাকালীন একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারী শিশুর আঁকা শেখ মুজিবের ছবি তিনি স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রনপত্রে ‘লোগো’ হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি ‘বিকৃত’ ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে- এমত অভিযোগে জেলা প্রশাসক তাকে শোকজ করেন। ইউএনও উত্তর দেন, যা জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অত:পর দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বা আনা হয় একজন সাবেক বিএনপি নেতা, বর্তমান বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজুকে।

তিনি ইউনিও’র বিরুদ্ধে সিএমএম আদালতে মামলা ঠুকে দেন। বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে ‘হৃৎকম্পন’ হচ্ছিলো এবং যারপরনাই ব্যথিত হয়েছেন-অভিযোগে ওবায়দুল্লাহ আদালতকে জানান। সমন পেয়ে ইউএনও আদালতে হাজির হলে জামিনযোগ্য মামলায় তিনি জামিন পান নাই, সংক্ষিপ্ত হাজতবাসের দুই ঘন্টা পরে নাটকীয়ভাবে জামিন পান। শুরু হয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দল ও বিচার প্রশাসনের অনেক কুৎসিত তথ্য প্রকাশিত হতে থাকে।

পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সিভিল প্রশাসন ইউএনও’র ঘটনায় বিষ্ময় ও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ত্বরিৎ হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী ইউএনও’র প্রতি এই আচরনে যুগপৎ  বিষ্মিত ক্ষুব্দতা প্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীন দলও সচকিত হয়ে ওঠে। ‘এস্কেপ গোট’ হিসেবে ওবায়দুল্লাহ দল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত হন। বরিশাল ও বরগুনার জেলা প্রশাসকদ্বয়কে প্রত্যাহার করা হয় এবং সিএমএম আলী হোসেনের বদলির সুপারিশ সুর্প্রীম কোর্টে পাঠানো হয়।

বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে যে হৃৎকম্পন হচ্ছিলো তা কতটা বন্ধ হয়েছে জানা না গেলেও সাময়িক বহিষ্কৃত ওবায়দুল্লাহ ইউএনও’র বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিয়েছে। বরিশাল আওয়ামী লীগ ওবায়দুল্লাহ’র বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছে, যদিও এর কোন মূল্য নেই। উল্টোটা হলেও তারা স্বাগত জানাতো। কারণ, বিশেষ একটি পরিবারের ‘ফ্রাঙ্কেনষ্টাইল’ ওবায়দুল্লাহ ও বরিশাল আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত হয় কাদের মাধ্যমে-ক্ষমতাসীনদের কেন্দ্রের তা অজানা নেই।

চার. ক্রমশ: অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র-সমাজে ইউএনও তারিক সালমানের ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্বরিৎ প্রতিক্রিয়া সিভিল প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু অন্যান্য বিভাগ ও জনগনকে কতটা আশ্বস্ত করলো, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে? কারণ, একজন ইউএনও যখন ব্যাংক ম্যানেজারকে প্রকাশ্যে চড়-থাপ্পড় মারছেন, সংসদ সদস্য শিক্ষককে কান-ধরে ওঠবস করাচ্ছে; একজন কলেজ শিক্ষক ফরিদউদ্দিনকে দিগম্বর করে রাজপথে ঘোরানো হচ্ছে এবং সহকারী কমিশনার শিক্ষককে লাঞ্চিত করছে কিংবা পুলিশ শিক্ষকদেরকে পেটাচ্ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাবীতে মিছিলে নির্বিচারে ‘‘ব্যবস্থা’’ নেয়া হচ্ছে -এরকম ছবি বা খবর মিডিয়ায় অসংখ্যবার প্রকাশিত হলেও সকলে বেশ নির্লিপ্ত থাকছেন। পাঠক, এগুলো সামান্য কয়েকটি ঘটনা মাত্র, অনেকেই এর চেয়েও ঢেড় বেশী ঘটনার খবর রাখেন, তা সত্য বলে মানি।

অসহিষ্ণু সরকার, সংসদ সদস্যবৃন্দ, প্রশাসনযন্ত্র তথ্য প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারাকে ভালভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন। অতি বিতর্কিত এই আইনটি সরিয়ে দেয়ার কথা উঠছে, তবে দ্বিমতও আছে কর্তাদের। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯ ধারা মূলত: ৫৭ ধারার প্রায় অবিকৃত প্রতিস্থাপন। এসব আইনের চর্চায় সরকার হয়তো সুখ-স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে, কিন্তু জনগনের সুখ-স্বস্তি কেড়ে নিয়ে ক্রমশ: নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।

অতি সম্প্রতি শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে প্রশাসনের বিরোধ বা সখ্যতার প্রেক্ষাপটে প্রাক-নির্বাচনী বছরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম এবং নিকট ভবিষ্যতে এর প্রভাব তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য।

নির্বাচন-পূর্ব অর্থ পাচার : সহজেই ৩টি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) গত মে মাসে ‘ইল্লিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৫-১৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থ পাচারের  যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে। এবারের প্রতিবেদনে রয়েছে ২০০৫-২০১৪ সাল সময় পর্যন্ত তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থ পাচারে ভারতের পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার (প্রায় ৭২,৮৭২ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে ২০১৪ সালে- যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও পানিসম্পদ খাতের মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান। এছাড়া, ২০০৫-২০১৪ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৭৫৮৫ কোটি ডলার বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে (৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার)- যা ছিল সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের বছর পর্যন্ত। অর্থ পাচারে দেশগুলোর তালিকায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯টি দেশের মধ্যে ছিল ২৬তম। আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপনসহ নানা পদ্ধতির মাধ্যমেই এই অর্থের বড় অংশ পাচার করা হয়েছে। অথচ কেবল অর্থ পাচার ঠেকাতে পারলেই মূসক খাতের আয় নিয়ে আদৌ কোনো দুশ্চিন্তা করতে হতো না এনবিআরকে। পাচার হওয়া এ অর্থ দিয়েই বাংলাদেশে ৩টি পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব হতো। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬-তে দেখা যায়; ২০১৫ সালে সেদেশে বাংলাদেশীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা বেড়েছে ১৯ শতাংশ। বর্তমানে যেখানে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর আগেই বলা হয়েছে যে, মে মাসের শুরুতে ওয়াশিংটন ভিত্তিক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয় ১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

আমাদের দেশটি বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে;নানা স্বপ্নও দেখানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মতে, অচিরেই দেশটি মধ্যম আয়ের দেশের বলয়ে ঢুকে যাবে। ফলে অর্থপাচারের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের আমলে না নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এর আগেও অনেকবার বিষয়টি সামনে এসেছে, কিন্তু সরকার তথা সংশ্লিষ্টরা অর্থপাচার রোধে খুব যে একটা তৎপরতা দেখিয়েছে, তেমনটি মনে করা যায় না। এর প্রমাণ তো প্রতিবেদনের বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্য অর্থপাচারের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও, সংশ্লিষ্টদের রয়েছে অনিবার্য নির্লিপ্ততা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠা অমূলক নয় যে, দেশ থেকে অর্থপাচারের মতো ভয়াবহ ঘটনা আদৌ রোধ করা যাবে কি না?

প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে এবং রফতানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে আমদানি রফতানি করছেন। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিষয়টি যেহেতু বারবার আলোচনায় উঠে আসছে, তাহলে তা প্রতিরোধে কেন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। পণ্যের আমদানি-রফতানির জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলই ব্যবহার করতে হয়। অর্থপাচারের এই দায় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করতে পারে না।

অন্যদিকে, ‘সেকেন্ড হোম’ এর কথাটিও বহুল আলোচিত। এমনও দৃষ্টান্ত রয়েছে, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী মোটা অংকের বিনিয়োগ করে শিল্পপতিরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে নিচ্ছেন। বাংলাদেশীদের মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের সুবিধা নেওয়া, কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি, বেশকিছু ব্যবসায়ীর সিঙ্গাপুর, হংকং-এ অফিস বানানোর তথ্য সত্য বলেই এখন ধরে নেয়া যায়।

২০১৫ সালে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশিদের জন্য সরকারের ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পে বাংলাদেশ ৩য় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ; যেখানে ৩ সহস্রাধিক বাংলাদেশি প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নগদ ৫ লাখ রিঙ্গিত (১ কোটি ২৫ লাখ টাকা) দেশটিতে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত যে কোন দেশে নাগরিকদের বিদেশে টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে, যেখানে গত ১০ বছরে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে কোনো অনুমোদন দেয়নি। এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মালয়েশিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করা হয়েছে।  এছাড়াও যেসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত রয়েছে, সেই সব দেশের আবাসিক ভবন, জমি ক্রয়, হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। এদের মধ্যে অনেকে অফশোর ব্যাংকিং, বিদেশী কনসালটেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন।

বিশ্বজুড়ে আলোড়নকারী টাকা পাচারের কেলেঙ্কারি ফাঁস করা ‘পানামা পেপার্স’ এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২৭টি ব্যাংক হিসাবের কথা প্রকাশিত হয়েছে।

গত ১০ বছরের অর্থপাচারের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব বছর দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেশি ছিল, সেসব বছরে অর্থপাচার বেড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তার সময় ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আগের ৯ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে। ওই বছরটিতে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর আগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অনেক বেড়ে যায়। বছরটিতে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর আগের অন্যান্য বছরের মধ্যে ২০০৪ সালে ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪১০ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ থেকে দিন দিন অর্থপাচারের পরিমাণ বেড়ে চলেছে।

এটাও জানা যায়, দেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হলেও এর বিপরীতে মামলা হচ্ছে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকার, যা মোট পাচারকৃত অর্থের ৩ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৭ শতাংশ বা ৪৩ হাজার কোটি টাকার কোনো রেকর্ড থাকছে না। এ অর্থ হিসাবের মধ্যে আসছে না। পাচার হওয়া অর্থের একটা বড় অংশ জমা আছে সুইস ব্যাংকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে যখন বাংলাদেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ ঘটছে না, তখনো পাচার হচ্ছে অর্থ। অথচ এই অর্থ যদি পাচার না হয়ে বিনিয়োগে আসত তাহলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতো, উৎপাদন ও রফতানি বাড়তো, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। সব মিলে অর্থনীতি ও উন্নয়নে বড় রকমের অগ্রগতি হতো।

সাধারণত দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত অর্থসহ অবৈধভাবে প্রাপ্ত অর্থ পাচার হয়ে যায়। এটা ঠিক, দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের নিরাপত্তার অভাব আছে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশেরও অভাব আছে। অর্থপাচার হওয়ার এ দু’টিই বড় কারণ। এর আগে অপ্রদর্শিত অর্থ বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও খুব বেশি সাড়া পাওয়া যায়নি। দুদক ও বিভিন্ন সংস্থার ভয়ে অনেকেই অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহ ও উৎসাহ দেখাননি। দুর্নীতি বা অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন কোনো দেশেই সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও দেখা গেছে অনেক দেশ এ অর্থ অবাধে ও বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে এবং তাতে ওইসব দেশ লাভবান হয়েছে।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) পরিচালিত ২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যিক লেনদেনের গড়ে ১০ শতাংশের বেশি অর্থ পাচার হয়। ২০১৪ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ৪০-৮০ শতাংশ কালোটাকা। জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) এর তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। পাচারকৃত এ অর্থ দেশের মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এর দুই-তৃতীয়াংশ।

বিলাত ফেরত সহায়ক সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রায় দশককাল পরে বিএনপি ‘নির্বাচন যাত্রা’ শুরু হয়েছে। নির্বাচনমুখী একটি দল যদি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায় না করতে পারে, তাহলে তার অবস্থান হয়ে দাঁড়ায় ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’- বিএনপি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরন। নানা পন্থায় সরকারের অদম্য ও সীমাহীন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের সৌভাগ্য যে, ভাঙনের মুখোমুখি হয়নি দলটি অথবা উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মীরা দলছুট হয়নি। মামলা-হামলা-নির্যাতন সয়েও নিষ্ক্রিয় হয়েছেন; কিন্তু দল ছাড়েননি, আনুগত্যও পরিবর্তণ করেননি।

তবে এ বিষয়টি কখনই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হিসেবের মধ্যে ছিল না যে, ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনে এরশাদের অধীনে ঘোষিত নির্বাচন বয়কট এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এক নয়; সময়-কাল- পাত্র ভিন্ন। ২০১৪ সালে বিএনপি আন্দোলনমুখী ছিল না; নেতৃত্বও মাঠে ছিল না; জামায়াত-শিবির নির্ভর আন্দোলন নাশকতার চোরাগলিতে হারিয়ে গেছে। যদিও আতঙ্কিত সরকার বলেছিল, ‘সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার এই নির্বাচন, আলোচনার ভিত্তিতে সহসাই একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে’।

ঐ নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতৃত্ব আন্দোলনে ইতি-টেনে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে জনগনকে সংগঠিত করে কোন আন্দোলন তারা আর করতে সক্ষম ছিলেন না- যাতে সরকারকে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করা যায়। ফলে ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেয়ে যায় পুরোপুরিভাবে। নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার হয়ে অনিবার্যভাবে হয়ে ওঠে হিংস্র, ক্ষিপ্র ও কর্তৃত্ববাদী। এই আশঙ্কাটি নিয়েই ২০১৪ সালের গোড়াতেই ‘‘আমাদের বুধবার’’-এ বলা হয়েছিল যে, এই সরকার কোন বিরুদ্ধ মত-পথ সহ্য করবে না।

ধারনা করা হয়, ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনের অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলেই দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারতো। নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতাসীনরা বিএনপির অংশগ্রহনে নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তাদের বার্তা দিয়েই দিয়েছিল। ফলে একটি যেন-তেন প্রকারের নির্বাচনেও ভোট দেয়ার সুযোগ দিলে কি ঘটবে- এটি তাদের জানাই ছিল। সেজন্য বিএনপিকে বাইরে রেখে একক নির্বাচনের পথ-নকশা হয়েছিল- আর বিএনপি সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিল, লন্ডন থেকে উসকানী পাঠিয়ে দেয়া হলো।

অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু আলাপচারিতায় দেশের একজন খ্যাতনামা গবেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। তার মতে, ঐ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিএনপি অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলে গোটা ছকই পাল্টে যেত এবং ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারতো। তিনি আরো মনে করেন, মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বিএনপির অপরিনামদর্শী নেতৃত্ব সে বিষয়টি অনুধাবনে সক্ষম ছিল না। যার ফলে নির্বাচনী রাজনীতির মূল¯্রােত থেকে তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুরে সরে যেতে হয়েছে।

দুই. নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ বা ‘পথ-নকশা’ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলটি সন্তোষ ব্যক্ত করে রোডম্যাপ অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তবে বিএনপির মহাসচিবের মতে, “যার কোন রোডই নাই, তার ম্যাপ আসবে কোত্থেকে”। তিনি অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, সিনিয়র নেতাদের সাথে আলোচনা করে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাবেন। তার মতে, বিএনপি এখন সহায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহনের কথা ভাবছে না।

কিন্তু এবিষয়টি নিশ্চিত যে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনীমুখী এই দলটির সামনে কি অন্য কোন বিকল্প আছে? ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে অনেক ধরনের মেরুকরণ ঘটে গেছে, বহু কিছুণেযা হয়েছে দখলে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধ্বজাধারী আওয়ামী লীগ ধর্মকে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিএনপির চেয়েও পারঙ্গমতা অর্জন করেছে, সেটিও দৃশ্যমান। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের এই তৎপরতা কতটা সুফল এনে দেবে  খোদ ক্ষমতাসীন দলই সে ব্যাপারে ভালো বলতে পারবে। তবে তারা ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন পাবার আশা ছাড়েনি।

বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের আওয়াজ তুলেছে মাত্র। দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে লন্ডনে রওয়ানা হয়ে গেছেন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। সেখানে তার পুত্র ও দলের দ্বিতীয় প্রধান তারেক জিয়ার সাথে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই হবে বিএনপির আগামী কর্মসূচি। লন্ডন থেকে ফিরে এসে খালেদা জিয়া সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করবেন। এর আগে নির্বাচনকে মাথায় রেখে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করা হয়েছে অনেকটাই ‘মিশন’বিহীন পরিস্থতিতে।

তবে গুরুত্বপূর্ন একটি ম্যাসেজ নির্বচন কমিশনের পক্ষ তেকে দেয়া হয়েছে; আর তা হলো-নির্বাচনকালীন সময়ের বিষয়গুলো তাদের এখতিয়ার; এর আগের লেভেল-প্লেইং ফিল্ড গঠন তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এটিও মনে রাখতে হবে যে, বিএনপিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে হবে  নির্বাচনকালে। এটি যে সহজ নয় তা দলটির জানা আছে। এই দেশে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য তিন ধরনের শক্তির দরকার হয়। ক) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা; খ) জনগনের শক্তি; গ) আন্তর্জাতিক সমর্থন- বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের। দশককাল ধরে বিএনপির ক্ষেত্রে এই শক্তিগুলোর সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্ষমতাও নেই। বিএনপির ভোট আছে বটে কিন্তু জনগনের শক্তিকে সংগঠিত করার সক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে তারেক জিয়া এখনও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অতিবড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন’।

দলের ভঙ্গুর দশা, দলের মধ্যে দল ও অনৈক্য এবং সুবিধাবাদীদের চক্রান্ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে বিএনপির। এ সকল বিপত্তিও যে  কোন সময় বিপদের কারণ হতে পারে। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার মামলাগুলি আদালতে সহসাই নিস্পন্ন হবে যাচ্ছে-এমন আলামত সুস্পষ্ট। মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হলে আইনী মোকাবেলাসহ আগামী নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বিএনপিকে। আর এর সাফল্যেই নির্ভর করবে কি ধরনের লক্ষ্যভেদী কৌশল তারা নির্ধারন করতে সক্ষম!

বিএনপির কিছু শুভাকাংখী অবশ্য অবগতিতে রয়েছেন যে, খুব সহজেই ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনের পরিনতির শিক্ষণ মাথায় রেখেই এগোচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেককেই এই নির্বাচনের বাইরে রাখার তৎপরতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যত দিন যাবে, এই তৎপরতা বহুমাত্রিকতা পাবে। এসব কিছুকে বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনমুখী বিএনপির স্মৃতিতে রয়েছে ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা,পরিস্থিতি আর হাঁ-হুতাশ আছে, তবে দুঃখজনকভাবে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নেই।

ষোড়শ সংশোধনী রায় : কেন ক্ষমতাসীনদের এতো ক্ষোভ ?

সি আর আবরার ::

গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদের সদস্যরা সর্বোচ্চ আদালতের ওপর তুমুল আক্রমণ চালিয়েছেন। ষোড়শ সংশোধনী খারিজ করে দেওয়া ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে তারা তিক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ওই সংশোধনীতে অসদাচরণ এবং অক্ষমতাজনিত কারণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরকে অপসারণে পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে ক্ষমতাসীন দলের রথী-মহারথীরা ওই বিষয়ে তৈরি হয়ে আসার জন্য সিনিয়র এমপিদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। মিত্র দলের নেতাদেরও এ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিল। তারা দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের মনের ‘ঝাল’ ঝেড়েছেন। তারা রায়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে নিন্দা করতে তাদের ‘ক্ষোভ’ উগরে দিয়েছেন। তাদের বিষোদগারে, এটা কারো কারো মনে হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়টি ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।’ জনৈক প্রভাবশালী এমপি তার সহকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘শত্রুদের সাথে শত্রু র মতোই আচরণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে তাদেরকে ঠান্ডা করে দিতে হবে।’ বিচারকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘রায়ের মাধ্যমে তাদের অভিশংসন থামানো যাবে না।’ তিনি ‘নিজেদের ভুল সংশোধনের জন্য’ বিচারকদের পরামর্শও দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের এক মিত্র দলের নেতা ‘বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পেয়ে একে ‘সংসদের সার্বভৌমত্বে’ হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমপিরা তাদের অবস্থানে ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। তারা জোর গলায় বলেন, খারিজ করা সংশোধনীটি ছিল ‘১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ ধারা পুনঃবহালের’ লক্ষ্যে একটি অপরিহার্য প্রয়াস, তারা ‘সংবিধানের মৌলিক চরিত্র লঙ্ঘন করতে পারেন না।’ ক্ষমতাসীন জোটের আরেক নেতা বিচারপতিদের স্মরণ করিয়ে দেন, এই পার্লামেন্টেই তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে, ‘মাত্র কয়েক দিন আগে’ তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, এমপি মহোদয়েরা কোর্টের রায় এবং ১০ অ্যামিকাস কিউরির (তাদের ৯ জনই সংশোধনীটি বাতিল করার সুপারিশ করেছেন) পর্যবেক্ষনের মধ্যে তাদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি । তারা প্রধান বিচারপতি এবং দুই অ্যামিকাস কিউরি- ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের অনভিপ্রেত সমালোচনা করেন। একজন উর্ধ্বতন মন্ত্রী দাবি করেন, রায়ে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানকে তার আদর্শ বিবেচনা করেন। ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে ‘সুযোগসন্ধানী,’ ‘বিবেকবর্জিত,’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দুই অ্যামিকাস কিউরির একজনের শ্বশুর যে ‘পাকিস্তানের নাগরিক’ এবং অপরজনের ‘জামাতা যে ইহুদি’ সেটা জোর দিয়ে বলতে কোনো কসুর করা হয়নি!

যারা এই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন বিকশিত হওয়ার জন্য দশকের পর দশক ধরে সংগ্রাম করেছেন, তাদের জন্য ওই সন্ধ্যার কার্যক্রমটি ছিল বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। তাদের যুক্তি যে কেবল সংসদীয় শিষ্টাচারের বরখেলাপ এবং রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও আইন পরিষদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির মূলনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, সেইসাথে তারা ছিলেন ভ্রান্ত ও স্বার্থন্বেষকও।

এমপিরা দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করার কাজটি ছিল ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ এবং ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ পরিকল্পনা বানচাল করা। ২০১০ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্ট আরো তিনটি সাংবিধানিক সংশোধনী- পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ- বাতিল করেছে। বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে ‘মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং সপ্তম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। ফলে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করা যায়, আওয়ামী লীগ এমপিরা যদি ওইসব রায়কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বিবেচনা না করেন, তবে তারা ষোড়শ সংশোধনীর ব্যাপারে এমনটা কেন করছেন?

তাদের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিটিও শূন্যগর্ভ মনে হয়। ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা যদি ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল্যবোধ ও কার্যকারিতার বিষয়টি এত প্রবলভাবেই অনুভব করে থাকেন, তবে তারা সেটাকেই কেন অবিকলভাবে ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদে বিল কেন আনছেন না? দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এ ধরনের উদ্যোগ যে সফল হবে, তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়।

ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করেনি এবং এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃত্ব-বহির্ভূত কাজ করেছে বলে এমপিদের জোরালো দাবি হালে পানি পায় না। স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলেই অনুধাবন করা যায়, বিচার বিভাগ থেকে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে পার্লামেন্টের কাছে সমর্পণ করার মানে হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা এবং সেইসূত্রে সংবিধানের মূল কাঠামোকে দুর্বল করা।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তৃতাবাজির তোড়ে আরেকটি বিষয় পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গেছে যে, ১৯৭২ সালের সংবিধান থেকে পার্লামেন্টের বিচারপতিদের অপসারণের বহুল আলোচিত ব্যবস্থাটি উচ্ছেদ ও বাতিল করাটা প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারেরই কর্ম। তারাই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটা করেছিলেন।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তব্যের সারমর্ম প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, এমপিরা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে আছেন কিনা। জবাব দ্ব্যর্থহীনভাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ৯৪(৪)-এ সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতি তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে স্বাধীন থাকবেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাহী সরকার বা সংসদ সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে পারবে না। কার্যপ্রণালীতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি কার্যক্রম নিয়ে থাকা কোনো প্রশ্ন, প্রস্তাব উত্থাপনযোগ্য নয়’ (ধারা ৫৩, ৫৪ ও ১৩৩)। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সংসদ সদস্যরা সংসদে যে কথাই বলুন না কেন, ধারা ৭৮-এর আলোকে থাকা দায়মুক্তির সুবিধাটি নিয়ে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে- এমন কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করতে পারবেন না’ (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ, ঢাকা : মল্লিক ব্রাদার্স, ২০১২)।

এটাও উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, কার্যপ্রণালীতে ব্যক্তিগত ধরনের কোনো অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে এমপিদের। ফলে এটা খুবই সম্ভব যে, অ্যামিকাস কিউরি প্রশ্নে অরুচিকর মন্তব্য করে এমপিরা তাদের প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

সম্মানিত এমপিরা জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল পাকিস্তানেই বিচারপতিদের অপসারণে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ রয়েছে। তারা বলেন, বেশির ভাগ দেশেই এই ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া আছে। এ ধরনের দাবির পক্ষে প্রমাণের ওপর আলোকপাত করা যাক। ২০১৫ সালে কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘কমপেনডিয়াম অব অ্যানালাইসিস অব বেস্ট প্রাকটিস অন দি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেনিউর অব রিমোভাল অব জাজেজ আন্ডার কমনওয়েলথ প্রিন্সিপালস’-এ বলা হয়েছে, কমনওয়েলথভুক্ত ৪৮টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা (৩৪.৩%), ৩০টির মতো দেশে নির্বাহী ও আইনপরিষদ থেকে আলাদা একটি সংস্থা (৬২.৫%) রয়েছে। বাকি দুটি দেশে রয়েছে মিশ্রব্যবস্থা (৩.২%)।

কমনওয়েলথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ সংসদীয় অপসারণব্যবস্থায় কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত, তথ্যানুসন্ধান এবং মূল্যায়নে স্বাধীন, বহিরাগত সংস্থার  সম্পৃক্ত করার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সম্মানিত এমপিরা আমলে নিতে পারতেন, যে ১৬টি দেশ সংসদীয় অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের ১২টিই তথ্য তদন্তের দায়িত্বটি আইনপ্রণেতাদের ওপর রাখেনি। তারা এর বদলে আইন পরিষদ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা একটি সংস্থার ওপর এ  দায়িত্বটি দিয়েছে। কেবল শ্রীলঙ্কা, নাউরু ও সামোয়োর অনুসরণ করে বিচারক অপসারণে একচ্ছত্র পার্লামেন্টারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে বাংলাদেশ।

সমীক্ষায় সতর্কতা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, সংসদীয় অপসারণ পদ্ধতি ‘প্রয়োগ করা হলে মারাত্মক সাংবিধানিক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।’ এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই কক্ষবিশিষ্ট পদ্ধতিই অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা বর্তমানে সম্ভব নয়।

এক সিনিয়র মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, একজন অ্যামিকাস কিউরি ভারতে বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি এমন ধারণা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছেন যে, মনে হতে পারে, দেশটিতে এখনো সংসদের অপসারণের পুরনো পদ্ধতি চালু আছে। বাস্তবে ভারত, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশ বিচারপতি অপসারণে পার্লামেন্টকে দেওয়া ক্ষমতা হ্রাস করে সরকারি প্রভাবমুক্ত একটি ব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত করেছে। সংবিধানের ৭০ ধারায় আবদ্ধ আমাদের এমপিদের নতুন বাস্তবতার প্রতি যথাযথ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আইন প্রণয়ন বিভাগের অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া এবং বিচারপতি অপসারণ প্রশ্নে সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের প্রায় সার্বজনীনভাবে বহাল থাকার ভ্রান্ত দাবি এই দেশের গণতন্ত্রের জন্য কলাণকর নয়। আশা করা যেতে পারে, যুক্তিই জয়ী হবে এবং রাষ্ট্রের সব অঙ্গ ক্ষমতা বিভাজনের মৌলিক ধারণা এবং আইনের শাসনের প্রতি যথাযথভাবে শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

(লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

রামপালে ক্ষমতাসীনদের ‘শিল্প-বানিজ্য’ নগরী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

কম-বেশি ১৮৬টি ভারী-মাঝারি শিল্প স্থাপনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে, সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায়। সরকার এখন বলছে, ইউনেসকো’র শর্ত মেনে আপাতত: সুন্দরবনের আশে-পাশে বড় ধরনের শিল্প অবকাঠামোর অনুমোদন দেয়া হবে না। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার মেনে চলবে ইউনেসকো’র শর্ত-সুপারিশ। সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টার। তার মতে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ নয়, চলবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সুন্দরবন থাকুক আর না থাকুক উন্নয়ন চলবেই- এ ব্যাপারে সরকার প্রধান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই উন্নয়ন জোয়ারে এতকাল কোন বাধা পাত্তা না পেলেও যেইমাত্র শর্তসাপেক্ষে ইউনেসকো খসড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যা এখনোও চুড়ান্ত নয়, ঠিক অমনি সরকার সেটি লুফে নিয়েছে। প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এবং সবশেষ জ্বালানী উপদেষ্টা ফলাও করে সেটি প্রচার করেছেন। গেল কয়েকদিন জ্বালানী উপদেষ্টা মিডিয়ায় দারুন সরব- ইউনেসকো যা বলেছে তার বাইরে যাবেনই না-হাক-ডাক, ভাব যেন তেমনই!

অথচ এত বড় প্রতারণা কী মেনে নেয়া যায়? ইতিমধ্যে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই কিনেছেন কম-বেশি তিন হাজার একর জমি। দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নেতৃবৃন্দ কিনেছেন প্রায় সাত হাজার একর। একুনে দশ হাজার একর জমি কেনা হয়েছে এবং কেনার হিড়িক পড়ে গেছে।

এসব জমি তো আর বসতবাড়ি, রেষ্টহাউস বা বাংলো বানানোর জন্য কেনা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে ভাগ্যবান নেতা, যিনি এর আগে চিংড়ি ঘেরের ম্যানেজার ছিলেন, তিনি মোংলার জয়মনিরগোল এলাকায় কিনেছেন প্রায় দুশো একর জমি। নিশ্চয়ই বসবাসের জন্য নয়! দেশের খ্যাতনামা শিল্পগোষ্ঠি ওরিয়ন, বসুন্ধরা, সামিট, ইনডেক্সসহ নামী-দামী কর্পোরেট গ্রুপেরা সুন্দরবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার জলা-জমি কিনে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই শিল্প, কল-কারখানা স্থাপনের জন্য ?

খুলনা-মোংলা হাইওয়ের মাঝামাঝি থেকে শেষ মাথায় গেলে যে কারো মনে হবে- এখানে গড়ে উঠছে মেগা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল শিল্পাঞ্চল।  চিংড়ি ঘের,  গ্যাস প্ল্যান্ট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলির শিল্পবর্জ্য নিঃসরিত হচ্ছে। মিশকালো ধোঁয়া ও ফ্লাই এ্যাশ মিশে যাচ্ছে সুন্দরবনে। মোংলার সাম্পানঘাটে বিশাল আকৃতির সাইনবোর্ডঃ ‘‘এলাকাটি সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা’’। কিন্তু খোদ সরকারই সুন্দরবন ঘেঁষে জয়মনিরগোলে নির্মান করেছে বিশাল সাইলো বা খাদ্যগুদাম।

মোংলা ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চলের বিশাল সারির পর রামপালের দিকে যেতে দুই পাশে যে জমি মাত্র কিছুকাল আগেও ফাকা ছিল, আজ তার এতটুকুও জমি ফাঁকা নেই। সবই প্রস্তাবিত অথবা নির্মানাধীন শিল্প কারখানার দখলে। অথচ গোটা অঞ্চল প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ-এর অন্তর্ভুক্ত। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার নয়টি উপজেলায় ইতিমধ্যে ১৪০ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে চ’ড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনের দুই কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মাহববুবুল আলম হানিফ ‘সানমেরিন শিপইয়ার্ড’ নির্মানের ছাড়পত্র পেয়ে গেছেন।

ছাড়পত্র প্রসঙ্গে বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল চমৎকৃত করে দেবার মত। তার মতে, “দেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার, আবার শিল্প-কারখানাও দরকার। আমরা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্দ্রী বরাবরে উপস্থাপন করছি”। বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠির তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে। কারণ, সুন্দরবন রক্ষা করতেই হবে-এটি তাদের প্রধানতম কাজ।

প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ এবং জ্বালানী উপদেষ্টাকে স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে না, তাদের রাষ্ট্রীয় গেজেট নিশ্চয়ই পড়তে হয়, পড়েন, জানেনও। রাষ্টপতির পক্ষে উপসচিব স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে; “প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিব বৈশিষ্ট্য নষ্ট ও পরিবর্তন হবে, এমন কোন কাজ করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দুষনকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না”। প্রসঙ্গত: সরকার সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার এলাকা প্রভাবিত প্রতিবেশ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের একজন, সংসদ সদস্য, একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফ কী জানেন না যে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় চিংড়ি ঘের করতে হলে পবিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে? গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা একসাথে কতগুলি রাষ্ট্রীয় আইন ভেঙ্গে চলেছেন!

এক. সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) কোন বাণিজ্যিক কর্মকান্ড স্থাপনা নিষিদ্ধ হলেও দাকোপের সুতারখালীতে ৩৫ একর বিশিষ্ট চিংড়ি খামার এবং দোতলা ও একতলা স্থাপনা নির্মান করেছেন হানিফ।

দুই. ঘের স্থাপনের বেড়িবাঁধ কেটে সুন্দরবনের পশুর নদ থেকে নিয়মিত লবন পানি ঘেরে প্রবাহিত করা হচ্ছে।

তিন. ঘেরের মাঝে অবস্থিত কালীমন্দিরের জায়গা তিনি ইজারা নিয়েছেন এবং একটি পুকুর ভরাট করে জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলেছেন।

চার. আরেকটি মন্দির নির্মান করছেন। পানি শোধনাগার স্থাপন করেছেন।

পাঁচ. চিংড়ি খামারে তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর ব্যবহার করে মারাত্মক শব্দদুষন সৃষ্টি করছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের পাঁচ ধারায় বর্ণিত ইসিএ  এলাকায় নিষিদ্ধ এসব কর্মকান্ড করে সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইন লংঘন করছেন…..।

এখন দেখা যাক, সুন্দরবন এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানে সরকার প্রধানের অবস্থান কি? কারণ তার নিজের এবং অনুসারীদের ভাষায়,“বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে দেশের একবিন্দু ক্ষতি হতে পারে না। তার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই”! সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে অনমনীয়। এক্ষেত্রে তিনি দেশ- বিদেশে সকল বাধা উপেক্ষা ও অতিক্রম করেছে; এমনকি ভারতে এরকম দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প পরিত্যক্ত হবার পরেও।

প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে যুক্তি হাজির করেছেন নানাসময়ে। তার উল্লেখযোগ্য যুক্তিগুলো হচ্ছে; উন্নয়ন করতে গেলে জলা- বনের কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করতেই হবে। উন্নয়নের সুফল সে ক্ষতি পুষিয়ে দেবে। এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করলে পরিবেশের ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় হবে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে। সারাদেশে বিদ্যুতের জোয়ার এলে দু’চারটে ক্ষতি মানুষ ভুলে যাবে। যে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র ফেরত এনেছি, একই প্রক্রিয়ায় উন্নয়নবিরোধী সব তৎপরতা থামিয়ে দেয়া যাবে।

ষাট দশকে পাকিস্তানের সেনাশাসক আইয়ুব খান কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, পাহাড়ীদের দুর্দশা যাই হোক, বিদ্যুতের উন্নয়ন তা ভুলিয়ে দেবে। আইয়ুবের উন্নয়ন তত্ত¡ মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। কাপ্তাই থেকে যে বিদ্যুৎ এসেছে সে তুলনায় অর্থনৈতিক, পরিবেশ-প্রতিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয়। পাহাড়ীরা উচ্ছেদ হয়েছে, জলমগ্নতায় বদলেছে তাদের জীবন। এই উন্নয়ন প্রকল্পকে জীবনহানির সমতুল্য চিহ্নিত দশকের পর দশক তারা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে।

এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। পাহাড়ে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করতে হয়েছে। এক দেশের মধ্যে ‘দুই চিন্তা’ জন্ম নিয়েছে। একই দেশের অধিবাসীরা পরস্পরকে শত্রæ ভেবে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে বহু বছর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রকৃতি ও মনুষ্য জীবন বিবেচনায় সবচেয়ে ক্ষতিকর উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এই ধরনের উন্নয়ন দর্শন বা উন্নয়ন লক্ষ্যটি সৎ-স্বচ্ছ হয় না। কারণ এরকম তথাকথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ থাকে না, উন্নয়নও আসলে উদ্দেশ্য নয়। জনস্বার্থ তো কোন বিষয়ই নয়। এসব একপর্যায়ে পরিবেশ- প্রতিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। এজন্যই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদাহরন নিয়ে আসতে হয়েছে। উন্নয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যেন-তেন প্রকারে শক্তি প্রয়োগের নীতিতে জনভাবনার বিপরীতে উন্নয়ন অনেক সময় কদর্য পরিনতি ডেকে আনে। এরকম অজ¯্র উদাহরন থাকা সত্তে¡ও রামপালের বিষয়ে সরকার প্রধান অনমনীয়ই থেকে যাচ্ছেন।

এই নিবন্ধ লেখার সময় জানা গেল, ইউনেস্কো ১২ জুলাই সুন্দরবন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারে। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে বাংলাদেশে ইউনেস্কো প্রতিনিধি বিয়েট্রিকা কালডুন এ খবর জানিয়েছেন। তার মতে, গত ২ জুলাই থেকে পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে শুরু হওয়া বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় প্রকল্প অনুমোদন, বাতিল কোনটিই করা হয় না। সম্মেলন শুরুর আগে গত মে মাসে সুন্দরবনের ওপর তৈরী হওয়া খসড়া সিদ্ধান্তের কিছু বিষয়ে সংশোধন আসতে পারে। তবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই।

এরই মধ্যে গত রোববার থেকে সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় দাবি করে আসা হচ্ছে, ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে। শুধু একটি কৌশলগত সমীক্ষা করতে বলেছে ২০১৮ সালের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের ব্যাপারে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির কোন আপত্তি নেই।