Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 20)

Author Archives: আমাদের বুধবার

শিক্ষার সর্বগ্রাসী সংকট : মেধাহীন প্রজন্ম সৃষ্টির কূটকৌশল

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ‘মানব-সম্পদ উন্নয়ন’। প্রশ্নপত্র ফাঁস আর ‘গায়েবী’ নির্দেশে পরীক্ষা পাশের হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মানব-সম্পদ ‘ধুঁকছে’;  মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিপর্যস্ত শিক্ষকদের দলাদলিতে। স্কুল শিক্ষকদের পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, পিপার-স্প্রে দিয়ে শাসন করা হয়। একজন সংসদ সদস্য শিক্ষকদের উদোম করে রাস্তা প্রদক্ষিণ করিয়েছেন, প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠ-বস করিয়েছেন আরেক সংসদ সদস্য।  এর ফলে শিক্ষকরা উদোম বা কান ধরে ওঠ-বস করেছেন, না গোটা জাতি করেছে- এ নিয়ে ভাবার সময় নেই। আর শিক্ষক নেতাদের মুখে তো কুলুপ!

প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে কানেই তোলেননি। ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নীতি পাল্টেছেন। সবশেষে বলেছেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো পুরোপুরি সম্ভব নয়। এর আগে বলেছিলেন, “কিছুসংখ্যক ‘কুলাঙ্গার’ শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছে। কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস সামলাবো”? তারপরে বলেছিলেন, “আমাদের ভাল শিক্ষক নেই”। এইসব কথামালা একটি বিষয়কেই ইঙ্গিত করে- হয় প্রশ্ন ফাঁসকারীরা সরকারের চেয়ে শক্তিশালী, অথবা সরকারের প্রভাবশালীরা প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত।

ভুলে ভরা বিকৃত পাঠ্যবই পৌঁছাচ্ছে আর মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে পাশের হার বাড়াচ্ছে। শিক্ষায় শনৈ: শনৈ: উন্নতির গল্প শুনছে মানুষ। এর মধ্য দিয়ে কি মনোজগত তৈরী হচ্ছে শিক্ষার্থীদের? সারাদেশে কিশোর অপরাধ বাড়ার কারন কি এই ভুল-বিকৃত শিক্ষার মনোজমিন। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যে মৌলিক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে- সেই তুলনায় সময়মত বই পৌঁছানো কি সত্যিই সাফল্য? কি ফলাও করেই না এই সাফল্য প্রচার করা হয়!

সত্যটা কি উপলব্দিতে আছে? দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার-আত্মসাত হলেও ক্ষতি পোষানো যায়! চাইলে চলমান হত্যাকান্ড থামিয়ে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়নও করা সম্ভব; ধ্বসে যাওয়া নির্বাচন ব্যবস্থা মেরামত সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরিও বন্ধ করা যায়। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্তর্গত ক্ষতি-ধ্বস কি ইচ্ছে করলেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব? এর জন্য কত সময় লাগবে, কত মূল্য দিতে হবে জানা নেই। অন্তত: একটি প্রজন্ম তো বটেই।

প্রশ্ন ফাঁস, নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশের মত অশিক্ষা নিয়ে যারা পাশ করে বের হচ্ছে, আগামী এক-দেড় দশক পরে তারাই নেতৃত্বে থাকবে। এই শিক্ষা ও মেধা নিয়ে তারা কেমন নেতৃত্ব দেবেন? মেধাবী-যোগ্য মানুষ কি পাওয়া যাবে? ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নের সুযোগে যারা ডাক্তার হয়ে বেরিয়ে আসবেন, তারা কি চিকিৎসা সেবা দেবে? ভয়াবহতা-ধ্বস কতটা ঘটেছে, আপাত: আমোদে মত্ত আমরা কি তা অনুমান করতে পারছি!

এটি স্বীকৃত সত্য যে, দেশে মানুষকে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষিত করা গেলে মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটে। শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে বড় উদাহরন। সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় উন্নয়ন তার আপন গতি পেয়েছে। রাস্তা-ফ্লাইওভার, সেতু নির্মান উন্নয়ন নয়, উন্নয়ন সহায়ক কাজ। প্রযুক্তি তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন শিক্ষা-মেধা দিয়ে সেগুলি তৈরী করে মানুষ ব্যবহার করে উপকৃত হয়। এখানে অমূল্য একটি প্রশ্ন হচ্ছে- এই ব্যবস্থার কি শিক্ষা-মেধা কোনটি নিশ্চিত করছে, কি নিশ্চিত করবে?

আমরা কি তাহলে পুরো ব্যবস্থাই ধ্বংস করে দিলাম? ৯৫ শতাংশ মানুষের সন্তান যে শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ তার কথাই বলা হচ্ছে – ৫ শতাংশের সন্তানরা ইংরেজী মাধ্যমে পড়ালেখা করে। ‘ও’ লেভেল পাশ করে উন্নত দেশের নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়, সেটির আরও উন্নতি হচ্ছে। এই যে বৈষম্য তা থাকবে না- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো ছিল সেটিই। সুতরাং ৯৫ শতাংশের ব্যবস্থা ধ্বসিয়ে দিয়ে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হবে?

দুই.এক দলদাস শিক্ষকের কথা বলি। এমত শিক্ষক এখন ছড়ানো-ছিটানো সর্বত্র। শিক্ষার ধ্বস, অবনমন ও নজিরবিহীন অনাচারের বিরুদ্ধে এরা কথা বলেন না কখনও। এরকম এক দলদাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর আব্দুল আজিজ ২০১৪ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীতে ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় যা বলেছিলেন তা মনে করিয়ে দেব। ঐ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী  আসাদুজ্জামান নুর।

“ছাত্রলীগের সব নেতা-কর্মীদের চাকরী দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হক্ষে, কোন কর্মী যেন বেকার না থাকে। ছাত্রলীগ নেতাদের রেজাল্টের প্রয়োজন নেই। তাদের গায়ের ক্ষতচিহ্নই তাদের বড় যোগ্যতা…। বর্তমান সরকারের আমলে কেবল ছাত্রলীগ কর্মীদের চাকরী দিতে সরকারকে আহবান জানাই”। প্রফেসর আজিজের এই মৌলিক প্রস্তাবনার প্রতিধ্বনি ছিল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের কথায়। তিনিও বলেছিলেন, ছাত্রলীগ কর্মীদের শুধু লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেই হবে, বাকিটুকু তারা দেখবেন।

জাতির সবচেয়ে উজ্বল সময়ে ন্যায্য রাষ্ট্র চিন্তায় শিক্ষকরা ভূমিকা রেখেছিলেন। চিন্তায়, মননে  ছিলেন নির্মোহ, নির্লোভ, পক্ষপাতহীন। তারা জাতিকে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু দলদাস শিক্ষকরা তাদের উত্তরাধিকার নন। এই শ্রেনীটি সবসময় সব ক্ষমতাসীনদের সাথেই আছেন। ক্রমাগত মূল্যবোধ-হ্রাসপ্রাপ্ত গত চার দশকে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা হয়ে পড়েছে নতজানু। শিক্ষক-শিক্ষকতার এই অবনমন সবকিছুতেই গা সহা সমাজকে আর আলোড়িত করে না, আন্দোলিতও করে না।

শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার ধ্বস নিয়ে প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীর গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ১০ শতাংশের বেশি ভর্তি পরীক্ষায় টিকছে না- গণমাধ্যমে এমত সমালোচনার পর শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মত। খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন বললেন, “আমাদের ছেলে-মেয়েরা বেশি সংখ্যায় পাশ করবে তাও অনেকে চায় না”। ব্যাস, শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ভোল পাল্টে ফেললেন, গলা মেলামেল প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সাথে। তারা বিবেচনা করেননি, এই দলদাস ভূমিকা শিক্ষার সর্বনাশের পাশাপাশি তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে!

তিন. শিক্ষার সংকট কোথায়? এ আলোচনায় পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার অধ:পতন ঘটেছে। কিছুকাল আগেও নকল ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা; এখন সেখানে সব ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। স্কুলকেন্দ্রিক পড়াশুনার বদলে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট শিক্ষক নির্ভর হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন মিলছে। শিক্ষার্থীদের অনুশীলন যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা পদ্ধতি এখন কার্যত: অকার্যকর। এরসাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার হার বাড়ানোর উচ্চাভিলাষ।

শিক্ষাবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, “শিক্ষার প্রধান সমস্যা তিনটি। প্রথমত: বাণিজ্যিকীকরণ। শিক্ষা পণ্যে পরিনত হয়েছে। পূঁজিবাদী সমাজে মুনাফাই যেহেতু লক্ষ্য, তাই পণ্যে ভেজাল হওয়া খুবই স্বাভাবিক। শিক্ষা নামক পণ্যটিতেও ওই ভেজালটা ঢুকে গেছে। দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রের গুরুত্বহীনতা; রাষ্ট্র যে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয় না, শিক্ষাই যে জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি, এটি রাষ্ট্র আমলে নেয় না। তৃতীয়ত: তিনধারার শিক্ষা; এটা রাষ্ট্র বাড়াচ্ছে। এরকম তিন ধারার শিক্ষা যত বাড়বে বৈষম্য তত বাড়বে”।

জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম বিষয় ছিল শিক্ষার হার বৃদ্ধি। এই লক্ষ্যপূরণে মরিয়া সরকার পাশের হার বাড়াতে, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নম্বর বাড়িয়ে, মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। জেনুইন নম্বর দিতে গিয়ে অনেক শিক্ষক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এই সর্বগ্রাসী সরকারী চাহিদা মেটাতে মেধা মূল্যায়নে পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি কাজে আসছে না। প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষা পদ্ধতির সংকট, খাতা মূল্যায়নে সরকারী নির্দেশনা কেবল নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা এখন সমস্যাজর্জর। সরকারী, বেসরকারী, মাদ্রাসা ও ইংরেজী  মাধ্যমে শিক্ষা কাঠামো এই বহুমুখী সংকটকে সর্বগ্রাসী করে তুলছে।

চার. শিক্ষার বিদ্যমান স্তরে প্রাথমিক শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সবদেশেই প্রাথমিক শিক্ষা গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশেও তাই ছিল। এখন পয়তাাল্লিশ বয়সী এই দেশে ভাঙাচোরা প্রাথমিক স্কুল এখন দালানে পরিনত। ভাঙা ঘরে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক ছিলেন, স্কুল ছিল শিশুর দ্বিতীয় বাড়ি। শিক্ষক ছিলেন মা- বাবার পরের অভিভাবক। বঞ্চনা-কষ্টকে মেনে নিয়ে তারা শিশুকে একাডেমিক ও নৈতিক শিক্ষা দিতেন। কারো মধ্যে মেধার খোঁজ পেলে পরিচর্যা করতেন বিশেষভাবে।

ইট সিমেন্টের দালানে এখন “অন্যকিছু করতে না পারা” মেধাহীনরা প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত। যিনি এইচএসসি পাশ করেছেন টেনেটুনে। চাকরি নিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য বা কোন ক্ষমতাধরকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে। এলাকায় তিনি ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হন। চাষ-বাস বা ব্যবসা করেন। মাঝে মধ্যে স্কুলে যান আড্ডার মেজাজে।

শিক্ষার এই সংকট মূলত: সমাজের দৈন্য চেহারা এবং পাশাপাশি এটি সংঘবদ্ধ অপরাধী সমাজ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। অগণতান্ত্রিক ও চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিক বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসছে সমাজের সব স্তরে। মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে এবং জড়িয়ে পড়ছে দখলদারিত্ব আর অনৈতিক প্রতিযোগিতায়। উগ্রপন্থা, সহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটছে।

এই অবস্থা প্রমান করছে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মানবিক, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনার নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে না। সংস্কৃতি বিনির্মানেও শিক্ষাব্যবস্থা অক্ষম। সামাজিক বৈষম্য দুর করা ও নানামতের প্রয়োজনীয়তা বোঝার বদলে শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

এর মূল কারন নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের উপরিকাঠামোয়। রাষ্ট্র যেমন গণতান্ত্রিক চেহারা বিসর্জন দিচ্ছে, কঠোর কর্তৃত্ববাদীতায় ঢেকে দিচ্ছে সবকিছু, শিক্ষাঙ্গনেও পড়েছে এর কড়ালগ্রাস। এই কঠোর, কর্তৃত্ববাদী শাসনে সরকার হয়ে উঠেছে আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অদৃশ্য শক্তি নির্ভর। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আজকের অবস্থায় নিয়ে আসা এবং শিক্ষাঙ্গণে গণতন্ত্র চর্চা, প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি নিপুন কৌশলে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে- শুধুমাত্র ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার বাসনায়।

এজন্যই প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, “সমাধানের প্রশ্নে গেলে বলব, সংস্কারের সময় শেষ হয়ে গেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কারের আর কোন সুযোগ নেই। এখন সমাজের আমুল রূপান্তর দরকার। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের এখন আমুল পরিবর্তন ছাড়া যে কিছু সঠিক হবে না এই সত্যটি মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে”।

ভারতের সিদ্ধান্ত : আর নয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

২০২২ সালের পর ভারতে আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্রকল্প  নির্মাণ করা হবে না

ওয়েব সাইট অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

প্রবল প্রতিবাদের মধ্যেও যখন বাংলাদেশের রামপালে যৌথ উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে, তখন খোদ ভারতেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নীতিগত অবস্থানের ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন ঘটেছে; অর্থাৎ পুরো পরিবর্তন হয়েছে এসংক্রান্ত পরিকল্পনায়। দেশটির সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) জানিয়েছে, পাঁচ বছর পরই তারা আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করবে না। তারা বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে যাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমাগত কমিয়ে আনা হবে।

ভারত কিন্তু বেশ ভাবনা-চিন্তার পরই কয়লা ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে। ২০২২ সালের পরে আর কোন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ তারা করবেনা। তবে দেশটিতে এখনো যে পরিমাণ কয়লার মজুত আছে, তা দিয়ে তারা ২০২৭ সাল পর্যন্ত আনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যেতে পারবে। কিন্তু তারপরও ওই অবস্থান থেকে তারা সরে আসছে।

এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো পরিবেশ দূষণ। আবার দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে প্রতিষেধকমূলক যেসব পদক্ষেপ নিতে হয়, সেগুলো নিতে গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় অনেক বেশি। এই ব্যয়ভার মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণেই  অত্যাধুনিক এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত সরঞ্জাম দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপানের চাহিদা কমে যাচ্ছে।  ভারতের ন্যাশনাল ইলেকট্রিসিটি প্লানে (২০১৭-২০২২) এ ব্যাপারে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে,  ২০২১-২২ এবং ২০২৬-২৭ সময়কালে মোট জ্বালানির যথাক্রমে ২০.৩ ও ২০.৩ ভাগ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে বেসরকারি খাতে। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্লান্টে বিনিয়োগে বড় ধরনের সমস্যা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার সিইএ’র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হলে ৪,০০০ মেগাওয়াটের আল্ট্রা মেগা পাওয়ার প্লান্টের প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করা হচ্ছে।

গত ডিসেম্বরে সিইএ’র খসড়া জাতীয় বিদ্যুত পরিকল্পনাটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে এটা প্রণয়ন করা হয়। ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১২-১৭) অনুযায়ী, ওই সময়কালে দেশটিতে ১,০১,৬৪৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা। এগুলোর ৮৫ ভাগই কয়লাভিত্তিক প্লান্ট থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে, ২০২২ সালের পর আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্লান্ট নির্মাণ করা হবে না। ২০২২ সাল থেকেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্টের কাজ বড় আকারে শুরু হবে। ওই বছরে মোট ১৭৫ গিগাওয়াটের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করা হবে।

২০১৬ সালের মার্চে ভারতের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬১ ভাগ ছিল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের, ১৪ ভাগ জলবিদ্যু, ১৪ ভাগ নবায়নযোগ্য (বেশির ভাগই বায়ুভিত্তিক), ৮ ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২ ভাগ পরমাণু এবং ১ ভাগ ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রের।

বিদ্যুৎ স্বল্পতা দূর করা এবং প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভারতে ১৯৫০ সালে বিদ্যুৎ সামর্থ্য ছিল ১,৭১৩ মেগাওয়াট, ২০১৬ সালের মার্চে দাঁড়ায় ৩০২,০৮৮ মেগাওয়াট। ভারতের  দিক থেকে এটা বড় ধরনের সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু এটা করতে গিয়ে পরিবেশের ভয়াবহ দূষণ ঘটে । কোনো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভারতের রাজধানীকে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী। ভারতের অবস্থানও একই পর্যায়ের। অবশ্য কেবল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই যে দূষণ ঘটছে, এমন নয়। তবে এটা অন্যতম কারণ।

আবার ভারতই নয়, পরিবেশ সুরক্ষার দিকে পরোয়া না করা দেশগুলোর তালিকায় ভারতের সাথে যেন প্রতিযোগিতা করছে চীন, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশ। পরিবেশ দূষণ ওইসব দেশেই সীমিত থাকছে না। বাংলাদেশের মতো দেশ তার শিকার হয়। সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য কিন্তু বাংলাদেশ দায়ী নয়। কিছুটা অগ্রসর দেশগুলো তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গিয়ে এমন সব ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার সুফল তারা এককভাবে পেলেও কুফলগুলো গরিব দেশগুলোকেও ভোগ করতে হচ্ছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৬ সালের মার্চে যেখানে এই খাত থেকে বিদ্যুৎ আসতো ৫২৩ মেগাওয়াট, সেখানে ২০২২ সাল নাগাদ এই খাত থেকে ৫২৩ গিগাওয়াট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮৫ ভাগ থেকে কমিয়ে ৪৭.৫ ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে পানি, পরমাণু, বাতাস, সৌর বিদ্যুতের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হবে।

গ্যাসের দাম, শিক্ষাক্রম : অবিরাম জনবিরোধী কর্মকান্ড কার স্বার্থে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন:::

এক. পৃথিবীতে এমন কোন সরকার আছে, যে নিজের দেশের জনগনের পকেট কাটে? বিশ্ববাজারে দাম অবিশ্বাস্য রকমভাবে পড়ে গেলেও তেলের দাম কমায় না। ‘ভন্ডামী’ করে জনগনের গাঁটের অর্থ শুষে নেয়! যখন খুশি গ্যাসের দাম বাড়ায়; এমনকি এক বছরে দু’বার। বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। আর এক্ষেত্রে ভন্ডামীটি হচ্ছে- দাম বাড়ানোর আগে একটি কথিত ‘গণশুনানী’র আয়োজন করে। তারপর প্রায় সব সুপারিশ উপেক্ষা করে জ্বালানী-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েই চলে।

২০১৫ সালে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গড়ে ২৬.২৯ শতাংশ। ওই বছরের শেষের দিকে আরেক দফা দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে পিছিয়ে আসে, কারন বিইআরসি আইনে বছরে দু’বার মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেই। কিন্তু ২০১৭ সালে সেই আইন তারা আর তোয়াক্কা করেনি। মার্চ ও জুনে দু’দফায় বাড়িয়ে দিয়েছে সাড়ে বাইশ শতাংশ। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত কোন গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে গ্যাস কোম্পানীগুলোর আব্দার, যাদের রাজস্ব ঘাটতিই নেই, বরং আছে লাভ।

জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী বলেছেন- ‘মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক’। অর্থমন্ত্রী বলেছেন- ‘এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়বে না’। একেবারেই নির্ভার তারা; এসব বলতে পারছেন, কারন জ্বালানী ক্ষেত্রে যে কোন সিদ্ধান্তে দায়মুক্তি আইন রয়েছে সরকারের পক্ষে। ক্ষমতায় এসে দ্রুত জ্বালানী ও বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করার নামে ওই ‘দায়মুক্তি’ জনগনের বিপক্ষে সরকারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। ফলে এই খাতে গত অর্ধযুগ কোন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যা দাবি করা হচ্ছে, জনগনকে  তাই মেনে নিচ্ছে হচ্ছে।

এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, জ্বালানী খাতে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা অর্জনের চেয়ে এই খাতকে ব্যবহার করে মুনাফা ও জনগনের পকেট খালি করার দিকেই সরকারের আগ্রহ বেশি। এর কারন হচ্ছে বর্তমান সরকারের কোথাও কোন জবাবদিহিতা নেই। সংসদে-রাজপথে কোন চ্যালেঞ্জ নেই। ফলে জ্বালানী খাতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ জনবান্ধব না হলেও বিশেষ গোষ্ঠিবান্ধব। এই বিশেষ গোষ্ঠি জ্বালানি খাতকে ব্যবহার করে মাত্র কয়েকবছরে অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম সাতশো টাকা। অথচ বিশেষজ্ঞরা ভারতে এর দাম বিবেচনায় এনে বাংলাদেশে নানা সূচক হিসেব করে দেখিয়েছিলেন, এখানে এর দাম হওয়া উচিত সাড়ে চারশো টাকা। বেসরকারী উদ্যোগে এলপিজি উৎপাদন দেখভালের জন্য সরকারের কোন নীতিমালা নেই। বাজারে কৃত্রিম সংকট জিইয়ে রাখতে উৎপাদকরা সরবরাহ কমিয়ে কালোবাজার তৈরী করে। এভাবে প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি হয় এক হাজার থেকে ১২’শ টাকায়।

সরকারের এই কালোবাজার, কৃত্রিম সংকট ও সিলিন্ডার প্রতি অবৈধ মুনাফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং এই দামের সাথে সমন্বয়ের জন্য আবাসিক গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে, গ্যাস কোম্পানীগুলোর মুনাফার খাই মেটাতে। এর মাধ্যমে কালোবাজারকে বৈধতা দেবার পাশাপাশি ‘একচেটিয়া ব্যবস্থা’ নিশ্চিত করছে সরকার। এর প্রধান কারন হচ্ছে, এই সরকারের কাছে জনস্বার্থ মুখ্য নয়, যেমনটি ছিল না অতীতের কোন সরকারের কাছে। মুখ্য হচ্ছে বিশেষ গোষ্ঠি এবং দলীয় স্বার্থ।

দুই. কোচিং সেন্টার, নোট বই, গাইড নামক বইয়ের বোঝা এবং ফি বছর পরীক্ষা ও দশ বছরে শিশু শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট অর্জনে তিনটি পরীক্ষা দেয় কোন দেশে? মূল প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তা নিয়ে গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করলে তাকে ‘গুজব’ অভিহিত করে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন কোন দেশের শিক্ষামন্ত্রী? কোন দেশে পরীক্ষায় খাতায় পরীক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশের হার শতভাগ করার গোপন নির্দেশ আসে? এর সবকটির উত্তর, সেই দেশ বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ এখন কতগুলি চরম ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। বই, কোচিং এবং পরীক্ষার মত ‘সিন্দাবাদের দৈত্য’ ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শিশুদের রোবটে পরিনত করছে। ফি-বছর পাবলিক পরীক্ষার ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র যোগাড়ে উন্মত্ততা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনোজগত করে তুলছে বিকারগ্রস্ত। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত অনাচার নিয়ে সরকারের মনোভঙ্গি জনগন গ্রহন করে ফেলেছে। মানুষ ধরে নিয়েছে ফাঁসকৃত প্রশ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেবে এবং যারা না পাবে তারা ভগ্ন হৃদয়ে মেনে নেবে নিয়তি হিসেবে।

প্রফেসর ড. জাফর ইকবাল গণমাধ্যমে সরকারকে দায়ী করে লিখেছেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার চাইলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো না। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা ভাল করে একটি পরীক্ষা নিতে পারি না, এরচেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না, তাহলে হবে না। প্রশ্নপত্র ছাপানো ও বিতরন যাদের দায়িত্ব তাদের কোন শাস্তি হচ্ছে না…’ (সূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)।

ড. ইকবালের লেখনীর অন্তর্নিহিত সত্য হচ্ছে, সরকার চায় না প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হোক। চলতি বছরে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। গত বছর কোটি টাকার লেন-দেনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগের স্বপক্ষে তথ্য-প্রমান ছিল। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন লাঠিপেটা ও বুটের লাথিতে পিষে দমন করা হয়েছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গেছে অনেক শিক্ষার্থীর।  কিন্তু এ বছর সরকার চেয়েছে, তাই পেরেছে।

শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতে বিনামূল্যে ভুল-বিকৃত বই সরবরাহ করা হয়। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে নজিরবিহীন নৈরাজ্য, Hurt কে Heart , ছাগলকে গাছে উঠিয়ে আম খাওয়ানো কুসুম কুমারী দাসের কবিতা সম্পাদনার নামে চার লাইন বাদ দেয়া, ড, হুমায়ুন আজাদের কবিতা মাঝখান থেকে বাদসহ ভুলে ভরা বিকৃত বই সরবরাহ করার মূল উদ্দেশ্য কি? সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন, ভবিষ্যত জঙ্গী মনোজগত গঠন নাকি শিক্ষার্থীদের মাঝে জিহাদী জোশ সৃষ্টি করা? হেফাজতে ইসলামকে খুশি-সন্তুষ্ট রাখতে সরকারের এই ব্যগ্রতা তাদের বুদ্ধিজীবিরাও মেনে নিতে পারছেন না।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হলে স্কুল-কলেজে শিক্ষা বলতে অনিয়ম-অনৈতিকতা এক নম্বরে অবস্থান নেয়, তাহলে সেই দেশ সেতু, রাস্তা, ফ্লাইওভার বা স্কুল-কলেজভবন আর স্থাপনা দিয়ে কি করবে? বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকরা সোচ্চার হওয়ার বদলে মেতেছেন দলদাস ভূমিকায়। পাঠ্যপুস্তকের ভয়াবহ ভুলগুলিকে তারা দেখছেন, ‘সরকারের অর্জিত সাফল্য ম্লান’ হতে। এভাবে তারা রাজনীতি করছেন, দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখছেন। এজন্যই প্রাইমারী থেকে এইচএসসি পর্যন্ত নিয়মিত প্রশ্নফাঁস নিয়ে কখনও মুখ খুলছেন না। কারন চাটুকারিতা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে তো দলদাসদের মুখ থাকে কুলুপ আঁটা।

আপনি কি এমন একটি দেশ খুঁজে পাবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের দায়ে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্মঘট, অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে কোন সংগঠন? তার পেছনে মদত থাকে সরকারের মন্ত্রী এবং সুবিধাভোগী দুর্বৃত্ত রাজনীতিক নামধারীদের? জনগনকে জিম্মি করে নামিয়ে আনতে পারে ভয়াবহ জনদুর্ভোগ। অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বা সুন্দরবন রক্ষায় যদি নাগরিকরা সমবেত হন, সমাবেশ করেন, দেখবেন ভয়াল ও নির্দয় পুলিশি এ্যকশন।

গত ক’দিন সংবাদপত্র জুড়ে শুধু মৃত্যুর খবর। সড়ক হয়ে উঠেছে যেন মৃত্যুর উপত্যকা। দুর্ঘটনায় প্রতিদিন নানা স্থানে অকাতরে মরে যাচ্ছে মানুষ। মাত্র সাতদিনে যখন নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় অর্ধশতাধিক তখন মনে হয় এ যেন মৃত্যুর মিছিল। জীবন কি তাহলে এরকম মৃত্যুপুরী! অথচ এইসব মৃত্যু চাপিয়ে দেয়া। এর জন্য দায়ী কেউ না কেউ। সেই দোষীদের ক্ষমতার কাছে নিশ্চুপ- নিষ্ক্রিয় সরকার। রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, জনগনের কথা তো আসছেই না। ধরে নেয়া হয়েছে এসব হননকারীরাই দুর্বলের ভাগ্যবিধাতা!

দেশটা যে দাঁড়াচ্ছে নিজের পায়ের ওপর, সেখানে সবচেয়ে বড় অবদান কৃষকের, কৃষিখাতের। কৃষক বিরতিহীন উৎপাদনে নিয়োজিত। ধান উৎপাদনে মার খাচ্ছে তো যাচ্ছে আলু, পেঁয়াজ বা সব্জি উৎপাদনে। সে অদম্য এবং সবসময় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত। কৃষকের কন্যা পোষাক শিল্পের চালিকাশক্তি। তার ছেলে প্রবাসকর্মী হিসেবে রেমিট্যান্স জোগাচ্ছে। কৃষি উৎপাদনে সার, কীটনাশকসহ কিছু উপকরন সরবরাহ সরকার নিশ্চিত করলেও কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য কখনোই নিশ্চিত করেনি। ফলে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য না পেয়ে কৃষক প্রান্তিক থেকে ভুমিহীনে পরিনত হচ্ছে।

কৃষকের যে কন্যাটি গার্মেন্টস কর্মী, সেও শ্রম শোষণের শিকার। সেই শোষণের টাকায় কানাডা, মালয়েশিয়ায় আলাদা বাংলাদেশ পল্লী গড়ে উঠছে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগানো প্রবাসী ছেলেটির পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই। সামগ্রিক অর্থনীতি, জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স বাড়ার ক্ষেত্রে কৃতিত্ব কৃষক ও তার পরিবারের, একেবারেই সাধারন জনগনের। তাদের সাফল্য ছিনতাই করে নিজেদের সাফল্যের প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে অহর্নিশি।

রাজনৈতিক অঙ্গন দুর্বৃত্তায়িত। আর্থিক খাতসমূহে বিশৃঙ্খলা চলমান। এরমধ্যেই ‘উন্নয়ন’ গল্প বলা হচ্ছে ছেলে ভুলানো ছড়ার মত। যে ছড়ায় উন্নয়ন বর্ণনা হচ্ছে, রাস্তা-ব্রিজ, ফ্লাইওভার নির্মানের কড়চা। মানবসম্পদ উন্নয়ন সরকারের কাছে বিবেচ্য নয়। ধরে নেয়া যায়, জেনে-বুঝে মানুষের অধঃপতন ঘটানো হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কেন এসব করবে? সহজ উত্তর, জানা নেই।

এর একটি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্র জ্ঞানচর্চাকে প্রয়োজনীয় মনে করছে না। জ্ঞানচর্চা সমাজে সীমিত হয়ে এসেছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে পাঠকের মধ্যেও। তারাও জ্ঞানচর্চার ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। … মূলত: এরজন্য দায়ী  পুজিবাদী ব্যবস্থা। পুজিবাদের সূচনায় জ্ঞানের চর্চা ছিল বটে, কিন্তু সে তার প্রয়োজনেই জ্ঞানচর্চাকে সংচুচিত করে নিয়ে এসেছে। কারন সে চায়না সমাজে অসঙ্গতিগুলি নিয়ে প্রশ্ন উঠুক...”।

যে রাষ্ট্র জ্ঞানচর্চার মত বিষয়কে পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের মধ্যে গুলিয়ে ফেলে, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে কোটারি ও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সাথে এক করে ফেলে, সেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সূচকই হয়ে ওঠে ব্রিজ-কালভার্ট ও ফ্লাইওভার নির্মান। মানুষের সবরকম অধিকারকে সংকুচিত করে এই উন্নয়ন দর্শন অন্তিমে কোন কাজে আসেনি। অতীত-বর্তমানে এর অজস্র প্রমান থাকলেও কর্তৃত্ববাদ সেটিকে কখনই বিবেচনায় নিতে চায়নি।

ফারাক্কা : ভারতে আবারও তীব্র প্রতিবাদ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ফারাক্কা বাঁধ এখন ভারতের জন্যে, বিশেষ করে এর বিহার অঞ্চলের অভিশাপ। বাঁধটি বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করে মরুভূমিতে পরিণত করছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলছে, আবার বিহারসহ উজানে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের। বাঁধটি চালু হওয়ার প্রথম থেকেই বাংলাদেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। আর এখন সোচ্চার হয়েছে বিহারের মানুষ। অবশ্য এটা ঠিক, এই বাঁধ যে পশ্চিমবঙ্গের জন্যও ভয়াবহ ক্ষতির কারণ, তা প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। এই প্রকল্পের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার বাঁধটির নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে তাকে সরে যেতে হয়েছিল।

কিন্তু এখন ভারতে বাঁধটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে অনেক মানুষ। পরিবেশবাদীদের সাথে যোগ দিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারসহ আরো অনেক সুপরিচিত মুখ।

প্রতিবাদকারীর আরেকজন হচ্ছেন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিজয়ী রাজেন্দ্র সিং। তাকে ভারতের ‘ওয়াটারম্যান’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। তিনি ‘ফারাক্কা বাঁধ গুঁড়িয়ে দেওয়া’র প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফরাক্কা হলো বিহারের কাছে অশুভ। এটা একটা অভিশাপ- যাকে সরানোর প্রয়োজন। কারণ, যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে রাজেন্দ্র বলেন, এতদিন ফারাক্কার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি, পরিবেশগত থেকে শুরু করে এর সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক, আধ্যাত্মিক দিকগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার।

আরেক বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠক্কর জানান, ফারাক্কা বাঁধের কার্যকারিতা বলতে কিছুই নেই। সেচ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ- কোনো কাজেই আসছে না ফারাক্কা। তার প্রস্তাব, গোটা বিষয়টি (ফারাক্কার প্রয়োজনীয়তা) খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তিনি যোগ করেন, সাধারণত, প্রত্যেক বাঁধের গুরুত্বের খতিয়ান ২০ বছর অন্তর খতিয়ে দেখা উচিত। কিন্তু, ৪২ বছর হয়ে গেলেও, ফরাক্কা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা হয়নি। তার দাবি, ফারাক্কা যতদিন থাকবে, ততদিন গঙ্গার গতি থমকে যাবেই। ফলে, বিহারে ভয়াবহ বন্যা হবে।

এদিকে, গঙ্গা পুনঃজীবীকরণ নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রস্তাব দিয়েছে, বিহারের বন্যা পরিস্থিতি সামলাতে ফারাক্কা বাঁধ লাগোয়া জলাধারের চরায় ড্রেজিং করতে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও চুপ কওে বসে নেই। তিনি ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য কেন্দ্র সরকারের কাছে প্রবল দাবি জানিয়ে বলেছেন, এর কোনো উপযোগিতা নেই, সেইসাথে এটা প্রতিবছর রাজ্যে বন্যা সৃষ্টি করে। তিনি প্রস্তাবিত ‘বক্সা’র জলাধার এবং উত্তরপ্রদেশগামী ‘এলাহাবাদ-হলদিয়া’ পানিপথেরও তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আগের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। বিষয়টা আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বলেছিলাম। তাকে বলেছি, ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীতে ব্যাপক পলি জমাচ্ছে, প্রতি বছর বিহারে প্রবল বন্যা সৃষ্টি করছে’। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতির দিকটি উল্লেখ করেছেন।

এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মূল ইঞ্জিনিয়ার এই বাঁধ নির্মাণের সাথে জড়িত ছিলেন তিনিও এর বিরোধিতা করেছিলেন- যাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, ওই বাধ নির্মানের বিরোধিতার জন্যে। তিনি লোক সংবাদ (গণ-সংলাপ)  অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি প্রতিটি প্লাটফর্মে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে দাবি জানিয়েছি। কারণ এটা গঙ্গা নদীতে পলি জমিয়ে দিচ্ছে, শক্তিশালী নদীটির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে’। তিনি বলেন, আগের মনমোহন সিং সরকারের আমলে রাজ্য পানিসম্পদমন্ত্রী পবন বনশালকে বাঁধের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখানো হয়েছিল, বিহার এবং অন্যান্য উজানের রাজ্যে এটা কেমন সমস্যার সৃষ্টি করছে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার বলেন, ‘গত বছরের বন্যার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন আমার সাথে কথা বলেছিলাম, তখন তাকে জানিয়েছিলাম, ফারাক্কা বাঁধ কেমন সমস্যা সৃষ্টি করছে। পরে এক সভায় তাকে এর অপকারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলাম।’ তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধ কল্যাণকর কিছুই করছে না। সমীক্ষাতেও এমনটা দেখা গেছে।

এই বাঁধের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ওই রাজ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে অন্যরা কী বললো, তাতে আমি মনোযোগ দিচ্ছি না। কারণ বিহারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং আমরা এর বিরোধী।

নীতিশ কুমার বক্সারে এলাহাবাদ-হলদিয়া জাতীয় নৌপথ নম্বর ১-এর জলাধার নির্মাণের প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘গঙ্গার পরিষ্কারকরণ তখনই সম্ভব হবে, যখন এর প্রবাহ থাকবে বাধাহীন।

মৌসুমী শিল্প-সাহিত্য আর অর্থ সংস্কৃতি

ফ্লোরা সরকার ::

প্রাণীকুল এবং মানুষ্যকুল দুই কুলের সাথে সব থেকে বড় মিল হলো দুই কুলের মাঝেই পেটের ক্ষুধা একটা সাধারণ প্রকৃতিক নিয়ম। উভয় কুলই খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে বেঁচে থাকে বা বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়। এখন কথা হলো, শুধু খাবার খেয়ে বেঁচে থাকাটাই যদি মানুষের উদ্দেশ্য এবং একই সাথে কাজ হতো তাহলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কোনো তফাৎ আমরা করতে পারতাম না। এবং মানুষকে সকল জীবের সেরা জীব হিসেবে বলা তো দূরেই থাক। মানুষের মাঝে কিছু বিশেষত্ব আছে বলেই সে অন্যান্য প্রাণী থেকে বেশ আলাদা। তার মানে মানুষের ভেতর শুধু পেটের ক্ষুধা নেই, আরও ক্ষুধা তার ভেতর আছে, যে ক্ষুধার কারণে সে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। এবং সেটা হলো মানসিক বা মনের ক্ষুধা। মানুষ শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, কাজ ইত্যাদির মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকতে চায়না, এসবের অতিরিক্ত আরও কিছু সে চায়, যা তাকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায় এবং তাকেই আমরা বলছি মানসিক ক্ষুধা। প্রেরণা সম্পর্কে অভিনেতা উৎপল দত্তের চমৎকার একটা সংজ্ঞা আছে -‘প্রেরণা একটি নিবিড় অনুভূতি, প্রথম প্রেমের উন্মেষের মতন ; বারোয়ারি মন্ডপের বস্তু সে নয়’ (গদ্য সংগ্রহ, উৎপল দত্ত)। মানুষ তার মানসিক ক্ষুধা নিবারনের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার সেই প্রেরণা অনুভব করে যা প্রথম প্রেমের উন্মেষের মতো ; শারীরিক ক্ষুধার বারোয়ারি মন্ডপের বস্তু দিয়ে সেই ক্ষুধা সে মেটাতে পারেনা এবং এই কারণেই যে কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে শিল্প-সাহিত্যের এতো প্রয়োজন পরে। মানুষ যখন তার সেই মানসিক ক্ষুধা মেটাতে পারে, তখন শুধু সে বেঁচে থাকার প্রেরণাই পায়না, একই সাথে বেঁচে থাকাটাতে তার অর্থপূর্ণ মনে হয়।

পৃথিবীর সব থেকে কঠিনতম কাজ নিজের বা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখা। কোনো ব্যক্তি-মানুষ বা সমাজ কখনোই সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে বা নিজেদের দেখতে পায়না। যদি পারতো তাহলে, কোনো সমাজে অত্যাচার, অনাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি কিছুই হতোনা। মানুষ যখন তার নিজের জীবনকে প্রতিবিম্ব হিসেবে দেখতে পায় তখন তার ভুলগুলো সে ভালো ভাবে ধরতে পারে এবং সবাই না হলেও কেউ কেউ শুধরে নেয়ার চেষ্টা করে। কেউ সেই প্রতিবিম্ব আঁকেন তুলির আঁচড়ে, কেউ কলমের আঁচড়ে বা কেউ সিনেমা বা টিভি পর্দায় ক্যামেরার কলম দিয়ে। শিল্প-সাহিত্যের কাজ হলো নিজেকে বা নিজেদের মেলে ধরা। নিজেদের সঠিক প্রতিবিম্ব পাঠক বা দর্শকের সামনে সঠিক ভাবে মেলে ধরা। আমাদের দেশে শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে বর্তমান সময়ে, এই মেলে ধরার কাজটা কীভাবে, কতটুকু সংঘঠিত হচ্ছে বা আদৌও হচ্ছে কিনা সেটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ লিখলেই যেমন লেখা হয়না তেমনি টিভি বা সিনেমা পর্দায় কিছু ভেসে উঠলেই তা দেখার যোগ্য নাও হতে পারে। আজকের এই বিষয়গুলো একটু তলিয়ে দেখার চেষ্টা করবো।

আমরা যদি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের দিকে তাকাই তাহলে কি দেখতে পাই ? বিগত প্রায় দশ-পনের বছর ধরে একই ধারায় আমাদের শিল্পকর্মের কাজগুলো সংঘঠিত হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ উৎসবকে সামনে রেখে এর কাজগুলো হচ্ছে। যেমন, ঈদ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে ইত্যাদি বিশেষ দিনগুলোকে সামনে রেখে টিভিতে বিশেষ নাটক, গান, নাচ, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতে পাই। ভাবটা এমন, বিশেষ এসব দিন ছাড়া ভালো নাটক নির্মাণ বা ভালো কোনো অনুষ্ঠানের আয়জনের কোনো প্রযোজন নেই। আরও পরিতাপের বিষয় হলো, এই সবকিছু ( নাটক, গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি ) যেন শুধুই টিভিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। টেলিভিশন ছাড়া শিল্পকর্ম করার আর কোনো জায়গা নেই এবং টিভি পর্দায় দেখা দিলেই সে শিল্পী এবং না দেখা দিলে সে শিল্পী নয়। বাইরের মঞ্চ বা উন্মুক্ত জায়গাগুলোও যে শিল্পচর্চ্চার চমৎকার খেত্র হতে পারে তা কারোর মাথাতেই যেন থাকেনা। এর মাঝে সেই টিভিও যখন শুধু বিশেষ উৎসবের টিভি হয়ে যায় তখন মনে হয় উৎসবের বাইরে আমাদের কোনো শিল্পকর্ম নেই। বছরের বাকি দিন ভালো নাটক বা গান না হলেও কোনো অসুবিধা নেই। আসলে যেটা হয়, সেটা হলো উৎসবের সময় বানিজ্য বেড়ে যায়। অন্যান্য সময়ের চেয়ে সেই সময়ে দর্শক সংখ্যা বেড়ে যায়। দর্শক সংখ্যা বাড়া মানেই বানিজ্য বাড়া। দর্শক সংখ্যা বাড়ে কেনো ? কারণ উৎসবের ছুটি ছাড়াও, আরও যে একটা বিষয় দর্শকের ভেতর কাজ করে তা হলো, দর্শক ইতিমধ্যেই জেনে গেছে শুধুমাত্র উৎসবের দিনগুলোতেই কিছু অন্তত ভালো নাটক, গান বা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ থাকে, যা বছরের অন্যান্য দিনে থাকে না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিল্পকর্ম শুধুই বিশেষ মৌসুম কেন্দ্রীক হয়ে পড়ছে। অথচ শিল্পকর্ম কোনো বিশেষ বিশেষ সময়ের জন্যে না। তা সারা বছরের জন্যে। আমাদের সিনেমা শিল্প আলোচনার বাইরে রাখা হলো। কারণ এই বিভাগের অবস্থা এতোটাই করুণ যে আলোচনা করারও জায়গা নেই। এবারে দেখা যাক, সাহিত্যের খেত্রে কি হচ্ছে।

বইমেলা শুধুই এখন ‘একুশের বইমেলা’। ফেব্রুয়ারি মাসটা যেন শুধু বই প্রকাশের এক প্রতীকী মাস হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। বইমেলার আয়োজন দেখলে মনে হয়, শুধু এই একমাসেই সারা বছরের বই প্রকাশ করা হবে এবং পাঠকও শুধু এই এক মাসই বই পড়বে, বছরের বাকি দিন বইয়ে হাত না দিলেও চলবে। এখানেও মৌসুমী প্রকাশকদের ভিড়ে প্রকৃত প্রকাশকেরা জায়গা করে নিতে পারছেনা। বাংলা একাডেমি থেকে স্থান বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল এলাকা জুড়ে বইমেলার আয়তন বাড়ানো হয়েছে ঠিক, কিন্তু বাড়ে নাই ভালো বইয়ের সংখ্যা।  বই শুধু প্রকাশের মধ্যে দিয়েই তার কাজ শেষ করেনা। সেই বই পাঠযোগ্য কিনা সেটাই সব থেকে বড় প্রশ্ন। আমরা অনেক সময় পাঠককে দোষারোপ করে বলি যে, আজকাল কেউ বই পড়েনা। কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। যে মানষটা শুধু পড়তে এবং লিখতে শিখেছে, সেই মানুষ ভালো-মন্দ দুটোই বুঝতে শিখেছে। এবং একটা ভালো গল্প বা উপন্যাস বা কবিতা সাধ্য নেই কারো তা পড়া থেকে কাউকে বিরত রাখা। আমরা ভুলে যাই, ভালো গল্প বা উপন্যাস বিজ্ঞাপনের চাইতে, পাঠক থেকে পাঠকের কাছে দ্রুত ছড়িয়ে যায়। একটা গল্প যখন একজন পাঠকের মন ছুঁয়ে যায় সে তখন সেই ভালো লাগাটাকে শেয়ার করতে চায় অন্যের সাথে। এই শেয়ারের মধ্যে দিয়ে সেই গল্পের পাঠকের সীমানা বাড়তে থাকে। তাছাড়া বই পাইরেসির বিষয়টা এতো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে পাঠক দেশি বই রেখে ( দাম বেশি হবার কারণে ), পার্শ্ববর্তী দেশের সস্তা পাইরেট বই কিনতে বেশি আগ্রহি।

একটা দেশের শিল্প-সাহিত্যের উন্নয়নের উপর নির্ভর করে সেই দেশের সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন। যদিও সংস্কৃতির সংজ্ঞা বিশাল তবু আলোচনার সুবিধার্থে এখানে শুধুমাত্র শিল্প-সাহিত্যের উপর সীমিত রাখা হয়েছে। একটা উন্নত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে অন্যান্য বিষয়ের সাথে একটা পরিশীলিত সাংস্কৃতিক পরিবেশের বড় প্রয়োজন। আমাদের এখানে যেভাবে সিনেমা, নাটক, গান, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি নির্মিত এবং রচিত হচ্ছে, তা প্রধানত অর্থ  বা টাকা কেন্দ্রীক। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে টাকার প্রশ্নটাও জড়িত থাকে কিন্তু তার অর্থ এই না যে, কোনো রকমে একটা সিনেমা বা নাটক বানিয়ে আমরা শুধু লাভের অংকটার দিকেই তাকিয়ে থাকবো। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে অন্যান্য কাজের এখানেই বিশেষ পার্থক্য। কারণ, শিল্পকর্ম পণ্য হলেও, বানিজ্যিক পণ্য নয়। বানিজ্যিক পণ্য নয় বলেই সে, শারীরিক ক্ষুধা নয় মানসিক ক্ষুধা মেটানোর পথে চলে। মানুষের এই মানসিক ক্ষুধা থেকেই মূলত শিল্পকর্মের উদ্ভব। তা না হলে আমরা গুহা চিত্র পেতাম না, মুখে মুখে গান বা কবিতা রচিত হতোনা। শুধু টাকার দিকে তাকিয়ে যখন শিল্পকর্ম রচিত হয় তখন তা আরেক ধরণের সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলে আর তা হলো “ অর্থ সংস্কৃতি ”। সবকিছু তখন শুধু অর্থ দিয়েই মাপা হয়; যা বর্তমানে হচ্ছে। এই কারণে একটা সিনেমার গল্প বা কাহিনীর চেয়ে তার নির্মাণ খরচ, নায়ক-নায়িকার গ্ল্যামার, সেট, শুটিং স্পট ইত্যাদি বেশি আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। নায়ক বা নায়িকার চরিত্রের চেয়ে তার পোশাক বেশি জরুরী হয়ে উঠে। গায়কির চেয়ে গায়ক বা গায়িকার গানের ঢং (অঙ্গ সঞ্চালন), পোশাক, স্টুডিওর জাঁকজমক ইত্যাদি বেশি জরুরী হয়ে উঠে। অর্থ সংস্কৃতি দিয়ে আর যেটাই গড়ে তোলা যাকনা কেনো, কোনো সুস্থসংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব নয়। এসব তখনই হয়, মানুষ যখন শিল্পের চেয়ে বিশেষ মৌসুম আর টাকাকে মাথায় রেখে কিছু লিখে বা নির্মাণ করে। আমরা যদি এভাবে বিশেষ মৌসুমে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চ্চাকে এইভাবে অব্যহত রাখি, তাহলে তা দিয়ে হয়তো অর্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলা যাবে কিন্তু সুস্থ সংস্কৃতি কোনো ভাবেই নয় এবং মানসিক ক্ষুধা নিবারণ তো নয়ই। শেষে বলবো- শিল্পকর্ম বহমান নদীর মতো বয়ে চলে, কোনো বিশেষ মৌসুমে এসে শেষ হয়ে যায়না।

প্রধানমন্ত্রী কার পক্ষে অবস্থান নেবেন- মন্ত্রী নাকি জনগনের?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে, তারপরেও তিনজন মন্ত্রীর বাণী দিয়ে শুরু করা যাক। মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেছেন, “ক্ষুব্দ চালকরা জেল-জুলুম মাথায় নিয়ে কাজ করতে চায় না”। মন্ত্রী আনিসুল হক ধর্মঘটকে ‘দুঃখজনক’ মনে করে বলেছেন, “জনগনকে কষ্ট না দিয়ে আদালতে বক্তব্য দিন”। এই ধর্মঘট আদালত অবমাননা কিনা, সে প্রশ্নে তিনি মনে করেন এটি আদালতের বিবেচ্য বিষয়। মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, “ধর্মঘট অযৌক্তিক। প্রত্যাহার করা উচিত”।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সত্যি হলে জানবেন, একজন মন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে বসে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সরকার সমর্থক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এর মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্র-জনগনকে জিম্মি করছেন- দোষী সাব্যস্ত হওয়া আদালতে দন্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি মওকুফ করানোর জন্য! এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কি তার মন্ত্রীদের পক্ষে অবস্থান নেবেন, নাকি জনগনের পক্ষে?

সরকারের নৌ-মন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনে’র কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি সরকারের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। গণমাধ্যম জানিয়েছে, যে বৈঠকটি ধর্মঘট আহবানের জন্য মন্ত্রীর সরকারের বাসভবনে অনুষ্টিত হয়েছে সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় খুবই চাতুর্যের সাথে। দায় এড়াতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। কারন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সরকারের কর্তারা।

জনগন জানে না, গণমাধ্যমে দেয়া নৌমন্ত্রীর বক্তব্য আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি-না? নিশ্চয়ই সেটি আদালত বিবেচনায় নেবে। নৌমন্ত্রী বলছেন, “সংক্ষুব্দ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারে। আপনিও করেন, আমিও করি। ঠিক একইভাবে ওরাও (শ্রমিক) ক্ষোভ প্রকাশ করছে। চালকরা মনে করছেন, তারা মৃত্যুদন্ডাদেশ বা যাবজ্জীবন রায় মাথায় নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। তাই তারা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। এটাকে ধর্মঘট নয়, স্বেচ্ছায় অবসর বলা যেতে পারে”।

এটি হচ্ছে সরকারের মন্ত্রীর বক্তব্য। এটি কি তাহলে সরকারের ভেতরের সরকার। তার ভাষায়, ‘স্বেচ্ছা অবসরে’ থাকা শ্রমিকরা দেশজুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে। চড়াও হচ্ছে পুলিশ-র‌্যাবের ওপর। জনগনের কথা তো আসছেই না। তাহলে ধরে নিতে হবে সরকারের মন্ত্রী, সরকার সমর্থক শ্রমিক নেতারা দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবেন? তারা কি বিচারিক আদালতের রায়ও বদলে দেবেন?

নৌমন্ত্রী ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর এহেন আচরনে দুঃখ পেয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গণমাধ্যমকে বলেছেন,“তাদের (তার সহকর্মীরা, নাকি পরিবহন শ্রমিকরা) উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জনগনকে কষ্ট না দিয়ে আপনারা আদালতে এসে আপনাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আপনাদের বক্তব্য যদি যুক্তিসঙ্গত হয়, তবে তা দেখা হবে। যুক্তিসঙ্গত না হলে দেখা হবে না”।

কি সুন্দর বক্তব্য! যিনি এধরনের কাজে সব সময় সিরিয়াস, তিনি কিনা ধর্মঘটের নামে অবরোধ, ধ্বংসযজ্ঞের মত ব্যাপারে এতটাই যুক্তিবাদী! অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার সহকর্মীদের এবং সমর্থক নেতাদের এরকম কর্মকান্ড অযৌক্তিক বলছেন এবং মনে করছেন, ধর্মঘট প্রত্যাহার করা উচিত।

লঞ্চ দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়েরকৃত মামলাগুলির প্রায় কোন অনুসন্ধান বা তদন্ত হয় না। কারন সরকারের কর্তারাই শ্রমিক নেতা এবং অন্যরা সরকারের সক্রিয় সমর্র্থক।  নানা ঘটনা ধামাচাপা দিতে, বিরোধীদলের কর্মসূচি ভেস্তে দিতে ক্ষমতাসীনরা ব্যবহার করা হয়েছে পরিবহন শ্রমিকদের। এজন্যই ক্ষমতাসীনদের আস্কারায় তারা এতই বেপরোয়া যে, ‘দুর্ঘটনা’র নামে মানুষ খুন করে ‘দায়মুক্তি’ দাবি করছে।

গেল ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র তিনদিনে সড়কের মড়কে নিহত ৫৭ জন। জানুয়ারিতে নিহত ৪১৬ জন। সরকারী হিসেব মতে বছরে গড়ে মারা  গেছে আড়াই হাজার। যাত্রী কল্যান সমিতির দাবি- এই সংখ্যা ৮ হাজার। সংখ্যা হয়ে উঠেছে বিবেচ্য। কিন্তু সড়কে চালকের বেপরোয়াত্বের কারনে একজন মানুষও নিহত হলে তার দায় সরকারের। কিন্তু দায় নেয়ার বদলে এখন আদালতের রায় বদলাতে দেশ জুড়ে নামিয়ে আনা হয় ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য!

মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদকে সড়কে যে চালক মেরে ফেলেছিল, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ এবং গাড়িটি ছিল ফিটনেসবিহীন। এর পর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে শিক্ষাগতসহ কিছু যোগ্যতা নির্ধারন করলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে তোলা মন্ত্রীর ক্ষমতাবলয়ের প্রভাব এতটাই যে, পরিবহন সেক্টরে সরকার প্রায় কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আদালতের রায়ের সাথে নাকি জনগনের সম্পর্ক নেই। তিনি কি বলতে চেয়েছেন, ইতিপূর্বে আদালত যে সব যুগান্তকারী রায় দিয়েছে, শাস্তি দিয়েছেন ঘাতকদের তার সাথে জনগন সম্পর্কহীন? কারন মি. কাদের মনে করছেন, “আদালত রায় দিয়েছে, জনগন দেয়নি”। আদালতের দেয়া রায় ও কার্যকর করা জনগনের প্রার্থিত এবং প্রত্যাশিত। সে কারনে এ রায় জনসম্পর্কিত। কিন্ত প্রাক্তন ছাত্রনেতা, রাজনীতিক ওবায়দুল কাদের জানেন, জনগন যখন রায় দেয়, তখন তার পরিনাম কি হয়! ইতিহাসের অজস্র উদাহরন নিশ্চয়ই তাকে স্মরন করিয়ে দিতে হবে না।

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৭ : ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড

আনু মুহাম্মদ ::

২০১৩ সালের শেষের দিকে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এক জোড়া বিশাল নির্মাণ যজ্ঞ এবং তার সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। সড়ক ও সমুদ্র পথ দিয়ে দুটো যোগাযোগ নির্মাণ যজ্ঞ হলো – ‘সিল্ক রোড ইকনমিক বেল্ট’ এবং  ‘টুয়েনটি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোড’। এই দুটোকে একসাথে বলা হয় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড।[i] এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থকরী প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং এই অবকাঠামো সংযোগ উদ্যোগ বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং তার সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পথ নকশা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে চীনের ভেতরে শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা এবং পুঁজি বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত ক্ষমতার। কারও কারও ভাষায় চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের আত্মসম্প্রসারণের তাগিদেরই এটা বহি:প্রকাশ।

সড়কপথে চীন থেকে পাকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইটালি আবার সমুদ্রপথে ইটালী থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ স্পর্শ করে মালাক্কা প্রণালী মালয়েশিয়া হয়ে আবার চীন। সিঙ্গাপুরের   ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে ভারতীয় মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন পর্যন্ত পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হয়ে আরেকটি পথও এই পরিকল্পনার মধ্যে আছে। শ্রীলঙ্কাও এই পথে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রপথের বিভিন্ন বিন্দুতে চীন তাই একাধিক গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজে আগ্রহী। প্রথম দিকে রাশিয়া পরিকল্পনায় আগ্রহী না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বিবাদের পর তারা আগ্রহী হয়েছে।

সাম্প্রতিক কালে চীন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাতেও বড়ধরনের ভূমিকা গ্রহণ শুরু করেছে। ব্রিকস সদস্যদেশগুলো সহ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (এআইআইবি) চীনের প্রায় একক উদ্যোগে এবং পরিচালনায় কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে চেষ্টা করলেও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ এর সদস্য হয়েছে। এছাড়া সিল্ক রোড ফান্ডসহ আরও বেশি কিছু আর্থিক ব্যবস্থার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের মতো সংস্থার একক কর্তৃত্বশালী অবস্থার জন্য পরিষ্কার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীনের এসব উদ্যোগ।

এসব উদ্যোগের সাথে আর্থিক আয়োজন বিশাল। আগের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের ভার বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু চীন এই প্রকল্পগুলো একের পর এক গ্রহণ করে যাচ্ছে। সিল্ক রোডের সাথে যুক্ত বিভিন্ন দেশে চীনের যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এআইআইবি, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সিল্ক রোড তহবিল এবং এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ভার বহনে মূল ভূমিকা চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের। চীনের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘এসব বৃহৎ পুঁজিঘন প্রকল্পগুলো নেবার কারণ হলো চীনের উদ্বৃত্ত আভ্যন্তরীণ সঞ্চয় দেশের ভেতর কম উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করে, অতি উৎপাদন ক্ষমতার অপচয় না করে, তা আরও উৎপাদনশীল কাজে লাগানো। যেহেতু ব্যাংকিং খাতেই চীনের আভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের কেন্দ্রীভবন ঘটে সেহেতু এই ব্যাংক এই দায়িত্ব নিতে সক্ষম।’ [ii]

সিএনবিসি-র একই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘এপর্যন্ত চীনের ব্যাংকগুলো থেকে দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পে যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ১.২ ট্রিলিয়ন (বা ১২০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।’ ঋণের পরিমাণ যেরকম অদৃষ্টপূর্ব হারে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এই ঋণের পরিশোধ নিয়ে অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞই চিন্তিত!

এটা ঠিকই যে, চীনে পুঁজি পুঞ্জিভবন ঘটছে অনেক দ্রুত হারে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তি পুঁজিপতির পাশাপাশি রাষ্ট্রের হাতেও বিপুল বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির সমাবেশ ঘটেছে। এর কারণে পুঁজির চাপ তৈরি হয়েছে অধিকতর মুনাফাযোগ্য বিনিয়োগের। এই বৈশ্বিক সম্প্রসারণের তাগিদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিশ্বের বিদ্যমান ভারসাম্যের সাথে চীনকে বোঝাপড়ায় যেতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে, ভারত নিজের ও মার্কিন তাগিদে চীনের তৎপরতা বিষয়ে সতর্ক। সিল্করোডের বাস্তবায়ন তাই সামনে মসৃণ হবে না। ইতিমধ্যে চীন সাগরে কর্তৃত্ব নিয়ে জাপানসহ কয়েকটি দেশের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে চীন। এরমধ্যে চীনের সামরিক বাজেটও বাড়ানো হয়েছে। এনিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে।


[i]Erebus Wong, Lau Kin Chi, Sit Tsui and Wen Tiejun: One Belt, One Road: China’s Strategy for a New Global Financial Order. Monthly Review, vol 68, issue 08, January 2017.  https://monthlyreview.org/2017/01/01/one-belt-one-road/

[ii]http://www.cnbc.com/2017/01/26/ancient-silk-road-revival-plans-could-be-the-new-risk-to-chinese-banks.html