Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 3)

Author Archives: আমাদের বুধবার

বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

জমো  সানদারাম ও আনিস চৌধুরী ::

আয় ও সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ – উভয় ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই বেড়েছে। বিশ শতকজুড়েই, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মোটা দাগে বৈষম্য ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, এতো ব্যাপক বৈষম্য  মানব ইতিহাসে আর কোনো কালেই ছিল না।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ দখল করে আছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক মাত্র ১২ ভাগ আয়ের অধিকারী। ইউরোপে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ পেয়েছে ১৮ ভাগ, নিচের অর্ধেক পেয়েছে ১৪ ভাগ।

অক্সাফামের ‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৮২ ভাগ চলে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের হাতে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব যারা অর্ধেকে রয়েছে তারা প্রায় ৩.৭ ভাগ মানুষ বলতে গেলে কিছুই পায়নি। ইতিহাসে ২০১৬ সালেই সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি দুদিনে একজন করে বিলিওনিয়ার সৃষ্টি হয় ওই বছরে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বাড়ে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, বৈষম্য বৃদ্ধি যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা ও সমাধান করা না হলে এটি নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

‘দি গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্র্যাসি ২০১৭ : এক্সপ্লোরিং ডেমোক্র্যাসিস রেসিলেন্স’ ধারণা করছে, বৈষম্য গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। বৈষম্যের ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, সামাজিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত করছে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও সমর্থন ধসিয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অগ্রগতির পথে বাধা :

আলেক্সি ডি টকভিল বিশ্বাস করেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে, সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণ সমাজে আয় ও সম্পদের মারাত্মক বিভেদের ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি উন্নতিতে তেমন কিছু করা না হয় বা অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক সাম্যের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ ধনীরা অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব রাখে ও কবস্তার করে,  গরিবরা এই ধরনের সুযোগ পায় না।

আর অমর্ত্য সেনের মতে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গরিবের ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ বা ‘সামর্থ্য’ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। যাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকে, তারা কেবল ইতিবাচক পুনঃবণ্টনেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, সেইসাথে তাদের নিজেদের অনুকূলে বিধিবিধান ও নীতি প্রণয়ন করে নেয়।

রবার্ট পুটনামের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আস্থার’ মতো নাগরিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

যোশেফ স্টিগলিসের মতে, বৈষম্য বাড়লে সামাজিক কাঠামো এবং সংযোগ শিথিল করে দেয়। সবক্ষেত্রে আস্থা হ্রাস, উদাসীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ প্রশ্নে আগ্রহের অভাব ও স্বভাব রুক্ষতা-কটুতা বাড়ায়। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ায়, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়ও নি:শেষ করে, সমাজবিরোধী আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অর্থপূর্ণ গণতন্ত্রের প্রয়োজন সামাজিক বিষয়াদিতে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তভুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মেরুকরণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ফাঁপা করে তোলে, নাগরিক সম্পৃক্ততা হ্রাস করে।

লোকরঞ্জকতা বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ হুমকি সৃষ্টি করে বহুত্ববাদকে। আলেক্সি ডি টকভিলের  কাছে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য গণতন্ত্রের ‘সাম্য’ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে, এমনকি উচ্চ আয়ের সমাজেও তা হতে পারে। ‘ধনবাদী লোকরঞ্জকবাদ বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বশেষ পরিচিতি রাজনীতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে।

জনসমাবেশ আর মিডিয়া ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য ‘অন্যদের’ তথা অভিবাসী ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন লোকদের দায়ী করে। অর্থাৎ ধনিকশ্রেণি  সুযোগ-সুবিধা ও ‘বিভক্ত করে শাসন করার’ চলতি পদ্ধতির ‘অধিকার’ ব্যবহার করে ‘তাদের জনগণকে’ সন্তুষ্ট রাখতে সফল হয় প্রায়ই।

মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে তারা প্রায়ই ধনিকতন্ত্র শাসনকে আড়াল করে রাখে, এমনকি সবচেয়ে জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে অনেক সময় সাফাইয়ের ব্যবস্থাও করে। যেমন নির্বাহী পদে থাকাদের ‘উচ্চ পারিতোষক’, টাইকুনদের উদারভাবে কর হ্রাস, বিনিয়োগ ইনসেনটিভ। আর এসবই করা হয় সামাজিক ব্যয় ও গণপরিষেবার ব্যয় ছাঁটাই করে।

বর্তমানের ‘বিজয়ী সবই নেবে’ বা “winner – take -all” এর মাধ্যমে  অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সফলভাবে লবি করে কর হার কম রাখতে সক্ষম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় থেকে এক শতাংশের হাতেই সর্বোচ্চ মাত্রায় আয় পঞ্জিভূত হচ্ছে।  আর ১৯৮০ সাল থেকে তলানিতে থাকা অর্ধেক আমেরিকান মোট প্রবৃদ্ধির মাত্র ৩ ভাগ অর্জন করতে পারছে। আধুনিক সময়ে এত ব্যবধান আর কখনো দেখা যায়নি।

অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে শীর্ষে থাকা ০.০১ ভাগ তথা ১৪ হাজার আমেরিকান পরিবার মার্কিন সম্পদের ২২.৩ ভাগের মালিক ছিল। আর নিচে থাকা ৯০ ভাগ তথা ১৩৩ মিলিয়ন পরিমার মাত্র ৪ ভাগের মালিকছিল। সবচেয়ে ধনী ১ ভাগ এক প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন আয়ে তাদের অংশ তিনগুণ করতে সক্ষম হয়।

একদিকে আইনগত ও অন্যান্য সংস্কার, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সবই ক্ষমতা বা প্রভাববঞ্চিতদের ভয়াবহ বিপরীত অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্প-আয়ের আমেরিকান পরিবারগুলোর ৭০ ভাগের বেশি আগের বছরের তুলনায়  ফৌজদারি মামলায় বেশী জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের ৮০ ভাগের বেশি পরিবার আইনগত সুবিধাও তেমন পাচ্ছে না।

তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়ায় তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়া ও বাদ পড়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেক আমেরিকান মোহমুক্তি ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে এই তারাই আবার ‘অন্য’ তথা আমদানি ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উগ্র দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতিতে অনেক বেশি সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।

সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের ভোট না দেয়ার ইচ্ছা রয়েছে : রানা দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওই নির্বাচনের আগে-পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ এবং শংকা প্রকাশ করছে। ইতোমধ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের মনোনয়ন না দেয়ার জন্যও ঐক্য পরিষদ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু ঐক্য পরিষদ বলছে, তাদের ওই আহবানে তেমন একটা সাড়া মেলেনি। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মহাসচিব এ্যডভোকেট রানা দাশগুপ্ত আমাদের বুধবার-এর সাথে এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন যে, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের ভোট না দেয়ার ব্যাপারে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইচ্ছা তাদের রয়েছে। সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘আমরা কারো ভোট ব্যাংক নই।’ আমাদের বুধবার-এর পক্ষ থেকে সাক্ষাতকার নিয়েছেন আমীর খসরু

রাজনীতি এবং নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের উত্থান প্রশ্নে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ

যতোই দিন যাচ্ছে রাজনীতি এবং নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ততোই বাড়ছে। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে কিংবা নিয়ন্ত্রণে এখন আর কার্যত নেই। না থেকে তা ক্রমাগতভাবে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে । রাজনীতি এখন ব্যবসায়ী নির্ভর হয়ে পড়েছে। এমনটা জানিয়ে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার  প্রতিবেদনগুলো জানাচ্ছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ছিল মাত্র দশমিক ৫৪ শতাংশ যা এখন ৮০-৮৫ শতাংশের বেশি। এটি সুস্থ ধারার রাজনীতির প্রতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।  নির্বাচন এবং রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রশ্নে সাক্ষাতকারভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছেন বিশিষ্ট নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. তোফায়েল আহমদ। তিনি মনে করেন, রাজনীতি ব্যবসায়ী নির্ভর হয়ে গেলে সৎ, যোগ্য, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গ রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন- যার স্পষ্ট আলামত ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন- আমীর খসরু

নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়ারা

আনু মুহাম্মদ ::

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর পৃথিবীর বহুদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। বছরে বছরে এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চতাই বেড়েছে কেবল। এবারের নির্বাচন নিয়েও তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে নজরদারি, পরিবেশবিধ্বংসী প্রান্তস্থ পুঁজিবাদের বিকাশকালে জনগণের জীবন ও অধিকারের সীমা কেমন হতে পারে, উন্নয়নের নামে মুনাফা ও দখলদারিত্ব বিস্তার কী চেহারা নিতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ নির্বাচন তো বটেই, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। নির্বাচনের প্রতি ক্ষমতাবানদের অনীহা ও ভয় প্রকাশিত হচ্ছে বহুভাবে। এমনকি সামরিক শাসন থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাতেও শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বাচন-সন্ত্রস্ত চেহারা প্রকাশিত।

নির্বাচন বিষয়টি কী রকম পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তার একটি প্রমাণ নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ ও বাস্তব চেহারা। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুনে বড় দলের প্রার্থীরাসহ সবাই হাসে। সবাই জানে যে, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী তাদের বড় অংশ এই আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছে। এর একশ’গুণ খরচও অনেকের কাছে অপ্রতুল মনে হতে পারে। বড় দলের প্রার্থীদের টাকার কোনো অভাব নেই। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্য খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও কম ব্যয়বহুল নয়। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা একটা বিরাট সাধনা ও ধরাধরি শুধু নয়, অনেক টাকারও বিষয়। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক-শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এই অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’ ভদ্রভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহুগুণে ফেরত নিয়ে আসাই এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে, তার কারণগুলোর সারসংক্ষেপ করা যায় নিম্নরূপে:

প্রথমত, দুর্নীতি, লণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথ এর সুবিধাভোগীদের কখনও সুস্থির হতে দেয়নি। একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও  উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সাংসদদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ”এক নেতা এক দল’ নীতি” কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্বসংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে। এখন তার সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ভারত রাষ্ট্র ও সে দেশে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ পুঁজি। ১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী, ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর, বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত ‘নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতাবন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। ‘ক্রসফায়ারে’র মতো পদ্ধতি এই তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে এসব বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চতুর্থত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরও বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সবকিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত যা ‘সেবা খাত’ নামে পরিচিত, তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশন নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বাড়ছে, আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ও পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য; শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব।

পঞ্চমত, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, তত রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুই ধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে।

ষষ্ঠত, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপ-সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী। দেশের নীতিনির্ধারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল, তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবেন কোত্থেকে? শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে?

এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে না; একমাত্র তখনই নির্বাচন প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা। গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী।

মন শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধির নির্বাচন কমিশনের দাওয়াই

আমীর খসরু ::

অনেকেই প্রত্যাশার পারদ উপরে উঠিয়ে এমনটা ধারণা করেছিলেন যে, বিএনপিসহ বিরোধী দল ও পক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে নির্বাচন কমিশনে কর্তাব্যক্তিদের – মন মস্তিষ্ক ও মনোজগতে সামান্য হলেও একটা ঝাকুনি লাগলেও লাগতে পারে। কারো কারো এমনটাও মনে হয়েছিল যে, পুরো নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে জনমনে যে বদ্ধমূল  নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে – তা বদলের চেষ্টায় হলেও তারা অন্তত ‘কিছু একটা করবে’ এবং সেটি হবে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব প্রত্যাশা উল্টিয়ে, ‘যা আগে ছিল তাই পরে রয়ে গেল’। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিটি করপোরেশনের সময়ের মন্তব্যের পথ ধরে একজন নির্বাচন কমিশনার এবার আগে ভাগেই আগামী নির্বাচনটি কেমন হতে পারে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আগাম জানান দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর কোনো দেশে শতভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হয় না, বাংলাদেশেও হবে না’’। (প্রথম আলো- ১৬ নভেম্বর)। এর আগে-পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শোনানো হলো নিয়ম-নীতির নামে নানা নসিহত। নির্বাচন কমিশন সচিব ১১ নভেম্বর স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিলেন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ভোট কেন্দ্রের ছবি তুলতে পারবেন না, সংবাদ মাধ্যমের সাথে নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া, মতামত প্রকাশ, এমনকি আনুষ্ঠানিক কথা পর্যন্ত বলতে পারবেন না। তাদের ‘মূর্তির মতো’ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই ধারায় আরও কয়েক দফা নীতিমালা ঘোষণা করা হলো পর্যবেক্ষকদের জন্য। সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্যও ইতোপূর্বে এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই যেসব নিয়মনীতি ও নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে-তাতে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদেরও সরাসরি ‘মূর্তি’ হতে না বললেও প্রায় ‘মূতির্’ হওয়ার নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এবার চোখ পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপরেও।  নির্বাচন কমিশনের সচিব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যাতে তারা ভাষায় ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য ওই মাধ্যম মনিটর করা হবে। সরকার কথিত ‘প্রোপাগান্ডা’রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে; নানা বিভাগ ও নানা উদ্যোগে এ কাজটি কৌশলে বহুদিন ধরে করা হচ্ছে। সম্ভবত নির্বাচন কমিশন এতেও নিশ্চিত হতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কাকে প্রোপাগান্ডা বলছে ও বলবে। এবং এর মাপকাঠি কি? ইতোমধ্যে কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, কিছুসংখ্যক সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাকে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলে দিয়েছে। তাহলে এই কর্মকর্তারাই কি ঠিক করবেন প্রোপাগান্ডা কোনটি এবং কোনটি প্রোপাগান্ডা নয় ?

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য এবং আমলা সচিবের বক্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা যা বলছেন তা তারা সহি ও সত্য কথা বলছেন বলেই মনে করাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ তারা আগেভাগেই ‘হয়তো’ জানান দিয়ে যাচ্ছেন যে, আগামী নির্বাচনটি তারা কেমন ভাবে করতে চান বা অনুষ্ঠিত হবে। তাদের এই মনোবাসনা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এই কারণে যে, ভোটারসহ দেশবাসী এবং বিদেশীরা আশাহতের বেদনায় যেন ভবিষ্যতে হঠাৎ করে বড় ধরনের নিরাশার মুখোমুখি না হন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন কেমন হতে পারে তার জন্য সাধারণ মানুষের বা আম-ভোটারের মন শক্ত ও কঠিন করার লক্ষ্যে, সহ্যক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে – মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতোই- এক ধরনের দাওয়াই দিয়ে যাচ্ছেন।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। সর্বসাম্প্রতিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তার ব্যাপারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি তালিকা দিয়ে তাদের বদলি করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু এতোদিন নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এক চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ওই কর্মকর্তাদের কোনোক্রমেই বদলি করা উচিত হবে না। এক পক্ষের দিক থেকে চিঠির পর চিঠি যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু এসব অভিযোগের ব্যাপারে কমিশন নিশ্চুপ রয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক্ষেত্রে তারা মতামত জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিটি অভিযোগই খতিয়ে দেখতে হবে’। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে পথে হাটছে না। হাটছে না যে, তার আরও উদাহরণ আছে। রাজধানীর আদাবরে ২জন এবং নরসিংদিতে ২জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে তফসিল ঘোষণার পরে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। যশোর বিএনপির একজন নেতার মরদেহ কয়েকদিন নিখোজ থাকার পরে ঢাকায় নদী থেকে উদ্ধার করা হলো এবং এক্ষেত্রে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক্ষেত্রে বরাবরের মতোই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন বলে তার কর্মসম্পাদন করেছেন। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সমর্থকদের ভিড়কে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী উচ্ছাস হিসেবে দেখেছেন; আবার বিএনপি অফিসের সামনের ভিড়কে তারা দেখেছেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফ করাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো তেমন কোনো আমলেই নিলেন না। শত শত নেতাকর্মীকে তফসিল ঘোষণার পরে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলে দিয়েছেন এই মামলাগুলো তফসিল ঘোষণার পরে হয়নি। তিনি এও বললেন, বিএনপি অনেক মামলার বিস্তারিত নথিপত্রই দিতে পারেনি। পুলিশ সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একই। তিনি জোরের সাথেই বলেছেন, পুলিশ বিনা কারনে কাউকে গ্রেফতার করেনা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব বাদ দিয়ে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের দিকেই পুরো মনোযোগী হয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায় বললেও, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন ইভিএম ব্যবহার থেকে তারা পিছপা হবেন না। যে ব্যবস্থাটির সামান্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হলো না, এমন কি জনসম্মুখে যেসব ত্রু টির কথা বলা হচ্ছে তা যে সঠিক নয়- তা জনসম্মুখে ওই ইভিএম মেশিন ব্যবহার করেই পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী পর্যন্ত না করে ‘অসীম আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে’ ইভিএম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী ভারতেও ইভিএম-এর ত্রু টি যে কতো ভয়াবহ হতে পারে, নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার ক্ষেত্রে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে বিজেপি, কংগ্রেসসহ সবদলের সামনে আম-আদমী পার্টির পক্ষ থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশনের সময়েই একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে দেখানো হয় যে, কিভাবে ইভিএম ব্যবহারে ফলাফল ম্যানিপুলেশন করা যায়।

এতোসব পরিস্থিতির মধ্যেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বাক্যটি হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। এমন প্রত্যাশার আসল অর্থ হচ্ছে এখানে যে, এই পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান নেই। অর্থাৎ এর চরম অনুপস্থিতি রয়েছে। এই চরম অনুপস্থিতির বিষয়টি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনে অনুভূত হয়নি। কারণ ওই নির্বাচনটি ’৯০ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারে সবার জন্য সমান সুযোগের অভাবটি অনুভূত হচ্ছে সব দল ও পক্ষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে। এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, যোগ্যতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হচ্ছে-একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাদের মনেপ্রাণজুড়ে ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি অনুপস্থিত বলেই জনগণ ধারণা করে নেতিবাচক এবং এ কারণে জনমনে শংকা, উদ্বেগ ভীতির সৃষ্টি হয়। এই শংকা, ভীতি ও উদ্বেগ আরও বহু গুণে বেড়ে যায় সরকারের ভূমিকার কারণে।

আর এ কারণেই জনগণ এখন পর্যন্ত আস্থাশীল হতে পারছে না যে, আগামী নির্বাচনটিতে তারা নির্বিঘ্নে, নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এটাই হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এখন পর্যন্ত প্রধান অন্তরায়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এমন পরিস্থিতির নিশ্চয়তা নির্বাচন কমিশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটাই নির্বাচন কমিশনের বড় ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের বড় সাফল্য।

সমতল মাঠ আর পশ্চিমীদের ইভিএম পরিত্যাগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. ২৪ নভেম্বর সিইসি জানালেন, “লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। পুলিশ তাদের কথা মান্য করছে। অকারনে কাউকে গ্রেফতার করছে না”। একইদিন নির্বাচন কমিশন সচিব জানান, ৬টি সংসদীয় আসনে পূর্নাঙ্গভাবেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ আসনগুলি ঠিক করা হবে দৈবচয়ন ভিত্তিতে। কমিশনের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ অনেকগুলি দলের নির্বাচনে সমান সুযোগ এবং ইভিএম ব্যবহার না করার  মূল দাবি উপেক্ষিত হলো। এর ফলে নির্বাচনের আগামী দিনগুলো কেমন যাবে- সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া একটি প্রথা। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর অন্যতম শর্তও বটে। কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বর্তমান রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বর্তমান সংসদ সদস্যরা স্বপদে থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখছে না, আগত নির্বাচনে সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে, প্রয়োগ দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, নির্বাচনকালে সংসদ নিষ্ক্রিয় থাকবে, এর কোন কার্যকারীতা দেখা যাবে না। সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের আকার ছোট করলে উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এসব কথা বলার অর্থই হচ্ছে, নামে নির্বাচনকালীন সরকার হলেও তারা অন্য সময়ের মতই সকল কাজ অব্যাহত রাখবেন,  শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন সরকারের মত রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন না।

সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা তফসিল ঘোষণার পরে থাকবে না- এমনটিও কিন্তু সংবিধানে লেখা নেই। নির্বাচনী আচরন বিধিতেও “সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না”-এমন কোন বিধানও সংযোজন করা হয়নি। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, সংসদ সদস্যদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের বক্তব্য নিছকই রাজনৈতিক। মন্ত্রী বা এমপি পদে থেকে নির্বাচন করবেন, কিন্তু কোন ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না-এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? এমন উদারতা এদেশের রাজনীতি কখনও দেখেছে? সুতরাং মুখে যাই বলা হোক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটি সবচেয়ে বড় বাধা।

পৃথিবীর বহু দেশে ইভিএম ব্যবহার হয়- এটি নির্বাচন কমিশনের যুক্তি এবং তারা সীমিত আকারে ব্যবহার করবেনই এটি এখন বাস্তবতা। মজার বিষয় হচ্ছে, ইউরোপে, জার্মানী, নেদারল্যান্ডস, ইতালী, ফ্রান্সসহ আরো অনেক দেশ ইভিএম ব্যবহার করে না। জার্মানীর সুপ্রীম কোর্ট নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকে ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে আদেশ দিয়েছেন। ইউরোপের বড় দেশগুলো ইভিএম ব্যবহার শুরু করে ‘নির্ভরযোগ্য’ নয় বলে ফিরে গেছে ব্যালটে। মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে ব্যালটে ফিরতে হবে”।

দুই. “পৃথিবীর কোন দেশে ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব হয় না। ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব নয়”-এ বক্তব্য কোন রাজনৈতিক দলের নয়, খোদ নির্বাচন কমিশনের। যদিও তারা শপথ নিয়েছিলেন এবং দায়বদ্ধ শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে এবং সেমত করার জন্য সাংবিধানিক ক্ষমতাও তাদের হাতে ন্যস্ত। যে কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সংবিধান তাদের অপার ক্ষমতা দিয়েছে, সুপ্রীম কোর্টের রায়ও কার্যকর আছে – সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে যা যা দরকার সবই তারা করতে পারবেন। সুতরাং কমিশনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠছে,  ‘নির্বাচনী যুদ্ধ শুরুর আগেই কি তারা পিছু হটছেন’?

“শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন হয় না”- এটি একটি ভুল তথ্য। অনেকের মত নির্বাচন কমিশনেরও জানা আছে, ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচন নিয়ে সামান্য কোন প্রশ্ন উঠে না। সুতরাং সাংবিধানিক পদে থেকে এমন বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করার দায় কিন্তু তাদের। সেটির বদলে বিতর্কিত ইভিএম এর পেছনে কমিশন নিয়োগ করেছেন সর্বশক্তি। এমন অকার্যকর আচরন দৃশ্যমান হয়ে উঠলে তাদের কার্যকারীতা প্রসঙ্গে গোটা নির্বাচনের সময় তো বটেই, নির্বাচনের পরেও প্রশ্ন উঠতে থাকবে।

জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা সম্ভবত: স্থায়ী হতে চলেছে। ধারণাটি হচ্ছে, সব আমলে নির্বাচন কমিশন সরকারের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ইভিএম নিয়ে তাড়াহুড়ো না করা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে সিইসি যেমনটি বলেছিলেন, “সরকার ও সংসদ চাইলে ইভিএম ব্যবহার হবে”। সরকার ও সংসদ যেহেতু এখানে সমার্থক, সেজন্য অন্যান্য দলগুলোর মতামত কমিশন বিবেচনায় নেবেন না। মানে দাঁড়ালো, সরকার চাইলেই কেবল তারা বিবেচনায় নেবেন। আর সংসদ তো কাগজে-কলমে নিষ্ক্রিয় থাকছে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সংবিধান সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রয়োজনে যে কোন আইন-বিধি জারি করার এখতিয়ার রয়েছে কমিশনের। ক্ষমতাসীন দলসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে দিক নির্দেশনা দেয়ার এখতিয়ারও আছে কমিশনের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশনা-এমনকি আকার-ইঙ্গিতেও যথেষ্ট হয়ে ওঠে কমিশনের কাছে। অতীত-বর্তমানের সকল কমিশনের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।

তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ‘উন্নয়ন তত্ত্ব’ ১৪ দলীয় জোটের শরীকদের পুনর্বার ক্ষমতায় আসাকে অনিবার্য করে তুলতে চেয়েছে। তাদের দাবি এই উন্নয়ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আবারও সরকার গঠন করতে হবে। না হলে ধারাবাহিকতা থাকবে না। একথা ২০১৩-১৪-এর প্রতিধ্বনি। সুতরাং যে কোন মূল্যে জয় চাইবে আওয়ামী লীগ। তাদের সংসদ, তাদের সরকার, তাদের প্রশাসন বজায় রেখেই হচ্ছে যে নির্বাচন, সেখানে জয় ছাড়া অন্য কিছু তাদের পক্ষে আশা করা সম্ভব নয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মত ২০০১ সালে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সেমত করেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন খুব কঠিন হবে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা সমীকরন হিসেব করে মহাজোটের আঙ্গিকে নৌকা প্রতীককে সামনে রেখেই নির্বাচন করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে আসুক- এটি তাদের জন্য খুব স্বস্তিকর নয়, সেজন্যই সতর্কতা অনেক বেশি। স্বয়ং শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন।

কারান্তরালে থাকা খালেদা জিয়াও তার দলের নেতাদের যেকোন মূল্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানেন, দোধারী ক্ষুরের ওপর রয়েছেন তিনি, এবারের নির্বাচন তারজন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ! সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে নির্বাচনের মাঠে-অতল খাদের কিনারায় এটি তাদের টিকে থাকার সবশেষ সুযোগ, খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নেতারা সেটি ভালো করেই জানেন। ফলে তাদের জন্য আগত নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, নির্বাচনকালীন সরকারের দেখা নেই, খালেদা জিয়ার মুক্তি নেই- তবুও বিএনপিকে নামতে হচ্ছে নির্বাচনে। এতো ছাড় দিয়ে, দলের অভ্যন্তরের কট্টরপন্থীদের দাবিয়ে রেখে বিএনপি কেন নির্বাচনমুখী? সাদা কথায়- নির্বাচনকেই তারা আন্দোলনের পথ হিসেবে নিয়েছে। এজন্যই নীতি ও পুরানো বৈরীতা ভুলে গিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে গঠন করেছে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। আবার ২০ দলীয় জোটের কাঠামো বজায় রাখছে তারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে এই তত্ত¡ ছিল কোথায়? নির্বাচনকে তখন আন্দোলনের পথ ভাবা হয়নি কেন? প্রতিরোধে সহিংস-রক্তাক্ত পথ বেছে নিতে হলো কেন? রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তত্ত্ব-তালাশ বা মূল্যায়ন কোনটিই বিএনপি আজতক করেনি। গত একযুগে শক্তিমান প্রতিপক্ষের ‘নিশ্চিহ্নকরণ’ চেষ্টার আত্মরক্ষায় রত থেকেছে, কর্ম আর কর্মফলের বিশ্লেষণের সুযোগ পায়নি। সেটিই কি একমাত্র কারণ?

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করতে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এখানে কোন পক্ষই পরাজয় বরণ করতে চায় না। আবার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে আকছার প্রশ্ন উঠছে, তৈরী হচ্ছে নেতিবাচক পারসেপশন। বিবাদমান পক্ষগুলি পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করদে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নির্বাহী বিভাগগুলি প্রজাতন্ত্রের হওয়ার বদলে কতটা দলীয়-সে নিয়েও নানা প্রশ্ন। এখানে রাষ্ট্র কিংবা দল বা প্রতিষ্ঠান-কোথাও গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি।

তারপরেও এই দেশের মানুষের আকাঙ্খা একটি সুন্দর নির্বাচনের, এই জনআকাঙ্খাটি সরকার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা অনুধাবন করলেই মঙ্গল।

সমান সুযোগ প্রাপ্তির জন্য কাকুতি-মিনতি

আমীর খসরু ::

প্রথমেই বিষয়টি স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন যে, মনে-প্রাণে অগণতান্ত্রিক শাসককূল এবং তাদের নানা কিসিমের তাবেদাররা বহু চেষ্টার পরে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এই ধারণাটিকে নিয়ম বা নিয়তি বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, আসলে নির্বাচনই হচ্ছে সামগ্রিক গণতন্ত্র। অর্থাৎ নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় কায়েম ও জারি হয়ে যাবে। সার্বিক ও সামগ্রিক গণতন্ত্রকে বিদায় জানিয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রহীন বা খুবই স্বল্পমাত্রার কথিত গণতান্ত্রিক শাসন- খোদ গণতন্ত্রের জন্য একটি বিশাল সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোটি নড়বড়ে করে ফেলেছে। আর এই নড়বড়ে পরিস্থিতির সুযোগে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কার্যত: অগণতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান হচ্ছে দেশে দেশে। সংকটাপন্ন নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও আরও সংকটময় করে তুলেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রও এখন বিভিন্ন দেশে কার্যত অচল অবস্থার মুখোমুখি।

ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রই কাঠামোগত এবং প্রায়োগিক সংকটকে সঙ্গী করে, বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝের অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রেরও চরম বিপন্ন ও বিপর্যস্তার কাল। এবারের নির্বাচন নিয়ে এখনো জনমনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার যে প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে- তাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কারণ এর ফলে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ বড় মাপে বদলে গেছে। একতরফা নির্বাচনের অথবা নির্বাচনে ভোটারের প্রয়োজন হয় না বলে এই জমিনে যেসব কলংকজনক ঘটনাবলী ঘটেছে ইতোপূর্বে-এটি তার বিপক্ষে এবং বলা যায়, জনগণ যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কামনা করে এটি তারই স্বপক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক হলেও আগামী নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বা রাখার চেষ্টা হচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে নিশ্চিত করার কোনো কারণ ঘটেনি। কারণ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে গেলে ক্ষমতাসীনদের ‘রুটিন ওয়ার্ক বা সরকার পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যতোটুকু না করলেই নয়’, ততোটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়; প্রশাসনের সব বিভাগকে চলতে হবে দলীয় নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক। কিন্তু বাস্তবে তা কি বিদ্যমান রয়েছে? বরং নির্বাচন কমিশনই এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি বা কমিশনও এপর্যন্ত এমত কোন নজীর সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচন কমিশনকে ‘পুরোপুরি নিরপেক্ষ’ নয় বলে আখ্যা দিচ্ছে।

আসলে নির্বাচন কমিশন কতোটা শক্তিশালী, সক্ষমতা ও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে এবং ভবিষ্যতে পারবে তার উপরই সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্ভর করে। কিন্তু যেভাবে গ্রেফতার ও নানা ধরনের মামলা চলছে, ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে একপক্ষের নেতাকর্মীদের মনে এবং সরকার ও কর্তা ব্যক্তিদের ভাষা ও ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ দেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জনআস্থা তৈরি হয় না। এমন একটি আস্থাহীনতার পরিবেশ এখনো পর্যন্ত বজায় থাকলেও সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে, প্রত্যক্ষ করতে চায়, আস্থাশীল হতে ইচ্ছুক যে, সবার জন্য সমান সুযোগ অচিরেই তৈরি হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ বিদ্যমান থাকা গণতন্ত্রে প্রতিদিনের, নিত্যদিনের বিষয় হওয়াই  বাঞ্চনীয় ও প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কয়েকটা দিনের জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি ও প্রাপ্তির জন্য ভিক্ষা চাওয়া, কাকুতি-মিনতি করা- নির্বাচনী গণতন্ত্র তো অবশ্যই খোদ গণতন্ত্রের জন্যও একদিকে যেমন সংকটের তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিশাল দুর্ভাগ্যেরও বিষয়।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’। প্রখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল-এর বিখ্যাত বই ‘‘এ্যনিমেল  ফার্ম’’-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমার নিচের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে.- ‘সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষ সমান; তবে কোন কোন রাজনৈতিক দল ও পক্ষ একটু বেশিভাবেই সমান।’ কারণ দক্ষতা, যোগ্যতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গি, আর এর বিপরীতে যারা তাদের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়- দেখার চোখও আলাদা, মন-মস্তিক এবং মনোজগতও ভিন্ন। আর এখানেই অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে।