Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 30)

Author Archives: আমাদের বুধবার

এশিয়ায় অনিশ্চয়তা আর অস্বস্তি :: চীন-মার্কিন বানিজ্য যুদ্ধ!

ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ ::

অনেক অনেক দিন আগে থেকে আমেরিকান গ্র্যান্ড স্ট্যাটেজি তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং তা থেকে সৃষ্ট সমৃদ্ধি; জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত দৃঢ় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিত্রতা; এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ। আমেরিকার নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এগুলোর কোনোটিকে পরোয়া করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার বিজয়ে এশিয়ায় আমেরিকান শক্তি ও মর্যাদায় বিরাট আঘাত বিবেচিত হচ্ছে।

বাণিজ্য দিয়ে শুরু করা যাক। কয়েক বছর ধরেই ওবামা প্রশাসন সবার জন্য সমান সুযোগ-সংবলিত, স্বচ্ছ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে ১২ জাতি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপকে (টিপিপি) এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। দেশে এটা সহজে গ্রহণযোগ্য হবে না মনে হলেও, ধারণা করা হচ্ছিল রিপাবলিকান প্রাধান্যপূর্ণ কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত এটা পাশ করে দেবে। এখন তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আইনপ্রণেতারা জাতীয় মনোভাবের প্রতি স্পর্শকাতর এবং ট্রাম্পের ভোটাররা আর যা-র জন্যই ভোট দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত এশিয়ার সাথে ওই বাণিজ্য চুক্তির জন্য নয়।

সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ ভাগ কঠিন কর আরোপের কথা ভাবছেন। এ ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভবত আমেরিকাই হবে এর বৃহত্তম শিকার। আর তা এশিয়ায় বিস্তৃত উৎপাদন নেটওয়ার্ক দিয়ে ধেয়ে চাকরি শেষ করে দেবে, আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানবে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের মধ্যে থাকা একমাত্র অর্থনীতিবিদ (বাকিরা আসলে ব্যবসায়ী) পিটার ন্যাভ্যারোর মতে, আমেরিকার উৎপাদন খাতে ধস সৃষ্টির জন্য দায়ী চীন। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাকে তিনি মনে করেন বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। মূলধারার জনমতে এসব দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আলোচিত। তবে যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনে ন্যাভ্যারো বিশেষ গুরুত্ব পাবেন, তাই তার মনোভাবকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেবেন, চীনের সাথে বারাক ওবামার করা জলবায়ু সমঝোতা, যেটাকে সাইনো (চীন) -আমেরিকান সম্পর্কের গুটিকতেক উজ্জ্বল বিন্দুর অন্যতম মনে করা হয়, বাতিল করে দেবেন।

বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রাণবন্ত মহাদেশ হিসেবে এশিয়ার প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিতে বারাক ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ধারণা বিকশিত করে তুলেছিলেন। এটাও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তার জয়ে এশিয়ায় আমেরিকার মিত্ররা বেশ অস্বস্তিতে পড়বে। বারাক ওবামা চেয়েছিলেন চীনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে সংযত করতে। তা না হলে এই দেশটি দূরপাল্লার পরমাণু বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হতে পারে। হিলারি ক্লিনটন সেটা বুঝতেন। আর তা-ই জয় নিশ্চিত মনে করে তিনি এশিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করে ফেলেছিলেন।

ট্রাম্প কিন্তু এসব কিছু বোঝেন না। এসব ব্যাপারে কে তাকে পরামর্শ দেবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনী প্রচারকাজের সময় তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার আশ্বাসে বসে না থেকে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজ নিজ প্রতিরক্ষা খাত জোরদার করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

তার এসব কথার সূত্র ধরে বলা যায়, তিনি এশিয়ার সাথে তেমনভাবে সম্পৃক্ত থাকবেন না। আর সেটাই যদি হয়, তবে তা হবে চীনের জন্য মহাসুযোগ। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, চীন হলো উদীয়মান শক্তি, আর আমেরিকার অবস্থা ভাটার দিকে।

ট্রাম্পের জয় আসলে আমেরিকার দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত  গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য সম্ভবত চীনের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাবে। আমরা এখন কেবল তাকে অবাধে তার কাজ করার সুযোগ দিয়ে তিনি কত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে পারি।’

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫১ : সমৃদ্ধির গতিপথ

আনু মুহাম্মদ ::

পুঁজিমুখি সংস্কারের মধ্য দিয়ে চীন দ্রুত পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার শক্তিশালী অংশীদারে পরিণত হয়েছে গত কয়েক দশকে। চীন যে খুব দ্রুত এবং ধারাবাহিকভাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে সবাইকে বিস্মিত করেছে শুধু তাই নয়, খুব দ্রুত একটি ছোট কিন্তু খুবই সম্পত্তিশালী গোষ্ঠী গড়ে তুলেও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। এই নতুন এলিট গোষ্ঠী চীনে তাইজিদাং (Taizidang) নামে পরিচিত। এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসী চীনা পরিবারের সাথে সম্পর্কিত, অনেকেই বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত, ব্যবসায় বিশেষ আগ্রহী এবং সফল। চীনা পার্টি প্রশাসনের সাথে এরা যে খুবই ঘনিষ্ঠ তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায়, চীনে বিপুল সম্পদশালীদের (মার্কিন ডলারে বিলিয়নেয়ার) সংখ্যা এখন প্রায় ৩০০-তে পৌঁছেছে। ৬ বছর আগে এদের সংখ্যা ছিলো ১৩০।

এই একই প্রক্রিয়ায় চীনে মধ্যবিত্তেরও বিস্তার ঘটেছে, তাদের একটি শক্তিশালী ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। চীনে বিভিন্ন বিলাস সামগ্রীর বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে তাদের ওপর ভর করেই। মাথাপিছু বার্ষিক  আয় ১৭ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি হলে মধ্যবিত্ত বলে বিবেচিত হয়। এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

চীন এখনও নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বলে দাবি করে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থা কি সমাজতান্ত্রিক না পুঁজিবাদী তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সুনির্দিষ্টভাবে এই বিষয় নিয়ে আমরা সামনের পর্বগুলোতে আরও বিশ্লেষণে যাবো। তবে এতোটুকু বলাই যায় এটি নিশ্চিতভাবে নতুন একটি মডেল উপস্থিত করেছে।  চীনা অর্থনীতিকে এখন আর কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি বলা যায় না।  কেননা জিডিপির শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই এখন আসে অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি ও ছোটবড় বিভিন্ন ব্যবসা থেকে। শিক্ষা ও চিকিৎসাও আগের মতো পুরো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বহন করা হয় না। জমির ওপর ব্যক্তি মালিকানা এখনও স্বীকৃত না হলেও দখলীস্বত্ত আছে। তবে সরকারের ভূমিকা এখনও কেন্দ্রীয়। মূলধনী হিসাব, বিনিয়োগ, মালিকানা হস্তান্তর ইত্যাদিতে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আছে। ব্যাংক ঋণ, বিনিয়োগ গতিমুখ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত। নীতিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা চীনে এখনও অনেক বেশি। এর ভিত্তি বস্তুত বিপ্লব-উত্তর চীনেই নির্মিত হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ব্যাপক নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচিতে চীনের সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে চীনকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। ১৯৪৯ সালে যেখানে শিক্ষার হার ছিলো শতকরা মাত্র ২৮ ভাগ, তা দুইদশকের মধ্যে শতকরা ৭০ ছাড়িয়ে যায়। শিক্ষার মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিপ্লব-উত্তর চীনে বিভিন্ন উদ্ভাবনী পথে বিশাল জনগোষ্ঠীর সুস্থ থাকার অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছিলো। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার আগেই মুক্তাঞ্চলে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিকাশ ঘটানো হয়েছিলো। বিপ্লবের পরপরই সারাদেশে সর্বজনের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিলো। যথেষ্টসংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তারের অভাবে নগ্নপদ ডাক্তার, ধাত্রীদের দিয়ে বিরাট বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিলো। চীনের লোকজ চিকিৎসার বিকাশের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয় করে ক্রমে সবার কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। চিকিৎসার আগে রোগের কারণ দূর করায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করায় সামাজিক আন্দোলনসহ ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত পার্টি কমিটি ও কমিউন কাঠামো ছিলো এসব বিষয়ে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম। সবার আগে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়টি তো ছিলোই। বস্তুত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়েই চীনের বিশাল জনসংখ্যার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির গুণগত উন্নতি হয়েছিলো। বাজারমুখি সংস্কার প্রক্রিয়ায় কমিউনের সাথে সাথে এসব সর্বজনকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিও আর কার্যকর নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেককিছুই এখন বাণিজ্যিক তৎপরতার আওতায়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও সেকারণে বেড়েছে। উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির ধরনের কারণে এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পানি ও বায়ুদূষণ।

বাজারমুখি সংস্কারের আগে দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, গোপন অর্থনীতির অস্তিত্ব প্রায় ছিলোই না বলতে গেলে। এমনকি ১৯৮৫ সালেও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবেও চীন ছিলো দুর্নীতির দিক থেকে অনেক নীচে।[1] বাজারমুখি সংস্কারে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়তে থাকার সাথে সাথে দুর্নীতির বিস্তার ঘটলেও খুন, ধর্ষণ, গোপন অর্থনীতির হারে চীন এখনও অনেক নিয়ন্ত্রিত। বিপ্লবের ধারায় গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পার্টি কাঠামো, বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মত ও সিদ্ধান্ত প্রকাশের পাশাপাশি সক্রিয়তার সুযোগ অনেকখানি অব্যাহত রাখায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর আছে এখনও।উন্নয়ন নামের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক এমনকি প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটছে।


[1]Vladimir Popov: Is Chinese Variety of Capitalism Really Unique?  http://www.net workideas.org/featart/ jun2010/ Unique.pdf

 

বিশ্বে ক্ষুধার দেশের তালিকায় ভারতের অবস্থান ৯৭ আর প্রতিরক্ষা খাতে ৬ষ্ঠ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ভারত। অথচ এই দেশটির মানুষই ক্ষুধার অসহনীয় কষ্টে ভুগছে। সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে (জিএইচআই) দেখা যাচ্ছে- তাদের অবস্থান তলানির দিকে, উন্নয়নশীল ১১৮টি দেশের মধ্যে ৯৭। ভারতের চেয়েও বেশি গরিব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকার নাইজার, শা’দ, ইথোপিয়া আর সিয়েরা লিয়ন। আর আছে ভারতের দুই প্রতিবেশী আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। অন্যদিকে, ভারতের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও চীন। জিএইচআই বেশ কয়েকটি সূচক ব্যবহার করে এই হিসাব কষেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অপুষ্টির শিকার জনসংখ্যা, অপুষ্টিজনিত কারণে অনুর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুদের বেটে ও কম ওজনের হওয়া, একই বয়স গ্রুপের শিশু মৃত্যুর হার।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ভারতে ১৫ ভাগ লোক অপুষ্টির শিকার। তারা গুণ ও মান উভয় দিক থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার পাচ্ছে।

এছাড়া কম ওজনের শিশুর হার প্রায় ১৫ ভাগ, খাটো শিশু ৩৯ ভাগ। এতে ভারসাম্যপূর্ণ খাবারের ব্যাপক ও অব্যাহত অভাবের বিষয়টিই ফুটে ওঠেছে। ভারতে ৫ বছর বয়সের আগে শিশুমৃত্যুর হার ৪.৮ ভাগ। এটা দেশটির অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিষয়টিই পরিষ্কার করে দিচ্ছে।

ভারত যদিও শিশু পুষ্টি বাড়ানোর জন্য ৬ বছরের ছেয়ে ছোট শিশুদের জন্য আইসিডিএস এবং স্কুলে দুপুরের খাবার প্রদান করার বিশ্বের বৃহত্তম প্রকল্পটি পরিচালনা করে, কিন্তু তবুও দেশটিতে অপুষ্টির থাবা এখনো বেশ বড়।

এই দুরবস্থার পেছনে রয়েছে নিদারুণ দারিদ্র্য, বেকারত্ব, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির অভাব, কার্যকর স্বাস্থ্য পরিচর্যার অভাব। আগের সময়ের চেয়ে শিশুদের ওজন কম ও খাটো হওয়া রোধে কিছু সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তাতেও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৭ ভাগ থেকে ১৫ ভাগে নেমে আসাটা বড় কিছু নয়। ভারতে বেটে শিশুর হারে অবনতি ঘটেছে। ২০০৮ সালে তাদের অবস্থান ১০২-এ। ২০০০ সালে ছিল ৮৩ নম্বর স্থানে। আসলে অন্যান্য দেশ এ দিকে যত তাড়াতাড়ি উন্নতি করছে, ভারত ততটা পারছে না। এ কারণে র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে ১৫ বছর আগের চেয়ে তারা এখন নিচের সারিতে স্থান পেয়েছে।

এমনকি বাংলাদেশও এ দিক থেকে উন্নতি করেছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশের স্থান ছিল ৩৮.৫ স্কোর করে ৮৪। কিন্তু জিএইচআই-এ ২৭.১ স্কোর করে ৯০ নম্বর স্থানে এসেছে। আর ভারত রয়েছে ৯৭ নম্বরে।

সার্বিকভাবে বিশ্বে ক্ষুধার হার কমেছে ২০০০ সালের তুলনায় ২৯ ভাগ।

ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় :

ক্ষুধার ব্যাপকতাকে পাশ কাটিয়ে ভারত নিজেকে আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তিধর একটি দেশ হিসেবেই দেখতে ভালোবাসে। আর এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকহারে বাড়ানো হচ্ছে। বিশ্বখ্যাত স্টকহোম পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি)-র সাম্প্রতিক এক গবেষণা পত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালেই ভারত ৫ হাজার ১শ ৩০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা খাতে। চলতি বছরে এই ব্যয় আরও কমপক্ষে ৮ শতাংশ বাড়বে বলে সিপরি-র গবেষণা প্রতিবেদনে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে গত মার্চে ভারত সরকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে তাতে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় আগের তুলনায় ৯ দশমিক ৭ ভাগ বাড়ানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা জেনস্ ডিফেন্স-এর গত মার্চে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক দিয়ে ভারত বর্তমানে ৬ষ্ঠ স্থানে রয়েছে। আর দেশটি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের ১০টি শীর্ষ তালিকার দেশের একটি।

(হিন্দুস্তান টাইমসসহ ওয়েবসাইট অবলম্বনে)

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(পঞ্চম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

একথা সত্য যে বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে কয়েকবার ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলনের মতো প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই সকল ঘটনা ব্যাখ্যা করব কিভাবে? একথাও সত্য যে, একই মাটিতে জন্ম নিয়ে একই ভাষায় কথা বলে একই গ্রাম বা শহরে প্রতিবেশী হয়েও হিন্দু ও মুসলমান শতাব্দীর পর শতাব্দী পৃথক থেকেছে। কেন?  হ্যাঁ, একত্রে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। বহুবিধ সামাজিক কাজকর্মে ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে কাজ করেছে। তবু তারা একত্রে খায় না, তাদের মধ্যে বিয়েশাদি হয় না, হিন্দুর রান্নাঘরে মুসলমান যেতে পারে না, গো-মাংস, শূকরের মাংস খাওয়া নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রভেদ আছে। হিন্দু সমাজে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটি প্রবল। এত বৎসর পাশাপাশি বাস করার পরও এই প্রভেদ-খাওয়া ও বিবাহ এই দুই ক্ষেত্রে পার্থক্য ও বাধাটুকু ঘুচল না। কেন? এর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। এটি গভীর গবেষণার বিষয়। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ খুবই প্রণিধানযোগ্য: ‘ভারতবর্ষের এমনি কপাল যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানের মতো দুই জাত একত্র হয়েছে; ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল, আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্মমতে প্রবল। এক পক্ষের যে দিকে দ্বার খোলা, অন্য পক্ষের সেদিকে দ্বার রুদ্ধ। এরা কী করে মিলবে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর।)

হিন্দু মুসলমানের মধ্যকার এই যে বিভাজন (এমনকি গরিবদের মধ্যেও) তাকে কাজে লাগিয়েছিল ইংরেজ শাসকরা। অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজরা হিন্দুদের কাছে টেনে নেয়, বিংশ শতাব্দীতে হিন্দুদের সন্দেহের চোখে দেখে। উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের দূরে রাখা হত, বিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের কাছে টানার চেষ্টা ছিল। বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের কথা আগেই বলেছি। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের জন্য রাখিবন্ধনের চেষ্টা করেন, কিন্তু সে চেষ্টা খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। কেন হয়নি তার কারণটিও রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়েছে। প্রধানত জমিদার ও মহাজন ছিল হিন্দুরা। প্রজারা অধিকাংশ ছিল মুসলমান (পূর্ববঙ্গে-যেখানে কবির জমিদারি ছিল)। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আমি যখন প্রথম জমিদারি কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলুম তখন দেখেছিলুম, কাছারিতে মুসলমান প্রজাকে বসতে দিতে জাজিমের একপ্রান্ত তুলে দিয়ে সেই স্থানে তাকে স্থান দেওয়া হতো।’ (‘হিন্দু-মুসলমান’-কালান্তর।) রবীন্দ্রনাথ অন্যত্র জাজিম তোলার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে দেখিয়েছেন যে হিন্দু-মুসলমানের জন্য পৃথক বসার ব্যবস্থা এবং মুসলমানের জন্য নিম্নতর আসনের ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে বিরাট ফাঁক। ঐক্যের পথে বাধা রয়েছে ‘জাজিম তোলা আসনে বহু দিনের মস্ত ফাকটার মধ্যে।’ (‘স্বামী শ্রদ্ধানন্দ,’ কালান্তর।)

কংগ্রেসেও বর্ণহিন্দুর প্রাধান্য ছিল। গান্ধি খাঁটি হিন্দু হলেও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষ বসু ও জওহরলাল নেহরুও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। মওলানা আজাদ কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। তা সত্ত্বেও কংগ্রেসে মুসলমানরা কিছুটা পেছনের সারিতে ছিল। অনেক হিন্দু কংগ্রেস-নেতার মধ্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রবল ছিল। ভারতবিভক্তি, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে কংগ্রেসের নেতৃত্বের ভূমিকাও বহুলাংশের দায়ী ছিল। ১৯২০ সালে গান্ধি খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে মুসলমানদের সমর্থন আদায় করতে চেয়েছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থাকে। আসলে খিলাফত আন্দোলন কতটা সমর্থনযোগ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সম্রাট পরাজিত হন। তুরস্কের সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল বিভিন্ন জাতি, কয়েকটি আরব রাজ্য। যুদ্ধে বিজয়ী ইংরেজ-ফরাশিরা সেই সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেয়। এতে ভারতের মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল, তারা তুরস্কের খিলাফতের পুনপ্রতিষ্ঠা চেয়েছিল। এর মধ্যে প্যান-ইসলামিক ভাবধারা আছে, যা হল প্রতিক্রিয়াশীল। এইভাবে তুরস্ক সাম্রাজ্যের অধীনস্ত দেশ ও জাতিসমূহের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয় এবং খোদ তুরস্কের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকেও বাতিল করা হয়। পরে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল এবং রাজতন্ত্র বা তথাকথিত খিলাফত অপসারিত হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের কারণে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করেননি। পরবর্তীতে সেই জিন্নাহ্ই বদলে গেলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি-এই প্রতিক্রিয়াশীল দ্বিজাতিতত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবিভক্তি এবং পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি কোন অনিবার্য ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মীয় মৌলবাদ কোনটাই কখনই শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল না। আমার দৃঢ় অভিমত, এখনও নেই। প্রথমেই বলে রাখি, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ এক জিনিস নয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা হল এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি অপর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিদ্বেষমূলক মনোভাব। কখনও কখনও তা সহিংসতায় পর্যবসিত হয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে না, কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ঠিকই ছড়াচ্ছে। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রভাবশালীরা সংখ্যালঘুর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে জায়গাজমি সম্পত্তি দখল করছে। চাকুরির ক্ষেত্রেও আপন লোকজনদের সুবিধা দেওয়ার জন্য দুর্বল জনগোষ্ঠীকে (হতে পারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অথবা সংখ্যালঘু জাতি, আদিবাসী ইত্যাদি) বঞ্চিত করা হয়। এর মধ্যে যত না সাম্প্রদায়িক মনোভাব কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে স্বার্থবুদ্ধি, আর্থিক সুবিধালাভের নোংরা মনোবৃত্তি। এই কারণে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই ধর্ম, ভাষা, জাতি, বর্ণ (গায়ের চামড়ার রং) ইত্যাদির দিক দিয়ে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়।

ধর্মীয় মৌলবাদ এক ধরনের ভাবাদর্শ যা ধর্মের নামে সবরকম পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণাকে লালন করে এবং তা জোরজবরদস্তি করে এবং প্রায়শ সহিংস উপায়ে প্রয়োগ করতে চায়। সব ধর্মের ক্ষেত্রেই দেখা যায় মৌলবাদীরা ফ্যাসিস্ট চরিত্রের হয়, তারা বিজ্ঞানবিরোধী ও নারীবিদ্বেষী। এটা সকল ধর্মীয় মৌলবাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ইউরোপে আলোকপ্রাপ্তির যুগে এবং ফরাশি বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে যাজকশ্রেণী ও চার্চের প্রভাব কমে আসে। তারই প্রতিক্রিয়ায় খ্রিষ্টীয় ধর্মকে কেন্দ্র করে যে আধুনিকতা-বিরোধী জীবনাচরণ সংক্রান্ত মতবাদ জন্ম নেয়, তাকেই ইংরেজিতে বলা হয় ফান্ডামেন্টালিজম বা ‘মৌলবাদ’। অর্থাৎ ধর্মে যেভাবে জীবনাচরণ বর্ণিত আছে, সেইভাবে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে চালিত করতে হবে। তা যদি বর্তমান কালের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে আধুনিকতাকেই বর্জন করতে হবে। অবশ্য ধর্মীয় ব্যাখ্যাটা হবে মৌলবাদের মনমতো।

আমদের দেশে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদের ধ্যানধারণা উনবিংশ শতাব্দীতেই দেখা গিয়েছিল-তার আগে নয়। আর তা রাজনৈতিক সাংগঠনিক রূপ লাভ  করে বিংশ শতাব্দীতে। আবুল আলা মওদুদী ইসলামী মৌলবাদকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক রূপ দেন। জামায়াতে ইসলামী তাঁরই তৈরি। অন্যদিকে ১৯২৫ সালে গঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আর.এস.এস। এটা হিন্দু মৌলবাদীদের সংগঠন। পূর্বে যে ওয়াহাবি ও ফরায়জি আন্দোলনের উল্লেখ করা হয়েছে সেই আন্দোলনের মধ্যেও মৌলবাদী ভাবনা কিছুটা মিলেমিশে ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু সমাজে সংস্কার হয়েছিল ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে। কিন্তু ওয়াহাবি ও ফরায়জি আন্দোলনের মধ্যে ব্রিটিশরাজ ও জমিদার বিরোধী সংগ্রামের দিকটি থাকলেও উভয় আন্দোলনের মধ্যেই ধর্মীয় ও সমাজ-সংস্কারের নামে বহু বছর ধরে চলে আসা লোকসংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করার প্রবণতা ছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল সমাজে। যেমন ওয়াহাবি নেতা তিতুমির প্রচার করেন যে আরবদেশের মুসলমানদের মতো ইসলামী ধরণের নাম রাখতে হবে, সন্তানের জন্য আকিকা করতে হবে, দাড়ি রাখতে হবে, গোফ ছোট করে কাটতে হবে ইত্যাদি, তা না করলে পাপ হবে, আল্লাহ্ শাস্তি দেবেন। তবে তিনি দাবি করেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’ এবং অমুসলমানের সঙ্গে ধর্মীয় ব্যবধানের কারণে অহেতুক বিবাদ করা আল্লাহ্-রসুল পছন্দ করেন না।

ফরায়জি আন্দোলনের প্রভাবে মুসলমানদের মধ্যে পোশাক-পরিচ্ছেদ, সাংস্কৃতিক উৎসব ইত্যাদি বিষয়ে হিন্দুদের থেকে পার্থক্য সৃষ্টি এবং এক অদ্ভূত ধরনের স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। যেমন দাবি করা হয়েছিল ধূতি নাকি হিন্দুদের পোশাক। আগে নবান্নের সময় হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে উৎসব করত, কট্টর মুসলমনাপন্থীরা বলল, এটা হারাম। ঠিক একই জিনিস এখনও দেখা যায়। মৌলবাদীরা বলে, পহেলা বৈশাখের উৎসব করা অনৈসলামিক। তবে এই ধরনের কুপ্রভাব যে স্থায়ী হয়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন দেখি পহেলা বৈশাখের গানের আসরে বোমা নিক্ষেপ ও মানুষ হত্যার পরও বাংলা নববর্ষের গান ও উৎসব বন্ধ করা যায়নি। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পহেলা বৈশাখের উৎসবে অংশগ্রহণ করে। এটা প্রমাণ করে যে মৌলবাদের শিকড় এখানে খুব দুর্বল। এক সময় ফরায়জিদের প্রচারের কারণে গানবাজনা নিষিদ্ধ ছিল, নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাত্রা, গান, সিনেমা কোনটাই বন্ধ হয়নি (সাম্প্রতিক সময়ে মৌলবাদীরা সিনেমা হলেও বোমা নিক্ষেপ করেছিল)। এই সকল ঘটনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, বহু অতীত থেকে আমাদের সমাজ জীবনে যে উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিকবোধ উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসছে, সংকীর্ণ গোঁড়ামিপূর্ণ মতবাদ তাকে পাল্টে দিতে পারেনি। অবশ্য এইখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে,তাহলে পাকিস্তান আন্দোলন সফল হল কিভাবে?

রামপাল প্রকল্প : ইউনেসকোকেও না বলা কার স্বার্থে

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইউনেসকোর উদ্বেগ সংবলিত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের জবাবে সরকারের অবস্থান জানিয়ে সুন্দবরন রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। এই কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। আর রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে বলে ইউনেসকো যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যা বলেছে, তাতে তথ্যগত ভুল রয়েছে।’ এ সংক্রান্ত একটি জবাব গত ১১ অক্টোবর সরকার ইউনেসকোর কাছে প্রদান করে। কিন্তু সরকারের সে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি ইউনেসকো। এই প্রেক্ষিতেই জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ‘‘ইউনেসকো’’ এবং আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অব কনজার্ভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১৬-এর ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে রামপালে সরকারিভাবে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং বেসরকারিভাবে ওরিয়ন কর্তৃক নির্মিত ৫৫৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ অর্থাৎ এর জীববৈচিত্র্যের জন্য ব্যাপক হুমকি হিসাবে উল্লেখ করে। ইউনেসকো এবং আইইউসিএন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করে সুন্দরবন এবং সম্পদের ক্ষতি করবে না এমন যথাযথ স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরিয়ে নিতে সুপারিশ করেছে। এ বিশ্ব ঐতিহ্যের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ প্রতিবেদন জমা দিলে তার ভিত্তিতেই ২০১৭ সালে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিকভাবে ইআইএ নির্মোহভাবে সম্পাদনের নিয়ম রয়েছে। রামপালে সরকার কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ইআইএ আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান (সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল এন্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস -সিআইজিআইএস) কর্তৃক সম্পাদনের ফলে এটি নিরপেক্ষতার মানদনন্ড অর্জন করতে পারেনি, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত থাকার সম্ভাবনা থাকার কারনে। উল্লেখ্য, ১৭৯৭ থেকে ২০০৯ সালে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় আইলা’র সময় পর্যন্ত ৪৭৮ টি মাঝারি ও বড় ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস যেমন, তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সুন্দরবন না থাকলে এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে জাতীয় অর্থনীতিতে কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো তার হিসাব করেনি সিইজিআইএস। এটা পরিস্কার, বিশ্বাবাসীর উদ্বেগকে আমলে না নিয়ে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখলে সুন্দরবনের ধ্বংস অনিবার্য।

উল্লেখ্য, এর আগে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ইউনেসকো’র উদ্বেগ সম্বলিত প্রতিবেদনকে বাস্তবতার সঙ্গে মিল না থাকা বা অসত্য বলে সরকার জাতিসংঘের এই প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, বরং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ১৩ আগষ্ট ২০১৬ বলেন, “বর্তমানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প একটি জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। এ বিতর্কের যৌক্তিক কারণ থাকতেও পারে, আবার নাও পারে। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলে তা আরো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে”। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবিত প্রকল্প বিষয়ে রামসার সচিবালয়ে’র উদ্বেগ-এর প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর এক চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে জানায়,‘‘প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে  রামসার সাইট/এলাকা সুন্দরবনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্রের ওপর সম্ভাব্য বিরুপ প্রভাবের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর উদ্বিগ্ন”। শুধু তাই নয়, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১-এ তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক স্বাক্ষরিত এক পত্রে উল্লেখ করা হয় যে, ‘‘ রামসার সাইট/এলাকা’’ সুন্দরবনেরই অংশ -যার বৈধ বা লিগ্যাল আভিবাবক বন অধিদপ্তর। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং ‘ল্যান্ডস্কেপ জোন’ এ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।” ঐ পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার আহবান জানান। প্রশ্ন হলো কোন কারনে ও কার স্বার্থে ইউনেসকো’র উদ্বেগকে এখন অস্বীকার করা হচ্ছে? আর সরকার যদি মনেই করে থাকে যে, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সুন্দরবন এর কোনো ক্ষতি হবে না- তাহলে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্তে¡ও প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা বাতিল করলো কেন?

সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রটি সর্বাধুনিক আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মাণ করার কথা বলা হলেও ইউনেসকো’র দাবি, ‘‘রামপালে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে না।” বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী কোম্পানি থেকে প্রকাশিত তথ্য, পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন ও দরপত্রের নথি বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রযুক্তি, পরিবেশ সুরক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞরাও স্পষ্ট করে বলেছেন, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৩০ বছর আগের দ্বিতীয় শ্রেণির প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বড় ভূমিকম্প ও বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম নয়। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ রণজিৎ সাহু বলেন, ‘‘সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল জায়গার পাশে এ ধরনের বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কখনো নির্মিত হয়নি। এমনকি ভারতের পরিবেশ অধিদপ্তরের গাইড লাইন অনুসারে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার নিয়ম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মানেনি চুক্তির প্রধান পক্ষ ভারতীয় এনটিপিসি। রামপাল প্রকল্পে কয়লার ছাই বাঁচানোর জন্য পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে ওই ছাই বাজারে বিক্রি করা যায়। খরচ কমাতে ও আয় বাড়াতে নেওয়া এই পুরোনো প্রযুক্তির কারণে প্রকল্প থেকে পারদ নির্গত হওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে, যা সুন্দরবনের পানি ও মাটির সঙ্গে মিশে পুরো বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও বিষাক্ত করে তুলবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজিও ব্যবহার করা হলে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণের পরিমাণ মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব। আর সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি যদি আর্থিকভাবে লাভজনকই হতো বা দূষণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমাতে পারতো তাহলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে এই টেকনোলজি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হলো কেন? তাছাড়া, রামপাল প্রকল্পের সমান অংশীদার ভারতের ইআইএ নোটিফিকেশন ২০০৬ এবং ভারতের বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন, ১৯৭২-এর অধীন সংরক্ষিত ঘোষিত কোন এলাকার ১০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না। এসব বলা হলেও বাংলাদেশে তা  মানা হয়নি; বরং সুন্দরবনের মাত্র ৯ কিলোমিটারের দূরত্বে রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার প্রধান প্রতিষ্ঠান ভারতীয় এনটিপিসি’র কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত ছাই’র দূর্বল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০১০ এবং ২০১১ সালে প্রকল্পের কারিগরি প্রস্তাবের ইআইএ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এপ্রাইজাল কমিটিই শুধু অসন্তোষ প্রকাশ করে। সম্প্রতি ভারতীয় গবেষণা সংস্থা সায়েন্স এন্ড এনভায়রেনমেন্ট সেন্টার (সিএসসি) কর্তৃক ৪৭টি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে দিল্লিতে অবস্থিত এনটিপিসি’র কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সর্বোচ্চ পরিবেশ দূষণকারী কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উল্লেখ্য, গত ২০১৫ এর ১৩ মার্চ ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল তথ্য বিকৃতি/জালিয়াতি এবং প্রতারণার দায়ে কর্ণাটক রাজ্যে এনটিপিসি’র প্রস্তাবিত একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত করে দেয়। ভারতের কর্ণাটক, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও ওড়িশ্যার রাজ্য সরকারগুলো এবং স্থানীয় জনগণের আপত্তির কারণে চারটি বড় ধরনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প ২০১৬-এর  জুনে বাতিল করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইতিমধ্যে ভারতের তামিলনাড়ু–তে ২৫০০ একর জায়গায় ৬৪৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিশ্বের বৃহৎ সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৩ লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রামপালেও একই ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদার পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব।

মোটা চালের দাম বৃদ্ধি : নির্বিকার সরকার, অসহায় মানুষ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

চাল নিয়ে চলছে চক্রান্ত; সিন্ডিকেট চাল মজুদ করছে। পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে। মিলার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী নিজ অবস্থান থেকে অতিমাত্রায় মুনাফার চেষ্টা করছেন। ফলে এক-দুই মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় পাঁচশ’ টাকা। সরু চালের দাম বেড়েছে তিনশ’ টাকা। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুস্থ পরিবারের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বাজারে ছেড়েছে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে সরকারের এ কর্মসূচি খুব বেশি সফল হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ইরি, বোরো এবং আমন মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় চলছে। বাজারে ধানের সরবরাহ কম। এই সুযোগ নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেট। তারা চাল ধরে রাখায় দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন দুস্থ মানুষগুলো। ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে তাদের ২৮ টাকা কেজির মোটা চাল ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দু’মাস আগে ২৮ টাকা কেজি হিসাবে এক মণ চালের দাম ছিল ১১২০ টাকা। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। একইভাবে মানভেদে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি সাত থেকে সাড়ে সাত টাকা। অথচ আড়তে চালের কোনো অভাব নেই। তবুও দাম বাড়ছেই।

দেশে মজুদ খাদ্যশস্যের পরিমাণ ১০ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং ২ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন গম। পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, মাত্র ১২ থেকে ১৫ মিল মালিকের কাছে চালের বাজার জিম্মি হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও তারা চাল নিয়ে কারসাজি করছেন। ইচ্ছেমতো চালের সরবরাহ দিচ্ছেন। তারা মজুদ থেকে বাজারজাত করছেন কম; দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে বাজার স্থির থাকছে না। অজুহাত হিসেবে ব্যবসায়ীরা দোষ চাপাচ্ছেন চলতি মৌসুমে সরকারের অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহের নীতিকে। সরকার বেশি দামে বাজার থেকে ধান কিনছে বলে মিল মালিকরা অভিযোগ করছেন। তাদের মতে সরকারের সংগ্রহ মূল্যের কারণে বাজারে ধানের দাম বেশি। মিল মালিকরা বেশি দামে ধান কিনে কম দামে চাল বিক্রি করতে পারবে না।

জানা গেছে, দেশে ১৭ হাজার হাস্কিং মিল আছে। এসব মিল প্রতি ১৫ দিনে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল তৈরি করতে পারে। কিন্তু ধানের সরবরাহ না পাওয়ায় শত শত মিল চাল উৎপাদন করতে পারেনি। সরকারের পাশাপাশি চালকল মালিকরা যাতে বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিল। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। সরকার এককভাবে ৮৫ ভাগ ধান কেনায় বেসরকারি মিল মালিকরা ধানের সংকটে পড়ে। তারা কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনে চাল করেছেন। এ কারণে দাম বেশি পড়ছে বলে মিল মালিকরা দাবি করেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, দেশে চালের কোনো সংকট নেই। বরং প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন চালের উদ্বৃত্ত থাকছে। চালের যে চাহিদা আছে তার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে। তিনি বলেন, চাহিদা ৩ কোটি ২৮ লাখ টন। এ বছর উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। ফলে বিপুল পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। তিনি স্বীকার করেছেন, দেশীয় কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতেই চাল আমদানির ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। যারা অবৈধভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। কর্তৃপক্ষের নাকের সামনেই দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু তারা কিছুই বলছে না।

খবর মিলছে, উত্তরাঞ্চলে ধানপ্রধান কয়েকটি জেলা থেকে দেশে চাল সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আকস্মিকভাবে দাম বেড়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের চালপ্রধান চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়াসহ আশপাশের জেলাগুলোর মিল মালিকরা বলছেন, সরকারের খাদ্য সংগ্রহ বা খাদ্য ক্রয়নীতির প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। খুচরা ও পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে গত এক মাসে অন্য চালের তুলনায় মোটা চালের দাম আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অসুবিধায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন।

বাজারে রোজার ঈদের পর থেকে মোটা চালের দাম কেজিতে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে মোটা চাল ও চিকন চালের দামের ব্যবধান বর্তমানে খুবই সামান্য। বাজারে চিকন চালের মধ্যে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা পাইকারি ২২শ থেকে ২৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাজিরশাইল (ভাল) ২৩শ টাকা এবং জিরা নাজির ৫০ কেজির বস্তা ২২শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান খাবার ভাত। আর দাম কম হওয়ার কারণে তারা মূলত মোটা চালই কিনে থাকেন। কিন্তু মোটা চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় চিকন চালের কাছাকাছি। মোটা চালের দাম অবিলম্বে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তারা। চালের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে চাল ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারের কিছু নীতির সুযোগ গ্রহণ করে চাতাল ও মিল মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে লাভ কম হওয়ায় তাদের ব্যবসাতেও ক্ষতি হচ্ছে। এবারে মোটা চালের দাম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২২ টাকার চাল ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কেজিপ্রতি এক টাকাও লাভ হচ্ছে না। যারা মোটা চাল কিনতো তারা, অধিকাংশই চিকন চালের সঙ্গে ব্যবধান কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে চিকন চাল কিনছেন। বাজারে চাল কিনতে এসে নিম্নআয়ের মানুষজনকে হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে।

গত রোজার ঈদের পর থেকেই উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশে চালের দাম বাড়তে শুরু করে। ২২ টাকা কেজি দরের মোটা চালের দাম বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের সংগ্রহ নীতির দুর্বলতার কারণেই মোটা চালের দাম বেড়েছে। এছাড়া কৃষকরাও গত কয়েক বছর ক্ষতির শিকার হয়ে মোটা ধান (স্বর্ণা) চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। খবর মিলছে, লাভজনক হওয়ায় সবাই চিকন চালের ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এসব কারণে মোটা চালের সঙ্কট দেখা দেওয়ায় ‘অটোমেটিক’ চালের দাম বেড়ে যায়। সরকারের চাহিদা পূরণে প্রতিটি মিল মালিক এক সাথে মাঠে নামার পর ধানের দাম বেড়ে গেল। পরিস্থিতি এমন হয় যে, চালের দাম বাড়ার পরেও ২ থেকে ৩শ টাকা লোকসান দিয়ে সরকারকে চাল দিতে হয়েছিল। আর এর প্রভাব পড়ে সার্বিক চালের বাজারে। চিকন জাতের চালের দাম আরও কমতে পারে। তবে নভেম্বরে আমন ধান বাজারে আসার আগ পর্যন্ত মোটা জাতের ধান কিংবা চালের দাম খুব একটা কমবে না। অনেক দিন ধরেই গরিবের খাদ্য মোটা চালের দাম বাড়ছে। কৃষকরা সরাসরি অসহায় ভুক্তভোগী হলেও মজুদদাররা ঠিকই মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।

আ’লীগের কাউন্সিল, না তৃতীয় প্রজন্মের অভিষেক?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাতষট্টি বছর বয়সী আওয়ামী লীগ সম্ভবত: ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা সময়টি উপভোগ করছে। গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা-জেলা থেকে কেন্দ্র, সর্বত্রই আওয়ামী লীগ। দেশ জুড়ে ছড়ানো লক্ষ লক্ষ বিলবোর্ডে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনার ছবি ক্রমশ: ছোট হচ্ছে, বড় হচ্ছে নামধারীদের ছবি এবং গুনকীর্তন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সংসদ সদস্যদের হাত ধরে ফুলের মালা দিয়ে ও নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ সহস্রাধিক নেতা-কর্মী এখন আওয়ামী লীগার। একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের ভাষায়, আওয়ামী লীগের ইশারা ছাড়া এখন গাছের পাতাও নড়ে না।

তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এখন একক এই দলের নামে সবকিছু হচ্ছে। মেগা সাইজের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, কুড়ি বিলিয়ন ডলারের ওপরে রিজার্ভ, নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ মাথাপিছু আয় হাজার ডলারের ওপরে-সবকিছুর কৃতিত্ব দাবি করছে দলটি একজনের নামে। তিনি হচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি ধারাবাহিক দুই মেয়াদসহ তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন। প্রথম মেয়াদে অবশ্য বলেছিলেন, বয়স ৫৭ পেরোলে অবসরে যাবেন। সম্ভবত: সেটি ছিল কথার কথা; অবসরে যাওয়া হয়নি। কাজ করছেন পূর্ণোদ্যমে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে আবারও অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। দলীয় প্রধান হিসেবেও তার একটি দুর্লভ বিশ্বরেকর্ড রয়েছে- আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সূদীর্ঘ ৩৬ বছর। এবারের কাউন্সিলেও সভাপতি হবেন, কারণ তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সারাদেশে আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই প্রতিপক্ষবিহীন। বিএনপি দল হিসেবে এতটাই নির্জীব যে, কেন্দ্র ব্যতীত অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। বিএনপি নিজেরা নির্জীব হয়ে পড়েছে ও নির্জীব করাও হয়েছে নানা পন্থায়। জামায়াত-শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং মাঝে মাঝে সহিংস হামলায় অস্তিত্ব জানান দেয়। এজন্য প্রায় প্রতিপক্ষবিহীন রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ নিজেরাই এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ। দেশের এমন কোন ইউনিয়ন, উপজেলা-জেলা নেই যেখানে আওয়ামী লীগের বিভাজন নেই। এখানে কর্মীর বিরুদ্ধে কর্মী, নেতার বিরুদ্ধে নেতা, দলের বিরুদ্ধে দল। যে নেতার যত অর্থ-নানা ধরনের ক্ষমতা- তার দাপট সবচেয়ে বেশি। এই দলীয় বিভাজন কোন আদর্শের নয়; এই বিভাজন-লড়াই সাম্রাজ্য বিস্তারের, ক্ষমতাবলয় সংহত করার, অর্থে-বিত্তে সর্বেসর্বা হওয়ার।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মুসলিম লীগের সামন্ততান্ত্রিক ও জমিদার তোষণের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন এবং একটি গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল তারই উদ্যোগে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভাবনীয় সাফল্য, যা মুসলিম লীগের সামগ্রিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল, তার মূল স্তম্ভ ছিলেন ভাসানী, শেরে-বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী। এখনও ওই নির্বাচন হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নৌকার নির্বাচন হিসেবে ইতিহাসখ্যাত।

শিগগীরই ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। স্বায়ত্ত্বশাসন, বাঙালীর অধিকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নীতির প্রশ্নে এই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং ১৯৫৭ সালে কাগমারীর ঐতিহাসিক সম্মেলনে প্রগতিশীল, উদার ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীদের নিয়ে মাওলানা নতুন দল গঠন করেন। দলের নাম ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। মার্কিনীদের প্রতি অনুরক্ত উর্দুভাষী আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সাথে দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিনতি ছিল এটি।

পাকিস্তানে মার্কিনীদের প্রভাববলয় গড়ে ওঠা, পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো ও সেন্টো চুক্তিতে স্বাক্ষর প্রশ্নে ভাসানী ছিলেন তীব্র বিরোধী এবং অনমনীয়। পরিনামে আওয়ামী লীগে দুটো ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দল গঠনের পেছনে সামন্ততান্ত্রিক, ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক ধারণা পরিত্যাজ্য হয়েছিল। কারণ মাওলানা ভাসানীর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে সবসময়ই সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদী ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন। এই দ্বন্দ্বে  ভাসানীর বিশেষ স্নেহভাজন শেখ মুজিব অবস্থান নেন সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত নেতা হিসেবে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।

ভাসানীর অত্যন্ত স্নেহভাজন সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য শেখ মুজিব থেকে যান আওয়ামী লীগে। এর পরের ইতিহাস, বিশেষ করে প্রাক মুক্তিযুদ্ধ পর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের যে কোন নির্মোহ বিশ্লেষণে উঠে আসবে ষাটের দশকে পশ্চিমমুখীনতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক হিসেবে জনগনের ইচ্ছের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এ সময়কালে স্বায়ত্ত্বশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনগুলিতে আওয়ামী লীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে জনগনের মুক্তির আকাঙ্খা ধারন করতে সমর্থ হয়। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা ঘোষণা করেণ এবং অচিরেই এটি বাঙালীর মুক্তি সনদে পরিনত হয়ে ওঠে। যদিও এর আগে তৎকালীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ব্যপক সমর্থন পায় এবং ৬ দফাসহ ওই সময়ের নানা ঘটনার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পরিনামে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দলটি পূর্ব বাংলায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনই ছিল বাঙালীর মুক্তি আন্দোলনের নির্ধারক, যা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিনত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিকতা মনে করিয়ে দেবার কারন, পাকিস্তানী সামরিক স্বৈরাচার ও শোষন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাতিগত ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানে আওয়ামী লীগের সাফল্যের মূলে ছিল, জনগনের অকুন্ঠ সমর্থন। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ জনগনের এই ইচ্ছাকে ধারন করতে তো পারেইনি বরং উল্টো যাত্রায় সামিল হয়েছিল স্বাধীনতার পরেই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরন হচ্ছে, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর দলটি উদার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় চতুর্থ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটি মুছে ফেলেছিল।

ফলে দলের মধ্যের ষড়যন্ত্রকারী নেতৃবৃন্দ ও কতিপয় বেসামরিক-সামরিক আমলার সম্মিলনে ’৭৫-এর বর্বরতম ট্রাজেডি সংঘটিত হয়। ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষকরা মনে করেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বাসনায় সুষ্ট জনবিচ্ছিন্নতা ট্রাজেডির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, যা সাধারন মানুষের কাম্য ছিল না। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম ধারক এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল ঐতিহাসিকভাবে গণতন্ত্র বিচ্যুতির দায় পরিশোধ করেছিল নির্মম ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে। পরিনামে নির্বাক-নিথর জনগন সাক্ষী হয়ে থাকে ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় ক্যু-পাল্টা ক্যু, অজস্র রক্তপাতের। গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্খায় পৃথিবীর কোন জাতিকে এত রক্ত দিতে হয়েছে- ইতিহাসে এরকম নজির বোধকরি আর নেই।

এই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পরিনাম ছিল সূদুরপ্রসারী। এ সময়েই রাজনীতিকদের হাত থেকে রাজনীতি বেরিয়ে যেতে থাকে। সামরিক আমলাতন্ত্র বেসামরিক আমলাতন্ত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আওয়ামী লীগ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। ১৯৬৬ সালে প্রায় সকল জেলে আটক থাকাকালে আমেনা বেগম আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন, যেমনটি ’৭৫ পরবর্তীকালে ধরেছিলেন জোহরা তাজউদ্দিন। কিন্তু অচিরেই দল দ্বিধাবিভক্তির পাশাপাশি অনেক উপদলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসা হয় আসন্ন দলীয় বিপর্যয় রোধ করার জন্য।

১৯৮১ থেকে ২০০৮ এর নির্বাচন পর্যন্ত একটি কালপর্ব ধরলে দেখা যাবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৮৩-৯০ পর্বে প্রথমে সামরিক শাসনকে স্বাগত জানিয়েছে, যেমনটি জানিয়েছিল ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। বিএনপি ও বাম দলগুলোর সাথে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, আবার ১৯৮৬’র নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। এরশাদের পতনের পরে সংসদীয় পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। তত্ত্বাবধায়ক  সরকার প্রতিষ্ঠায় জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। এ সময়েই এরশাদের সাথে যে সমঝোতা হয়েছিল পরবর্তীকালে সেটি অংশীদারীত্বে পরিনত হয়েছে।

১৯৯৬ সালে আওযামী লীগ ক্ষমতায় এসে কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল বাতিল করে শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন করেছিল। ফলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাটি নষ্ট হয়ে যায় দলীয়করণ ও কুক্ষিগত করার কারণে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে স্থুল কারচুপির অভিযোগ আনেন শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের মত সংসদ বর্জনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। সুতরাং দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ পর্ব অতিক্রম করলেও দেশের রাজনীতিতে সুস্থ গণতান্ত্রিক বাত্যাবরন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেননি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হয় তিন-চতর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। সম্ভবত: এই বিজয় দলটিকে পুনরায় স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ফলে  তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মত একটি পরীক্ষিত বিষয়কে সংস্কার না করে জনগনের অভিপ্রায়ের বিপক্ষে বাতিল করে দেয়া হয়। এর সূদুুরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল একটি একক নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কারণ সিটি নির্বাচনে শেখ হাসিনা মেসেজটি পান যে, প্রচলিত ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশ নেয় তাহলে ফলাফল কি হতে পারে! রাজনীতির কূটচালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে।

২০০৯ থেকে ২০১৬। অনুকল এক রাজনৈতিক পরিবেশে গনতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রতিকূলে প্রবাহিত করার ঐতিহাসিক দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। সরকার তার নিজস্ব দল ও রাজনৈতিক শক্তির ওপরে নির্ভর করার বদলে প্রশাসন, পুলিশ ও দমননীতি নির্ভর হয়ে পড়ে। এ কারণে জনসমর্থন নয় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নীল নকশাটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পালে আরো বাতাস লাগে প্রায় কোন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকায়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এসময় একক ও কর্তৃত্ববাদী সবকিছৃ নিয়ন্ত্রণের আগ্রাসী সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবারতন্ত্রকে গ্রহনযোগ্য মনে না করা হলেও বাংলাদেশে প্রধান দল দুটিতে এটি জেঁকে বসেছে। বিএনপিকে যেমন ‘মায়ে-পুতে’র দল বলা হয় আগামী কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগও সেই ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সজিব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, রেজওয়ান এরা কাউন্সিলর হয়েছেন। বলা যেতে পারে, এবারের কাউন্সিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আনুষ্ঠানিক অভিষেকের এবং রাজনীতিতে জয় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন, সন্দেহ নেই। তরুন তুর্কীরা দলে জয়ের নেতৃত্ব চাচ্ছেন, শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য এবং ক্ষমতাবলয়ে অবস্থান দৃঢ় করতে।

‘‘উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে দুর্বার, এখন সময় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার”-আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের মূল শ্লোগান এটি। এরকম একটি শ্লোগান চমৎকৃত করতে পারে বা কসমেটিক উন্নয়নের সাফল্যগাথা আরো উজ্জীবিত করতে পারে, কিন্তু এর অন্ত:সারশূন্যতা অন্য জায়গায়। এই দেশের উন্নয়ন ভাবনায় ভীমরতি ঢুকেছে, যে কোন উপায়ে হীনপন্থা অবলম্বনে উন্নয়ন সাফল্য প্রচার করা হচ্ছে। অবকাঠামো, শিক্ষাক্ষেত্র, পরিবেশ- কোনকিছুই বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না উন্নয়ন সাফল্য প্রচারে।

যে কোন টেকসই উন্নয়নের সারকথা হচ্ছে, সুনীতি-সুশাসনের ভিত্তিতে পরিকল্পিত চেষ্টা। যে উন্নয়নের পেছনে সুনীতি-সুশাসন নেই, গায়ের জোরে উন্নয়ন চাপিয়ে দেয়া হয়, তার ভেতরে থাকে গলদ, দুর্নীতি আর ক্ষণস্থায়িত্ব। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উন্নয়ন মানুষকে কতটা ঝুঁকি ও বিপদে ঠেলে দেয়, আইয়ুব-এরশাদের কথিত উন্নয়ন ফল তার প্রমান রেখেছে অনেককাল আগে। মূলত: মানুষের অধিকার ও আকাঙ্খাকে দমিত রাখার জন্য এরকম চটকদার শ্লোগান সামনে নিয়ে আসা হয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের এবারের কাউন্সিল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে কথিত উন্নয়ন ভাবনায় আবর্তিত হবে-সে বিষয়ে সন্দেহ থাকছে না।