Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 4)

Author Archives: আমাদের বুধবার

নির্বাচন : রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

অর্ধদশকের বড়মাত্রার অগনতান্ত্রিক শাসনেরও বোধ করি ক্লান্তি আছে। সেজন্যই কী প্রাক-নির্বাচনকালে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ নেতৃত্ব একটু-আধটু গণতান্ত্রিক বাত্যাবরণ চাচ্ছিলেন? অন্তত:পক্ষে দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এটি জানান দেয়া যে, তারা আলোচনা করেছেন বিরোধীপক্ষের সাথে, হোক না তা নিঃস্ফল। কিন্তু সূচনা হিসেবে এটি একেবারে মন্দ নয়। এর মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও বোঝানো যাচ্ছে, সবকিছু একতরফা হচ্ছেনা !

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপ চেয়ে চিঠি পাঠানোর পরে সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া এই বার্তা দেয় যে, সরকার বরফ ভাঙ্গতে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আরো অনেকগুলি দল এবং জোটকে গণভবনে সংলাপের আমন্ত্রন জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘সংলাপ’ চলতে থাকে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ এবং ক্ষমতার অংশীদার তার দলের সাথেও সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে যায়।

সংলাপ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল ছিল অনেকটাই নির্ভার। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে জেলে এবং নির্বাচনে তার অংশগ্রহন নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। ভাইস চেয়ারপারসন তারেক রহমান যাবজ্জীবন দন্ডিত, লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে, নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন না। সুতরাং শর্তহীন আলোচনায় ঐক্যফ্রন্ট উত্থাপিত সাতদফার একটি দাবিও না মেনে পরপর দু’দফায় সংলাপ শেষ করে ক্ষমতাসীনরা এক ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্ত্ইি বাগালেন বটে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রশ্ন অনেকগুলো। নির্বাচন কী যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে? ইতিমধ্যে সাত দিন পিছিয়েছে। পুণ:তফসিল ঘোষিত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের দাবি আরো তিন সপ্তাহ পেছানোর। আওয়ামী লীগও জানিয়ে দেয়, নির্বাচন আর পেছানো যাবেনা। একদিনও নয়, এক ঘন্টাও নয়। নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট জানিয়েছে, তারিখ পেছানো হবেনা।

তারপরেও কী নির্বাচন কাঙ্খিত মান অর্জনে সক্ষম হবে? জনতুষ্টিরওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিশন কতটা অনড় থাকতে পারবে, সকল চাপ-তাপ উপেক্ষা করে? আপাতত: এর উত্তর হচ্ছে, না। সে পরীক্ষার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, সিটি-কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ফলে তফসিল ঘোষণার পরেও আশঙ্কা বাড়ছে। মামলাসহ, প্রতিপক্ষ দমন প্রবৃত্তির অব্যাহত ধারা দেখে।

গত কয়েক দশক ধরেই রাষ্ট্র-সমাজ বিভাজিত। প্রতিহিংসা পরায়নতায় যে অবস্থান সমাজে তৈরী হয়েছে, তার পরিনতি দেখি নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হওয়ার পরে। কি ভয়ঙ্কর তান্ডব নেমে আসে জনগোষ্ঠির ওপর, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী- সমর্থকদের ওপর- তা বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করছে ২০০১ সাল থেকে। এ কারনে একটি চমৎকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর ভয় কিংবা ক্ষমতায় না যেতে পারার আক্ষেপ!

ক্ষমতাসীনদের একটি হিসেবে বোধ করি গরমিল হয়ে গেছে! তারা ধরে নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেকের বিষয় সুরাহা না করে বিএনপি নির্বাচনে আসছে না। তারা এও সম্ভবত আশা করেছিলেন, এবার নির্বাচনে না এলে বিএনপিতে ভাঙ্গন দেখা দেবে এবং নেতা-কর্মীদের ভাগিয়ে আনা যাবে। বাস্তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়া এবং এর বড়  শরীক হিসেবে বিএনপি’র নির্বাচনে আসা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার ঘোষণা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী কৌশল পাল্টে দিয়েছে। তারা আবারও মহাজোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, ক্ষমতা ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে।

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনী পরিবেশ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না করেই, এমনকি সাত দফার প্রায় কোন দফা না মানার পরেও নির্বাচনে যেতে হচ্ছে বিএনপিকে। কারন, এই মূহুর্তে তাদের আর কোন বিকল্প নেই। একটি নির্বাচনমুখী দল হিসেবে এখন তারা যে ট্রাকে রয়েছে, তার বাইরে তাদের কর্মী সমর্থকদের আবেগকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। নির্বাচন ও আন্দোলন-এই দুইফ্রন্ট খোলা রাখার ঝুঁকি বিএনপিকে নিতেই হচ্ছে। যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ২০১৩-১৪ সালে, সেখান থেকে বেরোনোর এটিই তাদের সর্বশেষ সুযোগ।

যে কোন জাতীয় নির্বাচন আসলে নাম সর্বস্ব ক্ষুদ্র দল, গোষ্ঠি ও ব্যক্তিদের তৎপরতা শুরু হয়। ধর্মকেন্দ্রিক দলগুলোর সক্রিয়তাও হয়ে ওঠে লক্ষ্যণীয়। বড় দলগুলো নানা লোভ- টোপ ফেলে তাদের সাথে জোটবদ্ধ হয় অথবা সরাসরি দলে টেনে নেয়। এক্ষেত্রে এরশাদেও অবস্থান সবচেয়ে সুবিধাজনক। রাজনীতির মল্লযুদ্ধে বড় দুই দলের অবস্থান দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি, আবারও ফিরেছেন মহাজোটে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত হয়েও তিনি ও তার দল ছিলেন ক্ষমতার অংশীদার, আবার সংসদের বিরোধী দলও বটে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শক্তি বিএনপি। আবার বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে ২০ দলীয় জোট। বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা দুইভাগে ভাগ হওয়ার পর তারা সরকারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখিয়ে আছে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গ পাবার জন্য। এক্ষেত্রে বিএনপির পুরানো সঙ্গী জামাতের সাথে ক্ষমতাসীনদেও সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের সমর্থন আওয়ামী লীগের দিকে। নির্বাচন যতই নিকটবর্তী হবে রাজনৈতিক খেলাধুলাএবং ভাঙ্গা-গড়া বাড়বে। ধর্মীয় দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানও এই খেলায় সক্রিয় থাকবে।

বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সরকারী জোটের অংশীজন এবং ক্ষমতার ভাগীদার। গত দশ বছরে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। তাদের এখন মহাজোটে থাকা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখলেও বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। ভোটের ফলাফল যাই হোক, রাজনীতির মাঠে ছোট হলেও বাম দলগুলোর ভিন্ন ইমেজ রয়েছে। বড় দলগুলি তা পূঁজি করতে চাইবে। সুতরাং ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় বাম দলগুলি সামিল হবেনা, এমনটি আপাতত জানান হয়েছে।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সামরিক শাসকদের কথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের আবহে শুরু হয়েছিল দল ভাঙ্গা-গড়ার খেলা’। এই ভাঙ্গা-গড়ার প্রভাব একসময় বড় রাজনৈতিক দলগুলিতেও চাপ তৈরী করে। নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত এই দেশের রাজনীতি এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলা প্রত্যক্ষ করেছে। সে সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয়। বাম ঘরানার দলগুলির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। তাদের অহরহ ভাঙ্গন দলের বদলে ‘ওয়ানম্যান শো’ তৈরী করে আসছে।

গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা এই দেশে সাতচল্লিশ বছরেও কোন রূপ পরিগ্রহ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিকতার চর্চা দাঁড়ায়নি। ব্যক্তি বা একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল দল বা বিবদমান পক্ষগুলি যে যার মত জিততে চাইবে। নির্বাচনে যেই জিতুক, প্রশ্ন হচ্ছে, এ রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে? নাকি আবারও একক কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিগঢ়ে বাঁধা পড়বে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এখানে এখন এ সকল সংকট ও সম্ভাবনা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সকল দলকে একীভূত করার একটি রাজনৈতিক চেষ্টা হয়েছিল। শেষাবধি তা রক্তাক্ত পরিনতির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষণটি রেখে গিয়েছিল। কিন্তু শাসকশ্রেনী ইতিহাসের অমূল্য শিক্ষণগুলি কখনই মেনে নিতে চায়না। দার্শনিক হেগেলকে উদ্ধৃত্ত করে কার্ল মার্কস সেজন্যই বলতেন, “ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি ঘটে, প্রথমটি যদি হয় ট্রাজেডি, তাহলে পরেরটি অবশ্যই কমেডি। আর প্রথমটি কমেডি হলে পরেরটি অবশ্যই ট্রাজেডি’’।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-২ : ধনিক শ্রেণী গঠন : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

আনু মুহাম্মদ ::

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে (ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮) ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছে অর্থাৎ বিশ্বে ধনিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ধনী ব্যক্তি বলতে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের বোঝানো হয়েছে।[1]

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশ প্রক্রিয়ায় ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই গঠনের প্রথম পর্বে ছিলো লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানী, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সাথে যোগ হয় ব্যাংক ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপীও বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা ও সরকারি ক্ষমতার মধ্যে যোগাযোগ ও চুক্তির নতুন বিন্যাস ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণীর উপস্থিতি যতো স্পষ্ট হতে থাকে ততো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় যাবার হার বাড়তে থাকে, আবার এই হস্তান্তরে ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ৮০ দশকের শুরুতেই ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক এর যাত্রা শুরু হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ খেলাপীদেরই নতুন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে। দেখা যায়, একজন যতো পরিমাণ ঋণ খেলাফী তার একাংশ দিয়েই তারা নতুন ব্যাংক খুলে বসে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে নামে বেনামে ঋণ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, লেনদেন ব্যবস্থা সম্পদ কেন্দ্রীভবনের একটি কার্যকর পথ হিসেবে দাঁড়াতে থাকে।

বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝাতে আমি ৮০ দশকের শুরুতে ‘লুম্পেন কোটিপতি’ পদ ব্যবহার করি। লুম্পেন কোটিপতি বলতে আমি বুঝিয়েছি এমন একটি শ্রেণী যারা নিজেদের বিত্ত অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল পথের চাইতে দ্রুত মুনাফা অর্জনে অন্যান্য সহজ ও চোরাই পথ গ্রহণে বেশি আগ্রহী থাকে, এগুলোর মধ্যে চোরাচালানি, মাদক ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ লোপাট, জবরদখল, জালিয়াতি ইত্যাদি অন্যতম। এরজন্য সব অপরাধের পথ তারা গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়।[2]

বাংলাদেশে ৮০ দশক ছিলো নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি সংহত করবার জন্য খুবই সুবর্ণ-সময়। একদিকে তখন বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র অধীনে সংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও থিংকট্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার মূল পথপ্রদর্শক ছিলো বরাবরই। বর্তমান বাংলাদেশেও তাদের মতাদর্শই উন্নয়ন পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করছে।[3]

যাইহোক, ৮০ দশক থেকেই  ক্ষমতাবানদের সাথে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিরা রাতারাতি তখন অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়, এরজন্য তাদের উদারভাবে ব্যাংক ঋণও দেওয়া হয়। [4] এটা সম্ভব হয় ক্ষমতার সাথে একটা অংশীদারীত্বের চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করবার কারণে। রাষ্ট্র-ব্যবসা-ধর্ম-লুন্ঠনের এরকম প্যাকেজ বাংলাদেশে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। দুর্নীতি-লুন্ঠন-ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যে ভিত্তি তখন নির্মিত হয় তা দিনে দিনে আরও শক্ত হয়েছে। কেননা সেইসময় বিন্যস্ত শাসন-দুর্নীতির পথেই পরবর্তী সরকারগুলোও অগ্রসর হয়েছে। তাই একদিকে দুর্নীতির শত হাতপা বিস্তার এবং অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতায় কেন্দ্রীভবন দুটোই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সেই হিসেবে ৮০ দশকের দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী শাসককে পরবর্তী শাসকদের গুরু হিসেবে উল্লেখ করা চলে। পরবর্তী সময়ের শাসকেরা বহুভাবে তাঁকে অনুসরণ করে লুন্ঠন দুর্নীতি ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের ক্ষেত্রে পরিমাণগত দিক থেকে ধাপে ধাপে বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

গত এক দশকে আমরা প্রবেশ করেছি পুঁজি সংবর্ধনের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংক ঋণের মধ্যে সম্পদ লুন্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্খা এবং সুযোগ দুটোই এখন অনেক বেশি। তাই পুরো ব্যাংক, ভবন, সেতু, সড়ক খেয়ে ফেলাই এখনকার সফল প্রজেক্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তার বাইরে নয়। শেয়ার বাজারও একটি লোভনীয় ক্ষেত্র। এটা প্রমাণিত যে, প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় সমর্থন বা অংশীদারীত্ব ছাড়া কোনো বড় দুর্নীতি ঘটতে বা তা বিচারের উর্ধ্বে থাকতে পারে না। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধ্বস হয়েছে। এর পেছনে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছিলো খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ফরাসউদ্দীন। কিন্তু দুটো তদন্ত কমিটির ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে অভিন্ন। পুরো রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়নি। মূল দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তারা ক্ষমতার ছড়ি নিয়ে আরও নতুন নতুন অপরাধের কাহিনী তৈরি করছেন।

শুধু ব্যাংক বা শেয়ার বাজার নয়, সর্বজনের (পাবলিক) সব সম্পদই এখন অসীম ক্ষুধায় কাতর এই শ্রেণীর লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি-নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা অনিয়মের রাস্তা তৈরিসহ পুরো দেশই এখন ভোগ্যবস্তু। আগেই বলেছি, পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিলো নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা  বা অংশীদারীত্বের ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশি-বিদেশি কর্পোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সাথে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়। উচ্ছিষ্টভোজী সমর্থক হিসেবে এমবেডেড বুদ্ধিজীবীর আয়তন বিস্তৃত হয়েছে গত এক দশকে। লুম্পেন শ্রেণীর সকল অংশের একটি বৈশিষ্ট অভিন্ন: এই দেশে সম্পদ আত্মসাৎ আর অন্য দেশে ভবিষ্যৎ তৈরি। সুতরাং শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, নদী, বায়ু, পরিবেশ বিপর্যস্ত করে এই দেশকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এই শ্রেণী যেভাবে সংহত হয়েছে তার সাথে রাজনীতির নির্দিষ্ট ধরনের বিকাশও সম্পর্কিত। নানা চোরাই পথে কোটি-কোটিপতি হবার চেষ্টা যারা করে তাদের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও অর্থবরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিদ্যাচর্চা-সংস্কৃতিচর্চা বিপদজনক। তাই এই গোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতা কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা, যাদের সাথে সহজেই সমঝোতা, অংশীদারীত্ব, চুক্তি করা সম্ভব। তাদের অংশীদার বানিয়ে তরতর করে বিত্তের সিঁড়ি অতিক্রম করা সহজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যতো অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক হবে ততো তাদের সুবিধা। তাদের জন্য তাই একই সাথে দরকার একটি নিপীড়ন মূলক শাসন ব্যবস্থা, স্বৈরতন্ত্রী আবহাওয়া যেখানে ভিন্নমত ও স্বাধীন চর্চার ওপর চড়াও হবার জন্য নানা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বা বিচার ব্যবস্থার আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

যেসব খাত এগিয়ে :

সরকার যেসব বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, নিচ্ছে তার আকার ও বরাদ্দ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দের কোন উর্ধ্বসীমা নেই, এর যৌক্তিক বিন্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা নেই, যৌক্তিকতা বিচারের কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও আর কার্যকর নেই। তার ফলে এগুলোর ব্যয় অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ২/৩ গুণ এমনকি ১০ গুণ বেশি হলেও তার জবাবদিহিতার কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং সরকারি অনুমোদন নিয়েই এগুলোর ব্যয় শনৈ শনৈ বেড়ে যাচ্ছে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সড়ক মহাসড়ক ফ্লাইওভার রেলপথ সেতু সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোনোদেশেই এতো ব্যয় হয় না।[5] এর পেছনে উর্ধ্বমুখি কমিশন এবং ঋণদাতা সংস্থা বা সরকার প্রভাবিত ঠিকাদার নিয়োগ অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়। গত ৬ বছরে এই অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধিতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন নির্মাণখাত সবচাইতে বর্ধনশীল। ইটভাটা অসংখ্য, বৈধ যত তার চাইতে অবৈধ সংখ্যা বেশি। সিমেন্ট কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শীতলক্ষাসহ বিভিন্ন নদীর বাতাসে পানিতে এর প্রবল ছোঁয়া পাওযা যায়। দূষণরোধের কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না। রডের উৎপাদন বেড়েছে। নিয়ম মেনে বা না মেনে বালু তোলার পরিমাণ বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। ফার্নিচারের ব্যবসাও বেড়েছে। এরজন্য বনের গাছের ব্যবসা ভালো। দেশে নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করায় প্রশাসন বরাবর সক্রিয় সহযোগী।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ বিনাশ ক্ষেত্রে অগ্রণী। দায়মুক্তি আইন এক্ষেত্রে অন্যতম রক্ষাকবচ। সরকার দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়মনীতি অমান্য করে দেশি বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চমূল্যে কাজ দিচ্ছে, আইনের  হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০১০ সাল থেকে সরকার চলছে ‘দায়মুক্তি আইন’ ঢাল দিয়ে, নানা সুবিধা ছাড়াও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় থেকে বাঁচানোর জন্য দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে রাশিয়ান ও ভারতীয়সহ বিদেশি কোম্পানিকেও (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রষ্টব্য)। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশি-বিদেশি কোম্পানির উচ্চলাভ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজি নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। বন, জমি, উপকূলবিনাশ, অধিক ঋণ ও বিদেশ নির্ভরতা এবং ব্যয়বহুল এই পথ নেয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদার কথা। কিন্তু যখন পরিবেশবান্ধব, সুলভ এবং টেকসই বিকল্প পথ দেখানো হচ্ছে তখন সরকার সেদিকে যাচ্ছে না কারণ সেই পথ দেশ ও জনগণের জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য হয়েও কর্পোরেট গোষ্টীর তাতে লাভ নেই, আমলা মন্ত্রীদের কমিশনের সুযোগ নেই।[6]

আরেকটি ক্ষেত্র সর্বজনের অর্থ দিয়ে বিশাল কেনাকাটা। যন্ত্রপাতি  কেনা হচ্ছে, কাজ নাই; বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই সেগুলো হাওয়া; ডেমু ট্রেন কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই তার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হচ্ছে; সিসিটিভি কেনা হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা নষ্ট; ঋণ করে সাবমেরিন সহ সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ করে শত শত বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই যেগুলো বিকল হচ্ছে;  কেনা হচ্ছে গাড়ি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার  মধ্যে গাড়ির মডেল পরিবর্তন করা, আরও বড় আরও দামি গাড়ি কেনার পথে প্রবল উৎসাহ। সর্বজনের অর্থ যে কোনোভাবে বরাদ্দে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নেই। কিন্তু এই অর্থ জোগাড়ে বাড়ছে মানুষের ওপরই চাপ। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, ভ্যাট বসছে সর্বত্র, খাজনা বাড়ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছুলোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হবার জায়গা। এর অন্যতম সুফলভোগী কতিপয় শিক্ষকও। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং আর টিউশনি নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন বিষময়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার কারণে গাইড বই, কোচিং এর বাণিজ্যের পথ খুলেছে। চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তাই একদিকে জৌলুস বাড়ছে অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নীচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম।[7]  ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লক্ষ শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার বহু প্রতিষ্ঠানের অনাহারী শিক্ষকেরা বারবার ঢাকা আসেন কিন্তু তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ হয়না। তাঁরা অনশনও করেছেন বহুবার। নন এমপিও এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন টিচারস এ্যান্ড এমপ্লয়ীজ  ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ  বলেছেন, ‘২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দাবি নিয়ে আমরা ২৮ বার ঢাকা শহরে এসেছি।[8]’  কোনো কাজ হয়নি।

উন্নয়নের ধরনে যদি দুর্নীতি অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা হীনতা, দখল, দূষণ থাকে অর্থাৎ যদি উন্নয়ন প্রকল্প অতি উচ্চ মাত্রায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি/বিপর্যয়ের কারণ হয় তাহলে তা কুশাসন অবধারিত করে তোলে। ব্যবসা- লবিষ্ট- রাজনীতিবিদ- প্রশাসনের দুষ্ট আঁতাত আরো অনেক অপরাধ-সহিংসতাকেও ডাকে। বলপূর্বক টেন্ডার দখল, জমি-ব্যবসা দখল করতে গিয়ে খুন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সহযোগিতা গুম, আটক বাণিজ্য, দরকষাকষি এগুলোও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায়। প্রশাসন আর দল একাকার হয়ে গেলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের বল্গাহীন প্রতিযোগিতা চলবেই। বাড়তেই থাকবে ধর্ষণ, নারী-শিশু- সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, ক্রসফায়ার, হেফাজতে নির্যাতন, এবং সরকারি দলে বিভিন্ন গোষ্ঠী হানাহানি। এসব কিছু মিলিয়েই পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির জৌলুস বাড়তে থাকে প্রাণ প্রকৃতির বিনাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা-অপমান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]https://www.wealthmanagement.com/sites/wealthmanagement.com/files/wealth-x-wealth-report.pdf

[2]পুঁজিপতি শ্রেণীর উৎপাদন বিচ্ছিন্ন-লুটেরা- ধরন বোঝাতে ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ প্রথম ব্যবহার করেন একজন অষ্ট্রিয়ান  লেখক, ১৯২৬ সালে। প্রথম ইংরেজী ভাষায় এর ব্যবহার করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত পলিটিক্যাল ইকনমি অব গ্রোথ গ্রন্থে। পরে এ শব্দবন্ধ বিশেষ পরিচিতি পায়  জার্মান-মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী  আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাংক এর (১৯৭২) লুম্পেন বুর্জোয়া লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট গ্রন্থের মাধ্যমে। তিনি এই গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থ প্রান্তস্থ দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ আলোচনায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন এমন একটি শ্রেণীর বিকাশ যারা সা¤্রাজ্যবাদের সাথে ঝুলে থাকে, নিজস্ব অর্থনীতির উৎপাদনশীল বিকাশের বদলে তারা যে কোনো ভাবে অর্থবিত্ত অর্জনের পথ গ্রহণ করে, নিজেদের স্বার্থে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে।

 

[3] আমার বেশ কয়টি বইতে এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। কয়টির নাম এখানে উল্লেখ করছি- কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, বিশ্বায়নের বৈপরীত্য, উন্নয়ন বৈপরীত্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারত প্রশ্ন।

 

 

 

[4]কয়েকদশকে ব্যাংকঋণ লোপাট কাহিনী ও তার বিবর্তনের বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- কল্লোল মোস্তফা: সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১৮। এছাড়া ব্যাংকের খেলাফী ঋণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এখনও বিষয়টি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। দেখুন মইনুল …..

 

[5] এবিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার সূত্র ধরে বিভিন্ন রিপোর্ট দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলো, বণিকবার্তা ছাড়াও এসম্পর্কিত আরও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি:https://www.jamuna.tv/news/24438, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2016/05/31/364233, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/14/451818, https://www.thedailystar.net/frontpage/road-construction-cost-way-too-high-1423132

[6]এ বিষয়ে দ্রষ্টব্য তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বিকল্প মহাপরকিল্পনার খসড়া। দেখুন: https://drive.google.com/file/d/1hPjRITBhY9cizuxfMJ2eAwieaSXP_EtI/view

[7]গত এক দশকের উন্নয়ন বরাদ্দের ধরন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- মাহতাব উদ্দীন আহমদ: বাজেট এবং এক দশকের ‘উন্নয়ন চিত্র’, সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১

[8] নিউ এইজ, জুলাই ৫, ২০১৮

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী আদৌ সক্ষম?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারন নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এখনকার জেনারেশন ভুলে গেলেও প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামানের “বিপুলা পৃথিবী” গ্রন্থ করতে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল। ড. আনিসুজ্জামান তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। লিখেছেন তিনি, “…. ৭ মার্চ ১৯৭৩ দেশের প্রথম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের সন্নিহিত এলাকায়। দুই গাড়ি করে আমরা একসঙ্গে ভোট দিতে গেলাম-উপাচার্য ইন্নাছ আলী, রেজিষ্টার মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, ইংরেজী বিভাগের মোহাম্মদ আলী আর আমি। স্বাধীন দেশে এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি-মনের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেলো। জানলাম, আমাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে”।

এক. বলা যায় ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগন তার স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশ করুক। শাসকশ্রেনী সবসময়ই ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন-শক্তিশালী, যোগ্য করে তুলতে চায়নি। সেই থেকে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রু টি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও এটি গ্রহনযোগ্য মান অর্জিত হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও  অর্থাৎ ২০০৮ সালে হুদা কমিশন যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিবাচকতা অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। যার একটি বড় উদাহরন দশম জাতীয় সংসদ  নির্বাচন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? সঠিক সময়ে, সব দলের অংশগ্রহনে মানসম্মত একটি নির্বাচন কি হবে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম? সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে অজস্র প্রশ্নবোধক ঝুলিয়ে দিয়েও তারা মনে করছেন, ঐ নির্বাচন সুষ্ঠ এবং অবাধ হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের আস্থা অর্জনে সক্ষম হলেও অন্যান্য দল ও জোটের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, যা এখন আজ-কালের ব্যাপার। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত বছর ২৪ আগষ্ট থেকে শুরু করে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে। আলোচনাকালে দলগুলি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রায় সাড়ে চার’শ প্রস্তাব উপস্থাপনা করেছিল। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটি ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসছে, এবং আসতেই থাকবে অন্তত: নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে; ১. নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? ২. নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে? ৩. নির্বাচনী আসনের সীমানা পুন:নির্ধারন করা হবে কিনা? ৪. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হবে কিনা? নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দল ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। সম্প্রতি ড. কামালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট, যার বড় অংশীদার বিএনপি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্বাকালীন সরকার প্রশ্নে একই মেরুতে।

সরকারী দল ও তার মিত্ররা বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। তারা সবাই এখন এটিকে ‘সাংবিধানিক’ মনে করছেন এবং এর বাইরে চুল পরিমানও নড়বেন না-এই বক্তব্য জোরে-সোরে জানান দিতে ভুল করছেন না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি জোরে-সোরে তুলেছেন। এজন্য তারা প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের কথাও বলছেন।

নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য মনে করে নির্বাচনে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে নিয়োগের প্রয়োজন মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং ক্ষমতাসীন দলও তাই চায়। এ ব্যাপারে অন্যান্য দলের অবস্থান অনড়, তারা ইভিএম ব্যবহার চান না। সীমানা পুন:নির্ধারন প্রশ্নেও তাদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে।

দুই. জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পর বিরোধী দাবি মেটানোর ক্ষমতা কমিশনের কতটুকু আছে এবং সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার ‘ইচ্ছাশক্তি’ আদৌ আছে কীনা? যদিও সুপ্রীমকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা আছে, সুষ্ঠ-অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন যে কোন আইন করতে পারবে – কিন্তু কোন কমিশনই এ পর্যবেক্ষণকে আমলে নিয়ে কোন আইন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং এই নির্বাচন কমিশনও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নতুন কোন নজির স্থাপন করবে বলে আভাস মেলেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের অতীত বলে, এখানে সবসময় নির্বাচন কমিশন সেই কার্যক্ষমতাই দেখিয়েছে, যেরকমটি নির্বাচনকালীন সরকার চেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলীয় হলে তাদের বিজয়ই অক্ষুন্ন থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। সে অর্থে নির্বাচন কমিশন সব সময় দলীয় সরকারের ইচ্ছেকেই প্রধান্য দিয়েছে।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলেও তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন সেভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্বাধীন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বাংলাদেশে তার কোন প্রমান অতীতে কোন নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলতে পারবে, নির্বাচনকালীন সরকারের ইচ্ছেকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়াসী হওয়ার মত সাহস বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেখাবে- আপাতত: এর চেয়ে দুরাশা আর কি হতে পাবে!

সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে অন্তত তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা অর্জণ করতে পারে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সরকারী কাজে গিয়ে নির্বাচন প্রচারনা চালাচ্ছেন, এটি মেনে নিয়ে কমিশন পূর্বতনদের নজির অব্যাহত রাখছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, অনুকূল পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত: নির্বাহী বিভাগের লাগামটি টেনে ধরতে পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হয় না। ইতিপূর্বে সিইসি আজিজ কমিশন, রকিব কমিশনের সাথে দৃশ্যত: বর্তমানটিও একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেলো নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীনতা ও পরাধীনতার যে নজির রেখে গিয়েছিল সেটি অব্যাহত থাকছে। ফলে ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটালে, মেরুদন্ড সোজা করে না দাঁড়ালে জনগনের আস্থা-বিশ্বাস সহসাই ফেরানো যাবে না।

তিন. এই দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনে কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। এখানে সংসদীয় ধারার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পিষ্ট করেছে জনগনকে। ফলে ক্ষমতাসীন কোন দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারণ দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স প্রকাশিত “বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫” সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত: এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোন নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহুদুরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-১

আনু মুহাম্মদ ::

 ‘মানুষ ছাড়া বন বাঁচে

বন ছাড়া মানুষ বাঁচে না।

মানুষ ছাড়া নদী বাঁচে

পানি ছাড়া মানুষ বাঁচে না।।’

তাই একটি দেশের বস্তুগত উন্নয়ন কতোটা মানুষের জন্য তা বুঝতে শুধু অর্থকড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি দেখলে হবে না।

তাকাতে হবে বন নদী পানিমানুষসহ সর্বপ্রাণের দিকে

 

পুঁজিবাদের বিকাশ ও উন্নয়নের পরিসংখ্যান :

সন্দেহ নেই, গত চারদশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে সকল ক্ষেত্রে। গত দুদশকে এর বিকাশ মাত্রা দ্রুততর হয়েছে। ধনিক শ্রেণীর আয়তন বেড়েছে। কয়েক হাজার কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে, স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের একটি স্তর তৈরি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটেছে। এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় দেশের সমাজ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্র এখন পুঁজির আওতায়, একইসাথে একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অঙ্গীভূত।

পুঁজিবাদের এই বিকাশ নিয়ে সরকারি উচ্ছ্বাস সীমাহীন। উন্নয়নে সরকার সার্থক বলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অর্থনীতিবিদদের মধ্যে স্তুতিগানের কমতি নেই। এই স্তুতি বন্দনায় বিশেষভাবে ৭০ দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বই-এর কথা টানা হয়, নাম – বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট [1]  এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জে . আর. পারকিনসন। এই গ্রন্থে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের দর্শন অনুযায়ী তাঁরা পুঁজিবাদ বিকাশের সম্ভাবনাই বিচার করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্যে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের এমনই অবস্থা যে, যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন হয় তাহলে বিশ্বের কোথাও উন্নয়ন কোনো সমস্যা হবে না। এই হতাশাব্যঞ্জক কথার সূত্র টেনে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক তুলনা করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু স্বাধীনতার পর বিপুল প্রত্যাশা আর তার বিপরীতে রাষ্ট্রের যাত্রা নিয়ে সেসময়ের অন্য আরও কিছু বই আছে যেগুলোর প্রসঙ্গ টানলে বিশ্লেষণ ভিন্ন হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই।[2]  যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষণ করি, যদি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনা করি, যদি স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে যে তিনটি লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিলো সেই সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা- বর্তমান উন্নয়ন ধারায় কতটা অর্জিত হয়েছে তার বিচার করি, তাহলে উচ্ছ্বাসের বদলে উন্নয়নের গতিধারা নিয়েই প্রশ্ন আসবে। যদি ধনিক শ্রেণীর আয়তন ও জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি কতো নদী বিনাশ হলো, কতো বন উজাড় হলো, বাতাস কতো দূষিত হলো, মানুষের জীবন কতো বিপন্ন হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা ও বৈষম্য কতোটা বাড়লো, শ্রেণী-লিঙ্গীয়-ধর্মীয়-জাতিগত বৈষম্য নিপীড়ন কী দাঁড়ালো তার হিসাব করি তাহলে  উন্নয়নের সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি এবং মাথাপিছু আয় এখন বার্ষিক ১৬শ’ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।[3]  গত ১০ বছরের গড় হিসাবে বিশ্বের সবচাইতে উচ্চহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে নাওরু, ইথিওপিয়া, তুর্কমেনিস্তান, কাতার, চীন এবং উজবেকিস্তানে। এক দশকের গড় হিসাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০। তবে ২০১৭ সালের প্রবৃদ্ধি হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। বাংলাদেশের চাইতে বেশি, সমান ও কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হার অর্জনকারী অন্যদেশগুলো হলো: ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, আইভরিকোস্ট ও সেনেগাল।[4]

ভারতে মাথাপিছু আয় ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার গত এক দশক ধরে বেশ ভালো দেখালেও তার পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে সেখানকার অর্থনীতিবিদরা অনেক প্রশ্ন তুলছেন, বিতর্ক হচ্ছে। ডাটা-র গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।[5]  ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের তথ্য উপাত্ত পরিসংখ্যান হিসাব নিকাশ প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ অনেক বেশি থাকলেও বাংলাদেশে এনিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই, কোনো বিতর্ক নেই। সরকারি ভাষ্যের সাথে মেলে না এরকম যুক্তি, তথ্য,  প্রশ্ন আর বিতর্ক সরকার পছন্দ করে না বলে প্রায় সকল অর্থনীতিবিদ, থিংক-ট্যাংক, মিডিয়াও বিনাপ্রশ্নে সব গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। যাইহোক, কতটা এবং কীভাবে তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের অবকাশ থাকলেও জাতীয় আয় নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।

কোনো দেশের অর্থনীতিকে জিডিপি/জিএনপি এবং মাথাপিছু আয় দিয়ে পরিমাপ করায় বিশ্বব্যাংক- আইএমএফ-ই প্রধান পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। এই পদ্ধতি সারা দুনিয়ার কর্পোরেট শাসকদের প্রিয়, কেননা এতে অনেক সত্য আড়াল করা যায়। বিশ্বব্যাংকই সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো হল: (১) নিম্ন আয়ভুক্ত দেশ (মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত)। (২) নিম্ন মধ্য আয়ভুক্ত দেশ (১ হাজার ২৬ মার্কিন ডলার থেকে ৪ হাজার ৩৫ ডলার); (৩) উচ্চ মধ্যম আয় (৪ হাজার ৩৬ মার্কিন ডলার থেকে ১২ হাজার ৪৭৫ ডলার)। (৩) উচ্চ আয়ভুক্ত দেশ (১২ হাজার ৪৭৬ মার্কিন ডলার থেকে বেশি )।

মাথাপিছু আয়সহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে জাতিসংঘেরও বিভাজন আছে। তাদের মাপকাঠি অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ গ্রুপের পরের ধাপ উন্নয়নশীল (developing)) দেশ; এই পর্বের দেশগুলোকে কম (less developed) বা অনুন্নত (underdeveloped)  দেশও বলা হয়। তাদের সর্বশেষ  তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের  ৪৭টি দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকায়। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আছে ১৩টি, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের মধ্যে একমাত্র হাইতি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এশিয়ার মধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ছিল আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও নেপাল। জাতিসংঘের বিবেচনায় সবচাইতে দরিদ্র এবং দুর্বল দেশগুলো নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ গঠন করা হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ এই তালিকাভুক্ত হয় ১৯৭৪-৭৫ সালে।

৪৭ বছর আগে এই গ্রুপ গঠন করবার পরে এর মধ্যে মাত্র ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে পুরোপুরি বের হতে পেরেছে। এগুলো হল বতসওয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ এবং সামোয়া। জাতিসংঘের কমিটি বলেছে, আগামী ৩ বছরে আরও দুটি দেশ ভানুয়াতু এবং এ্যাঙ্গোলা এই উত্তরণের তালিকায় আছে। নেপাল এবং তিমুরও শর্ত পূরণ করেছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের বিষয়টি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী সভায় বিবেচনার জন্য রাখা হয়েছে।

গত ১৫ মার্চ জাতিসংঘের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, লাওস এবং মিয়ানমার প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য শর্ত পূরণ হয়েছে। আরও কয় বছর দ্বিতীয় দফায় শর্ত পুরণ করতে পারলে চুড়ান্ত ভাবে এলডিসি তালিকা থেকে এ দেশগুলো বের হতে পারবে।[6]

একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও যে টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে, মাথাপিছু আয় বেশি হলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে এবিষয় স্পষ্ট করে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে নানাদেশে। অমর্ত্য সেন এবিষয় পরীক্ষা নিরীক্ষা নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। মাহবুবুল হকের সাথে ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ ধারণা প্রবর্তন করেছেন, যার ভিত্তিতে জাতিসংঘ এখন নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। জোসেফ স্টিগলিজসহ মূলধারার বহু অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে জিডিপি ব্যবহারের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।[7]

ভারতের ভেতরেই রাজ্য থেকে রাজ্য তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎ পাওয়া যায়। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, মধ্যম আয়ের বিবরণে তারা বাংলাদেশ থেকে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের প্রায় সমান, মানে তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। মিয়ানমারও একইসঙ্গে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাবার শর্তপূরণ করেছে। নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চাইতে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবেনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরও খারাপ। সেজন্য মানব উন্নয়ন সূচকে নাইজেরিয়া বাংলাদেশেরও পেছনে।

প্রকৃতপক্ষে জি ডি পি দিয়ে একটি দেশের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিতরণ, পরিষেবার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কারণ যেকোনো লেনদেন ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধিতেই জিডিপি বাড়ে। কিন্তু এরজন্য সামাজিক ও পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হলে তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সেকারণে এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ  মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না, অর্থনীতির গুণগত অগ্রগতিও বোঝা যায় না।

যেমন চোরাই অর্থনীতির তৎপরতাতেও জি ডি পি বাড়ে কিন্তু সমাজের বড় একটা অংশের জীবন জীবিকা তাতে বিপদগ্রস্ত হয়। নদীনালা, খালবিল, বন দখল ও ধ্বংসের মাধ্যমেও জি ডি পি বাড়তে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘ মেয়াদে  টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে না, বরং অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এসব তৎপরতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় না বরং জীবনমান বিপর্যস্ত হয়। দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও বড় দেখায়, জিডিপির অংকও বাড়ে। একইসময়ে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ কমে এসেছে তার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু এই ব্যয়বৃদ্ধি আবার জিডিপি বাড়ায়। অনিয়ন্ত্রিভাবে গৃহীত বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুন্ঠন ও পাচারও জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

দ্বিতীয়ত, যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয়ের হিসাব বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। একটি পরিবার যদি দশ লক্ষ টাকা আয় করে, পাশাপাশি অন্য একটি পরিবার যদি দশ হাজার টাকা আয় করে তাহলে উভয় পরিবারের গড় আয় হবে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এতে কি দুই পরিবারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়? বর্তমান মাথাপিছু আয় হিসাবে আমাদের দেশে চার সদস্যের পরিবারের বার্ষিক গড় আয় হয়  প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ মাসে প্রায় ৫৭ হাজার টাকা। তারমানে বাংলাদেশের সকল নাগরিক শিশু বৃদ্ধ নারীপুরুষ সকলেরই মাথাপিছু আয় মাসে এখন প্রায় ১৪ হাজার টাকা! অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন  মানুষের মাসিক আয় এর থেকে অনেক নিচে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় যত শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ পায় তার মাত্র ৩০ শতাংশ। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]Just Faaland, J.R. Parkinson: Bangladesh A Test Case of Development, S. chand, New Delhi, 1977.

[2]মো: আনিসুর রহমান: পথে যা পেয়েছি, ২য় পর্ব, অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০০৪। একই লেখকের Anisur Rahman: The Lost Moment, UPL,Dhaka, 1993. Ges Nurul Islam: Development Planning in Bangladesh, UPL, 1981. এছাড়া আরও দেখুন- – – Rehman Sobhan and  Muzaffar Ahmed: Public enterprise in an intermediate regime: a study in the political economy of Bangladesh. Bangladesh Institute of Development Studies,  1980.

[3] বাংলাদেশ সরকার: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮।

[4]https://www.gfmag.com/global-data/economic-data/countries-highest-gdp-growth-2017

[5]Amiya Kumar Bagchi:“What an Obsession with GDP Denotes”, Economic & Political Weekly EPW, September 1, 2018.

[6] একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে যে, ভুটান, কিরিবাতি সাওতোম এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ইতোমধ্যে সব শর্ত পূরণ করে অর্থাৎ জাতীয় আয় এবং শিক্ষা-চিকিৎসার শর্ত পূরণ করে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে বের হবার এবং উন্নয়নশীল দেশ কাতারে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের নাম এখন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) জাতিসংঘের ইকনমিক এ্যান্ড সোশাল কাউন্সিল এ পাঠাবে, সেখান থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গিয়ে তা চুড়ান্ত হবে।

[7]`দীপ্তি ভৌমিক: জিডিপি- উচ্ছ্বাস ও বাস্তবতা। সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।: : Debra Efroymson: Beyond Apologies: Defining and Achieving an Economics of Wellbeing, March 2015, Institute of Wellbeing, Dhaka.

বাংলাদেশের চাইতে ভুটানের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও বেশি। তারপরও ভুটান জিডিপির এই হিসাব পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর নাম মোট জাতীয় সুখ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। এতে সর্বমোট ৯টি ক্ষেত্র বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয় : মানসিক ভালো থাকা, সময়ের ব্যবহার, সম্প্রদায়, জীবনীশক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা, জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। এছাড়া এসসব ক্ষেত্রের সাথে মাথাপিছু আয় সহ ৩৩টি নির্দেশক আছে। অন্যান্য নির্দেশক হলো নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, সাক্ষরতা, বাস্তুতান্ত্রিক বিষয় এবং ঘুম এবং কাজে ব্যয়কৃত সময়।

 

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি : চীন-ভারত দ্বন্দ্ব চরমে

আসিফ হাসান

আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতির বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশগুলোর অন্যতম চীন আর ভারত।  চীনের তুলনায় ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে থাকলেও  উদীয়মান শক্তির মর্যাদা  পেয়ে গেছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে উভয়েরই।  আবার দেশ দুটির প্রতিবেশীরা তাদের তুলনায় ‘লিলিপুট’। গালিভাররের কাছে এই লিলিপুটরাই আবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে। দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির উভয়ের কাছ থেকে তারা যেমন কখনও কখনও সহায়তা পাচ্ছে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলোমেলোও হয়ে পড়ছে।  বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা বড় ধরনের পরিবর্তনই যেন অবধারিত করে তুলেছে।

বর্তমানে সময়টা এমনই যে অন্য কিছু ভাবার মতো অবস্থাও নেই।  চীন-ভারতের উত্থানের কারণেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ভারত মহাসাগর। চীন প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে। তাকে ভারত মহাসাগরের বাইরে কিছুই যেতে দেবে না মার্কিন নেতৃত্বাধীন  শক্তি।  আর এ কারণেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হোক যুক্তরাষ্ট্র  তা চায়। কিন্তু চীনও হার মানার পাত্র নয়। দীর্ঘ দিন ভারতের আধিপত্যের এলাকা হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে সে হানা দিচ্ছে জোরালোভাবে।

শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি সরকার পরিবর্তন যেভাবে ঘটেছে, তাতে করে মনে হচ্ছে, ওহানে নরেন্দ্র মোদি আর শি জিনপিঙের অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকের রেশ ধরে উপমহাদেশে শান্তির বাতাসের চেয়ে অশান্তির ঝড়ই দেখা যাচ্ছে অনেক বেশি।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঘরোয়া ইস্যুগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিও ওঠে আসছে বড়ভাবে।  রনিল বিক্রমাসিঙ্গের সাথে মহিন্দা রাজাপাকসের দ্বন্দ্বে পেছন থেকে ভারত আর চীনের কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি অবধারিতভাবেই অনুভব করা যাচ্ছে। বিক্রমাসিঙ্গে ভারতপন্থী আর রাজাপাকসে চীনপন্থী। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার বিক্রমাসিঙ্গের বদলে রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করাটা দেশীয় পরিসরেই বিবেচিত হচ্ছে না।

কলম্বোতে এই পরিবর্তনের ফলে শ্রীলঙ্কায় প্রস্তাবিত ভারতীয় বিনিয়োগ, বিশেষ করে মাত্তালা বিমানবন্দর, কলম্বোর ইস্ট কন্টেইনার টার্মিনাল, কেরাওয়ালাপিতিয়ায় এলএনজি প্লান্ট, জাফনার পালালে বিমানবন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে। আর ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে। এই পরিবর্তন নিয়ে চীন যে খুশি, তা বেশ নিশ্চিত। গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্রবন্দরসহ চীনা প্রকল্পগুলোও প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ছিল। ঘরোয়া অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চীনা ঋণের দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব নিয়ে সরকার উদ্বেগে পড়েছিল। কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে সহিংসতা ও বিরোধিতাও সৃষ্টি হয়েছিল। এখন রাজাপাকসাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ফলে এই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেবে, বেইজিং সুবিধা পাবে। এতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নতুন গতি পাবে, চীনা বিনিয়োগ বাড়বে।

প্রেসিডেন্ট থাকার সময় চীনের প্রতি রাজাপাকসে ঝুঁকেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। অভিযোগ রয়েছে, তাকে বিদায় করতে কোমর বেঁধেই নেমেছিল দিল্লি। সফলও হয়েছিল। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে দান উল্টে গেল। বিক্রমাসিঙ্গে আউট, রাজাপাকসে ইন। ্রপরেও যে সবকিছু ঠিকঠাক তা বলা যাবেনা।

তাহলে কি মালদ্বীপেও একই ঘটনা ঘটবে? মালদ্বীপে যে অবস্থা ছিল তাতে আবদুল্লাহ ইয়ামিন হেরে যাবেন, তা কেউ ভাবেনি। যেমন ২০১৫ সালে ভাবেননি রাজাপাকসে। কিন্তু নির্বাচনী সমীকরণ মেলাতে পারেননি রাজাপাকসে। ইয়ামিনও পারেননি। চীনের দিকে দেশকে বেশ ভালোভাবে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্ভব সবভাবে ভারতকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন। তার জের ধরে ক্ষিপ্ত হচ্ছিল পাশ্চাত্য বিশ্বও। তারা সবাই জোট বেঁধেছিল মালদ্বীপকে আবার নিজেদের বলয়ে ফিরিয়ে আনার জন্য।

মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে সবচেয়ে বড় মিলটি হলো উভয়েই দ্বীপ দেশ। আর তাদের অবস্থান ভারত মহাসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের একেবারে কাছে। এই রুটের নিয়ন্ত্রণ লাভ খুবই জরুরি। ফলে দেশ দুটির দিকে নজর একটু বেশিই।

মালদ্বীপে চীনাপন্থী প্রেসিডেন্টের পতনের কিছু দিনের মধ্যেই শ্রীলঙ্কায় পট পরিবর্তন কি বদলা নেয়া? এত দিন মনে হতো, চীন কেবল তার সফট পাওয়াই ব্যবহার করে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ঘটনায় কি মনে হয়, তারা ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছে? এমন আশঙ্কা কিন্তু আরো আগে থেকেই করা হচ্ছিল। মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কায় চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট শি’র ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য উভয় দেশই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এই দুটি দেশ অন্য দিকে গেলে চীনা উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি আঁতুর ঘরেই মরে যেতে পারে। ফলে নিজের দিক থেকে দেখতে গেলে মনে হবে, চীনের পিছু হটার সুযোগই ছিল না।

কিন্তু ভারত কি ছেড়ে দেবে? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ? এখানে ছাড় দেয়া মানে চীনের লাগাম ধরার পুরো পরিকল্পনাই ভণ্ডুল হয়ে যাওয়া।

একই কথা প্রযোজ্য নেপাল, ভুটানের ক্ষেত্রেও। এ দেশ দুটি আরো প্রবলভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল । ভুটান নিজ সিদ্ধান্ত কতোটা স্বাধীনভাবে নিতে পারে  সে প্রশ্নও ওঠে মাঝে মাঝে। নেপালও কাছাকাছি অবস্থায়। ভূবেষ্টিত দেশ দুটিকে ভারতের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়।  কয়েক বছর আগেও ভারতকে এই দেশ দুটি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এখন তার ঘুম হারাম হবার উপক্রম।

যদি বলা হয়, নেপাল এখন প্রায় ভারতের হাতছাড়া হয়ে গেছে, তবে বাড়িয়ে বলা হবে না।  কে পি ওলির নেপাল এখন দ্রুত গতিতে চীনের দিকে ঝুঁকছে।

ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিংয়ের অর্থনৈতিক এজেন্ডা হিমালয় অঞ্চলের এ দেশটির সাথে ভারতের সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির পর্যবেক্ষকরা  মন্তব্য করেছেন। সাবেক কূটনীতিক ও দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এসডি মুনি বলেন, তারা যদি তাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয় এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাইরে তাদের অর্থনীতিকে আরো সম্প্রসারণ করে, তাহলে ভারতের উপর নিশ্চিতভাবে এর প্রভাব পড়বে।

আবার গত বছরের দোকালাম-এ সামরিক অচলাবস্থার পর থেকে ভুটানে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণের দাবি উঠেছে। তাদের অভিযোগ ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের দ্বারা খুব বেশি  নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত । ফলে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিস্পত্তি করা যাচ্ছে না বলে অনেকে মনে করছে। তাদের মতে, ভারতই বাধা দিচ্ছে, নিষ্পত্তির দিকে না যেতে।

চীন ও ভুটান দু’দেশই দোকলামের উপর মালিকানা দাবি করছে। স্থানটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। ওই এলাকায় চীনা সৈন্যরা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারতীয় সেনারা গিয়ে বাধা দেয়। ভারতের কৌশলগত গুরত্বপূর্ণ ”চিকেন নেক” – শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে দোকলামের অবস্থান। এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো সংযুক্ত। ফলে এখানে ভারত ও চীনের ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে।

এদিকে, শেরিং যে অর্থনৈতিক রূপরেখা উত্থাপন করেছেন, তাতে করে অবধারিতভাবেই তাকে ছুটতে হবে চীনের দিকে।  ভুটানের তরুণরাও চাচ্ছে, তাদের দেশ যাতে কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত হতে চাইছে। আর তাতেই ভারতের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।

এক দশকের বেশি সময় আগে রাজা জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচক ভুটানে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালু করার পর থেকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার দেশটি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মাঝে থাকা ভুটানের অবস্থান কি হবে তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভারত যেহেতু এই অঞ্চলে তার ন্যায্য নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিসরনে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ভুটানে তার উপস্থিতি অতিমাত্রায় অনুভুত না হয়। ভুটানের জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থটিকেই মনে রাখতে হবে।

এমন প্রেক্ষাপটেই সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রাথমিক রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক ক্ষমতাসীন দল  পিপলস ডেমক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। জয়ী হন কিছুটা স্বাধীনচেতা ড. লোটে শেরিংয়ের দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি)।

এদিকে, চীনের সাথে সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে নেপালের। কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।  নেপালিরা যেন পণ করেছে, তারা ভারতের নাগপাশ ছিন্ন করবেই।  বিশেষ করে ২০১৫ সালের অঘোষিত অবরোধের পর নেপালি জনমত এখন প্রবল ভারতবিরোধী। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে চীন। তারা নানাভাবে নেপালে তাদের অবস্থান জোরদার করছে।

নেপাল ও ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে তাদের পক্ষে কোনোভাবেই ভারতের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা হলো একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তাতেই ভারতের ক্ষতি, চীনের লাভ।

এই লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে গিয়েই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নির্মমতার শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। ভূ-রাজনীতির যে খেলা চলছে মিয়ানমারে তাতে একটি বড় রণাঙ্গন হচ্ছে আরাকান রাজ্য। চীন সেখানে ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক জোন, তেলের ডিপো নির্মাণ করতছ ও আরো করতে চায়। কিন্তু পাশ্চাত্য কাজটি সহজে হতে দিতে চায় না। আর পরিণামে সেখানকার রোহিঙ্গারা দাবার ঘুঁটির মতো মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার হলো।

রোহিঙ্গাদের ওপর এমন অত্যাচার সত্ত্বেও  চীন ও ভারত  কিন্তু মিয়ানমারকে কাছে টানতে হেন কাজ নেই যা করছে না।  ভারতেরও অ্যাক্ট ইস্ট নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য মিয়ানমারকে প্রয়োজন।

 

সংলাপের ফলাফল : ধারনার বাইরে কিছুই ঘটেনি

আমীর খসরু ::

রাজনীতি নিয়ে সামান্য চিন্তা-ভাবনা করেন, ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন এবং সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা যাদের আছে- তারা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীনদের সাথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে গঠিত জাতীয় ঐক্যফন্টের ‘সংলাপ’-এর ফলাফল নিয়ে বোধকরি অবাক হননি। সংলাপের পরে ড. কামাল হোসেন যেমনটি বলেছেন, ‘বিশেষ সমাধান পাইনি’ এবং মির্জা ফখরুলের ‘আমরা সন্তুষ্ট নই’ ধরনের মন্তব্যের বিষয়টি আঁচ করা গিয়েছিল আগেই। কারণ ড. কামাল হোসেনের চিঠির জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে রাজি হওয়ার বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার একটি কথাই আগাম জানান দিয়েছিল যে, ‘সংবিধান সম্মত’ সব বিষয় নিয়েই তারা আলোচনা করতে রাজি। আর এই ‘সংবিধান সম্মত’ কথাটি উল্লেখ করেই সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, তার একটি  ইঙ্গিত   তাদের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়। ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দিয়েছে তার প্রথম দফাতেই-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে।

এছাড়া অপরাপর যে দাবিগুলো যেমন- নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ অন্যান্য বিষয় কতটা মানা হবে- তা যে কেউই বুঝতে পারবেন। একটি বিষয় বিবেচনা করলেই সংলাপের পুর্বাপর সম্পর্কে সবকিছু পরিষ্কার হবে যে, ক্ষমতাসীন দল ‘সংবিধান’ বলতে বিদ্যমান সংবিধানকেই গণ্য করে। ইতিপূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলসহ যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে- তা তারা বিবেচনায় নেবেন না, এটাই তাদের দিক থেকে স্বাভাবিক।

তাহলে সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, সে বিষয়ে যাবার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়ায় প্রয়োজন যে, বিএনপি যদি আন্দোলন সংগ্রামে যথেষ্ট শক্তিশালী ও সক্ষম হতো, রাজপথে সরব থাকতো, ক্ষমতাসীনদের সমান্তরাল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো,  প্রথাপ্রতিষ্ঠানগুলো  কিছুটা হলেও পক্ষপাতমুক্ত  হতো এবং রাজনীনৈতিক পরিস্থিতির ওপরে নূন্যতম নিয়ন্ত্রন থাকতো  তাহলে ঐক্যফ্রন্টের নামে তারা সংলাপে যেতোও না, এমনকি সংলাপ চাইতও না। এসব বিষয়গুলো অনুপস্থিত বলেই সংলাপ চাওয়া হয়েছে সমান্তরাল মাঠ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে।

সংলাপের ফলাফল বিষয়ে আরো দুটো বিষয় উল্লেখ করা জরুরি বলে মনে হয়- ১) সংলাপ সরকারের তরফে ডাকা হয়নি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সংলাপের আবদার করেছে। ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যাতে বিশেষ গুরুত্ব না পায় এবং অন্যান্য দলের সাথে সংলাপের মতোই সমান বলে বিবেচনা করা হয়, সে লক্ষ্যে  এখন সবার সাথে সংলাপ চলবে বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২) নভেম্বরের প্রথমের যেকোনো দিন তফসিল ঘোষণা করার আগে এ ধরনের সংলাপ চালিয়ে যেতে পারলে সরকারই লাভবান হবে, এ কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা- সব পক্ষের সাথে সংলাপ হচ্ছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে এবং এই লক্ষ্যে তারা যে কতোটা আন্তরিক, দেশী-বিদেশী সবাইকে এটা বোঝানো সহজ হবে বলে ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই বলা হচ্ছিল সংলাপের কোনোই প্রয়োজন নেই।

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে সংলাপের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়েছে- এমন নজির নেই বললে চলে। নব্বই পরবর্তী বেসামরিক শাসনের সময়কালেও অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেস দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতা এবং সংলাপ প্রচেষ্টাসহ এইবার ধরে এ সময়কালে অন্তত ছয়বার সংলাপ ও মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতের সংলাপে সভা-সমাবেশের অধিকারের যে কথা বলা হয়েছে তা এই প্রথম বলা হলো এমনটি নয়। প্রধানমন্ত্রী এর আগেও প্রকাশ্যে এমন কথা বলেছেন। আর গ্রেফতার-মামলা সম্পর্কে তালিকা চাওয়া হয়েছে। এই তালিকার ভবিষ্যৎ কি হবে সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সঠিক হবে বলে মনে করি না।

তবে বাহবা দিতে হয় এবং সাধুবাদ জানাতে হয় সেই সব মতলববাজ সংবাদমাধ্যম ও কতিপয় কথিত বিশ্লেষককে যারা এই সংলাপকে ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে জনমনে উচ্ছাস, উচ্চাশা, সমস্যা সমাধানের আশার-আলো জাগ্রত করার প্রানান্তকর চেষ্টা ও বড় কিছু পাওয়া যেতে পারে বলে ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বরাবরের মতোই-তাদেরকে। অবশ্য তারা এখনো যে থেমে থাকবেন, তা নয়।

আর সংলাপ ও নৈশভোজের নিট ফলাফল হচ্ছে- দু পক্ষের এক পক্ষ এখন ‘আন্তরিকভাবে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে; সমস্যার কিছু কিছু সমাধানও হয়েছে’ এবং অপরপক্ষ ‘পাইনি, হতাশ হয়েছি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে’- জাতীয় কথাবার্তা বলে সংলাপকে যে যার মতো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিএনপিসহ যেসব বিরোধী নেতারা টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে থাকেন তারা নেত্রীর বক্তৃতা শুনেছেন সামনাসামনি বসে।

খুব সংক্ষেপে সংলাপের ফলাফল হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভেদ, বিদ্বেষ, অনৈক্য ও চরম বৈরিতার ইতিহাসে আরো একটি নজির সৃষ্টি করা হয়েছে – যা জন-আকাঙ্খার সম্পূর্ণ বিপক্ষে, বিপরীতে।

চরমমাত্রার দমন-পীড়ন প্রহসন ও ভোট-ডাকাতির ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ : ক্যামেরুন স্টাইল

ফরেন পলিসি থেকে

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

রাজা না হয়েও পল বিয়ার বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ধরে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বহাল থাকাটা কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়। তিনি ক্ষমতায় আছেন ৩৬ বছর ধরে, এখন সপ্তম মেয়াদের জন্য ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশকে ‘‘পরিচালনার’’ করার আসল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। সাংবিধানিক পরিষদ তাকে ক্ষমতায় রেখেছে, বিষয়টি এমনও নয়। তিনি রীতিমত ‘‘নির্বাচনে জিতে’’ তবেই ক্ষমতার মসনদে আছেন!

বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতে, যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদন্ডেই গত ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ক্যামেরুনের নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ভয়াবহ রকমের কম। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভয়ের কারণে কোনো কোনো এলাকায় এক শতাংশেরও কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলে কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর পরিচালিত কঠোর দমন অভিযানের ফলে অনেক ভোটকেন্দ্র বন্ধ থাকে, বাকিগুলোতে মূলত সৈন্যদেরই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

তবে ওই  দেশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া আপনাকে জানাবে, নির্বাচন হয়েছে চমৎকার। আর তাদের বক্তব্যের সমর্থনে ’বাইরের পর্যবেক্ষকদের’ উদ্ধৃতিও দিয়ে হলেও প্রমাণ করতে চাইবে, নির্বাচন হয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ।

গত ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্যামেরুন রেডিও ও  টেলিভিশন (সিআরটিভি) একদল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সাক্ষাতকার প্রচার করে। এতে তারা দেশটির নির্বাচনের প্রশংসা করে একে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করেন। সিআরটিভিতে প্রদর্শিত ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নুরিট গ্রিনজার নামে অভিহিত এক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ক্যামেরুনের নির্বাচনকে ’চরমমাত্রার সুষ্ঠু’ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার ব্যবস্থা প্রতারণা করার কোনো পথ ছিল বলে আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

তবে এখানে একটু জটিলতা আছে বৈকি; ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ক্যামেরুনে কোনো নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠায়ইনি। আর সিআরটিভিতে যাকে দেখা গেছে, তার সাথে গ্রুপটির কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে খোদ ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ট্রান্সপেরেন্সি’র মুখপাত্র মাইকেল হর্নসবে বলেন, ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচয় দানকারী এই লোক কে, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। সংগঠনটির মুখপাত্র ফরেন পলিসিকে বলেন, তবে আমি মনে করি, বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করার পরও এক লোক বারবার বলছেন, তিনি আমাদের প্রশিক্ষিত লোক।

অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধতার রঙ দিতে স্বৈরশাসকরা নতুন পদ্ধতি হিসেবে এই আশ্চর্য ব্যবস্থাটিকেই ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার করছে। বহিরাগতদেরকে ব্যবহার করার এই বিশেষ কৌশলটি এখন দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আবার গণতন্ত্রী হিসেবে ভান করা দুনিয়ার সব স্বৈরাচারের মধ্যে পল বিয়া অন্যতম কড়িৎকর্মা। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনি অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বেশি ভুল করেছেন, কিন্তু তাতে তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল থাকতে কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না।

আফ্রিকায় গণতন্ত্র বিকাশে নিয়োজিত অমুনাফামূলক সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড আফ্রিকা’র নির্বাহী পরিচালক জেফরি স্মিথ বলেন, ক্যামেরুন ও অন্যান্য স্থানে সত্যিকার অর্থে যা ঘটছে তা অতি মাত্রায় অবমাননাকর, দমনমূলক। আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার কাজটি কোনো না কোনোভাবে করে নেবে।

এই কৌশলের মধ্যে যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য প্রধান শক্তি যাতে বিব্রতকর হওয়ার মতো কোনো অবস্থায় না পড়ে, সে দিকে নজর রাখা হয়। বিয়ার এলাকাটি ছোট হলেও অত্যন্ত শক্তিধর লবিং গ্রুপ আর গণসংযোগ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাইরের দুনিয়ার কাছ থেকে মর্যাদা কেনার প্রয়াসে তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির মিডিয়া ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সংস্পর্শ বজায় রাখে।

ক্যামেরুনে ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রথম নারী প্রার্থী কাহ উল্লাহ তার দেশকে ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের বিষয়টি মাথায় রেখেই ক্যামেরুনের বিরোধী দল বাস্তবে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, তার দল, আমলাতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও এমনকি বেসরকারি মিডিয়ার বেশির ভাগের (যেগুলো দলের ক্যাডার আর সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করে) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তিনি বলেন, ভোটের দিন আমাদের দলের প্রতিনিধিদের ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া হুমকি, ঘুষ প্রদানের ব্যাপার তো রয়েছেই। বিরোধী দল হিসেবে আমাদেরকে সারাক্ষণ ভোটকেন্দ্রগুলোর পাশে ধাওয়ার শিকার হতে হয়’’।

ক্যামেরুনের সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিল। এই পরিষদের সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান পল বিয়া। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই পরিষদের সদস্যদের অভিযোগ শোনার কথা ছিল। কিন্তু তারা প্রার্থীদের তাদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দাখিলের সুযোগ না দিয়েই চলে যান।

ক্যামেরুনের উচ্চমর্যাদার অ্যাংলোফোন মানবাধিকার আইনজীবী এনকোনখো ফেলিক্স অ্যাগবোর বাল্লা অতিসম্প্রতি সাংবিধানিক পরিষদে বলেন, যেকোনো নির্বাচনী চ্যালেঞ্জেই আসুক না কেন, রায় যাতে পল বিয়ার পক্ষে যায় সে ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছিলেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, বিচারকেরা যার ওপর নির্ভরশীল, তাকে তো আর ক্ষেপাতে পারে না, তারা তাদের প্রভূর বিরুদ্ধে যেতে পারে না। এসব লোক কখনোই বিয়াকে নির্বাচনে হারতে দেবে না।

বিয়া বছরের পর বছর ক্ষমতায় রয়েছেন তার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার এলিটদের কাছে টেনে, বিভক্ত বিরোধীদের দুর্বল করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে- যারা নির্বাচন নজরদারি করে, তাদের নতজানু করে।

সহিংসতা ও দীর্ঘ দিনের বেপরোয়া দুর্নীতি ক্যামেরুনের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিয়া তার পুনঃনির্বাচনের জন্য প্রধান প্রধান যুক্তি হিসেবে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকানের মতো প্রতিবেশীদের তুলনায় তার দেশের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।  স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাব-সাহারিয়ান আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নাটালি লেতসা বলেন, দশকের পর দশক ধরে বিয়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলে আসছেন, আমাদের প্রতিবেশীদের দিকে তাকান, নাইজেরিয়াকে দেখুন, কী বিশৃঙ্খলা চলছে। আমরা স্থিতিশীল, আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা গর্ব করার মতো শক্তিশালী দেশ।

তিনি বলেন, যেসব তথ্য সম্পর্কে দেশবাসী সহজে জানতে পারে না, সেগুলোই বিয়ার সরকার তোতাপাখির মতো আউরিয়ে যাচ্ছে।