Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 5)

Author Archives: আমাদের বুধবার

নির্বাচন : আবার ফিরে আসুক জনআস্থা ও শংকাহীন পরিবেশ

আমীর খসরু ::

গণতান্ত্রিক শাসন যে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ প্যাকেজ- তা জনগণের মনোজগত থেকে মুছে ফেলতে পারাটাই হচ্ছে  বিদ্যমান গণতন্ত্রের বড় সংকট। অনেক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণীর শাসকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টাটি অব্যহত ছিল যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাৎ নির্বাচনের অপরনাম গণতন্ত্র – এমন ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা। গণতন্ত্রকে সামগ্রিক বিবেচনা, পরিমন্ডল ও এর ব্যপ্তি থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারাটাই যেমন ওই শাসককূলের জন্য সাফল্যের বিষয়, তেমনি এটাই অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় ও জারী রাখা এবং শাসন ব্যবস্থায় জনঅংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা দূরে রাখার লক্ষ্যে ‘‘অগণতান্ত্রিক শাসন’’ একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম একট ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এর বিপরীতে ওই নির্বাচনকেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলে প্রতিষ্টিত করার যে প্রচেষ্টাটি শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়েছে। আর এখান থেকেই সামগ্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটের মধ্যে পড়ে। শুধুমাত্র ওই শাসন ব্যবস্থাই যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রও সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র এক কথা নয়, এটা হতেও পারে না। কিন্তু কতিপয় শাসক ও ক্ষমতাসীনদের সাফল্য হচ্ছে – ধীরে ধীরে এর বিপরীত কাছটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে পারা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের এক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি স্তর বা ধাপ হিসেবে গণ্য হতে হবে রাষ্ট্র এবং সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রায় বিদ্যমান গণতন্ত্র রয়েছে এমন রাষ্ট্রে কতৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র -এমন ধারণাটি এখন মোটামুটিভাবে জনমনেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর ফলে জনগণকে যেমন ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে বিতাড়ন করা যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব যে জনগণের বুঝ-ব্যবস্থার বিষয় বা এতে তাদের অংশগ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, তা মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে এমন ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে যে, জনগণ ভোট দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত প্রদান তাদের কর্ম নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মূল সংকট- যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।

নির্বাচনকেন্দ্রীক এই ধারণাটি এখন শুধুমাত্র আর দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রার গণতন্ত্রের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন দেশে কতৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যেও এটি সংক্রামিত হতে শুরু করেছে।

কাজেই গণতন্ত্রের এই পুরো অব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে জনগণকে বাদ দেয়া হচ্ছে,  শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অধিকার বিলুপ্ত হতে বসেছে এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তির’ পর্যায়ে নেই। আর এ কারণেই রাষ্ট্র এখন কতিপয়ের এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিও বিলুপ্তির পথে। এটি গণতন্ত্র তো বটেই, খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি সীমাহীন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের একটি বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান দুজন ব্যক্তি অর্থাৎ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিনকে স্মরণ করা যায়।

অমর্ত্য সেন ‘দ্য আউডিয়া অফ জাস্টিস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গনতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ সামির আমিন ‘প্রতিরোধের বিশ্বময়তা’ (ফরাসী ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থন’।

কাজেই গণতন্ত্র, শাসক, ক্ষমতাসীনদের মনের মধ্যে ও মনোজগতে সার্বক্ষণিক বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকতে হবে।

দুই.

বাংলাদেশেও আগামী জানুয়ারি নাগাদ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে এবং দেশে বিদেশে নানা মহলে। যদিও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদৌ সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে বিভিন্ন সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করেছে এবং জনগণকে ক্রমাগত ওই নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকেও দূরে সরিয়ে নেয়ার ও রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ গত কয়েক বছরের নির্বাচনগুলোর পরে জনমনে নির্বাচন সম্পর্কেই একদিকে যেমন শংকা, ভীতির সৃষ্টির হয়েছে, তেমনি নির্বাচন সম্পর্কে একটি অনাগ্রহের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি অনেকেরই বিশ্বাস যে, নির্বাচনে জনগণের অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ থাকতেই হবে- এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের এখন আর প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এবারের নির্বাচনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একই ঘটনার একইভাবে দ্বিতীয়বার আর ঘটে না।

তিন.

আগামী যে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনের একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাত্র মাস তিনেক আগে যেমন পরিস্থিতি, পরিবেশ ও প্রস্তুতি প্রত্যাশিত – তা নানা কারণে অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। বিরোধী দলগুলো থেকে বারবার বলা হচ্ছে- নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নেই। বিএনপি দাবি করছে, গেলো কিছু দিনেই নতুন করে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজারের বেশি মামলায় ৮৫ হাজার জনের নাম দেয়া হয়েছে। অজ্ঞাতনামা রয়েছে তিন লাখের বেশি। এসব মামলাকে গায়েবী বলছেন সংবাদমাধ্যমসহ অনেক বিশিষ্টজনরা। আগের মামলা তো রয়েছেই। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রীক একটি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের সমান সুযোগও অনুপস্থিত বলেই কার্যত দেখা যাচ্ছে। এর  সবকিছু মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশী-বিদেশীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি শংকা, সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এরই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অদ্ভূত এক জোটসঙ্গী এরশাদের কণ্ঠেও। গত শনিবার ঢাকায় এক জনসভায় খোদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না।’

শুধু যে রাজনৈতিক দল, দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন তা নয়, ঠিক একই সাথে জনগণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাশীল হতে চায়। এখন সরকারেরই দায়িত্ব হবে- হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থাকে পুনরায় যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রাটি আবার শুরু হোক-এমনটি প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অন্যায্য হবে না।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন : তাহলে প্রবল হবে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধুমাত্র শাসকদলই করে তা নয়, বিরোধী দল যখন পোলারাইজেশনের রাজনীতি করে- তখন সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবার সমান সুযোগ বিনষ্ট হয়, সেটাও প্রকৃতার্থে অবাধ নিরপেক্ষ হয়না।  অবাধ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু ধরনের মত ও পথ তৈরী হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যায্য ও নির্ভেজালভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রতিফলন ঘটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, জন্ম নিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হচ্ছে, ভোটের আগেই জয়লাভ নিশ্চিত ও ফলাফল অদৃশ্যভাবে নির্ধারণ করে রাখা। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুক্ষ্ম, স্থুল বহু ধরণের উপাদানে সমৃদ্ধ হতে পারে; কেন্দ্র ও বুথ দখল, জাল ভোট দেয়া, বুথ বা কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের কয়েকটি পদ্ধতির উদাহরন । আধুনিক গণতন্ত্রের এই যুগে ক্ষমতাশালীদের কেউ কেউ ও কোন কোন রাজনৈতিক  দল এ পদ্ধতি অনুসরন করে । ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল সুক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করে এবং কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে, নির্বাচনকালে গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনসহ সকল এ্যক্টর কোনভাবেই যেনো শাসকদলের নির্বাচনী নকশা বাস্তবায়নে শক্ত বাধা তৈরী না করে; বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধু স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অগ্রসর দেশেও ঘটছে। কিন্তু এসব অগ্রসর প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহ অধ:পতিত ভূমিকা পালন করেছেনা, কর্পোরেট বিনিয়োগ ও আনুকল্যে ওই নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ক্ল্যাসিক ‘কেইসে’ পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের শাসকদলের নক্সার এবং পদ্ধতির উত্তোরোত্তর বিকাশ ঘটছে। এই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেটা আমরা তুলে ধরবো।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের রাজনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের লক্ষ্য হচ্ছে- পূর্ব নির্ধারিত জয় ও ক্ষমতাকে রক্ষা করা। এটাকে কোনভাবে আমজনতার ভোটের উপর ছেড়ে না দেয়া। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে শুধু নিজের জয় নয়, জয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদন্ধীকে দমন ও অবরুদ্ধ করা। এমনকি তার রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা। এর সাথে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর কর্তৃত্ববাদী অহং। এই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অহংয়ের কারণে স্বাধীনতা উত্তর প্রথমদিকে ডাকসু নির্বাচনে পরাজয় ও প্রয়াত আলীম রাজী, মেজর (অব:) জলিল সহ কয়েকজনের বিজয় মেনে নেবার গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায়নি। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ধারাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

এই অবক্ষয় ‘৯০ এর যে অলিখিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্ট্রি হয়েছে। এখানে দু’দলই সমানতালে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের  উপাদানগুলিকে বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। আজকের শাসকদলই শুধু নয়, দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অন্য দলটিও সেই অবক্ষয়ের জন্য সমান দায়ী। নির্বাচনকালীণ কেয়ারটেকার সরকারকে ম্যানিপুলেট করতে গিয়েই ওই দলটি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। তারপরের ইতিহাস সকলের জানা- বিএনপিকে তাদের নিয়ন্ত্রন মুক্ত নির্বাচনে ক্ষমতায় হারতে হয়েছিল এবং নির্বাচনের ফলাফলকেও মেনে নিতে হয়েছিল। তারপর ২০১৪ নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে সংঘাত ও দ্বন্ধের নতুন অধ্যায় তৈরী হল। রাস্তার আন্দোলন ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বিএনপি নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, আর শাসকদল রাষ্ট্রশক্তিতে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের কর্তত্ব প্রতিষ্ট্রায় সফল হয়। এ সফলতা একদিকে যেমন আওয়ামীলিগকে কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত করে, অন্যদিকে, বিএনপিকে পরিণত করে দিশাহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট দলে ।

এখন প্রশ্ন শাসকদল  আওয়ামী লীগের এই আপাত সফলতার রাজনৈতিক ফ্যাক্টর গুলি কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারত ফ্যাক্টরকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এটা ইতিহাসের আয়রণি, দু’তিন দশক আগেও ভারত বিরোধীতাই ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা আরোহণের মুখ্য উপায়। এখন ভারতের আস্থা ও সহযোগিতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে পড়েছে। কেন এমন হলো? বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেকটা নির্বাক ভূমিকা পালন করেছে কার্যত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার জন্যে। এছাড়া ভারতের আরো শক্তি অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ভারতের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমান শাসকদল এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করতে দক্ষতা দেখিয়েছে। আভ্যন্তরীণভাবে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা শক্তিশালী শাসক হিসেবে সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। যুদ্ধপরাধীদের বিচার এর মধ্যে অন্যতম। দ্বিতীয়ত: পরপর দু’টার্ম ক্ষমতায় থাকার কারনে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সংকটকালে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কতোটা আনুগত্য বজায় রাখবে, সহায়ক ভূমিকা নেবে তাতে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি ভোটের বাক্সে তারা আওয়ামীলীগ প্রদত্ত সুবিধার কতটা প্রতিদান দেবে তাতেও সংশয় রয়েছে। হামজা আলাভী নামে একজন মার্ক্সবাদী বিশ্লেষক বাংলাদেশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার উত্তর ঔপনেবেশিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ঔপনেবেশিক লিগ্যাসি থেকে বের হতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের হাতে নাগরিকদের নিপীড়নের যন্ত্র। গত দশ বছর আওয়ামীলীগ ঔপনেবেশিক লিগ্যাসিকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রশক্তিতে নাগরিকের বিরূদ্ধে আরো নিপীড়নমুলক করেছে। এর পটভূমিতে ২০১৯ সনের ৪ঠা জানুয়ারীর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোথায় আছি? কিন্তু সন্দেহ নেই এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল ও বিচিত্র উপাদানে সমৃদ্ধ। বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ বা ২০১৯ এর মধ্যে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান এর দিকে এগুচ্ছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন কালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি ঘোষণা করেছে তারা খালেদা জিয়া ব্যতীত নির্বাচন করবে না। আওয়ামীলীগ মনে করেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নেবে। অগোছালো বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে, তাকে কিছু কিছু সিট ছেড়ে দিয়ে বিএনপিকে বিরোধী দলে আসনে বসিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার সরকার গঠন করতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও শাসকদল একটা যেনো  -তেনো নির্বাচন করে ফেলতে পারবে বলেই তাদের ধারনা। কাজেই বিএনপি’র এ উভয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত: ম্যাজিক সমাধান নেই। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাঝে ভোটের বাক্সের নীরব বিপ্লব কি সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। এরপর ২০১৮ আগষ্ট হয়ে পড়ল ঘটনা বহুল। এই ঘটনাগুলি এক. ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে  ঐক্যফ্রন্ট, দুই. ২১ শে আগষ্টের হত্যাকান্ডের রায়, তারেক জিয়ার যাবজ্জ্বীবন কারাদন্ড, তিন. নির্বাচন কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদারের ভিন্নমত ও বিরোধ। এই তিনটি ঘটনার কোনটিই আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কোন গুণগত পরিবর্তন  আনতে পারেনি। কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রণ্টের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রতিযোগিতায় নির্বাচন নিয়ন্ত্রনের আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জের একটা জানালা খুলে যেতে পারে। তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন বিএনপি নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব ও নিষ্ঠুরতাকে সামনে এনেছে। মাহবুব তালুকদারের বিরোধীতা এই নির্বাচন কমিশনের নৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অর্থনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের একটি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারাবার পর নেতৃবৃন্দ সহজ শিকার হন অর্থনৈতিক দূর্নীতির মামলায়। কাজেই নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে এ ধরনের হয়রানির আশংকা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা বন্টন করে যার প্রতিদান তারা ভোটের বাক্সে পেতে চায়। সুবিধা বন্টন শুধু ভোটারদেরকে নয়, যারা ভোটকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের কাছেও পৌছানো হয়, তার পরেও নির্বাচনে বিনিয়োগের ক্ষমতা সবসময় শাসকদলের অনেক অনেকগুনে বেশী থাকে। বর্তমান শাসকদলের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অর্থনৈতিক সুশাসনের ঘাটতি থেকে উৎসারিত হয়েছে বললে, তা বেশী বলা হবে না। বিদ্যুৎ রেন্টাল, নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মানসহ সকল সরকারী ব্যয়ই গুণগতভাবে প্রশ্ন সাপেক্ষ। কাজেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন একমাত্র সমাধান বলে সব শাসকদলই মনে করে।

অনিশ্চিত রাজনৈতিক সুশাসন : অবাধ, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর রাজনৈতিক সুশাসনের সুচনা হতে পারে। আর বিকাশ ঘটতে পারে রাজনৈতিক সুশাসনই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুশাসনের । মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুশাসন নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথকেই সুগম করে। কিন্তু সামনের নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবার সম্ভাবনা যেমন এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, তেমনি আস্থা তৈরী করতে পারেনি সবার মনেও। কাজেই রাজনৈতিক সুশাসনের অনিশ্চয়তা থাকবে কি থাকবেনা –তা বলার সময় এখনও আসেনি।

 

ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি : দিল্লির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র

আসিফ হাসান ::

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের হুমকিকে তোয়াক্কা না করে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে ভারত।  কেবল এই ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরকালে দুই দেশ আরো কয়েকটি চুক্তিতে সই করেছে।  এতে করে ভারতের মনোভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে ; আর তা প্রকাশ করতে রাখঢাকও করছে না ওয়াশিংটন।

বিশেষ করে মার্কিন সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরাই এখন ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। এই চুক্তির ফলে রুশ ও চীনা অস্ত্রের বিপরীতে মার্কিন অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে ধারণা যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে আসছিল, তাতেও চিড় ধরেছে।  মার্কিন অস্ত্র বাদ দিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অস্ত্র কেনার এই উদাহরণটি অন্যান্য দেশও ব্যবহার করতে পারে। তাতে আরো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র- এমনটাই এখন আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের।

সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড ওয়াশিংটন এক্সামিনারকে বলেন, রুশ-ভারত চুক্তিটি ভারত-মার্কিন সমঝোতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা যখন রুশ অস্ত্র কেনা নিয়ে কথা বলে, তখন এর কী অর্থ হতে পারে, তা খুবই পরিষ্কার।

রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যে এস-৪০০ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তির ফলে ভারতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে বড় ধরনের অস্ত্র কিনলে তাদের ওপরও অবরোধ আরোপ করা হবে।

তাছাড়া রুশ-ভারত ওই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতামূলক চুক্তি ‌”সিওএমসিএএস”-এর কার্যকারিত হ্রাস হতে পারে বলেও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান বব কোরকার বলেন, ভারতের সাথে সিওএমসিএএসএ চুক্তি সই করা ছিল বিরাট এক অগ্রগতি। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছিল। ভারতের উচিত হবে না মার্কিন অবরোধ আরোপ হয় এমন কিছু করে এই অগ্রগতি হ্রাস করা।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইক পম্পেইও এবং ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে সই হওয়া ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারতের কাছে স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তর ও গোয়েন্দা তথ্য তাৎক্ষণিক সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

বেশকিছুদিন ধরে   ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের মোদি সরকার যেমন অতি-আগ্রহী ছিল, যুক্তরাষ্ট্রও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিল ব্যবসার সাথেসাথে আঞ্চলিক ও ভারত মহাসাগরকেন্দ্রীক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকা আর হিন্দু ভারতের মিলন বেশ সহজ মনে হতব বলে মনে করা হচ্ছিল।

এর মধ্যেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্য নয়াদিল্লীতে যে ২+২ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের অংশীদারিত্বের সম্পর্ক অনেকখানি এগিয়ে যায়।

যেকোনো দিক থেকেই ওয়াশিংটনের জন্য এটা ছিল বিজয়। বহু বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ব্যবসার চুক্তির দুয়ার এখন খুলে যাবে-এটাই ছিল প্রত্যাশা। একই সাথে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্রশান্ত জোটের দিকেও ভারতকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। এভাবেই ২+২ সংলাপ থেকে একক বৃহৎ যে অর্জনটা হয়েছে সেটা হলো কমিউনিকেশান্স কমপ্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট (সিওএমসিএএসএ) চুক্তি স্বাক্ষর। এই চুক্তির অধীনে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়বে, আমেরিকা ভারতের কাছে স্পর্শকাতর প্রযুক্তি রফতানি করতে পারবে এবং মার্কিন গোপন তথ্যভাণ্ডারের সুবিধা পাবে ভারত।

২+২ সংলাপের পর যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছে, সেখানে দুই বাহিনীর পারস্পরিক বিনিময়ের মাত্রার দিকটিতে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘অন্যতম প্রতিরক্ষা সহযোগি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এছাড়া এতে রয়েছে – ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক রফতানি (১৬ বিলিয়ন ডলার); ভারতের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রফতানির উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া; লাইসেন্স-মুক্তভাবে মার্কিন প্রযুক্তি কেনার জন্য ভারতের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়গুলো।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ২+২ সংলাপকে যেভাবে ‘সবচেয়ে ফলপ্রসু, ইতিবাচক ও সুফলদায়ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, সেটাকে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে : আজকের বৈঠক একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রার সূচনা করল… আমাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বের ব্যাপারে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সবচেয়ে প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে.. । এই অর্জন.. একটা বৃহৎ ইতিবাচক শক্তি সৃষ্টি করেছে, যেটা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে… আমাদের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছেন যে, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই… আমাদের আলোচনা ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ককের ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। আমাদের অভিন্ন স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা এ অঞ্চল ও এ অঞ্চলের বাইরে শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এক সাথে কাজ করতে পারব।’

এই প্রেক্ষাপটেই সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার মন্তব্য করেছিলেন মোদির ‌‌”মেক ইন ইন্ডিয়া”র সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও বাণিজ্য উদ্যোগের সমন্বয় সাধন ঘটেছে। আর ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ভারসাম্যের পুনঃব্যবস্থার সমন্বয় ঘটে। কার্টার বলেন, ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যবাহী মিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করেছে।। মার্কিন নেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্কের সাথে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াও সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে।

সবই যখন মিলে যাচ্ছিল, তখনই মঞ্চে রাশিয়ার উপস্থিতি ঘটে।  যুক্তরাষ্ট্রের সব হিসাব পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের হুমকিতে পড়ে গেছে ভারত। তবে ভারতের সেনাপ্রধান একে গুরুতর কিছু নয় বলে মনে করছেন।

জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেন, রাশিয়ানরা যখন আমেরিকান অবরোধের কথা জানতে চেয়েছিল, আমার জবাব ছিল ”এই যে হ্যাঁ আমরা জানি যে আমাদের ওপর অবরোধ আরোপ করা হতে পারে। কিন্তু আমরা স্বাধীন নীতি অবলম্বন করব। আমরা আমেরিকান প্রযু্ক্তি গ্রহণ করব। তবে অনুসরণ করব স্বাধীন নীতি ”।

ভারত স্নায়ুযুদ্ধের সময় জোট নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিল। তারা ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে জোট গড়তে চায়নি। তবে ওই সময় সামরিক সম্ভারের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। এর রেশ ধরেই বর্তমানে রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠেছে ভারতের জন্য।

এই অস্ত্র কেনা সত্ত্বেও ভারতের ওপর যাতে অবরোধ আরোপ না করা হয়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস এই লবিটি বেশ জোরালোভাবে করছেন।

কিন্তু সেটি ফলপ্রসূ হবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সাথে রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে। রুশ-ভারত সম্পর্কে সে বিষয়টির দিকেও নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

ল্যাঙ্কফোর্ড বলেন, দিল্লির সাথে সামরিক চুক্তির ফলে ভারতে সরবরাহ করা মার্কিন অস্ত্র সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা পেয়ে যাবে রাশিয়া।

তবে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতে মোতায়েনের আগে পর্যন্ত ভারতের ওপর মার্কিন অবরোধ আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে।

সাংবাদিক খাশোগি ‘হত্যা’ : সৌদি রাজতন্ত্রের ভবিষ্যত কী ?

এম. জাকির হোসেন খান ::

জামাল খাশোগি একজন প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক- যিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েত অভিযান, ওসামা বিন লাদেনের উত্থানসহ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সংবাদ কভার করেছেন। গত বছর আমেরিকায় যান স্বেচ্ছা নির্বাসনে এবং ওয়াশিংটন পোস্টে প্রতি মাসে কলাম লিখতেন- যেখানে তিনি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখা লিখেছেন। প্রথম কলামেই তিনি লেখেন, যুবরাজ সালমান বাদশাহ সালমানের স্থলাভিষিক্ত হলে খাশোগি ভিন্নমত পোষণের কারণে গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস প্রিয়ার সান্নিধ্যে যাওয়ার প্রস্তুতিপর্বেই জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়, প্রথমে বলা হয়েছিল ‘‘দুর্বৃত্তরাই’’ ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত কনস্যুলেট ভবনের ভেতরেই সাংবাদিক জামাল খাশোগির মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করেছে সৌদি আরব। সৌদি দাবি, হাতাহাতি থেকে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গোয়েন্দা উপপ্রধান ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এক উপদেষ্টাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৮ জন সৌদি নাগরিককে। নানা নাটকীয়তার পর এর মধ্য দিয়ে খাশোগির ব্যাপারে তুরস্কের দাবি সত্য বলে প্রমাণিত হলো। ঘটনার ১৭  দিন পর ‘হাতাহাতির একপর্যায়ে খাসোগির মৃত্যু’ হয়েছে বলে বিবৃতি দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর আগ পর্যন্ত ঘটনার ব্যাপারে টানা অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল দেশটি।

খাশোগি ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি কনসুলেটে প্রবেশ করার পরপর সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়। তাদের তদন্তকারীদের হাতে নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। আল জাজিরা ছাড়াও রয়টার্স খবর দিয়েছে, তুরস্কের কর্তৃপক্ষের কাছে একটি ১১ মিনিটের অডিও রেকর্ড রয়েছে, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। ১১ মিনিটের অডিওর টেকনিক্যাল ভয়েস বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, সেখানে খাশোগি ছাড়াও ৩ সৌদি পুরুষ কণ্ঠের আওয়াজ পাওয়া যায়। অডিও থেকে আরও বোঝা যায়, কনস্যুলেটে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই আক্রমণের শিকার হন তিনি। জামাল খাশোগির হাতে থাকা অ্যাপল ওয়াচে ধারণকৃত অডিওর চেয়ে ভিন্ন আরেকটি সূত্র থেকে এই অডিও হস্তগত হয়েছে তুর্কি কর্তৃপক্ষের কাছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই অডিও অনেক দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবও রয়েছে। তুরস্কের দাবি ছিল, এখন আমরা কনস্যুলেটের মধ্যে নিখাদ প্রমাণ সংগ্রহের পর্যায়ে রয়েছি। তুরস্কে আসা ১৫ সদস্যের একটি সৌদি দল এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ আঙ্কারার। তবে তখন পর্যন্ত খাশোগিকে হত্যার কথা কড়া ভাষায় অস্বীকার করেছে সৌদি আরব। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে খাশোগিকে কনসুলেট ভবনের ভেতরে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে, এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে গণমাধ্যমগুলোতে।

অন্তত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, খাশোগির সম্ভাব্য হত্যার পুরো ঘটনাটিই বেঁধে দেওয়া ছক অনুসারেই সাজানো ছিল। আর তা বাস্তবায়নে ১৫ জনের যে দলটি সৌদি আরব থেকে ইস্তাম্বুলে  যায় তার অন্তত দুজন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, দেশে-বিদেশে একাধিকবার তাদের দেখা গেছে যুবরাজের পাশে। শুধু তাই নয়, ১৫ জনের ১১ জনই সৌদি নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য। তিনজন বিন সালমানের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। সৌদি আরবের বহু কর্মকর্তাই মনে করেন, ৩৩ বছর বয়সী প্রিন্স বিন সালমানের অজ্ঞাতে এত বড় কান্ড ঘটতে পারে না, তাঁর অনুমোদন সাপেক্ষেই খুন হন খাশোগি। নিখোজ হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল যে খাশোগী কনস্যুলেট হতে বেরিয়ে গেছেন, তুরস্কের পক্ষ থেকে এর প্রমাণ চাওয়া হলে তা সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে রিয়াদ। তাছাড়া, কেন খাশোগির নিখোঁজের দিন তার কনসুলেটে প্রবেশের আগেই কেন কনসুলেটের কর্মচারিদের চলে যেতে বলা হলো। সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি দায়ী নাই হয়ে থাকবে তবে কেন তুরস্কের ইস্তানবুলে নিযুক্ত সৌদি আরবের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ আল-ওতাইবির বাসভবন তল্লাশির আগেই তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে গেলেন।

উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহ আগে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট ভবন থেকে সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায় ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে প্রথমবারের মতো তুরস্কের একটি তদন্তকারী দল কনসুলেট ভবনে অনুসন্ধান এবং সৌদি আরবের কনসাল জেনারেলের বাড়িতে তল্লাশি চালায় তুর্কি পুলিশ। ওই নয় ঘণ্টার অনুসন্ধানে খাশোগিকে হত্যার আলামত পেয়েছেন বলে দাবি করেছে তুর্কি পুলিশ। অনুসন্ধানের বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, মিশনে তারা বিষাক্ত বস্তুর সন্ধান করেছেন। তিনি বলেন, আমি আশা করি যত দ্রুত সম্ভব আমরা আপনাদের গ্রহণযোগ্য উপসংহার দিতে পারব। কথায় বলে, অপরাধী তার অপরাধের সাক্ষ্য কোনো না কোনভাবে রেখে যায়। স্বীকার করেছে সৌদি আরব স্বীকার করে ও জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে আপাতত চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে- এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত নির্দেশদাতা কে ছিলেন?

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে- খাশোগির পরিবার তার অন্তর্ধানের ঘটনা তদন্তে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের আবেদন জানিয়েছে। জামাল খাশোগি নিখোঁজের ঘটনায় যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা খাশোগির নিখোঁজের ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতিই আঙুল তুলেছেন। সৌদি আরবের ইস্তাম্বুল কনসুলেট ভবনে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার রেকর্ডকৃত প্রমাণ চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তুরস্ক সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেওয়ার পরও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘‘আমি মনে করি সেখানে কী ঘটেছিল, প্রথমে তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আপনারা ভাবছেন, নিরপরাধ (?) প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী, কিন্তু আমি এমনটি মনে করি না”। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যা ধামাচাপা দিতে সৌদি আরবকে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, খাসোগির ভাগ্যে কী ঘটেছে, দ্রুত সেই রহস্য উন্মোচিত হোক এমনটাই চান তিনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সাথে মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং এই সম্পর্কের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইহুদি বা ইসরাইল লবির ভূমিকা আছে বলেও এখন বলা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কথিত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে মোকাবেলা বিন সালমানের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে আবির্ভূত হন আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কাতার এবং তুরস্কের সাথে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বিরোধ জটিল আকার ধারণ করে। পশ্চিমা বিশ্বে প্রথম দিকে মোহাম্মদ বিন সালমানকে তুলে ধরা হয়েছে একজন সংস্কারকামী রাজপুত্র হিসেবে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া সাংবাদিক টমাস ফ্রিডম্যান প্রশংসা করে লিখেছিলেন, ‘সৌদি আরবে আরব বসন্ত শুরু হয়ে গেছে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের নিজের সমাজের জন্য আছে বড় বড় পরিকল্পনা।’ সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি প্রদান, সিনেমা হল চালু করা, স্টেডিয়ামে এক সাথে নারী ও পুরুষের খেলা দেখার অনুমতি দেয়াকে মোহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কারের নমুনা হিসেবে পশ্চিমা গণমাধ্যমে হাজির করা হলেও এর আড়ালে ঢাকা পড়েছে ‘ইসলামী ব্রাদারহুড’ সমর্থকসহ ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর নিপীড়ন ও সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের রক্তাক্ত ঘটনা। বিন সালমানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের পেছনে বড় কারণ ছিল বিপুল অঙ্কের অস্ত্র কেনার চুক্তি এবং ইরানকে কোণঠাসা করতে ইসরাইল ঘেঁষা নীতি বাস্তবায়ন। একই সাথে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি ট্রাম্প ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এমবিএস’র অস্তিত্ব যেন হুমকির মুখে না পড়ে, সেজন্যই এ ঘটনা ধামাজাপা দিতে ওই লবি সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে অনেকেরই ধারনা।

বাস্তবে এমবিএস’কে রক্ষা করার নামে ‘ডলার মেশিনকে’ রক্ষা করতেই এরা সবাই অবস্থান নিয়েছে। সাংবাদিক খাশোগির নিখোঁজ রহস্যের জবাব পেতে সৌদি আরব সফর করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক  পম্পেও এবং খাশোগির ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেয়ায় বাদশাহ সালমানকে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, এমবিএস কর্তৃক ইয়েমেনে অনৈতিক গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতার দাপট দেখানোর ফলে লাখ লাখ শিশুর জীবন হুমকির মুখে, প্রতিনিয়ত শত শত নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। এর আগে কাতারকে একঘরে করতে অবরোধ করলে তুরস্ক কাতারের পাশে দাড়ায়। এমনকি মোহাম্মদ বিন সালমান লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে রিয়াদে ডেকে সেখানে বসেই পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য করলেন, বিভিন্ন নাটকীয়তার পর তিনি দেশে ফিরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। আর প্রতিপক্ষ ইরানকে কোণঠাসা করতে সৌদি যুবরাজ সম্ভাব্য সবকিছুই করে চলছেন, এমনকি যে কারো সঙ্গে হাত মেলাতে তাঁর দ্বিধা নেই এবং ফিলিস্তিনের ওপর গণহত্যা চালানো ইসরায়েল এখন সৌদি রাজতন্ত্রের বড় ‘দোস্ত’। সৌদ পরিবারের কট্টর সমালোচক খাশোগি হত্যাকান্ডের মাধ্যমে এমবিএস বহির্বিশে^ তার সমালোচকদের একটা কড়া বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। আর তা যে বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করেই করেছেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। জামাল খাশোগির অন্তর্ধান এমবিএস কর্তৃক ভিন্ন মতাবলম্বীদের কঠোরভাবে দমনের নীতির একটা চিত্র মাত্র। কিছু দিন আগেও ধর্মপ্রচারক সালমান আল আওদাহকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। রাজপরিবারের সদস্যসহ অনেককেই অন্তরীণ রাখা হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে জামাল খাশোগি আন্তর্জাতিক অপরাজনীতির শিকার। প্রচন্ড আন্তর্জাতিক চাপে আছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে একঘরে হওয়ার উপক্রমে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে হুংকার দিলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফেলে সালমান প্রশাসনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। সৌদি রাজতন্ত্রকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ লুটতে দুর্বল বা লেজিটেমেসিহীন সরকারই তো তাদের পছন্দ হওয়ার কথা!

উল্লেখ্য, নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা যায়, সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও যখন সৌদি আরব সফর করছিলেন, তখন সৌদি সরকার সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সহায়তার জন্য গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসনকে সৌদি আরবের প্রতিশ্রুত ১০০ মিলিয়ন ডলার সৌদি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, জামাল খাশোগির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছিল এই অর্থ প্রদানের মাধ্যমে তা অনেকটা স্বাভাবিক হবে।

এর আগে সৌদি আরবকে উসকিয়ে কাতারের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সৌদি আরবের সাথে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা করে ট্রাম্প প্রশাসন। তাছাড়াও সম্প্রতি সৌদি সরকারি মালিকানাধীন তেল কোম্পানী আরামকো’র ৫% শেয়ারের মালিকানা বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সাম্প্রতিক তা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ শেয়ার যেন চীন বা অন্য কোনো প্রতিদ্ব›দ্বীর হাতে না যায় সেজন্যই সৌদ প্রশাসনকে চাপে রাখতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। জামাল খাশোগির অন্তর্ধান সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মোহাম্মদ বিন সালমান  রাজপরিবার ও সৌদি নাগরিকদের সমর্থন অনেকটা হারিয়েছেন। জামাল খাশোগি হত্যার সাথে সৌদি সম্পৃক্ততায় বিন সালমানের ওপর হোয়াইট হাউজের সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে আসল কার্ড তুরস্কের হাতে থাকায় আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদ প্রশাসন তুরস্কের সাথে অর্থনৈতিক ও ক‚ুটনৈতিক ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার মাধ্যমে সমস্যার সমধাধানের চেষ্টা করবে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের পতন হলে সবচেয়ে বেশি ‘ক্ষতিতে পড়তে হবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে। তবে সৌদি আরবের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসসহ নানা মহল থেকে চাপ অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের তাঁবুকে রাশিয়ার সেনাঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়া  যেখান থেকে সিরিয়া, ইসরাইল, লেবানন ও ইরাকে নজরদারি করা যাবে। তেল অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি বাস্তবে করতে চাইলে এমবিএস’র পরিবর্তে হোয়াইট হাউজ নতুন ক্রাউন প্রিন্স বেছে নিতে পারে, যা আঞ্চলিক রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

‘রাষ্ট্র আমাদেরও’- এই বোধ পুন:প্রতিষ্ঠার স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন

সি আর আবরার ::

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের কিশোরেরা দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় রচনা করেছে। বাংলাদেশের পরিবহন খাতের সব নোংরামি সমাধান করার তাদের অধিকারের বিষয়টি ঘোষণা করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার লোক প্রাণ হারায়, লাখ লাখ লোক আহত হয়। তাদের অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। এসব ঘটে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন করার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নাগরিক সমাজ দশকের পর দশক করে আহ্বান জানাতে থাকলেও তা  এই খাতের সংশ্লিষ্টদের কানে ঢোকেনি। রাজনীতিবিদ, ভাড়ায় খাটা স্বঘোষিত ইউনিয়নকর্মী ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি লোকজনের সমন্বয়ে কায়েমি স্বার্থেন্বেষী মহল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক পুলিশ) বজ্রমুষ্টি প্রতিষ্ঠা করেছে, আইন-শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ ভন্ডুল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দায়মুক্তি ভোগ করে এই মহলটি আদালতের আদেশ বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ও রুখে দিতেও সফল হয়।

সাধারণ মানুষের এ ধরনের অসহায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের শেষদিকে একটি বাসের চাপায় দুই কলেজছাত্র নিহত হলে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ছাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির, তিনি জাহাজ চলাচল মন্ত্রীও, অনুভূতিশূন্য ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য বিক্ষোভকারীদের বিচার পাওয়া ও সমস্যার সুরাহার ব্যাপারে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে গিয়ে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়। অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য শহর ও নগরীতে দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে শত শত, হাজারে হাজারে রাস্তায় নেমে এসে বিচার ও রাস্তায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাতে থাকে। তারা নিবন্ধিত ও চলাচলযোগ্য যানবাহন কেবলমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই যাতে চালাতে পারে, এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনটির বাস্তবায়নের দাবি জানাতে থাকে।

ট্রাফিক পুলিশের অদক্ষতা ও দুর্নীতি এবং পরিবহন সিন্ডিকেট ও তাদের গডফাদারদের সাথে তাদের যোগসাজসে হতাশ হয়ে ছাত্ররা ঢাকা নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধু হয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ছাত্ররা, মূলত কিশোর, স্কুলের পোশাক পরে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে, রোদ-বৃষ্টিতে প্রচন্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়েও সফলভাবে এমন এক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে যা অতীতে কোনো সময়ই এই মেট্রোপলিটান নগরী দেখতে পায়নি।

নিবন্ধিত ও চলাচল উপযোগী গাড়ি কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে চালানো নিশ্চিত করার কাজটি করে  তরুণ তুর্কিরা। তারা গাড়ির যাত্রীদের সিট বেল্ট বাঁধতে পরামর্শ দিয়েছে, মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরতে, পথচারীদের ফুটপাথ, জেব্রা ক্রসিং, ফুট ব্রিজ ব্যবহার করতে অনুরোধ করেছে। মোড়ে রিকশাগুলো যাতে এলোমেলোভাবে না চলে, তাতেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো প্রধান প্রধান রাস্তায় এক লেনের খালি রাখা হয় জরুরি যানবাহন চলাচলের জন্য।

স্ব-নিয়োজিত কিশোর আইনপ্রয়োগকারীরা ভদ্র, তবে দৃঢ়। যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই এক সিনিয়র মন্ত্রীকে তার পথ পরিবর্তন করে সঠিক পথে চলতে বলে। যথাযথ নিবন্ধন কাগজপত্র সাথে না থাকায় আরেক মন্ত্রীকে তারা গাড়িটি ছেড়ে দিতে বলে। আইন সমুন্নত রাখার চেতনায় যথাযথ নথিপত্র না রাখায় তারা ডিআইজি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও নৌবাহিনীর গাড়ি থামিয়ে দেয়।

তবে গাড়িচালকেরা যখন তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস কাগজপত্র প্রদর্শন করতে চায়নি, তখন কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি ভাংচুর করেছে। কোনো কোনো মোড়ে বিক্ষোভকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যান চলাচলে বিরূপ প্রভাব পড়ে, পথচারীদের বেশ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও ছাত্র বিক্ষোভকারীরা মোটামুটিভাবে নগরবাসীর কাছ থেকে উষ্ণ সাড়া পায়। সামাজিক মাধ্যমে তাদের প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। জনসাধারণ তাদেরকে আশ^স্ত করে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কিছু সমস্যা ও জটিলতা তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। অনেকে তো এমনও বলে, যানজটের প্রচন্ড কষ্ট এবং তাদের স্বার্থের সাথে বলতে গেলে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন মিছিল-সমাবেশের কারণে তাদের যে ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তার তুলনায় এই সাময়িক দুর্ভোগ অনেক ভালো।

কিশোরদের বিক্ষোভ কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাদের জন্য মায়েরা স্নাকস ও বোতলের পানি নিয়ে আসে। এক ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শিশু বিক্ষোভকারীদের খিচুরি খাওয়াচ্ছেন। এটি কিশোরদের প্রতি সমর্থনের গভীরতা প্রকাশ করে। বিক্ষোভের চতুর্থ দিনে অভিভাবক, মা-বাবাসহ সাধারণ মানুষ র‌্যালিতে যোগ দেয়। যথেষ্ট হয়েছে আর নয়- এই ছিল তাদের কথা। তারা সবাই সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করার দাবি জানায়। বিক্ষোভকারীদের ন্যায়সঙ্গত বক্তব্য সেলিব্রেটিদেরও উদ্দীপ্ত করে। ছাত্রদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পীরাও এগিয়ে আসে। তারা একসাথে জাতীয় কবির উদ্দীপনাময় রণসঙ্গীত ‘চল চল চল’ গায়।

অনেক দিক থেকেই এই বিক্ষোভ অনন্য। কিশোরেরা আবেদনময়ী শ্লোগান, কবিতা ও গান রচনা করে, গায়। এটি আইনের শাসনে প্রতি কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং আইন কিভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে, তারই একটি প্রদর্শনী। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কর্মসূচি নয় এটি, বরং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যে কত জরুরি, তার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যবস্থা। এটি রাজনৈতি ক্ষমতা দাবি করার ব্যাপার নয়, বরং এর মাধ্যমে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিক্ষোভকারীরা প্রমাণ করেছে, দায়িত্ব পালনের সদেচ্ছা ও দায়বদ্ধতা থাকলে রাষ্ট্রীয় অর্থপুষ্ট পেশাদার বাহিনীগুলো দশকের পর দশক ধরে যে কাজ করতে পারছে না, তা-ও করা সম্ভব।

ছাত্ররা সরকারের কাছে তাদের ৯ দফা দাবি পেশ করে। ছাত্রদের ব্যাপক তৎপরতা ও জনগণের কাছ থেকে প্রবল সমর্থন পাওয়ায় সরকার এসব দাবির কিছু অবশ্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এসব দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে মন্ত্রীদের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরও তা রক্ষা করা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ায় তারা রাজপথ ছেড়ে দিতে অনীহা প্রকাশ করে। কোটা আন্দোলনের প্রতি প্রধানমন্ত্ররি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ধীরে চলো কৌশল এখনো তাদের মনে গেঁথে রয়েছে।

একইভাবে নতুন পরিবহন আইনের প্রতিশ্রুতির প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে অতি সামান্য। অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই তারা মনে করছে, নতুন আইনের ব্যাপারে কথার ফানুশ নয়, বরং প্রয়োজন বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া ও সিনিয়র মন্ত্রীদের আন্দোলনটিকে বিএনপি-জামায়াতের ছলাকলা হিসেবে অভিহিত করার ফলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে আরো সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক দিনে প্রাণঘাতী অস্ত্র হাতে মুখোশধারী লোকদের, তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও শ্রমিক শাখার কর্মী বলে অভিযোগ রয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ পলকা বিশ্বাস আরো কিছুটা ক্ষয়ে দিয়েছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই বৈধ ও জনপ্রিয় নাগরিক আন্দোলন একটি খোলা প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাবে। এই ইস্যুর ন্যায়সঙ্গত, যৌক্তিক ও আশু সমাধানের দায়িত্ব পুরোপুরি সরকারের কাঁধে। এই ঘটনার প্রধান উস্কানিদাতা মন্ত্রীর পদ থেকে কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির পদ থেকে শাজাহান খানের অপসারণ উত্তপ্ত পরিবেশ অনেকাংশেই প্রশমিত করতো। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার সত্যিকার ব্যবস্থা ও  ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নই সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করবে। ছাত্রদের ওপর যেকোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শন, বিদ্রুপ করা ও শক্তিপ্রয়োগ করা হলে (কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এ ধরনের পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে) পরিস্থিতির আরো ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।

বিক্ষোভকারীদের দখলে থাকা রাস্তায় একটি পোস্টারে লেখা ছিল : ‘রাষ্ট্রের মেরামত কাজ চলছে : সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ আমরা আশা করতে পারি, কর্তৃপক্ষ তাদের আহ্বানে কর্ণপাত করবে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সত্যি সত্যিই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

(সি আর আবরারঅধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

শিশু-কিশোররাই ফিরিয়ে এনেছে সাহস-দ্রোহ আর জীবনের জয়গান

শাহাদত হোসেন বাচ্চু:

রাজধানীসহ সারাদেশ এখন শিশু-কিশোরারণ্য। কিছু প্লাকার্ড চোখে পড়ছে। অসামান্য, অনবদ্য। “উই ওয়ান্ট সেইফ বাংলাদেশ…উই ওয়ান্ট জাস্টিস”- দাবি নিয়ে শিশু-কিশোররা রাস্তায়। এ দাবি আপামর জনগনের; কিন্তু তারা সাহস হারিয়ে ফেলেছে, দ্রোহ অবশিষ্ট নেই। রাস্তায় নেমে আমাদের শিশুরা সেই সাহস-দ্রোহ ফিরিয়ে এনেছে। জীবন থেমে নেই। জীবনের জয়গান ফিরিয়ে আনতে সারা বাংলাদেশ এখন রাস্তায়। প্রতিপক্ষ পুলিশ এবং পরিবহন শ্রমিকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। মন্ত্রী, বিচারপতি, সরকারী কর্তাদের ড্রাইভারদের লাইসেন্স নেই ! শিশুরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে  দিচ্ছে, এক অরাজক বাংলাদেশে কতটা অনিরাপদ আমরা !

এক. লিখতে বসে ভয় হচ্ছে। ভয় পেয়েছেন কর্তারাও। শিক্ষামন্ত্রী স্কুল বন্ধ করে দিয়ে ভয়-তড়াস ঠেকাতে চাইছেন। শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। পিটিয়ে, কাঁদানে গ্যাস-রাবার বুলেট ছুঁড়েও ঘরে ফেরানো যাচ্ছে না অদম্যদের। তারা বিচার চায়। নিরাপদ সড়ক চায়। সরকার বিচার দিতে পারে না, নিরাপত্তা দিতে পারে না। বদলে পিটিয়ে, জখম করে বিচারপ্রার্থীদের দমাতে চায়। আর দাবি মেনে নেয়ার প্রহসন করে !

ভয় হচ্ছে! কতরকম ভয়ে এখানে মানুষ মরছে। প্রকৃতির হাতে মরছে। শক্তির হাতে মরছে। গুম হয়ে, ‘বন্দুকযুদ্ধে মরছে’। অস্বাভাবিকতার হাতে মরছে। দায়িত্ব জ্ঞানহীনতায় মরছে। দেখার কেউ নেই বলে মরছে। চলছে মৃত্যুর মিছিল। আরো মরছে সুশাসনের অভাবে। কি বলবো, “এই মৃত্যুর উপত্যকা আমার দেশ নয়”-বল্লেই কি দেশ বদল হয়ে যাবে? কিংবা আমাদের সন্তানেরা ফিরে পাবে এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড”র মত দেশ?

কোন বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের নীতি-কুশলীরা ভাবছেন? এই দেশ নিয়ে তারা গর্ব করেন উন্নয়নে ভাসিয়ে দেয়ার। স্বপ্ন দেখান মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার। কৌশল নির্ধারন করেন, পরিকল্পনাও গ্রহন করেন। কিন্তু তারা জানেন না এর বাইরেও একটি সমাজ অবয়ব পাচ্ছে। মূলধারার কুশীলবরা সে খবর কতটুকু রাখেন, জানি না। এজন্যই শিশু শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দেখে তারা চমকে উঠছেন। কারণ নব্বইয়ের পরে এই বাংলাদেশকে তারা ভুলেই গিয়েছিলেন।

দুই. রাষ্ট্র-সরকারের সবস্তরে একধরনের ‘অপরাধীকরণ’ (Criminalization)  দৃশ্যমান। আইনের শাসন এবং বিচারহীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অসহনশীলতা এবং বৈষম্য এক দেশকে অনেক দেশে রূপান্তরিত করছে। এর বিপরীতে জন অসন্তোষ এবং মানুষের অধিকারগুলিকে কর্তৃত্ব ও শক্তি দিয়ে দলিত করা হচ্ছে। সরকারের ভেতরের সরকার এই পন্থাকে উস্কে দিচ্ছে, মদত দিচ্ছে আবার চরমপন্থায় দমনও করছে। বিচারহীনতার বিপরীতে ‘অপরাধী মনোজমিন’ স্থায়িত্ব লাভ করছে।

‘অপরাধী মনোজমিন’র একটি বড় উদাহরন পরিবহন সেক্টর। এখানে একটি মাফিয়া চক্র বাংলাদেশে সবকালে সক্রিয়। তারা সর্বকালে সরকারের অংশ হয়ে ভেতরের সরকার। এখানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বেসরকারী খাতে পরিবহন কোম্পানীগুলির মালিক। আবার তারাই শ্রমিক নেতা। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং মশিউর রহমান রাঙ্গা পরিবহন শ্রমিকদের দুই শীর্ষ নেতা। এরা চাইলে সারাদেশে জনদুর্ভোগ নামিয়ে আনতে পারে। নামিয়ে আনতে পারে ভয়াবহ নৈরাজ্য।

যাত্রীসেবায় সরকার কোন আইনী উদ্যোগ নিতে গেলেই ভেতরকার সরকার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য যাত্রীদের পক্ষে প্রণীত কোন আইনই জনগনের পক্ষে যায়না। পরিবহন মালিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষ এবং মন্ত্রী-আমলা সবাই একাট্টা হয়ে যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে, পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির হয়, পরিমান বছরে হাজার কোটি টাকা। এজন্য এই সেক্টর সবসময় ক্ষমতাসীনদের দখলে  ধারাবাহিক নৈরােজ্যর কবলে থাকে। সঙ্কটে পড়লে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অংশ হয়ে পড়ে।

পরিবহন সেক্টরে মালিকদের লাভালাভই প্রধান বিষয়। শ্রমিকদের কাজটি অমানবিক এবং অমর্যাদার। জীবনমানের উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কখনও। সেজন্য তারাও পথে পথে নানা সুযোগ নেয় বাড়তি আয়ের আশায়। শ্রমিকদের পেশাগত জীবনে বেতন-মর্যাদা প্রদানে এই সেক্টরে কোন সিষ্টেম গড়ে তোলেনি। মালিকদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর জীবন-জীবিকা নির্ভর। ফলে একটি প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে এই সেক্টরে আকৃষ্ট করা যায়নি, কাজে লাগানোও হয়নি।

অন্যদিকে সরকার পক্ষ, যখন যারাই ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিকদের ব্যবহার করেছেন। সরকার থেকে কোন দায়িত্বশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অথরিটি তৈরী হলেও তারাও ‘মাফিয়া চক্র’ ভাঙ্গতে পারেণি। ফল হয়েছে, ব্যক্তি খাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলাকে সঙ্গী করে। শ্রমিকদের নিয়ে কিছু রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা ‘মাফিয়াতন্ত্র’ গড়ে তুলে সর্বকালে সরকারের অংশ হয়েছে।

তিন. সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুঘর্টনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেল তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিক বার্তা ৩ মে ’১৮)।

তাঁর কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় পরের দিনই। দেরী করেননি মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলোঃ ৫ মে ’১৮)।

প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি চূড়ান্ত সত্য! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কী মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হচ্ছে সম্ভামনাময় আগামীর। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

চার. আপনি কি এমন কোন দেশ খুঁজে পাবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের দায়ে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্মঘট, অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে কোন সংগঠন? হ্যা পারে, বাংলাদেশে। মন্ত্রী শাহজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা’র নেতৃত্বে শ্রমিকরা আদালতের বিপক্ষে জনজীবনে নৈরাজ্য নামিয়ে আনতে পারে! আর নির্বিকার পুলিশ পরিবহন শ্রমিকদের বিপক্ষে কোন এ্যাকশনে যায় না। কিন্তু এই পুলিশই নির্বিচার লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ে, পিপার স্প্রে করে, জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনস্বার্থ নিয়ে যেকোন সমাবেশ-আন্দোলনে। শিশু-কিশোররাও বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পায় না।

সরকারের নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশানের কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা। বিষ্ময়ের বিষয় হচ্ছে এই দুই মন্ত্রী সরকারী বাসভবনে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে যে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আদালত বা সরকার কোন ব্যবস্থা তো দুরের কথা , প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখাননি।

গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

National Committee to Protect Shipping, Roads & Railways  নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপরোয়া গাড়ি চালনা।  ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

পাঁচ. এক বিশৃঙ্খল, অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে প্রতিনিয়ত সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুর হারকে বাড়াচ্ছে। পৃথিবীতে সড়ক, নৌ, রেলপথ ও আকাশ পথে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। বাংলাদেশে এরকম কোন দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ আছে বলে জানা নেই। থাকলে অনেকদিন আগেই চরম বিশৃঙ্খল এবং মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত হয়ে সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারতো। তাহলে এই অযাচিত মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে হ্রাস পেত।

সড়ক নিরাপত্তায় আরেকটি আইনের খসড়া প্রণীত হয়েছে। তাদের নিয়েই যারা কিনা, পরিবহন সেক্টরের ‘মাফিয়াচক্র’। এই আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের প্রায় কাউকে যুক্ত করা হয়নি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, এটিও আরেকটি প্রহসন হবে। প্রমান হচ্ছে, সড়কমন্ত্রী জানিয়েছেন দেশে ৩৬ লাখ গণপরিবহনের মধ্যে ১৮ লাখই অবৈধ। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করলে, ১৮ লাখ অবৈধ যানবাহনের মালিক, ড্রাইভার ও অন্যান্যদের আটক করতে হবে। ধরেই নেয়া যায়, বরাবরের মত আন্দোলন-বিক্ষোভ সামাল দিতে সরকার কিছু চটকদার বক্তব্য দিচ্ছে, দাবি মানার ভান করছে থাকবে। অন্তিমে জনগনের সাথে প্রহসন অব্যাহত থাকবে কারন তারা কতিপয়ের, সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়!

কোটা সংস্কার আন্দোলন : হাতুড়ি, রিমান্ড, নিস্ক্রিয়তা এবং কটাক্ষ

সি আর আবরার ::

বেসামরিক আমলাতন্ত্রে নিয়োগের বিতর্কিত ও পৃষ্ঠপোষকতামূলক কোটাব্যবস্থা সংস্কারের পর্যালোচনার দাবি জানাতে গিয়ে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররা ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতার মুখে পড়েছে। ৩০ জুন তারা কোটা সংস্কার প্রশ্নে গ্যাজেট প্রজ্ঞাপন জারির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক একটি পদ্ধতিকে অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার স্বার্থেন্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ এবং ‘সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা আর সময় ক্ষেপণ না করে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের সংগঠকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘সফলভাবে’ সংবাদ সম্মেলন ভন্ডুল করে দেয়। আর এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের উৎসাহী অনুসারীদের হাতে ভিন্নমত প্রকাশকারী ছাত্রদের ওপর দমনপীড়নের নতুন মাত্রা শুরু হয়।

কয়েকটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তায় মনে হয়েছে তারা অপরাধমূলক কাজে সহায়তা করছে এবং অন্য কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, তারা বিপুল উৎসাহে বিক্ষোভকারী, তাদের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে। সুস্পষ্টভাবে অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করে তাদেরকে আইন লঙ্ঘনের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার বদলে তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারীদের খুঁজছে, আটক করছে ও রিমান্ডে নিচ্ছে। তারা শক্তি প্রদর্শন করে শিক্ষক, অভিভাবক ও উদ্বিগ্ন নাগরিকদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। মন্ত্রীদের পাশাপাশি বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও এমনকি ভিসিরাসহ এস্টাবলিশমেন্টের অ-রাষ্ট্রীয় গ্রুপগুলো ক্ষুব্ধ ছাত্রদের ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবে অভিহিত করার  ক্ষেত্রে সুর মেলাচ্ছে।

মিডিয়ায় সহিংসতার মাত্রা ও তীব্রতা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অংশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের রড, বাঁশ, এমনকি হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র  নেতাদের ছবি ও ফুটেজ অহরহ দেখা যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের প্রতি বিনা উস্কানিতে সহিংসতা চালানো, ছাত্রীদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করার বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সাক্ষী-প্রমাণ প্রিন্ট মিডিয়ায় এই সহিংসতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এসব কিছু সত্ত্বেও সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল কোনো সদস্যের এ ধরনের কাজের সমালোচনা করা তো দূরের কথা, এগুলো ঠিক হয়নি পর্যন্ত তারা বলেননি। তার পরেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অপরাধীরা ভিন্নমত দমনের জঘন্য এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবাধ সুযোগ পেয়েছে। গত ১৫ জুলাই অবস্থার আরো অবনতি ঘটে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের দুই বিবেকবান শিক্ষক সহিংসতায় আহতদের সাথে সংহতি প্রকাশ করার কারনে অপদস্ত হন।

সহিংসতামূলক কাজ করে অপরাধীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের পবিত্রতাই লঙ্ঘন করেনি, ভিন্নমত প্রকাশের প্রতীকি সৌধ শহিদ মিনারের অলঙ্ঘনীয়তাও নস্যাৎ করেছে। প্রতিবাদকারীদের শান্ত করার জন্য সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সব ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা চালায় ; গুম ও ধর্ষণ; বাঁশ, রড, চাপাতি, এমনকি হাতুড়ি নিয়ে হামলা করে, নিগৃহীত ও অপহরণ করার হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনও করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে, তা দ্রুততার সাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সাভার, রংপুর ও দেশের আরো অনেক নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসকে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রাখার নামে অনৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করে সংগঠনটি ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার কাজে জড়িতদের’ হাত থেকে মুক্ত করার তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ।

কথাকে কাজে পরিণত করার একটি ঘটনায় শহিদ মিনারে প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রী আক্রান্ত হয়েছেন। আরেক ঘটনায় এক কোটা সংস্কার সমর্থককে লাইব্রেরি থেকে টেনে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লাইব্রেরিয়ানের সামনে প্রহার করার সময় তাকে আহত করে। কয়েকটি ঘটনায় ছাত্রলীগ প্রতিবাদকারী ছাত্রদের আটক করে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাদেরকে আইন-শৃঙ্খলা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিবাদকারীদের তাদের বাড়িতে ও হলে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতির জন্যে হুমকি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ রকমের হতাশাজনক। প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করা ও উদ্বেগ প্রশমিত করতে বলতে গেলে কিছুই করা হয়নি। দিনের পর দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতা চলা ও এতে ক্যাম্পাস জীবন বিঘ্নিত হলেও প্রক্টর এমন দাবিও করলেন যে, ‘এ ধরনের হামলা হওয়ার কোনো খবর তার জানা নেই’। তিনি দাবি করলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া গেলে, তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি হামলা ও হয়রানি থেকে ছাত্রদের রক্ষা করতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হলেও একজন মাত্র শিক্ষক ক্যাম্পাস সহিংসতার প্রতিবাদে নগ্ন পায়ে ক্যাম্পাসে এসে তার বিরক্তি প্রকাশ  করায় আসল কারন রেখে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বিরল সাফল্য লাভ করেছে। সহিংসতার শিকারদের প্রতি সমর্থন, সহানুভূতি প্রদর্শন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য ছুঁড়ে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতিগুলো হামলাকারীদের  পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া ভীতিকর যদি না-ও হয়ে থাকে, অন্তত তা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন কোটা সংস্কারপন্থী ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ভন্ডুল করার কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ায়, তখন পুলিশ সদস্যরা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহন না করে বরং শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ খালি করে দেয়। এ ধরনের যেকোনো সহিংস ঘটনার পর হামলাকারীদের গ্রেফতার করার বদলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকারদের আটক, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিচ্ছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক মাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি, ভিডিও ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুস্পষ্ট উদাসিনতা দেখা যায়। ডেইলি স্টারসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে হামলাকারীদের ছবি, নাম ও পদবি (ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে তারা রয়েছে) প্রকাশ করেছে। তারা অবাধে ক্যাম্পাসজুড়ে বিচরণ করলেও হামলার শিকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধাওয়ার মুখে পড়ছে। এক্ষেত্রে খুব কম সংশয়ই আছে যে, আইনকে নিজের ধারায় চলতে দেওয়া হলে বেশির ভাগ হামলাকারীই ক্ষতিকর অস্ত্র বহন, দৈহিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি সাধন, অন্যায়ভাবে আটক ও অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত হতো। মরিয়ম ফারার বক্তব্য ছিল মর্মভেদী। ছাত্রলীগের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে তাকে থানায় নিয়ে আরেক দফা অপদস্থ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ভাবতাম, থানা হবে নিরাপদ, কিন্তু এটা মনে হয়েছে দ্বিতীয় দোজখ।’

ছাত্রদের সক্রিয়বাদী বা অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও পাকিস্তানি পুলিশের গৃহীত বাড়াবাড়িকে লজ্জায় ফেলে সরকারি হাসপাতালগুলো মারাত্মক আহত অন্তত দুজন কোটা সংস্কারবাদী ছাত্রকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেছে। একটি ঘটনায় মা-বাবা অভিযোগ করেছেন, আহত ছাত্রকে একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকেও চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা সংস্থাগুলো সময় ক্ষেপণ না করে নির্দোষ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে, এমনকি আহতদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে সফলও হয়েছে। সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেটরা কোন যুক্তিকে এসব আবেদন মঞ্জুর করেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। হতভাগ্য ছাত্ররা তাদের ও জাতির ভবিষ্যতকে আক্রান্ত করতে পারে এমন সরকারি নীতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করার তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করছিল। তারা হামলকারী নয়, বরং হৃদয়হীন সহিংসতার শিকার।

বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হতাশা বোধগম্য। প্রধানমন্ত্রী ‘কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্তি’ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্তে¡ও বলতে গেলে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি। মনে রাখতে হবে, ছাত্ররা কিন্তু পুরো কোটাব্যবস্থা বাতিল চায়নি। দীর্ঘ নীরবতা ও প্রায় নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে নিয়মিতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘অবগত নই,’ ‘নির্দেশনা নেই,’ ‘অগ্রগতি নেই,’ ‘প্রধানমন্ত্রী ফেরার পর সিদ্ধান্ত,’ ‘ঈদের পর গ্যাজেট’ ইত্যাদি বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছিল। কয়েক মাস আগে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সাথে আলোচনার সময় শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার প্রতিশ্রতি দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও প্রতিশ্রুতিটি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সর্বশেষ দফার বিক্ষোভের পরই কেবল ৩ জুলাই কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।

বৈধ চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে অন্যায় ও ভ্রান্ত বক্রোক্তি ও কটাক্ষের আশ্রয় গ্রহণের দিকে ধাবিত করছে। এর ফলে এমনকি আইনমন্ত্রী বলে ফেলেছেন, বিএনপি ও জামায়াতই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে উস্কানি দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগৈর শক্তিশালী সাধারন সম্পাদকও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলার জন্য ছাত্রলীগের দায়দায়িত্ব নাকচ করে দিয়ে তিনি যুক্তি দেখান যে, এখন সেখানে ছাত্রলীগের কোনো কমিটিই যেহেতু নেই, তাই সংগঠনটিকে দায়ী করার কোনো অবকাশই নেই। মন্ত্রী কি সত্যিই জনগণকে বিশ্বাস করাতে চান যে কমিটি ভেঙে দেওয়া হলে ছাত্রলীগের সদস্যরা গুটিয়ে যায় ? পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে যে, একসময়ে তেজোদীপ্ত ছাত্রকর্মী হিসেবে পরিচিত এক সিনিয়র মন্ত্রী গত এপ্রিলে প্রতিবাদকারীদের রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঢাবির ভিসির বাসভবন ভাংচুরকারীদের দায় কোটা সংস্কার কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা-ই যদি হবে, তবে কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে হামলাকারীদের শাস্তি প্রদান করা? যদি তাই না হবে তবে প্রশ্ন করা যায় কিনা, ঘটনা কী  এতোই বিস্বাদপূর্ণ যে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়?

গোয়েন্দা না হলেও পুলিশের অদৃশ্য পোশাক পরিহিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলন আসলে ‘অন্তর্ঘাত চালানোর লক্ষ্যে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন।’ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি একই ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করে একে ‘অপ:শক্তির কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের সাথে বেশ খোলামেলাভাবেই বলেছেন, প্রতিবাদকারীদের ভিডিও ফুটেজ তাকে ‘তালেবান, আল শাবাব ও বোকো হারামের উস্কানিমূলক ভিডিও বার্তার’ কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।

কোটা সংস্কার অ্যাক্টিভিস্টদের বৈধ দাবির প্রতি সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সঙ্গী-সাথীদের প্রতিক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে জনগণ ও তাদের সমস্যা থেকে তাদের গভীর বিচ্ছিন্নতার কথাই প্রকাশ করছে। এটি যেকোনো ধরনের সম্মিলিত প্রতিরোধে তাদের নাজুকতাই প্রকাশ করছে। এতে আরো সুস্পষ্ট হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয় পক্ষপাতিত্ব কেবল অপরাধের শিকারদের রক্ষা করতেই ব্যর্থ হচ্ছে না, সেইসাথে অমানবিক, অবৈধ ও প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে থাকা ব্যবস্থার সংঘর্ষিক তৎপরতাও শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

একথাটি মনে রাখতে হবে যে, তরিকুলের ওপর হাতুড়ির আঘাত কেবল তার পা বা মেরুদন্ডেরই ক্ষতি করেনি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

(সি আর আবরার- অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)