Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 51)

Author Archives: আমাদের বুধবার

ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকেই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :

এশিয়া কাপ হলো, টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব হলো। এর আগে আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক আসর হলো। তাসকিন আহমেদ এগুলোতে দোর্দন্ড প্রতাপে খেললেন। তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। এমনকি যে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচের সুবাদে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো, সেখানেও কিন্তু তার একটি বলও ‘নো’ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাসকিন আর আরাফাত সানির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেওয়া হলো। তাদের বোলিং ভঙ্গি সন্দেহজনক। তারপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা। আর সেখানে যথারীতি ব্যর্থ। তাদের ওপর নেমে এলো নিষেধাজ্ঞার খড়গ।

এই নিষেধাজ্ঞা কেবল তাদের ওপরই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উদীয়মান শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকেই চেপে ধরা। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটাকে সূচনাতেই শেষ করে দেওয়া।

বাংলাদেশকে হতদমিত করলে ভারতের কী লাভ? সবচেয়ে বড় লাভ তাদের ক্রিকেটীয় বর্ণবাদ সমুন্নত থাকবে। ক্রিকেটের শুরুতে কিন্তু এমন মানসিকতা ছিল। ব্রিটিশ প্রভূরা ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে রাজি ছিল না। লর্ডদের এই বিনোদনকে তারা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে উপনিবেশভুক্ত কয়েকটি দেশে মাত্র এই খেলাটি প্রচলিত হয়। অলিম্পিকের মতো আসরে ক্রিকেট নেই। ফুটবল যেখানে সবাই খেলতে পারে, ক্রিকেটে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানা তথাকথিত নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে অন্যদের ক্রিকেট থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। চাইলেও তারা ক্রিকেট খেলতে পারবে না। শুরুতে এই কাজটি করেছে ইংল্যান্ড। তারপর অস্ট্রেলিয়া। এখন করছে ভারত।

জগমোহন ডালমিয়া যখন আইসিসির সভাপতি ছিলেন, তখন কিন্তু অন্য রকম পরিস্থিতি ছিল। তিনি চাইছিলেন জোটবদ্ধ এশিয়াকে নিয়ে অ-এশিয়ানদের প্রতিরোধ করতে। তিনি তার এই কাজে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছিলেন। ওই প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পর জোটবদ্ধ থাকার প্রয়োজন আর অনুভব করেনি ভারত। এর মধ্য অবশ্য আরো দুটি ঘটনা ঘটে গেছে। ডালমিয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ভারতে কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের আবির্ভাব। এসব খেলোয়াড় ভারতকে ভালো দলে পরিণত করেছে। একইসাথে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে এন শ্রীনিবাসনের মতো একনায়কদের। এই বর্ণবাদী চরিত্রগুলো ন্যূনতম প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা শুরুতেই শেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর। আইসিসি এখন এদের দখলেই। শ্রীনিবাসন সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার তুলনায় বেশ নমনীয়, ডালমিয়ার কাছাকাছি। কিন্তু অন্যরা তো রয়ে গেছে। তার ফল হলো তাসকিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

নিজেদের মাতব্বরি অব্যাহত রাখার জন্য ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইসিসিকে কুক্ষিগত করেছে। তাদের কেউ বলে তিন মাতবর, কেউ তিন জমিদার, কেউ তিন মোড়ল। তারাই এখন অঘোষিত। ভারত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এখন ভারতের সব আবদার মেনে নিচ্ছে। এর জের ধরে কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এই তিন দেশের বাইরের ক্রিকেটারদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা।

ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ চৌধুরী একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। ওই তিন দেশের কোনো ক্রিকেটার এখন পর্যন্ত অবৈধ ঘোষিত হননি। গত আইসিসি বিশ্বকাপের আগে সুনীল নারায়ন, সাইদ আজমল, মোহাম্মদ হাফিজের মতো বেশ কয়েকজন বোলারদের হঠাৎ করে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা কি বিশ্বকাপে মাতব্বরদের পথ পরিষ্কার করার আগাম কার্যক্রম ছিল? তখনই অনেকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন।

ভারত এখন যে কাজটি করছে, এই কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড তা-ই করত। মুত্তিয়া মুরালিধরনের ব্যাপারটাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এখন উভয় দেশই মুরালিধরনের ব্যাপারে উচ্ছ¡সিত, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু এই লঙ্কান বোলার যখন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তখন শেন ওয়ার্নের চেয়েও সফল ছিলেন, তখন তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলে তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তবে শ্রীলঙ্কা হাল ছাড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে মুরালির পাশে ছিল। মুরালির সৌভাগ্য তিনি বোর্ডের পাশাপাশি অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো একজন অধিনায়ক পেয়েছিলেন। হাফিজ, আজমলরা পাননি। তাসকিনরা কি পারবেন?

কাজটা খুবই কঠিন। গত আইসিসি বিশ্বকাপের সময় ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে বাংলাদেশকে অন্যায়ভাবে হারিয়ে দেওয়ার পর ওই সময়ে সংগঠনটির সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল (পরিকল্পনামন্ত্রী) অভিযোগ করে মন্তব্য করেছিলেন- ‘আইসিসি এখন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলেরই নামান্তর’। তিনি সংগঠনটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেই এমন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পেছনে ডালমিয়ার অবদান ছিল। তবে সাধারণভাবে ভারতের বড় অংশই চাচ্ছিল না, বাংলাদেশ তাদের সমান মর্যাদার হোক। বর্তমানে তাদের ওই মানসিকতা আরো জোরদার হয়েছে। এর একটি প্রমাণ হলো, এত বছর পরও বাংলাদেশকে টেস্ট খেলার জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ কি হাল ছেড়ে দেবে? না। হাল যে ছেড়ে দেবে না, সেটা বাংলাদেশ এর মধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে। তাসকিন নেই, সানি নেই, অসুস্থতার কারণে তামিম ইকবাল নেই, কিন্তু তবুও তারা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করেছে। অল্পের জন্য ম্যাচটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ লড়াই করার যে মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটাই তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সেই বাঘ কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বাংলাদেশও করবে না। নিজেরা তো এগিয়ে যাবে, সেইসাথে বঞ্চিত অন্য দেশগুলোকে নিয়ে আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

বিএনপি’র কাউন্সিল : এসব কী শুধুই কথার কথা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু :

ক্ষমতা হারানোর সাত বছর পরে এবারের কাউন্সিলে বিএনপি প্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে তাঁর দিব্যদর্শন ঘটেছে। নাকি তিনি আর দশ কথার মত অনেকগুলি নীতি নির্ধারনী বিষয়ে বক্তব্য দিলেন, যার মর্মার্থ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ শোনার অপেক্ষায় রইলাম। তাঁর ভাষণ লিখিয়েদের ধন্যবাদ, অনেকগুলি মৌলিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের অবতারনা করা হয়েছে, নব্বইয়ের শীত মৌসুমে এরশাদ পতনের পর জোটগত ও দলগতভাবে যেগুলি বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে খালেদা বা হাসিনা সরকার বিকাশমান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দেশকে নিয়ে গেছেন উল্টো যাত্রায়।

কাউন্সিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরনে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে”।

এই বক্তব্য খালেদা জিয়ার! এটি অবিশ্বাস্য! এটি শুনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই বক্তব্য তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস বা ধারন করেন? যার দলে গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এক হাজার একটা প্রশ্ন আছে তিনি বলছেন, ক্ষমতায় গেলে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র যদ্দুর জেনেছি দলে চেয়ারপার্সন নিরঙ্কুশ, এবারের কাউন্সিলেও সেটি প্রমানিত। কাউন্সিল তাঁকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেভাবে চান সেভাবেই কমিটি গঠিত হবে।

দলে এরকম অবিসংবাদিত ক্ষমতার অধিকারী কোন ব্যক্তি সরকারের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতায় আসীন হলে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আজকের সামগ্রিক সংকটের মূলে রয়েছে ব্যক্তির হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পূঞ্জিভূত হওয়া। গত সাত বছরে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিষয়ে প্রতিদ্বদ্বীকে ইঙ্গিত করে যদি খালেদা জিয়ার এই দিব্যদর্শন ঘটে থাকে, তাহলে প্রথমেই দলের অভ্যন্তরে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য এনে সততার পরীক্ষা দিতে হবে। প্রমান করতে হবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিনি আসলেই বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য চান এবং ক্ষমতায় গেলে তিনি এভাবেই সেটি করতে চান।

কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের পুণঃনির্বাচন প্রমান করেছে তাদের প্রতিপাদ্য “মুক্ত করবই গণতন্ত্র” কতটা অসাড়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জয়-জয়কারের এই দেশে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলে প্রতিদ্ব›দ্বীতাহীন, ক্ষমতায় থাকলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ আর নতুন কিছু নয়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নিয়ে তাদের হা-হুতাশ এবং সমালোচনার নৈতিক অধিকার এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে। অপর  অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা এতে খুশি, তিনি বলেছেন, “নাটকটা ভালই করেছে”।

গোটা কাউন্সিলের দৃশ্যমান একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। ছয় বছর পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। দলের পূর্ণ মহাসচিব হবেন। প্রয়াত: মান্নান ভূঁইয়ার পরে সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ হিসেবে ফখরুল এই পদে বসবেন। সেটি ঝুলে থাকল চেয়ারপার্সনের ইচ্ছায়-অনিচ্ছার ওপর। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত এক বা দ্বিতীয় নেতৃত্বের দলে সাধারন সম্পাদক কিংবা মহাসচিবের পদ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি কমবেশি সকলের জানা। তারপরেও ষাট দশকে তাজউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারনে যধেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়াও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন।

এটি মধ্যপন্থী দল থেকে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া বিএনপির চলমান বিপর্যয় কাটাতে পুরানো নেতৃত্বকেই বহাল রাখা হয়েছে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতামত্ত বিএনপি কখনই ভাবেনি ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সে সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র হাওয়া ভবন এবং এর আর্শীবাদপুষ্টরা কাউকেই মানুষ মনে করতে রাজী ছিলেন না। ক্ষমতা হারিয়ে তারেক রহমানের লন্ডন চলে যাবার পরে বিএনপির দোর্দন্ড প্রতাপশালী নেতারা মামলা, জেল ও সরকারের রোষানল থেকে রক্ষা পাবার ক্রমশ: নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে উটপাখির মত বালুতে মুখ গুঁজে লুকিয়ে পড়েন।

বহু ধারা এবং মত-পথের সমন্বয়ে গঠিত দলটিতে এখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব সুস্পষ্ট। সাবেক বামরা অনেকটা কোনঠাসা ছিলেন। তবে মির্জা ফখরুল মহাসচিব  হলে এই ধারাটি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ডানদের দৌরাত্মে এই দল সামগ্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে, প্রতিরোধ বা ক্ষমতাসীনদের পুন:নির্বাচনে বাধ্য না করতে পারায়। এটি আরো ত্বরান্বিত হয়, ২০১৫ সালের শুরুতে হরতাল-অবরোধের নামে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করায়। সরকার দেশে-বিদেশে এই সুযোগে বিএনপিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় এবং যৎকিঞ্চিৎ সাফল্য লাভ করে।

দল হিসেবে বিএনপির এই বিপর্যয়, দুর্গতির কারণ তাদের শীর্ষ পর্যায়ে এখনও অনুদঘাটিত। এটি অনুদঘাটিতই থেকে যাবে কারণ, একটি একক নেতৃত্বের পরিচালিত দলে কখনই প্রশংসা ছাড়া ব্যর্থতার মূল্যায়ন হয় না। ফলে জনসমর্থনপুষ্ট এই দল কেন ব্যর্থ হল, কঠিন দুঃসময়ে পতিত হল-এসব বিশ্লে¬ষণ কখনই হবে না। আগেই বলেছি, বহু ধারা ও মত-পথের এই দলকে সমন্বিত রাখতে পারে একমাত্র ক্ষমতা। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে এই কাঠামোর একটি দলে যে যে দুর্গতি এবং দৈন্য হওয়ার কথা তার সবকিছুই এখন বিএনপির গোটা অবয়বে স্পষ্ট।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতের মত একটি অপরাধ প্রবণ দলের খপ্পরে পড়ার মত বৃহৎ ভুল, অক্ষমতা, অন্যায্যতা, অন্যায় সর্বোপরি রাজনৈতিক অপরিপক্কতার কারণে আজকের যে পরিস্থিতি-এর কোন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন নেতা-কর্মীদের সামনে বিএনপি উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলে এর সকল দায় তারা চাপাতে চেয়েছে এক/এগারো সেনা সমর্থিত সরকার ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। দল হিসেবে ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ সময়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সামগ্রিক ব্যর্থতা উঠে আসেনি।

অনুদঘাটিত, অনির্ণেয় এসব ভুল ও অক্ষমতার পূনরাবৃত্তি অব্যাহত রেখেছে দলটি। দেশের রাজনীতিতে, দলের অভ্যন্তরে-কোন ক্ষেত্রেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়নি গত সাত বছরে কেন তারা একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলো না। এর অনিবার্যতায় সংঘবদ্ধ, সৃজনশীল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় যেতে পারছে না দলটি। এই অচলাবস্থার মধ্যে বাধ্য-বাধকতার একটি কাউন্সিল করছে বিএনপি। যেন এই কাউন্সিল ছিল খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিনা প্রতিদ্ব›দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য! দলের এমন পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে আগামী গণতন্ত্রের সারথী হবে?

রাজনীতির একটি সন্ধিক্ষণে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন-পুলিশ সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের নামটি যারা টিকিয়ে রাখছেন, খালেদা জিয়া কাউন্সিলের আগে তাদের নিয়ে একদিনের জন্যও বসেননি। ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে তাদের বক্তব্য শোনেননি। মাঠ পর্যায়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রণোদনা যোগাতে পারেননি। বিএনপির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জ হবে, মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের দুরত্ব লাঘব।

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির একটি চটকদার শ্লোগান রয়েছে। চটকদার বলা হচ্ছে, কারণ দলটির অবয়বে কোথাও এই শ্লোগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অতীত-বর্তমানে যেসব দলগুলো ছিল তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। কাউন্সিলে বিএনপির শ্লোগান ছিল, “দুর্নীতি দু:শাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ”। সন্দেহ নেই, শ্লোগান হিসেবে এটি অসামান্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু যে দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দুঃশাসন নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই, তার কোন ব্যাখ্যা-মীমাংসা ছাড়া এরকম শ্লোগান চটক-চমক সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র চায় বিএনপি। এজন্য প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বিএনপিকে, দলে কি গণতন্ত্র চায় তারা? যে দলটির নেতৃত্বই উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, কন্যা-জায়া-জননী সেখানে এই শ্লোগানের অসাড়ত্ব বুঝতে পন্ডিত হওয়া লাগে না। এবারের কাউন্সিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথে যায়নি।  শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মাইকে ঘোষণা হবে, হাত উঁচিয়ে সমর্থন ব্যক্ত হবে। অথচ দলটির গঠনতন্ত্রের বিধানঃ জাতীয় কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হবেন।

ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানেই। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে যে বাক্যটি যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একচ্ছত্র করা হয়েছিল, বাহাত্তরের সংবিধানে সেই বাক্যের প্রেসিডেন্ট শব্দটি মুছে প্রধানমন্ত্রী বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগ কখনও স্বীকার করেনি। অপরপক্ষে বিএনপি পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিকতা দুর করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিভাবে আরো নিরঙ্কুশ করা যায়, সেই পথেই হেঁটেছে।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সামনে এই সুযোগটি এসেছিল যখন দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরছে। কিন্তু বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের ৫৫ অনু্েচ্ছদ, যেখানে মন্ত্রীসভাকে নিঃস্ব করে  প্রধানমন্ত্রীকে সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল, সেটি পুণরুজ্জীবিত করে ক্ষান্ত দেয়নি, দলত্যাগ সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদও তারা আরো কঠোর করে (পঞ্চদশ সংশোধনীতে যেটি বাদ পড়েছে), যাতে প্রধানমন্ত্রীর আসন টলে না যায়। সে সময়ে জরুরী অবস্থা জারীতে এবং সংসদ ডাকা ও বাতিল করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান ছিল না, সেটিও যুক্ত করা হয়।

আওয়ামী লীগও এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে অনুসরণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে সকল কর্তৃত্ব ও দলে তাঁর নিরঙ্কুশ প্রধান্য বজায় রেখেছে। সুতরাং বিএনপি নেতার বক্তব্য যে কথার কথা নয় সেটি প্রমান করতে অতি দ্রুত সংস্কার কমিটি করে সহসাই তার খসড়া জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। খালেদা জিয়া কাউন্সিলে শুধু হাসিনামুক্ত নির্বাচনের বিষয়টি স্পষ্ট করলেন, কিন্তু তিনি বা তাঁর দল নির্বাচনকালীন সরকার চায় (তারা অবশ্য এখন আর তত্তাবধায়ক সরকার বলছেন না, বলছেন নিরপেক্ষ সরকার), এর কোন পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অজতক জাতির সামনে হাজির করতে পারলেন না।

 

ধর্মীয় উগ্রতা প্রশ্নে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ইকোনমিস্ট থেকে–
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ফুলে ফেঁপে ওঠেছে। বিকাশমান বাণিজ্যিক যোগাযোগ, অভিন্ন কৌশলগত উদ্বেগ এবং সমৃদ্ধিশীল ভারতীয় বসতি বন্ধুত্বকে মজবুত করে তুলছে। তবে নিরেট বাস্তবতা হলো উভয় দেশে থাকা বিপুল, বৈচিত্র্য ও বিরোধের জায়গায় ভর্তি- যেগুলো পরিস্থিতি কঠিন করে তুলতে পারে। এসবে এমন একটি আছে যা উভয় দেশ, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সেটা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতার দূতদের সৌদি আরব, পাকিস্তান ও চীনের মতো অ-মুক্ত স্থানগুলো সফর করতে পারলেও তৃতীয়বারের মতো ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ মার্চ ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের (ইউএসসিআইআরএফ) একটি প্রতিনিধি দলের ভারত যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা ভিসা পায়নি। সংস্থাটির কমিশনার ও সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাটরিনা ল্যান্টস সুইট বলেছেন, ‘আমরা খুবই হতাশ, এটা সত্যিই সুযোগ হারানো।’
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটাকে দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসিতে ভারতীয় দূতাবাস বলেছে, ভারতে সাংবিধানিকভাবে নিশ্চয়তা দেওয়া অধিকার-পরিস্থিতি নিয়ে রায় প্রদান করতে ইচ্ছুক কোনো বিদেশী সংস্থাকে অনুমতির কোনো অবকাশ তারা দেখছে না। এর জবাবে ক্যাটরিনা ল্যান্টস বলেছেন, তাদের সফরের রায় প্রদানের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, বরং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে দেওয়া কমিশনের পরামর্শগুলো ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি নিম্নপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিদর্শকদের আমেরিকান মূল্যবোধ ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তারা বরং সব দেশের পালনীয় আন্তর্জাতিক যে মানদন্ডে ভারত স্বাক্ষর করেছে, সেটা কতটা পালিত হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখত। কমিশনের অন্যতম উদ্বেগ হলো ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ আইন প্রয়োগ। হিন্দুদের খ্রিস্টান বা ইসলামে ধর্মান্তর ঠেকাতেই মূলত আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নরম করে বলা যায়, ইউএসসিআইআরএফ ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে কিছুটা জটিল ইতিহাস রয়েছে। ২০০৫ সালে এই যুক্তিতে মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ২০০২ সালে সেখানে সংগঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য তিনিও দায়ী। তাকে ১৯৯৮ সালের আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতা আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আইনের আওতাতেই ফেডারেল সরকারের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত, তবে স্বাধীন তদারকি সংস্থা হিসেবে ইউএসসিআইআরএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি কয়েক বছর পর্যন্ত কিছুটা সফলতার সাথে মোদির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। গুজরাট দাঙ্গা এবং এর তদন্ত নিয়ে মোদির অবস্থানকে মেনে না নেওয়ার বিষয় ছিল এটা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সংস্থাটি জানায়, গুজরাট প্রশ্নে ‘পুরোপুরি স্বচ্ছ’ না হওয়া পর্যন্ত মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত হবে না।
এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচ- বিতর্ক হয়। আমেরিকান কট্টর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অহিন্দু বংশোদ্ভূতরা দাবি করে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি অন্যান্য ধর্মের জন্য বিপর্যয়কর। তবে আমেরিকায় হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের মধ্যে বিজেপির বিপুল ও সোচ্চার অনুসারী রয়েছে। এমনকি মোদিকে সশরীরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে ভিডিও ক্লিপিংসের মাধ্যমে হলেও বক্তা হিসেবে তার উপস্থিতির দাবি তোলা হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রেও পাড়ি দিয়েছে।
মোদি ২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ থেকে বাদ দেওয়া অব্যাহত রাখার কোনো প্রশ্নটি টিকে থাকেনি। তিনি ও বারাক ওবামা কয়েক দফা উচ্চ পর্যায়ের সভা করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নে আমেরিকার নির্বাচকম-লীর অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি ভারত সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে সব ধর্ম যাতে বিকশিত হতে পারে, তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অন্তত কিছু সুপরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেহমানের বক্তব্য তার মেজবান পছন্দ না করলেও আমেরিকার কিছু ভোটারকে তা সন্তুষ্ট করেছে।
গত মাসে আট আমেরিকান সিনেটর এবং ২৬ প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ভারতের খ্রিস্টান, মুসলমান ও শিখদের প্রতি আচরণ নিয়ে ‘বিশেষ উদ্বেগ’ প্রকাশ করে মোদিকে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা বলেন, ৫০টি গ্রাম পরিষদ অ-হিন্দু রীতিনীতিকে অপরাধমূলক কার্যক্রম ঘোষণা করায় ছত্তিশগড়ের খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা দুর্ভোগে রয়েছে; হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ গরু খাওয়া নিয়ে মুসলমানরা আইন হাতে তুলে নেওয়া লোকজনের সহিংসতার মুখে রয়েছে; আলাদা ধর্মের স্বীকৃতি না দেওয়ায় শিখরা হতাশ হয়ে পড়েছে। তবে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখছেন, এই বোধ থাকায় আমেরিকান আইন প্রণয়নকারীরা তাদের বক্তব্যকে বেশ সতর্কভাবে সংযত রেখেছেন। তারা ‘ধর্মের পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হবে বলে মোদির দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ‘তা বাস্তবায়ন করার জন্য’ তার প্রতি অনুরোধ জানান।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমেরিকার এসব আইন প্রণয়নকারীর মতে, মোদিকে চিঠি লিখে আসলে তারা তাদের ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছেন। তবে ওই বক্তৃতায় কর্ণপাত করার কোনো ইচ্ছা সম্ভবত ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নেই। চাপ প্রয়োগ করা হলে সম্ভবত তারা বলে দেবেন, দুনিয়া এখন বদলে গেছে, বৈশ্বিক বিষয়াদিতে আমেরিকার তুলনামূলক প্রাধান্য ১৯৯৮ সাল থেকে আর আগের মতো নেই।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায়” নির্বাচিত হওযার গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৪ সালে এসে সেটি রেকর্ড ছুঁয়েছিল। ৩’শ আসনে ১৫৪ টি, অর্ধেকেরও বেশি। এটি এখন সংক্রামিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন, একই বছর শেষে পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এবং এখন সেটি পরিপূর্ণতা পেতে যাচ্ছে আগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে।
যে সকল ভিত্তির ওপর ভর করে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে তার একটি বড় পরিমাপক হচ্ছে অবাধ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন। গণতান্ত্রিক বা যে কোন ব্যবস্থায় জনগনের মতামত প্রদানের সবচেয়ে স্বীকৃত মাধ্যম নির্বাচন। এটিকে গণরায় বলা যেতে পারে। উপমহাদেশের ইতিহাসে যে নির্বাচনটিকে সবচেয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহনমূলক বলে অভিহিত করা হয়, সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি সামরিক সরকারের অধীনে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেয়া গণরায়ের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এরকম কোন পরিবর্তন না ঘটালেও জনগনের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উৎসবে মেতে ওঠার নির্বাচন। কিন্তু দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে উৎসব-উৎসাহ সাধারন ভোটারের অন্তত: নেই। নির্বাচনে প্রথম ধাপে ৭৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের ৬২টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬৪৭টির ১৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটি সত্যিই অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দু’একটি সাধারন ব্যতিক্রম ছাড়া এরকম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।
একতরফা, একদলীয় কিংবা একক-কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে কোন কোন রাজনৈতিক দলের বয়কটের কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, এ অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে এটি শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের ঘোষিত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, জাতীয় পরিষদের ৭৮টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৭৫টি আসনের ১০০টি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন। অবশ্য ঐ নির্বাচনে নির্বাচিতরা কোনদিন পার্লামেন্টে বসার সুযোগ পায়নি। কারণ ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত ঘটনাবহুল নির্বাচনে ১১ জন, ১৯৭৯ সালে ১১ জন, ১৯৮৮ সালে ১৮ জন ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একক নির্বাচনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে বিএনপি বর্জন করলেও এবং ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন ছিলেন না। এক্ষেত্রে রেকর্ড করেছে ২০১৪ সালের নির্বাচন, এটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ১২২ জনকে পাওয়া যেত।
সুতরাং বাংলাদেশ এ যাবতকাল মেনে নিয়েছিল যে, জাতীয় নির্বাচন যদি একতরফা, একদলীয় হয় তাহলে ক্ষমতাসীনদের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন থাকতে পারেন। সেখানে মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহন নাও থাকতে পারে। এমনকি ঐ নির্বাচনে গঠিত পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দল মিলে একাকার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গত পৌরসভা নির্বাচন থেকে জনগন এটিও দেখতে শুরু করেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একতরফা, একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন হতে চলেছে।
এই প্রথম রাজনৈতিক মনোনয়নের নির্বাচনে ১৭৪টি ইউনিয়নে দেশের একটি প্রধান দল বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। এদিক থেকে টেক্কা দিয়েছে বাগেরহাটের মোল্লারহাট ও চিতলমারী উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়ন। এখানে সব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে কাউকে প্রার্থী হতে দেয়া হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মনোনয়ন পত্র দাখিলের সুযোগ পায়নি। কিভাবে বিপক্ষ প্রার্থীদের বিরত রাখা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত: এই আসনের সংসদ সদস্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিন।
নির্বাচন কমিশনের নিস্ক্রিয়তা ও নির্বিকারত্ব দেখার মত। হালে দু’একটি ক্ষেত্রে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেও হাজার হাজার ঘটনার মধ্যে তা কোন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। মাত্র কিছুকাল আগে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনেও একই দশা হয়েছিল। মনোনয়ন পত্র জমা দিতে না পারার অজস্র ঘটনা, একের পর এক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়াÑ কোন কিছুই আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই নির্বাচন কি আরো একটি প্রহসনে পরিনত হতে চলেছে?
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে একটি বড় খুঁটি হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। অবাধ নিরপেক্ষ, অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সেরকম অবকাঠামো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। যে সব দেশে নির্বাচন কমিশন দুর্বল নেতৃত্ব, অযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও দলীয় মনোভঙ্গির বাসনা পূরণের ক্ষেত্র হয়ে যায়, সেখানে জনআকাঙ্খা প্রতিফলনের উপায়গুলিও নি:শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় নির্বাচন যতটা না গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য, তার চেয়ে বেশি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে মহিমান্বিত করার জন্য। এজন্যই ২০১৪ থেকে গড়ে ওঠা নির্বাচনের সংস্কৃতি দেশকে ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলছে।
আগেই বলেছি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এই দেশে বরাবরই উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উৎসবের। এই নির্বাচনে ভোট দেয়া ও নিজের পছন্দমত প্রার্থী নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ থাকে মাত্রা ছাড়ানো। আশির দশকে সামরিক শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চর দখলের আকার ধারণ করলেও প্রতিদ্বন্দ্বীতা অন্তত: ছিল। ১৯৯১ সালের পরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরোক্ষ মনোনয়ন ও সমর্থনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনগুলিতে উৎসবের মেজাজ আবার ফিরে আসে। ভোটারদের উচ্ছাসিত অংশগ্রহনে নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার।
এবারেই প্রথম সরাসরি রাজনৈতিক মনোনয়নে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দাপট এবং প্রশাসন-পুলিশের পক্ষপাত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিরোধী দলীয় প্রার্থী, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীরাও এলাকাছাড়া। ভোটাররা আতঙ্কিত, ভোট দেবার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং এটিও অনেকটা একক নির্বাচনের রূপ লাভ করতে যাচ্ছে।
এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, ক্ষমতাসীনরা ও নির্বাচন কমিশন মিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় যে নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন, সেটি কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হতে চলেছে? ২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোটারের অংশগ্রহন ছিল না। গত পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। আগত ইউপি নির্বাচনে ইতিমধ্যে ৭৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত। দুই উপজেলার একটি ইউনিয়নও বিরোধী দলীয় প্রার্থী নেই।
জনগনের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের দাবি করে, তাঁর আমলে সেই ভোটের অধিকার নির্বাচন কমিশন যাদুঘরে পাঠাতে চলেছে – সেটিই কি তাঁর এবং জনগনের অনিবার্য নিয়তি!

ড. আতিউরের পদত্যাগেই যেন সব শেষ হয়ে না যায়!

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়া, ঘটনা সংঘটিত হওয়ার এক মাসেও অর্থমন্ত্রীসহ সরকারকে বিষয়টি না জানানো প্রভৃতি বিষয় সামনে রেখেই এবং অনেক জল্পনা-কল্পনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করলেন। নৈতিক অবস্থান থেকেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমকে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমকে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীও তার এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করেছে। অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এখানেই যেন সবকিছুর সমাপ্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে। সবাই চাইবে, সঠিক তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে উন্মোচন করা হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের লুকোচুরি জনমনে সন্দেহই তৈরি করবে। ঘটনাটি গভর্নরের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সঠিক তদন্তে নজর দিতে হবে এখন, এটি সবাই চায়। এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে এর বিকল্প নেই। অর্থ চুরির সঙ্গে কারা জড়িত, সেটি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থ উদ্ধারেও চালাতে হবে জোর তৎপরতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে রিজার্ভের মোট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় গেছে ২ কোটি ডলার। তার মধ্য থেকে ১ কোটি ৯৯ লাখ ডলার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাবে (অ্যাকাউন্টে) ফেরত এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকিং সচিব আসলাম আলম। তবে ফিলিপাইনে যাওয়া মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে হদিস মিলেছে মাত্র ৬৮ হাজার ডলারের। অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে জব্দ হওয়া ছয়টি ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। সেই হিসাবে ফিলিপাইনে চলে যাওয়া মোট অর্থের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ৩২ হাজার ডলারের এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হলো, কিভাবে এই অর্থ ফেরত আসবে, কতো তাড়াতাড়ি আনা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির বিষয়ে এখনো কুলকিনারা না হতেই অর্থ স্থানান্তর দিনক্ষণ নিয়ে দু’রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে এ চুরি হয়েছে ৪ ফেব্রুয়ারি বা ৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ দেশি বিদেশি তদন্ত সংস্থা প্রাথমিক তদন্তে ২৪ জানুয়ারি এ লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে। তথ্যের এ গরমিলে প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
চুরির দিনক্ষণের গরমিলের তথ্যে দু’দিনের ছুটির ফাঁদের যে কথা বলা হচ্ছে -তা সঠিক নয় বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ছুটি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। কিন্তু কাজটি যদি ২৪ জানুয়ারি (রোববার) হয়ে থাকে তাহলে ছুটির ফাঁদে পড়ার কোনো অবকাশ নেই।
ফিলিপাইনের পত্রিকা এনকোয়ারার ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই এই অর্থ চুরি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম এবং সুইফট কোড কন্ট্রোলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩০টি পেমেন্ট অ্যাডভাইজ পাঠায় ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের জন্য। আর এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এর মধ্যে ৫টি অ্যাডভাইজ অনার করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আর এই পাঁচটি অ্যাডভাইজে মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন উদ্ধারের দাবি করলেও এখনো ৮১ মিলিয়ন রয়েছে হ্যাকারদের হাতে।
এছাড়া গত ৯ মার্চ ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার জানায়, আরও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এই অর্থ দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। অবশ্য ঘটনাটি গত মাসের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকাউটেন্স অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ দু’টি বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত। ওই দুই বিভাগ দেখাশোনায় মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকও রয়েছেন। সার্বক্ষণিক এ কাজ করার জন্য তাদের বাড়তি সুবিধাও দেয়া হয়। তাহলে ছুটির দিনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে তা অবান্তর।
ঘটনা তদন্তে সরকার অবশেষে একটি কমিটি গঠন করেছে। দেখার বিষয়, সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকতার সাথে সত্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ খোয়া যাওয়ার বিষয়টিরও সুরাহা নিয়ে সংশয় তৈরি হয় বৈকি। এবারের ঘটনার উপরই নির্ভর করছে সংশয় কাটানোর, তাতে সন্দেহ নেই। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতে কি ধরনের পরিবর্তন আনেন, সেদিকে নজর থাকবে সবার। এ কথা সত্য, সরকার যথেষ্ট ব্যবস্থা না নিলে কোনো গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না।

ভারতের আপত্তিতে অনিশ্চয়তায় গঙ্গা ব্যারেজ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফার্স্টপোস্ট থেকে
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় পানিস্বল্পতা নিরসনে পদ্মায় একটি (গঙ্গা) ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি গ্রহণ না করায় সেটা ঝুলে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের আমলে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছিল।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সম্ভাবতা যাচাই করে ফেলেছে। রাজবাড়ী জেলার পাংশায় নির্মিতব্য ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত ড্যামটি হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটিতে।
বাংলাদেশ পদ্মা নামে পরিচিত গঙ্গা। আর এটি হলো বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠের পানির অন্যতম উৎস। পানি স্বল্পতা ও লবণাত্মকতা এই অঞ্চলের অভিন্ন সমস্যা। এ থেকে মুক্তি পেতেই ব্যারেজটি নির্মাণে বাংলাদেশ সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র-স্তর বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাত্মক্ততার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রস্তাবিত ড্যামটি নদীগুলোর মাধ্যমে পানি ছেড়ে দিয়ে লবণের মাত্রা কমিয়ে আনবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সমর্থন না থাকলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হবে কঠিন কাজ।
ভারতের আপত্তি : নয়া দিল্লি ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে জানায়, ভারতের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ঢাকার পাঠানো প্রকল্প নথিপত্র যাচাই করে এই ড্যাম ভারতে বন্যা সৃষ্টি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সমতল ভূমি দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতীয় চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, নদীটির পানির স্তর সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন ভারতের বিপুল এলাকা ডুবে যাবে। ঢাকাকে বৈজ্ঞানিক মডেলসহ পুুরো সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে নয়া দিল্লি বলেছে, তারা নিশ্চিত হতে চায়, ড্যামের ফলে ভারতীয় ভূখ-ে পানির উচ্চতা বাড়বে না।
বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ভারত যেসব নথিপত্রের জন্য অনুরোধ করেছিল, সেগুলোর সবই পাঠানো হয়েছে, কিন্তু নয়া দিল্লি এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। নভেম্বরে ভারত সফরকারলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ তার ভারতীয় সমকক্ষ উমা ভারতীর সাথে সাক্ষাত করেছিরেন। তখন তিনি খুব শিগগিরই ভারতের অবস্থান জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ ধরনের বিশাল কোনো ড্যাম নির্মাণ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই ভারতের সহযোগিতা কামনা করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত আরেকটি আন্তর্জাতিক নদী তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক মতানৈক্যে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক প্রকল্পটির ব্যাপারে বলেন, ‘ভারতীয় ভূখ-ে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হবে- এ ধরনের কারিগরি ইস্যু তুলে ভারত (গঙ্গা) প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে পারে এমন আশঙ্কায় ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের কোনো প্রকল্প উজানের দেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তিনি বলেন, ভারত যেসব কারিগরি প্রশ্ন তুলেছে, বাংলাদেশের উচিত সেগুলোর দ্রুত জবাব দেওয়া। গত অক্টোবরে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড্যাম প্রকল্পটিতে ভারতের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
চীনা সমর্থন?
সমীক্ষা অনুযায়ী, সাত বছরে প্রকল্পটি শেষ করতে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার দরকার হবে। কিন্তু এই তহবিলের সংস্থান করতে পারেনি। পানিমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, গঙ্গা-নির্ভরশীল এলাকায় বর্ধিত কৃষি ও মৎস চাষ এবং সেইসাথে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ফলে পাঁচ বছরের মধ্যেই ব্যারেজ প্রকল্পের ব্যয় ওঠে আসবে।
চীনা প্রতিষ্ঠান হাইড্রোচায়না করপোরেশন ড্যামটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়ে তারা বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে কয়েকবার বৈঠকও করেছে হাইড্রোচায়না করপোরেশন কর্মকর্তাদেরসাথে। তাদের মতে, চীন সরকার পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশকে সহজ শর্তে ২০ বিলিয়ন ঋণ দিতে আগ্রহী। হাইড্রোচায়না করপোরেশনের ব্যবসায়িক উন্নয়ন ম্যানেজার ঝাও ইয়াং বলেন, আমরা প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খুবই আগ্রহী। দুই সরকারের আলোচনার মাধ্যমে তহবিলের ব্যবস্থাও হতে পারে।
গঙ্গা ব্যারেজ ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রিজার্ভার সৃষ্টি করবে। ৬২,৫০০ হেক্টর জমিতে ২.৯ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি মজুতের সক্ষমতা থাকবে এর। মন্ত্রীর ভাষ্যানুযায়ী, ১২৩টি আঞ্চলিক নদীর মাধ্যমে ২৬ জেলায় পানি সরিয়ে নেওয়া যাবে।
ড্যামটি নির্মাণ করা গেলে পানির স্বল্পতা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে পানির দূষণ প্রতিরোধ করা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে রিজার্ভারের পানি সারা বছর ব্যবহার করা যাবে। এই পানি সেচ, নৌচলাচল ও লবণাত্মক্ততা দূর করার কাজে লাগবে।
ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক রওশন আলী খান বলেন, রিজার্ভারের মাধ্যমে গঙ্গা বেসিন থেকে পানি নির্গমনের ফলে নদীগুলোতে পলিভরাট সমস্যার সমাধান হবে, পানি নিষ্কাষণ সহজ করে দেবে।
এটা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ রক্ষাও করবে বলে তিনি জানান।