Home » Author Archives: আমাদের বুধবার

Author Archives: আমাদের বুধবার

‘সৌদি ও আমিরাতের অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী থাকলেও আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামান্যই সামিল হয়েছে’ : নোয়াম চমস্কি

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখন সর্বোচ্চ শক্তিতে বৈশ্বিক যুদ্ধাভিযানে পরিণত হয়েছে। অথচ আইএসআইসের মতো ভয়ঙ্কর সংগঠনগুলোর উত্থান ও বিকাশের আসল কারণ পুরোপুরিই অগ্রাহ্য করা হচ্ছে।
নভেম্বরে প্যারিস হত্যাযজ্ঞের পর ফ্রান্স ও জার্মানির মতো প্রধান প্রধান পাশ্চাত্য দেশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগ দিয়েছে। একই ধরনের ভয়ে ভীত হয়ে রাশিয়াও তাড়াহুড়া করে এই ক্লাবে যোগ দিয়েছে। বস্তুত, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে রাশিয়া তার নিজস্ব ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। একই সময় সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আইএসআইএসকে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছিল। তবে অল্পকিছুদিন ধরে সৌদিরা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করেছে। তুরস্কও নানা কর্মকান্ড করছে। কিন্তু এই বাস্তবতাও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত পাশ্চাত্য বাহিনী অবলীলায় এড়িয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘনের কথিত ঘটনায় তরস্ক একটি রুশ বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার পরই কেবল রাশিয়া ‘সন্ত্রাসীদের মদতদাতা’ হিসেবে তুরস্ককে অভিযুক্ত করে আসছে। (উল্লে¬খ্য, বছরের পর বছর ধরে তুর্কি জঙ্গিবিমানগুলো এর চেয়ে অনেক অনেক বেশিবার গ্রিক আকাশসীমা লঙ্ঘন করে আসছে, কেবল ২০১৪ সালেই করেছে ২,২৪৪ বার।)
‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কোনো অর্থ আছে কি? এর কি কোনো কার্যকর নীতি আছে? আর রোনাল্ড রিগ্যান ও জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের আমলের আগের দুটি ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ পর্যায় থেকে বর্তমানটির পার্থক্য কোথায়? অধিকন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ থেকে আসলে কে লাভবান হচ্ছে? এবং মার্কিন সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স ও যুদ্ধ সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্কটা কী? বিশ্বখ্যাত সমালোচক নোয়াম চমস্কি এসব ইস্যু নিয়ে ট্রুথআউটকে তার উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। বিশেষ এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সি জে পলিক্রুনিউ। অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ


প্রশ্ন : এই সাক্ষাতকারটি দেয়ার জন্য শুরুতেই আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। প্রথমেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আপনার ধারণা শুনতে চাইব। এই নীতিটা সেই রিগ্যানের আমলে শুরু হয়েছিল- যা এর পরই জর্জ ডবি¬øউ বুশ [ইসলামাতঙ্ক] ‘ক্রুসেড’-এ পরিণত করেছিলেন, যেটা স্রেফ অপরিমেয় সংখ্যক নিরীহ মানুষের জীবন নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বশান্তির ওপর প্রবল প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার কিছু মিত্রের চেয়ে ভিন্ন ধরনের পলিসি এজেন্ডা এবং স্বার্থ নিয়ে অন্য আরো কয়েকটি দেশ এতে লাফিয়ে সামিল হওয়ায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন এবং সম্ভবত আরো বিপজ্জনক ধাপে প্রবেশ করছে। প্রথমত আপনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে ওপরে বলা মূল্যায়নের সাথে একমত হলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী বৈশ্বিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিণতি, বিশেষ করে পাশ্চাত্য সমাজের জন্য, কি হতে পারে?
চমস্কি : একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ পর্যায় দুটি পরস্পর থেকে বেশ ভিন্ন। রিগ্যানের যুদ্ধ খুবই দ্রুত সন্ত্রাসী যুদ্ধে পরিণত হয়, সম্ভবত ওই কারণেই এটা ‘অদৃশ্য’ হয়ে গেছে। তার সন্ত্রাসী যুদ্ধ মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে আসে। সবচেয়ে প্রত্যক্ষ টার্গেট ছিল মধ্য আমেরিকা। তারা এখনো সেই ক্ষত সারিয়ে ওঠতে পারেনি। বর্তমান উদ্বাস্তু সঙ্কটের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো এটা (খুব কমই এর উল্লে¬খ হয়)। দ্বিতীয় পর্যায়টির (যেটি জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০ বছর পর ২০০১ সালে আবার ঘোষণা করেছিলেন) ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রত্যক্ষ আগ্রাসন বিশাল এলাকা ধ্বংস করে দেয়, সন্ত্রাস নতুন আকার ধারণ করে, বিশেষ করে ওবামার বৈশ্বিক গুপ্ত হত্যার (ড্রোন দিয়ে) অভিযানে সন্ত্রাসবাদের বিবরণীতে নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে এবং এ ধরনের ব্যবস্থায় সন্দেহভাজনদের যতজনকে হত্যা করা হয়, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ সন্ত্রাসীর সৃষ্টি করে।
বিশ্ব জনমত যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তির জন্য বিপুলভাবে বৃহত্তম হুমকি মনে করে। বুশের যুদ্ধ টার্গেট ছিল আল-কায়েদা। একটার পর একটা ভয়াবহ আঘাত হেনে (আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া এবং তারপর আরো অনেক) জিহাদি সন্ত্রাসকে আফগানিস্তানের ছোট্ট উপজাতীয় এলাকা থেকে লেভ্যান্ট [সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, জর্ডান ও ইসরাইল নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ এলাকা] হয়ে পশ্চিম আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের অন্যতম পরিচালনা দক্ষতাগত সাফল্য। এর মধ্যে আবার আল-কায়েদার স্থানে আবির্ভূত হয় আরো বেশি খারাপ ও ভয়ঙ্কর অনেক উপাদানের। বর্তমানে, আইএসআইএস (আইএসআইএল, ইসলামিক স্টেট) দানবীয় নৃশংসতার রেকর্ডের অধিকারী। তবে শিরোপাটির অন্য দাবিদাররা খুব বেশি পেছনে নেই। কয়েক বছর পেছনে থাকা এই গতিশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন সামরিক বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু কুকবার্ন তার গ্রন্থ ‘কিল চেইন’-এ। তিনি প্রামাণ্যভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন, মূল ও কারণগুলো সমাধান না করে দৃশ্যগ্রাহ্য কোনো নেতাকে হত্যা করা হলে নিশ্চিতভাবেই খুব দ্রুত তার স্থলাভিষিক্ত হয় আরো তরুণ, আরো যোগ্য এবং আরো বেশি ভয়ঙ্কর কেউ।
এসব অর্জনের একটি পরিণাম হলো বিশ্ব জনমত বিপুল ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তির জন্য বৃহত্তম হুমকি মনে করে। অনেক পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের এত ওপরে থাকার কারণ দৃশ্যত বিপুল ভারতীয় ভোট। যে সাফল্য ইতোমধ্যেই দেখা গেছে, তা আরো বাড়লে জ্বলতে থাকা মুসলিম বিশ্বের সাথে বৃহত্তর যুদ্ধও সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে, পাশ্চাত্য সমাজগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ দমন এবং নাগরিক অধিকার খর্ব এবং বিপুল ব্যয়ের বোঝায় নতজানু দেখতে পাবে, যা আসলে ওসামা বিন লাদেনের সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন (এবং বর্তমানের আইএসআইএসের) বাস্তবায়ন।
প্রশ্ন : মার্কিন নীতি প্রণয়ন আলোচনা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে কেন্দ্র করেই ঘোরাফেরা করছে, প্রকাশ্য ও গোপন কার্যক্রমের মধ্যকার পার্থক্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এদিকে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর শনাক্তকরণ এবং সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনকারী কর্তা বা রাষ্ট্রগুলো নির্বাচন করা দৃশ্যত কেবল পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারমূলকভাবেই হচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্তকরণ এই প্রশ্নও সৃষ্টি করছে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সত্যিই কি সন্ত্রাসবাদের বিরদ্ধে যুদ্ধ নাকি বিশ্বজয়ের নীতিমালাকে যৌক্তিক করতে এটা স্রেফ ধাপ্পাবাজির আবরণ? উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আল-কায়েদা ও আইএসআইএস যে সন্ত্রাসী ও খুনে সংগঠন তা অকাট্য সত্য হলেও সৌদি আরব ও কাতারের মতো মার্কিন মিত্র এবং এমনকি তুরস্কের মতো ন্যাটো সদস্যদের আইএসআইএসকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দানের বিষয়টি মার্কিন নীতিনির্ধারক এবং মূলধারার মিডিয়া হয় অগ্রাহ্য করছে কিংবা ব্যাপকভাবে ছোট করে দেখছে। এ ব্যাপারে আপনার কোনো মন্তব্য আছে কি?
চমস্কি : রিগ্যান ও বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সংস্করণ নিয়েও একই সত্য প্রযোজ্য। রিগ্যানের কাছে এটা ছিল মধ্য আমেরিকায় হস্তক্ষেপের অজুহাত। স্যালভাডোরের বিশপ রিভার ওয়াই ডাদাস (তিনি গুপ্তহত্যার শিকার আর্চবিশপ অস্কার রোমেরোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন) বিষয়টাকে বর্ণনা করেছেন ‘অসহায় বেসামরিক লোকজনকে সম্পূর্ণ বিলীন করা এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যা চালানোর যুদ্ধ’ হিসেবে।
গুয়েতেমালায় পরিস্থিতি ছিল আরো খারাপ, হন্ডুরাসে ছিল ভয়াবহ। নিকারাগুয়া ছিল একটি দেশ, যার রিগ্যানের সন্ত্রাসীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার একটি সেনাবাহিনী ছিল; অন্য দেশগুলো নিরাপত্তা বাহিনীই ছিল সন্ত্রাসী।
আফ্রিকার দক্ষিণাংশে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ দেশে ও বিদেশে ভয়ঙ্কর মাত্রায় করা দক্ষিণ আফ্রিকান অপরাধের অজুহাত তুলে দেয়। সর্বোপরি আমাদেরকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাসী গ্রুপের একটি’ নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের কাছ থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে হয়েছিল। ম্যান্ডেলা নিজে পর্যন্ত ২০০৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন সন্ত্রাসী তালিকায় ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ লেবানন এবং অন্যান্য স্থানে ইসরাইলি খুনে আগ্রাসনের সমর্থন সৃষ্টি করে। আর বুশের জন্য এটা ইরাক আক্রমণের অজুহাতের ব্যবস্থা করে। এভাবেই এটা এখনো চলছে।
সিরিয়ার নৃশংসতার কাহিনী ভাষাতেও প্রকাশ করা যায় না। আইএসআইসের বিরোধিতাকারী প্রধান স্থল বাহিনী দৃশ্যত কুর্দিরা, ইরাকের মতো এখানেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকায় রয়েছে। উভয় দেশেই তারা আমাদের ন্যাটো মিত্র তুর্কিদের হামলার প্রধান টার্গেট। এই দেশটি সিরিয়ায় আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন আল-নুসরা ফ্রন্টকেও সমর্থন দিচ্ছে। আইএসআইএস আর আল-নুসরার মধ্যে পার্থক্য আছে খুব সামান্যই, যদিও তারা খুবই কঠিন যুদ্ধে রয়েছে। আল-নুসরার প্রতি তুর্কি সমর্থন এতই প্রবল যে, পেন্টাগন যখন তার প্রশিক্ষিত কয়েক ডজন যোদ্ধাকে পাঠাল, তুরস্ক দৃশ্যত আল-নুসরাকে সতর্ক করে দিল, তারা তাদেরকে পুরোপুরি বিলীন করে দিল। আল-নুসরা এবং এর ঘনিষ্ঠ মিত্র আহরার আল-শ্যামকেও মার্কিন মিত্র সৌদি আরব ও কাতার সমর্থন করছে এবং মনে হচ্ছে, সিআইএ’র কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্রসম্ভার পাচ্ছে। এমন খবরও পাওয়া গেছে, তারা আসাদ সেনাবাহিনীকে মারাত্মক পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিতে সিআইএ’র সরবরাহ করা ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করছে। সম্ভবত এটাই রাশিয়াকে হস্তক্ষেপ করতে উদ্দীপ্ত করেছে। তুরস্ক দৃশ্যত সীমান্তজুড়ে জিহাদিদের আইএসআইএসের কাছে অবাধে যেতে দেয়াটা অনুমোদন করে যাবে।
অনেক বছর ধরেই বিশেষভাবে সৌদি আরব চরমপন্থী জিহাদি আন্দোলনগুলোর অন্যতম সমর্থক। কেবল অর্থ দিয়েই নয়, বরং কোরআনিক মাজহাব, মসজিদ [এবং] আলেমদের মাধ্যমে দেশটি তার চরমপন্তী ইসলামি ওয়াহাবি মতাদর্শও প্রচার করছে। প্যাট্রিক কুকবার্ন সুন্নি ইসলামের ‘ওয়াহাবিকরণ’কে যুগের অন্যতম বিপজ্জনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সৌদি আরব ও আমিরাতের বিপুল অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী থাকলেও তারা আইএসআইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অতি সামান্যই সামিল হয়েছে। তারা ইয়েমেনে অভিযান চালিয়ে একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে এবং খুব সম্ভবত আগের মতোই আমাদের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ আমাদের টার্গেট করার জন্য ভবিষ্যতের সন্ত্রাসী সৃষ্টি করছে।
সিরিয়ায় একমাত্র ক্ষীণ আশার রেখা হতে পারে আইএসআইএসকে বাদ দিয়ে সম্পৃক্ত বিভিন্ন উপদানের মধ্যে আলোচনা। তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন [সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-] আসাদের মতো সত্যিই আতঙ্কিত লোকজন, যারা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক না হওয়ায় আলোচনায় সম্পৃক্ত হতে চাইবেন, যদি না জাতীয় আত্মহত্যার সর্পিলগতি অব্যাহত থাকা বন্ধ করতে হয়। আর পরিশেষে, এই পথের গন্তব্য হবে ভিয়েনা। বাস্তবভাবে আরো কিছু করতে হবে, তবে কূটনীতিতে পরিবর্তন অনিবার্য।

অস্ত্র বিক্রি : ভারতসহ উদীয়মান উৎপাদনকারীরা এগিয়ে

আসিফ হাসান
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ অস্ত্র। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এই বাণিজ্যের নানা দিক তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অস্ত্র বিক্রয় সংক্রান্ত এক রিপোর্টে। তাদের হিসাব মতে, টানা চতুর্থ বছরের মতো অস্ত্র ও সামরিক খাতের বিভিন্ন বিক্রি কমেছে । তবে সেটা সার্বিক হিসাবে নয়, শীর্ষ ১০০ বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানির অস্ত্র বিক্রির দিক থেকে। ওই শীর্ষ ১০০ বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানির আয় হয়েছে শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই ৪০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের কমেছে : শীর্ষ ১০০ অস্ত্র বিক্রেতা কোম্পানির তালিকায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে। মোট বাজারের ৫৪.৪ ভাগ তাদের দখলেই। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রি কমেছে ৪.১ ভাগ। ২০১২-১৩ মেয়াদেও একই অবস্থা দেখা গিয়েছিল। তবে অনেকের কমলেও কয়েকটি কোম্পানির বিক্রি বেড়েই চলেছে। সেটা হলো লকহিড মার্টিন। তারা ২০০৯ সাল থেকে শীর্ষ ১০০-এ স্থান ধরে রেখেছে। ২০১৪ সালে তাদের অস্ত্র বিক্রি ৩.৪ ভাগ বেড়ে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অস্ত্র বিক্রি বাড়ায় তাদের সাথে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বোয়িংয়ের সাথে ব্যবধানও বাড়ছে। ২০১৪ সালে বোয়িংয়ের বিক্রি ছিল ২৮.৩ বিলিয়ন ডলার।
আর ২০১৫ সালে হেলিকপ্টার প্রস্তুতকারী সিকোরস্কি এয়ারক্রাফট করপোরেশন কিনে নেওয়ায় লকহিড মার্টিন এবং শীর্ষ ১০ থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যকার ব্যবধান আগামী বছর আরো বাড়বে। এই ধারণাটি দিয়েছেন সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক আউড ফ্লয়েন্ট।
২০১৪ সালে পশ্চিম ইউরোপের কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রি ৭.৪ ভাগ কমেছে। কেবল জার্মান (+৯.৪ শতাংশ) ও সুইস (+১১.২ শতাংশ) কোম্পানিগুলো প্রকৃত অর্থে অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে পেরেছে। অস্ত্র বিক্রিতে জার্মানির তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে জার্মান জাহাজ নির্মাণ কোম্পানি থাইসেনক্রাপের (+২৯.৫ ভাগ) বিক্রি বেড়ে যাওয়া। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের পিলাটাস এয়ারক্রাফট লাভবান হচ্ছে প্রশিক্ষণ বিমানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়। শীর্ষ ১০০-এ থাকা ইউরোপিয়ান কোম্পানির মধ্যে যে সাতটির বিক্রি কমেনি, এই দুটি তাদের অন্যতম।
রুশ অস্ত্র বিক্রি বাড়ছেই : রাশিয়ার অর্থনীতি সমস্যায় থাকলেও তাদের অস্ত্র শিল্প বেশ চাঙ্গা দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালে তাদের অস্ত্র শিল্প বেশ ভালো ছিল। ২০১৪ সালে শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মধ্যে ১০.২ ভাগ তথা ১১টি ছিল রুশ। আগে তাদের সংখ্যা ছিল ৯। শীর্ষ ১০০-এ সম্পূর্ণ নতুন হিসেবে প্রবেশ করেছে হাই প্রিসিশন সিস্টেমস (৩৯তম) ও আরটিআই (৯১তম)। আর নতুন প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড ইনস্ট্রমেন্ট ম্যানুফেকচারিং করপোরেশন (ইউআইএমসি) ২৪তম হিসেবে তালিকায় ঢুকেছে। তারা সোজভেজডাইয়ের স্থান দখল করেছে। এই কোম্পানিটি ইউআইএমসি গঠন করতে অন্য কোম্পানিগুলোর সাথে মিলে গেছে। রুশ যেসব কোম্পানির অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছে উরালভ্যাগোনজাভদ। তাদের অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে ৭২.৫ ভাগ। আরমাজঅ্যানটের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৩ ভাগ। তারা এখন ১১ নম্বর স্থানে আছে।
সিপরির সিনিয়র রিসার্চার সাইমন ওয়েজম্যানের মতে, ২০১৩-১৪ সালে রুশ কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৮.৪ শতাংশ।
বিপরীতে ইউক্রেনের কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ২০১৩ সালে ৫৮তম স্থানে থাকা উক্রোবোনোন-প্রম ২০১৪ সালে ৯০তম স্থানে নেমে গেছে। তাদের বিক্রি কমেছে ৫০.২ শতাংশ। দেশটির আরেক কোম্পানি মোটর সিচের বিক্রি কমে যাওয়ায় শীর্ষ ১০০ তালিকা থেকেই বাদ পড়ে গেছে। ইউক্রেনের অস্ত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হলো দেশটির পূর্বাঞ্চলে সংঘর্ষ, রাশিয়ার বাজার হারানো এবং স্থানীয় মুদ্রার মূল্য পড়ে যাওয়া।
উদীয়মান উৎপাদনকারীদের অবস্থান জোরদার হচ্ছে : সিপরি ২০১৩ সালে ‘উদীয়মান বাজার’ পরিভাষাটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করেছিল। যেসব দেশ তাদের সামরিক শিল্পকে চাঙ্গা করা শুরু করেছিল, তাদের অবস্থা বোঝানোর জন্যই ছিল এই উদ্যোগ। ২০১৪ সালে এই ক্যাটাগরিতে ছিল ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মধ্যে তাদের বিক্রি ৫.১ ভাগ বেড়েছে।
দুটি তুর্কি কোম্পানির শীর্ষ ১০০-এ রয়েছে। ২০১৪ সালে আসেলস্যানের বিক্রি ৫.৬ ভাগ বাড়লেও তাদের স্থান ৬৬তম থেকে ৭৩-এ নেমে গেছে। আর টার্কিশ অ্যারোস্পেশ ইন্ডাস্ট্রির (টিএআই) বিক্রি ১৫.১ ভাগ বাড়ায় তারা ৮৯তম হিসেবে শীর্ষ ১০০ তালিকায় প্রবেশ করেছে।
সিপরির সিনিয়র রিসার্চার সাইমন ওয়েজম্যান বলেন, অস্ত্রের দিক থেকে তুরস্ক আত্মনির্ভরশীল হতে চাচ্ছে। এ কারণেই তারা বেশ আগ্রাসীভাবে রফতানি বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো শীর্ষ ১০০-এ স্থান উন্নত করেছে। এশিয়ার ১৫টি কোম্পানি (চীনকে এই হিসাবে রাখা হয়নি) শীর্ষ ১০০-এ স্থান করে নিয়েছে। ওয়েজম্যানের মতে, এশিয়ার অনেক কোম্পানি তাদের বিক্রি স্থিতিশীল রেখেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ান কোম্পানিগুলো ২০১৩ সালের চেয়ে ২০১৪ সালে বিক্রি বাড়িয়েছে ১০.৫ ভাগ। শীর্ষ ১০০-এ যোগ দেওয়া নতুন দক্ষিণ কোরিয়ান কোম্পানি হলো হুনদাই রোটেম। তারা সামরিক যানবাহন তৈরি করে।

সেই মার্চ আর এই মার্চ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
মার্চ ১৯৭১। উদ্বেল বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, স্বাধীনতার অপার আকাঙ্খায়। জাতির জীবনে সোনালী প্রত্যয়, শৃঙ্খল, প্রতিরোধ আর আত্মোৎসর্গে ভাস্বর। সেই বসন্তের আগুনঝরা সময় জুড়ে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের পথে হেঁটেছিল বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, যা ছিল স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত ধাপে পদার্পন। সাংবিধানিক ধারায় ক্ষমতায় যাওয়া যখন বাধাগ্রস্ত তখনই ১ থেকে ২৫ মার্চ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল জাতির আকাঙ্খার স্ফুরণ।
ব্যক্তি সেখানে হয়ে উঠেছিল গৌণ, মূখ্য হয়ে উঠেছিল আপামর জনসাধারণের স্বাধিকার অর্জনের প্রাণান্তকর আকাঙ্খা। তাকে শক্তি দিয়ে দমিত করছে চেয়েছে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি। হত্যা, গুম, ধর্ষণ আর অজস্র লাশ দিয়ে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই আকাঙ্খাকে। কিন্তু সাগরের ঢেউয়ের মত উপচে পড়া জনস্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সবকিছু। সেই এক সময়। ঘনঘোর অন্ধকার সময়। কিন্তু মানুষ থামেনি। মানুষ জেগেছে ভেতরের শক্তিতে। কারণ জনগনের ইতিহাস তো বিজয়গাঁথার। কে রোখে তাকে!
সাহস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর পরার্থপরতার অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল সেই বসন্তে। এজন্যই সামষ্টিক কল্যাণে ব্যক্তি উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে, ভবিষ্যত কল্যাণের জন্য। সেই মার্চে সকল রাজনৈতিক দল এবং জনগন ছিল ঐক্যবদ্ধ। বিপরীতে জামায়াত, মুসলিম লীগসহ ধর্মের কথিত ধ্বজাধারীরা দাঁড়িয়েছে জনআকাঙ্খার বিপরীতে। পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংসতায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কোরামিন দিয়ে বাঁচাতে চেয়েছে মৃতপ্রায় পাকিস্তানকে।
এর বিরুদ্ধে মানুষ একাট্টা হয়েছিল। আলবদর, আলসামস, রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন অকুতোভয়। মৃত্যুপুরীর মধ্যে থেমে থাকেনি জীবনের জয়গান। নিজের জীবনের বিনিময়ে আগত নাগরিকদের জন্য চেয়েছে স্বাধীন দেশ। শেখ মুজিবের ডাকে শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ। শেষতক তা ব্যক্তি, দলের সীমানা অতিক্রম করেছে। পরিনত হয়েছে জনযুদ্ধে। সেই বসন্তে মানুষের এই অসামান্য জাগরন এই জাতির এখনও সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রকৃত অর্থে সেই বসন্ত ছিল রাষ্ট্রের অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক সাহসী পদক্ষেপ। ছিল সকল প্রকার রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বৈষম্য বিলোপের অপারাজেয় সাধনা। ছিল রাষ্ট্রকে অধিকতর গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলার প্রাণপণ লড়াই। স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন সমাজ তৈরীর। জাতি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র অর্জনে। প্রণোদনা ছিল আগামী উজ্জল ভবিষ্যত। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছিল। মুক্তি অর্জনে আর কোথাও এত মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে? ইতিহাসের এরকম উদাহরণ একটিই।
সাড়ে চার দশক পেরিয়ে সেই বসন্তের গৌরবময়, আত্মসম্মানের বলীয়ান, মহিমান্বিত মূল্যবোধ এই বসন্তে কি চেহারা পেয়েছে? অত্যুদ্ভুত দশম সংসদ নির্বাচনের পরে দুই বছরের বাংলাদেশ, পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে নতুন আদলের সংবিধান এই দেশকে কোন জাগ্রত চেতনার দিকে ঠেলছে। জাতীয় সংসদে সরকার-বিরোধী দল একাকার, কে সরকার, কে বিরোধী চেনার উপায় নেই।
এই প্রশ্নগুলি উঠলে একাত্তরের মার্চের দিকে তাকাতে কুন্ঠা জাগে। বিদ্বেষ-হিংসা প্রসূত ক্ষমতার কামড়া-কামড়ি জাতির সামগ্রিক বিবেক-বিবেচনাকে অতলে নিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের প্রথম সূচক নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। শাসক ও শাসিতদের মধ্যে টেনে দেয়া হয়েছে ভেদরেখা। ধর্মকেও নিরাপদ রাখা যাচ্ছে না। ধর্ম হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা বা না থাকার অন্যতম হাতিয়ার। মানুষে মানুষে বাড়ছে বৈষম্য। আর এই বৈষম্য যত বাড়ছে, অস্থির সমাজ ততটাই হিংস্র হয়ে উঠছে। এর অনিবার্যতায় এই দেশ এখন শিশু ও নারীর বধ্যভূমিতে পরিনত।
একাত্তরের মার্চে জাতির মধ্যে ছিল এক রাষ্ট্রের চিন্তা। যে ন্যায্য রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সকলের। কিন্তু সাড়ে চার দশক পরে বিভাজনের খেলায় এখন জন্ম নিচ্ছে এক রাষ্ট্রের মধ্যে বহু রাষ্ট্রচিন্তার। মূল কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি জনআকাঙ্খার বিপরীতে এক দলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ন্যায্য রাষ্ট্রচিন্তা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। এর ফল এত বছর পরেও রাষ্ট্রের সারা অঙ্গে সুস্পষ্ট।
স্বাধীনতা লাভের প্রথম দশকে এজন্যই রাষ্ট্রের স্থপতিরা প্রাণ দিয়েছেন স্বাধীনতা বিরোধী এবং দলের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত ক্ষমতালোভী চক্রের ষড়যন্ত্রে, আন্তর্জাতিক শক্তি যার সাফল্য নিশ্চিত করেছিল। স্থপতিরা জানতেন না, জনআকাঙ্খার বিপরীতে যেমন নিজেকে রক্ষা করা যায় না, তেমনি গোটা দেশ-জাতি নিমজ্জিত হয় ঘোর অমানিশার মাঝে।
এই আত্মপর রাষ্ট্রচিন্তা ২০১৬ সালের মার্চে এসে যে বাংাদেশ তৈরী করে দিয়েছে, তা একাত্তরের মার্চের আকাঙ্খার সাথে সাংঘর্ষিক। নয়া রাষ্ট্রের এই দুর্বলতা অসামান্য দূরদর্শিতায় স্থপতিদের দু’একজন ভাবেননি তা নয়। এটি আঁচ করতে পেরেছিলেন মাওলানা ভাসানী ও তাজউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্র হবে, সাথে রাষ্টানুগ শাসক হতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে সেই রাষ্ট্র কতটা বাসযোগ্য হবে, সন্দেহ জেগেছিল উভয় নেতার মনে। সঠিক সময়ে তার গুরুত্ব বিবেচিত না হওয়ায় অচিরেই উল্টো যাত্রায় সামিল হতে হয়েছিল দেশ ও জাতিকে।
সমষ্টির উন্নতিই রাষ্ট্রের উন্নতি। রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা বৈষম্যহীন, তার রাজনৈতিক সুস্থিতি কতটা শুভভারাপন্ন তার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা কল্যাণকামী। স্বার্থক রাষ্ট্র মাত্রই অধিকসংখ্যক জনগনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। যে রাষ্ট্র কতিপয় উন্নতিকে গুরুত্ব দেয়, যে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উ্ন্নয়ন কতিপয়কে পরিপুষ্ট করে, সে উন্নয়ন যতই চোখধাঁধানো হোক অন্তিমে তা হয়ে ওঠে জনবিনাশী। কারণ এই উন্নয়ন শুধু বৈষম্যই বাড়ায়। একাত্তরের মার্চে সংগঠিত হওয়া এবং আন্দোলন ও যুদ্ধের অন্যতম স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্র আর কখনই বৈষম্য উস্কে দেবে না।
এক সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এই রাষ্ট্রকে গ্রাস করতে চলেছে। অধিকসংখ্যক জনগোষ্ঠিকে রাষ্ট্র অসুখী করে রেখেছে। এই কারণে রাজনৈতিক সুস্থিরতা নেই। বর্তমানে যে নিস্তরঙ্গ ও উত্তাপহীন পরিস্থিতি দেখে ক্ষমতাসীনরা সুখী বোধ করে, শান্ত ও সুস্থিত বলে তৃপ্ত হয়, ২০১৬ সালের এই মার্চে সেটি হয়তো তাদের মনোজগতের ভাবনায় আছে। কিন্তু সামগ্রিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্য এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু বা নারীরা নির্মমতার শিকার হয়ে জীবন দিচ্ছেন। পরিবারও এখন আর শিশুদের জন্য নিরাপদ নেই।
সুস্থিত রাজনীতি, গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সুশাসনহীনতায় রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন কিছু কিছু অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটায় বটে। কারণ শাসকশ্রেনী যাদের ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকে, তাদের সুযোগ-সুবিধে নিশ্চিত করতে উন্নয়ন ঘটাতে হয়। এই কথিত উন্নয়ন টেকসই নয় এবং তা সর্বজনকে সুবিধা দেয় না। কর্তৃতববাদী শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে দমন-পীড়ন এবং যে কোন উপায়ে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে রাখা হয়ে ওঠে মূলনীতি। ফলে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির বদলে জায়গা করে নেয় হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি।
উন্নয়ন তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন, Political development along democratic line is as important as economic development- এই তত্ত্বে বিশ্বাস করলে মানতেই হবে, বিদ্বেষপ্রসূত হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলে সুফলগুলি কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। পরিনামে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি উন্নয়নের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে। হয়ে পড়ে ভাগ্য ও নিয়তি নির্ভর। এই নির্ভরতা তাদের বিপথে চালিত করে এবং হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে জঙ্গীবাদী গোষ্ঠিগুলোতে তরুনদের যুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণই হচ্ছে এটি।
স্বৈরাচারী শাসকের পতনের পর দেশের জনগন এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভিকটিম হিসেবে পরিগনিত। তারপরেও পাঁচ বছর পরে তাদের সামনে একটি সুযোগ অন্তত ছিল, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে উন্নত কিছুর প্রত্যাশা করা। যদিও সে আশা ভোটাধিকারের মাধ্যমে তারা কখনই প্রতিফলিত করতে পারেননি। এর মূল কারণ হচ্ছে, সামরিক শাসনের আদলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন অব্যাহত থাকা। এই দুর্বৃত্তায়নে রাজনীতিকদের জায়গা দখল করে নিয়েছে উঠতি ব্যবসায়ী শ্রেনী, যাদের অর্থের মূল উৎস মূৎসুদ্দী পূঁজি ও ঋণের নামে ব্যাংক লুটের অর্থ। ফলে রাজনীতিতেও গুনগত পরিবর্তন ঘটেছে গত আড়াই দশকে এব্ং কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এই লুটেরা ব্যবসায়ী শ্রেনীর স্বার্থ।
রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল নাগরিকদের জন্য সবক্ষেত্রে ন্যায্যতার সূচনা করা। যা একটা সময়েই ন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। ব্যক্তি বিশেষকে অন্যায় সুবিধে দিয়ে সুরক্ষা প্রদান রাষ্ট্রের কোন নৈতিকতার সাথে যায় না। রাষ্ট্রের কাজ সামষ্টিক লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখা। রাষ্ট্র যে পদ্ধতিতে কাজ করে সেখানে পক্ষপাতিত্ব, বিশেষ সুবিধে প্রদান যে অন্যায্যতা সৃষ্টি করে, তা এক সময়ে পুরো ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত করে দেয়। ২০১৬ সালের মার্চে এসে এই অবস্থাটি সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পরে যে চোখধাঁধানো উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তা কতটা টেকসই? গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং সুশাসন ছাড়া এটি কতটা অর্থহীন তা প্রমান করতে বেশিদুর যাওয়া লাগবে না। সারাদেশের আশি ভাগ সম্পদ ও অর্থ কাদের হাতে কুক্ষিগত এই প্রশ্নটির উত্তরে নিহিত রয়েছে উন্নয়ন স্থায়ীত্বশীলতা। ক্ষমতায় থাকতে চোখে ঠুলি পড়ে উন্নয়নের ঢাক বাজানো এবং সবকিছুকে জায়েজ মনে করেন ক্ষমতাসীনরা। ক্ষমতা হারালে চোখ খুলে যায় এবং তখন প্রতিপক্ষের সবকিছুকে মনে হয় অবৈধ।
এজন্য মার্চ এলেই সামনে আসে স্বাধীনতার কথা, মুক্তির কথা। একাত্তরের পয়তাল্লি¬শ বছর পরে ২০১৬ সালের এই মার্চ সামনে নিয়ে আসছে ব্যর্থতা, বিতর্ক, বিভেদ, বিদ্বেষ, সন্দেহ। আবার জিজ্ঞাসা, যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়িত হবে? রাজনীতির কূটিল খেলায়, অর্থের ছড়াছড়িতে জনদাবি কি মিলিয়ে যাবে? এ কূটতর্কে জড়িয়ে পড়েছে সরকার, সর্বোচ্চ বিচারালয় পর্যন্ত। ছড়ানো হচ্ছে বিভেদ-বিদ্বেষ। রাষ্ট্র কি এখান থেকে বেরুতে পারবে? পারবে কি সবক্ষেত্রে ন্যায্যতার সূচনা করে জন-মানুষের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতি, লুকোচুরি : অনেক প্রশ্ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন : বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনিয়ম ও জনগণের অর্থের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব যাদের সেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রির্জাভের অর্থ খোয়া গেছে। প্রশ্ন উঠছে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও। প্রকৃত ঘটনা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সুইফট কোডের মাধ্যমেই অর্থ লুটের ঘটনা ঘটেছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুইফট কোড নিয়ন্ত্রণ করা হয় ভারত থেকে। অর্থ লুটের পর নিয়ন্ত্রণে জড়িতদের বাংলাদেশে আসতে বলা হলেও তারা আসছে না। সুইফট তথা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন হলো বেলজিয়ামভিত্তিক আন্তব্যাংক আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে আন্তব্যাংক লেনদেনের পরিচিতি শনাক্ত করা হয়- যা মূলত সংকেতলিপি তথা কোডের মাধ্যমে করা হয়। এক্ষেত্রে লেনদেনের তারবার্তা (ওয়ার) এই কোডের মাধ্যমে আদান প্রদান করা হয়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইফট কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে বার্তা (ওয়ার) বিনিময় হয়েছে, সেটি ছিল বিশ্বাসযোগ্য (অথেনটিক)। এখন পর্যন্ত আমাদের নেটওয়ার্ক অপব্যবহার হয়েছে, এ রকম কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। যার মানে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো সুইফট কোড দিয়েই অর্থ সরানো হয়েছে। এক্ষেত্রে সহজেই প্রশ্ন করা সম্ভব যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ কী এই কোড পাঠানোর সঙ্গে জড়িত? তাহলে প্রশ্ন কে বা কারা হলো কে জড়িত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা দাবি করেছেন, ‘সার্ভার বাংলাদেশ থেকে হ্যাকড হয়নি। এটি দেশের বাইরে থেকে হয়েছে, যা আমাদের আওতার বাইরে। তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সার্ভার এরিয়া খুবই সুরক্ষিত। আইডি প্যানেলে ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ও এন্টি-ভাইরাস প্রুফ। এতে সুইফট কোড হ্যাকড হওয়া তো দূরের কথা, এর আইডি প্যানেলে তৃতীয় কোনো পক্ষের প্রবেশ করার সুযোগও নেই। সঙ্গত কারণে হ্যাকারদের মিশন এখানে কোনোভাবেই সফল হবে না। ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষও সাফ জানিয়ে দিয়েছে – তাদের দফতর থেকেও হ্যাকড হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাহলে প্রশ্ন হল- কথিত হ্যাকাররা কীভাবে হ্যাকড করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি করে নিয়ে গেল।
এ পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের খোয়া যাওয়া ৮৭ কোটি ডলার ফিলিপাইনের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পাচার হওয়ার চেষ্টা গত মাসে নস্যাৎ হয়ে যায়। যদিও তার কিছুদিন আগেই একই উৎস থেকে আসা ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেলে ঢুকে পড়ে এবং পরে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) স্থানীয় গ্রাহকদের নামে ছাড় করা হয়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে অনুপ্রবেশকৃত মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক নির্ভরশীল সূত্রে জানা গেছে, শ্রীলঙ্কা থেকে উদ্ধার করা দুই কোটি ডলার গিয়েছিল সে দেশের একটি ব্যাংকে নতুন খোলা এনজিও-র (বেসরকারি সংস্থা) হিসাবে। কনসালট্যান্সি বা পরামর্শক ফি হিসেবে ওই অর্থ স্থানান্তরের ‘পরামর্শ’ গিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকেতলিপি থেকে। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন শক্তিশালী হওয়ায় নতুন একটি হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সন্দেহের চোখে দেখেছে। তখন ওই ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আনা হলে সেই অর্থ আটকে দেয়া হয়।
সূত্রটি আরও জানায়, ফিলিপাইনেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়ে জমা হয়। পরে সেখান থেকে অন্য হিসাবে সে সব অর্থ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের দুর্বলতা এবং ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকায় বড় অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেন সত্ত্বেও তা অনায়াসে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে চলে যায়। ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চুরি করা অর্থের বড় অংশই কয়েকটি ক্যাসিনোর হাত ঘুরে ফিলিপাইন থেকে বেরিয়ে হংকংয়ে চলে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লুকোচুরি: গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুইফট কোডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে মজুদ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে মোট ১০ কোটি ১০ লাখা ডলার শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে পাচার করা হয়। অর্থ পাচারের পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংককে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘটনা জানায় এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেয়। কিন্তু ফিলিপাইনে পাচার হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ লাখ ডলার লুটেরা নিয়ে যেতে পেরেছে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো ৫ ফেব্রুয়ারির এ ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক এক মাসেরও বেশি সময় ধামাচাপা দিয়ে রাখে। এমনকি গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের সংবাদপত্র ‘দি ফিলিপিন্স ডেইলি ইনকোয়ারার’ অর্থ পাচারের প্রতিবেদন ছাপলেও ৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক লিখিত এক বিবৃতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আলোচিত এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে। একই দিন অর্থমন্ত্রী জানান, তিনি সংবাদপত্র থেকে অর্থ পাচারের কথা জেনেছেন, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে কিছুই জানায়নি। প্রশ্ন হলো- এতবড় ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক কেন এতদিন চেপে রেখেছিল এবং এক মাসেরও বেশি সময় খোদ অর্থমন্ত্রীকেও তারা ঘটনা অবহিত করেনি কেন?
খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো স্পষ্টভাবে খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করেনি। এখনো তারা বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরি করছে। প্রশ্ন হলো, জনগণের অর্থ নিয়ে এত লুকোচুরি কেন? কেন্দ্রীয় সার্ভারের কম্পিউটারগুলো যাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় তারা খুবই প্রযুক্তি দক্ষ। এই সার্ভারের সবকিছু নিয়ন্ত্রণের জন্য কয়েকজন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞও রয়েছেন। যারা সুপার অ্যাডমিন হিসেবে কাজ করেন। আবার তাদের তত্ত্বাবধানে কাজ করেন আরও বেশকিছু অ্যাডমিন। তারা ফাস্টলাইনে থেকে আইডিগুলো পরিচালনা করেন। এদের প্রত্যেকে পৃথক আইডি ও আইপি ব্যবহার করে থাকেন। আবার কাউন্টার চেকিংয়ে তারা সার্ভারে কী করছেন তা প্রধান অ্যাডমিন পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হ্যাকারদের এমন আক্রমণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেই হ্যাকারদের লোক থাকতে পারে। আর এজন্য স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রযুক্তি জানা গোয়েন্দাদের এ অনুসন্ধান ও তদন্তে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্ভারের ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই বোঝা যাবে আসলে কী হয়েছিল। যদিও ম্যালওয়ার ভাইরাস আক্রমণের কথা বলা হচ্ছে। আদৌ কোনো ভাইরাস আক্রমণ করেছিল কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুরো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে। সবচেয়ে আশ্চার্যের বিষয় হলো, দেশে সাইবার বিশেষজ্ঞ দল, র‌্যাবের আইটি বিশেষজ্ঞ, আইসিটি মন্ত্রণালয় থাকা স্বত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক ভারতীয় সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞকে এ কাজে নিয়োজিত করেছে।
সবই জানতেন আরসিবিসি শাখার কর্মকর্তারা: ইনকোয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিটে অবস্থিত ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন বা আরসিবিসি শাখায় মূল লেনদেনের ঘটনা ঘটেছিল। শাখাটির প্রধান এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিষদ বরাবর দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইয়ুচেংকো পরিবার পরিচালিত ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা লেনদেনের একেবারে আদি-অন্ত জানতেন। কয়েক মাস আগে সৃষ্ট ৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তহবিলগুলো জমা করা হয়েছিল এবং তা পেসোতে রূপান্তরিত করতে ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্রোকার ফিলরেমে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এরপর তা আরসিবিসি বরাবর স্থানান্তর করা হয় এবং তা চীনা বংশোদ্ভূত এক ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর নামে রাখা হয়। আর সেখান থেকেই সেগুলো ক্যাসিনোতে পাঠানো হয়। ফিলিপাইনের এক সরকারি সূত্রের বরাতে ইনকোয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় ক্যাসিনো হয়ে অর্থগুলো হংকংয়ে জমা করতেন চীনা বংশোদ্ভূত ওই ফিলিপিনো ব্যবসায়ী।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের প্রতিনিধির দাবি, ২০১৫ সালের মে মাসে ম্যানেজারকে ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারাই এ আদেশ দেন। এ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খুলতে গিয়ে আরসিবিসি ব্রাঞ্চের ম্যানেজারকে ৫টি আইডি কার্ড সরবরাহ করা হয়। তবে কার্ডগুলোতে যেসব পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে তার সবগুলোই কাল্পনিক। ঘটনা প্রকাশের পর এখন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এ ব্যাপারে মুখ খোলার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইনকোয়ারার। কারণ তার আশঙ্কা, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সব দায় তার গায়ে দিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে যে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হয়েছে তা বিভিন্ন হাত হয়ে ক্যাসিনোতে চলে যায়। এসব টাকা জুয়ার আসর থেকে আবার নগদ টাকায় রূপান্তরের পর চলে যায় হংকংয়ের একটি অ্যাকাউন্টে। এদিকে আরও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এই অর্থ দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। যদিও ঘটনাটি গত মাসের। কিন্তু ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর এর আগে ১০১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) হ্যাকাররা নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখান থেকে শ্রীলংকার ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করা ২০ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনা হয়েছে বলে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঘটনাও অনেক আগের কিন্তু জানা গেল মাত্র ৭ মার্চ।
পত্রিকাটি বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, ওই ঘটনার মাত্র ক’দিন আগে ৮১ মিলিয়ন ডলার একই উৎস থেকে ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকিং সিস্টেমে ঢুকেছিল এবং তা রিজাল কমার্সিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) এক স্থানীয় ক্লায়েন্টের কাছে আসে। যে ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে। যেখান থেকে গ্রাহকের হাতে চলে যাওয়া টাকা একটি ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারের কাছে পাঠানো হয়েছিল এবং পরে তা সিটি অব ড্রিমস ও মিদাসের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোতে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সে অর্থগুলো জুয়ার আসরে নিয়ে বাজি ধরার উপযোগী করা হয়। আর শেষ পর্যন্ত আবার সেগুলোকে নগদ অর্থে পরিবর্তন করে হংকংয়ের একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরি বানচাল করার পর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফিলিপাইনের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনা। তবে এ ঘটনা নাকি আরসিবিসি ব্যাংকের কর্মকর্তারা আগে থেকেই জানতেন। ফিলিপাইনের এক সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের নেয়া টাকাগুলো স্থানীয় ক্যাসিনো হয়ে হংকংয়ে জমা করেছেন চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপাইনের ওই ব্যবসায়ী। ব্যাংকটির ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের দাবি, ২০১৫ সালের মে মাসে ম্যানেজারকে ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাই এ আদেশ দেন। এ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খুলতে গিয়ে আরসিবিসি ব্রাঞ্চের ম্যানেজারকে ৫টি আইডি কার্ড সরবরাহ করা হয়। যে কার্ডগুলোতে ব্যবহৃত পরিচয় ছিল কাল্পনিক। ঘটনা প্রকাশের পর এখন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য তৈরি রয়েছেন বলে পত্রিকাটি তাদের খবরে প্রকাশ করেছে।
আরও প্রশ্ন: একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের পুরো আর্থিক খাতকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে দলীয় পরিচয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনারও সমাধান হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। কারসাজি করে এখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, যাদের সাথে ক্ষমতাসীনদের কারো কারো সাথে সখ্যতা আছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি সরকার। হলমার্ক, ডেসটিনির মতো নামসর্বস্ব কোম্পানিও সাধারণ জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও তা উদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। সর্বশেষ এটিএম কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে দুষ্কুতিরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বহু উদাহরণ তো রয়েছেই। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হলো, কারসজি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ নেয়ার ঘটনা। কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি, কোনো বিচার শেষ হয়নি, এমনকি কাউকে শাস্তি বা জবাবদিহি করতে হয়নি। এ কারণে দুবৃর্ত্তরা শতগুণ উৎসাহিত হয়ে এ ধরনের কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, তা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও কর্তৃপক্ষ নানা কথা তৈরি করছে, লুকোচুরি করছে বিষয়টি নিয়ে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এ-সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হলেও এত বড় ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর এবং সরকার প্রধান কোনো বক্তব্যই দেয়নি। কাজেই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি, যে বাংলাদেশ ব্যাংক হরহামেশা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলে, তারা এখন কি বলবেন?

সুন্দরবন – আগ্রাসী উন্নয়নের নতুন শিকার

Sundarbanদেওয়ান মওদুদুর রহমান : প্রাণ ও প্রকৃতির অনন্য এক জাদুঘর আমাদের সুন্দরবন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, স্বাদুপানির ডলফিন, নোনাজলের কুমির, দুরন্ত হরিণ, সুন্দরী, গেওয়া, গরানএসব কিছু মিলিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন হয়ে উঠেছে আশ্বর্য এক বিস্ময়। অথচ এই সুন্দরবনেরই একেবারে নিকটে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প।

প্রায় দু’বছর ধরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ, যৌথ কোম্পানী গঠন, সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ সহ নানা কর্মযজ্ঞ চলতে থাকলেও প্রকৃতিপ্রেমী সচেতন মহলের ধারণা ছিল হয়তোবা কোন এক পর্যায়ে সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে বিধ্বংসী এ প্রকল্প হতে সরকার সরে আসবে। কিন্তু সর্বশেষ গত এপ্রিলে ভারতের সাথে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট তিনটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তিকে অনেকেই দেখছেন কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে।

উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে বিদ্যুৎ। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মানুষগুলোর কাছে গত নির্বাচনে এ সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রতি ছিল বিদ্যুৎ সমস্যা দূরীকরণ। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকট উত্তরণে ১৩২০ মেগাওয়াটের এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে যে সুন্দরবন এলাকাকেই বেছে করা হবে সেটি কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জ্বালানী হচ্ছে কয়লা। কয়লা খনি ব্যবসার প্রসারে পরিবেশ সংরক্ষণের উপায় হিসেবে আধুনিককালে সিসিএস (পধৎনড়হ পধঢ়ঃঁৎব ধহফ ংঃড়ৎধমব) নামে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় সেটি আদতে কোন কাজে আসে না। তাই রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক দূষণ যে বাতাসমাটিপানির মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রাণপ্রকৃতিতে চরমতম আঘাত হানবে তা বলাই যায়। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে প্রয়োজন হবে ৪৭ লক্ষ টন কয়লা যা জাহাজযোগে নিয়ে আসা হবে ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। সুন্দরবনের বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলা পশুর নদীর উপর দিয়ে দূষিত কয়লা বোঝাই জাহাজগুলো চলাচল করবে বছরের প্রায় ২৩৬ দিন। এতে পরিবহনকালে কয়লার ভাঙ্গা টুকরা, তেল, ময়লা আবর্জনা দিয়ে সুন্দরবনের পানি দূষিত হবে। সৃষ্ট ঢেউয়ে পাড় ভাঙবে। উন্মুক্ত চলাচলের সুযোগে সুন্দরবনে চোরাই শিকারী বাড়বে। এই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পোড়ানোয় তৈরী হবে বিষাক্ত ধোয়া। যাতে থাকবে সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রজেন অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। এছাড়া আর্সেনিক, পারদ, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, রেডিয়াম এগুলোর মারাত্মক দূষণ তো রয়েছেই। এতে এসিড বৃষ্টি হবে, যা কিনা উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর জন্য মারাতœক হুমকি।

থাইল্যান্ডের মাই মোহ’তে ২৬২৫ মেগাওয়াটের অনুরূপ একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে বৃষ্টির পানিতে সালফেটের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। সালফার দূষণে জমির ফলন কমে গেছে। এসিড বৃষ্টির ফলে ওই অঞ্চলের গাছপালা মরে যাচ্ছে। চীনের সানঝি নগরী এক সময় পরিচিত ছিল ফুল ও ফলের নগরী হিসেবে। অথচ মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে কয়লা দূষণে এখন তা ধূসর পাহাড় আর কালো পানির শহরে পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট ইয়ুগ্যাং গ্রোট্টি’র হাজার বছরের ঐতিহ্য হালের কয়লা দূষণে এতটাই ভঙ্গুর হয়ে গেছে যে, সামান্য স্পর্শেই পাথর খসে পড়ে। তাই যতই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হোক না কেন অনূরূপ ঘটনা সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও ঘটবে।

আধুনিককালে কার্বন দূষণের ভয়াবহতা বিবেচনায় শুন্য নির্গমণ নীতি ব্যবহার করা হয়। অথচ এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে ৯১৫০ ঘনমিটার হারে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের পর ঘন্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার হারে পশুর নদীতে ফেলা হবে। গ্রীষ্মে এ পানির তাপমাত্রা থাকবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর শীতে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এক্ষেত্রে একদিকে কার্বন দূষনে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর অন্যদিকে, তাপীয় দূষণে মাছের বৈচিত্র আশংকাজনকভাবে কমে যাবে। ঠিক এমনিভাবে ইন্দোনেশিয়ার সিলাসাপ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তাপীয় দূষণে মাছের সংখ্যা কমে গেছে প্রায় ৫০ ভাগ।

এ প্রকল্পে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম একেবারে স্পষ্ট। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশাল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণে স্থানীয় মানুষের দাবিদাওয়া আমলে নেয়া হয়নি। ৫ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার ব্যাপারে কোন চিন্তা করা হয়নি। শত শত কোটি টাকার ফসল, গবাদি পশু, হাসমুরগীমাছের খামার আর স্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কোন বিকল্প চিন্তা করা হয়নি। কাজ শুরুর পূর্বে কোন পরিপূর্ণ পরিবেশগত সমীক্ষা রিপোর্ট (ইআইএ) করা হয়নি। আর সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে বাস্তব সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়নি।

প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ হারুণ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকায় প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব বিষয়ক একটি গবেষণা করা হয়েছে। এই গবেষণায় পরিবেশগত প্রভাবের দিকগুলো ৩৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই প্রভাব কতটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হবে সেটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। এই ৩৪টি ক্যাটাগরির ২৭ টিতেই পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। ৭টি ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নই একমাত্র বাস্তবিক ইতিবাচক পরিবর্তন। বাকি ৬ টিকে ইতিবাচক হিসেবে বলা হলেও সুন্দরবন ধ্বংসে সে প্রভাবগুলো ‘টনিকে’র মত কাজ করবে। ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে রামপাল ও তদঃসংশ্লিষ্ট এলাকায় নগরায়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও হাট বাজার সৃষ্টি। কিন্তু বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যাংগ্রোভ বনকে ঘিরে যদি শিল্পের প্রসার হয় কিংবা জনবসতি গড়ে ওঠে তবে সে বন আর কতদিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা ভেবে দেখবার বিষয়।

আধুনিককালে এ ধরণের বড় কোন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মোকাবেলা করা হয় দুই উপায়ে। প্রথমটি হচ্ছে, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থান, যার মাধ্যমে পরিবেশ আইন ভঙ্গের কঠোর শাস্তি দ্রুত সময়ে নিশ্চিত করা যায়। আমাদের দেশে এ দুটি জিনিসেরই বড় অভাব। আর তাইতো বুড়িগঙ্গায় আশ্রয় পায় নর্দমার পানি, গয়নাঘাট খাল ভরাট করে তৈরী হয় বিশাল বিপণী বিতান আর তিতাসের বুক চিরে তৈরি হয় চলাচলের রাস্তা।

যেই উন্নয়নের সিড়ি প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পরিবেশ ধ্বংসের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় সেই উন্নয়ন অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হতে যাচ্ছে সেই উন্নয়নের বাহন যেখান থেকে পাওয়া যাবে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আর বিলীন হয়ে যাওয়া সুন্দরবনের বিস্তৃত ন্যাড়া ভূমি।।

২০১৫ :: জনমনে আতংক উদ্বেগ আর জঙ্গীবাদের নতুন উত্থানের বছর

আমীর খসরু

বছরটি শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক সংঘাতসহিংসতার মধ্যদিয়ে। কারণ ছিল এর আগের বছরের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে। আর বছরটি শেষ হচ্ছে প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান পৌর নির্বাচনকে ঘিরে উত্থাপিত নানা অনিয়ম, আচরণবিধি লংঘন এবং ছোটবড় নির্বাচনকেন্দ্রীক সহিংসতার মধ্যদিয়ে। বছরটি জুড়ে ছিল আগে থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট নানা বিপদ। আর ওই ভারসাম্যহীনতার কারণে রাজনৈতিক শূন্যতা গাঢ় হয়ে বড় সংকটের দৃশ্যমাণ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ওই কারণে বছরটিতে জঙ্গীবাদী কার্যক্রমের নতুন উত্থান ঘটে। আগের চেয়ে শক্তিমান হিসেবে আবির্ভূত হয় তারা এবং নতুন মাত্রায়। পুরো বছরটি জুড়ে রাজনৈতিক শূন্যতার যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে তা আগামীতে কমবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি ও কর্তৃত্ববাদীতার কারণে। বিস্তারিত »

পাঁচ জানুয়ারি থেকে পাঁচ জানুয়ারি

হায়দার আকবর খান রনো

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি। গত বছর বিএনপিকে কোন রকম সভা করতে দেয়া হয়নি। এমনকি খালেদা জিয়াও অবরুদ্ধ ছিলেন নিজ কার্যালয়ে। তার অফিসের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে রাস্তায় অবরোধ তৈরি করেছিল। কিন্তু জনৈক মন্ত্রী বলেছিলেন, ওটা নাকি বাড়ি মেরামতের জন্য আনা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন মিথ্যাচারে আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলা। অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার অফিসে এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়া হয়েছিল। পানি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং এটা করা হয়েছিল এক মন্ত্রীর জনসভায় প্রকাশ্য বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে, সরকারি সিদ্ধান্তেই। খালেদা জিয়ার ঘরে বিষাক্ত স্প্রে দেয়া হয়েছিল। এটাকে আর যাই হোক, সভ্য আচরণ বলা যায় না। বিস্তারিত »