Home » সম্পাদকের বাছাই (page 10)

সম্পাদকের বাছাই

ষোড়শ সংশোধনী রায় : কেন ক্ষমতাসীনদের এতো ক্ষোভ ?

সি আর আবরার ::

গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদের সদস্যরা সর্বোচ্চ আদালতের ওপর তুমুল আক্রমণ চালিয়েছেন। ষোড়শ সংশোধনী খারিজ করে দেওয়া ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে তারা তিক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ওই সংশোধনীতে অসদাচরণ এবং অক্ষমতাজনিত কারণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরকে অপসারণে পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে ক্ষমতাসীন দলের রথী-মহারথীরা ওই বিষয়ে তৈরি হয়ে আসার জন্য সিনিয়র এমপিদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। মিত্র দলের নেতাদেরও এ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিল। তারা দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের মনের ‘ঝাল’ ঝেড়েছেন। তারা রায়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে নিন্দা করতে তাদের ‘ক্ষোভ’ উগরে দিয়েছেন। তাদের বিষোদগারে, এটা কারো কারো মনে হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়টি ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।’ জনৈক প্রভাবশালী এমপি তার সহকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘শত্রুদের সাথে শত্রু র মতোই আচরণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে তাদেরকে ঠান্ডা করে দিতে হবে।’ বিচারকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘রায়ের মাধ্যমে তাদের অভিশংসন থামানো যাবে না।’ তিনি ‘নিজেদের ভুল সংশোধনের জন্য’ বিচারকদের পরামর্শও দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের এক মিত্র দলের নেতা ‘বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পেয়ে একে ‘সংসদের সার্বভৌমত্বে’ হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমপিরা তাদের অবস্থানে ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। তারা জোর গলায় বলেন, খারিজ করা সংশোধনীটি ছিল ‘১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ ধারা পুনঃবহালের’ লক্ষ্যে একটি অপরিহার্য প্রয়াস, তারা ‘সংবিধানের মৌলিক চরিত্র লঙ্ঘন করতে পারেন না।’ ক্ষমতাসীন জোটের আরেক নেতা বিচারপতিদের স্মরণ করিয়ে দেন, এই পার্লামেন্টেই তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে, ‘মাত্র কয়েক দিন আগে’ তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, এমপি মহোদয়েরা কোর্টের রায় এবং ১০ অ্যামিকাস কিউরির (তাদের ৯ জনই সংশোধনীটি বাতিল করার সুপারিশ করেছেন) পর্যবেক্ষনের মধ্যে তাদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি । তারা প্রধান বিচারপতি এবং দুই অ্যামিকাস কিউরি- ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের অনভিপ্রেত সমালোচনা করেন। একজন উর্ধ্বতন মন্ত্রী দাবি করেন, রায়ে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানকে তার আদর্শ বিবেচনা করেন। ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে ‘সুযোগসন্ধানী,’ ‘বিবেকবর্জিত,’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দুই অ্যামিকাস কিউরির একজনের শ্বশুর যে ‘পাকিস্তানের নাগরিক’ এবং অপরজনের ‘জামাতা যে ইহুদি’ সেটা জোর দিয়ে বলতে কোনো কসুর করা হয়নি!

যারা এই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন বিকশিত হওয়ার জন্য দশকের পর দশক ধরে সংগ্রাম করেছেন, তাদের জন্য ওই সন্ধ্যার কার্যক্রমটি ছিল বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। তাদের যুক্তি যে কেবল সংসদীয় শিষ্টাচারের বরখেলাপ এবং রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও আইন পরিষদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির মূলনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, সেইসাথে তারা ছিলেন ভ্রান্ত ও স্বার্থন্বেষকও।

এমপিরা দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করার কাজটি ছিল ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ এবং ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ পরিকল্পনা বানচাল করা। ২০১০ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্ট আরো তিনটি সাংবিধানিক সংশোধনী- পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ- বাতিল করেছে। বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে ‘মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং সপ্তম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। ফলে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করা যায়, আওয়ামী লীগ এমপিরা যদি ওইসব রায়কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বিবেচনা না করেন, তবে তারা ষোড়শ সংশোধনীর ব্যাপারে এমনটা কেন করছেন?

তাদের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিটিও শূন্যগর্ভ মনে হয়। ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা যদি ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল্যবোধ ও কার্যকারিতার বিষয়টি এত প্রবলভাবেই অনুভব করে থাকেন, তবে তারা সেটাকেই কেন অবিকলভাবে ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদে বিল কেন আনছেন না? দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এ ধরনের উদ্যোগ যে সফল হবে, তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়।

ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করেনি এবং এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃত্ব-বহির্ভূত কাজ করেছে বলে এমপিদের জোরালো দাবি হালে পানি পায় না। স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলেই অনুধাবন করা যায়, বিচার বিভাগ থেকে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে পার্লামেন্টের কাছে সমর্পণ করার মানে হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা এবং সেইসূত্রে সংবিধানের মূল কাঠামোকে দুর্বল করা।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তৃতাবাজির তোড়ে আরেকটি বিষয় পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গেছে যে, ১৯৭২ সালের সংবিধান থেকে পার্লামেন্টের বিচারপতিদের অপসারণের বহুল আলোচিত ব্যবস্থাটি উচ্ছেদ ও বাতিল করাটা প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারেরই কর্ম। তারাই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটা করেছিলেন।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তব্যের সারমর্ম প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, এমপিরা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে আছেন কিনা। জবাব দ্ব্যর্থহীনভাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ৯৪(৪)-এ সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতি তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে স্বাধীন থাকবেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাহী সরকার বা সংসদ সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে পারবে না। কার্যপ্রণালীতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি কার্যক্রম নিয়ে থাকা কোনো প্রশ্ন, প্রস্তাব উত্থাপনযোগ্য নয়’ (ধারা ৫৩, ৫৪ ও ১৩৩)। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সংসদ সদস্যরা সংসদে যে কথাই বলুন না কেন, ধারা ৭৮-এর আলোকে থাকা দায়মুক্তির সুবিধাটি নিয়ে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে- এমন কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করতে পারবেন না’ (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ, ঢাকা : মল্লিক ব্রাদার্স, ২০১২)।

এটাও উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, কার্যপ্রণালীতে ব্যক্তিগত ধরনের কোনো অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে এমপিদের। ফলে এটা খুবই সম্ভব যে, অ্যামিকাস কিউরি প্রশ্নে অরুচিকর মন্তব্য করে এমপিরা তাদের প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

সম্মানিত এমপিরা জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল পাকিস্তানেই বিচারপতিদের অপসারণে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ রয়েছে। তারা বলেন, বেশির ভাগ দেশেই এই ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া আছে। এ ধরনের দাবির পক্ষে প্রমাণের ওপর আলোকপাত করা যাক। ২০১৫ সালে কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘কমপেনডিয়াম অব অ্যানালাইসিস অব বেস্ট প্রাকটিস অন দি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেনিউর অব রিমোভাল অব জাজেজ আন্ডার কমনওয়েলথ প্রিন্সিপালস’-এ বলা হয়েছে, কমনওয়েলথভুক্ত ৪৮টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা (৩৪.৩%), ৩০টির মতো দেশে নির্বাহী ও আইনপরিষদ থেকে আলাদা একটি সংস্থা (৬২.৫%) রয়েছে। বাকি দুটি দেশে রয়েছে মিশ্রব্যবস্থা (৩.২%)।

কমনওয়েলথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ সংসদীয় অপসারণব্যবস্থায় কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত, তথ্যানুসন্ধান এবং মূল্যায়নে স্বাধীন, বহিরাগত সংস্থার  সম্পৃক্ত করার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সম্মানিত এমপিরা আমলে নিতে পারতেন, যে ১৬টি দেশ সংসদীয় অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের ১২টিই তথ্য তদন্তের দায়িত্বটি আইনপ্রণেতাদের ওপর রাখেনি। তারা এর বদলে আইন পরিষদ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা একটি সংস্থার ওপর এ  দায়িত্বটি দিয়েছে। কেবল শ্রীলঙ্কা, নাউরু ও সামোয়োর অনুসরণ করে বিচারক অপসারণে একচ্ছত্র পার্লামেন্টারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে বাংলাদেশ।

সমীক্ষায় সতর্কতা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, সংসদীয় অপসারণ পদ্ধতি ‘প্রয়োগ করা হলে মারাত্মক সাংবিধানিক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।’ এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই কক্ষবিশিষ্ট পদ্ধতিই অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা বর্তমানে সম্ভব নয়।

এক সিনিয়র মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, একজন অ্যামিকাস কিউরি ভারতে বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি এমন ধারণা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছেন যে, মনে হতে পারে, দেশটিতে এখনো সংসদের অপসারণের পুরনো পদ্ধতি চালু আছে। বাস্তবে ভারত, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশ বিচারপতি অপসারণে পার্লামেন্টকে দেওয়া ক্ষমতা হ্রাস করে সরকারি প্রভাবমুক্ত একটি ব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত করেছে। সংবিধানের ৭০ ধারায় আবদ্ধ আমাদের এমপিদের নতুন বাস্তবতার প্রতি যথাযথ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আইন প্রণয়ন বিভাগের অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া এবং বিচারপতি অপসারণ প্রশ্নে সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের প্রায় সার্বজনীনভাবে বহাল থাকার ভ্রান্ত দাবি এই দেশের গণতন্ত্রের জন্য কলাণকর নয়। আশা করা যেতে পারে, যুক্তিই জয়ী হবে এবং রাষ্ট্রের সব অঙ্গ ক্ষমতা বিভাজনের মৌলিক ধারণা এবং আইনের শাসনের প্রতি যথাযথভাবে শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

(লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

রামপালে ক্ষমতাসীনদের ‘শিল্প-বানিজ্য’ নগরী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

কম-বেশি ১৮৬টি ভারী-মাঝারি শিল্প স্থাপনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে, সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায়। সরকার এখন বলছে, ইউনেসকো’র শর্ত মেনে আপাতত: সুন্দরবনের আশে-পাশে বড় ধরনের শিল্প অবকাঠামোর অনুমোদন দেয়া হবে না। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার মেনে চলবে ইউনেসকো’র শর্ত-সুপারিশ। সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টার। তার মতে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ নয়, চলবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সুন্দরবন থাকুক আর না থাকুক উন্নয়ন চলবেই- এ ব্যাপারে সরকার প্রধান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই উন্নয়ন জোয়ারে এতকাল কোন বাধা পাত্তা না পেলেও যেইমাত্র শর্তসাপেক্ষে ইউনেসকো খসড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যা এখনোও চুড়ান্ত নয়, ঠিক অমনি সরকার সেটি লুফে নিয়েছে। প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এবং সবশেষ জ্বালানী উপদেষ্টা ফলাও করে সেটি প্রচার করেছেন। গেল কয়েকদিন জ্বালানী উপদেষ্টা মিডিয়ায় দারুন সরব- ইউনেসকো যা বলেছে তার বাইরে যাবেনই না-হাক-ডাক, ভাব যেন তেমনই!

অথচ এত বড় প্রতারণা কী মেনে নেয়া যায়? ইতিমধ্যে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই কিনেছেন কম-বেশি তিন হাজার একর জমি। দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নেতৃবৃন্দ কিনেছেন প্রায় সাত হাজার একর। একুনে দশ হাজার একর জমি কেনা হয়েছে এবং কেনার হিড়িক পড়ে গেছে।

এসব জমি তো আর বসতবাড়ি, রেষ্টহাউস বা বাংলো বানানোর জন্য কেনা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে ভাগ্যবান নেতা, যিনি এর আগে চিংড়ি ঘেরের ম্যানেজার ছিলেন, তিনি মোংলার জয়মনিরগোল এলাকায় কিনেছেন প্রায় দুশো একর জমি। নিশ্চয়ই বসবাসের জন্য নয়! দেশের খ্যাতনামা শিল্পগোষ্ঠি ওরিয়ন, বসুন্ধরা, সামিট, ইনডেক্সসহ নামী-দামী কর্পোরেট গ্রুপেরা সুন্দরবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার জলা-জমি কিনে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই শিল্প, কল-কারখানা স্থাপনের জন্য ?

খুলনা-মোংলা হাইওয়ের মাঝামাঝি থেকে শেষ মাথায় গেলে যে কারো মনে হবে- এখানে গড়ে উঠছে মেগা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল শিল্পাঞ্চল।  চিংড়ি ঘের,  গ্যাস প্ল্যান্ট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলির শিল্পবর্জ্য নিঃসরিত হচ্ছে। মিশকালো ধোঁয়া ও ফ্লাই এ্যাশ মিশে যাচ্ছে সুন্দরবনে। মোংলার সাম্পানঘাটে বিশাল আকৃতির সাইনবোর্ডঃ ‘‘এলাকাটি সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা’’। কিন্তু খোদ সরকারই সুন্দরবন ঘেঁষে জয়মনিরগোলে নির্মান করেছে বিশাল সাইলো বা খাদ্যগুদাম।

মোংলা ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চলের বিশাল সারির পর রামপালের দিকে যেতে দুই পাশে যে জমি মাত্র কিছুকাল আগেও ফাকা ছিল, আজ তার এতটুকুও জমি ফাঁকা নেই। সবই প্রস্তাবিত অথবা নির্মানাধীন শিল্প কারখানার দখলে। অথচ গোটা অঞ্চল প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ-এর অন্তর্ভুক্ত। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার নয়টি উপজেলায় ইতিমধ্যে ১৪০ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে চ’ড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনের দুই কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মাহববুবুল আলম হানিফ ‘সানমেরিন শিপইয়ার্ড’ নির্মানের ছাড়পত্র পেয়ে গেছেন।

ছাড়পত্র প্রসঙ্গে বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল চমৎকৃত করে দেবার মত। তার মতে, “দেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার, আবার শিল্প-কারখানাও দরকার। আমরা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্দ্রী বরাবরে উপস্থাপন করছি”। বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠির তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে। কারণ, সুন্দরবন রক্ষা করতেই হবে-এটি তাদের প্রধানতম কাজ।

প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ এবং জ্বালানী উপদেষ্টাকে স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে না, তাদের রাষ্ট্রীয় গেজেট নিশ্চয়ই পড়তে হয়, পড়েন, জানেনও। রাষ্টপতির পক্ষে উপসচিব স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে; “প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিব বৈশিষ্ট্য নষ্ট ও পরিবর্তন হবে, এমন কোন কাজ করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দুষনকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না”। প্রসঙ্গত: সরকার সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার এলাকা প্রভাবিত প্রতিবেশ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের একজন, সংসদ সদস্য, একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফ কী জানেন না যে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় চিংড়ি ঘের করতে হলে পবিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে? গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা একসাথে কতগুলি রাষ্ট্রীয় আইন ভেঙ্গে চলেছেন!

এক. সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) কোন বাণিজ্যিক কর্মকান্ড স্থাপনা নিষিদ্ধ হলেও দাকোপের সুতারখালীতে ৩৫ একর বিশিষ্ট চিংড়ি খামার এবং দোতলা ও একতলা স্থাপনা নির্মান করেছেন হানিফ।

দুই. ঘের স্থাপনের বেড়িবাঁধ কেটে সুন্দরবনের পশুর নদ থেকে নিয়মিত লবন পানি ঘেরে প্রবাহিত করা হচ্ছে।

তিন. ঘেরের মাঝে অবস্থিত কালীমন্দিরের জায়গা তিনি ইজারা নিয়েছেন এবং একটি পুকুর ভরাট করে জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলেছেন।

চার. আরেকটি মন্দির নির্মান করছেন। পানি শোধনাগার স্থাপন করেছেন।

পাঁচ. চিংড়ি খামারে তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর ব্যবহার করে মারাত্মক শব্দদুষন সৃষ্টি করছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের পাঁচ ধারায় বর্ণিত ইসিএ  এলাকায় নিষিদ্ধ এসব কর্মকান্ড করে সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইন লংঘন করছেন…..।

এখন দেখা যাক, সুন্দরবন এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানে সরকার প্রধানের অবস্থান কি? কারণ তার নিজের এবং অনুসারীদের ভাষায়,“বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে দেশের একবিন্দু ক্ষতি হতে পারে না। তার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই”! সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে অনমনীয়। এক্ষেত্রে তিনি দেশ- বিদেশে সকল বাধা উপেক্ষা ও অতিক্রম করেছে; এমনকি ভারতে এরকম দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প পরিত্যক্ত হবার পরেও।

প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে যুক্তি হাজির করেছেন নানাসময়ে। তার উল্লেখযোগ্য যুক্তিগুলো হচ্ছে; উন্নয়ন করতে গেলে জলা- বনের কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করতেই হবে। উন্নয়নের সুফল সে ক্ষতি পুষিয়ে দেবে। এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করলে পরিবেশের ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় হবে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে। সারাদেশে বিদ্যুতের জোয়ার এলে দু’চারটে ক্ষতি মানুষ ভুলে যাবে। যে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র ফেরত এনেছি, একই প্রক্রিয়ায় উন্নয়নবিরোধী সব তৎপরতা থামিয়ে দেয়া যাবে।

ষাট দশকে পাকিস্তানের সেনাশাসক আইয়ুব খান কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, পাহাড়ীদের দুর্দশা যাই হোক, বিদ্যুতের উন্নয়ন তা ভুলিয়ে দেবে। আইয়ুবের উন্নয়ন তত্ত¡ মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। কাপ্তাই থেকে যে বিদ্যুৎ এসেছে সে তুলনায় অর্থনৈতিক, পরিবেশ-প্রতিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয়। পাহাড়ীরা উচ্ছেদ হয়েছে, জলমগ্নতায় বদলেছে তাদের জীবন। এই উন্নয়ন প্রকল্পকে জীবনহানির সমতুল্য চিহ্নিত দশকের পর দশক তারা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে।

এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। পাহাড়ে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করতে হয়েছে। এক দেশের মধ্যে ‘দুই চিন্তা’ জন্ম নিয়েছে। একই দেশের অধিবাসীরা পরস্পরকে শত্রæ ভেবে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে বহু বছর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রকৃতি ও মনুষ্য জীবন বিবেচনায় সবচেয়ে ক্ষতিকর উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এই ধরনের উন্নয়ন দর্শন বা উন্নয়ন লক্ষ্যটি সৎ-স্বচ্ছ হয় না। কারণ এরকম তথাকথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ থাকে না, উন্নয়নও আসলে উদ্দেশ্য নয়। জনস্বার্থ তো কোন বিষয়ই নয়। এসব একপর্যায়ে পরিবেশ- প্রতিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। এজন্যই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদাহরন নিয়ে আসতে হয়েছে। উন্নয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যেন-তেন প্রকারে শক্তি প্রয়োগের নীতিতে জনভাবনার বিপরীতে উন্নয়ন অনেক সময় কদর্য পরিনতি ডেকে আনে। এরকম অজ¯্র উদাহরন থাকা সত্তে¡ও রামপালের বিষয়ে সরকার প্রধান অনমনীয়ই থেকে যাচ্ছেন।

এই নিবন্ধ লেখার সময় জানা গেল, ইউনেস্কো ১২ জুলাই সুন্দরবন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারে। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে বাংলাদেশে ইউনেস্কো প্রতিনিধি বিয়েট্রিকা কালডুন এ খবর জানিয়েছেন। তার মতে, গত ২ জুলাই থেকে পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে শুরু হওয়া বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় প্রকল্প অনুমোদন, বাতিল কোনটিই করা হয় না। সম্মেলন শুরুর আগে গত মে মাসে সুন্দরবনের ওপর তৈরী হওয়া খসড়া সিদ্ধান্তের কিছু বিষয়ে সংশোধন আসতে পারে। তবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই।

এরই মধ্যে গত রোববার থেকে সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় দাবি করে আসা হচ্ছে, ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে। শুধু একটি কৌশলগত সমীক্ষা করতে বলেছে ২০১৮ সালের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের ব্যাপারে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির কোন আপত্তি নেই।

মোদি’তে ইসরাইলের এত আগ্রহ কেন?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারতের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে ইসরাইল সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একে খুবই সফল সফর হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে যখন পোল্যান্ডে যাচ্ছিলেন, সেদিনই শেষ হলো মোদির ইসরাইল সফর।

অস্তিত্বের শুরু থেকেই ইসরাইলের বেশির ভাগ মিত্র পাওয়া গিয়েছিল পাশ্চাত্যে। জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় দুই দেশ চীন ও ভারত আরবদের সমর্থন দিয়েছিল; ইসরাইলের সাথে দেশ দুটির কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিল না।

অনেক বছর ধরেই ভারত ছিল বিশেষভাবে ইসরাইলের প্রতি বৈরী। ভারতের নেতৃত্বে থাকা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন অনেকবারই ইসরাইল বিরোধী ঘোষণা দিয়েছে।

অতীতে ইসরাইলী-ফিলিস্তিনী সংঘাতে ভারত ভারসাম্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে আসছিল। মোদিই এই ঐতিহ্যের পুরোপুরি ও বেপরোয়া লংঘন ঘটালেন। তিনি ফিলিস্তিনীদের সাথে সাক্ষাত করার গরজই অনুভব করেননি। এমন অবস্থায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটা বৈশ্বিক-ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ধরনের জোটগত পুনর্গঠন হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন অনেক।

চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে ১৯৯২ সালে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, অন্যদিকে ওসলো শান্তি-প্রক্রিয়া নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তখন থেকেই চীন, ভারত এবং আরো অনেক দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে ফেলল ইসরাইল।

শুরুতে চীন ও ইসরাইল উভয়ের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে ধীরে ধীরে। কিন্তু গত কয়েক বছরে উভয় দেশের সাথে বাণিজ্য বেড়েছে দ্রুত। ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সাথে ভারতের বাণিজ্য ছিল ২০ কোটি ডলার। গত বছর তা দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক আরো নাটকীয়ভাবে বড়েছে। ১৯৯২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ২ কোটি ডলার, সেখানে গত বছর দাঁড়িয়েছে ৭৭০ কোটি ডলারে।

শুরুতে বেশির ভাগ বাণিজ্যই ছিল সামরিক সরঞ্জাম খাতে। আমেরিকার আপত্তির কারণে চীনের সাথে অস্ত্র বাণিজ্য সীমিত হলেও ভারতের সাথে সেটা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তবে চীন ব্যাপকভাবে ইসরাইলী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করে। নতুন প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠা কোম্পানি- উভয় দিকেই নজর ছিল চীনাদের।

বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ের আগে পর্যন্ত চীন ও ভারত উভয় দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল অনেকটাই নিম্ন পর্যায়ের। তবে চলতি বছর এই অবস্থা বদলে গেছে। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর উদযাপন উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে চীন সফর করেন। আর অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফর করলেন ইসরাইল, যেটাকে কেবল পারস্পরিক ‘ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিযোগিতা’ হিসেবেই কেবল বর্ণনা করা যায়।

এমন পরিবর্তন কেন ?

এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ‘স্টার্ট-আপ ন্যাশন’ হিসেবে ইসরাইলের খ্যাতির কারণে চীন বা ভারতের পক্ষে দেশটিকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে দেশটি। ইসরাইলে এমন সব বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন ঘটিয়েছে, যেদিকে চীন বা ভারত আগে নজর দেয়নি। উভয় দেশের সাথে সরাসরি বাণিজ্য এখন বিপুল হলেও, পরোক্ষ বাণিজ্য আরো বিশাল। উভয় দেশই ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, চীন ও ভারত উভয় দেশেরই বিপুল সংখ্যায় মুসলিম সংখ্যালঘুর আছে এবং তারা উভয়েই সন্ত্রাসবাদের ননানাদিক নিয়ে ভীত। পশ্চিম তীরে ইসরাইলী নীতিতে তারা একমত না হলেও ইসরাইলের সাথে উভয় দেশই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহী।

তৃতীয়ত, আরব দেশগুলোর দুর্বলতা। উপসাগরের অনেক দেশই এখন ইসরাইলের সাথে সহযোগিতা করছে। ফলে ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই এখন ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক উন্নতি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে পড়েছে।

আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, নেতানিয়াহুর সফরের আগে মোদি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কোলাকুলি সেরে আসেন। আবার গত মাসে পুতিনের সাথে সাক্ষাত করে মোদি তাকে ‘সহজাত মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্যাখ্যা করলে কী দাঁড়ায়? পশ্চিম ইউরোপ ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের প্রতি বৈরী হয়ে ওঠেছে। জার্মানি তো ট্রাম্পকে চোখের বালি মনে করছে। ইউরোপের দৃষ্টিতে ইউরোপের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ট্রাম্পকে তাদের প্রতিরোধ করতেই হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অবস্থা আর দেখা যায়নি। ৩০ বছর আগে বিশ্ব মোটামুটিভাবে উদার গণতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় বিভক্ত ছিল। এখন উদার গণতন্ত্রের সাথে লড়াই হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক প্রতাপশালীদের মধ্যে। মোদি, ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, পুতিন- কি এক কাতারে পড়ছেন না?

মোদিকে ইসরাইলে স্বাগত জানানোর জন্য নেতানিয়াহু তার মন্ত্রিসভার সব সদস্যকে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করেন। এই সফরটি যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমপর্যায়ের হয়, তার সব আয়োজন নিশ্চিত করেন নেতানিয়াহু। মোদির ইসরাইলে অবস্থানের পুরোটা সময় নেতানিয়াহু তার সাথে ছিলেন।

রাস্তায় লোকজনও মোদিকে বিপুল আগ্রহভরে গ্রহণ করেছিল। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী না বলে থাকতে পারেননি এবং তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমেরিকা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তখন মোদির উষ্ণ সফরটি অবশ্যই দারুণ বিষয়’।

এই সফরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি বড় ধরনের প্রশ্ন এখন ঘুরপাঁক খাচ্ছে। চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে ইসরাইল কি এখন নতুন মিত্রদের সন্ধান করছে? যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপে তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে যাচ্ছে?

ট্রাম্পের আমলে বিষয়টা বিশেষভাবে সত্য। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলে আসছেন, তিনি ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অন্যদিকে মনে হচ্ছে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এ কথাটাই জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত গর্বভরে বলেছেন, আমেরিকার নীতি এখনো পুরোপুরি অনিশ্চয়তাপূর্ণ।

অনেকেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করছে। তারা মনে করছেন, চীন ও ভারতের সাথেই তাদের ভবিষ্যত। অবশ্য অনেকে এখনো ততটা উৎসাহী নয়। তাদের মতে, ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। অভিন্ন মূল্যবোধ পোষণ করে দুই দেশ। তাছাড়া আমেরিকান ইহুদি সম্প্রদায়ের সমর্থনের কথাটা কিভাবে ভোলা যায়?

ইসরাইলের নতুন মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহে থাকা লোকজন আরেকটি কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরাইলের পক্ষে ভোট দিয়ে আসছে আর চীন তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। আর ভারত কিছু দিন ধরে কৌশলগত ভোট দানে বিরত থাকছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ইসরাইল দুটির একটি বেছে নেওয়ার মতো কোনো সমস্যায় পড়েনি;  অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কথাটা বাদ দিলে। এই মুহূর্তে প্রাচ্যে তার নতুন জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে উপভোগ করছে। আবার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সাথেও সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

তবে ইসরাইল যখন বিডিএসের (বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং অবরোধ) যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তখন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশের সাথে বিপুল সম্পর্ক ইসরাইলকে নিঃসঙ্গ করার তাদের প্রয়াসকে বিদ্রুপে পরিণত করছে। কারন ভারত আর ইসরাইল এখন প্রকাশ্যের ঘনিষ্ট বন্ধু ও মিত্র।

(নিউজ উইক ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)

ব্রিটেন থেকে সামরিক পরিবহন বিমান কিনছে বাংলাদেশ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বিমান বাহিনীর পরিবহন ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্রিটেনের কাছ থেকে দুটি সি-১৩০জে সি৫ কৌশলগত পরিবহন বিমান বাংলাদেশ কিনছে বলে খবর দিয়েছে ডিফেন্স ওয়ার্ল্ড.নেট। এ নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকার একটি চুক্তি করেছে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ায় নবম দেশ হিসেবে সি-১৩০জে সি৫ বিমান চালনাকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

বাংলাদেশের পরিবহন বহরে বর্তমানে চারটি লকহিড সি-১৩০ই হারকিউলিস এবং দুটি এলইটি এল-৪১০ টারবোলেট পরিবহন বিমানও রয়েছে।

সি-১৩০জে-এ সি৫ সংস্করণে নতুন ‘অ্যালিসন এই’ টারবোপ্রপ ইঞ্জিন এবং ডাউটি অ্যারোস্পেস সিক্স-বেস্নডেড কম্পোজিট প্রপেলার সংযুক্ত করা হয়েছে। সি-১৩০জে বিমান কৌশলগত অভিযান, প্যারাস্যুট সংযুক্তি এবং পরিবহন কাজে ব্যবহার করা যায়।

আরেক জুনের স্মৃতি

ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। আর কর্তৃত্ববাদী শাসন তখনই সম্ভব যখন সরকার প্রধান হিসেবে থাকেন  বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী……

ফ্যালি এস. নরিম্যান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

আমার কাছে জুন হলো স্মৃতির মাস : ২৬ জুন ‘জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবস’- আমি এই নামেই একে অভিহিত করে থাকি, আগে দিয়ে ঘটা একটার পর একটা ঘটনা মনে পড়ে। ওই জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবসের কিছু স্মৃতি প্রকাশ করার সময় এখনই। মনে পড়ে ১৯৭৫ সালের ১২ জুন দিনটির কথা। ওই দিনই ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে রাজ নারায়নের দায়ের করা নির্বাচনী মামলার রায় প্রকাশ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এতে অসাধুতা অবলম্বনের দায়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় বছরের জন্য সব ধরনের সরকারি পদ গ্রহণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কয়েক দিন পর ইন্দিরার আইনজীবী জে বি দাদাচানজি আমাকে বলেছিলেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনের যুক্তি এবং স্থগিতাদেশ আবেদন (সুপ্রিম কোর্টে দাখিলের জন্য) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী তাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। ওইসব নথিপত্র তৈরি করেছিলেন ইন্দিরার নিজস্ব সিনিয়র অ্যাডভোকেট ননি পালকিবালা। তারপরও অনুরোধ করায় তিনি বেশ পুলকিত হয়েছিলেন বলে জানান আমাকে। তিনি কাগজপত্র পুরোপুরি পরীক্ষা করে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় এবং আমি আইনমন্ত্রী এইচ আর গোখলের (স্থগিত আবেদনের ওপর শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন) অফিসে ছিলাম। সিদ্ধার্থ ফোন তুলে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন, কেবল তিনিই এ কাজটি করতে পারতেন। বললেন : ‘আমার কথাটা শুনুন।’ তিনি আবার বললেন, ‘না, ম্যাডাম, আমার কথাটা শুনুন।’ ‘ইন্দিরাজি আমার কথাটা শুনুন।’ একটু ‘শুনুন’- ‘এই আবেদনটি এখনই দাখিল করতে হবে।’ আমি ফোনের অপর প্রান্তে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেলাম। ওই সময় ইন্দিরার আশপাশে ভিড় করে থাকা জ্যোতিষীরা আরেকটু শুভ সময়ে আবেদনটি দাখিল করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন! জ্যোতিষীদের পরামর্শে ভক্তি রেখে ১৯৭৫ সালের ২২ জুন আবেদনটি দেরিতে দাখিল করা হলো, অবকাশকালীন বিচারকের বেঞ্চে (বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ার) স্থগিত আবেদনটি তালিকাভুক্ত করা হলো। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত পছন্দের আইনজীবী পালকিবালা আবেদনের ওপর শুনানিতে অংশ নিলেন। তিনি ভালোভাবেই কাজটি করলেন, স্থগিতাদেশ প্রাপ্য ছিলেন।

পরদিন সন্ধ্যায় আমার স্ত্রী ও আমি ট্রেনযোগে মুম্বাই ছাড়ার সময় আমি ইভিনিং নিউজের একটি খবর পড়লাম। ভেতরের পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ খবরটি প্রকাশ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবকে বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় রাজস্থান থেকে এস এল খুরানাকে আনা হয়েছে। এই সময় কেনো এই বদলি করা হলো? তখন আমি বিষয়টির দিকে আর কোনো মনোযোগ দেইনি।

ওই সময় স্বরাষ্ট্রসচিব পদে হঠাৎ বদলি আমার কাছে তেমন কোনো ইঙ্গিতবহ বলে মনে হয়নি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, এটা ছিল সতর্কতামূলক প্রস্তুতি। কেবল সঞ্জয় গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রীর দুই-একজন ঘনিষ্ঠজন ছাড়া এই প্রস্তুতি-পর্ব সম্পর্কে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। যদি সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেন, তবে এই বদলির আলোকে কাজ করা হবে বলে স্থির করা হয়েছিল। কৃষ্ণ আয়ারের নির্দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হলো ২৪ জুন। আমি তখন মুম্বাই। এটা ছিল শর্তসাপেক্ষ স্থগিতাদেশ। ‘অপারেশন ইমার্জেন্সি’ সাথেসাথে চালু হলো। তবে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপতির সম্মতিহীনভাবে নয়।

ফখরুদ্দিন আলী আহমদের নেতৃত্বে আরো তিন প্রখ্যাত আইনজীবী এইচ আর গোখলে, এস এস রায় ও রজনী প্যাটেল (তারা সবাই কংগ্রেসের সদস্য) ঘোষণায় সই আনার জন্য ২৫ জুনের মধ্যরাতে গেলেন।

এমনকি ২৬ জুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা অনুমোদনের আগেই এর আগের রাতেই জরুরি আইনের ঘোষণায় সই হয়ে গেছে এবং কার্যকরও হয়ে গেছে। ওই সময়ের মিসেস গান্ধীর মন্ত্রিসভার অন্যতম যোগ্য সদস্যের মন্তব্য আমার মনে পড়ছে। সকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মিসেস গান্ধী তাকে জরুরি আইন জারি নিয়ে তার মতামত জানতে চাইলেন। বেশ কায়দা করে বাবুজি জবাবটা দিলেন, ‘ম্যাডাম, আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন, তখন আমি আর কি বলবো?’

আমি ২৭ জুন বোম্বাই থেকে ডাকযোগে দিল্লিতে আইনমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠালাম। এতে বীরোচিত কিছু ছিল না।

এ ধরনের ঘটনা আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আপনারা যারা জরুরি আইনের অভিজ্ঞতা লাভ করেননি, বা এ নিয়ে খুব একটা পড়াশোনা করেননি, তাদের জেনে রাখা উচিত, ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। ১৯৭৫ সালের জুনে ভারতে জরুরি আইন জারির সময় দেশটিতে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার, সরকার প্রধান হিসেবে ছিলেন বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সাংবিধানিক দায়িত্বশীলেরা এবং এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক পর্যন্ত আমাদের হতাশ করেছেন।

২৫ জুন রাতে পার্লামেন্টের বিরোধী দলের সব এমপিকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করা হলো, অবশ্য পার্লামেন্টের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলো। লোকসভার স্পিকার পর্যন্ত এর প্রশংসা করে প্রকাশ্যে বললেন, এতে করে পার্লামেন্টের কাজকাম ‘আরো সাবলীলভাবে’ করা সম্ভব হবে। আর আদালত রায় দিল, তাদের উচিত পার্লামেন্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা, কিন্তু আটক থাকার কারণে যেতে পারেননি। কিন্তু তার পরও পার্লামেন্টের এ ধরনের কার্যক্রম বৈধ।

সর্বোচ্চ আদালতের এটা প্রথম লজ্জাজনক রায়। তবে এরপর তারা আরো লজ্জাষ্কর রায় দিয়েছিল (১৯৭৬ সালের এপ্রিলে এডিএম জাবালপুরে)। ওই রায়ে আদালতের সবচেয়ে সিনিয়র পাঁচ বিচারপতির চারজনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধানে প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার বিধানটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। সাহস করে একমাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি এইচ আর খান্না। ভারতের প্রধান বিচারপতি হওয়ার জন্য পরম্পরায় তিনি তিন নম্বর স্থানে ছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, সিনিয়রিটির আলোকেই প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়ে থাকেন। তারপরও তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা লঙ্ঘনকে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৭৫ সালের জুনে জরুরি অবস্থা জারির পর মিসেস গান্ধী ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। তাতে তিনি পরাজিত হন। ওই সময় বেশির ভাগ মানুষেরই চিন্তায় ছিল, তিনি কি সেনাবাহিনী তলব করবেন? তার তত অবনতি ঘটেনি। তিনি কাজটি করেননি। তিনি কি জনগণের রায় মেনে নেবেন? কয়েকজন আইনজীবী-রাজনীতিবিদের পরামর্শ সত্বেও তিনি মেনে নিয়েছিলেন।  আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ঘটনার ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহানের মন্তব্যও স্মরণ করি। তিনি বলেছিলেন, সত্যিকারের গণতন্ত্রের চূড়ান্ত নিদর্শন হলো, নির্বাচনে পরাজয় বরণকারী সরকারের স্বেচ্ছায় তার বিরোধীদের কাছে ক্ষমতা সমর্পণ করার আগ্রহ।

(লেখক : ভারতের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট)

গুম : যার উত্তর মিলছে না

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ফরহাদ মজহার অপহরন ঘটনার আপাত: পরিসমাপ্তি ঘটেছে অনেক প্রশ্ন, অনেক নাটকীয়তা নিয়েই। তিনি কিডন্যাপ করার বর্ণনা পুলিশের কাছে দিয়েছেন, আদালতেও জবানবন্দী দিয়েছেন। পুলিশ বলেছে, তদন্ত করে দেখবেন, জবানবন্দীর সত্যতা। বিএনপি সরকারকেই দায়ী করছে এই অপহরণের জন্য এবং তাদের ভাষায় চাপ সহ্য করতে না পেরে সরকার তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তারা আরও বলেছেন, ভারতে মুসলিম নিধন এবং গো-মাংস নিষিদ্ধের প্রতিবাদ করায় মূলত: ফরহাদ মজহারকে এই পরিনতি বরণ করতে হয়েছে।

গত সাড়ে তিন বছরে ফরহাদ মজাহারের মত ‘রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ’ বা অপহৃতদের মধ্যে পরিবারে ফিরতে পেরেছেন মাত্র ২৭ জন। ফিরে আসার এসব ঘটনায় প্রতিটিতে কম-বেশি সমিল লক্ষ্য করা যায়, যেমনটি ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ভাষ্য থাকে একই রকম। ঘটনাগুলি মোটামুটি ছক বাঁধা। একটি বড় অংশকে অপহরণের পর ‘উদভ্রান্ত’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ অবস্থায় দেশ-বিদেশের কোন সড়কে পাওয়া যায়। ফিরে আসার পরে তারা প্রায়শ: ‘রহস্যজনক স্মৃতিভ্রষ্টতার’ শিকার হন।

২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তথাকথিত নিখোঁজ এবং অপহরণ ও গুমের শিকার হয়েছেন ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৩৬ জনকে এবং পরিবারে ফেরত এসেছেন ২৭ জন। বাকি ১৭৭  হতভাগ্যের কি ঘটেছে জানা যায়নি। আজতক তাদের হদিস মেলেনি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশকেন্দ্রের ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর কোন ঘটনায় অনুসন্ধান, তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া এগোয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে শত শত মানুষকে অবৈধভাবে আটক করে গোপনে স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে ২০১৬ সালে ৯০ জনকে গুম করা হয়েছে বলে বিস্তারিত তথ্যাদি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে এবছরের প্রথম ৫ মাসেই ৪৮ জনকে গুম করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়াও আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীকে এ কাজ পরিচালনায় অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার, মানুষের জীবন ও আইন প্রতি তোয়াক্কা না করাকে সরকারের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই প্রতিবেদনে বলেছে।

১৬ এপ্রিল ২০১৪ ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা-নারায়নগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন। তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট পরিবেশ আইনবিদ রিজওয়ানা হাসানের স্বামী। অপহরণের ৩৪ ঘন্টা পর চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে মীরপুর রোডে নামিয়ে দেয়া হয়। বাঁধন খুলে কলাবাগানে পুলিশ চেকপোষ্টে আসলে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং জবানবন্দী রেকর্ড করে ছেড়ে দেয়া হয়। এই অপহরণ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি হিমাগারে চলে গেছে।

রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না ২০১৫ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে বনানী থেকে ‘নিখোঁজ’ হন এবং ২১ ঘন্টা পরে পুলিশ তাকে ধানমন্ডী থেকে গ্রেফতার দেখায়। বনানী থেকে সাদা পোষাকধারী পুলিশরা তুলে নিয়ে গেছে বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করলেও পুলিশ, র‌্যাব অস্বীকার করে। খুব কমক্ষেত্রেই রাষ্টদ্রোহীতা ও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ এনে তাকে জেলে রাখা হয়। এরকম স্পর্শকাতর অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত এগোচ্ছে না বা আদৌ কি হয়েছে জানা যায় না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সে সময়ের মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকার উত্তরা থেকে ‘রহস্যজনক নিখোঁজ’ হন। ৬২ দিন পরে ভারতের শিলংয়ের একটি সড়কে উদভ্রান্ত ও অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘোরাঘুরিরত সালাহউদ্দিনকে পায় ভারতীয় পুলিশ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি, যারা অপহরণ করেছে তারাই তাকে ভারতে নিয়ে গেছে। এর বেশি তিনি কিছু বলেননি। সালাহউদ্দিনের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে কোন উচ্চ-বাচ্য নেই, এমনকি তার দলও ভুলে গেছে তার কথা!

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পরে গণমাধ্যমে সাক্ষাতকারদাতা তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ দিনগত রাতে ‘নিখোঁজ’ হন। ৫ দিন পরে এয়ারপোর্ট রোডে উদভ্রান্ত অবস্থায় হাঁটতে থাকা তানভীরকে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়। এই ‘নিখোঁজের’ বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি। ঢাকার আদালত পাড়া থেকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ২০১৬ সালের ৪ আগষ্ট ‘নিখোঁজ’ হয়ে সাত মাস পরে অজ্ঞাতস্থান থেকে বাড়ি ফিরে আসলেও কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।

নিখোঁজ, অপহরণ, গুম-যাই বলা হোক- এর শিকার মানুষটির নিকটজনরা প্রায়শ: যে অভিযোগটি করেন-আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যারা ফিরতে পারেন ভাগ্যের জোরে তাদের বক্তব্যও একইরকম। মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে তাদের অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটুকু বলে আর কিছু মনে করতে পারেন না বা বলেন না  এবং স্রেফ বোবা বনে যান।

ফিরে আসার পর ফরহাদ মজহারের বক্তব্যও ওই একইরকম। পুলিশকে তিনি জানিয়েছেন, শ্যামলীতে তার বাসার সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু চাঞ্চল্যকর হচ্ছে, ‘‘সরকারকে বিব্রত করতে সন্ত্রাসীরা এ কাজ করে থাকতে পারে বলে ফরহাদ মনে করেন’’। ভাবুন তো, জামায়াত-বিএনপি ঘরানার কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার এরকমটিই মনে করছেন! প্রশ্ন উঠেছে, যা ঘটেছিল সেটি কি ফরহাদ মজহার ইচ্ছেকৃত চেপে যাচ্ছেন অথবা নির্দেশিত হয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহসাই মিলবেনা।

লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার কি ঠিক করেছিলেন যে থ্রিলার লিখবেন? এডগার এ্যালান পো’র মত নিজেই থ্রিলারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হবেন? সেজন্যই কি সাতসকালে খুলনা যাত্রা করেছিলেন ব্যাগেজ ছাড়াই এবং গফুর নামে টিকিট কেটে ফেরার পথে ব্যাগেজ জোগাড় করে নিয়েছিলেন? নাকি কোন সাজানো মঞ্চে ঈদোত্তর বিশেষ একটি নাটকে মহড়া দিয়ে এলেন। খুব সহসাই এ রহস্যের উন্মোচন হচ্ছে না। পুলিশের খুলনার রেঞ্জ ডিআইজি’র মতে, তিনি ভ্রমনরত অবস্থায় ছিলেন।

ফরহাদ মজহার যদি দিনভর একটি নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন আসবে নাটকের রচয়িতা, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশক কে? এটি কি তিনি নিজেই নাকি বিএনপির দাবি অনুযায়ী সরকার বা কোন এজেন্সি । কিংবা এমন কোন রাজনৈতিক দল যারা অতীত-বর্তমানে এরকম রহস্যজনক নাটক মঞ্চস্থ করতে ও করাতে বিশেষ পারঙ্গমতা অর্জন করেছে।

অনেক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল এটি অপহরণ। বাসা থেকে বের হবার সামান্য পরেই সকাল সাড়ে ৫টার দিকে মোবাইল ফোন করে তার স্ত্রীকে জানালেন, “ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে”। এই ‘ওরাটা’ কারা সেটি হচ্ছে মূল রহস্যের জায়গা। সরকারের দায়িত্ববান কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি ভ্রমন করছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক মন্তব্য না করেই পুলিশি তদন্তের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে রহস্যোপনাসের প্লট বলে মনে হচ্ছে! কিন্তু দুর্বল গাঁথুনির। ফাঁক-ফোঁকড় অনেক। সত্যি কি ওষুধ কেনার জন্য তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন? নাকি কারো ফোনকলে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিলেন? অপহরণের পরে তাকে ফোন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল এবং তারা ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণও দাবি করেছে। এরপরে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। নাটক নাকি ঘটনা এগিয়ে চলে। জানা যায় ফরহাদ মজহার খুলনায়। রাত ১১ টায় হানিফের গাড়ি থেকে উদ্ধার। সরকারী ভাষ্য, তিনি ভ্রমন করছিলেন।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “একজন অপহরণ বা নিখোঁজ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর যদি সরকার বা আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী তার সম্পর্কে কিছু বলতে না পারে তখন সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে”। আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, একটা ঘটনারও সুরাহা হয়েছে বলে জানা যায়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। ফলে জন-পারসেপশন হচ্ছে, সরকারের সমালোচকদের ক্ষেত্রে রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা বেশি ঘটছে। এটি দুর করতে হলে অবশ্যই অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

 

পাকিস্তানে চীনা সামরিক ঘাঁটি

আসিফ হাসান ::

চীন তার সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য বাড়াচ্ছে, সেইসাথে তার শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও গড়ে তুলছে। আর এই লক্ষ্যেই দেশটি বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছে। পাকিস্তানকেই দ্বিতীয় ঘাঁটি স্থাপনের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সম্প্রতি চীনা সামরিক বাহিনী সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে পেন্টাগন এসব কথা জানিয়েছে।

চীনা গণমুক্তি বাহিনী (চায়না পিপলস আর্মি, পিএলএ) বিদেশের মাটিতে প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত জিবুতিতে। গত বছরের ফেব্রæয়ারিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। আগামী বছর তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন আগে বলেছিল, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরো বেশি অংশগ্রহণ, সোমালিয়া এবং এডেন উপসাগরীয় এলাকার আশপাশের পানিসীমায় পাহারা কার্যক্রম চালানো এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা এই ঘাঁটিটি প্রতিষ্ঠা করছে।

পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের মাটিতে ঘাঁটি স্থাপন করা হলে চীন আরো ভালোভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে বিদেশে ঘাঁটি নির্মাণে চীনা সামর্থ্য ‘হয়তো দেশগুলোকে তাদের বন্দরে পিএলএ’র উপস্থিতি সমর্থন করতে রাজি হতে বাধ্য করবে।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীনা নেতারা তাদের সামরিক বাহিনীর ভীতি সৃষ্টিকারী সামর্থ্য বৃদ্ধি, বৈরী শক্তির আস্ফালন প্রতিরোধ এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করার দিকে নজর দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণেই শক্তি প্রদর্শন ক্ষমতা চীনা বলয়ের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি পিএলএ’র আধুনিকায়ন কর্মসূচিতে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তাদের এই আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তারা পূর্ব চীন সাগরে ৪০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়াকো প্রণালী ও ফিলিপাইন সাগরে বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে। চীনাদের মোতায়েন করা জিয়ান এইচ-৬কে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ক্যারিয়ার গুয়ামে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে বলে পেন্টাগন ধারনা করছে। এইচ-৬কে হলো আধুনিকায়ন করা চীনা নির্মিত, সোভিয়েত আমলের টোপোলেভ টু-১৬ ‘ব্যাজার’ সাবসনিক বোমারু বিমান। এগুলো দূরপাল্লার আক্রমণে ব্যবহার করা যায়। আর ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের দিক থেকে চীন এখন শীর্ষ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেছে বলেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। তাদের এইচকিউ-১৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা তিন হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রুখে দিতে পারে।

চীনা সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির আওতায় সেনা, নৌ ও বিমান- সব বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও পেন্টাগন মনে করছে।

চীনা নৌবাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে টাইপ ০৫২ ফ্লিট ডিফেন্স ডেসট্রয়ার, টাইপ ০৫৪ ফ্রিগেট নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে চীনা সামরিক কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা প্রদান করা হলেও বেশ কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়েছে। ডিফেন্স নিউজের মতে, পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভ্রান্তি বা সেকেলে তথ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন চেঙদু-জে-২০ পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গিবিমানের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিন্তু খবর হলো, গত বছরই চীন এই বিমানের উৎপাদন হার কমিয়ে দিয়েছে।

তাছাড়া প্রতিবেদনে যেসব মানচিত্র ও ইনফোগ্রাফিকস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোতে ত্রæটি সহজেই চোখে পড়ে। যেমন হাইনান দ্বীপে চীনা গুরুত্বপূর্ণ নৌবাহিনী ঘাঁটিটির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখই নেই। আবার চীনের নর্দার্ন থিয়েটর কমান্ডের বিমান ঘাঁটিটিকে ভুল করে বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবার চীন নিজেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের শক্তি প্রদর্শনের কোনো পরিকল্পনা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনা সামরিক শক্তি সম্পর্কে ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবার চীনও তাদের সুপ্ত ইচ্ছাটিও অস্বীকার করেছে। দুই বক্তব্যের মাঝামাঝি কিছু একটা কিন্তু থাকতেই পারে। চীনের ‘‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’’- ইনিশিয়েটিভ যেসব দেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, সেগুলোর কয়েকটিতে অস্থিতিশীল উপাদান তীব্রভাবে সক্রিয় রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ওই প্রকল্পেরই অংশবিশেষ। আর পাকিস্তানে ওই করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উত্তপ্ত বেলুচিস্তানে অবস্থিত। সেটার নিরাপত্তা বিধানের জন্য চীন যদি সেখানে সৈন্য মোতায়েন করে, তবে তাতে কি আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে? আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো নয়। ভারতের সাথে তো নয়ই। ভারত ওই চীনা প্রকল্পের বিরোধিতা করছে প্রকাশ্যেই। ফলে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি চীনাদের মধ্যে থাকবেই।

চীনা প্রকল্পটির অন্যান্য অংশের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বৈকি।