Home » সম্পাদকের বাছাই (page 2)

সম্পাদকের বাছাই

ভোটটি দিতে পারা না পারার শঙ্কা-উদ্বেগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

মাও সে তুং যেমনটি বলেছিলেন-“যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি, আর রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ”– সে বিবেচনায় গত সাতচল্লিশ বছরই কী কাটলো যুদ্ধের মধ্যে? কারন কি এই যে, গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেললে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি রাজনীতি আর নাগরিকদের মিত্র থাকে না? বিশেষ করে দুর্বল নাগরিকদের সাথে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। সেজন্যই রাজনীতিতে কেবল অভিগম্যতা সেই সব নাগরিকদের বা পরিবারের, যারা সবল অর্থে-বিত্তে ও বংশ মর্যাদায়। দুর্বলরা কেবলই রক্তপাতময়তার বলি।

এক. বিজয়ের মাস এবং শীতের আমেজ- সব ছাপিয়ে উঠেছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সর্বত্র আলোচনার বিষয় এখন একটি। খানিকটা আশা-আশঙ্কা অথবা নিস্পৃহতার দোলাচল। নির্বাচন হবে? হলে সুষ্ঠ হবে? জনমনে এই গুঞ্জরণ ও ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত আলোচনা ক্রমশ আকার নিচ্ছে। কারন হচ্ছে, অতীত তিক্ত এবং রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। সাতচল্লিশ বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে সারাটা কাল জুড়ে ছিল রক্তপাতময়-সহিংস এবং নিয়ন্ত্রিত।

জনগনের অভিজ্ঞতা বলছে, কোন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, এই দেশে অমন নির্বাচন কখনই সুষ্ঠ হয় না। অতীতে কখনও হয়নি। সামরিক সরকারগুলোর আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলি ছিল চরম প্রহসন ও সামরিক স্বৈরাচারের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার মহড়া। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে আওয়ামী লীগ খন্দকার মোশতাকসহ কয়েকজন নেতাকে জেতাতে নিজেরাই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, যার ছিল সূদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিল থেকে শুরু করে প্রচারনাকালে ইতিমধ্যে খুন হয়েছে অনধিক ১০ জন। কোন দলের সেটি বড় প্রশ্ন নয়, তারা সবাই আদম সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী। এই হানাহানির মূল কারন হচ্ছে, নির্বাচনী মাঠটি মোটেই সমতল নয়। ক্ষমতাসীন দলের জন্য যতটা মসৃন, বিরোধী দলের জন্য ততটাই এবড়ো-থেবড়ো। এজন্য বড় দুই দল বা জোটের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমেই হয় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন না হয় হামলা করছেন, ক্রমশ: হয়ে উঠছেন সহিংস।

হামলায় শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী প্রার্থী- সমর্থকরা এগিয়ে। তাই বলে ক্ষমতাসীনরা এর শিকার হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। মোট কথা একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশজুড়ে। জাতীয় সংসদ বহাল, এমপি পদে বহাল থেকে এক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন, অন্যদিকে রয়েছেন মামলার বোঝায় ন্যূব্জ ও তাড়া খাওয়া প্রার্থীরা। তাদের জন্য মাঠটি অবতল। যেমনটি ঘটেছে গত বুধবার, নির্বাচনী প্রচারকালে একজন প্রার্থীকে পূর্বাপর মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকছে।

দুই. এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’। খোদ সিইসি সেটি প্রকাশ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে ঠেকলে তাঁকে ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’ হতে হচ্ছে। এর আগে আমরা আদালতকে ‘বিব্রত’ হতে দেখেছি। সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন, মামলাটি অন্য আদালতে স্থানান্তর করে। কিন্তু সিইসি’র ‘বিব্রত’ হওয়া নিয়ে কি হবে? তিনি শুধু ‘বিব্রত’ হয়েই থাকবেন নাকি রেফারীর ভূমিকায় শক্ত অবস্থান নিয়ে ‘হলুদ কার্ড’ এবং ‘লাল কার্ড’ ব্যবহার করা শুরু করবেন? অথবা বিব্রত হবেন এবং নিরপেক্ষতার নামে পক্ষাবলম্বন করবেন? তাদের এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশ এবং সুষ্ঠ নির্বাচন।

নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে- সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ সরকারের অনুকূলেই থাকবে-জনমনের এই ধারনা কমিশন দুর করতে সক্ষম হবেন কী ? সম্ভাবনা ক্ষীণ। নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সাহসী হতে পারবেন, সেটি দেখার জন্যও কি হাতে সময় আছে? বিগত ইউপি নির্বাচনে দেশ দেখেছে হত্যাকান্ড, সন্ত্রাস ও লাগামহীন জাল ভোট। তার আগের উপজেলা নির্বাচন ! সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে জনগন কখনই দেখেনি। এমনকি সক্রিয় হতেও না। বরং ধামাচাপা দিতে অতীতকালের ধারাবাহিক রেকর্ডটি বাজিয়েছে-“দু’একটি ঘটনা বাদে নির্বাচন মোটামুটি অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহনযোগ্য হয়েছে”। মাত্র ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনসমূহের নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়টিও ধামাচাপা দেয়া হয়েছে পুরোনো কায়দাই। এর ফলে সাধারন ভোটাররা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কিত এটা ভেবে যে,  তার ভোটটি দিতে পারবেন তো ?

এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরুতেই অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে আরেকরকম সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজমান ছিল। অন্যদলের চেয়ে নিজ দলের ভেতরকার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল বেশি। সেটি দুই বড় দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের মধ্যে ঘটেছে এবং নিহত হয়েছে আধা ডজন দলীয় নেতা-কর্মী। একটি দলের চেয়ারপার্সনের অফিস ভাংচুর হয়েছে। নেতা-কর্মীরা অবরুদ্ধ করেছে দলের মহাসচিবকে। এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে দেয়া প্রার্থীকে ঘোষণা করেছে অবাঞ্ছিত। এসবই নির্বাচনী শঙ্কায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দেশী পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আস্থাহীনতা এবং কমিশনের প্রতি ধোঁয়াশা- অদ্ভুত এক পরিস্থিতি তৈরী করছে। জনগনের বিশ্বাস প্রায় উঠে যাচ্ছে যে, নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। দেখে-শুনে এই দেশের জনগনের মধ্যে অদ্ভুত একটি ধারনা গড়ে উঠছে যে, সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে এবং বিদেশীরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়! মনে করা হয়, তারা কারো প্রতি পক্ষপাত করে না। কিন্ত সেনাসদস্যদের মাঠে নামানোর তারিখ ১৫’র বদলে ২৪ ডিসেম্বর পেছানোয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ।

ক্ষমতায় থেকে গড়ে-বেড়ে ওঠা বিএনপি কম-বেশি একযুগ ক্ষমতার বাইরে। দমন-পীড়নে পিষ্ট। দলীয় চেয়ারপারসন দন্ডিত হয়ে জেলে। তার ডেপুটি ও পুত্রও দন্ডিত এবং বিদেশে অবস্থানরত। তাদের এমত প্রতীতি রয়েছে যে, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন। তাদের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোটে তারা জিতে যাবেন। এটি ধরে নিয়ে নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা। এজন্যই, তাদের ভাষায় সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য তারা মরিয়া। এই মরিয়া ভাব বজায় রেখে তারা কি কৌশল নেবেন, সেটিও দেখার বিষয়।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দলের ন্যায্যতা ও সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা হচ্ছে সংবিধানিক প্রথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব দেশে এটি করা হয় না ঠিক, কিন্তু ওয়েষ্ট মিনিষ্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে এটি প্রথা ও পালনীয় হিসেবে স্বীকৃত। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়াটাই ‘সঠিক অভ্যাস’ বলে মনে করা হয়। যে যাই বলুক, এখানে সংসদ ও মন্ত্রীসভা বহাল রয়েছে- তার সুবিধা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই যাবে।

জনমনে যে বিষয়গুলি হামেশাই ঘুরে-ফিরে আসছে তা হচ্ছে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষ নেবে। আবার দু’চারজন বিশ্বাস করছেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন নির্বাাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। সেজন্য অন্তিমে একটি ভাল নির্বাচন দেখা যাবে। সাম্প্রতিক নজিরগুলো এই বক্তব্যের পক্ষে যায় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সন্ত্রাস ও দখলবাজির এন্তার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টদের বাড়ি তল্লাশিসহ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ ছিল।

এবারের আশঙ্কা, “গায়েবী” মামলার। যে কেউ আসামী হয়ে গ্রেফতার হতে পারে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে এসব আশঙ্কা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়েছে। যদিও মামলা-গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অতীতের মত পক্ষ হয়ে এসব অভিযোগ খন্ডণ করবেন, এমনটি আশা করা হচ্ছে না। এরই প্রতিফলন হিসেবে কি নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ হতে শুরু করেছেন? দেখার বিষয়, ‘বিব্রত’ হওয়ার পরে তাঁরা এর প্রতিকারে কি ধরনের কৌশল গ্রহন করেন?

নির্বাচনকে ঘিরে এরকম শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলাচলে সরকার মনে করছে, এগুলি কেবলই বিরোধী দলের অপপ্রচার। সরকারের নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময়মত নির্বাচন হবে। সহিংসতা মোকাবেলা করার কথাও বলছেন। অথচ দিয়েছিলেন লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি । এমনকি ইভিএম ‘ম্যানিপুলেট’ না করার নিশ্চয়তা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কথা। সরকার ও ক্ষমতাসীন মহল আকছার দাবি করে আসছেন, সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন তারা।

বাস্তবতা কি? বিরোধী দল ও জোট বলছে, এসব প্রতিশ্রুতিই সরকারের কৌশল। নির্বাচনকে নিজেদের মতো করার যে কোন সক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারন অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, নির্বাচন এগিয়ে এলে রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি বইয়ে দেন এবং এর অধিকাংশ যে কথার কথা তা জানা হয়ে গেছে। উদাহরন, গত সিটি নির্বাচনে প্রায় সকল মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হলে ‘সিটি গভার্ণমেন্ট’ চালু করার কথা ইশতেহারে ও মুখে বলেছেন।

এরকম অবাস্তব এবং আকাশচারী সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা জনগনের ভোট নিতে চান। কারন রাজনীতিবিদ, অর্থে-বিত্তে প্রতাপশালী এবং কথিত সুশীল সমাজের কাছে জনগন এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছে বলে ধারনা পোষণ করে থাকেন। কারণ, এদের প্রত্যেকেরই দল, সংঘ-সমিতি রয়েছে। কিন্তু এদেশে কেবল সাধারন মানুষের কোন দল নেই-ঠাঁইও নেই। নেই আপাত: কোন সংঘবদ্ধতা।

সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহত হতে পারেন!

আমীর খসরু ::

সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাককে পুলিশ বুধবার আটক করে ‘ভিন্ন এক পদ্ধতিতে’। দোহার থানার ওসির সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া ভাষ্য মোতাবেক – প্রার্থী  আবু  আশফাকের নিরাপত্তার জন্যই তাকে আটক করে পুলিশ কাস্টোডিতে নেয়া হয়।

১৯৭০-এর প্রথমদিকের ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কালে একটি ঘটনা বোধ করি অনেকেরই মনে নেই অথবা জানা নেই । সেই সময়ে ভিয়েতনামে ঘটে যাওয়া দুনিয়া কাঁপানো একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান সাংবাদিক পিটার আর্নেট তখন এ্যসোসিয়েটেড প্রেস বা এপির ভিয়েতনাম বিষয়ক সংবাদদাতা। পিটার আর্নেটের ওই সময়কালের একটি প্রতিবেদন ছিল এই রকম- যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তখন ভিয়েতনামের একটি গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। ঘটনাটির খবর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌছালে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন গ্রামটি ধ্বংস করো হলো? জবাবে সেই ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা জবাব দিয়েছিলেন- “We had to destroy the village in order to save it.”  অর্থাৎ ‘গ্রামটিকে রক্ষার  জন্যই ওই গ্রামটিকে আমাদের ধ্বংস করে দিতে হয়েছে।’ সাম্প্রতিক যেসব ঘটনাবলী ঘটছে তাতে কর্মকর্তাদের ভাষ্য শুনে ওই ঘটনা বারংবার মনে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতিপক্ষের উপরে হামলা, ভাংচুর, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটে চলেছে। ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিবের গাড়িবহরে হামলা ও ভাংচুর, নোয়াখালীতে যুবলীগ নেতা নিহত হওয়াসহ সংবাদ মাধ্যমের হিসাব মোতাবেক আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর প্রথমদিনেই কমপক্ষে ১৮টি স্থানে সহিংস রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে। বুধবার সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে ১৭ জেলায়। এতে হামলা-ভাংচুর, সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩২ জন। বৃহস্পতিবারও ২৩ জেলার বিভিন্নস্থানে হামলা, সংঘর্ষ, বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশের বিশাল এক এলাকা এখন নির্বাচনী সহিংসতার কবলে।  আর এটি করা হচ্ছে, মূলত ক্ষমতাসীন দল ও  আইন শৃংখলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাধ্যমে।

শুক্রবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরেও হামলা হয়েছে। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বের হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠের ‘স্থিতিস্থাবকতা বা ভারসাম্য’ বিনষ্ট করা হচ্ছে – যার ফল স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহভাবে নেতিবাচক হতে বাধ্য। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সব ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না, আসতে দেয়াও হয় না। কাজেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা যে কতো বিশাল এবং ভীতিকর তার সামান্য হলেও কিছুটা আচ করা যাচ্ছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খবর দিচ্ছে-বুধবার আর বৃহস্পতিবার- দুইদিনেই বিএনপির প্রার্থীসহ দুইশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আলো স্পষ্ট করেই বলেছে, বিএনপিকে চাপে রাখতেই গ্রেফতার, হামলা, বাধার ঘটনা ঘটছে। আসলে কোন দল বা জোট প্রার্থীকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ না বিএনপি প্রার্থীদের বাধা দেয়া হচ্ছে সেটি বড় ও মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচনের জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তির যে আকাঙ্খাটুকু জনমনে ছিল তা যে কোথাও বিদ্যমান নেই; বরং এর উল্টো পরিস্থিতি বিরাজমান – তা চোখে আঙুল দিয়ে আর দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, এতোসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কোনো কার্যকর ভূমিকাই দৃশ্যমান নয়। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা যে এরকমটি হবে, সাধারণ মানুষ ইতোপূর্বেই তার আলামত  টের পাচ্ছিলেন বা আচ করতে পারছিলেন। এ কারণে আমজনতা নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকায় অবাক তো হয়ইনি, বিস্ময়ের কোনো বিষয়ও নয় ওই ভূমিকা। এটা সবারই ধারণা ছিল যে, এমনটাই হবে। সাধারণ মানুষ এমনটাও ধারণা করেছিল যে, প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের সম্ভাব্য ভূমিকা কি হতে পারে? তবে কিছুটা কৌতূহল জেগেছে এই কারণে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এত্তোসব সহিংস ঘটনাবলীতে শুধুমাত্র ‘বিব্রত ও মর্মাহত হয়েছেন’। এর মধ্যদিয়ে একটি বিষয় প্রমাণিত হলো যে, সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহতবোধ করতে পারেন। এটুকু এখনো অবশিষ্ট আছে। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।

তবে সিইসি’’র এমন বক্তব্য তার এবং পুরো নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব আর ব্যর্থতাই প্রমান করে। এমন অসহায়ত্ব থাকলে জনমনে আস্থাহীনতা ও ভীতির সৃষ্টি হয়। ওই বক্তব্য সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্য হচ্ছে- ‘‘নির্বচন কমিশন একটি এ্যকশন ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠান। কোনো ঘটনায় তার বিব্রত হওয়া বা মর্মাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কমিশন চাইলে যেকোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে পারে।”

কিন্তু সাথে সাথে এ বিষয়টিও যেকোনো কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দলের অর্ন্তদ্বন্দ্বে ঢাকার আদাবরে ২ জনের নিহত হওয়াসহ ওই সময় যেসব ঘটনাবলী ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশন কঠোর হলে এখনকার ঘটনাবলী হয়তো এড়ানো যেতো। সিইসি ওই সময় এও বলেছিলেন, পুলিশ প্রশাসন অন্যায্য কিছু করছে না।

এদিকে, প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই এমন সহিংস রক্তারক্তির ঘটনাবলীর পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময়ে প্রার্থীরা বৈধ অস্ত্র বহন করতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কেন চুপচাপ? বিগত নির্বাচনগুলোতে বৈধ অস্ত্রও সংশ্লিষ্ট থানায় বা  আইনী হেফাজতে রাখার বিধান ছিল। এবারই তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।

যে ধারায় ও পর্যায়ে হামলা, গ্রেফতার, সহিংসতা চলছে এবং চালানো হচ্ছে এবং প্রশাসনের যে ভূমিকা তাতে সাধারণ মানুষের মন ও মনোজগতে বিদ্যমান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শংকা এতোটুকুও তো কমেইনি, বরং দিনে দিনে বাড়ছেই। এ কারণেই সর্বত্র একটি প্রশ্নই এখন উচ্চারিত হচ্ছে- ‘আমরা আমাদের ভোটটি শেষ পর্যন্ত ‘সহি-সালামতে’ দিতে পারবো তো?’ এই ভীতি, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, শংকা দূর করতে না পারার ব্যর্থতা পুরোটাই নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, সিইসি যতোই বিব্রত ও মর্মাহত হবেন, জনমনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সংশয় -সন্দেহ ততোই বাড়তেই থাকবে। আসলে পুরো পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং কর্মকান্ডে সাধারণ ভোটাররাই সত্যিকার অর্থে বিব্রত, মর্মাহত।

৭১ এর শক্তি

আনু মুহাম্মদ ::

‘‘আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়’’

নির্বাচনের হট্টগোলের মধ্যেও বিজয় দিবসের ডাক আসে, প্রশ্ন আসে, আনন্দ বেদনার সাথে আসে ক্ষোভ। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে দানবীয় অপশক্তির ভয়ংকর থাবার মধ্যে, নির্যাতন ও প্রতিরোধের যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এইদেশের মানুষ গেছেন, তা যারা দেখেননি তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন। সেই অভিজ্ঞতা এই জনপদের সেইসময়ের ও পরবর্তী সকল প্রজন্মের জন্য অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের ভয়ংকর কারাগার থেকে মুক্ত হবার আনন্দ নিয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে এসেছিল নতুন করে শ্বাস নেবার দিন। বেদনার পাহাড় বুকে নিয়েও মানুষের তখন অনেক স্বপ্ন।

কিন্তু এরপর থেকে একে একে দুমড়ে মুচড়ে যায় তার অনেককিছু। সবকিছু দখলে চলে যেতে থাকে ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠীর হাতে, তৈরি হয় লুটেরা কোটিপতি, স্বৈরশাসন আসে নানা রূপে। যুদ্ধাপরাধীদের দল আসে, ব্যবসা হয়, ক্ষমতা হয়, গাড়ি হয়,- তাতে উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। সাম্রাজ্যবাদ নতুন করে খুঁটি বসায়। তাই সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীপুরুষের ওপর শোষণ নির্যাতন চলতে থাকে। অসম্পূর্ণ বিজয়ের পর একেকটা পরাজয় জমতে থাকে।

এই বিজয় দিবসে আমাদের সামনে ত্বকী, সাগর-রুনী, তনু, মিতুর লাশ, রামুর বিধ্বস্ত জনপদ, ভাঙাচোরা বুদ্ধের শরীর, গোবিন্দগঞ্জের গুলিবিদ্ধ আগুনে পোড়া মানুষের হাহাকার, নাসিরনগর সাঁথিয়াসহ বহু অঞ্চলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত মুখ, পার্বত্য চট্টগ্রামে উজাড় পাহাড় আর সহিংসতায় বিপন্ন মানুষ ও প্রকৃতি। আমাদের সামনে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত – গুম হয়ে যাওয়া হাজার মানুষ। আসে শত হাজার নিহত শ্রমিকের মুখ। নিপীড়িত কিশোর ও তরুণেরা। জীবন্ত কবরে সহস্রাধিক, কয়লা হয়ে যাওয়া শতাধিক শ্রমিকের শরীর। সড়কে লঞ্চে হাজার হাজার মানুষ। কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়, লোভের খুন। আমাদের চোখের সামনে বিশ্বজিতের বিস্ময়, চিৎকার আর রক্তাক্ত দেহের ছায়া। পুলিশের সামনে দলবদ্ধ হয়ে একজন নিরীহ অচেনা তরুণকে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা। নদী দূষণ ও দখল, পাহাড় বন উজাড় আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন বর্তমান সময়ের উন্নয়ন যাত্রার প্রধান চিহ্ন। সমুদ্রের ব্লক নিয়ে আত্মঘাতী তৎপরতা চলছে। বিশেষজ্ঞ মত, জনমত অগ্রাহ্য করে সুন্দরবন বিনাশীবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা বাণিজ্যিক বনগ্রাসী ভূমিগ্রাসী তৎপরতাও চলতে পারছে। চলতে পারছে দেশবিনাশী রূপপুর প্রকল্পের কাজ।

গত ৪৭ বছরে দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন এখনও মানুষের হয়নি। এখন অর্থনীতি ধরে রেখেছেন দেশের গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক আর কৃষকেরা। দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকেরা জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেশে বছরে আনেন প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এই প্রবাহ না থাকলে লুটেরাদের দাপটে অনেক আগেই ধ্বস নামতো অর্থনীতিতে। আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়। এর জন্য তো মানুষ অসম্ভব সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে জীবন দিয়ে বাংলাদেশ আনেনি। অথচ এর মধ্যেই এখন আমরা ‘আছি’। দুর্নীতি দখলদারিত্ব, নানা অগণতান্ত্রিক আইনী বেআইনী তৎপরতা, সন্ত্রাস-টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি বিস্তারের সুবিধাভোগী খুবই নগণ্য কিন্তু তারাই ক্ষমতাবান।

যাদের ২৪ ঘন্টা রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিপালিত নানা বাহিনীর পাহারায় কাটে তারা ছাড়া বাকি কারও তাই আতংক আর কাটে না। নিজের ও স্বজনের জীবন নিয়ে, পথের নিরাপত্তা নিয়ে, জিনিষপত্রের দাম, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠা দিনরাত। উদ্বেগ উৎকন্ঠা নির্বাচন নিয়েও। সবচাইতে বড় ভয়, দিনের পর দিন সবকিছুতে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা এখন এমনই যে, মানুষের জন্য মানুষের শোক, আতংক কিংবা উদ্বেগ নিয়েও একটু স্থির হয়ে বসা যায় না। নতুন আরেক আঘাত পুরনো শোক বা আতংককে ছাড়িয়ে যায়। টিভি বা সংবাদপত্রেরও ঠাঁই নাই সবগুলোকে জায়গা দেবার, কিংবা লেগে থাকার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুইদল বা জোটের সংঘাত কখনোই জমিদারী লড়াই এর চরিত্র থেকে বের হতে পারেনি। যে অংশ ক্ষমতায় থাকে তাদের ইচ্ছা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেবার। তাই একপর্যায়ে বিরোধ চরমে ওঠে। আফ্রিকার দেশগুলোর মতো এদেশে গোত্র বা এথনিক সংঘাতের অবস্থা নাই। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপি লড়াই যেনো তার স্থানই পূরণ করতে যাচ্ছে, রাজনৈতিক বৈরীতা ও সংঘাত নিয়েছে ট্রাইবাল বৈরীতা ও সংঘাতের রূপ। আসলে দলের ব্যানার দেখে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে ব্যানারের পেছনে দাঁড়ানো লুটেরা, দখলদার ও কমিশনভোগীদের। দলের ব্যানার আসলে ব্যবহৃত হয় তাদের মুখ ঢাকার জন্য। মানুষ দল দিয়ে বিচার করে, দলের উপর ভরসা করে, দলের উপর বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, ক্ষোভে-দুঃখে চিৎকার করে। দল আসে যায়, আসে যাবে। কিন্তু কমিশনভোগী, দখলদার, লুটেরাদের কোন পরিবর্তন হয় না। তাদের শক্তি ও অবস্থান আরও জোরদার হয়।

প্রক্রিয়া যদি একই থাকে ক্ষুধা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেট তো ভরতে হবে। তাই এইভাবে চলতে চলতে মাঠ, গাছ, বন, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, নালা, খালবিল সব হজম হতে থাকে। ক আর খ এর  যখন যার সুযোগ আসে। কখনও প্রতিযোগিতা কখনও সহযোগিতা। কখনও ঐক্য কখনও সংঘাত। দখল, কমিশনের উপর দাঁড়ানো বিত্ত বৈভব শানশওকতে শহরের কিছু কিছু স্থান ঝলমল করতে থাকে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন সেলিম আল দীনের ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’  নাটক। সবকিছুই ছিলো প্রধান চরিত্র মুনতাসিরের খাদ্য। তার ক্ষুধার কোন শেষ নাই। আমাদের দেশে একের পর এক শাসক গোষ্ঠী একজনের থেকে অন্যজন আরও বেশি ‘মুনতাসির’। ক্ষমতাবানরা যখন এভাবে নিজের অর্থনীতি তৈরি করেন তখন রাজনীতি কেন জমিদারী থেকে আলাদা হবে? আমাদেরই বা সদা আতংক ছাড়া আর কী পাবার আছে?

সেজন্য গুম, খুন, ক্রসফায়ার, উর্দিপরা বা উর্দিছাড়া লোকজনদের ডাকাতি চাঁদাবাজী, কৃত্রিম কিংবা উস্কে তোলা রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা, দখল, দুর্নীতি এই সবকিছু নিয়ে মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসুস্থতার কালে পর্দার আড়ালে আরও অনেককিছু হয়ে যেতে থাকে। সহিংসতা বা অস্থিরতায় শতকরা ১ ভাগের হাতে আরও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে কোনো বাধা নেই। পাহাড় নদী বন দখলকাজে কোন সমস্যা নেই। দেশের সমুদ্র, সম্পদ, অর্থনীতিতে দেশি বিদেশি লুটেরাদের আধিপত্য বৃদ্ধির আয়োজনে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।নির্বাচনের হট্টগোলের আড়ালেও এইসব অপকর্ম চলতে থাকে।

এই অবস্থায় তাহলে কী হবে বাংলাদেশের? দুই জমিদার বা দুই ডাইনাস্টির আড়ালে, চোরাই টাকার মালিক সন্ত্রাসী প্রতারক দখলদার ব্যাংক লুটেরা আর কমিশনভোগীদের হাতে, নিজেদের সর্বনাশ দেখতেই থাকবে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ? তাহলে কী আর কোন উপায় নেই? শক্তিশালী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের দরবারে এই বলয়ের বাইরে আলোচনারও সুযোগ কম। নিপীড়নের খড়গ সর্বত্র। ভিন্নস্বর ভিন্নসত্য ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মানুষের চিন্তার সুযোগও সংকুচিত হতে থাকে। ফলে জনগণের মধ্যে এক অসহায়ত্বের বোধ প্রায় স্থায়ীরূপ নেয়।

এসব দেখে বারবার প্রশ্ন আসে, তাহলে কি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অগণিত নারী পুরষের অসম্ভব সাহস ও লড়াই-এর অভিজ্ঞতা বৃথা? না। ১৯৭১ এর সেই সাহস এখনও আমাদের শক্তি। এই শক্তি নিয়েই যুদ্ধাপরাধী ও লুটেরাশক্তির, দখলদার ও জমিদারদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক প্রভাব অতিক্রম করে জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। নিষ্ক্রিয়, আচ্ছন্ন আর সন্ত্রস্ত জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বোধ বিকশিত হওয়া ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আচ্ছন্নতা আর ভয় থেকে মুক্ত হলে, নিজেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হলে, জনগণ তার অন্তর্গত বিশাল শক্তিও অনুভব করতে সক্ষম হবে। তখন সম্ভব হবে পথের সন্ধান পাওয়া, সম্ভব হবে তার রাজনীতির বিকাশে স্বাধীন পথ গ্রহণ।

বারবার ৭১ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মানুষ, তা সে শারীরিকভাবে যতই দুর্বল অপুষ্ট হোক, জাগ্রত হলে যে কোনো দেশি বিদেশি দানবের মোকাবিলা করতে তারা সক্ষম। সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসন, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন লড়াই-এ জনগণের শক্তির স্ফুরণ তারই বহিপ্রকাশ। তাই শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশের প্রতারণামূলক বাগাড়ম্বরের মধ্যে নয়, শোষণ বৈষম্য নিপীড়ন আধিপত্য বিরোধী সকল লড়াই-এর মধ্যেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত। আত্নসমর্পণ আর পরাজয়ের বিপরীতে তার অবস্থান। চোরাই টাকা, প্রতারণা, বাগাড়ম্বর আর রক্তচক্ষু দ্বারা পরিচালিত নির্বাচনের মধ্যে পথ হারালে চলবে না। কারণ মানুষ যখন নিজের ভেতরে মুক্ত হয়, তখনই তার মুক্তির পথ তৈরি হয়।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ক্রমাগত ভাঙ্গন : সম্পর্কের নতুন মাত্রা আওয়ামী লীগের সঙ্গে

জহির উদ্দিন বাবর ::

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একটি প্রভাব বরাবরই ছিল। তারা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে না যেতে পারলেও বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলে অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এবং নিজেদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য করার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব দলের অবস্থান মূলত; আওয়ামী ও বাম শিবিরের বিপরীতে। তবে জামায়াতসহ কোনকোন দল কৌশল ও নিজেদের অতীত কর্মকান্ডের কারনে মানসিক দূরত্বের আওয়ামী লীগের সাথেও ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তুলেছে। তবে ডানপন্থি বিএনপির সঙ্গে সার্বিকভাবে তাদের সখ্য দীর্ঘদিনের। তবে বামঘেষা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামপন্থিদের দূরত্ব আগের চেয়ে অনেকটা ঘুচে গেছে। বিভিন্ন কারণে ইসলামি দলগুলো আর আগের মতো আওয়ামী বিরোধিতা করে না। আওয়ামী লীগও আর ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে আগের মতো তাদের প্রতিপক্ষ ভাবে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, ‘এককালের বাম ও সেক্যুলার ভাবধারার আওয়ামী লীগে ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যাই বেশি’। বাস্তবতা হলো, ধর্মভিত্তিক শক্তির মূলধারাটি এখনও আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই চলছে। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্টতার নানা কারণে ধর্মভিত্তিক দলের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে ইসলামপন্থিদের একটি বড় অংশ এখনও আওয়ামী লীগ ও বামধারার রাজনীতির প্রতি আগের অবস্থান ও মনোভাব থেকে সরে আসেনি।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যেও আছে নানা ধারা-উপধারা। জামায়াতে ইসলামীকেন্দ্রিক ধারাটি সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ; এখনও মাঠ পর্যায়ে তারাই বেশি শক্তিশালী। যদিও যুদ্ধাপরাধ অপরাধের মামলায় দলের প্রথম সারির নেতাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার পর তাদের আগের সেই অবস্থান আর নেই। চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে দলটির অনুসারীরা। দলটি একটা সময় এদেশে আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে আছে আওয়ামীবিরোধী শিবিরে। সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও আছে বিএনপি জোটের সঙ্গেই। তবে জামায়াতে ইসলামী নিছক ধর্মভিত্তিক দল নয়, সংসদীয় মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে তাদের সামঞ্জস্য থাকার কারণে তাদেরকে ইসলামি দল হিসেবে মানতে অনেকের আপত্তি আছে।

ইসলামপন্থিদের আরেকটি ধারার সম্পর্ক মাজার ও দরবারকেন্দ্রিক। তারা সাধারণত পীর, খানকা, দরবার, মুরিদ এসবের দ্বারা আবর্তিত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে বরাবরই আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালো। বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার তারা। জামায়াতে ইসলামী ও কওমিপন্থিরা যেন আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ভিড়তে না পারে এ ব্যাপারে তারা সবসময় তৎপর থাকে।

দেশে ইসলামপন্থিদের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশটি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলেমদের নেতৃত্বে পরিচালিত। দেশের ধর্মীয় অঙ্গন মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন তারাই। সমাজের মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ততটা না থাকলেও প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তাদের আছে। দেশের কয়েক লাখ মসজিদ, হাজার হাজার মাদ্রাসা সরাসরি তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সাধারণ জনগণকে নিজের মতের পক্ষে নাড়া দিতে পারে।

কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রায় দেড়শ বছর ধরে সরকারের কোনো স্বীকৃতি ও হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কয়েক মাস আগে জাতীয় সংসদে কওমি সনদের স্বীকৃতি বিল পাস হওয়ার পর তারা সমাজের মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ঐতিহ্যগত দিক থেকে কওমি আলেমদের মধ্যে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। বৈষয়িক প্রাপ্তির নানা সমীকরণ যুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না এটাই চরম সত্য।

দুই.

দেশে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বেশ কিছু দল রয়েছে। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনেকটা মিল থাকলেও তাদের মধ্যে মতভিন্নত প্রকট। বিভাজন হয়নি, ব্র্যাকেটবন্দি হয়নি – এমন ইসলামি দল খুব কমই আছে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুরের হাত ধরে কওমিপন্থিদের ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আগমন। হাফেজ্জি হুজুরের সেই খেলাফত আন্দোলন থেকে এখন এক ডজনের বেশি দল হয়েছে। দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে, নেতৃত্বের লড়াই অব্যাহত আছে বছরের পর বছর ধরে। নব্বই দশকের শেষ দিকে সবগুলো ইসলামি দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল ইসলামী ঐক্যজোট। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সেই ইসলামি ঐক্যজোট ভেঙে যায়। এরপর প্রচলিত ধারার স্বার্থের রাজনীতির চর্চা শুরু হয়ে যায় এখানে। কখনও এর সঙ্গে, কখনও ওর সঙ্গে করতে করতে এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলো অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। প্রায় কোনো দলেরই আগের সেই অবস্থান নেই। প্রতিটি দলই একটি সুনির্দিষ্ট গন্ডিতে আবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা খুব একটা নেই। মসজিদ-মাদ্রাসা আর ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের বেশির ভাগ কর্মসূচি। ফলে ইসলামি দলগুলো এখনও এদেশের জনগণের কাছে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে পারেনি।

সবশেষ ২০১৩ সালে ইসলামপন্থিদের বড় একটি উত্থান চোখে পড়ে। সেই সময় অনলাইনে ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে নাস্তিক ব্লগারদের বিচার দাবিতে চাঙা হয়ে উঠে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। ওই বছরের ৬ জুলাই মতিঝিলে ঐতিহাসিক লংমার্চে তারা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়। অনেকে এটাকে ‘নতুন শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে ঠিক এর এক মাস পর ৫ মে শাপলা চত্বরেই পতন ঘটে হেফাজতের। এরপর আর হেফাজত মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। বিভিন্ন সময় নানা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তা হালে পানি পায়নি। তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই হেফাজতে ইসলাম এখন আর আওয়ামী লীগের শত্রু  নয়, পরম বন্ধু। সংগঠনের আমির ও দেশের সবচেয়ে প্রবীণ আলেম আল্লামা আহমদ শফী নিজেই আওয়ামী লীগের প্রশংসা করেছেন। জাতীয় সংসদে স্বীকৃতি ঘোষণার পর কওমি আলেমরা ঘটা করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথিত শুকরিয়া মাহফিলের নামে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। এর দ্বারা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই সংবর্ধনা নিজেদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। এর আগে কোনো সরকার প্রধানকে এভাবে সব আলেম একমঞ্চে এসে সংবর্ধনা জানানোর নজির নেই।

শাসক দলের সঙ্গে এভাবে আলেমদের মাখামাখিকে ভালো চোখে দেখছে না খোদ ইসলামপন্থিদের অনেকেই। তবে নানা কারণে কেই সরাসরি বিরোধিতাও করতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে নানা অসন্তোষ ও ক্ষোভ কাজ করলেও কেউ তা প্রকাশের সাহস করছে না। আর নেতৃত্বের আসনে থাকা আলেমরাও নানা কারণে সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে গেছেন। একদিকে প্রলোভন আরেক দিকে নানা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে ঊঠে তারা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারছেন না বলে মনে করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ এটা কৌশল হিসেবে দেখছেন। সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় টিকে থাকার স্বার্থে আলেমরা একটু কৌশলী ভূমিকা নিয়েছেন বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তিন.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলোও আছে আলোচনায়। তবে এবারের নির্বাচনে কোনো দলই তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। মার্কাহীন, নিবন্ধনবিহীন জামায়াতে ইসলামীর কথা বাদ দিলে বর্তমানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই নির্বাচনে দলটি তিনশ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। এই নির্বাচনে তারাই একমাত্র ইসলামী দল যারা সব আসনে একক প্রার্থী দিয়েছে। যদিও একটি আসনেও পাস করার মতো অবস্থান গড়ে উঠেনি তাদের। এই দলটির বিরুদ্ধে বরাবরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ করে আসছে অন্যান্য ইসলামি দলগুলো। যদিও এর কোনো ‘‘দালিলিক প্রমাণ’’  নেই ।

তবে একটি বিষয় দৃশ্যমান, অন্যান্য ইসলামি দলকে আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে চরমোনাই পীরের দলকে সেটা মনে করে না। কয়েকটি সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থী তৃতীয় অবস্থান লাভ করে বেশ আলোচনায় আসে। অনেকে মনে করেন, তারা ইসলামপন্থিদের যে ভোট কাটেন তা সাধারণত বিএনপির বাক্সে যাওয়ার কথা ছিল। সরাসরি না হলেও তাদের ভোট কাটা সুবিধা করে দেয় আওয়ামী লীগকে। মূলত এই কারণে আওয়ামী লীগ তাদেরকে অনেকটা আনুকূল্য দেয় বলে কারও কারও ধারণা। যদিও তারা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এই অভিযোগ। অন্যান্য দলের সঙ্গে বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তারা যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই এটার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করেছে।

মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলাম ঐক্যজোট দীর্ঘ সময় বিএনপি জোটে থাকলেও বছর দুয়েক আগে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনের আগে ইসলামী ঐক্যজোট নৌকায় চড়ছে বলে জোর প্রচারণা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় তারা নৌকা পায়নি। পরে কয়েকটি আসনে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। যদিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও খুবই মধুর। তাদেরকে নির্বাচনী খরচসহ নানা সুবিধা আওয়ামী লীগ দিচ্ছে বলে কানাঘুষা আছে। তবে তাদেরকে জোরে বা কৌশলে বিএনপি জোট থেকে বের করতে পারাই আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য। তবে মুফতি আমিনীর জীবদ্দশায় তাকে নানাভাবে চেষ্টা করেও নত করা যায়নি। নিঃসন্দেহে এটা তাদের কৃতিত্ব। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামি ঐক্যজোটকে বিএনপি জোট থেকে বের করলেও একটি ভগ্নাংশ এখনও রয়ে গেছে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে। যদিও অ্যাডভোকেট আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন অংশটির কার্যক্রম খুব একটা নেই।

শায়খুল হাদিস আল্লাম আজিজুল হকের দল খেলাফত মজলিস ভেঙে যায় তার জীবদ্দশায়ই। দুই ভাগে বিভক্ত খেলাফত মজলিসের যে অংশটির সঙ্গে শায়খুল হাদিসের পরিবারের সম্পৃক্ততা আছে তারা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে নিবন্ধন পায়। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করে এই দলটি আলোচনায় আসে। যদিও এক-এগারোর পর সেই চুক্তি কার্যকারিতা পায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের নৌকা প্রতীকে ভোটও করা হয়নি। সেই দলটি চলতি বছর নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জোট হলেও চরমভাবে হতাশ হয় দলটি। জাতীয় পার্টি যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের ভাগ-ভাটোয়ারা মেটাতে হিমশিম খেয়েছে সেখানে শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য কিছুই করতে পারেনি। এখন হাতে গোনা কয়েকটি আসনে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে কোনোরকম মুখরক্ষা করেছে দলটি। শায়খুল হাদিসের ইন্তেকালের পর দলটির আভ্যন্তরীণ অবস্থা তেমন ভালো নয়। শায়খুল হাদিসের পরিবারের বলয়ে কোনোরকম টিকে আছে।

শুধু ‘খেলাফত মজলিস’ নামে নিবন্ধন পাওয়া দলটির নেতৃত্বে আছেন মাওলানা ইসহাক ও আহমদ আবদুল কাদের। দলটি এখনও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে। এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তারা হবিগঞ্জের দুটি আসন পেয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসন দুটিতে তাদের পাস করে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।  এই দলটিতে জামায়াতে ইসলামীর কিছুটা ছায়া আছে। এই দলের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের একসময় ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। যদিও পরে জামায়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তিনি হাফেজ্জি হুজুরের তওবার রাজনীতির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। প্রাচীন এই দলটি এখন দুই অংশে বিভক্ত। একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা আবদুল মুমিন। তবে বয়োবৃদ্ধ এই আলেম ততটা পরিচিত নন। সামনে রয়েছেন মহাসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমি। মূলত মাওলানা কাসেমির নামেই পরিচিত এই অংশটি। অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। তিনি এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চারদলীয় জোট সরকারের সাংসদ ছিলেন। এবারের নির্বাচনেও তিনি যশোরের একটি আসন থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এবারের নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দুই অংশ মিলে বিএনপির কাছ থেকে তিনটি আসন পেয়েছে। অন্তত দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

হাফেজ্জি হুজুরের হাতেগড়া খেলাফত আন্দোলন এখন আছে অনেকটা করুণ অবস্থায়। এই দলটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর উপকণ্ঠ কামরাঙ্গীচরে নুরিয়া মাদ্রাসার বাইরে তাদের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। হাফেজ্জি হুজুরের পরিবারের সদস্যদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই মূলত দলের এই করুণ দশা। অন্যদিকে অনেক প্রাচীন দল নেজামে ইসলামের অবস্থাও হ-য-ব-র-ল। দলটি যে কয়টি অংশে বিভক্ত খুঁজে বের করাও মুশকিল। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম, আরেকটি অংশের নেতৃত্বে মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, তিনি আবার ইসলামী ঐক্যজোটেরও চেয়ারম্যান। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন অ্যাডভোকেট আবদুর রকিব। একসময় মিসবাহুর রহমান চৌধুরী একটি অংশের নেতৃত্বের দাবি করলেও তিনি এখন ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত। এছাড়া মাওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য আন্দোলন একসময় আলোচনায় থাকলেও এখন তেমন কোনো কার্যক্রম নেই দলটির। এ ধরনের আরও কিছু দল তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এসবের কোনো প্রভাব আমাদের সমাজ বা রাজনীতিতে খুব একটা নেই।

চার.

মূলত ইসলামি দলগুলোর এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য দায়ী পরিকল্পনাহীনতা। তারা কী করতে চায়, কোন পথ ধরে এগুতে চায়, আর এর জন্য কী করতে হবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো ছক নেই ইসলামি দলগুলোর। গতানুগতিক ধারায় চলছে দল ও রাজনীতি। দলগুলোর গঠনতন্ত্র থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা অনুসরণ করা হয় না। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি, পরিবার বা বলয়েই চলছে দল। এখানে তাদের কথাই মুখ্য; গঠনতন্ত্রের কোনো মূল্য নেই। ব্যক্তি ও পরিবার পূজা ইসলামি দলগুলোর বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামি রাজনীতি এখনও পরিচালিত হয় মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। বেশির ভাগ দলেরই মূল জনশক্তি কোনো না কোনো মাদ্রাাসা। সারা দেশ থেকে নানা মত ও পথের মানুষের সন্তানেরা রাজধানীর মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে আসে। কিন্তু মাদ্রাসাটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বলয়ে হলে ওই ছাত্রটিকেও বাধ্যতামূলক এই দলটির কর্মী হয়ে যেতে হয়। কোনো ইস্যুতে মিটিং-মিছিলের প্রয়োজন হলে তাকে নামতে হয় রাজপথে। ওই দলটির মূল জনশক্তি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তারা কেউ বুঝে আবার কেউ বাধ্যতামূলকভাবে দলীয় কর্মী হয়ে মাদ্রাসা পরিচালক বা কর্তৃপক্ষের রাজনীতির হাতিয়ার হন। এর বাইরে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর নেই তেমন কোনো প্রভাব। কেউ কেউ পীর হিসেবে মুরিদদেরও দলীয় কর্মী মনে করেন। কিন্তু নির্বাচনের সময় ওই মুরিদেরাও দলকে ভোট দেয় না।

সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর তেমন কোনো যোগসূত্রতা নেই। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদারও হয় না ইসলামি দলগুলো। শুধু ধর্মীয় কোনো ইস্যু তৈরি হলেই ইসলামি দলগুলো সরব হয়। অন্যথায় তেমন কোনো কার্যক্রমই থাকে না এ দলগুলোর। সাধারণ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক নানা সমস্যার ব্যাপারে মাথা ঘামান না ইসলামি দলের নেতারা। ইসলাম সম্পর্কে কেউ কটূক্তি করলে ইসলামি দলগুলো বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেটা দেখা যায় না জাতীয় কোনো ইস্যুতে। এসব কারণে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব দিন দিন কমে আসছে। এক সময় দেশের শীর্ষ আলেমরা ইসলামি দলগুলোর নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু এখন এসব দলে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে নেতৃত্ব সংকট। তাছাড়া নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে বারবার আপস করায় ইসলামি দলগুলোর ভেতরেই তৈরি হয়েছে সংকট। তাদের নিজেদের কর্মী সংখ্যা তেমন বাড়ছে না, বরং উল্টো দলীয় কর্মীরা নানা কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। সবমিলিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

ব্যবসায়ী ফাটকা পুজিপতিদের ‘রাজনীতি দখল’ : জিম্মি জনগন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য দিয়ে শুরু করা যাক। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “নির্বাচন বাণিজ্যে যারা অর্থ বিনিয়োগ করবে তারা সে অর্থ বহুগুন তুলে নেবে”। এই অপ-আকাঙ্খার কারনেই কি ৩’শ আসনে মনোনয়নপত্র জমা পড়ে হাজার চারেক?‌‌‌ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের মতে, ১৯৫৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল দশমিক ৫৪ শতাংশ। সে সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৮০-৮৫ শতাংশে। এভাবেই নির্বাচনকে শেষতক বাণিজ্যে পরিনত করা হয়েছে।

এক. প্রত্যেক ব্যবসায়ী দেশের একজন নাগরিক। কোন কোন ক্ষেত্রে ‘কমার্শিয়ালি ইম্পর্টেন্ট পারসন” (সিআইপি)। ফাটকা পুঁজিবাদী বা এমন পুঁজিবাদী সমাজে ব্যবসায়ীদের কদর আলাদা। ব্যবসায়ী মানে টাকার ক্ষমতা, বিনিয়োগের ক্ষমতা এবং এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা। রাজনীতিতে যুক্ত হতে বা কোন দলের নেতৃত্ব দিতে ব্যবসায়ীদের জন্য কোন সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ নেই। কিন্তু আছে নানা সন্দেহ-অস্বস্তি। বিশ্লেষকদেরও আছে নানা প্রশ্ন। আদর্শিক দলগুলো জোরে-সোরেই ব্যবসায়ীদের রাজনীতির বিরোধিতা করে। যদিও রাজনীতি করার অধিকার ব্যবসায়ীদের রয়েছে। ফলে কেউ রাজনীতিতে আসলে তাকে রাজনীতি দিয়ে থামানোর বিকল্প পথও এখন আর খোলা নেই।

আসলে ব্যবসায়ীদের কাজ হচ্ছে, অর্থ বিনিয়োগ করা এবং তা থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে মুনাফা তুলে নেয়া। যেহেতু  দেশের রাজনীতি দুর্নীতিমুক্ত নয়। ফলে রাজনৈতিক দলে নেতা হতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, নির্বাচন এলে মনোনয়ন পেতেও আবার অঢেল। সহজ কথায যার নাম-মনোনয়ন বানিজ্য। ব্যবসায়ীরা এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনছেন, নিরাপদ করছেন। এটি তাদের জন্য স্বাভাবিক হলেও জনগনের জন্য ক্ষতিকর, যখন জানা যায় দেশ থেকে মাত্র একবছরেই ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলি, বিশেষ করে শাসক দলগুলি তাদের নেতা-কর্মী ও জনগনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না; নির্ভর করতে পারছে না। সেজন্য নির্বাচনে জিততে বা ক্ষমতায় থাকতে ব্যবসায়ীদেরও দয়া-আনুকুল্য দরকার হয়ে পড়ছে। নানাসময়ে ক্ষমতার সাথে যুক্ত দলগুলি টাকার ওপর নির্ভর করেছে, টাকা দিয়েই অবস্থান তৈরী করতে চেয়েছে। সেজন্যই ব্যবসায়ীদের এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। এটি দুর্নীদির এক দুষ্টচক্রে আটকে ফেলেছে দেশের রাজনীতিকে।

মুশকিল হচ্ছে, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের অর্থবান হওয়ার ক্ষেত্রটি বেশিরভাগই অবৈধ ও অন্ধকার পথে। এটিকে তারা অবলীলায় কাজেও লাগান। এ ধরনের ব্যবসাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য রাজনীতির প্রয়োজন হয়। শেয়ার বাজার ও ব্যাংক লুঠ, মাদক-অস্ত্রের চোরাকারবার, মানবপাচার, খাদ্য পণ্যেও সিন্ডিকেট ও ভেজাল, দুর্নীতি-দখলসহ অবৈধ পন্থায় উপার্জিত হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা দিতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা। এজন্যই মানুষের যত অস্বস্তি, সন্দেহ এবং প্রশ্ন।

দুই. সামরিক সরকারগুলোর সময় ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ব্যবসায়ীদের উত্থান ঘটেছিল পেশাদার রাজনীতিবিদদের নানান দুর্বলতায়। আশির দশকের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সামরিক স্বৈরাচার তৃণমূল পর্যায়ে যে টাউট-বাটপার শ্রেনী তৈরী করেছিল, তারাই কালক্রমে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এই নবোত্থিত টাউট-ব্যবসায়ীরা অচিরেই অঢেল অর্থের মালিক হয়েছে, নব্বই দশকে নির্বাচিত সরকারগুলি দলে ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে এদেরকে।

আসছে সংসদ নির্বাচনে বড় দলগুলি কম-বেশি বড় ব্যবসায়ী ও ব্যবসা সংগঠনের নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছে। অনেক দল বা জোট মনোনয়ন দিয়েছে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ঋন খেলাপীর চিন্হিত মহানায়কদের। নির্বাচিত হয়ে যারা বাণিজ্য ও মুনাফাভিত্তিক নীতি প্রণয়নে সরকারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। পোশাক খাতের অন্তত: ৩০ জন ব্যবসায়ী চলতি সংসদের সদস্য। তাদের প্রবল রাজনৈতিক দাপটের কারনে সর্বোচ্চ আদালত কথিত “বিষাক্ত ক্ষত” বিজেএমই ভবন এখনও সপাটে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। উপেক্ষিত হয়েছে ভবন ভাঙ্গার নির্দেশ। এ দিয়েই বোঝা যাবে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের বর্তমান অবস্থান।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের সংসদে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহন ছিল অনধিক ১০ জন। সেটি এখন গিয়ে ঠেকেছে ৮০-৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ পেশাদার রাজনীতিকরা এখন সংখ্যালঘু। এদের কল্যাণে দ্রব্যমূল্য, পরিবহন, পোশাক খাত, ঔষধ, চিকিৎসা ব্যবস্থা- সবকিছুর নিয়ন্ত্রন চলে গেছে ব্যবসায়িক রাজনীতিকদের হাতে। জনগন ও রাজনীতি জিম্মি এদের কাছে। সব খাতে ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা ভোগ করছে। কর অবকাশ, নতুন ব্যাংক করা থেকে সব কিছুতেই পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুকূল্য।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে জনগন দেখছে বিভিন্ন ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুঠকারী বা তাদের পৃষ্ঠপোষক, মাত্র দশককাল আগেও কপর্দকহীন- বর্তমানে হাজার কোটি টাকার মালিকরা স্থানীয় জাতীয়সহ সকল নির্বাচনে রাজনৈতিক মনোনয়ন লাভ করছে। এভাবেই তৃণমূল পর্যন্ত একটি ‘গডফাদার কালচার’ গড়ে উঠেছে রাজনীতিতে। নির্বাচন বাণিজ্যে এই যে বিশাল বিনিয়োগ, সেটি পেশাদার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মূলধারার রাজনীতি থেকে অপসৃত করে দিচ্ছে। তারা হয়ে উঠছেন দয়া-দাক্ষিণ্যের পাত্র।

তিন. বিশ্বজুড়ে সরকারে থাকার কতগুলি সাধারন নৈতিকতা আছে। এই নৈতিকতার স্খলন অনেক রাষ্ট্রে সরকারের পতন ডেকে আনে। এর অন্যতম হচ্ছে, লাভজনক কোন প্রক্রিয়ায় নীতি-নির্ধারকরা যুক্ত হতে পারবেন না। অর্থাৎ সরকার বা সাংবিধানিক পদের অধিকারী কোন ব্যক্তি তার পদকে ব্যবহার করে কোন লাভজনক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবেন না। তাহলে তার ‘শপথ’ ভঙ্গ হবে এবং তিনি ঐ পদে থাকার নৈতিক যোগ্যতা হারাবেন। গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় পরিচালিত সরকারগুলি এটি মেনে চলেন।

কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম আকছার ঘটছে। ভরিষ্যতেও আরো বেশীভাবে যে ঘটবে   না, এরকম কোন গ্যারান্টি পাওয়া যায় না। এই অনৈতিকতাকে শাসক দলগুলি ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনেও নিয়েছে। এ নিয়ে কখনও কোন তাড়া বা চাপ তারা অনুভব করেনি। দেশের দলদাস, বিবেকবর্জিত সুশীল সমাজ এ বিষয়ে তেমন করে উচ্চকিতও নয়। তবে ক্ষীণ হলেও বিবেকবান অনেকে এখন বলতে শুরু করেছেন, এটি বন্ধ হতে হবে। কারন দেশ থেকে অবাধে অর্থপাচার, রিজার্ভ চুরিসহ আর্থিক খাতে ভয়ঙ্কর দুর্নীতির সাথে কারা জড়িত, সেটি এখন ওপেন সিক্রেট।

সংসদ সদস্য হিসেবে যে সকল ব্যবসায়ী নির্বাচিত হচ্ছেন, তাদের যেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, সেইখানে যেন নীতি-আইন প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের না দেয়া হয়-এটি অন্তত: নিশ্চিত করতে হবে। নইলে রাজনীতির ‘আনুষ্ঠানিক মৃত্যু’ আর অনানুষ্ঠানিক থাকবে না। এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে ওঠা দরকার। যেমনটি রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘‘রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই’’।

দেশের চলমান ঘটনাবলী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে, জাতীয় স্বার্থ দেখার মত কেউ নেই। সাধারন মানুষের স্বার্থ তো দুর কী বাত। রাজনীতি বাণিজ্যিকীকরনের প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে, ভোটের আগে জোট গঠন করা। উদ্দেশ্য জনগনের অধিকার রক্ষা নয়, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করা। এক সাক্ষাতকারে এরকমটিই মন্তব্য করেছেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- “নির্বাচনের এই খেলায় জনগন যে হারবে সেটি নিশ্চিত। আগেও হেরেছে তারা, এবারেও হারবে। কারন তাদের নিজস্ব দল নেই। যারা জিতবে তারা টাকাওয়ালা এবং বড় দলের লোক। নির্বাচনের পরের দিন থেকেই দেখা যাবে, তারা জনগনের প্রতিপক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন”।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-৩ : মুনাফার পাহাড় : প্রাণ প্রকৃতির বিপর্যয়

আনু মুহাম্মদ ::

তাই পুঁজি সংবর্ধনের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রাণ প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। কারণ এই ‘উন্নয়ন’ধারার মূল কথাই হলো প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণ ও দখল করা। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল বিবেচনা না করে, ভবিষ্যত প্রজন্মের বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সকল তৎপরতা পরিচালনা তাই এই দৃষ্টিতে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল- স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রং ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মৎস্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। বর্তমান নিরাপদ খাদ্যের সংকট, পানি দূষণ সবকিছুই ঐ বিদেশি ঋণনির্ভর ‘উন্নয়ন চর্চার’ ফলাফল।[1]

গত তিন দশকে একদিকে পাহাড় ও সমতলের বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে বিদেশী ঋণের টাকায় এমন সব আমদানি করা গাছ লাগানো হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।[2] এসব গাছে পাখি বসে না, এসব গাছপালা অন্যান্য গাছ কিংবা তরুলতা টিকে থাকতে দেয় না। ফুল, ফলহীন এসব গাছ গবাদিপশুকেও সমর্থন দেয় না। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি কিংবা শাল, গর্জন কিংবা বটগাছ না লাগিয়ে এসব আমদানি করা গাছ লাগানোর ফলে প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং নাজুকতা তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো প্রধানত বনাঞ্চল, সেখানে নিরাপত্তার নামে বনবিনাশ এবং পাহাড় দখল প্রক্রিয়া চলছে কয়েক দশক ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা, বনবিনাশ ও সামরিকীকরণের উৎসও একটি বিদেশি ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।[3]

নদীর কথা-

নদীর পানি প্রবাহের ওপরই বদ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম, নদী বিপন্ন হলে তাই বাংলাদেশের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। নদী হারানোর সর্বনাশ ১/২  বছরে,  ১/২ দশকে বোঝা যায় না। গত কয়দশকে বাংলাদেশে জিডিপি যে বহুগুণ বেড়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে আছে, কিন্তু একইসময়ে বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীমালার কতটা জীবনহানি ও জীবনক্ষয় হয়েছে তার ক্ষতির কোন পরিসংখ্যানগত হিসাব আমাদের কাছে নেই।

বাংলাদেশের নদীগুলো যে ভাবে খুন হচ্ছে, কারণ হিসেবে ভাগ করলে,এর পেছনে তিনটি উৎস সনাক্ত করা যায়। এগুলো হল: প্রথমত, ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তৎপরতা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নদী বিদ্বেষী উন্নয়ন কৌশল। এবং তৃতীয়ত, দেশের নদী দখলদারদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজস।

ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। এগুলোর সাথে সম্পর্কিত ছোট নদী, শাখা নদীর সংখ্যা বাংলাদেশে আগে ছিলো সহস্রাধিক। এখনও ২ শতাধিক নদী কোনভাবে বেঁচে আছে। কংক্রিটকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ বড় শিকার বাংলাদেশ ও ভারত দুইদেশেরই নদীমালা। বাংলাদেশ অংশে নদীর বিপন্নতা ঘটেছে তুলনায় অনেক বেশি। একতরফা আক্রমণে বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট নদী এখন একেকটি মৃতদেহ, কিংবা মুমূর্ষু। কার্যত বাংলাদেশের বৃহৎ চার নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা এখন বিপর্যস্ত এবং আরও আক্রমণের মুখে।[4]

ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারতের নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা গত চারদশকে বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও সম্পর্কিত অসংখ্য ছোট নদী খালবিলকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুকিয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন পানি প্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি। সেচের জন্য চাপ বাড়ছে ভ’গর্ভস্থ পানির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল প্রতিবেশগত সংকট তৈরি করছে।

শুধু তাই নয়, পদ্মা নদীর এই ক্ষয় তার সাথে সংযুক্ত নদীগুলোকেও দুর্বল করেছে যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে সুন্দরবন পর্যন্ত। সুন্দরবনের কাছে নদীর প্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লবনাক্ততা বেড়েছে আর তাতে ক্রমাগত ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে পানিনির্ভর বনের জীবন। ফারাক্কার বিষক্রিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশেপাশেও পড়ছে। একদিকে পানিশূন্যতা অন্যদিকে অসময়ের বন্যা এবং অতিরিক্ত পলি। সম্প্রতি বিহারের মানুষ শাবল নিয়ে মিছিল করেছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেবার দাবিতে।  বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও এই বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাও ভারতের বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীকে থামাতে পারেনি। তাছাড়া ভারতের শাসকদের চিন্তা পদ্ধতিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার বিষয় একেবারেই অনুপস্থিত। মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের প্রস্তুতি পুরোটাই চলেছে একতরফাভাবে। এখনও এর হুমকি চলে যায়নি। এই বাঁধ বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ নদী মেঘনার জন্য যে বড় হুমকি হবে তা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন।

ম্যাপ দেখলে দেখা যায় ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর বিভিন্ন স্থানে কাঁটার মতো সব বাঁধ। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ভাটির দেশকে না জানিয়ে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। গ্রীষ্মে তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল অঞ্চল পানির অভাবে খা খা করে। তিস্তা নদীর প্রবাহ এখন শতকরা ১০ ভাগে নেমে এসেছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা ছাড়াও মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরে কোদলা নদীর উপর বাঁধ, খোয়াই নদীর উপর চাকমা ঘাট বাঁধ, বাংলাবন্ধে মহানন্দা নদীর উপর বাঁধ, গোমতি নদীর উপর মহারানি বাঁধ এবং মুহুরি নদীর উপর কলসী বাঁধসহ আরও ১৫/২০টি অস্থায়ী কাঁচা বাঁধ কার্যকর রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। ভারত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্প অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি ১৪টি নতুন খননকৃত খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে প্রবাহিত করা হবে। এটি কার্যকর হলে অন্যান্য নদীর সাথে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ নদী যমুনা আক্রান্ত হবে। শুকিয়ে যাবে অধিকাংশ নদী উপনদী।

দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের নদনদী খাল অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পানি প্রবাহের উপর ৫০ দশক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ এসেছে ‘উন্নয়ন’ নামক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে।[5]  এই প্রকল্পগুলি করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার ঋণের টাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বাঁধসহ নির্মাণমুখি কর্মসূচি হিসেবে। দেখা গেছে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও একপর্যায়ে গিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয়নি, সেচসুবিধা কাজ করেনি এবং সর্বোপরি মূল লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন বা নির্মাণ কাজ প্রধানত বিদেশি ঋণের টাকায় হয়। ফলাফল যাই হোক, ঋণদাতা, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, আমলা এবং ভুমিদস্যুদের লাভ অনেক। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শুধু একটি দৃষ্টান্ত দেই।

বড়াল নদী বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী পদ্মা এবং যমুনার সংযোগ নদী।  দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার, ১২০ মিটার প্রস্থ, এর অববাহিকা ৭৭২ বর্গকিলোমিটার। এর সাথেই চলনবিল। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এই নদীর মুখে স্লুইস গেট, ক্রসড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, নৌপথ সম্পসারণ লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম তিনবছর উৎপাদন ভালোই দেখা যায়। এরপরে শুরু হয় বিপর্যয়। ফারাক্কার কারণে এমনিতেই পদ্মা নদীর প্রবাহ কম ছিলো, উপরন্তু বরাল নদীর মুখে স্লুইস গেট বসানোতে পদ্মা থেকে আসা পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। স্রোত কমে যায়, বহু জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়। যমুনায় যেখানে গিয়ে বড়াল গিয়ে মেশে সেখানে পানিপ্রবাহ খুবই নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় যমুনা নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভাঙ্গন বিস্তৃত হয়। অববাহিকার প্রায় ১ কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বড়াল শুকিয়ে যে জমি উঠেছে তা এখন নানাজনের দখলে।[6]

তৃতীয়ত, বিভিন্ন নদীর মরণদশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা সহজ। নদী বাঁচলে তার মূল্য/টাকার অংকে পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু মরলে তার থেকে উঠে আসা জমির দাম শত/হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সেজন্যই নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতে অনেকেই আগ্রহী। খোদ রাজধানীতে বুড়িগঙ্গা, পাশে তুরাগ, বালু নদীর পাশ দিয়ে যাবার সময় এই দৃশ্য আমাদের সবাইকে  জানিয়ে দেয় এই দেশে সরকারের কাজ শুধু দখলদারদের সমর্থন দেয়া, জনপ্রতিরোধের মুখে তাকে রক্ষা করা, নদীদূষণের মাধ্যমে দখলদারদের পথ প্রশস্ত করা।

শুধু নদী বা খালবিল নয়, অপরিকল্পিত প্রকল্প ও দুর্নীতিযুক্ত উন্নয়ন তৎপরতায় ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে। ২০০৬ ও ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এই সময়ে আশংকাজনক ভাবে নীচে নেমে গেছে। ঢাকার বেশ কয়েকটি নদীতে অক্সিজেন নেই।[7]  সরকারের কেন্দ্রে নদী বিষাক্ত হলে বা লেক দখল হয়ে গেলেও কোনো প্রতিকার দেখা যায় না। কারণ দখলদাররা ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্কিত।[8]

এতোসব বিপর্যয় বাংলাদেশের শাসকদের বা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করেনি। আগের প্রকল্পগুলোর ফলাফল নিয়ে কোনো যথাযথ পর্যালোচনাও নেই। বরং আশি দশকে সমালোচিত ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান এখন আরও বৃহত্তর আকারে বিপুল ব্যয়বহুল ডেল্টা প্ল্যান নামে সরকার গ্রহণ করেছে।

বন, সুন্দরবনের কথা

‘বঙ্গের দক্ষিণে সাগরকূ’লে যদি বিশাল অরণ্য না থাকিত, তাহা হইলে বঙ্গোপসাগরের মেঘসমূহ উত্তর মুখে দূরে চলিয়া গিয়া হিমালয়ের উপত্যকায় বারিবর্ষণ করিত; তখন দক্ষিণ বঙ্গ বালুকা প্রান্তরে পরিণত হইয়া একপ্রকার মানুষের বাসের অযোগ্য হইয়া পড়িত। এখন যেমন ভাটিরাজ্যের উত্তর হইতে দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইতে লাগিলে, প্রথমে পদ্মার প্রবল প্রবাহ, পরে নদীমাতৃক উচ্চদেশে মানুষের বসতি, তাহার পরে মানুষের খাদ্যের জন্য নিম্নতল উর্বর ক্ষেত্রে ধানের প্রাচুর্য এবং সর্বশেষে দুর্ভেদ্য প্রাকারের মত সুন্দরবনের এই নিবিড় জঙ্গলশ্রেণী- এমন দৃশ্য আর দেখা যাইত না। জঙ্গলের জন্য আরও অনেক বিপদ হইতে দেশ রক্ষা হইতেছে। সমুদ্রের জলোচ্ছাস একান্ত প্রবল হইলেও সম্পূর্ণভাবে দেশ ভাসাইতে পারে না; সমুদ্রের ঝটিকাবর্ত বা বায়ুপ্রবাহ বসতিস্থানসমূহ উৎখাত করিতে পারে না।’ [9]

সাধারণভাবে একটি দেশের প্রতিবেশগত ভারসাম্যের জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ভূমি বনে আচ্ছাদিত থাকা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ৭ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।[10]     বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যান-এ বলা হয়েছে, ‘সমতলের শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ প্রাকৃতিক শালবন এবং পার্বত্যাঞ্চলের শতকরা মাত্র ১১ ভাগ বন এখনও টিকে আছে আর সেগুলোর অবস্থাও খুবই খারাপ।’ [11]

বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকেই জানা গেছে, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি বন উজাড় হয়েছে উচ্চপ্রবৃদ্ধির এই এক দশকেই।..শুধু গাজীপুরেই এক দশকে ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ বনাঞ্চল।’  মন্ত্রণালয়ের ওই তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ‘১৯৩০-৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখন্ডে বার্ষিক বন উজাড়ের হার ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। ১৯৭৫-৮৫ সাল পর্যন্ত বন উজাড় হয় বার্ষিক দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে। ১৯৮৫-৯৫ সালে এ হার খানিকটা কমে দাঁড়ায় দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর থেকে বন উজাড়ের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বন উজাড়ের নিট হার ছিল দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বন উজাড় হয়েছে। এত বেশি হারে বন উজাড়ের ঘটনা এর আগে কোনো দশকেই ঘটেনি।[12]

‘উন্নয়ন’ নামে পুঁজি সংবর্ধনের উন্মাদনার সর্বশেষ শিকার সুন্দরবন, যাকে বলা যায় বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রাকৃতিক বন। এই সুন্দরবনের মোহনায় যত প্রজাতির মাছ আবিষ্কার করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে ইউরোপে তত প্রজাতির মাছ নেই। সুন্দরবনের যে বৃক্ষ এবং লতাগুল্ম, যে জীববৈচিত্র্য তৈরি করেছে সেটাও বিশ্বের গবেষকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের মানুষ ও সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সুন্দরবন বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্ট নানাবিধ প্রকৃতি বিধ্বংসী মুনাফামুখী তৎপরতার কারণে সুন্দরবন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সুন্দরবন এখনো প্রকৃতি-প্রাচীর হিসেবে রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। সুন্দরবনে বছর দশেক আগে সিডর যে আঘাত হেনেছে তাকে মোকাবিলা করে সুন্দরবন আবার নিজেকে নতুনভাবে পুনরুৎপাদন করেছে অন্তর্গত শক্তির বলেই।

প্রকৃতির মধ্য থেকে সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা সুন্দরবনের পক্ষে যে সম্ভব সেটা যেমন বারবার প্রমাণিত হয়েছে তেমনি এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের মুনাফা  লোভ সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা তার পক্ষে খুবই কঠিন।  মুনাফামুখী তৎপরতায় সেখানকার পানি লবণাক্ত হয়েছে, লবণাক্ত পানি সেখানকার প্রাণবৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের মধ্যেকার ভারসাম্য বিপন্ন হয়েছে। যে ফুলবাড়ী প্রকল্প উত্তরবঙ্গের পানি আবাদী জমি এবং মানুষ এমন কি দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবনের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছিল, শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটি দিয়ে দেশের কয়লা বিদেশে পাচারের এই প্রকল্পকেই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বলে ঢোল পেটানো হয়েছিলো। জনপ্রতিরোধে তা কার্যকর হয়নি। পরে এসেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ তিন শতাধিক বাণিজ্যিক প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার যৌথভাবে কার্যত সুন্দরবনের মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করেছে।

লবণ ও মিষ্টি পানির সমন্বিত প্রবাহে, ভূমি ও নদীর সম্মিলিত যোগে সুন্দরবন এক বিশেষ বাস্তুসংস্থান যা বিশ্বে বিরল এবং সেই কারণে প্রাণবৈচিত্রে তার সমাহার অনেক বেশি। পরিবেশদূষণ হ্রাসেও তার ক্ষমতা অনেক। একদিকে তা খুব নাজুক উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে, আবার তা প্রবল শক্তিধর প্রকৃতির দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ক্ষমতার কারণে। সেজন্যই বাংলাদেশের সুন্দরবন শুধু এদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক অতুলনীয় সম্পদ। যেহেতু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট এবং বিশ্ব ঐতিহ্য এই সুন্দরবন এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর  হিসেবে কাজ করে সেকারণেই উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ এই সুন্দরবনের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। আমরা সবাই জানি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম বিপদগ্রস্ত দেশ। এই বিপদের মোকাবেলায়ও আমাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন এই সুন্দরবন। তাছাড়া ৩৫-৪০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল। এগুলো বিনষ্ট হলে তাদের উদ্বাস্তু হওয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। আমাদের হিসাবে প্রতিদিনই ঢাকা শহরে ‘উন্নয়ন’-দুর্যোগে বা পরিবেশ উদ্বাস্তু হিসেবে মানুষের ভীড় বাড়ছে। তাঁদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে যদি সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।

সবার জানাকথা আমরা বারবারই বলি যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নাই। সুঁই থেকে রকেট, গণভবন থেকে তাজমহল সবই আমরা বানাতে পারবো, কিন্তু সুন্দরবন আর বানাতে পারবো না। সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প দিয়ে কিছু গোষ্ঠী দ্রুত মুনাফা বানাতে পারবে, বনবিনাশ করে জমি দখল করে টাকার জোয়ার তৈরি করতে পারবে, তাতে জিডিপিও বাড়বে কিন্তু বাংলাদেশ শিকার হবে চিরস্থায়ী বিপর্যয়ের। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]বাংলাদেশের মতো দেশে‘উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নী সংস্থা ও লুম্পেন কনসালট্যান্টদের আগ্রহ বরাবরই বেশি। কেননা এখানে বাছবিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার কোনো দরকার হয় না। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক জালসহ এসব বিষয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী লেখার জন্য দেখুন: Salim Rashid: Rotting from the Head, Donors and LDC Corruption, UPL, Dhaka, 2004.

[2]বনবিনাশ ও সামাজিক বনায়নের বিবরণী ও বিশ্লেষণের জন্য দেখুন- ফিলিপ গাইন (সম্পাদিত): বন, বনবিনাশ ও বনবাসীর জীবন সংগ্রাম, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)। ঢাকা, ২০০৪

[3]দেখুন: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: অধিকতর উন্নযনের আগমনধ্বনি’, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র, শ্রাবণ, ২০০০।

[4]বাংণাদেশের নদী ও পানিসম্পদ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য M Inamul Haque: Water Resources, Anushilon, Dhaka 2008.  মাহবুব সিদ্দিকী: গঙ্গা পদ্মা পদ্মাবতী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৪।

 

[5]বাংলাদেশে নদী বিষয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমস্যা ও বিকল্প নিয়ে বিশ্লেষণের জন্য দেখুন Nazrul Islam: Let the Delta be a Delta, Eastern Academic, Dhaka, 2016

[6]বড়াল নদীর দুর্দশার কারণ ও বরাল উদ্ধার চেষ্টার কাহিনীর জন্য পড়ুন- নথিবদ্ধ বড়াল-তথ্য তত্ত্ব ও সম্ভাবনা, রিভারাইন পিপল ও বড়াল রক্ষা আন্দোলন,  শ্রাবণ, ২০১১।

[7]প্রথম আলো ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

[8]প্রথম আলো, ‘২২ একর লেক দখল, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

 

[9]সতীশচন্দ্র মিত্র: যশোহর খুলনার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, দেজ, কলকাতা, পৃ. ২৫৩

 

[10]বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে প্রদত্ত বক্তব্য:  https://www.dhakatribune.com/bangladesh/environment/2018/03/23/experts-bangladeshs-forest-coverage-10

[11]Bangladesh Forest Department: Bangladesh Forestry Master Plan 2017-2036 (Draft Final) December 2016

[12]উদ্ধৃতি: ‘উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনের ক্ষত বাড়াচ্ছে’, বণিকবার্তা, নভেম্বর ৪, ২০১৭।

 

‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্ত নির্বাচন কমিশন

আমীর খসরু ::

গত কয়েকদিন সবার জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়েছে কি হয়নি – তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এখনো যে হচ্ছে না তা নয়, তবে বেশ কিছুটা কমেছে। কমার কারণ, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়ে গেছে- এমনটা নয়, এটা হয়নি একবিন্দু-বিসর্গও। বরং এটা যারা নিশ্চিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবেন সেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েই আমজনতা ধন্ধে পড়েছেন; বড় আকারে প্রশ্ন উঠেছে। আবার প্রশ্নের মধ্যদিয়ে উত্তর খোজারও চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকগণ। সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে ‘‘আসলে তারা কোনো কিছু দেখতে না চাইলে, জোর করে তো আর তাদের দেখানো যাবে না’’ বলে ডেইলি স্টারকে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন এই সোমবারে। বদিউল আলম মজুমদারের মতো ড. শাহদীন মালিকসহ অন্যান্যরাও উদ্বেগ ও শংকা প্রকাশ করছেন নির্বাচন কমিশনের একপেশে নীতি নিয়ে।

কিন্তু এসব বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকগণ সম্ভবত নির্বাচন কমিশনের উপসর্গগুলোই দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু আসল রোগটি ধরতেই পারেননি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার হচ্ছে, হ্যামিএ্যনোপিয়া (Hemianopia) নামের চোখের একটি রোগ-যা দৃষ্টিশক্তির সাথে জড়িত। এ রোগটির প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে, কোনো জিনিসের অর্ধেক দেখতে পাওয়া বা দৃষ্টিশক্তি অর্ধেকটা সাময়িক অথবা স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যিনি বা যারা হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত তারা অর্ধেকটাই শুধু দেখতে পাবেন; বাকি অর্ধেকটা তাদের দৃষ্টিশক্তির বাইরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক উন্নয়ন ঘটেছে-রোগটির নানা ধরন-ধারন এবং কারণও কালোক্রমে আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী  এও বলছেন, এটি মানসিক বিষয়াশয়ের সাথে জড়িত। যেহেতু আমি চিকিৎসক নই, তাই এ রোগটির বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলেও- রাজনীতির মাঠেও নিশ্চয়ই ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্তদের দেখা মিলছে বলে ধারণা করি। রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়ার লক্ষণও নিশ্চয়ই অর্ধেক দেখা এবং এর সাথে রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত বলে ধারণা করা যায়। রাজনৈতিক এই রোগটির উপসর্গ হচ্ছে, যতোটুকু দেখার ততোটুকু দেখবে এবং যতোটুকু দেখতে চাইবে না তা দেখবে না-এমন জাতীয়। নির্বাচন কমিশন এখন ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় সবচেয়ে বেশিভাবে আক্রান্ত।

ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. শাহদীন মালিক থেকে শুরু করে নির্বাচন বিষয়ক সব বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকসহ তাবৎ আমজনতার এ কথাটি জানা উচিত যে, দুর্ভোগ্যজনকভাবে আগের মতো এবারের নির্বাচন কমিশনটিও রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত। আর এটা বুঝতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে অর্থাৎ নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হলো কিনা, এর ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে দেশবাসী দেখলো কিনা, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়েছে কি হয়নি ইত্যাকার নানা বিষয় নিয়ে আর উদ্বেগ, শংকা তো থাকবেই না, কোনো প্রশ্নও মনের মধ্যে উকিঝুকিও দেবে না।

নির্বাচন কমিশনের আসল রোগটি জানা থাকলে– কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে কোথায় বদলি করে আবার কোথায় পদায়ন করা হয়েছে; কোন কোন কর্মকর্তা কার হয়ে কার পক্ষে কাজ করছেন; কেন গায়েবী মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আগে এবং এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে; কেনই বা একজন জীবিত মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকায় আসার পরে তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করতে হলো; কেনই বা তফসিল ঘোষণার পরে ৬ জন দলীয় অর্ন্তদ্বন্দ্বে নিহত হওয়ার পরেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এবং উল্লিখিত ঘটনাবলীর কোনো ব্যবস্থা কোনোদিনই নেয়া হবে না – সে সব নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।

তবে রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগের মুশকিলটি হচ্ছে- এই রোগে আক্রান্তরা কোন অর্ধেক দেখতে পাবেন বা দেখবেন আর কোন অর্ধেক দেখবেন না? এখানে বলা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনবিরোধী প্রচারণা বা নির্বাচনে গুজব সৃষ্টিকারী কোনো কিছু প্রকাশিত হলো কিনা তা দিনের ২৪ ঘন্টাই  মনিটর করতে থাকবে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, এটা নির্বাচন কমিশনের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে কিনা। ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের জন্যও নানা নিয়মনীতি জারি করা হয়েছে – যা অতীতে কখনো দেখাও যায়নি, শোনা তো দূরে থাক।

আগেই বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত। আর আক্রান্ত হওয়ার কারণে বর্তমানে সবার মনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শংকা বিদ্যমান রয়েছে-তারও কোনো কারণ খুজে ফেরার প্রয়োজন আর বোধকরি দরকার হবে না। আগামী নির্বাচনে আমজনতা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন কিনা, সব ভোটারের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত হলো কি হলো না – তারও খোজখবর এবং জবাব প্রাপ্তিরও কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ রোগটি যে ধরা পড়ে গেছে-তা ক্রমান্বয়ে সবাই জানতে থাকবে।

তবে এখন সম্মিলিতভাবে সবার পক্ষ থেকে প্রার্থনা হওয়া উচিত, নির্বাচন কমিশন যেন রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগটি থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। অবশ্য একটি সুখবর হচ্ছে, হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগের একটি ধরন আছে; আর তা হলো- এই রোগটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িক স্থায়ী হয়। আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা ও  প্রত্যাশা করি, এই রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া যেন সাময়িক হয়। প্রার্থনা করা ছাড়া আমভোটারদের আর সাধারণ মানুষের কিই বা করার আছে। তাই আসুন সবাই সম্মিলিতভাবে নির্বাচন কমিশনের রোগমুক্তির প্রার্থনায় মিলিত হই। আমীন!