Home » সম্পাদকের বাছাই (page 20)

সম্পাদকের বাছাই

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৭ : ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড

আনু মুহাম্মদ ::

২০১৩ সালের শেষের দিকে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এক জোড়া বিশাল নির্মাণ যজ্ঞ এবং তার সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। সড়ক ও সমুদ্র পথ দিয়ে দুটো যোগাযোগ নির্মাণ যজ্ঞ হলো – ‘সিল্ক রোড ইকনমিক বেল্ট’ এবং  ‘টুয়েনটি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোড’। এই দুটোকে একসাথে বলা হয় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড।[i] এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থকরী প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং এই অবকাঠামো সংযোগ উদ্যোগ বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং তার সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পথ নকশা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে চীনের ভেতরে শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা এবং পুঁজি বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত ক্ষমতার। কারও কারও ভাষায় চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের আত্মসম্প্রসারণের তাগিদেরই এটা বহি:প্রকাশ।

সড়কপথে চীন থেকে পাকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইটালি আবার সমুদ্রপথে ইটালী থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ স্পর্শ করে মালাক্কা প্রণালী মালয়েশিয়া হয়ে আবার চীন। সিঙ্গাপুরের   ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে ভারতীয় মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন পর্যন্ত পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হয়ে আরেকটি পথও এই পরিকল্পনার মধ্যে আছে। শ্রীলঙ্কাও এই পথে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রপথের বিভিন্ন বিন্দুতে চীন তাই একাধিক গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজে আগ্রহী। প্রথম দিকে রাশিয়া পরিকল্পনায় আগ্রহী না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বিবাদের পর তারা আগ্রহী হয়েছে।

সাম্প্রতিক কালে চীন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাতেও বড়ধরনের ভূমিকা গ্রহণ শুরু করেছে। ব্রিকস সদস্যদেশগুলো সহ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (এআইআইবি) চীনের প্রায় একক উদ্যোগে এবং পরিচালনায় কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে চেষ্টা করলেও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ এর সদস্য হয়েছে। এছাড়া সিল্ক রোড ফান্ডসহ আরও বেশি কিছু আর্থিক ব্যবস্থার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের মতো সংস্থার একক কর্তৃত্বশালী অবস্থার জন্য পরিষ্কার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীনের এসব উদ্যোগ।

এসব উদ্যোগের সাথে আর্থিক আয়োজন বিশাল। আগের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের ভার বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু চীন এই প্রকল্পগুলো একের পর এক গ্রহণ করে যাচ্ছে। সিল্ক রোডের সাথে যুক্ত বিভিন্ন দেশে চীনের যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এআইআইবি, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সিল্ক রোড তহবিল এবং এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ভার বহনে মূল ভূমিকা চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের। চীনের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘এসব বৃহৎ পুঁজিঘন প্রকল্পগুলো নেবার কারণ হলো চীনের উদ্বৃত্ত আভ্যন্তরীণ সঞ্চয় দেশের ভেতর কম উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করে, অতি উৎপাদন ক্ষমতার অপচয় না করে, তা আরও উৎপাদনশীল কাজে লাগানো। যেহেতু ব্যাংকিং খাতেই চীনের আভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের কেন্দ্রীভবন ঘটে সেহেতু এই ব্যাংক এই দায়িত্ব নিতে সক্ষম।’ [ii]

সিএনবিসি-র একই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘এপর্যন্ত চীনের ব্যাংকগুলো থেকে দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পে যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ১.২ ট্রিলিয়ন (বা ১২০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।’ ঋণের পরিমাণ যেরকম অদৃষ্টপূর্ব হারে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এই ঋণের পরিশোধ নিয়ে অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞই চিন্তিত!

এটা ঠিকই যে, চীনে পুঁজি পুঞ্জিভবন ঘটছে অনেক দ্রুত হারে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তি পুঁজিপতির পাশাপাশি রাষ্ট্রের হাতেও বিপুল বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির সমাবেশ ঘটেছে। এর কারণে পুঁজির চাপ তৈরি হয়েছে অধিকতর মুনাফাযোগ্য বিনিয়োগের। এই বৈশ্বিক সম্প্রসারণের তাগিদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিশ্বের বিদ্যমান ভারসাম্যের সাথে চীনকে বোঝাপড়ায় যেতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে, ভারত নিজের ও মার্কিন তাগিদে চীনের তৎপরতা বিষয়ে সতর্ক। সিল্করোডের বাস্তবায়ন তাই সামনে মসৃণ হবে না। ইতিমধ্যে চীন সাগরে কর্তৃত্ব নিয়ে জাপানসহ কয়েকটি দেশের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে চীন। এরমধ্যে চীনের সামরিক বাজেটও বাড়ানো হয়েছে। এনিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে।


[i]Erebus Wong, Lau Kin Chi, Sit Tsui and Wen Tiejun: One Belt, One Road: China’s Strategy for a New Global Financial Order. Monthly Review, vol 68, issue 08, January 2017.  https://monthlyreview.org/2017/01/01/one-belt-one-road/

[ii]http://www.cnbc.com/2017/01/26/ancient-silk-road-revival-plans-could-be-the-new-risk-to-chinese-banks.html

আরও চাপের মুখে বিএনপি : লক্ষ্য আগামী নির্বাচন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্য শুরু করেছিলেন শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ একটি রূপক গল্প দিয়ে। গল্পটি ছিল এরকমঃ এক পীরের মুরীদ ক্ষমতা চাইলো পীরের কাছে- তোর ইচ্ছেয় সবকিছু হবে। পীর রাজী নন, জানিয়ে দিলেন পরিনাম ভাল হবে না। মুরীদ নাছোড়বান্দা। অবশেষে রাজী হলেন পীর। একটি দোয়া লিখে দিলেন। ৪০ দিন নির্জন ঘরে এই দোয়া পড়লে এক দৈত্য আসবে। তাকে যা বলা হবে, করে দেবে। কাজ না দিলে ঘাড় মটকাবে। চল্লিশ দিবস পরে দৈত্য এলো। মুরীদের নির্দেশ পালিত হতে লাগলো। সময় এলো, দৈত্যকে আর কাজ দেয়া যাচ্ছে না। অবস্থা এমন যে, মুরীদের প্রাণ যায়। পীর দিব্যদৃষ্টিতে সব দেখছিলেন। মুরীদের সঙ্গে দৈব যোগাযোগ স্থাপিত হলো। বললেন, বাজার থেকে ঘি কিনে নিয়ে আসো। দৈত্যকে দাও এবং বলো উঠানে যে, কুকুরটি শুয়ে আছে তার লেজ সোজা করতে। ওটি অনন্তকাল চলবে।

শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ যে সময়ের প্রেক্ষাপটে রূপকটি বলেছিলেন, তা থেকে বাংলাদেশ চলে এসেছে ৪২ বছর সামনে। ‘সময় বহিয়া গিয়াছে’ কিন্তু প্রেক্ষাপট কি খুব বেশি বদলেছে? অথবা বলা যায়, এই রাষ্ট্র বহুকাল ধরে পেছন যাত্রায় সামিল ছিল, এখনও রয়েছে অনেকক্ষেত্রেই। রাষ্ট্রের জন্মের গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা পরিপূর্ণ হয়নি বলে প্রয়াত রাষ্ট্রনায়কের রূপকটি আজ অবধি প্রাসঙ্গিক।

এক. রাষ্ট্রপতির উদ্যেগে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে একটি নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সার্চ কমিটির দেয়া নামগুলি থেকে রাষ্ট্রপতি পছন্দের মানুষগুলো বেছে নিয়েছেন। এটুকু হচ্ছে সোজা-সরল কথা। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু? তিনি কি করতে পারেন? তাও সংবিধান বলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত তিনি কোন কাজ করবেন না। তাহলে আমরা কি ধরে নিতে পারি, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছেন?

সিইসি দলীয় লোক বা দলীয় লোক নন। বিশেষ দলের প্রতি তার আনুগত্য আছে, আনুগত্য নেই; এসবই এখন আলোচনার বিষয়। এই কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ অনেকের সাথে আলোচনা হয়েছে। ফলে আগ্রহ ছিল, কি ধরনের মানুষদের কমিশনে নিয়োগ দেয়া হবে! অবশেষে দেখা মিলেছে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিশনের এবং নানান আলোচনা শুরু হয়েছে, আশঙ্কাও প্রকাশিত হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহনের আগেই যথানিয়মে বিরোধীদল বলে দিয়েছে কমিশন দলীয়, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না!

কমিশন সম্পর্কে কৌতুহলের প্রাথমিক সুরাহা করেছেন কেবিনেট সচিব। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বিএনপির তালিকার এবং কবিতা খানম আওয়ামী লীগের তালিকার-এ তথ্য কেবিনেট সচিবের। পরে থলের বিড়াল বেরোলো এবং নটে গাছটি মুড়োলো। জানা গেল, সিইসিসহ অন্য দুই কমিশনারের নাম এসেছে ১৪ দলভুক্ত ছোট দলগুলো থেকে। বোঝা গেল, এটি ছিল একটি কৌশল। পছন্দের মানুষ আনতে মিত্রদের মাধ্যমে তালিকা দেয়া হয়েছিল। এটি ছিল খুবই চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ও আইওয়াশ।

সিইসি মোহাম্মদ নুরুল হুদা প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৭৩ ব্যাচ, যেটি একটি ‌’বিশেষ  ব্যাচ’ নামে পরিচিত। তিনি ‘জনতার মঞ্চে’র সাথে যুক্ততা অস্বীকার করেছেন। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে যুগ্মসচিব নুরুল হুদাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তিনি এর বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার নিয়ে ২০০৮ সালে ‘ভুতাপেক্ষ’ সচিব মর্যাদায় অবসর নেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসর পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

দুই. কমিশন শপথ ও দায়িত্ব গ্রহন করেছে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। শুরুতেই দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে ফেলেছেন। তারা উতরে গেছেন; কারন সরকার চায়নি শুরুতেই সামান্য পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে কমিশন বিতর্কিত হোক। ক্ষমতাসীনদের আসল দৃষ্টি ক্ষমতার সবুজ জমিনে। এজন্য সরকার চেয়েছে বলে দলের মধ্যে প্রবল প্রতিপক্ষ থাকার পরেও নারায়নগঞ্জের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হয়নি। এখানে তাদের কৃতিত্ব কতটুকু তা ভূতপূর্ব কমিশনের সকলেই জানেন।

শুরুতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দলীয় লোক বলে অভিহিত করতে শুরু করেছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলেও এ বিষয়ে কসুর করতো না। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল সিইসির ওপর আস্থা রেখেছে, বক্তব্য, বিবৃতিও দিতে শুরু করেছে। ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিও তাই করতো। বোঝা যাচ্ছে, এই কমিশনের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, চ্যালেঞ্জগুলি কি কি? সেগুলি তারা সামাল দিতে পারবেন নাকি রকিব কমিশনের যোগ্য উত্তরাধিকার হবেন?

বর্তমান কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সরকারের সর্বগ্রাসী প্রভাব উপেক্ষা করে একটি অবাধ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু এই দেশে নির্বাচন কমিশন কখনও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমান করতে সক্ষম হয়নি। এই দেশের ইতিহাসে এমন কোন কমিশন আসেনি যারা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবকে উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে। এমনকি সবচেয়ে ‘শক্তিশালী’ দাবি করা ‘ড. শামসুল হুদা’ কমিশনও তখনকার সেনা-সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের ইচ্ছেকেই প্রতিফলিত করেছে।

অতীত ধারাবাহিকতার মধ্যেই কাজ শুরু করতে হচ্ছে নতুন কমিশনকে এবং অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের সর্বগ্রাসী প্রভাবের মত চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই। পেছনে পড়ে আছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একক নির্বাচন- যেখানে ১৫৩ জন প্রার্থী ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। শক্তি প্রয়োগ, সরকারী বাহিনীসমূহের নৈপূন্য এবং সহিংসতার পথে প্রতিহতের চেষ্টার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্মৃতি। এবারে একটি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে নির্বাচন। কি রকম পরিস্থিতি না অপেক্ষা করে আছে কমিশনের সামনে!

তিন. ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে- মোটামুটি নিশ্চিত। নির্বাচন কেমন হবে, তা বলার সময় বোধকরি আসেনি। শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমরের সাথে একমত পোষণ করতে হচ্ছে, “বাংলাদেশে সরকারী ও বিরোধী দলীয় যেসব দল সংসদীয় রাজনীতি করে, তাদের কারো মুখে কোন লাগাম নেই। তারা সবাই জনগনকে গরু-ছাগল ছাড়া আর কিছুই মনে করে না”। এজন্য ২০১৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জননির্ভর ছিলেন না, ছিলেন ‘আজ্ঞাবহ কমিশন’ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এ্যাকশন নির্ভর।

দেশের রাজনীতিতে মত্ত দুই প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অতিসামান্য মাত্রায় আদর্শিক হলেও আসলে পুরো জায়গা জুড়ে আছে ক্ষমতার লড়াই। ক্ষমতার খেলায় গত আটবছর ধরে বিএনপি প্রায় পর্যদুস্ত, বিপর্যস্ত ও কোনঠাসা। এই খেলায় বিএনপির আত্মঘাতী প্রবণতা ক্ষমতাসীনদের সফল হতে সহায়তা করেছে। সামরিক ছাউনিতে জন্ম নেয়া দলটি আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মধ্যপন্থায় বিকশিত হলেও গত দু’দশকে তৈরী হয়েছে চরম ডানপন্থার ঝোঁক। এরপরেও দলটি সম্বিত ফিরে পায়নি। দল গোছানোর প্রচেষ্টায় গত কাউন্সিলের কথিত পুনর্গঠন এর সবচেয়ে বড় উদাহরন।

এই আত্মঘাতী ও জনগনের সাথে সম্পর্কহীন স্রেফ ক্ষমতা ও ডাইন্যাষ্টির রাজনীতি সরকারের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। মাত্র একটি নমুনা হচ্ছে সারা দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে কম-বেশি সাড়ে বাইশ হাজার। খালেদা জিয়াসহ ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে সাড়ে চার হাজার। এর অনেকগুলি মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। আইনী লড়াই বলে দেবে কি আছে বিএনপি নেতৃত্বের ভাগ্যে। তবে আইনী প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলার বদলে তারেক রহমান আপাতত: প্রবাসে থাকছেন-এটি নিশ্চিত।

নির্বাচন ঘোষিত হলে বর্জনের হুমকি দেয়ার মত অবস্থানে বিএনপি নেই। দলটির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিকল্প নেই। তাদের বহুল কথিত “আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন বা সরকারকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য করা”- এর কোন অবস্থানে তারা নেই। বিএনপির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে, নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকার’- যার রূপরেখা তারা সহসাই পেশ করবেন। যদিও সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, নেতা ওরকম ধারনা আগেই নাকচ করে দিয়েছেন।

অন্যদিকে, নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে সরকারের মনোভাব বোঝা গেল প্রভাবশালী মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্যে। তার মতে, “যিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী আছেন, তার অধীনেই নির্বাচন হবে”। সকলেই জানেন, এটি আসলে বাস্তবতা। সেজন্য ‘সহায়ক সরকার’ বা যে নামেই বিএনপি কোন রূপরেখা নিয়ে আসুক না কেন, রাজনীতিতে কি প্রভাব রাখবে সেটি বলার আগে আরো বাস্তবতা হচ্ছে- বিএনপি এই মূহুর্তে কোন বিষয়ে ‘দর কষাকষি’র অবস্থানেও নেই।

চার. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেককে ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে হতে পারে। মোটামুটি পরিস্কার যে, খালেদার ও তারেকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলির বিচার সহসাই নিস্পন্ন হতে চলেছে। বিএনপি ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আদালতকে প্রভাবিত করা হচ্ছে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে।

বিচারে সাজা হলে খালেদা ও তারেকের নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিষয়টি পুরোপুরি আইনী জটিলতা ও আইনী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এরকম পরিস্থিতির সবরকম সুবিধা নেয়ার জন্য সরকার তৈরী আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সংকট মোকাবেলায় বিএনপির প্রস্তুতি কি? শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়া এবং দলীয় কিছু লোকের জন্য অবাধ লুন্ঠনের ‘গণতন্ত্র’ কায়েমে জনগন তাদের সাথে সামিল হবে না। যেমনটি সামিল নেই আওয়ামী লীগের সাথেও। সেজন্য অবাধ নির্বাচনে সবকালে ক্ষমতাসীনদের ভয়।

বিএনপি অপর চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, নির্বাচন হবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কথা ছেড়ে দিয়ে সহায়ক সরকারের দাবি করছে বটে, কিন্তু দাবি আদায়ে তাদের অঙ্গীকার বা সক্ষমতা কি আছে? এটি বিএনপিও যেমন বোঝে, সরকারও তেমনি জানে। ফলে নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে হবে। অংশ নিয়ে তাদের অভিযোগের যথার্থতা প্রমান করতে হবে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকার ন্যূনতম নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম নয়।

সা¤প্রতিক বক্তব্যে মনে হচ্ছে, খালেদা ও তারেকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পেতে সরকার উদগ্রীব। বিএনপির অভিযোগ, দলের দুই শীর্ষ নেতাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের আচরন ও পদক্ষেপ এই অভিযোগকেই উস্কে দেয় এবং বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়ে একটি নির্বাচন আয়োজনের আভাস মেলে। এরকম সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে ২০১৯ সালের নির্বাচন হলে তৃতীয়বারের মত ক্ষমতাসীন হওয়ার ব্যাপারে সরকারের আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই।

একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই কি সমাধান? গত আড়াই দশকে কম-বেশি এরকম ৪টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সময়কালে যে দুটি দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের মনোজমিন এবং প্রায়োগিক সকল ক্ষেত্র জুড়ে আছে শুধুমাত্র ক্ষমতা, গোষ্ঠিতন্ত্র, উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুন্ঠন। সবশেষে সম্পদ বিদেশে পাচার করে নিরাপদ থাকা।

টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও অর্থনীতির ভিত এখন সুদৃঢ়। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন তাদের হাতে। মিডিয়া-তথ্য-প্রবাহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও তারা নিয়ন্ত্রন করছেন। এই দলকে ঘিরে বিশাল একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠি দাঁড়িয়ে গেছে। অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক এই গোষ্ঠির সুফল প্রাপ্তি অব্যাহত ও নিশ্চিত রাখতে দলটি দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ক্ষমতার সবুজ মাঠের দিকে। সেজন্য আগামী নির্বাচনেও সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তারা।

ভারত : নোট বাতিলের এতো বিরম্বনা

ধ্রুবজ্যোতি নন্দী ::

মোদি বলেছিলেন ৫০ দিন। কিন্তু ৮ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করা সেই টেলিভিশন বক্তৃতার পর ১০০ দিন কেটে গেছে। সোমবার থেকে সপ্তাহে টাকা তোলার ঊর্ধ্বসীমা নাকি বাড়িয়ে ৫০,০০০ টাকা করা হয়েছে, যদিও বাইরে ‘নো ক্যাশ’ লেখা এটিএম চোখে পড়ছে এখনও সর্বত্র। যেখানে টাকা আছে, সেখানেও আবার শুধুই ২০০০ টাকার নোট! কিন্তু গত মাস তিনেকে ব্যাংক থেকে নিজের টাকা নিজে তুলতে গিয়ে দুর্ভোগ এমনই স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে একে ভবিতব্য বলেই মেনে নিতে শিখেছেন সাধারণ মানুষ।

নোট বাতিলের আগে ভেবেছিলেন?

৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় বাজারে চালু নোটের ৮৬% রাতারাতি বাতিল করাকে রিজার্ভ ব্যাংকের নিজস্ব এখতিয়ার সরকারের হস্তক্ষেপ বলে শুরু থেকেই যেমন অনেকে তার বিরোধিতা করেছিলেন, তেমনই আবার এই সিদ্ধান্তকে কালো টাকার দাপট কমানোর লক্ষ্যে, দুর্নীতি দূর করার লক্ষ্যে এক জরুরি পদক্ষেপ মনে করে তাকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও জানিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তারপর থেকে ব্যাংক আর এটিএমের সামনে লম্বা লাইন দিনের পর দিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কতটা অপ্রস্তুত, অপরিকল্পিত এবং অবিবেচক ছিল সেই সরকারি সিদ্ধান্ত। প্রশ্ন উঠেছে, বাতিল নোট বদলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নোট ছাপতে কতটা সময় লাগবে তা জেনেও কি নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মোদি, না কি না-জেনেই? যন্ত্রের সংশোধন না করে এটিএম থেকে যে নতুন নোট ছাড়া যাবে না, সে কথা কি জানতেন নোটের মাপ পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়? হিসেব করে দেখেছিলেন, সমস্ত এটিএমে নতুন নোটের মাপে আনতে কতটা সময় লাগবে? জানতেন নগদের অভাবে কী সংকট তৈরি হতে পারে অর্থনীতিতে? বুঝেছিলেন, মার খাবে চাষী, দক্ষ কারিগর, ছোট ব্যবসায়ী? নগদের অভাবে লোকে খরচ কমানোয় সংকটে পড়বে ক্ষুদ্রতম কারখানা থেকে বিশাল আবাসন, সাবান-শ্যাম্পুর মতো ভোগ্যপণ্য থেকে পর্যটনের মতো শিল্প, কোটি কোটি শ্রমিক যার সঙ্গে যুক্ত। আন্দাজ ছিল, দিনের পর দিন মানুষের দুর্দশা বাড়বে আর নাজেহাল রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় প্রতিদিন নতুন সার্কুলার জারি করে নতুন নিয়ম চালু করবে? নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে প্রধানমন্ত্রী কার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এ সব বিষয়ে? রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর, ভারতীয় কারেন্সি নোটে যাঁর স্বাক্ষর থাকে, তাঁর সঙ্গে? আলোচনা হয়েছিল মন্ত্রিসভায়? অর্থমন্ত্রী নিজে জানতেন তো?

দেশের সরকার এবং সরকারি দলটি শুরুতে ভেবেছিল, কালো টাকা উদ্ধার হচ্ছে দেখলে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষ পছন্দ করবেই। তাই প্রথম কদিন তো এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়াই যায়নি। শুধুই বলা হত, নোট বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত তো সকলকে জানিয়ে নেওয়া যায় না। একটা বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল ক্রমশ যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়া এমন সাহসী সিদ্ধান্ত আর কে নিতে পারেন? এবং, গোপনীয়তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত একাই নিয়েছেন তিনি।

আপত্তি ছিল রাজনের?

কালো টাকা উদ্ধারের গল্প অবশ্য বেশি দিন গ্রহণযোগ্য রাখা গেল না। বরং, যত দিন এগিয়েছে, ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার যাবতীয় চেষ্টা অগ্রাহ্য করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে এসেছে নোট বাতিলের ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, এমনকী মৃত্যুর একের পর এক খবর। ততদিনে হাওয়ায় হাওয়ায় শোনা যাচ্ছে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন নোট বাতিলের প্রস্তাবে- আর সেই জন্যেই গভর্নর হিসেবে অসামান্য যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়া সত্ত্বেও মেয়াদ ফুরোতেই তাঁকে বিদায় করে এমন একজনকে শীর্ষ পদটিতে বসানো হয়, যিনি কোনওরকম ওজর-আপত্তি ছাড়াই সরকারি সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেবেন। ততদিনে সংসদ তোলপাড় হয়েছে অর্থনীতির বৃদ্ধি হার শ্লথ হওয়ার আশঙ্কায়। ভোটের প্রচারে গিয়ে নোট বাতিলের সুফল বোঝাতে গিয়ে মোদি–ভক্তদের যত তাড়া খেতে হয়েছে পাঞ্জাব-উত্তর প্রদেশে, ততই শোনা গিয়েছে, বিস্তর আলাপ-আলোচনা করেই তো  নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত।

কিন্তু সেই ভাষ্যেও যে নানা ভাষা, নানা মত। আপনি বিশ্বাস করবেন কাকে? সংসদীয় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির ডাকে উর্জিত প্যাটেল গিয়ে জানিয়ে এলেন, সরকার ২০১৬-র জানুয়ারি থেকেই নোট বাতিল সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেছিল রিজার্ভ  ব্যাংকের  সঙ্গে। রাজ্যসভায় অরুণ জেটলি তাঁর বক্তৃতায় বললেন, অর্থ মন্ত্রনালয় ফেব্রুয়ারি থেকে রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে নোট বাতিল নিয়ে কথাবার্তা শুরু করে। সামান্য ক্ষতি? কিন্তু রাজ্যসভায় তাঁর সেই বক্তৃতায় জেটলি তো এ–ও বলেছিলেন যে, গত বছর মে মাসেই রিজার্ভ ব্যাংকের পরিচালন পরিষদে বাতিল নোটের বদলে আসা নতুন নোটের নকশা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং তারপর থেকে নোট বাতিল নিয়ে নিয়মিত, প্রয়োজনে সপ্তাহে-সপ্তাহে, আলোচনা হয়েছে রিজার্ভ  ব্যাংকের বোর্ডে। এদিকে, তথ্য জানার অধিকারবলে তোলা এক প্রশ্নের উত্তরে রিজার্ভ ব্যাংক লিখিতভাবে জানিয়েছে, ২০০০ টাকার নতুন নোট চালু করার সিদ্ধান্ত মে মাসে অনুমোদিত হলেও মে, জুলাই বা আগস্ট মাসের বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ টাকা বা ১০০০ টাকার নোট বাতিল নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি! তার মানে, এমনই কঠোর ছিল গোপনীয়তার শাসন যে যাঁরা মিটিংয়ে বসলেন, তাঁরা জানলেনও না যে নোট বাতিল নিয়ে আলোচনা হয়ে গেল সেই মিটিংয়ে!

দুর্নীতি, কালো টাকা, জাল নোট, সন্ত্রাস-

তবু, না হয় মেনেই নেওয়া গেল বিস্তর আলাপ–আলোচনার পরেই চূড়ান্ত হয়েছিল নোট বাতিলের এই মহা-সিদ্ধান্ত। কোন লক্ষ্যে, কী প্রয়োজনে? ৮ নভেম্বরের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণায় মোদি বলেছিলেন, দেশ থেকে দুর্নীতি, কালো টাকা, জাল টাকার প্রকোপ কমানোর জন্য, সীমান্ত পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসের মোকাবিলার জন্য। দুর্নীতি কমবে মানে নোট বাতিলের ফলে ঘুষের আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যাবে? জানি না কার সে আশা ছিল, সাধারণ মানুষের অন্তত ছিল না। হয়ত সরকারের ছিল, মোদি–ভক্তদের ছিল। আশা ছিল, বহ্ন্যুৎসব হবে বাতিল নোটের, পুকুরে-নদীতে ভাসবে বাতিল নোটের বান্ডিল, যখন তখন নোটবৃষ্টি হবে আকাশ থেকে। এসব কিছু তো হলই না, উল্টে আজ তামিলনাডুতে, কাল গুজরাটে, পরশু হায়দরাবাদে লোকজন ধরা পড়তে শুরু করল ২০০০ টাকার বিপুল সংখ্যক নোট নিয়ে। দিল্লির আইনজীবী রোহিত ট্যান্ডনের অফিসে হানা দিয়ে ২ কোটি টাকা পাওয়া গেল কড়কড়ে নতুন ২০০০ টাকার নোটে। বাতিল নোটে কত টাকা ফেরত এল, জানতে চাইলে সরকারের মুখে কুলুপ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্পের নটে গাছটি তাই সাত তাড়াতাড়ি গেল মুড়িয়ে। কিন্তু সন্ত্রাস মোকাবিলায় সাফল্যের গল্পটা চলল বেশ অনেক দিন। টেলিভিশন খুললেই শুনি বিজেপি নেতারা বলছেন, কাশ্মীর ঠান্ডা হয়ে গেল শুধু নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে। হাওয়ালা বন্ধ, অবস্থা এমনই সঙ্গীন যে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হাওয়ালা কারবারিকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে বহুতলের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে। নতুন বছর পড়তেই সে ঘুড়িও গেল কেটে। তিনটি ঘটনায় ৬ সেনার মৃত্যুর পর ফেব্রুয়ারিতে সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতকে বলতে হল, যে সব স্থানীয় যুবক সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছে, বা সেনাবাহিনীর ফ্লাশিং আউট অপারেশনে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের সন্ত্রাস-সহযোগী বলে মনে করা হবে এবং সেই মতোই ব্যবহার করা হবে তাদের সঙ্গে। বাদ-প্রতিবাদের তুফান উঠছে সেই মন্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে আর তার মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরে শান্তি বিরাজের গল্পটা গেছে পুরোপুরি ঘেঁটে। ছিল বাকি জাল নোট, সে–ও তো ইদানীং নিয়মিত ছবি হয়ে খবরের কাগজের শোভা বাড়াতে শুরু করেছে আবার। নোট বাতিলের এত ঝঞ্ঝাট সহ্য করে তবে শ্লথ হয়ে যাওয়া অর্থনীতি ছাড়া পেলামটা কী? মাস তিনেকের মুখে দাঁড়িয়ে এ প্রশ্ন কি খুব অসঙ্গত?

প্রশ্ন তোলা যাবে, কিন্তু মোদিকে অত সহজে মোটেই গোল দেওয়া যাবে না। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি গোলপোস্ট মাঠের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছেন পশ্চিম প্রান্তে। দুর্নীতি, কালো টাকা, সন্ত্রাস ছেড়ে তিনি বেশ অনেক দিন ধরেই বলতে শুরু করেছেন ক্যাশলেস ইকনমির কথা। নগদহীন, পরে সংশোধন করে বলা শুরু করেছেন কম নগদের ডিজিটাল অর্থনীতি, চালু হলেই কাশীর ঘাটে স্নানের পুণ্য লাভ করবে ভারতীয় অর্থনীতি। শুদ্ধ, অমলিন সেই অর্থনীতিতে লগ্নির জন্য ছুটে আসবে দেশ-বিদেশের বাণিজ্য সংস্থা, কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে প্রতিদিন এবং  দেশের বৃদ্ধি হার হবে এতই চমকপ্রদ যে তারিফ করবে সারা দুনিয়া!

তবুও ফানুস উড়ছে-

ফানুস তবু এখনও উড়ছে। পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফল ঘোষণা পর্যন্ত তার উড়ান নির্বিঘ্নই হওয়ার কথা। তারপর কী হয়, সময়ই বলবে। তবে এরই মধ্যে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অরুণ কুমার ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য ব্ল্যাক ইকনমি অ্যান্ড ব্ল্যাক মানি ইন ইন্ডিয়া’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেই বইতে হিসেব দিয়েছেন তিনি, প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয়দের মাত্র ২২% ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং মাত্র ১৭% স্মার্টফোন। ডিজিটাল অর্থনীতিতে ঝাঁপ দেওয়ার জন্যে আমরা যে কতটা তৈরি তা বুঝে নেওয়ার পক্ষে এইটুকুই যথেষ্ট হওয়া উচিত। তাঁর হিসেবে, নগদে মজুত যে কালো টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল সরকার তা দেশে মজুত মোট কালো ধনের মাত্র ১% এবং শুধুমাত্র ২০১৬ সালে দেশে যে কালো ধন তৈরি হয়েছে, তার ৩.৫%। সরকার যদি নগদে ঘুরতে থাকা সমস্ত কালো টাকা বার করে আনতেও পারত, তাহলেও কোনওই প্রভাব পড়ত না দেশের কালো-অর্থনীতির ওপর, যা নানারকম সক্রিয়তায় ক্রমাগত তৈরি করে চলেছে হিসেব-বহির্ভূত টাকা, বা কালো টাকা। যে সব কারণে কালো টাকা তৈরি হয়, সেগুলি বন্ধ করতে না পারলে কালো টাকার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা অসম্ভব।

খুব নতুন কিছু বলেননি বরেণ্য চিন্তাবিদ, সামান্য ভাবনা-চিন্তাতেই নাগাল পাওয়া যায়, এমন কথাই শুনিয়েছেন। কিন্তু নোট বাতিলের ‘ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই কথাগুলি প্রধানমন্ত্রীকে বলার কি কেউ ছিল না? নাকি, মোদির জমানায় তলিয়ে ভাবনা-চিন্তার সংস্কৃতিটাই বিসর্জন দিয়েছেন দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারকরা? আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আগেই বলেছে, এখন ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাও বলছেন, পূর্ব-প্রত্যাশিত ৭.৬ শতাংশের পরিবর্তে চলতি বছরে ভারতীয় অর্থনীতির সম্ভাব্য বৃদ্ধি হার হতে চলেছে ৬.৬%। ২০১৫-১৬ সালে এই বৃদ্ধি হার ছিল ৭.৫৬%। সমস্ত বড় অর্থনীতির মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হার বলে তাই নিয়ে উল্লাসও কিছু কম হয়নি। টানা দু-বছর খরার পর গত বছরেই স্বাভাবিক বর্ষা পেয়েছিল সারা দেশ। কৃষি ক্ষেত্রের, গ্রামীণ ক্ষেত্রের উৎপাদন এবং আয় বৃদ্ধি চাহিদা বাড়াবে, গতি আনবে অর্থনীতিতে, এই ছিল সামগ্রিক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার মাথা মুড়িয়ে তাকে টেনে নামানোর দায় কে নেবেন? কে দায় নেবেন কর্মহীনতা বাড়তে বাড়তে ৫ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ার? কারখানায় তৈরি জিনিসের উৎপাদন-সূচক মাসের পর মাস নামতে থাকার? ব্যাংক-ঋণের চাহিদা তলানিতে ঠেকার? আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কোনও উচ্চারণে তার সামান্যতম হদিশও পেয়েছেন কেউ? বরং সংসদে প্রধানমন্ত্রী সদর্পে বলেছেন, শরীর যখন সুস্থ, তখনই শরীরে কাটা ছেঁড়া করে নিতে হয়। অর্থনীতি চাঙ্গা ছিল, তাই তখনই এই উচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজব যুক্তি! কিন্তু ‘সুস্থ’ অর্থনীতি যে অপ্রয়োজনীয় কাটা ছেঁড়ায় ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছে, এ কথা বেশ কিছু দিন ধরে অস্বীকার করে যাওয়ার পর সরকার এখন শুরু করেছে সান্ত্বনার পালা। নোট সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, বলছে সরকার, অর্থনীতিও এবার নাকি ফিরবে তার স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু না, বাস্তবে তেমন কোনও লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। সরকারি-বেসরকারি কোনও গবেষণা সংস্থাই তেমন কোনও লক্ষণ এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি। মোদি সরকারের আর পাঁচটা প্রতিশ্রুতির মতো এটাও আর একটা প্রতিশ্রুতি মাত্র। পূরণ হলে মোদি বাঁচবেন কিনা জানি না, তবে দেশ বাঁচবে। আর পূরণ না হলে? মোদি তো ডুববেনই, সঙ্গে দেশটাকেও অনেকখানি ডুবিয়ে দিয়ে যাবেন।

(কলকাতার দৈনিক আজকাল থেকে)

ভাষা আন্দোলন : মওলানা ভাসানীর ভূমিকা

শাহ আহমদ রেজা ::

দেশে ইতিহাস বিকৃতির সুচিন্তিত অভিযান চালানোর অভিযোগ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলেই বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের মাসে আংশিকভাবে হলেও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি অসত্য তথ্য সংশোধন করাকে আমরা জাতীয় দায়িত্ব মনে করি। প্রাসঙ্গিক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৫৭ সালের জুলাই পর্যন্ত দলটির সভাপতি হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলার তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রে ও পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে সরকার গঠন করেছে (সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬)। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসনের যে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল, মওলানা ভাসানী ছিলেন তার প্রধান নির্মাতা। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাকও তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানানোর পর তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর সুরা কাফেরুনের আয়াত উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর আজকের বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব বাংলার ওপর শোষণ, বঞ্চনা ও অবিচারের সূচনা হলে প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে তিনি স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে ক্রমাগত তীব্রতর করেছিলেন। স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প হিসেবে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সংগঠিত করার মাধ্যমে মওলানা ভাসানী সমগ্র পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। স্বাধীনতামুখী সে অবস্থান থেকে জনগণকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ব্যর্থ হয়েছিল এমনকি এক পাকিস্তানভিত্তিক সমঝোতার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টাও।

১৯৪৮ সাল থেকে বিকশিত ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে মওলানা ভাসানীর ছিল বলিষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিবৃতিতে বা জনসভার ভাষণে নয়, পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পার্লামেন্ট ‘ব্যবস্থাপক সভায়’ও তিনি বাংলা ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন। যেমন প্রাদেশিক ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে মওলানা ভাসানী ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার দাবি জানিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে তিনি অবশ্য আর কথা বলার বা দাবি জানানোর সুযোগ পাননি। কারণ, স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম লীগ সরকার মিথ্যা অভিযোগে ব্যবস্থাপক সভায় তাঁর সদস্যপদ বাতিল করিয়েছিল।

ওদিকে, পাকিস্তানের জাতির পিতা ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দেয়ার পর থেকে পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানও ঢাকা সফরে এসে কথিত ‘প্রাদেশিকতার’ কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে অত্যন্ত ‘অশোভন’ আখ্যা দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মীমাংসা হইয়া গিয়াছে।’ (১৮ নভেম্বর, ১৯৪৮) তখনও পর্যন্ত আসাম মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত মওলানা ভাসানী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত মন্তব্য ও পূর্ব বাংলাবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। এভাবে বিরোধিতার মধ্য দিয়েই তাঁর সরকারবিরোধী ভূমিকার আরম্ভ হয়েছিল। ফলে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল নির্যাতন। তিনি দক্ষিণ টাঙ্গাইল থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাঁর এই নির্বাচনকে বাতিল করে দেয়। সেই সাথে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়ার ওপর আরোপিত হয় নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু সরকারের সঙ্গে আপস করার পরিবর্তে মওলানা ভাসানী আন্দোলনের পথে এগোতে থাকেন, প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম প্রভাবশালী বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আবারও বাংলা ভাষা ও কথিত ‘প্রাদেশিকতার’ সমালোচনা করলে প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ঢাকায় এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালেই আরমানিটোলা ময়দানে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভা থেকে রাষ্ট্রভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ব বাংলার দাবি তুলে ধরা হয়। আন্দোলন দমন করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর মওলানা  ভাসানীকে গ্রেফতার করে সরকার।

লিয়াকত আলী খানের হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্তি পেয়ে ঢাকা সফরকালে ঢাকার সন্তান খাজা নাজিমউদ্দিনও উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতার পাশাপাশি তিনি মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধেও কঠোর বক্তব্য রেখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতের চর’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য পাকিস্তানের সংহতি নষ্ট করা। জবাবে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, জনগণ মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে বলে এবং নিজেদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে পড়তে শুরু করেছে বলেই খাজা নাজিমউদ্দিন বেসামাল হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ‘আবোলতাবোল’ অভিযোগ আনছেন।

খাজা নাজিমউদ্দিনের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে সর্বস্তরের বিশিষ্ট নাগরিকদের এক সভায় গঠিত হয়েছিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। ৪০ সদস্যবিশিষ্ট সে কর্মপরিষদের এক নম্বর সদস্য ছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা শাখা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি আবুল হাশিম ও আতাউর রহমান খানের মতো প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত নেতাদের পাশাপাশি অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও আবদুল মতিনের মতো ছাত্র ও যুবনেতারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ঢাকা নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪ ফেব্রুয়ারি যে ধর্মঘটের এবং সভা ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে সে সবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছিল। একাধিক বিবৃতি ও ভাষণে মওলানা ভাসানীও কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রাজধানীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সেদিন পাঁচ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয় এবং দীর্ঘ মিছিল নিয়ে বিক্ষোভ করে। বিকেলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় দেয়া ভাষণে মওলানা ভাসানী পূর্ব বাংলার সঙ্গে মুসলিম লীগ সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার কঠোর সমালোচনা করেন এবং রাষ্ট্রভাষার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ১৫০ নম্বর মোঘলটুলিতে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে সেটা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না- এই প্রশ্নে দীর্ঘ বিতর্ক চলে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে অলি আহাদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। তাকে সমর্থন জানিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, যে সরকার গণআন্দোলনকে বানচাল করার জন্য অন্যায়ভাবে আইন প্রয়োগ করে সে সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করে মেনে নেয়ার অর্থ স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করা। মওলানা ভাসানীর এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ওই সভার এক প্রস্তাবেই ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এক মাসের জন্য সব মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।

চরম উত্তেজনাপূর্ণ সে পরিস্থিতিতে ঢাকার ৯৪ নম্বর নবাবপুরে অবস্থিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের জরুরি সভা। এতে দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে বেশি ভোট পড়লেও পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছিল। সে মিছিলের ওপরই গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। আগের কর্মসূচি অনুযায়ী মওলানা ভাসানী এ সময় ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রদেশের বিভিন্নস্থানে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সাংগঠনিক সফরে ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার খবর জেনেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন। ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের মতে তিনিই জানাজার নামাজে ইমামতি করেছিলেন। অন্যদিকে আরেক ভাষা সৈনিক গাজীউল হক বলেছেন, তিনি মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সমর্থক সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ লিখেছিল, ‘মেডিকেল কলেজের সম্মুখে তিনি (অর্থাৎ মওলানা ভাসানী) লক্ষ লোকের একটি গায়েবানা জানাজায় নেতৃত্ব করেন।’ (বশীর আল হেলাল, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, পৃ- ৩৭৪-৩৭৭)

২২ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ঢাকায় যাহা ঘটিয়াছে তাহার নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নাই। কোন সভ্য সরকার এরূপ বর্বরোচিত কান্ড করিতে পারে দুনিয়ার ইতিহাসে তার নজির খুঁজিয়া পাই না।… আমি মোমেনশাহী, পাবনা, কুমিল্লা সফর করিয়া গতরাত্রে ঢাকায় ফিরিয়া যাহা দেখিলাম তাতে আমার কলিজা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। নূরুল আমীন সরকার অবশেষে জাতির ভবিষ্যৎ ছাত্রসমাজকে দমাইবার জন্য চরম পন্থা অবলম্বনে মাতিয়াছে।… আমি দাবী করি, অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হউক, পুলিশী গুলীর তদন্ত করার জন্য হাইকোর্ট জজ ও জনপ্রতিনিধি নিয়া গঠিত কমিশন নিযুক্ত করা হউক। আমি অপরাধীদের প্রকাশ্য বিচার দাবী করিতেছি। এই ব্যাপারে যাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাদের মুক্তি দেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হইয়াছে অবিলম্বে তাহা প্রত্যাহার করা হউক। সর্বোপরি শহীদদের পরিবার-পরিজনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হউক।…’ (মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

ভাষা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সরকার অসংখ্য ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করেছিল। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে জারি করেছিল গ্রেফতারি পরোয়ানা। মওলানা ভাসানী আদালতে হাজির হয়ে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন ১০ এপ্রিল (১৯৫২)। কারাগারেও তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রভাষা ও স্বায়ত্তশাসনসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং আন্দোলনকালে গ্রেফতার করা রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি আদায়ের জন্য মওলানা ভাসানী এ সময় নতুন ধরনের অনশন শুরু করেন। সারাদিন তিনি রোজা রাখতেন অর্থাৎ পানাহার করতেন না। অনশন ভাঙতেন সন্ধ্যার পর। তাঁর অনুপ্রেরণায় অন্য অনেক বন্দীও একইভাবে অনশন করতে থাকেন। রাজবন্দী অলি আহাদ ও ধনঞ্জয় দাশ লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর পরামর্শে তারা ৩৫ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং এর ফলে কারাগারের ভেতরে-বাইরে বন্দীদের মুক্তির জন্য আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে অনেকে মুক্তিও পেয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল। রোজা রাখার ধারাবাহিকতায় ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। এতে তাঁর শরীর খারাপ হতে থাকে, সে খবর প্রকাশিত হলে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জনমতের চাপে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মওলানা ভাসানী একদিনের অনশন করেছিলেন।

এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। সেকালের আরো অনেক নেতাও প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ নিয়েছিলেন সত্য কিন্তু তাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যেমন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা গাজীউল হক জানিয়েছেন, ‘মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ জন নেতা এই আন্দোলনের সপক্ষে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।’ (ধানসিঁড়ি সংকলন, চতুর্থ প্রকাশনা, ১৯৮০, পৃ-৫৮) এখানে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা সম্পর্কেও জানানো দরকার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার পর সমগ্র প্রদেশে যখন সরকারের বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছিল এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন যখন আরো দুর্বার হচ্ছিল তেমন এক পরিস্থিতির মধ্যেও ২৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের হায়দরাবাদ থেকে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘… ঘটনা বর্তমানে ঘটিলেও বহু পূর্বেই পূর্ব বংগে ভাষা সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিয়াছে। আমি সেই সময় একটি জনসভায়ও এক বিবৃতিতে বলিয়াছিলাম, যে-আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তদনুসারে উর্দুই হইবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।… বাংলার বুকে অবশ্য উর্দুকে জোর করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইবে না, তবে বিদ্যালয়ে আবশ্যিক দ্বিতীয় ভাষারূপে ইহা পড়ান হইবে এবং যথাসময়ে এই প্রদেশবাসীগণ এই ভাষার সহিত পরিচিত হইয়া উঠিলে প্রদেশের শিক্ষিত সমাজ ও সরকারী কর্মচারীগণ আপনা হইতেই ইহা পড়িতে ও লিখিতে শুরু করিবে। তখন উর্দু তাহাদের নিকট গৌরবজনক মর্যাদাই লাভ করিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানীরাও দুই ভাষাভাষী হইবে।…’ (দৈনিক আজাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এই বক্তব্যের কঠোর বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্রে জনাব সোহরাওয়ার্দীর এক বিবৃতি দেখিয়া আমরা অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম। উহাতে তিনি পরোক্ষভাবে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্য ওকালতী করিয়াছেন।… উহাতে তাহার ব্যক্তিগত অভিমতই প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া বুঝিতে হইবে এবং আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিতেছি যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহিত না হওয়া পর্যন্ত এবং সরকার কর্তৃক কার্যকরী না করা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাইবে। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার দাবী করা হইয়াছে এবং এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার পর হইতেই আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার জন্য আন্দোলন করিয়া আসিতেছি।’ (দৈনিক আজাদ, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

বলা দরকার, দলের পাশাপাশি মওলানা ভাসানী নিজেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে তাঁর অব্যাহত দাবি ও চাপের কারণেই ১৯৫৬ সালে রচিত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

ই-মেইল: shahahmadreza@yahoo.com

 

ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর : ট্রাম্পের জন্য উদাহরণ

সুধা রামচন্দ্রন ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তার ভাষায় ‘দুর্বৃত্ত, মাদক ব্যবসায়ী এবং ধর্ষণকারীদের’ দূরে রাখতে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ৩,২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘মহা, মহা প্রাচীর’ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেটা মোটেই নতুন কোনো আইডিয়া নয়। আরো অনেক দেশ- এগুলোর কেউ কেউ ইসলামফোবিয়া বা  ইসলামভীতিতে তাড়িত হয়ে- অবৈধ অভিবাসী, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে তাদের প্রতিবেশীদের সীমান্তে বেড়া দিয়েছে।

এসব দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিলে ট্রাম্প ভালো করবেন। এসব বেড়া বা প্রাচীর কেবল বিশেষভাবে অকার্যকরই হয়নি, এগুলোর নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা করা অর্থ ও মানব-জীবনের দিক থেকে বিপুল ব্যয়বহুল।

ভারতের উদাহরণটি বিবেচনা করুন। দেশটি তার প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাচীর দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তে ভারতের প্রাচীর দেওয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা। প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্তটি সামনে আসে ১৯৮০-এর দশকে। তখন আসাম রাজ্যে বাংলাদেশীদের অভিবাসন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিস্ফোরক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ ৪,০৯৭ কিলোমিটার ‘ছিদ্রযুক্ত, ঝাঝরা’(পোরাস বর্ডার) সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত সমভূমি, নদী, পাহাড়, ধান ক্ষেত দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে। এই সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বাসকারী লোকজন নানাভাবে আন্তঃসীমান্তের বা এপার-ওপার মিলিয়েই সম্পর্কিত; এই সম্পর্ক কারো কারো কাছে কয়েক শ’বছরের, কারো কারো কাছে নতুন।

আট ফুট উঁচু কাঁটাতারের প্রাচীরের কোনো কোনো স্থান বিদ্যুতায়িত। এ ধরনের প্রাচীর  আছে সীমান্তের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায়; ভয়াবহ কাঠামো। কিন্তু এটা স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করা কিংবা জীবিকার নিরাপত্তার সন্ধানে দুর্গম সফর থেকে অভিবাসীদের বিরত রাখতে পারছে না। উভয় পক্ষের চোরাকারবারি, মাদক বাহক, আদম পাচারকারী, গরু কারবারিরা তাদের ব্যবসার জন্য নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে, অনেক সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের সম্মতিতেই।

হাওয়াই বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘ভায়োলেন্ট বর্ডার্স : রিফ্যুজিস অ্যান্ড দি রাইট টু মুভ’গ্রন্থের লেখক রিস জোন্স বলেন, ‘সীমান্ত বেড়া বলতে গেলে কখনোই অভিবাসন ঠেকাতে পারে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, বেশির ভাগ সীমান্ত খুবই দীর্ঘ এবং খুবই হালকাভাবে পাহারা দেওয়া। ফলে ফাঁকা স্থান দিয়ে লোকজনের চলাচলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

বাংলাদেশের এক আইনজীবী এবং অভিবাসন নির্গমনের গুরুত্বপূর্ণ সোর্স দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, প্রাচীরটা ‘পানি-নিরোধক’নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সীমান্ত যখন নদী দিয়ে চলে (সীমান্তের প্রায় ১,১১৬ কিলোমিটার হলো নদীপথে)- সেখানে কোনো প্রাচীর নেই। বাংলাদেশের সাথে আসাম সীমান্তের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার ব্র‏হ্মপুত্র নদীতে। এই নদী আবার প্রতি বছর গতি বদলায়। এই নদীতে স্থায়ী প্রাচীর দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য টহল নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে পারাপার তদারকি করা সম্ভব নয়। দুই দেশের লোকজন ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঠিকই পাড়ি দিয়ে দেয়। তাছাড়া প্রাচীরটার ‘অনেক ক্রসিং পয়েন্ট আছে, লোকজন ভুয়া কাগজপত্র কিংবা ঘুষ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে,’ জানান জোন্স। ফলে সীমান্ত প্রাচীর ‘[মানুষজনের] চলাচলের প্যাটার্ন পাল্টে দিলেও তাদের চলাচল কিন্তু থামাতে পারে না।’

ভারত থেকে সন্ত্রাসীদের দূরে রাখার ব্যাপারে প্রাচীরের সক্ষমতা প্রশ্নে জোন্স বলেন, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীরের ‘সম্ভব কোনো প্রভাব নেই।’তিনি উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসীর কাছে ‘ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করার মতো টাকা থাকে। সে সহজেই চেকপয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সে বৈধ কাগজপত্র দিয়েও ভ্রমণ করতে পারে।’

অভিবাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে প্রাচীর কেবল ‘ব্যাপকভাবে অকার্যকরই’নয়, অনেক সময় সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সহিংস ঘটনাও ঘটে। প্রাচীর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে চাওয়া লোকজনকে সীমান্তরক্ষীরা নৃশংসবাবে গুলি করে হত্যা করে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়স্কা বাংলাদেশী মেয়ে ফেলানির হত্যাকান্ড বিশ্বজুড়ে ক্রোধের সৃষ্টি করে। ২০১০ সালের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রমের সময় প্রায় ৯০০ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।

’এই সহিংসতার শিকার অনেকেই সীমান্ত বেড়া বা  প্রাচীরের  কাছাকাছি বসবাসকারীরা- তাদের জমিতে চাষ করার সময় নিহত হয়েছে,’ জানান ওই বাংলাদেশী আইনজীবী। এভাবে অনেকেই কয়েকদিন সীমান্তের ওপারে তাদের স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পর বাড়ি ফিরে আসার সময় নিহত হয়েছেন। প্রাচীর দেয়ার মতো যে কাজটি করে সেটা হলো পরিবার ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঝামেলা পাকানো। আগে লোকজন সহজেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের স্বজনদের সাথে দেখা করতে যেতে পারতো। কিন্তু প্রাচীর থাকায় এখন ‘তাদেরকে চোরকারবারিদের টাকা দিতে হয়, বিএসএফের সামনে তাদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়,’ জানান জোন্স।

তাহলে কেন বিশেষ করে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী, এমনকি বিদেশীভীতির ‘আবেদনসৃস্টিকারী’ ও এতেকরে সাফল্য লাভকারী সরকারগুলোর কাছে প্রাচীর এত জনপ্রিয়? সীমান্ত প্রাচীর আসলে ‘জাতীয়তাবাদী’ প্রতীক, জানান জোন্স। এগুলো ‘অন্য জনসাধারণকে বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত আইডিয়ার’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেলায় মুসলিম বাংলাদেশীদের কিংবা ট্রাম্পের পরিকল্পিত দেয়ালের বেলায় মেক্সিকানদের দূরে রাখার প্রতীক।

এসব প্রাচীর সরকাকে “কঠোর করে দেখায়, এমনভাবে যেন, তারা তথাকথিত ‘অবৈধ’ ও ‘বহিরাগতদের’ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী,” জানান ওই আইনজীবী। জোন্সের মতে, প্রাচীর কার্যত যা করে তা হলো, ‘ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জীবনকে আরো নিরাপত্তাহীন করে দেওয়া।’বস্তুত অভিবাসীদের দূরে না রেখে প্রাচীর ‘প্রায়ই লোকজনকে আরো বেশি সময় রেখে দেয়, সত্যিকার অর্থে সাময়িক শ্রম অভিবাসীদের স্থায়ী অবৈধ বাসিন্দায় পরিণত করে।’

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও ভারতের প্রাচীর-নির্মাণ এতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটা বাংলাদেশী জনসাধারণের চোখে ভারতের ইমেজকে ‘বড়ভাইসুলভ’ হিসেবে বিদ্রুপে পরিণত করেছে। প্রাচীর-নির্মাণকে বন্ধুসুলভ কাজ মনে করা হয় না। বরং প্রাচীরকে ‘অবিশ্বাসের প্রতীক’ বিবেচনা করা হয়, যা পারস্পরিক উপলব্ধিকে চাপা দিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাকি অংশে কাজটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত। ২০০৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ান ম্যাগাজিন হিমালের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, প্রাচীর ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রজুড়ে জনসাধারণের ঐতিহাসিক চলাচলের মুখে উড়ছে, আমাদের অতীত ও বর্তমান উভয়ের কাছে সম্প্রীতিপূর্ণ নয়, এমন কঠোর সীমান্তে পরিণত করেছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে মতবিনিময়, বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব দেশের মধ্যে বিরতিহীন ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের কাছে ছুটে গেছে। এটা ফলপ্রসূ করার জন্য আন্তঃজাতীয় সড়ক এবং রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাচীর বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রয়াসের চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী।

দীর্ঘ মেয়াদে প্রাচীর এই অঞ্চলে সাধারণভাবে এবং বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সমস্যা কেবল বাড়িয়েই তুলতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিচু দেশ। সমুদ্রের স্তর এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা সম্ভবত তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভারত তিন দিক দিয়ে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে, বেড়া এর জনগণকে কেবল ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত উপকূলীয় জেলা হলো খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট। এগুলো ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। তাদের বাড়িঘর ও শস্য পানিতে তলিয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে?

ভারত সমস্যাটির ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এটা কেবল অমানবিক হবে বলেই নয়, সমুদ্র স্তর বাড়লে বাংলাদেশের যে সমস্যা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভারতের জন্যও তা একই ধরনের বিপর্যয়কর হবে। বস্তুত, কোনো কোনো সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাথে ভারতও জলবায়ু পরিবর্তনে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের থেকে দূরে না থেকে ভারতের উচিত দেশটির সাথে সহযোগিতা করা। এ জন্য ভারতকে অবশ্যই প্রথমে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে, তা হলো- প্রাচীর তুলে ফেলা। অবশ্য প্রাচীর দেওয়ার চেয়ে তুলে ফেলা অনেক বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা স্বীকার করা দরকার, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর এসব দেশের জনগণের জন্য সামান্যই নিরাপত্তা বয়ে এনেছে; বরং এটা নিরাপত্তাহীনতার একটি উৎসে পরিণত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো ট্রাম্প কি দেয়ালের লিখন বুঝবেন?

লেখক : ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে লিখে থাকেন। (দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে বাংলা অনুবাদ)

কবি হাসান হাফিজুর রহমান : অন্তরালের এক সংগ্রামী পুরুষ

শাহ আহমদ রেজা ::

ভাষা আন্দোলনের মাসে শহীদ এবং বিখ্যাত নেতাদের পাশাপাশি সব ভাষা সংগ্রামীকেও সমান সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা দরকার। বিশেষ করে এমনজনদের, যাদের সাহসী ও সৃষ্টিশীল ভূমিকার কথা সাধারণ মানুষ জানে না বললেই চলে। কবি হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন তেমন একজন, কম আলোচিত হওয়ার কারণে যিনি আসলে অন্তরালে রয়ে গেছেন। অথচ শহীদ দিবস উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সম্পাদক হিসেবে শুধু নয়, ১৫ খন্ডে সংকলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস এবং জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছেন; যুক্ত থাকবেনও।

সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানিয়ে নেয়া যাক। মহান এই কবি ও ভাষা সংগ্রামীর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে। উপলক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচনা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্দেশে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছিল -এপ্রিল, ১৯৭৭-সালে। প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি পেয়েছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান। স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদক বা সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি ছিলেন তিনি। আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করেছিল। কারণটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি হাই কোর্টের সামনে তৎকালীন সরকার সমর্থক সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে দু’জনের মৃত্যু ঘটে। এই খবরকে কেন্দ্র করেই দৈনিক বাংলা সেদিনই একটি ‘টেলিগ্রাম সংখ্যা’ বের করেছিল। দৈনিক বাংলা ছিল ট্রাস্টের তথা সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা। সে কারণে ক্ষমতাসীনরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দুঃখ প্রকাশের আড়ালে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন শুভাকাংক্ষীরা। তার জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের শক্তিশালী যুক্তি ও অজুহাতও ছিল। কারণ, টেলিগ্রামটি বের করেছিলেন সাংবাদিকরা। হাসান হাফিজুর রহমান সে সময় অফিসে ছিলেন না। তিনি তাই সহজেই দায়িত্ব এড়াতে পারতেন। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকারের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এজন্যই সব দায়িত্ব তিনি নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলেন। ফলে তার চাকরি চলে গিয়েছিল।

হাসান হাফিজুর রহমান মাঝখানে কিছুদিন মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস কাউন্সিলর পদে চাকরি করলেও বহুদিন বেকার ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে সম্মানের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি দিয়েছিলেন। এই প্রকল্পের চারজন গবেষকের একজন হিসেবেই আমি হাসান হাফিজুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম বলে শুধু নয়, স্বাধীনতামুখী সংগ্রামে অংশ নেয়ার এবং যুদ্ধের দিনগুলোতে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার অতীত বা পটভূমি থাকার কারণেও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো; এখনো করে। এজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম স্থান নিয়ে এম এ পাস করার পর অন্য চাকরির চেষ্টা না করে রীতিমতো ইন্টারভিউ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলাম। প্রকল্পের অফিস ছিল ৮১/বি সেগুনবাগিচায়, এক ব্যক্তিমালিকের তিনতলা বাড়ির দোতলায়।

ইন্টারভিউ দিতে গিয়েই প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলাম কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। হাতে জ্বলন্ত হাভানা চুরুট ছিল তার। রসিয়ে পানও খেতেন তিনি। চা তো খেতেনই। সত্যি বলতে কি, নাম জানা থাকলেও তার কবিতা ও সাহিত্য সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না আমার। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক  দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে রচিত ‘আরও দুটি মৃত্যু’ নামের একটি গল্প অবশ্য পড়েছিলাম। ট্রেনের ভেতরে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটেছিল এক হিন্দু নারীর; সঙ্গে তার সন্তানেরও। হৃদয়বিদারক এ কাহিনীই গল্পে তুলে এনেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। অসাধারণ ছিল তার উপস্থাপনা।

অন্য একটি তথ্যও জানতাম তার সম্পর্কে। ১৯৫২ সালের ভাষা আান্দোলনে দুর্দান্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারি মিছিল করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারজন-চারজন করে ছাত্র বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কোন চারজনের পর কোন চারজন যাবেন- সেটা ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব ছিল হাসান হাফিজুর রহমানের ওপর। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সে দায়িত্ব ফেলে তিনি নিজেই গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন মিছিলে! শহীদ বরকত তার ক্লাসমেট ছিলেন। গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। গুলি ও হত্যার পর সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য সংবলিত লিফলেট লেখা ও ছাপানোর ব্যাপারেও সবার আগে ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালের শহীদ দিবস উপলক্ষে প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ও তিনিই বের করেছিলেন। নিজে এর সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা ও কোলকাতা থেকে একযোগে প্রকাশিত সংকলনটিকে পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই একটি বিষয়ে ‘দিশারী’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন হাসান হাফিজুর রহমান। সেই থেকে তাকে অনুসরণ করেই প্রতি বছর একুশের সংকলন প্রকাশিত হয়ে আসছে।

ইতিহাস প্রকল্পে যোগ দেয়ার পর হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে ধীরে ধীরে অনেক কিছু জেনেছি। যতো জেনেছি, মুগ্ধ ও বিস্মিতও ততোই হয়েছি। আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল তার ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞান ও পড়াশোনা। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তো বটেই, ১৯৬৭-৬৮ থেকে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত থাকার এবং স্বাধীনতার পর মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণেও ভেতরে-ভেতরে কিছুটা অহংকার ছিল। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার পর সে অহংকার হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। অবিশ্বাস্য ছিল তার জ্ঞানের গভীরতা- বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে। গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্ধারণী সব ঘটনা এবং ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি আলোচনা করতেন। ব্যাখ্যা করতেন ঠিক একজন শিক্ষকের মতো। তাই বলে ‘জ্ঞান’ দিতেন না; মনে হতো একজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছে। অসম্ভব আড্ডাবাজ ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে ‘বস’ ছিলেন তিনি, কিন্তু কোনোদিনই বন্ধুর চাইতে বেশি কিছূ মনে হয়নি তাকে। অন্য সরকারি অফিসের মতো ‘স্যার’ বলা নিষেধ ছিল আমাদের চার গবেষকের জন্য (অন্য তিন গবেষক ছিলেন প্রয়াত কবি সৈয়দ আল ইমামুর রশীদ, ড. আফসান চৌধুরী এবং জ আ ম ওয়াহিদুল হক)। আমরা তাকে ‘হাসান ভাই’ ডাকতাম; তার নির্দেশেই।

প্রতিদিন আড্ডা দিতে দিতে আর এটা-ওটা খেতে খেতে পার হয়ে যেতো অনেক সময়। শুনলে মনে হতে পারে যেন সমবেতভাবেই আমরা কাজে ফাঁকি দিতাম। অন্যদিকে যে কোনো বিচারে ইতিহাস প্রকল্পের অর্জন ও সাফল্য ছিল অতুলনীয়। তখন সরকারি অফিসের সময় ছিল সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত। কিন্তু আমরা, গবেষকরা কোনোদিনই অতো সকালে যেতাম না। জরুরি কোনো কাজ না থাকলে হাসান ভাইও যেতেন না। এটাই আমাদের জন্য হাসান ভাইয়ের তৈরি করা নিয়ম ছিল। ওদিকে আবার অফিস থেকে চলে যাওয়ারও নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। কতদিন যে বেরোতে বেরোতে রাত দশটাও পেরিয়ে গেছে-তার কোনো হিসাব রাখা হয়নি। এখানেই ছিল হাসান ভাইয়ের বৈশিষ্ট্য। চমৎকার কৌশলে তিনি কাজ করিয়ে নিতেন। বুঝতেও দিতেন না যে, কাজে ব্যস্ত রেখেছেন তিনি। এজন্যই আমাদের পক্ষে মাত্র বছর চারেকের মধ্যেই স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত চার লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিলপত্র এবং ১৫ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল।

এখানে ইতিহাস প্রকল্পের কাজের ধরন সম্পর্কে বলা দরকার। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, প্রকল্প থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লেখা হবে। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান নিয়েছিলেন অন্য রকম সিদ্ধান্ত। তার বক্তব্য ছিল, সমসাময়িককালে লিখিত ইতিহাসে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ কারো কারো ভূমিকাকে মহিমান্বিত করার নির্দেশ এবং চাপ ও তাগিদ থাকায় অনেকে অসত্য লেখেন। ভয়ের কারণেও কারো কারো সম্পর্কে সত্য লেখা যায় না। সুতরাং ইতিহাস লেখার পরিবর্তে বেশি দরকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও তার পটভূমি সংক্রান্ত তথ্য ও খবর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি, প্রচারপত্র ও পুস্তিকাসহ দলিলপত্র এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সেনাবাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য-বিবৃতি-বৃত্তান্ত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা, যাতে সেসবের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের গবেষকরা সঠিক ইতিহাস লিখতে পারেন। হোক ৫০ বা ১০০ বছর বা তারও পর, কিন্তু সেটা যাতে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস হয়। হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘ভূমিকা’য় লিখেও গেছেন, ‘এর ফলে দলিল ও তথ্যাদিই কথা বলবে, ঘটনার বিকাশ ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে, ঘটনা পরম্পরার সংগতি রক্ষা করবে।’

হাসান হাফিজুর রহমানের এই চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ইতিহাস প্রকল্প লেখার পরিবর্তে ইতিহাসের সোর্স বা উপাদান সংগ্রহ ও সংকলন করার নীতি অনুসরণ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. মফিজুল্লাহ কবিরকে চেয়ারম্যান করে নয় সদস্যের একটি অথেন্টিকেশন বা প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন করেছিলেন তিনি। অন্য আটজন ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। কমিটির নয়জনের মধ্যে মাত্র একজনকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে। তিনি ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক ড. এনামুল হক। অন্যরা প্রকাশ্যেই ছিলেন জিয়া, তার সরকার এবং বিএনপি’র কঠোর বিরোধী ও সমালোচক। তাদের একজন, প্রয়াত ড. শামসুল হুদা হারুন পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার সংবিধান বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন। অন্য একজন, প্রয়াত ড. সালাহউদ্দিন আহমদ বিশিষ্ট আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে ভূমিকা পালন করে গেছেন। আরেকজন, বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান- এখনো আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন। অর্থাৎ ওই প্রামাণ্যকরণ কমিটিকে দিয়ে কোনো ‘ফরমায়েশী’ ইতিহাস লেখানো সম্ভব ছিল না। চমৎকার কৌশলই নিয়েছিলেন বটে হাসান হাফিজুর রহমান!

এই কমিটির সদস্যরা প্রতিটি দলিলপত্র যাচাই-বাছাই করে তার সত্যতা ও সময়ের সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। তারা সত্যায়িত করলেই দলিলপত্রগুলো ছাপানোর যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত হতো। ইতিহাস প্রকল্প চার লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিলপত্র এবং ১৫ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করেছিল। সেগুলো থেকে বাছাই করা দলিলপত্র নিয়েই পরবর্তীকালে, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ১৫ খন্ডে দলিলপত্র এবং এক খন্ডে ফটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। দুর্ভাগের বিষয় হলো, সবকিছুর পেছনে যার চিন্তা, চেষ্টা ও পরিশ্রম ছিল সেই হাসান হাফিজুর রহমান প্রকাশনার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন (১ এপ্রিল, ১৯৮৩)। তিনি অবশ্য তিন-চারটি খন্ড বাঁধাই-পূর্ব অবস্থায় দেখে গেছেন। পর্যায়ক্রমে অন্য তিনজন ব্যক্তি পরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেও প্রতিটি খন্ডে সম্পাদক হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমানের নামই রাখা হয়েছে। কারণ, আমাদের মাধ্যমে সব কাজ আসলে তিনিই সেরে গিয়েছিলেন। বাকি ছিল শুধু ছাপানো এবং বাঁধাই শেষে বিক্রি ও বন্টনের ব্যবস্থা করা।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে আরো কিছু কথা না বললেই নয়। তিনি শুধু আড্ডাবাজই ছিলেন না, ছিলেন অতিথিপরায়ণও। বাংলাদেশের এমন কোনো বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম বলা যাবে না, যিনি ইতিহাস প্রকল্পের ওই অফিসে যাননি; গিয়েছেনও অসংখ্যবার। সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, ফয়েজ আহমদ, নির্মল সেন, ফজলে লোহানী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী- কতজনের নাম বলবো? এদের মধ্যে জনাকয়েক ছিলেন, যারা যেতেন দু-একদিন পরপরই। এর কারণ ছিল অফিসের ঠিক সামনে, উল্টোদিকে অবস্থিত ‘চিটাগাং হোটেল’-এর সুস্বাদু খাবার। রুই আর চিতল মাছের পেটি এবং বিরাট বিরাট কই মাছের ঝোল দিয়ে প্লেটের পর প্লেট ভাত গোগ্রাসে খেয়েছেন তারা। পকেট খালি হয়ে গেলেও হাসান ভাইয়ের মুখে সব সময় দেখতাম তৃপ্তি আর সন্তুষ্টির হাসি। অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পেতেন তিনি। সাধারণভাবেও কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের লোকজনকে সাহায্য করতেন হাসান হাফিজুর রহমান। যেমন শুধু সাহায্য করার জন্যই প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদারকে ইতিহাস প্রকল্পে চাকরি দিয়েছিলেন তিনি। হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার এবং তার পক্ষে এর-ওর কাছে যাতায়াত করার বাইরে ত্রিদিব দস্তিদারকে অফিসের তেমন কোনো কাজ করতে হয়নি। ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের স্মৃতিচারণে জেনেছি, ছাত্রজীবনেও একই রকম আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। দশ টাকা ধার করে বন্ধুদের পেছনে খরচ করার পর অন্য কারো কাছ থেকে দু’টাকা ধার করতেন তিনি, আবারও দশ-বিশ টাকা ধার করার জন্য কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে! ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনটিও তিনি ধার করেই ছাপিয়েছিলেন। ‘তাঁর স্মৃতি’ শিরোনামে এক নিবন্ধে ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, “…‘একুশে ফেব্রুয়ারী’- হাসানের মহত্তম অবদান- বের হল, প্রশংসিত হল, বাজেয়াপ্ত হল। আমরা উত্তেজিত হলাম। কিন্তু প্রেসের বাকি শোধ হল না। এ নিয়ে হাসান খুব বিপদগ্রস্ত হলেন। অপমানিত হয়ে একদিন বাড়ি চলে গেলেন। হয় জমি নয় গুড় বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরে এসে দায় থেকে উদ্ধার পেলেন।” (স্মারক গ্রন্থ ‘হাসান হাফিজুর রহমান’, ১৯৮৩; পৃ- ৩৯০-৯৩)

আসলেও মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিলেন ‘হাসান ভাই’, কবি হাসান হাফিজুর রহমান । বিশেষ করে ইতিহাসের ব্যাপারে তার সততা, আন্তরিকতা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম ছিল অতুলনীয়। একই কারণে ইতিহাসও তাকে অমর করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতামুখী সংগ্রামের প্রথম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একে কেন্দ্র করে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। ১৫ খন্ডে সংকলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সম্পাদক হিসেবেও তিনিই দায়িত্ব পালন করেছেন। এভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তো বটেই, জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছেন- কবি হাসান হাফিজুর রহমান।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

ই-মেইল: shahahmadreza@yahoo.com

সরকারী তথ্যের সাথে মিল নেই আসল বাজারদরের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

খাদ্যের সংকট নয়, খাদ্য কেনার ক্ষমতা লোপ পেলেই দুর্ভিক্ষ ঘটতে পারে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ উপমহাদেশে সংঘটিত দুটি দুর্ভিক্ষের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, সে সময় খাদ্যের সংকট নয়, বন্টন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং খাদ্য কেনার ক্ষমতা না থাকায় বিপুলসংখ্যাক মানুষ খাবার না খেতে পেরে মারা গেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্যের কোনো সংকট নেই, রয়েছে খাদ্য কেনার সক্ষমতার অভাব। তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয় যে, দুভিক্ষ ঘটতে পারে। তারপরও দ্রব্যমূল্য বেড়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে- যেখানে মানুষ তার খাদ্য তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ি ভাড়া থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষকে এটি করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্য দিন দিন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় সবকিছুই যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

বিদায়ী ২০১৬ সালে দেশে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। ব্যয়বৃদ্ধির এই হার আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এ সময়ে পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। পরিবারের মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে পণ্য বা সেবার ওজনের ভিত্তিতে জীবনযাত্রা ব্যয়ের এই হিসাব নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে কর্মকান্ড পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গত বছর সব ধরনের চাল ও ডালের দাম ছাড়াও গরুর দুধ, মাংস, আদা, রসুন, চিনি, লবণ, দেশি থান কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, গেঞ্জি, তোয়ালে এবং গামছার দাম বেড়েছে। বছরজুড়েই অনিশ্চয়তা ছিল সেবা সার্ভিসের মধ্যে গ্যাস ও পানি নিয়ে। একদিকে শহরে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তার আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে বাসা ভাড়া পরিশোধে। সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সেবা সার্ভিসের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যাতায়াতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছেই।

সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই বাজারের। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কীভাবে কে ছে বা কমে, তা কারো বোধগম্য নয়। শুধু চালের দামই প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে। শুধু খাদ্যপণ্যের দাম নয়, ওষুধের দামও বাড়তির দিকে। গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে, বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৪৮০ টাকা কেজি দরে। মাছের দাম বাড়তি, বেড়েছে গরীবের আমিষের উৎস বয়লার মুরগীর দামও। ভোজ্য তেলের দামও কোনো কারণ ছাড়াই বেড়েছে। চিনির বর্ধিত দাম এখনো বহাল রয়েছে। এসবের কোনো উল্লেখ নেই সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অর্থনীতি। অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে একটি কায়েমী স্বার্থান্ধ চক্র গড়ে উঠেছে, যার কারণে সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাত্ত্বিকভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলতে আমরা রাজনীতি ও অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে বুঝে থাকি। অন্য কথায়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া অর্থনৈতিক দুষ্কর্ম পরিচালিত হতে পারে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য অপতৎপরতায় লিপ্ত হতে পারছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া কখনোই আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, মধস্বত্বভোগী বা খুচরা বিক্রেতারা কোনো ফন্দি বাস্তবায়ন করতে পারে না।

সাধারণ মানুষ আজ কোনদিকে যাবে তা ভেবে দিশেহারা। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের তো দৈনন্দিন জীবন রক্ষা করাই দায়; মুটেমজুর, কামার-কুমার, কৃষি ও দিনমজুর তদুপরি ছিন্নমূল মানুষের কথা তো লেখাই বাহুল্য। ভালো নেই কৃষকরাও। বারবার বাম্পার ফলন ফলিয়েও বাজারে গিয়ে প্রতারিত হতে হচ্ছে তাদের। তারা না পাচ্ছেন ধানের দাম, না চালের। না পাট বা অন্যান্য ফসলের- যেমন শাকসবজি, তরিতরকারি। প্রায় সব স্থানেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম প্রবল। মিল ও চাতাল মালিকদের খপ্পরে পড়ে কৃষক একদিকে যেমন ধান-চালের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে বাজারে গিয়ে উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে খোরাকির চাল। গত কয়েক মাসে মোটা চালসহ সবরকম চালের দাম বেড়েছে। মাঝখানে একবার সরকার সীমিত পরিমাণে চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্থগিত করে সিদ্ধান্ত। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তসহ বিরূপ আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চালের বাজারে।

শাকসবজি, আটা, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিমের দামেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমানে বাজারে এমনকি আদা-রসুন-পেঁয়াজ ও অন্যান্য মশলার দামও বাড়ছে। বার্ড ফ্লুর প্রকোপে ছোটবড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই ডিম ও ব্রয়লারের বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপক অস্থিরতা। গবাদিপশু ও দুধের ক্ষেত্রেও তাই। মাছও দুর্মূল্য-সহজলভ্য না হওয়ায়। ফলে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রোটিন ঘাটতি। চাল ও আটার দাম বাড়ায় এখন শর্করার ঘাটতিও অনিবার্য। ফলে দু‘বেলা দু’মুঠো খেয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই বর্তমানে রীতিমতো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমিত পরিমাণে ন্যায্যমূল্যে চাল ও আটা বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সুযোগ পৌঁছায় না সর্বত্র। কেবল রাজধানী ও নগরজীবনেই সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলে ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটাজাতীয় কিছু সামাজিক কর্মসূচি চালু থাকলেও সেসব সর্বত্রগামী-এমন কথা বলা যাবে না; এরও একটা দলীয় বিবেচনা আছে। ফলে গণমানুষের দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা বাড়ছেই। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নিজেদের কৃষি ও কৃষকবান্ধব বলে পরিচয় দেয়। দেশব্যাপী দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচিতেও তাদের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে। তবে কৃষকদের ধান-চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণসহ সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ-আয়োজন চোখে পড়ে না। গত কয়েক বছরে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি তো দূরের কথা, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে পুরনোগুলোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনিবার্য বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। মাঝখানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে সক্রিয় করে তোলার কথা শোনা গেলেও আশব্যঞ্জক অগ্রগতি নেই।

বিশ্লেষকদের দাবি, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কী সে হিসাব নেই সরকারের কাছে। নেই আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্যও। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় রেখে সারা বছর বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও সরকার গড়ে তোলেনি। জরাগ্রস্ত সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও নখদন্তহীন। পাস হয়নি প্রতিযোগিতা আইন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পণ্যের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে থাকতে হবে। আগাম ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পর তৎপরতা দেখালে চলবে না, এজন্য বছরজুড়েই পণ্যের দামের ওপর নজরদারি রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কত, উৎপাদন কত হবে, কী পরিমাণ আমদানি করতে হবে, কোন দেশে কোন পণ্য পাওয়া যাবে, দাম কেমন হবে- এসব বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছে। ব্যবসায়ীরা যে যার মতো আমদানি করছেন। কখনো দরকারের চেয়ে বেশি আমদানি করে লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা, আবার কখনো কম আমদানি করে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে তারা নিজেরাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন খাদ্যপণ্যের স্থানীয় বাজার দর। আর সেই দরই সরকার মেনে নিচ্ছে। তাই ভোক্তা অধিকার আইন করে, পরিবেশক প্রথা চালু করে, মোবাইল কোর্ট বসিয়েও খুচরা পর্যায়ে দাম ঠিক রাখা যাচ্ছে না। মোটকথা, সরকারের সদ্বিচ্ছার অভাবই হচ্ছে  এর মূল কারন।