Home » সম্পাদকের বাছাই (page 3)

সম্পাদকের বাছাই

বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

জমো  সানদারাম ও আনিস চৌধুরী ::

আয় ও সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ – উভয় ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই বেড়েছে। বিশ শতকজুড়েই, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মোটা দাগে বৈষম্য ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, এতো ব্যাপক বৈষম্য  মানব ইতিহাসে আর কোনো কালেই ছিল না।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ দখল করে আছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক মাত্র ১২ ভাগ আয়ের অধিকারী। ইউরোপে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ পেয়েছে ১৮ ভাগ, নিচের অর্ধেক পেয়েছে ১৪ ভাগ।

অক্সাফামের ‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৮২ ভাগ চলে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের হাতে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব যারা অর্ধেকে রয়েছে তারা প্রায় ৩.৭ ভাগ মানুষ বলতে গেলে কিছুই পায়নি। ইতিহাসে ২০১৬ সালেই সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি দুদিনে একজন করে বিলিওনিয়ার সৃষ্টি হয় ওই বছরে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বাড়ে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, বৈষম্য বৃদ্ধি যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা ও সমাধান করা না হলে এটি নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

‘দি গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্র্যাসি ২০১৭ : এক্সপ্লোরিং ডেমোক্র্যাসিস রেসিলেন্স’ ধারণা করছে, বৈষম্য গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। বৈষম্যের ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, সামাজিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত করছে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও সমর্থন ধসিয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অগ্রগতির পথে বাধা :

আলেক্সি ডি টকভিল বিশ্বাস করেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে, সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণ সমাজে আয় ও সম্পদের মারাত্মক বিভেদের ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি উন্নতিতে তেমন কিছু করা না হয় বা অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক সাম্যের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ ধনীরা অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব রাখে ও কবস্তার করে,  গরিবরা এই ধরনের সুযোগ পায় না।

আর অমর্ত্য সেনের মতে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গরিবের ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ বা ‘সামর্থ্য’ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। যাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকে, তারা কেবল ইতিবাচক পুনঃবণ্টনেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, সেইসাথে তাদের নিজেদের অনুকূলে বিধিবিধান ও নীতি প্রণয়ন করে নেয়।

রবার্ট পুটনামের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আস্থার’ মতো নাগরিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

যোশেফ স্টিগলিসের মতে, বৈষম্য বাড়লে সামাজিক কাঠামো এবং সংযোগ শিথিল করে দেয়। সবক্ষেত্রে আস্থা হ্রাস, উদাসীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ প্রশ্নে আগ্রহের অভাব ও স্বভাব রুক্ষতা-কটুতা বাড়ায়। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ায়, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়ও নি:শেষ করে, সমাজবিরোধী আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অর্থপূর্ণ গণতন্ত্রের প্রয়োজন সামাজিক বিষয়াদিতে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তভুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মেরুকরণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ফাঁপা করে তোলে, নাগরিক সম্পৃক্ততা হ্রাস করে।

লোকরঞ্জকতা বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ হুমকি সৃষ্টি করে বহুত্ববাদকে। আলেক্সি ডি টকভিলের  কাছে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য গণতন্ত্রের ‘সাম্য’ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে, এমনকি উচ্চ আয়ের সমাজেও তা হতে পারে। ‘ধনবাদী লোকরঞ্জকবাদ বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বশেষ পরিচিতি রাজনীতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে।

জনসমাবেশ আর মিডিয়া ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য ‘অন্যদের’ তথা অভিবাসী ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন লোকদের দায়ী করে। অর্থাৎ ধনিকশ্রেণি  সুযোগ-সুবিধা ও ‘বিভক্ত করে শাসন করার’ চলতি পদ্ধতির ‘অধিকার’ ব্যবহার করে ‘তাদের জনগণকে’ সন্তুষ্ট রাখতে সফল হয় প্রায়ই।

মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে তারা প্রায়ই ধনিকতন্ত্র শাসনকে আড়াল করে রাখে, এমনকি সবচেয়ে জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে অনেক সময় সাফাইয়ের ব্যবস্থাও করে। যেমন নির্বাহী পদে থাকাদের ‘উচ্চ পারিতোষক’, টাইকুনদের উদারভাবে কর হ্রাস, বিনিয়োগ ইনসেনটিভ। আর এসবই করা হয় সামাজিক ব্যয় ও গণপরিষেবার ব্যয় ছাঁটাই করে।

বর্তমানের ‘বিজয়ী সবই নেবে’ বা “winner – take -all” এর মাধ্যমে  অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সফলভাবে লবি করে কর হার কম রাখতে সক্ষম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় থেকে এক শতাংশের হাতেই সর্বোচ্চ মাত্রায় আয় পঞ্জিভূত হচ্ছে।  আর ১৯৮০ সাল থেকে তলানিতে থাকা অর্ধেক আমেরিকান মোট প্রবৃদ্ধির মাত্র ৩ ভাগ অর্জন করতে পারছে। আধুনিক সময়ে এত ব্যবধান আর কখনো দেখা যায়নি।

অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে শীর্ষে থাকা ০.০১ ভাগ তথা ১৪ হাজার আমেরিকান পরিবার মার্কিন সম্পদের ২২.৩ ভাগের মালিক ছিল। আর নিচে থাকা ৯০ ভাগ তথা ১৩৩ মিলিয়ন পরিমার মাত্র ৪ ভাগের মালিকছিল। সবচেয়ে ধনী ১ ভাগ এক প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন আয়ে তাদের অংশ তিনগুণ করতে সক্ষম হয়।

একদিকে আইনগত ও অন্যান্য সংস্কার, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সবই ক্ষমতা বা প্রভাববঞ্চিতদের ভয়াবহ বিপরীত অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্প-আয়ের আমেরিকান পরিবারগুলোর ৭০ ভাগের বেশি আগের বছরের তুলনায়  ফৌজদারি মামলায় বেশী জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের ৮০ ভাগের বেশি পরিবার আইনগত সুবিধাও তেমন পাচ্ছে না।

তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়ায় তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়া ও বাদ পড়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেক আমেরিকান মোহমুক্তি ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে এই তারাই আবার ‘অন্য’ তথা আমদানি ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উগ্র দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতিতে অনেক বেশি সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।

নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়ারা

আনু মুহাম্মদ ::

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর পৃথিবীর বহুদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। বছরে বছরে এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চতাই বেড়েছে কেবল। এবারের নির্বাচন নিয়েও তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে নজরদারি, পরিবেশবিধ্বংসী প্রান্তস্থ পুঁজিবাদের বিকাশকালে জনগণের জীবন ও অধিকারের সীমা কেমন হতে পারে, উন্নয়নের নামে মুনাফা ও দখলদারিত্ব বিস্তার কী চেহারা নিতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ নির্বাচন তো বটেই, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। নির্বাচনের প্রতি ক্ষমতাবানদের অনীহা ও ভয় প্রকাশিত হচ্ছে বহুভাবে। এমনকি সামরিক শাসন থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাতেও শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বাচন-সন্ত্রস্ত চেহারা প্রকাশিত।

নির্বাচন বিষয়টি কী রকম পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তার একটি প্রমাণ নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ ও বাস্তব চেহারা। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুনে বড় দলের প্রার্থীরাসহ সবাই হাসে। সবাই জানে যে, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী তাদের বড় অংশ এই আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছে। এর একশ’গুণ খরচও অনেকের কাছে অপ্রতুল মনে হতে পারে। বড় দলের প্রার্থীদের টাকার কোনো অভাব নেই। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্য খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও কম ব্যয়বহুল নয়। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা একটা বিরাট সাধনা ও ধরাধরি শুধু নয়, অনেক টাকারও বিষয়। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক-শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এই অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’ ভদ্রভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহুগুণে ফেরত নিয়ে আসাই এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে, তার কারণগুলোর সারসংক্ষেপ করা যায় নিম্নরূপে:

প্রথমত, দুর্নীতি, লণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথ এর সুবিধাভোগীদের কখনও সুস্থির হতে দেয়নি। একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও  উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সাংসদদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ”এক নেতা এক দল’ নীতি” কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্বসংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে। এখন তার সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ভারত রাষ্ট্র ও সে দেশে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ পুঁজি। ১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী, ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর, বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত ‘নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতাবন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। ‘ক্রসফায়ারে’র মতো পদ্ধতি এই তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে এসব বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চতুর্থত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরও বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সবকিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত যা ‘সেবা খাত’ নামে পরিচিত, তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশন নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বাড়ছে, আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ও পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য; শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব।

পঞ্চমত, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, তত রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুই ধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে।

ষষ্ঠত, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপ-সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী। দেশের নীতিনির্ধারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল, তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবেন কোত্থেকে? শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে?

এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে না; একমাত্র তখনই নির্বাচন প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা। গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী।

মন শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধির নির্বাচন কমিশনের দাওয়াই

আমীর খসরু ::

অনেকেই প্রত্যাশার পারদ উপরে উঠিয়ে এমনটা ধারণা করেছিলেন যে, বিএনপিসহ বিরোধী দল ও পক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে নির্বাচন কমিশনে কর্তাব্যক্তিদের – মন মস্তিষ্ক ও মনোজগতে সামান্য হলেও একটা ঝাকুনি লাগলেও লাগতে পারে। কারো কারো এমনটাও মনে হয়েছিল যে, পুরো নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে জনমনে যে বদ্ধমূল  নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে – তা বদলের চেষ্টায় হলেও তারা অন্তত ‘কিছু একটা করবে’ এবং সেটি হবে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব প্রত্যাশা উল্টিয়ে, ‘যা আগে ছিল তাই পরে রয়ে গেল’। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিটি করপোরেশনের সময়ের মন্তব্যের পথ ধরে একজন নির্বাচন কমিশনার এবার আগে ভাগেই আগামী নির্বাচনটি কেমন হতে পারে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আগাম জানান দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর কোনো দেশে শতভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হয় না, বাংলাদেশেও হবে না’’। (প্রথম আলো- ১৬ নভেম্বর)। এর আগে-পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শোনানো হলো নিয়ম-নীতির নামে নানা নসিহত। নির্বাচন কমিশন সচিব ১১ নভেম্বর স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিলেন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ভোট কেন্দ্রের ছবি তুলতে পারবেন না, সংবাদ মাধ্যমের সাথে নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া, মতামত প্রকাশ, এমনকি আনুষ্ঠানিক কথা পর্যন্ত বলতে পারবেন না। তাদের ‘মূর্তির মতো’ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই ধারায় আরও কয়েক দফা নীতিমালা ঘোষণা করা হলো পর্যবেক্ষকদের জন্য। সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্যও ইতোপূর্বে এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই যেসব নিয়মনীতি ও নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে-তাতে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদেরও সরাসরি ‘মূর্তি’ হতে না বললেও প্রায় ‘মূতির্’ হওয়ার নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এবার চোখ পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপরেও।  নির্বাচন কমিশনের সচিব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যাতে তারা ভাষায় ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য ওই মাধ্যম মনিটর করা হবে। সরকার কথিত ‘প্রোপাগান্ডা’রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে; নানা বিভাগ ও নানা উদ্যোগে এ কাজটি কৌশলে বহুদিন ধরে করা হচ্ছে। সম্ভবত নির্বাচন কমিশন এতেও নিশ্চিত হতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কাকে প্রোপাগান্ডা বলছে ও বলবে। এবং এর মাপকাঠি কি? ইতোমধ্যে কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, কিছুসংখ্যক সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাকে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলে দিয়েছে। তাহলে এই কর্মকর্তারাই কি ঠিক করবেন প্রোপাগান্ডা কোনটি এবং কোনটি প্রোপাগান্ডা নয় ?

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য এবং আমলা সচিবের বক্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা যা বলছেন তা তারা সহি ও সত্য কথা বলছেন বলেই মনে করাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ তারা আগেভাগেই ‘হয়তো’ জানান দিয়ে যাচ্ছেন যে, আগামী নির্বাচনটি তারা কেমন ভাবে করতে চান বা অনুষ্ঠিত হবে। তাদের এই মনোবাসনা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এই কারণে যে, ভোটারসহ দেশবাসী এবং বিদেশীরা আশাহতের বেদনায় যেন ভবিষ্যতে হঠাৎ করে বড় ধরনের নিরাশার মুখোমুখি না হন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন কেমন হতে পারে তার জন্য সাধারণ মানুষের বা আম-ভোটারের মন শক্ত ও কঠিন করার লক্ষ্যে, সহ্যক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে – মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতোই- এক ধরনের দাওয়াই দিয়ে যাচ্ছেন।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। সর্বসাম্প্রতিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তার ব্যাপারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি তালিকা দিয়ে তাদের বদলি করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু এতোদিন নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এক চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ওই কর্মকর্তাদের কোনোক্রমেই বদলি করা উচিত হবে না। এক পক্ষের দিক থেকে চিঠির পর চিঠি যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু এসব অভিযোগের ব্যাপারে কমিশন নিশ্চুপ রয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক্ষেত্রে তারা মতামত জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিটি অভিযোগই খতিয়ে দেখতে হবে’। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে পথে হাটছে না। হাটছে না যে, তার আরও উদাহরণ আছে। রাজধানীর আদাবরে ২জন এবং নরসিংদিতে ২জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে তফসিল ঘোষণার পরে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। যশোর বিএনপির একজন নেতার মরদেহ কয়েকদিন নিখোজ থাকার পরে ঢাকায় নদী থেকে উদ্ধার করা হলো এবং এক্ষেত্রে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক্ষেত্রে বরাবরের মতোই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন বলে তার কর্মসম্পাদন করেছেন। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সমর্থকদের ভিড়কে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী উচ্ছাস হিসেবে দেখেছেন; আবার বিএনপি অফিসের সামনের ভিড়কে তারা দেখেছেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফ করাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো তেমন কোনো আমলেই নিলেন না। শত শত নেতাকর্মীকে তফসিল ঘোষণার পরে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলে দিয়েছেন এই মামলাগুলো তফসিল ঘোষণার পরে হয়নি। তিনি এও বললেন, বিএনপি অনেক মামলার বিস্তারিত নথিপত্রই দিতে পারেনি। পুলিশ সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একই। তিনি জোরের সাথেই বলেছেন, পুলিশ বিনা কারনে কাউকে গ্রেফতার করেনা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব বাদ দিয়ে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের দিকেই পুরো মনোযোগী হয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায় বললেও, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন ইভিএম ব্যবহার থেকে তারা পিছপা হবেন না। যে ব্যবস্থাটির সামান্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হলো না, এমন কি জনসম্মুখে যেসব ত্রু টির কথা বলা হচ্ছে তা যে সঠিক নয়- তা জনসম্মুখে ওই ইভিএম মেশিন ব্যবহার করেই পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী পর্যন্ত না করে ‘অসীম আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে’ ইভিএম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী ভারতেও ইভিএম-এর ত্রু টি যে কতো ভয়াবহ হতে পারে, নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার ক্ষেত্রে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে বিজেপি, কংগ্রেসসহ সবদলের সামনে আম-আদমী পার্টির পক্ষ থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশনের সময়েই একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে দেখানো হয় যে, কিভাবে ইভিএম ব্যবহারে ফলাফল ম্যানিপুলেশন করা যায়।

এতোসব পরিস্থিতির মধ্যেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বাক্যটি হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। এমন প্রত্যাশার আসল অর্থ হচ্ছে এখানে যে, এই পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান নেই। অর্থাৎ এর চরম অনুপস্থিতি রয়েছে। এই চরম অনুপস্থিতির বিষয়টি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনে অনুভূত হয়নি। কারণ ওই নির্বাচনটি ’৯০ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারে সবার জন্য সমান সুযোগের অভাবটি অনুভূত হচ্ছে সব দল ও পক্ষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে। এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, যোগ্যতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হচ্ছে-একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাদের মনেপ্রাণজুড়ে ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি অনুপস্থিত বলেই জনগণ ধারণা করে নেতিবাচক এবং এ কারণে জনমনে শংকা, উদ্বেগ ভীতির সৃষ্টি হয়। এই শংকা, ভীতি ও উদ্বেগ আরও বহু গুণে বেড়ে যায় সরকারের ভূমিকার কারণে।

আর এ কারণেই জনগণ এখন পর্যন্ত আস্থাশীল হতে পারছে না যে, আগামী নির্বাচনটিতে তারা নির্বিঘ্নে, নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এটাই হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এখন পর্যন্ত প্রধান অন্তরায়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এমন পরিস্থিতির নিশ্চয়তা নির্বাচন কমিশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটাই নির্বাচন কমিশনের বড় ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের বড় সাফল্য।

সমতল মাঠ আর পশ্চিমীদের ইভিএম পরিত্যাগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. ২৪ নভেম্বর সিইসি জানালেন, “লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। পুলিশ তাদের কথা মান্য করছে। অকারনে কাউকে গ্রেফতার করছে না”। একইদিন নির্বাচন কমিশন সচিব জানান, ৬টি সংসদীয় আসনে পূর্নাঙ্গভাবেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ আসনগুলি ঠিক করা হবে দৈবচয়ন ভিত্তিতে। কমিশনের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ অনেকগুলি দলের নির্বাচনে সমান সুযোগ এবং ইভিএম ব্যবহার না করার  মূল দাবি উপেক্ষিত হলো। এর ফলে নির্বাচনের আগামী দিনগুলো কেমন যাবে- সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া একটি প্রথা। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর অন্যতম শর্তও বটে। কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বর্তমান রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বর্তমান সংসদ সদস্যরা স্বপদে থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখছে না, আগত নির্বাচনে সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে, প্রয়োগ দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, নির্বাচনকালে সংসদ নিষ্ক্রিয় থাকবে, এর কোন কার্যকারীতা দেখা যাবে না। সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের আকার ছোট করলে উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এসব কথা বলার অর্থই হচ্ছে, নামে নির্বাচনকালীন সরকার হলেও তারা অন্য সময়ের মতই সকল কাজ অব্যাহত রাখবেন,  শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন সরকারের মত রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন না।

সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা তফসিল ঘোষণার পরে থাকবে না- এমনটিও কিন্তু সংবিধানে লেখা নেই। নির্বাচনী আচরন বিধিতেও “সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না”-এমন কোন বিধানও সংযোজন করা হয়নি। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, সংসদ সদস্যদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের বক্তব্য নিছকই রাজনৈতিক। মন্ত্রী বা এমপি পদে থেকে নির্বাচন করবেন, কিন্তু কোন ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না-এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? এমন উদারতা এদেশের রাজনীতি কখনও দেখেছে? সুতরাং মুখে যাই বলা হোক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটি সবচেয়ে বড় বাধা।

পৃথিবীর বহু দেশে ইভিএম ব্যবহার হয়- এটি নির্বাচন কমিশনের যুক্তি এবং তারা সীমিত আকারে ব্যবহার করবেনই এটি এখন বাস্তবতা। মজার বিষয় হচ্ছে, ইউরোপে, জার্মানী, নেদারল্যান্ডস, ইতালী, ফ্রান্সসহ আরো অনেক দেশ ইভিএম ব্যবহার করে না। জার্মানীর সুপ্রীম কোর্ট নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকে ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে আদেশ দিয়েছেন। ইউরোপের বড় দেশগুলো ইভিএম ব্যবহার শুরু করে ‘নির্ভরযোগ্য’ নয় বলে ফিরে গেছে ব্যালটে। মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে ব্যালটে ফিরতে হবে”।

দুই. “পৃথিবীর কোন দেশে ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব হয় না। ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব নয়”-এ বক্তব্য কোন রাজনৈতিক দলের নয়, খোদ নির্বাচন কমিশনের। যদিও তারা শপথ নিয়েছিলেন এবং দায়বদ্ধ শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে এবং সেমত করার জন্য সাংবিধানিক ক্ষমতাও তাদের হাতে ন্যস্ত। যে কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সংবিধান তাদের অপার ক্ষমতা দিয়েছে, সুপ্রীম কোর্টের রায়ও কার্যকর আছে – সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে যা যা দরকার সবই তারা করতে পারবেন। সুতরাং কমিশনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠছে,  ‘নির্বাচনী যুদ্ধ শুরুর আগেই কি তারা পিছু হটছেন’?

“শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন হয় না”- এটি একটি ভুল তথ্য। অনেকের মত নির্বাচন কমিশনেরও জানা আছে, ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচন নিয়ে সামান্য কোন প্রশ্ন উঠে না। সুতরাং সাংবিধানিক পদে থেকে এমন বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করার দায় কিন্তু তাদের। সেটির বদলে বিতর্কিত ইভিএম এর পেছনে কমিশন নিয়োগ করেছেন সর্বশক্তি। এমন অকার্যকর আচরন দৃশ্যমান হয়ে উঠলে তাদের কার্যকারীতা প্রসঙ্গে গোটা নির্বাচনের সময় তো বটেই, নির্বাচনের পরেও প্রশ্ন উঠতে থাকবে।

জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা সম্ভবত: স্থায়ী হতে চলেছে। ধারণাটি হচ্ছে, সব আমলে নির্বাচন কমিশন সরকারের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ইভিএম নিয়ে তাড়াহুড়ো না করা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে সিইসি যেমনটি বলেছিলেন, “সরকার ও সংসদ চাইলে ইভিএম ব্যবহার হবে”। সরকার ও সংসদ যেহেতু এখানে সমার্থক, সেজন্য অন্যান্য দলগুলোর মতামত কমিশন বিবেচনায় নেবেন না। মানে দাঁড়ালো, সরকার চাইলেই কেবল তারা বিবেচনায় নেবেন। আর সংসদ তো কাগজে-কলমে নিষ্ক্রিয় থাকছে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সংবিধান সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রয়োজনে যে কোন আইন-বিধি জারি করার এখতিয়ার রয়েছে কমিশনের। ক্ষমতাসীন দলসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে দিক নির্দেশনা দেয়ার এখতিয়ারও আছে কমিশনের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশনা-এমনকি আকার-ইঙ্গিতেও যথেষ্ট হয়ে ওঠে কমিশনের কাছে। অতীত-বর্তমানের সকল কমিশনের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।

তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ‘উন্নয়ন তত্ত্ব’ ১৪ দলীয় জোটের শরীকদের পুনর্বার ক্ষমতায় আসাকে অনিবার্য করে তুলতে চেয়েছে। তাদের দাবি এই উন্নয়ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আবারও সরকার গঠন করতে হবে। না হলে ধারাবাহিকতা থাকবে না। একথা ২০১৩-১৪-এর প্রতিধ্বনি। সুতরাং যে কোন মূল্যে জয় চাইবে আওয়ামী লীগ। তাদের সংসদ, তাদের সরকার, তাদের প্রশাসন বজায় রেখেই হচ্ছে যে নির্বাচন, সেখানে জয় ছাড়া অন্য কিছু তাদের পক্ষে আশা করা সম্ভব নয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মত ২০০১ সালে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সেমত করেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন খুব কঠিন হবে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা সমীকরন হিসেব করে মহাজোটের আঙ্গিকে নৌকা প্রতীককে সামনে রেখেই নির্বাচন করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে আসুক- এটি তাদের জন্য খুব স্বস্তিকর নয়, সেজন্যই সতর্কতা অনেক বেশি। স্বয়ং শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন।

কারান্তরালে থাকা খালেদা জিয়াও তার দলের নেতাদের যেকোন মূল্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানেন, দোধারী ক্ষুরের ওপর রয়েছেন তিনি, এবারের নির্বাচন তারজন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ! সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে নির্বাচনের মাঠে-অতল খাদের কিনারায় এটি তাদের টিকে থাকার সবশেষ সুযোগ, খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নেতারা সেটি ভালো করেই জানেন। ফলে তাদের জন্য আগত নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, নির্বাচনকালীন সরকারের দেখা নেই, খালেদা জিয়ার মুক্তি নেই- তবুও বিএনপিকে নামতে হচ্ছে নির্বাচনে। এতো ছাড় দিয়ে, দলের অভ্যন্তরের কট্টরপন্থীদের দাবিয়ে রেখে বিএনপি কেন নির্বাচনমুখী? সাদা কথায়- নির্বাচনকেই তারা আন্দোলনের পথ হিসেবে নিয়েছে। এজন্যই নীতি ও পুরানো বৈরীতা ভুলে গিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে গঠন করেছে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। আবার ২০ দলীয় জোটের কাঠামো বজায় রাখছে তারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে এই তত্ত¡ ছিল কোথায়? নির্বাচনকে তখন আন্দোলনের পথ ভাবা হয়নি কেন? প্রতিরোধে সহিংস-রক্তাক্ত পথ বেছে নিতে হলো কেন? রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তত্ত্ব-তালাশ বা মূল্যায়ন কোনটিই বিএনপি আজতক করেনি। গত একযুগে শক্তিমান প্রতিপক্ষের ‘নিশ্চিহ্নকরণ’ চেষ্টার আত্মরক্ষায় রত থেকেছে, কর্ম আর কর্মফলের বিশ্লেষণের সুযোগ পায়নি। সেটিই কি একমাত্র কারণ?

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করতে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এখানে কোন পক্ষই পরাজয় বরণ করতে চায় না। আবার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে আকছার প্রশ্ন উঠছে, তৈরী হচ্ছে নেতিবাচক পারসেপশন। বিবাদমান পক্ষগুলি পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করদে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নির্বাহী বিভাগগুলি প্রজাতন্ত্রের হওয়ার বদলে কতটা দলীয়-সে নিয়েও নানা প্রশ্ন। এখানে রাষ্ট্র কিংবা দল বা প্রতিষ্ঠান-কোথাও গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি।

তারপরেও এই দেশের মানুষের আকাঙ্খা একটি সুন্দর নির্বাচনের, এই জনআকাঙ্খাটি সরকার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা অনুধাবন করলেই মঙ্গল।

সমান সুযোগ প্রাপ্তির জন্য কাকুতি-মিনতি

আমীর খসরু ::

প্রথমেই বিষয়টি স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন যে, মনে-প্রাণে অগণতান্ত্রিক শাসককূল এবং তাদের নানা কিসিমের তাবেদাররা বহু চেষ্টার পরে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এই ধারণাটিকে নিয়ম বা নিয়তি বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, আসলে নির্বাচনই হচ্ছে সামগ্রিক গণতন্ত্র। অর্থাৎ নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় কায়েম ও জারি হয়ে যাবে। সার্বিক ও সামগ্রিক গণতন্ত্রকে বিদায় জানিয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রহীন বা খুবই স্বল্পমাত্রার কথিত গণতান্ত্রিক শাসন- খোদ গণতন্ত্রের জন্য একটি বিশাল সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোটি নড়বড়ে করে ফেলেছে। আর এই নড়বড়ে পরিস্থিতির সুযোগে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কার্যত: অগণতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান হচ্ছে দেশে দেশে। সংকটাপন্ন নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও আরও সংকটময় করে তুলেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রও এখন বিভিন্ন দেশে কার্যত অচল অবস্থার মুখোমুখি।

ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রই কাঠামোগত এবং প্রায়োগিক সংকটকে সঙ্গী করে, বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝের অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রেরও চরম বিপন্ন ও বিপর্যস্তার কাল। এবারের নির্বাচন নিয়ে এখনো জনমনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার যে প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে- তাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কারণ এর ফলে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ বড় মাপে বদলে গেছে। একতরফা নির্বাচনের অথবা নির্বাচনে ভোটারের প্রয়োজন হয় না বলে এই জমিনে যেসব কলংকজনক ঘটনাবলী ঘটেছে ইতোপূর্বে-এটি তার বিপক্ষে এবং বলা যায়, জনগণ যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কামনা করে এটি তারই স্বপক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক হলেও আগামী নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বা রাখার চেষ্টা হচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে নিশ্চিত করার কোনো কারণ ঘটেনি। কারণ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে গেলে ক্ষমতাসীনদের ‘রুটিন ওয়ার্ক বা সরকার পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যতোটুকু না করলেই নয়’, ততোটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়; প্রশাসনের সব বিভাগকে চলতে হবে দলীয় নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক। কিন্তু বাস্তবে তা কি বিদ্যমান রয়েছে? বরং নির্বাচন কমিশনই এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি বা কমিশনও এপর্যন্ত এমত কোন নজীর সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচন কমিশনকে ‘পুরোপুরি নিরপেক্ষ’ নয় বলে আখ্যা দিচ্ছে।

আসলে নির্বাচন কমিশন কতোটা শক্তিশালী, সক্ষমতা ও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে এবং ভবিষ্যতে পারবে তার উপরই সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্ভর করে। কিন্তু যেভাবে গ্রেফতার ও নানা ধরনের মামলা চলছে, ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে একপক্ষের নেতাকর্মীদের মনে এবং সরকার ও কর্তা ব্যক্তিদের ভাষা ও ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ দেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জনআস্থা তৈরি হয় না। এমন একটি আস্থাহীনতার পরিবেশ এখনো পর্যন্ত বজায় থাকলেও সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে, প্রত্যক্ষ করতে চায়, আস্থাশীল হতে ইচ্ছুক যে, সবার জন্য সমান সুযোগ অচিরেই তৈরি হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ বিদ্যমান থাকা গণতন্ত্রে প্রতিদিনের, নিত্যদিনের বিষয় হওয়াই  বাঞ্চনীয় ও প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কয়েকটা দিনের জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি ও প্রাপ্তির জন্য ভিক্ষা চাওয়া, কাকুতি-মিনতি করা- নির্বাচনী গণতন্ত্র তো অবশ্যই খোদ গণতন্ত্রের জন্যও একদিকে যেমন সংকটের তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিশাল দুর্ভাগ্যেরও বিষয়।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’। প্রখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল-এর বিখ্যাত বই ‘‘এ্যনিমেল  ফার্ম’’-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমার নিচের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে.- ‘সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষ সমান; তবে কোন কোন রাজনৈতিক দল ও পক্ষ একটু বেশিভাবেই সমান।’ কারণ দক্ষতা, যোগ্যতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গি, আর এর বিপরীতে যারা তাদের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়- দেখার চোখও আলাদা, মন-মস্তিক এবং মনোজগতও ভিন্ন। আর এখানেই অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে।

নির্বাচন : রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

অর্ধদশকের বড়মাত্রার অগনতান্ত্রিক শাসনেরও বোধ করি ক্লান্তি আছে। সেজন্যই কী প্রাক-নির্বাচনকালে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ নেতৃত্ব একটু-আধটু গণতান্ত্রিক বাত্যাবরণ চাচ্ছিলেন? অন্তত:পক্ষে দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এটি জানান দেয়া যে, তারা আলোচনা করেছেন বিরোধীপক্ষের সাথে, হোক না তা নিঃস্ফল। কিন্তু সূচনা হিসেবে এটি একেবারে মন্দ নয়। এর মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও বোঝানো যাচ্ছে, সবকিছু একতরফা হচ্ছেনা !

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপ চেয়ে চিঠি পাঠানোর পরে সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া এই বার্তা দেয় যে, সরকার বরফ ভাঙ্গতে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আরো অনেকগুলি দল এবং জোটকে গণভবনে সংলাপের আমন্ত্রন জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘সংলাপ’ চলতে থাকে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ এবং ক্ষমতার অংশীদার তার দলের সাথেও সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে যায়।

সংলাপ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল ছিল অনেকটাই নির্ভার। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে জেলে এবং নির্বাচনে তার অংশগ্রহন নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। ভাইস চেয়ারপারসন তারেক রহমান যাবজ্জীবন দন্ডিত, লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে, নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন না। সুতরাং শর্তহীন আলোচনায় ঐক্যফ্রন্ট উত্থাপিত সাতদফার একটি দাবিও না মেনে পরপর দু’দফায় সংলাপ শেষ করে ক্ষমতাসীনরা এক ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্ত্ইি বাগালেন বটে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রশ্ন অনেকগুলো। নির্বাচন কী যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে? ইতিমধ্যে সাত দিন পিছিয়েছে। পুণ:তফসিল ঘোষিত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের দাবি আরো তিন সপ্তাহ পেছানোর। আওয়ামী লীগও জানিয়ে দেয়, নির্বাচন আর পেছানো যাবেনা। একদিনও নয়, এক ঘন্টাও নয়। নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট জানিয়েছে, তারিখ পেছানো হবেনা।

তারপরেও কী নির্বাচন কাঙ্খিত মান অর্জনে সক্ষম হবে? জনতুষ্টিরওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিশন কতটা অনড় থাকতে পারবে, সকল চাপ-তাপ উপেক্ষা করে? আপাতত: এর উত্তর হচ্ছে, না। সে পরীক্ষার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, সিটি-কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ফলে তফসিল ঘোষণার পরেও আশঙ্কা বাড়ছে। মামলাসহ, প্রতিপক্ষ দমন প্রবৃত্তির অব্যাহত ধারা দেখে।

গত কয়েক দশক ধরেই রাষ্ট্র-সমাজ বিভাজিত। প্রতিহিংসা পরায়নতায় যে অবস্থান সমাজে তৈরী হয়েছে, তার পরিনতি দেখি নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হওয়ার পরে। কি ভয়ঙ্কর তান্ডব নেমে আসে জনগোষ্ঠির ওপর, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী- সমর্থকদের ওপর- তা বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করছে ২০০১ সাল থেকে। এ কারনে একটি চমৎকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর ভয় কিংবা ক্ষমতায় না যেতে পারার আক্ষেপ!

ক্ষমতাসীনদের একটি হিসেবে বোধ করি গরমিল হয়ে গেছে! তারা ধরে নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেকের বিষয় সুরাহা না করে বিএনপি নির্বাচনে আসছে না। তারা এও সম্ভবত আশা করেছিলেন, এবার নির্বাচনে না এলে বিএনপিতে ভাঙ্গন দেখা দেবে এবং নেতা-কর্মীদের ভাগিয়ে আনা যাবে। বাস্তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়া এবং এর বড়  শরীক হিসেবে বিএনপি’র নির্বাচনে আসা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার ঘোষণা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী কৌশল পাল্টে দিয়েছে। তারা আবারও মহাজোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, ক্ষমতা ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে।

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনী পরিবেশ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না করেই, এমনকি সাত দফার প্রায় কোন দফা না মানার পরেও নির্বাচনে যেতে হচ্ছে বিএনপিকে। কারন, এই মূহুর্তে তাদের আর কোন বিকল্প নেই। একটি নির্বাচনমুখী দল হিসেবে এখন তারা যে ট্রাকে রয়েছে, তার বাইরে তাদের কর্মী সমর্থকদের আবেগকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। নির্বাচন ও আন্দোলন-এই দুইফ্রন্ট খোলা রাখার ঝুঁকি বিএনপিকে নিতেই হচ্ছে। যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ২০১৩-১৪ সালে, সেখান থেকে বেরোনোর এটিই তাদের সর্বশেষ সুযোগ।

যে কোন জাতীয় নির্বাচন আসলে নাম সর্বস্ব ক্ষুদ্র দল, গোষ্ঠি ও ব্যক্তিদের তৎপরতা শুরু হয়। ধর্মকেন্দ্রিক দলগুলোর সক্রিয়তাও হয়ে ওঠে লক্ষ্যণীয়। বড় দলগুলো নানা লোভ- টোপ ফেলে তাদের সাথে জোটবদ্ধ হয় অথবা সরাসরি দলে টেনে নেয়। এক্ষেত্রে এরশাদেও অবস্থান সবচেয়ে সুবিধাজনক। রাজনীতির মল্লযুদ্ধে বড় দুই দলের অবস্থান দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি, আবারও ফিরেছেন মহাজোটে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত হয়েও তিনি ও তার দল ছিলেন ক্ষমতার অংশীদার, আবার সংসদের বিরোধী দলও বটে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শক্তি বিএনপি। আবার বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে ২০ দলীয় জোট। বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা দুইভাগে ভাগ হওয়ার পর তারা সরকারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখিয়ে আছে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গ পাবার জন্য। এক্ষেত্রে বিএনপির পুরানো সঙ্গী জামাতের সাথে ক্ষমতাসীনদেও সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের সমর্থন আওয়ামী লীগের দিকে। নির্বাচন যতই নিকটবর্তী হবে রাজনৈতিক খেলাধুলাএবং ভাঙ্গা-গড়া বাড়বে। ধর্মীয় দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানও এই খেলায় সক্রিয় থাকবে।

বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সরকারী জোটের অংশীজন এবং ক্ষমতার ভাগীদার। গত দশ বছরে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। তাদের এখন মহাজোটে থাকা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখলেও বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। ভোটের ফলাফল যাই হোক, রাজনীতির মাঠে ছোট হলেও বাম দলগুলোর ভিন্ন ইমেজ রয়েছে। বড় দলগুলি তা পূঁজি করতে চাইবে। সুতরাং ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় বাম দলগুলি সামিল হবেনা, এমনটি আপাতত জানান হয়েছে।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সামরিক শাসকদের কথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের আবহে শুরু হয়েছিল দল ভাঙ্গা-গড়ার খেলা’। এই ভাঙ্গা-গড়ার প্রভাব একসময় বড় রাজনৈতিক দলগুলিতেও চাপ তৈরী করে। নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত এই দেশের রাজনীতি এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলা প্রত্যক্ষ করেছে। সে সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয়। বাম ঘরানার দলগুলির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। তাদের অহরহ ভাঙ্গন দলের বদলে ‘ওয়ানম্যান শো’ তৈরী করে আসছে।

গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা এই দেশে সাতচল্লিশ বছরেও কোন রূপ পরিগ্রহ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিকতার চর্চা দাঁড়ায়নি। ব্যক্তি বা একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল দল বা বিবদমান পক্ষগুলি যে যার মত জিততে চাইবে। নির্বাচনে যেই জিতুক, প্রশ্ন হচ্ছে, এ রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে? নাকি আবারও একক কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিগঢ়ে বাঁধা পড়বে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এখানে এখন এ সকল সংকট ও সম্ভাবনা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সকল দলকে একীভূত করার একটি রাজনৈতিক চেষ্টা হয়েছিল। শেষাবধি তা রক্তাক্ত পরিনতির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষণটি রেখে গিয়েছিল। কিন্তু শাসকশ্রেনী ইতিহাসের অমূল্য শিক্ষণগুলি কখনই মেনে নিতে চায়না। দার্শনিক হেগেলকে উদ্ধৃত্ত করে কার্ল মার্কস সেজন্যই বলতেন, “ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি ঘটে, প্রথমটি যদি হয় ট্রাজেডি, তাহলে পরেরটি অবশ্যই কমেডি। আর প্রথমটি কমেডি হলে পরেরটি অবশ্যই ট্রাজেডি’’।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-২ : ধনিক শ্রেণী গঠন : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

আনু মুহাম্মদ ::

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে (ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮) ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছে অর্থাৎ বিশ্বে ধনিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ধনী ব্যক্তি বলতে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের বোঝানো হয়েছে।[1]

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশ প্রক্রিয়ায় ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই গঠনের প্রথম পর্বে ছিলো লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানী, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সাথে যোগ হয় ব্যাংক ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপীও বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা ও সরকারি ক্ষমতার মধ্যে যোগাযোগ ও চুক্তির নতুন বিন্যাস ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণীর উপস্থিতি যতো স্পষ্ট হতে থাকে ততো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় যাবার হার বাড়তে থাকে, আবার এই হস্তান্তরে ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ৮০ দশকের শুরুতেই ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক এর যাত্রা শুরু হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ খেলাপীদেরই নতুন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে। দেখা যায়, একজন যতো পরিমাণ ঋণ খেলাফী তার একাংশ দিয়েই তারা নতুন ব্যাংক খুলে বসে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে নামে বেনামে ঋণ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, লেনদেন ব্যবস্থা সম্পদ কেন্দ্রীভবনের একটি কার্যকর পথ হিসেবে দাঁড়াতে থাকে।

বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝাতে আমি ৮০ দশকের শুরুতে ‘লুম্পেন কোটিপতি’ পদ ব্যবহার করি। লুম্পেন কোটিপতি বলতে আমি বুঝিয়েছি এমন একটি শ্রেণী যারা নিজেদের বিত্ত অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল পথের চাইতে দ্রুত মুনাফা অর্জনে অন্যান্য সহজ ও চোরাই পথ গ্রহণে বেশি আগ্রহী থাকে, এগুলোর মধ্যে চোরাচালানি, মাদক ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ লোপাট, জবরদখল, জালিয়াতি ইত্যাদি অন্যতম। এরজন্য সব অপরাধের পথ তারা গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়।[2]

বাংলাদেশে ৮০ দশক ছিলো নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি সংহত করবার জন্য খুবই সুবর্ণ-সময়। একদিকে তখন বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র অধীনে সংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও থিংকট্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার মূল পথপ্রদর্শক ছিলো বরাবরই। বর্তমান বাংলাদেশেও তাদের মতাদর্শই উন্নয়ন পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করছে।[3]

যাইহোক, ৮০ দশক থেকেই  ক্ষমতাবানদের সাথে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিরা রাতারাতি তখন অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়, এরজন্য তাদের উদারভাবে ব্যাংক ঋণও দেওয়া হয়। [4] এটা সম্ভব হয় ক্ষমতার সাথে একটা অংশীদারীত্বের চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করবার কারণে। রাষ্ট্র-ব্যবসা-ধর্ম-লুন্ঠনের এরকম প্যাকেজ বাংলাদেশে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। দুর্নীতি-লুন্ঠন-ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যে ভিত্তি তখন নির্মিত হয় তা দিনে দিনে আরও শক্ত হয়েছে। কেননা সেইসময় বিন্যস্ত শাসন-দুর্নীতির পথেই পরবর্তী সরকারগুলোও অগ্রসর হয়েছে। তাই একদিকে দুর্নীতির শত হাতপা বিস্তার এবং অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতায় কেন্দ্রীভবন দুটোই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সেই হিসেবে ৮০ দশকের দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী শাসককে পরবর্তী শাসকদের গুরু হিসেবে উল্লেখ করা চলে। পরবর্তী সময়ের শাসকেরা বহুভাবে তাঁকে অনুসরণ করে লুন্ঠন দুর্নীতি ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের ক্ষেত্রে পরিমাণগত দিক থেকে ধাপে ধাপে বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

গত এক দশকে আমরা প্রবেশ করেছি পুঁজি সংবর্ধনের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংক ঋণের মধ্যে সম্পদ লুন্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্খা এবং সুযোগ দুটোই এখন অনেক বেশি। তাই পুরো ব্যাংক, ভবন, সেতু, সড়ক খেয়ে ফেলাই এখনকার সফল প্রজেক্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তার বাইরে নয়। শেয়ার বাজারও একটি লোভনীয় ক্ষেত্র। এটা প্রমাণিত যে, প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় সমর্থন বা অংশীদারীত্ব ছাড়া কোনো বড় দুর্নীতি ঘটতে বা তা বিচারের উর্ধ্বে থাকতে পারে না। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধ্বস হয়েছে। এর পেছনে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছিলো খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ফরাসউদ্দীন। কিন্তু দুটো তদন্ত কমিটির ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে অভিন্ন। পুরো রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়নি। মূল দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তারা ক্ষমতার ছড়ি নিয়ে আরও নতুন নতুন অপরাধের কাহিনী তৈরি করছেন।

শুধু ব্যাংক বা শেয়ার বাজার নয়, সর্বজনের (পাবলিক) সব সম্পদই এখন অসীম ক্ষুধায় কাতর এই শ্রেণীর লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি-নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা অনিয়মের রাস্তা তৈরিসহ পুরো দেশই এখন ভোগ্যবস্তু। আগেই বলেছি, পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিলো নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা  বা অংশীদারীত্বের ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশি-বিদেশি কর্পোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সাথে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়। উচ্ছিষ্টভোজী সমর্থক হিসেবে এমবেডেড বুদ্ধিজীবীর আয়তন বিস্তৃত হয়েছে গত এক দশকে। লুম্পেন শ্রেণীর সকল অংশের একটি বৈশিষ্ট অভিন্ন: এই দেশে সম্পদ আত্মসাৎ আর অন্য দেশে ভবিষ্যৎ তৈরি। সুতরাং শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, নদী, বায়ু, পরিবেশ বিপর্যস্ত করে এই দেশকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এই শ্রেণী যেভাবে সংহত হয়েছে তার সাথে রাজনীতির নির্দিষ্ট ধরনের বিকাশও সম্পর্কিত। নানা চোরাই পথে কোটি-কোটিপতি হবার চেষ্টা যারা করে তাদের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও অর্থবরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিদ্যাচর্চা-সংস্কৃতিচর্চা বিপদজনক। তাই এই গোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতা কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা, যাদের সাথে সহজেই সমঝোতা, অংশীদারীত্ব, চুক্তি করা সম্ভব। তাদের অংশীদার বানিয়ে তরতর করে বিত্তের সিঁড়ি অতিক্রম করা সহজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যতো অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক হবে ততো তাদের সুবিধা। তাদের জন্য তাই একই সাথে দরকার একটি নিপীড়ন মূলক শাসন ব্যবস্থা, স্বৈরতন্ত্রী আবহাওয়া যেখানে ভিন্নমত ও স্বাধীন চর্চার ওপর চড়াও হবার জন্য নানা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বা বিচার ব্যবস্থার আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

যেসব খাত এগিয়ে :

সরকার যেসব বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, নিচ্ছে তার আকার ও বরাদ্দ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দের কোন উর্ধ্বসীমা নেই, এর যৌক্তিক বিন্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা নেই, যৌক্তিকতা বিচারের কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও আর কার্যকর নেই। তার ফলে এগুলোর ব্যয় অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ২/৩ গুণ এমনকি ১০ গুণ বেশি হলেও তার জবাবদিহিতার কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং সরকারি অনুমোদন নিয়েই এগুলোর ব্যয় শনৈ শনৈ বেড়ে যাচ্ছে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সড়ক মহাসড়ক ফ্লাইওভার রেলপথ সেতু সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোনোদেশেই এতো ব্যয় হয় না।[5] এর পেছনে উর্ধ্বমুখি কমিশন এবং ঋণদাতা সংস্থা বা সরকার প্রভাবিত ঠিকাদার নিয়োগ অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়। গত ৬ বছরে এই অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধিতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন নির্মাণখাত সবচাইতে বর্ধনশীল। ইটভাটা অসংখ্য, বৈধ যত তার চাইতে অবৈধ সংখ্যা বেশি। সিমেন্ট কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শীতলক্ষাসহ বিভিন্ন নদীর বাতাসে পানিতে এর প্রবল ছোঁয়া পাওযা যায়। দূষণরোধের কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না। রডের উৎপাদন বেড়েছে। নিয়ম মেনে বা না মেনে বালু তোলার পরিমাণ বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। ফার্নিচারের ব্যবসাও বেড়েছে। এরজন্য বনের গাছের ব্যবসা ভালো। দেশে নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করায় প্রশাসন বরাবর সক্রিয় সহযোগী।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ বিনাশ ক্ষেত্রে অগ্রণী। দায়মুক্তি আইন এক্ষেত্রে অন্যতম রক্ষাকবচ। সরকার দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়মনীতি অমান্য করে দেশি বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চমূল্যে কাজ দিচ্ছে, আইনের  হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০১০ সাল থেকে সরকার চলছে ‘দায়মুক্তি আইন’ ঢাল দিয়ে, নানা সুবিধা ছাড়াও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় থেকে বাঁচানোর জন্য দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে রাশিয়ান ও ভারতীয়সহ বিদেশি কোম্পানিকেও (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রষ্টব্য)। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশি-বিদেশি কোম্পানির উচ্চলাভ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজি নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। বন, জমি, উপকূলবিনাশ, অধিক ঋণ ও বিদেশ নির্ভরতা এবং ব্যয়বহুল এই পথ নেয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদার কথা। কিন্তু যখন পরিবেশবান্ধব, সুলভ এবং টেকসই বিকল্প পথ দেখানো হচ্ছে তখন সরকার সেদিকে যাচ্ছে না কারণ সেই পথ দেশ ও জনগণের জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য হয়েও কর্পোরেট গোষ্টীর তাতে লাভ নেই, আমলা মন্ত্রীদের কমিশনের সুযোগ নেই।[6]

আরেকটি ক্ষেত্র সর্বজনের অর্থ দিয়ে বিশাল কেনাকাটা। যন্ত্রপাতি  কেনা হচ্ছে, কাজ নাই; বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই সেগুলো হাওয়া; ডেমু ট্রেন কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই তার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হচ্ছে; সিসিটিভি কেনা হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা নষ্ট; ঋণ করে সাবমেরিন সহ সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ করে শত শত বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই যেগুলো বিকল হচ্ছে;  কেনা হচ্ছে গাড়ি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার  মধ্যে গাড়ির মডেল পরিবর্তন করা, আরও বড় আরও দামি গাড়ি কেনার পথে প্রবল উৎসাহ। সর্বজনের অর্থ যে কোনোভাবে বরাদ্দে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নেই। কিন্তু এই অর্থ জোগাড়ে বাড়ছে মানুষের ওপরই চাপ। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, ভ্যাট বসছে সর্বত্র, খাজনা বাড়ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছুলোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হবার জায়গা। এর অন্যতম সুফলভোগী কতিপয় শিক্ষকও। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং আর টিউশনি নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন বিষময়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার কারণে গাইড বই, কোচিং এর বাণিজ্যের পথ খুলেছে। চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তাই একদিকে জৌলুস বাড়ছে অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নীচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম।[7]  ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লক্ষ শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার বহু প্রতিষ্ঠানের অনাহারী শিক্ষকেরা বারবার ঢাকা আসেন কিন্তু তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ হয়না। তাঁরা অনশনও করেছেন বহুবার। নন এমপিও এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন টিচারস এ্যান্ড এমপ্লয়ীজ  ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ  বলেছেন, ‘২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দাবি নিয়ে আমরা ২৮ বার ঢাকা শহরে এসেছি।[8]’  কোনো কাজ হয়নি।

উন্নয়নের ধরনে যদি দুর্নীতি অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা হীনতা, দখল, দূষণ থাকে অর্থাৎ যদি উন্নয়ন প্রকল্প অতি উচ্চ মাত্রায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি/বিপর্যয়ের কারণ হয় তাহলে তা কুশাসন অবধারিত করে তোলে। ব্যবসা- লবিষ্ট- রাজনীতিবিদ- প্রশাসনের দুষ্ট আঁতাত আরো অনেক অপরাধ-সহিংসতাকেও ডাকে। বলপূর্বক টেন্ডার দখল, জমি-ব্যবসা দখল করতে গিয়ে খুন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সহযোগিতা গুম, আটক বাণিজ্য, দরকষাকষি এগুলোও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায়। প্রশাসন আর দল একাকার হয়ে গেলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের বল্গাহীন প্রতিযোগিতা চলবেই। বাড়তেই থাকবে ধর্ষণ, নারী-শিশু- সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, ক্রসফায়ার, হেফাজতে নির্যাতন, এবং সরকারি দলে বিভিন্ন গোষ্ঠী হানাহানি। এসব কিছু মিলিয়েই পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির জৌলুস বাড়তে থাকে প্রাণ প্রকৃতির বিনাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা-অপমান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]https://www.wealthmanagement.com/sites/wealthmanagement.com/files/wealth-x-wealth-report.pdf

[2]পুঁজিপতি শ্রেণীর উৎপাদন বিচ্ছিন্ন-লুটেরা- ধরন বোঝাতে ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ প্রথম ব্যবহার করেন একজন অষ্ট্রিয়ান  লেখক, ১৯২৬ সালে। প্রথম ইংরেজী ভাষায় এর ব্যবহার করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত পলিটিক্যাল ইকনমি অব গ্রোথ গ্রন্থে। পরে এ শব্দবন্ধ বিশেষ পরিচিতি পায়  জার্মান-মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী  আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাংক এর (১৯৭২) লুম্পেন বুর্জোয়া লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট গ্রন্থের মাধ্যমে। তিনি এই গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থ প্রান্তস্থ দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ আলোচনায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন এমন একটি শ্রেণীর বিকাশ যারা সা¤্রাজ্যবাদের সাথে ঝুলে থাকে, নিজস্ব অর্থনীতির উৎপাদনশীল বিকাশের বদলে তারা যে কোনো ভাবে অর্থবিত্ত অর্জনের পথ গ্রহণ করে, নিজেদের স্বার্থে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে।

 

[3] আমার বেশ কয়টি বইতে এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। কয়টির নাম এখানে উল্লেখ করছি- কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, বিশ্বায়নের বৈপরীত্য, উন্নয়ন বৈপরীত্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারত প্রশ্ন।

 

 

 

[4]কয়েকদশকে ব্যাংকঋণ লোপাট কাহিনী ও তার বিবর্তনের বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- কল্লোল মোস্তফা: সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১৮। এছাড়া ব্যাংকের খেলাফী ঋণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এখনও বিষয়টি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। দেখুন মইনুল …..

 

[5] এবিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার সূত্র ধরে বিভিন্ন রিপোর্ট দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলো, বণিকবার্তা ছাড়াও এসম্পর্কিত আরও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি:https://www.jamuna.tv/news/24438, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2016/05/31/364233, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/14/451818, https://www.thedailystar.net/frontpage/road-construction-cost-way-too-high-1423132

[6]এ বিষয়ে দ্রষ্টব্য তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বিকল্প মহাপরকিল্পনার খসড়া। দেখুন: https://drive.google.com/file/d/1hPjRITBhY9cizuxfMJ2eAwieaSXP_EtI/view

[7]গত এক দশকের উন্নয়ন বরাদ্দের ধরন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- মাহতাব উদ্দীন আহমদ: বাজেট এবং এক দশকের ‘উন্নয়ন চিত্র’, সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১

[8] নিউ এইজ, জুলাই ৫, ২০১৮