Home » সম্পাদকের বাছাই (page 30)

সম্পাদকের বাছাই

ছাত্রলীগ কী আসলেই অপরাধ করে না ?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ক্ষমতাসীন দল বা অঙ্গসংগঠনসমূহের নেতা-কর্মী যখন কোন অপরাধ সংঘটন করে তখন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ ও নেতৃবৃন্দের মুখে গৎবাঁধা কতগুলো বাক্য উচ্চারিত হয়। “অপরাধী যে দলেরই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে। ছাত্রলীগ ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। ছাত্রদল-ছাত্রশিবির থেকে আগত অনুপ্রবেশকারীরা এসব অপরাধ করছে”। গত আট বছরে ছাত্রলীগ নামধারীদের শত শত অপরাধ দু’চারটে ব্যতিক্রম বাদে বাগাড়ম্বরের আড়ালেই চাপা পড়ে গেছে। তদন্ত-অনুসন্ধান এগোয়নি, বিচারের সম্ভাবনা তো সূদুর পরাহত।

গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, খাদিজা হামলার বিচার হবেই। তার মতে, “এখানে কোন দলীয় কোন্দল ছিল না বা দল হিসেবে কেউ মারতে যায়নি। কে কোন দল করে আমি সেটা দেখি না বা দেখব না। যে অপরাধী সে অপরাধীই। কিছু লোক ও মিডিয়া এটিকে দলীয় হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করছে, দলীয় হিসেবে আমরা প্রশ্রয় দিচ্ছি না”। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য যে কোন নাগরিককে আশ্বস্ত করতে পারতো, যদি সারা দেশে ছাত্রলীগ নামধারী নেতা-কর্মীদের কৃত অপরাধগুলি আইনের আওতায় বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতো।

প্রধানমন্ত্রী মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে সংসদে যুগপৎ দুঃখ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। “একটি ছেলে একটি মেয়েকে নির্মমভাবে কোপালো। এত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখেছে, ছবি তুলেছে”। প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ, হতাশা নিশ্চয়ই নাগরিকদের ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে মেয়েটির সাথে সেলফি তুলেছেন যুব মহিলা লীগ নেত্রী অপু উকিলসহ আরো কয়েকজন; যদিও ফেসবুকে তা প্রকাশের পরে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তারা এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। অন্যদিকে, ঘাতক বদরুলের মা ‘‘ছেলের অপরাধের বিচার চেয়েছেন’’। সন্দেহ নেই, ঘটনার এপিঠ-ওপিঠ দুই-ই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে সবকিছুই বিবেচনা করতে হবে, কি কারণে মূল্যবোধগুলি হারিয়ে যেতে বসেছে।

এই দেশের মানুষ সামাজিক-রাজনৈতিক- নির্বাচনী তান্ডবে খুন, রক্তপাত, দখল, রাহাজানি, লুন্ঠন দেখে দেখে অসাড় হয়ে আছে। বোধশূন্য হয়ে পড়ছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত অপরাধের খবর স্বাভাবিক ও সহনীয় মাত্রা অর্জন করেছে। তারপরেও রাণা প্লাজার মত মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগসহ অনেক ঘটনায় মানবতা ও মূল্যবোধের বড় নির্দশনগুলো চোখের সামনে আছে। এখনো নানা দৈব-দুর্বিপাক ও সংকটে মানুষ এগিয়ে আসে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে মানুষের নির্লিপ্ততার মূল কারণ হচ্ছে, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা।

সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব অপরাধ প্রসঙ্গে  যেটি মনে করেন, তাও বলেছেন অকপটে। তার মতে, “এভাবে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা শিখিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। এরাই পথ দেখিয়েছে। নৃশংসতা করে করে মানুষের ভেতরে একটা পশুত্বের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একমত হলে বলতে হবে, ২০১৩-১৪ ও ২০১৫ সালে আন্দোলনকালে পেট্রোল বোমায় জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার বীভৎসতার তুলনাই হয় না। এই দায়ে বিএনপি-জামায়াত অভিযুক্ত। আবার নাশকতার দায় থেকে ছাড়া পেতে আওয়ামী লীগ নেতারা সনদ দেয়ার পাশাপাশি দলেও বরণ করেছেন অনেক বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীকে ।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একমত হলে মানতে হবে, ছাত্রলীগ নামধারী যেসব নেতা-কর্মী হত্যাসহ নানা অপরাধে লিপ্ত, বিএনপি-জামায়াতই তাদের এই নৃশংসতা শিখিয়েছে। পথ দেখিয়ে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের এতটাই বেপরোয়া করে তুলেছে যে, গত আট বছরে তারা আন্ত:কোন্দলে খুন করেছে ১৭৫ জনকে। এটি অবশ্য ২০১৪ সাল পর্যন্ত পত্র-পত্রিকার হিসেব মতে পরিসংখ্যান। মাতৃজঠরের শিশুও নিস্তার পায়নি তাদের বর্বরতার হাত থেকে। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে অপরাধীর শাস্তির কথা বলছেন বটে, কিন্তু দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বক্তব্যের সাথে বাস্তবের মিল নেই।

২০০১-০৬ মেয়াদে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, খুন-গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং অবশ্যই গ্রেনেড হামলায়ও বিএনপি-জামায়াত অভিযুক্ত। আইন-আদালতের বিচারে এই অভিযোগসমুহ এখনও প্রমানিত নয়। কিন্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ প্রতিটি ঘটনায় বিচার চায়। যেমনটি অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ও ২০০৬ সালে সুষ্ঠ র্নিাচনের দাবিতে আন্দোলনে গান পাউডার, লগি-বৈঠা ও বোমায় নিহত মানুষদের হত্যার অভিযোগের বিচারের দাবিও তো ক্ষতিগ্রস্তদের।

বলার অপেক্ষা রাখেনা, ক্ষমতার ছাত্রলীগ যা করছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ছাত্রদলও একই কায়দায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি ও হলের সিট বাণিজ্য, মাদকব্যবসা ও নারী নির্যাতনে যুক্ত ছিল। সে আমলে ছাত্রলীগ ছিল এখনকার ছাত্রদলের মত অসহায়। আর ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ভয়াবহ আতংকের ইসলামী ছাত্রসংঘের উত্তরাধিকার। কিন্ত কোন সরকারই এসব ছাত্র সংগঠনের নৃশংস ও ভয়াবহ অপরাধের বিষয় বিচারের আওতায় আনেনি, কারণ অপরাধের ক্ষেত্রে তারা একধরণের অলিখিত ইমিউনিটি ভোগ করে। ফলে ক্ষমতায় থাকতে হেন দুস্কর্ম নেই, যার সাথে এসব সংগঠনের নেতা কর্মীরা জড়িয়ে পড়েনা।

শোকাবহ আগষ্টেও ছাত্রসংগঠনটির নামে বেপরোয়া তান্ডব ও হামলার এন্তার অভিযোগ আছে। গত ২০ আগষ্ট ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী আফসানাকে ধর্ষণের পরে খুন করার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। কুমিল্লায় সংঘর্ষের পরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং খুলনায় সংঘর্ষের পর পরীক্ষা  পেছানো হয়েছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। জঙ্গীবিরোধী মানববন্ধন করতে গিয়ে চট্টগ্রামে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। গেল মাসগুলিতে সংবাদপত্রের রিপোর্টগুলি উল্লেখ করলে কলেবর বৃদ্ধি পাবে, কারণ প্রাচীন কলেজের ছাত্রাবাস সোল্লাসে পুড়িয়ে দিলেও যে দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গৃহীত হয় না সেখানে কলেবর বাড়িয়ে কি লাভ!

সারাদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জনপদে ছাত্রলীগের প্রায় কোন প্রতিপক্ষ নেই। রাজশাহী ও চট্টগ্রামে শিবিরের অস্তিত্ব আছে, ছাত্রদলের সাড়াশব্দও নেই কোথাও। যেখানে ছাত্র ইউনিয়ন আছে হামলার শিকার হচ্ছে তারাও। এজন্য এখন ছাত্রলীগেরই প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ। তারা সংঘর্ষে জড়ায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি ও হলের সিট বাণিজ্য, মাদকব্যবসা ও প্রত্যাখ্যাত প্রেমের প্রতিশোধ নিতে। খুনোখুনির পরে নেতৃবৃন্দ জানান, বিচার হবে, অনুপ্রবেশকারীরা এসব করছে। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের কোন্দলে খুন হয়েছে কম- বেশি ১৭৫ জন।  ঐতিহ্যমন্ডিত এই ছাত্রসংগঠন এখন দেশের অনেক এলাকায় আতঙ্কের নাম।

লাগামহীন সন্ত্রাসের ঘটনায় সরকারের মন্ত্রী ও একাধিক নেতা নানা সময়ে বলেছেন, ছাত্রলীগের এসব কর্মকান্ডের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না। দলের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ অনেকবার বলেছেন, ছাত্রলীগের ভেতরে শিবির ঢুকে গেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত এরকম একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন তথ্য জানা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠন কেন যে এরকম করছে বলে যারা বিষ্ময়ের ভান করেণ, তারা পেছনে ফিরে তাকান না।

১৯৭২-৭৫ এবং ১৯৯৬-২০০০ মেয়াদে ছাত্রলীগ কি করেছে! সেনাসমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে কি দায়িত্ব পালন করেছে ছাত্রলীগ? “ক্ষমতার বাঘ ছাত্রলীগ সেই দুই বছর কি বিড়াল বনে গিয়েছিল”-ভাষ্যটি ছিল মতিয়া চৌধুরীর । ছাত্রলীগ এই ভাষ্যের উত্তর দেয়ার জন্য তাদের সে সময়ের অবস্থান কখনোই কি তুলে ধরবে?

এক অভূতপূর্ব ও নজীরবিহীন নির্বাচনে পুনর্বার ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার বসেছে, তাদের ভাষায়, গণতন্ত্র সুরক্ষার যাত্রায়। এই যাত্রাকে বিএনপি বলছে, গণতন্ত্র হত্যা। বাস্তবতা হচ্ছে- গণতন্ত্র এক, দেশ এক, কিন্তু ভাবনা দুই। একদল ভাবছে তারা গণতন্ত্র পাহারা দিয়ে রক্ষা করছে, অপর দল রক্ষক সেজে গণতন্ত্র রক্ষা করার অভিযোগ আনছে। তাদের এই বিপরীতমুখী ভাবনা সৃষ্টি করছে অজস্র ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন, যাদের হাতে অজস্র প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে, শিকার হচ্ছে ধর্ষণ-যৌন হয়রানিসহ নানা নির্যাতনের। ফলে আশ্বাস নয়, জনগন তখনই সংসদে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নিশ্চিন্ত হবে, যখন দেখবে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত হতে শুরু করেছে।

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(চতুর্থ পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের পাশাপাশি মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটেছিল। একদিকের প্রধান প্রবক্তা বঙ্কিম, অন্যদিকে নবাব আবদুল লতিফ (১৮২৬-১৮৯৩) ও সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৮-১৯২৮)। ফরিদপুরের সাধারণ ঘরে জন্মগ্রহণকারী আবদুল লতিফ ছিলেন সরকারের আমলা (বঙ্কিমের মতোই)। ব্রিটিশরাজ তাঁকে নবাব খেতাবে ভূষিত করেছিল। ব্যারিস্টার সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলিম বিচারপতি। ১৮৬৩ সালে নবাব আবদুল লতিফ এবং ১৮৭৮ সালে সৈয়দ আমীর আলী যথাক্রমে ‘ক্যালকাটা মোহামেডান লিটেরারি সোসাইটি’ এবং ‘ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ইংরেজির চর্চা হত এবং বাংলা ভাষা প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। মুসলিম জাতীয়তাবাদের উৎস সন্ধান করা হত বাংলাদেশের মাটিতে নয়, আরব ইরান ইরাক মধ্য এশিয়ায়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘নবাব আবদুল লতিফ সেই ধারার মুখপাত্র যে ধারা বিংশ শতাব্দীতেও বাহাস করেছে বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা কি তাই নিয়ে।’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উনিশ শতকে বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ, পৃ. ৮২। )

এই ধারারই প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল মুসলিম লীগ। ১৯০৫ সালে ইংরেজ শাসকদের মদদে এই সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল দলটি গঠিত হয়েছিল ঢাকায়। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও ধনাঢ্য ব্যক্তি ইসমাইলিয়া শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা আগা খান ছিলেন এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা। এখানে উল্লেখ্য যে একই বৎসর ব্রিটিশের মদদে হিন্দু মহাসভাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্পষ্টতই ব্রিটিশ সাম্প্রাজ্যবাদ চেয়েছিল হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনকে কাজে লাগাতে তাদের শাসনের স্বার্থে।

হিন্দু মুসলমানের মধ্যে কি সত্যিই বড় রকমের বিভাজন ছিল? এতক্ষণ যে আলোচনা করা হল, ইসলাম ধর্মের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট এবং হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম ও সাধারণ সংস্কৃতি নির্মাণের ঐতিহ্য তা তো সে কথা বলে না। বস্তুত বিভাজনটি প্রকট হয়ে ওঠে উনবিংশ শতাব্দীতে যখন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ পাল্টাপাল্টি দাড়িয়ে যায়। তাও এইসব ছিল শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে। কৃষক সাধারণের মধ্যে ধর্মীয় আচরণে কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও সংগ্রাম ও সংস্কৃতি রচনায় ভেদাভেদ চোখে পড়ে না। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-উপরে উল্লেখিত গ্রন্থে-বলেছিলেন, ‘ওদিকে বাঙালী মুসলমানের যে বিরাট অংশ ছিলেন অক্ষরজ্ঞান বর্জিত তাদের পক্ষে সাহিত্যে থাকা না থাকা সমান কথা।’ এর পরপরই তিনি আরও লিখছেন, ‘এরই মধ্যে থেকে একজন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২) যে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন সে এক বিস্ময়কর ঘটনা বৈকি।’ (ঐ, পৃ. ৮২।)

মীর মশাররফের উল্লেখ আছে আহমদ ছফার প্রবন্ধেও। তাছাড়াও মীর মশাররফ বিশেষভাবে আলোচিত হবার দাবি রাখেন। তবে তার আগে দেখা যাক উনবিংশ শতাব্দীতে আর কোন কোন মুসলমান লেখক ছিলেন। মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষা লাভ করেছেন পরে। তার মধ্যে সম্ভ্রান্তরা আবার বাংলা ভাষাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। ফলে আধুনিক বাংলা ভাষা সাহিত্যে মুসলমান কবি সাহিত্যিকদের অবদান এত সামান্য। এমনটা কিন্তু মধ্যযুগে ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীতে অবশ্য মুসলিম নারী কবিও ছিলেন, যেমন তাহেরুন্নেসা । মুসলমান কবি সাহিত্যিক যাঁরা ছিলেন তাঁদের রচনা উচ্চমানের ছিল না।

হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কবিরা মাইকেলের অনুকরণে মহাকাব্যও লিখেছেন। কারো রচনাই উঁচু মানের নান্দনিক উৎকর্ষ দাবি করতে পারে না। এখানে আরও লক্ষণীয় যে মাইকেল যেভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবিক ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তেমন মনের উদারতা দেখাতে পারেননি অন্যান্য মহাকাব্য রচয়িতারা। হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) লিখেছেন ‘বৃত্রসংহার কাব্য’ যেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর অবশ্য অন্য কবিতা আছে যেখানে হিন্দু মুসলমানের ঐক্য কামনা করেছেন। নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) তিনটি মহাকাব্য লিখেছেন, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীকৃষ্ণ এবং এই ত্রয়ীকাব্যে হিন্দু ধর্মবোধ বিশেষভাবে প্রতিফলিত। যোগীন্দ্রনাথ বসু দুইটি মহাকাব্য লিখেছেন ‘পৃথ্বীরাজ’ ও ‘শিবাজী’ যেখানে হিন্দুর গৌরবের ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে।

তাঁদের বিপরীতে মুসলমান কবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২) ‘মহাশ্মশান’ কাব্য মুসলমানদের বিজয়গাথা বর্ণনা করেছেন, যদিও একই সঙ্গে কবি দেখাচ্ছেন যে যুদ্ধ ভয়াবহ এবং চূড়ান্ত বিশ্লেষণে কোন পক্ষই জয়ী হয় না। কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী আরব মুসলমানদের দ্বারা স্পেন বিজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী বর্ণনা করেছেন ‘স্পেনবিজয় কাব্যে’। হামিদ আলী (১৮৭৫-১৯৫৪) লিখেছেন কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘কাসেমবধ কাব্য’। এছাড়াও ‘জয়নালোদ্ধার’ ও ‘সোহরাববধ কাব্য’ এবং মুসলমানদের লেখা অন্যান্য অনেক কাব্যেই ইসলামী ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ছিল। এককথায় হিন্দু মুসলমান কবিরা, বিশেষ করে মহাকাব্য রচয়িতারা বিষয়বস্তু নির্বাচনের দিক দিয়ে দুইভাবে বিভক্ত ছিলেন।

এমন পরিবেশে মীর মশাররফ হোসেন নিশ্চিতভাবেই ব্যতিক্রম ও মহান। তিনিও কারবালাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু সেখানে ধর্মপ্রচারের চেয়ে মানব চরিত্র ফুটিয়ে তোলাই লক্ষ্য ছিল। দুইটি দিক দিয়ে উনবিংশ শতাব্দীর অনেক সাহিত্যিকের চেয়ে মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন একেবারে ভিন্ন। তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা ও জমিদার-বিরোধিতা তাঁকে স্বাতন্ত্র্য ও মহত্ব দান করেছে। তাঁর লেখা ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক জমিদার-বিরোধী মনোভাবের পরিচায়ক। এই নাটকে তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয় জমিদারকে ‘জানোয়ার’ বলেছেন। অনেক আগে মাইকেল হিন্দু জমিদারের মুসলমান নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টিকে তীব্র সমালোচনা করেছেন তীক্ষ্ম ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় (‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ নাটকে)। মীর মশাররফের ‘গো-জীবন’ গ্রন্থটি ছিল অসাধারণ রচনা, কত উদার, কত অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় বহন করে। তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন অথবা পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ উপন্যাসে যে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের আবেদন জানিয়েছিলেন তা যদি হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা অনুধাবন ও অনুসরণ করতেন তা হলে হয়তো আমাদের দেশের ইতিহাস অন্যরকম হত।

মীর মশাররফ হোসেন অবশ্য শেষজীবনে কিছু ধর্মপুস্তক লিখেছেন। তবে তা উন্নতমানের নয়। সে যাই হোক, মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক মানুষ এবং সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িকতা প্রচার করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে স্বল্পসংখ্যক হিন্দু লেখকের মতো স্বল্পসংখ্যক মুসলিম লেখকও ছিলেন যারা সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতেন ও প্রচার করতেন। যেমন মেদিনীপুরের শেখ আবদুল লতিফ (নবাব আবদুল লতিফ নন) মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় বিষয় আলোচনা করেছেন। তিনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সাম্যের বাণী প্রচারের চেষ্টা করেছেন। রামমোহনের সমসাময়িক আবদুর রহিম দাহরি (১৭৮৬-১৮৩৩) ছিলেন খুবই পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি কলকাতায় বসবাস করতেন যদিও তাঁর জন্মস্থান ছিল উত্তর প্রদেশে। দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ে তাঁর লেখা গ্রন্থ ছিল। তিনি ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন।

মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’ উপন্যাসের সমালোচনা করেছেন আহমদ ছফা। তিনি বলেছেন মুসলমানের লেখা ‘শহীদে কারবালা’ পুথিতে কারবালার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে পুথিলেখক আজগুবি তথ্য জুড়ে দিয়েছেন। পুথিলেখক আরবদেশে এক ব্রাহ্মণ পরিবার আবিষ্কার করেন। হজরত হোসেনের ছিন্ন মস্তকের মুখ থেকে কলেমা বের হয়েছিল যা পড়ে ঐ ব্রাহ্মণ পরিবারের সকল সদস্য মুসলমান হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের মহিমা কীর্তনের জন্য এই যে কসরত তাকে অতি নিম্নমানের সংস্কৃতির লক্ষণ ছাড়া আর কি বলা যায়? ‘জঙ্গনামা’ পুথিতেও এই রকম অজস্র আজগুবি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যাবে। আহমদ ছফা বলছেন, ‘বৌদ্ধ জাতক’ থেকে শুরু করে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ অথবা মঙ্গলকাব্যেও এমন আজগুবি জিনিস পাওয়া যাবে যার উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ ধর্মের মাহাত্ম্য প্রচার করা। আহমদ ছফা অভিযোগ করেছেন ‘শহীদে কারবালা’ পুথির সেই আজগুবি গল্প একইভাবে মীর মশাররফের ‘বিষাদসিন্ধু’ উপন্যাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই রকম উদ্ভট কাহিনী বলা এবং স্বধর্মের মহিমা প্রচারের ধরনটি মীর মশাররফের চরিত্রের সঙ্গে যায় না, কারণ তিনি পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক ও বাস্তববাদী।

তবে মীরের এই সমালোচনা মুনীর চৌধুরীও করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পুথির জীবনছবি মধ্যযুগীয় অজ্ঞানতা, ধর্মভীতি এবং অলৌকিকতামন্ডিত। যেখানেই এই পুথির প্রভাব পড়েছে সেখানেই এই অন্ধকার ছায়া ফেলেছে। এই আচ্ছন্নতা এতই সংক্রামক যে পুথির অনুসরণকারী বিদগ্ধ কবি-সাহিত্যিকরা পর্যন্ত একে এড়াতে পারেননি।’… ‘জনৈক গবেষক প্রচার করেছেন যে জঙ্গনামা পুথির শেষাংশে এবং মীরের বিষাদসিন্ধুর উত্তর পর্বে সত্যতার বিশেষ কিছু নেই। যেন উভয় গ্রন্থের পূর্বাহ্নেই ইতিহাস অটুট। … মীর সাহেব ‘বিষাদসিন্ধু’র প্রথমার্ধেও ইতিহাসকে উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু করলেও তিনি উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন, রূপকথা বা পুঁথি বানাননি। উদ্ধার পর্বে শিল্পী মীর প্রকৃতই পতিত।’ (মুনীর চৌধুরী, ‘মীর মানস’।)

আমার মতে, পুথির বয়ান ও পুথির দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব বড় করে দেখা সঠিক হবে না। পুথি ছাড়াও বেশ কিছু হিন্দু-মুসলমান কবি-লেখকদের রচনায় স্বজাতিগর্ব, ভিন্নধর্মের প্রতি বিদ্বেষ যে দেখা গেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। পাশাপাশি সেকুলার, উদার ও অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যও যে ছিল সেটাও তো মিথ্যা নয়। আমি আবার সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে চাই যে শ্রমজীবী বাঙ্গালি মুসলমানের সহজাত প্রবৃত্তি হল অসাম্প্রদায়িকতা, উদারতা, মানবিকতা ও পরমত-সহিষ্ণুতা। মধ্যপ্রাচ্যের মতো ধর্মীয় মৌলবাদ কখনই বাংলার মাটিতে স্থান করে নিতে পারবে না।

আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তাজরীন ফ্যাশনস, রাণা প্লাজা, থেকে টাম্পাকো। এ আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড। মধ্যযুগে যেমন মৃত্যুকূপে ফেলে মানুষকে হত্যা করা হতো, সে রকম নানা নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই দেশে শ্রমিকদের জন্য হয়ে উঠছে যেন মৃত্যুকূপ। ব্যবসায়ী নামক কতিপয় অর্থপিশাচের লোভের বলি হয়ে ফি- বছর এই দেশে ধ্বসে পড়ে, চাপা পড়ে, আগুনে পুড়ে, বারুদে ঝলসে মারা যায় মানুষ। দেখ-ভালের কেউই নেই। আছে, তবে তারা মালিকের রক্ষক, জনগনের তো নয়ই। সেজন্যই বছরের পর বছর মারা পড়া হতভাগা মানুষগুলির পরিবার-পরিজন কোন নিরাপত্তা পায়নি-কারো কাছ থেকে।

মালিক পক্ষ এবং যারা দেশ চালান তারা যখন ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা, সাধারনরা ঈদ যাত্রায় পথের দুর্ভোগ সয়ে পরিবারের সাথে মিলন প্রত্যাশী-কোরবানীর পশুর রক্তপ্রবাহে উদ্বেলিত, হায় কে রাখে কার খোঁজ! ওই সময়টিতেই টঙ্গীতে জ্বলছিল টাম্পাকো ফুয়েলস লিমিটেডের কারখানা। হতভাগ্যরা আগুনে পুড়ে ভর্তা হচ্ছিল। ৩৪ জনের অধিক মানুষের দগ্ধ লাশ বের করে আনা হয় আগুন থেকে। সবশেষ খবর, ৩৯জন মারা গেছে। হাসপাতালে ভর্তি আরো অগুনতি। দুর্ঘটনার এতদিনেও শেষ হয়নি উদ্ধার তৎপরতা। স্বজনদের আর্ত আহাজারিতে ভারি বাতাস। পশুতে-মানুষে যেন তফাৎ নেই।

মালিক পক্ষের হাজারো অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রের নতজানু ও দুর্বল নজরদারির কারনে রাণা প্লাজা থেকে টাম্পাকো দুর্ঘটনায় আদম সন্তানের বীভৎস মৃত্যু বিবেকবানদের বিপন্ন করে দিয়েছে। একি মৃত্যু না গণহত্যা! ফায়ার সার্ভিস সর্বশক্তি দিয়ে স্বল্পসময়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে পারেনি। সময় লাগছে অনেক দিন, তারপরেও পুরোপুরি নয়। ফায়ার সার্ভিসের অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের সক্ষমতাই এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। আগুন নিভেছে একসময়, ধ্বসিয়ে দিয়েছে আশ-পাশ, বেঁচে যাওয়াদের ঝলসে যাওয়া দেহ, দগদগে ক্ষত মুছবে কিভাবে!

এরকম একটি কারখানার ভয়াবহ আগুন যে পানি বা গ্যাস দিয়ে নেভানো সম্ভব নয়, আরো আধুনিক প্রযুক্তি দরকার, তা কর্তৃপক্ষের ৩৪টি লাশের বিনিময়ে জেনেছে। কিন্তু এ জানার বিষয়টি তারা ভবিষ্যতে কাজে লাগাবে, নাকি সনাতনী ধারায় চলবে-এই বিষয়টি মোটেই পরিষ্কার নয়। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরেও কারখানা থেকে নিখোঁজদের এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আরো অনেক ঘটনার মত সম্ভব হবে না, আত্মীয়-পরিজনরা এটি জেনে গেছেন। এখন অসহায় অপেক্ষা, কোন ক্ষতিপূরন বা আইনী সুবিচার তারা পাবেন কিনা?

উদ্ধার তৎপরতায় এই যে সক্ষমতার অভাব সবসময় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ায়। কিন্তু তাতে কি? মালিক পক্ষের কেউ তো আর ক্ষতির শিকার হয় না। রবীন্দ্রনাথের “সামান্য ক্ষতি” কবিতার কথা মনে আছে? সেখানে মাঘের শীতে রাণী স্নান করে শত সখী পরিবৃত হয়ে আগুন পোহাবেন বলে গরিবদের কুটিরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। রাজা ছিলেন সদাশয়, শাস্তিস্বরূপ রাণীকে করেছিলেন ত্যাগ। কিন্তু এ রাষ্ট্র তো গরীব-সাধারনের পক্ষে নয়, সুতরাং মালিক পক্ষ ‘সামান্য ক্ষতি’ করলেও  আখেরে আইনও তাদের কিছু করতে পারে না।

বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, বার বার এরকম বীভৎস ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে মেনে নেয়া হবে? এটিকে নিছক দুর্ঘটনা থাকবে, নাকি পাইকারী হত্যাকান্ড হিসেবে অভিহিত করা হবে? রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা, মালিকদের সীমাহীন লোভ-অবহেলার কারনে বছরের পর বছর যে প্রাণহানিগুলো ঘটছে সেগুলি তো আসলে এক ধরনের মুনাফালোভী হত্যাকান্ড! আরো বড় প্রশ্ন, আগামীতে কি অপেক্ষা করছে? দেশের অনিরাপদ শিল্প-কারখানাগুলি কবে কর্মরতদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে?

শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির ঘটনা তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। তথ্য জানাচ্ছে, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বেশিরভাগ বাংলাদেশে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সারাবিশ্বে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বড় রকম ছয়টি দুঘটনার তিনটিই এই দেশে। এই দশকে শিল্প দুর্ঘটনায় নিহত এক হাজার ছয়’শ জনের মধ্যে এক হাজার দুই’শ জনই এই দেশের। সে হিসেবে নিহতের আশি শতাংশ হতভাগ্য বাংলাদেশের।

শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনার নামে এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে সাধারন মানুষ ও দেশকে। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে রাস্তায় নামে পরিজনরা, সামনে নিয়ে অনিশ্চিত দিন-রাত। দেশের ভাবমূর্তি হয়ে পড়ে কালিমালিপ্ত। বিনিয়োগের সম্ভাবনা নষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক মহল রপ্তানির ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেয় নানা বিধি-নিষেধ। কোন কোন দেশ রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করে এসব ঘটনা। অন্তিমে যাই ঘটুক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ।

স্পেকট্রাম, তাজরীন, রাণা প্লাজা মাঝখানে ছোট-খাট অনেকগুলো এবং সবশেষ টাম্পাকোর ঘটনা বলে দিচ্ছে এরকম মৃত্যুকূপ আরো অনেক থাকতে পারে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এরকম ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। এগুলিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালানো অপপ্রয়াস মনে করিয়ে দেয় নিদারুন অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কথা। যদি পাঁচ বছর বা তারও পরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে তাহলে তা দুর্ঘটনা হতেও পারে। মনে আছে, রাণা প্লাজার ঐ ঘটনার পর পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ কবুল করে নিয়েছিল যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে ২০৫ টির মত দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান জাতীয় সংসদের শতাধিক সদস্য বিভিন্ন শিল্প-কারখানার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিক। রাষ্ট্র যদি সংসদে শিল্প-কারখানার নিরাপত্তায় বিশেষ কোন আইন করতে চায়, তাহলে সংসদের তিন ভাগের এক ভাগ সদস্য চাইবেন না যে, এমন আইন হোক- যা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এই এক ভাগের সাথে অন্য সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করে দেয়। এজন্যই রাষ্ট্র ব্যর্থ। কারখানা নিরাপত্তার জন্য আইন রয়েছে। আইন ভাঙ্গা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শাস্তি হচ্ছে না।

সাধারন ধারনা হচ্ছে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় রাষ্ট্র, মালিক, শ্রমিক-সকল পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে সব মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। দু’একজন ক্ষতির সম্মখীন হচ্ছেন। উদাহরন, তাজরীন গার্মেন্টস মালিক। মালিকরা হচ্ছেন পুঁজির ধারক। রাষ্ট্র এই পুঁজির পাহারাদার। কার্ল মার্কস বহুকাল আগে বলে গেছেন, মালিকের উৎপাদনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা। শ্রমিক কল্যাণ বা মানবকল্যাণ, কোনটিই নয়। সেজন্যই তার কাছে হিসেব হচ্ছে মুনাফার, শ্রমিকের জীবন নয়।

পুঁজির বিবেচনায় মালিক নিশ্চিত হতে চান, মুনাফার পরিমান কত আসবে! যদি বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাংশ মুনাফা আসে, ভাল। যদি ৫০ শতাংশ আসে, তাহলে ঐ মালিক ফাঁসির দড়িতে লটকে যাবার মত ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না। এটি এখন আমাদের রাষ্ট্রেও প্রবল হয়ে উঠেছে। এখানেও মালিকরা বিবেচনা করছেন, কারখানার ১০ শতাংশ শ্রমিক কথিত দুর্ঘটনায় মারা গেলে কি পরিমান ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে!

এই ক্ষতিপূরণের পরিমান যদি তার মুনাফার চেয়ে কম হয় তাহলে শ্রমিকের জীবন গুরুত্ব পায় না। মালিক তখন বিবেচনায় নেন, শ্রমিক মরলে মুনাফা থেকে কিছুটা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর মারা না গেলে মুনাফার পুরোটাই তার। যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে উদাহরন রয়েছে, কারখানায় প্রতি বছর তিনজন শ্রমিক মারা পড়তে পারে। তিনজনের জন্য ৫০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। কিন্তু ঐ তিনজন যদি বছরে কারখানার মুনাফার এক লাখ ডলার নিশ্চিত করতে পারে তাহলেও ক্ষতিপূরণ দেবার পরে ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে। আর মারা না গেলে পুরোটাই মুনাফা। এই নগদ লাভের স্বার্থে মালিক পক্ষ ভয়াবহ ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হচ্ছেন না।

এই দেশেও এখন মুনাফার হিসেব-নিকেষ প্রধান হয়ে উঠছে। মালিক পক্ষ উৎপাদন এবং সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধ্বসে পড়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া বা যে কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে তারা শতাংশের হিসেব কষেণ। ধরা যাক, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা শতাংশের চারভাগ। বাকি ৯৬ ভাগ তাদের ভরসা হওয়ার কারণে মুত্যুকূপের মত ঐসব শিল্প-কারখানা টিকে আছে। এখানে প্রত্যাশিত মুনাফার তুলনায় ঝুঁকির বিষয়টি নগন্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ কারণেই আইন এর প্রয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইনের দুর্বলতা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, সবলতা নিয়ে ততটা হয় না। মূলত: প্রয়োগের অভাবে। এখানে সবকিছু নির্ভর করে নির্বাহী আদেশের ওপর। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া প্রায় কোন ঘটনায় নড়া-চড়া লক্ষ্য করা যায় না। রাণা প্লাজা ট্রাজেডির পর মালিককে গ্রেফতার, উদ্ধার তৎপরতার সমন্বয়-সবকিছুতেই লেগেছিল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, এটি অব্যাহত আছে এখনও প্রায় সব ব্যাপারেই।

এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা তৈরী হয়েছে এই রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। সর্বোচ্চ নির্বাহীর দিকে তাকিয়ে থাকেন সবাই। কারণ, রাষ্ট্র-সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার তৈরীর বদলে ব্যক্তির ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে বসে থাকে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি যে সম্ভাবনা নয়, বরং সংকট-সেটি বার বার প্রমানিত হয়েছে। ‘চেইন অব কমান্ডে’র অভাব মূলত: এই নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয় সর্বোচ্চ ব্যক্তির দিকে। এর উৎস কি আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ? নাকি চর্চা-অভ্যাস, আনুগত্য বা চাটুকারিতার সব আমলের নিট ফলাফল?

বাংলাদেশ কী আসলেই লোপাট হওয়া অর্থ ফেরত পাবে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বারবার ঘোষণা দিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। কি আছে এই প্রতিবেদনে? কেন এত লুকোচুরি? ইত্যাদি প্রশ্ন আজ মানুষের মুখে মুখে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে কি আছে সে বিষয়ে এখনো কেউ নিশ্চিত নন। এমনকি ফিলিপাইন সরকার, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, অর্থ আদান-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সুইফট কেউই এ বিষয়ে জানেন না। যদি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশের সূত্র পাওয়া যায় তাহলে ফিলিপাইন, ফেডারেল রিজার্ভ বা সুইট তা থেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে; তারা বাংলাদেশের অর্থ ফেরত দিতে চাইবে না; এ বিষয়ে গড়িমসি করবে-বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এমনটিই মনে করেন। তবে রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদনে যদি ভালো কিছু থাকে অর্থাৎ বাংলাদেশের কেউ জড়িত না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তাতে অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে তো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তবে সেক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভ, সুইফট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। কারণ এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা বা না করা উভয়ই বিপজ্জনক। একদিকে মানুষ জানতে চায় মূল বিষয়টা কি ঘটেছে। আর তার অগ্রগতিই বা কতদূর। সেটা জানা গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। অন্যদিকে প্রকাশ করলে সমস্যা হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হবে। আর দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের দোষ না হলে ফেডারেল রিজার্ভ বা সুইফটের দুর্বলতার কারণে ঘটলে তারা বলবে এটা কেন চট করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলো। এ বিষয়ে তারা খারাপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে। এছাড়া এ বিষয়ে সিআইডি তদন্ত করছে। তাদের তদন্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রিজার্ভ চুরি বিষয়ে ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। যার প্রধান করা হয় সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- বুয়েটের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। গত ২০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর কাছে অন্তবর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেন এই কমিটি। ৩০ মে দেওয়া হয় পুরো প্রতিবেদন। এর পর অর্থমন্ত্রী একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের কথা বললেও সেটি আর প্রকাশ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেয় সাইবার অপরাধীরা। এরমধ্যে ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরুতেই আটকে দেয় এবং পরে তা ফেরত দিয়েছে। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখার কয়েকটি হিসাব থেকে চলে যায় ওই দেশটির ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইনের বিভিন্ন সংস্থা চুরি যাওয়া অর্থের কিছু অংশ নানাভাবে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া সেই অর্থের মধ্য থেকে ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত পেতে ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশের একটি আবেদন বিচারাধীন ছিল। বাংলাদেশের হয়ে আবেদনটি করে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) ও ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্ষতি দেখানো হয়নি। বরং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের হিসাবে (ব্যালান্সশিট) ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা এক ধরনের শ্রেণীকৃত সম্পদ। এই অর্থ আদায় হওয়া বা না হওয়ার ওপর নির্ভর করে চলতি অর্থবছর শেষে চূড়ান্ত হিসাবে নেওয়া হবে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস গত বছরের তুলনায় ১টি কমিয়ে ৪টি করা হয়েছে। তবে এই বোনাস তারা পাবেন পুরনো বেতন কাঠামোর মূল বেতনের হারে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ব্যালান্সশিটে কীভাবে দেখানো হবে বিষয়টি বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্স মিশনের সঙ্গে গত জুনে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্স মিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে চুরি হওয়া অর্থ ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসাবে ব্যালান্সশিটে রাখার জন্য বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়। ফলে পর্ষদ এটি অনুমোদন করে।

পর্ষদ সভায় জানানো হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (এফআরবি) নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাক হয়ে যায়। এর মধ্যে শ্রীলংকা থেকে ২ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া গেছে। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এখনো পাওয়া যায়নি। ওই অর্থ এফআরবির নিউইয়র্ক শাখায় আলাদা একটি হিসাব খুলে ইতোমধ্যে প্রটেস্টেড বিল হিসাবে রাখা হয়েছে, যা অন্যান্য সম্পদের শ্রেণিভুক্ত। সার্বিক বিবেচনায় আইএমএফ টেকনিক্যাল কমিটি সুপারিশে বলেছে, চুরি হওয়া অর্থ তাৎক্ষণিক ক্ষতি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যাংকের ইক্যুয়িটির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এটি করা সমীচীন হবে না। কারণ চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে জোর চেষ্টা চলছে। তাই এখনই ক্ষতি হিসেবে তা দেখানো ঠিক নয়।

আইএমএফের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির মামলার আর কোনো অগ্রগতি না হলে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে আর কোনো হিসাবায়ন না করে প্রটেস্টেড বিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে নোট হিসেবে এটি সন্নিবেশন করা যেতে পারে। আগামী অর্থবছর থেকে এর যৌক্তিক হিসাবায়ন করা উচিত হবে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস ‘ইনসেনটিভ বোনাস’ ৪টি মূল বেতনের সমপরিমাণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই বোনাস তারা পাবেন পুরনো স্কেলের মূল বেতন অনুসারে। এর আগে পরপর দুই অর্থবছর তাদের ৫টি করে উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে তারা যে বেতন কাঠামো ভোগ করতেন তার মূল বেতনের হারেই তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লোপাট হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের সবটাই ঢুকে পড়েছে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইন সিনেটের বিশেষ কমিটির শুনানির পরে একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী রাষ্ট্রীয় তহবিলে ওই অর্থের দেড় কোটি ডলার ফেরত দিয়েছেন। তবে প্রথমে শুনানিতে তিনি বলেছিলেন, তার হাতে পড়েছে সাড়ে তিন কোটি ডলার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ব্যবসায়ী আর বাকি দুই কোটি টাকা ফেরত দেননি। কাজেই হদিসহীন রয়ে গেছে বিশাল অংকের বাংলাদেশী অর্থ। এই অর্থ উদ্ধারে এখন আর ফিলিপাইন তেমন একটা উদ্যোগী নয়, যদিও ফিলিপাইন সরকারের দিক থেকে নানা ইতিবাচক কথা বলা হয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বলা হয়, নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ, ইমপোর্ট বিল ও দাতা সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় এসব পেমেন্ট দেয়া হয়। চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে আগষ্ট মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল ম্যানিলা যায়। ফিলিপাইন সরকারের কাছে জমা দেয়া এক ক্যাসিনো মালিকের দেড় কোটি ডলার ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্যই ম্যানিলা যায় প্রতিনিধি দলটি। ফিলিপাইনের বিচার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিনিধি দলটি অর্থের মালিকানা দাবি করে আদালতে একটি হলফনামা জমা দিয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। প্রতিবেদনটি আমরা কমিটির কাছে দিতে বলেছি। কমিটির সব সদস্য মনে করেন, ৮ কোটি ডলার যেটা গেছে, সেটা তো গেছে। কিন্তু দেশের ভাবমূর্তি বড় বিষয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা জরুরি। কারা দায়ী, সেটা বের করতে পারলে অন্যান্য দেশও এ বিষয়ে সজাগ হতে পারবে। রিজার্ভ থেকে খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে’।

গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেয় অপরাধীরা। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার যায় শ্রীলংকায়, যা উদ্ধার করা হয়েছে বলে সে সময় জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখার চার হিসাবের মাধ্যমে চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোয়। এরই মধ্যে চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেড় কোটি ডলার বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগষ্ট মাসেই পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছিলেন ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ। কিন্তু সে অর্থও এখনো আসেনি, কবে আসবে বা আসবেনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি হবেই?

সিএনএন-এর বিশ্লেষন অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারত ও পাকিস্তান কি যুদ্ধে নামবে? প্রশ্নটা অনেক দিন থেকেই ছিল স্রেফ কথার কথা, প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দুই দেশই অনেক আগে থেকেই পরমাণু শক্তিধর; আর এটাই সেখানকার ১৪০ কোটি মানুষকে চেপে ধরে আছে। ২০ শতকের হানাহানির ধারাবাহিকতায় উভয় দেশই একাধিকবার যুদ্ধে নেমেছে, আবার তুলনামূলক শান্তির সময়ও অতিবাহিত করেছে।

কিন্তু তারপর?

এখন যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে নিছক আর অসম্ভব আর চাপাবাজি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, খুবই গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারত দাবি করছে, তারা পাকিস্তান-সংলগ্ন নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালিয়েছে। ঘটনাবলীর ভারতীয় ভাষ্য হলো, তারা একটি সন্ত্রাসী লঞ্চিং প্যাডে হামলা করেছে। আক্রান্ত স্থানটি কোনো সন্ত্রাসী ঘাঁটি ছিল না বলে পাকিস্তান দাবি করেছে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা তাদের দুই সৈনিকের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

সর্বশেষ যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে তা হলো ১৮ সেপ্টেম্বর ভারত-শাসিত কাশ্মিরে একটি সেনা ঘাঁটিতে হামলায় ১৮ সৈনিকের নিহত হওয়া। ওই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনা-বিষয়ক মহাপরিচালক ঘোষণা করেন, হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীরা ‘পাকিস্তানি চিহ্নযুক্ত’ সরঞ্জাম বহন করেছিল।

এই অভিযোগটি সামাজিক মাধ্যমযোগে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইট করেন, ‘পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, একে এই পরিচিতিতেই চিহ্নিত ও নিঃসঙ্গ ও এঘরে করতে হবে।’

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির মহাসচিব রাম মাধব ফেসবুকের আশ্রয় নেন : ‘একটা দাঁতের জন্য পুরো চোয়াল।’ তিনি দৃশ্যত, ভয়াবহ প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেছেন।

ভারতের অনেক টিভি চ্যানেলে ক্রমাগত যুদ্ধের সুর তোলা হতে থাকে, সেটা বাড়তে বাড়তে প্রাইমটাইমের প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়ে পড়ে। ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়, এমন একটি ইংরেজি সংবাদ চ্যানেলের হোস্ট অর্নব গোস্বামী পাকিস্তানের প্রতি তার ক্রোধ প্রকাশ করেন আরো প্রবলভাবে এই বলে : ‘তাদেরকে পঙ্গু করে দেওয়া দরকার, আমাদের উচিত তাদেরকে তাদের হাঁটুর মধ্যে নামিয়ে দেওয়া।’ তার অতিথিদের মধ্যে একজন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এক জেনারেল। তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে বলেন : ‘আমাদেরকে অবশ্য অ-সন্ত্রাসী পন্থায় পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে হবে।… জাতির একটু স্বস্তি দরকার।’

কিন্তু উভয় দেশে তৈরি হয়ে থাকা পরমাণু অস্ত্র ভান্ডার নিয়ে কী হবে? সেটা ভয় দেখানোর হাতিয়ার হয়েই থাকবে?

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জি ডি বকশির কাছে জবাবটা পরিষ্কার, ‘পাকিস্তান আকারে ভারতের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। আমরা আমাদের অস্ত্র ভান্ডারের অল্প কিছুও যদি প্রয়োগ করি তবে পাকিস্তানি পাঞ্জাব, যেখান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসে : ৮০০ বছরে সেখানে আর কোনো ফসল ফলবে না।’ তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘আসুন আমরা নিজেদের ভয় পাওয়া থেকে বিরত থাকি।’

পাকিস্তানও জবাব দিয়ে চলে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সরতাজ আজিজ এক বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা যেসব ভিত্তিহীন ও দায়িত্বহীন অভিযোগ করছেন তার দেশ সেগুলো সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করছে।’

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র সিএনএনকে বলেন, ভারত-শাসিত কাশ্মিরের পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের নজর সরিয়ে নিতে ভারত বেপরোয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি দৃশ্যত কাশ্মিরের বিক্ষোভ ও উত্তেজনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

পাকিস্তানেও উত্তেজনা চলছে। ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় এক ভারতীয় সাংবাদিককে সেখান থেকে চলে যেতে বলেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে।

বিরাজমান বাস্তবতা :

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অজয় শুল্কা বলেন, ‘আমরা যে বাগাড়ম্বরতা দেখছি, তা চালিয়ে নেওয়া খুবই সহজ।’ তিনি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার স্ট্যাটেজিক সম্পাদক।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর যে হামলাটি হয়েছে, সেটি পাকিস্তান থেকে হয়েছে বলে যে অভিযোগটি ভারত করেছে, এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। জানুয়ারিতে উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবে ভারতীয় আরেকটি ঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল। স্থানটি পাকিস্তান সীমান্ত থেকে বেশি দূরে নয়। তাছাড়া ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার কথা বলা যায়। তাতে নিহত হয়েছিল ১৬৪ জন।

ভারতীয় কর্মকর্তারা এইসব হামলার জন্য পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্কিত করা অব্যাহত রেখেছেন। আর ইসলামাবাদ তাদের যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে।

এ ধরনের যেকোনো হামলার সময়ই কড়া ভারতীয় প্রতিক্রিয়ার দাবি ওঠে। ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় (ভারত) সরকার জনসাধারণের চিৎকারে নয়, বাস্তবতায় চালিত হয়। তারা বোঝে, তারা যদি পাকিস্তানে হামলা চালায়, তা ভারতের অনুকূলে হবে না।’ শুক্লা উল্লেখ করেন, কোনো ধরনের হামলা চালানোর জন্যই কৌশলগতভাবে ভারত প্রস্তুত নয়। তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তা হলো ‘পরিকল্পনা-প্রক্রিয়ায় ব্যর্থতা।’ শুক্লার মতে, এই বাস্তবতা কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না যে, পাকিস্তানের রয়েছে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিক সম্পর্কের মধ্যে রয়েছি। যেকোনো ধরনের হামলার যে পরিণতি হবে, তা লোকজন কল্পনাও পারছে না।’

আগের যেকোনো হামলার চেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বরের হামলাটি ছিল সম্ভবত ভিন্ন। কারণ এবার প্রতিশোধ গ্রহণের দাবিটি ওঠেছে খোদ ভারত সরকারের ভেতর থেকে। ফলে মুখ রক্ষার জন্য হলেও কিছু একটা করা দরকার হয়ে পড়েছে।

ভারতীয় বিক্ষোভকারীরা ১৯ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

ভারতে যে বাগাড়ম্বরতা চলছে, তা পাকিস্তান লক্ষ করছে। ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক মোশাররফ জাইদী, যিনি একসময় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি বলেন, ‘ভারতে যে ব্যথা ও ক্রোধের আবেগ দেখা যাচ্ছে, তা বোধগম্য। কিন্তু হামলার মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা যে, হামলাকারীরা জৈশ-ই-মোহাম্মদের এবং গ্রুপটি পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের সাথে সম্পর্কিত- তা পুরোপুরি কান্ডজ্ঞান-বহির্ভূত, পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে পরিহাসমূলক বিষয়।’ জাইদী বলেন, পাকিস্তান হয়তো ১৯৯০-এর দশকে কাশ্মিরে সক্রিয় গ্রুপগুলোর প্রতি সমর্থন দিত, কিন্তু পাকিস্তান সে পথ থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে যে বক্তব্য রাখছেন, পাকিস্তানের নীতি এখন পুরোপুরি সে অনুযায়ীই চলছে। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে এটা হবে আত্মঘাতী নীতি। পাকিস্তান এখন তার অর্থনীতি জোরদার করার চেষ্টা করছে। দেশটি এখন নিজেকে চীনের মতো দেশের জন্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।’

পাকিস্তানকে নিঃসঙ্গ করার ভারতের কঠোর বক্তব্য উভয় পক্ষের যুদ্ধবাজদের জন্য হবে পোয়াবারো। জাইদির মতে, এ ধরনের বক্তব্য যুক্তির কথাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে সবশেষ খবর হচ্ছে, সীমান্তে উত্তেজনা এড়াতে দুই দেশের দুই নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।

বৈশ্বিক কূটনীতি :

কয়েক দশক নয়া দিল্লী পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল। দেশটি ছিল জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠা। লক্ষ্য ছিল দেশটিকে পরাশক্তির প্রভাব থেকে দূরে রাখা। কিন্তু সদ্য কারাকাসে অনুষ্ঠিত ন্যাম সম্মেলনে ১৯৬১ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটির প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এর বদলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকতে চেয়েছেন। ২০১৪ সালের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে তার আটবার সাক্ষাত হয়েছে, ২০১৬ সালে এখন পর্যন্ত তিনবার।

মোদির পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্টভাবে অনেক বেশি গোছালো ও সিদ্ধান্তসূচক। সম্ভবত এই কারণেই তার সমর্থকেরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অনেক বেশি শক্তিপ্রদর্শনমূলক পদক্ষেপ আশা করে।

তবে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই পুরোপুরি আচ্ছন্নকারী বিষয় হচ্ছে প্রবৃদ্ধি, কিন্তু যুদ্ধ নয়; আর সেটাই গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানকে আক্রমণ করার গণদাবির প্রতি ভারত কর্ণপাত করেনি এবং তা তার কৌশলতগত স্বার্থকে ভালোভাবেই রক্ষা করেছে।

সম্প্রতি প্রভাবশালী পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮১ ভাগ ভারতীয় মোদির প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে, ৬১ ভাগ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার পদক্ষেপকে সমর্থন করে; আর ৭৩ ভাগ ভারতীয় পাকিস্তানের প্রতি বিরূপ, ৫৬ ভাগ দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার পক্ষে।

বিশ্বের বেশির ভাগই আশা করে, মোদি জরিপের সংখ্যাটির দিকে নজর দেবেন, জ্বালাময়ী বক্তৃতা বা সামাজিক মাধ্যমের প্রতি নয়।

 

 

ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কী আদৌ শক্তিশালী : ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ

কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এখন প্রবল উত্তেজনা। এমন এক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

অনেক ভারতীয়ের কাছে তাদের দেশের কৌশলগত অবস্থানটাই উদ্বেগজনক। তাদের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী হলো চীন ও পাকিস্তান। অতীতে উভয়ের বিরুদ্ধেই তারা যুদ্ধ করেছে, সীমান্ত ইস্যু এখনো উত্তেজনাকর। উভয়ই পরমাণুসজ্জিত, একে অপরকে সহায়তা করতে জোটবদ্ধ। ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি জিডিপি-সমৃদ্ধ উদীয়মান পরাশক্তি চীন নিঃশব্দে ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাবে থাকা এলাকায় ঢুকে পড়ছে, উপমহাদেশজুড়ে ‘মুক্তার মালা’ জোট গড়ার প্রয়াস চালাচ্ছে। পাকিস্তান তুলনামূলক দুর্বল হলেও পরমাণু ঢালের আড়ালে সুরক্ষিত থেকে ইসলামি গেরিলাদের আশ্রয়দাতায় পরিণত হয়েছে, প্রায়ই ভারতীয় টার্গেটে আঘাত হানছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা অনেক দিন ধরেই আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

এ কারণেই ১৮ সেপ্টেম্বর যখন ব্যাপক অস্ত্রে সজ্জিত চার অনুপ্রবেশকারী একটি ভারতীয় সেনা ঘাঁটিতে প্রবেশ করে আত্মহত্যা করার আগে ১৮ সৈন্যকে হত্যা করল, তখন যৌক্তিক কারণেই আশঙ্কা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘাঁটিটির অবস্থান ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিতর্কিত সীমান্ত ‘লাইন অব কন্ট্রোল’-এর কাছাকাছি পর্বতমালার ঢালে। ভারতীয় কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়; প্রচন্ড জবাব দেয়ার দাবি জানাতে রাজনীতিবিদ আর বিশেষজ্ঞরা প্রতিযোগিতায় নামে। ‘অনুপ্রবেশ ঘটে, এমন প্রতিটি পাকিস্তানি চৌকি গোলায় উড়িয়ে দেয়া উচিত’- বলেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার, তিনি এখন ভারতীয় রাজধানী নয়া দিল্লিতে একটি থিঙ্ক ট্যাংকের কর্তা।

পাকিস্তানের প্রতি কঠোর হওয়ার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকার তার পূর্বসূরীদের মতোই নমনীয় পথ অবলম্বন করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর লঘু শাস্তির জন্য পাকিস্তানি দূতকে তলব করে হামলাকারীরা যে সীমান্ত অতিক্রম করে এসেছিল, তার প্রমাণ তুলে ধরে, উল্লেখ করে, চলতি বছর শুরু থেকে এ ধরনের ১৭টি অনুপ্রবেশ ভারত রুখে দিয়েছে। ভারতের ‘সৌখিন’ যোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক।

এমনটা হওয়ার যৌক্তিক কারণও রয়েছে। পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করে ভারত কূটনৈতিক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে।  পরমাণু বিস্তার এবং তার অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভালোভাবেই বোঝে, পাকিস্তানে তারা অস্বাভাবিক বৈরিতার মুখোমুখি হয় : দেশটির রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা এমন এক মাত্রায় রয়েছে যে, যেকোনো ধরনের ভারতীয় উগ্র ও হুমকিসৃষ্টিকারী আচরণ পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে থাকা উপাদানগুলোকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করে ফেলে, যা ভারতের নিজের স্বার্থেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

তবে সংযত থাকার জন্য আরেকটি, যদিও অনেক কম দৃষ্টিগোচর হওয়া, কারণ রয়েছে। সংখ্যা দিয়ে যতটুকু মনে হয়, ভারত সামরিকভাবে ততটা শক্তিশালী নয়। এটা একটা গোলকধাঁধা। দেশটির অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে তার আন্তর্জাতিক উচ্চাভিলাষ বাড়া এবং তার কৌশলগত অবস্থান উদ্বেগজনক থাকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, ভারত প্রমাণ করেছে, সে সত্যিকার অর্থেই সামরিক শক্তি গঠনে ‘‘বিস্ময়করভাবে অসমর্থ’’।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনী কাগজে-কলমে ভালোই দেখা যায়। চীনের পর সে-ই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী, বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিস্থিতিতে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে সে বিশ্বে অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষ দেশ হিসেবে বিরাজ করছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রসম্ভার সে সংগ্রহ করছে। রাশিয়ার যুদ্ধবিমান, ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র, আমেরিকার পরিবহন বিমান, ফরাসি সাবমেরিন আছে তার কাছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও বেশ ভালো কিছু জিনিস উৎপাদন করে। বিশেষ করে বলা যায়, জঙ্গিবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা। তাছাড়া কোচির শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে ৪০ হাজার টনের বিমানবাহী রণতরী।

 

শক্তির ভারসাম্যহীনতা

২০১৫ সালের সামরিক সামর্থ্য

সশস্ত্র বাহিনী

 

সক্রিয় রিজার্ভ আধাসামরিক পরমাণু অস্ত্র
ভারত ১৩ লাখ ১২ লাখ ১৪ লাখ ৯০-১১০
চীন ২৩ লাখ ৫ লাখ ৬ লাখ ২৬০
পাকিস্তান ৬ লাখ            – ৩ লাখ ১০০-১২০

প্রতিরক্ষা বাজেট

বিলিয়ন ডলারে জিডিপির হার
ভারত ৫১.৩ ২.৩
চীন ২১৪.৮ ১.৯
পাকিস্তান ৯.৫ ৩.৪

 

কিন্তু তারপরও ভারতীয় অস্ত্রসজ্জায় বড় ধরনের ফাঁক আছে। সত্যিকার অর্থেই ভারতের অস্ত্রশস্ত্র পুরনো বা অবহেলিত। ‘আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা রয়েছে করুণ দশায়,’ বলেন সামরিক বিষয়ক ভাষ্যকার অজয় শুক্লা। ‘সক্রিয় যেগুলো দেখা যায়, সেগুলোর সবই ১৯৭০-এর দশকের পুরনো জিনিস। চমকপ্রদ নতুন কিছু স্থাপন করতে হয়তো আরো ১০ বছর লাগবে।’ প্রায় দুই হাজার বিমান নিয়ে কাগজে-কলমে ভারতের বিমানবাহিনী বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম। কিন্তু ২০১৪ সালে প্রতিরক্ষা প্রকাশনা জেনস ডিফেন্স-এর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এগুলোর মাত্র ৬০ ভাগ উড়ার মতো সক্ষম। চলতি বছরের প্রথম দিকের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমান শাখার গর্ব বিবেচিত ৪৫টি মিগ-২কে বিমানের মাত্র ১৬ ভাগ থেকে ৩৮ ভাগের কাজ করার সামর্থ্য রয়েছে। যে রণতরীটি তৈরি করা হচ্ছে, সেটি থেকে এসব বিমান উড়বে বলে ধরা হচ্ছে। ওই বিমানবাহী রণতরীটি ১৫ বছর আগে অর্ডার দেয়া হয়েছিল, ২০১০ সালে উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা হয়েছিল। সরকারি নিরীক্ষকদের হিসাব অনুযায়ী,  প্রায় ১,১৫০টি পরিবর্তনের পর এখন সেটি ২০২৩ সালের আগে পানিতে ভাসবে বলে মনে হচ্ছে না।

এ ধরনের বিলম্ব কিন্তু মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৮২ সাল থেকে নতুন স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসাল্ট রাইফেল চাচ্ছে। কিন্তু আমদানি করা হবে, না দেশেই উৎপাদন করা হবে; অধিকতর ভারী গোলাবর্ষণ না বেশি ক্ষিপ্র- কোনটা হবে- তা নিয়ে অব্যাহত বিতর্কের মধ্যেই বিষয়টা আটকে রয়েছে। সোভিয়েত আমলের জীর্ণ মডেলগুলোর স্থানে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের জন্য ভারতের বিমানবাহিনী ১৬ বছর ধরে বলে আসছে। অতি-উচ্চাভিলাষী সরঞ্জাম, দরদাম, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের কোটা পূরণে প্রায় অসম্ভব হওয়া ইত্যাদি কারণে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর বিদেশীদের দ্বারস্থই হতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। চার বছর আগে ফ্রান্স ১২৬টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি করার অবস্থায় পৌঁছেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা কমতে কমতে নেমে এসেছে ৩৬-এ।

ভারতীয় সেনাবাহিনীরও রয়েছে দুর্নামের ইতিহাস। অতীতেও দুর্নীতি ছিল একটা সমস্যা। বিশ্লেষকেরা সত্যিই ভেবে অবাক হয়ে যান, গেরিলারা কিভাবে দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে বারবার প্রবেশ করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সেইসাথে যোগ হয়েছে জেনারেলদের পদোন্নতির জন্য প্রকাশ্যে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া, বেতন নিয়ে সোচ্চার হওয়া এবং অফিসারদের ওজন কমানোর নির্দেশ জারির মতো ঘটনাগুলো। গত জুলাই মাসে একটি সামরিক পরিবহণ বিমান ২৯ জন আরোহী নিয়ে বঙ্গোপসাগরে হাওয়া হয়ে গিয়েছে, এখন পর্যন্ত এর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গত আগস্টে একটি অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকা ভারতের নতুন ফরাসি সাবমেরিনের কারিগরি বিষয়াদির বিস্তারিত বিবরণ ফাঁস করে দেয়।

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আরো বড় সমস্যা হলো কাঠামোগত। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন বাহিনীর প্রতিটিই সত্যিকার অর্থেই সামর্থপূর্ণ। তবে সমস্যা হলো, তারা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে কাজ করে। শুক্লা বলেন, ‘কোনো বাহিনীই অন্য বাহিনীর সাথে কথা বলে না, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক কর্মকর্তারাও তাদের সাথে কথা বলেন না।’ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মন্ত্রণালয়টিতে একজনও সামরিক ব্যক্তি নেই। ভারতের অন্য সব মন্ত্রণালয়ের মতো, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও পরিচালিত হয় পরিবর্তনশীল বেসামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে, রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তরা আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে ব্যালট বাক্সের দিকেই বেশি নজর দিয়ে থাকেন। মন্ত্রণালয়টির পরামর্শক হিসেবে দায়িত্বপালনকারী অভিজিত আয়ার মিত্র বলেন, ‘তারা সম্ভবত মনে করে, সাধারণ যে কোনো চিকিৎসকই অস্ত্রোপচারও করতে পারেন।’ ক্রমবর্ধমান শাররীক শক্তি সত্ত্বেও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী এখনো যথাযথ বুদ্ধি-বিবেচনার অভাবে ভুগছে।

নদী-বন ধ্বংসে আর কতো বিনাশী আয়োজন

হায়দার আকবর খান রনো ::

ফারাক্কা বাধ যখন নির্মিত হয়, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। ফলে সেদিকে নজর দেয়ার সুযোগ আমাদের হয়নি। ভারত তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সাহায্য করেছিল, তা কখনোই ভোলার নয়। কিন্তু একই সময়ে ভারত যে বাংলাদেশের জন্য এতো বড় সর্বনাশ করে চলছিল, সেদিকটি দেখার সময়-সুযোগ অবকাশ কোনটাই হয়নি আমাদের। ভারতের উচিত হয়নি, ভাটির দেশের সাথে কোন রকম সমঝোতা না করে গঙ্গা নদীর উপর বাধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার তদানীন্তন পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশ) ভবিষ্যত স্বার্থ নিয়ে তো কখনোই মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথম বিপদের দিকটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার বিখ্যাত ফারাক্কা মার্চ বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করে তুলেছিল।

সেই জন্য মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতবিরোধী’ বলে বদনাম কুড়াতে হয়েছিল। কিন্তু জনগণের নেতা কুৎসার প্রতি কর্ণপাত না করে যা সত্য, জনগণের যা ন্যায্য দাবি তা তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি।

ভারত বিরোধীতার দুটো দিক আছে। একটি হলো- ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অন্ধভারত বিরোধীতা, যা পাকিস্তানি রাজনীতির সম্প্রসারণ মাত্র। ঐতিহাসিক কারণেই এই ধরনের ভারত-বিরোধীতার সাথে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি জড়িত থাকে; যা একদা মুসলিম লীগ করেছিল। জামায়াত ও বিএনপির রাজনীতিও তাই। অন্যটি হলো- ভারত একদা আমাদের স্বাধীনতার জন্য সাহায্য করেছিল বলে যে ভারতের সব অন্যায় আচরণ মেনে নিতে হবে, এ তো কোনো কাজের কথা হলো না। আমরা লক্ষ্য করছি, শাসকবর্গ ভারতের প্রতি একপেশে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে চলেছে। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং কিভাবে ঢাকায় অবস্থান করে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন সে কথা তো ফাঁস করে দিয়েছিলেন বর্তমান সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদ। এছাড়া প্রতিদিন ভারতের বিএসএফ যেভাবে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে, তা কি কোন বন্ধুত্বের লক্ষণ? বন্ধুত্ব কখনো একতরফা হয় না।

বাংলাদেশের জন্য ভারত সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর যে কাজটি করেছে তাহলো-ভাটির দেশকে বঞ্চিত করে গঙ্গা-তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি সরিয়ে ফেলা। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তা তারা পারে না। কিন্তু গায়ের জোরে করছে। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশ সরকার মৃদুকণ্ঠেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে না।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নদীশূন্য, এমনকি পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এমন আশংকা করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তথ্য, উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

মরার উপর খাড়ার ঘা। এবার ভারত ও বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রীয় কোম্পানী মিলে সুন্দরবনও শেষ করতে চলেছে। সুন্দরবনের গা ঘেষে বাগেরহাটের রামপালে যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে উজাড় পর্যন্ত হয়ে যাবে, এমন আশংকা করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। গণপ্রতিবাদও গড়ে উঠেছে দেশব্যাপী। কিন্তু সরকার জেদ ধরে বসে আছে, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ওখানেই করবে। ক’দিন আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা বলেছি, এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাতাসের তাপ বৃদ্ধি পাবে, ছাই ও কয়লার কণা বনাঞ্চলে ও নদীতে ছড়িয়ে পড়বে, পশুর নদীর পানি ব্যবহার করে তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে ইত্যাদি। এতো বড় সর্বনাশ না করার জন্য আমরা অনেক বলেছি। সরকার বলেছেন, ওসব নাকি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। তাদের উন্নত প্রযুক্তির কারণে নাকি কোনো ক্ষতিই হবে না। এমনকি সরকার একথাও বলছেন যে, রামপাল নাকি সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে। আমরা বলছি ১৪ কিলোমিটারের চেয়েও কম দূরত্বে (বাফার জোন ধরলে নয় কিলোমিটারেরও কম)। সরকার দূরত্ব নিয়েও অবান্তর কথা বলছেন।

এবার জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোও বলেছে, সুন্দরবনের নিকটস্থ রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে। এই প্রকল্প এবং মংলা বন্দরের পাশে আরেকটি প্রস্তাবিত প্রাইভেট কোম্পানীর কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে ইউনেস্কো আপত্তি জানিয়েছে। আপত্তির কারণ হিসেবে আমরা এ পর্যন্ত যে সকল কথা বলে এসেছি, সেই একই কথা তারাও বলেছেন। কারণ বিজ্ঞান তো দুই রকম হতে পারে না। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯০০ ফুট উচু চিমনি দিয়ে যে তাপ বের হবে তা বাতাসকে উত্তপ্ত করবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে নদীর পানি ব্যবহার করা হবে, তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে। প্রতিদিন অনেক জাহাজ যাতায়াত করবে। তার শব্দ দূষণ তো আছেই। তাছাড়াও নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য ৩৫ কিলোমিটার নদীপথ খনন করা হবে। এতে ৩ কোটি ২১ লাখ ঘনমিটার মাটি নদী থেকে উত্তোলন করা হবে। ফেলা হবে কোথায়? সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ গাছপালা জীববৈচিত্র দারুনভাবে হুমকির মুখে পড়বে। গত দুই বছরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেল, সার, সিমেন্ট ও কয়লাবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনার উল্লেখ করে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এতো দুর্ঘটনার পরও জাহাজ চলাফেরার ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল, তা নেয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারকে রামপাল প্রকল্প বাতিল করার জন্য আহবান জানিয়েছে। দেখা যাক, এবার সরকার কি করে?

জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। সেটি হলো- ফারাক্ক বাধ সংক্রান্ত। গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনটি বলছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুন্দরবনের নদীসমূহে মিষ্টি পানি প্রবাহ কমে গেছে। পানির স্রোতও কম। ফলে সাগরের লবণাক্ত পানি অনেক বেশি। ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনের গাছ কম জন্মাচ্ছে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকেই অনেক বিজ্ঞানী একথা বলেছিলেন। ফারাক্কার অন্যান্য বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়টিও ছিল। তাহলে সুন্দরবন ধ্বংসের প্রক্রিয়া চার দশকের আগের থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধ্বংসের বাকি কাজটি দ্রুতই সম্পন্ন হবে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার যেন ভারতের সাথে আলোচনা করে পদ্মার পানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। আমি জানি না, সরকার সেই উদ্যোগ নেবে কি না। অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। তারপরেও দেখা যাক, ভারত তাতে সাড়া দেবে কি না।

ফারাক্কার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের অনেক নদী হারিয়ে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার আটটি নদী এবং বাগেরহাটের ২৩টি নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের অপরিকল্পিত সুইস গেট নির্মাণের কারণেও চলনবিলের বিভিন্ন নদনদী ও বিল জলাশয় পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে তিস্তা নদীতে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে যে বাধ দিয়েছে, তাতে উত্তরবঙ্গের বহু নদী হারিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায়, প্রমত্ত পদ্মায় ধুধু বালি। তিস্তা নদীতে পানি নেই।

প্রকৃতিকে এইভাবে হত্যা করা বড় ধরনের অপরাধ, যে কাজটি ভারত সরকার নির্বিচারে করেই চলেছে।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে একদিকে আমরা পানিশূন্য হচ্ছি, অন্যদিকে খোদ ভারতের বিহারেও ব্যাপক বন্যা হচ্ছে। ভারতের অঙ্গরাজ্য বিহারের মুখমন্ত্রী নিতিশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। হায়! একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে। একদা নাকি উগ্রভারত বিরোধীরা ফারাক্কা বাধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য শ্লোগান  দিত। এখন স্বয়ং ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একই কথা বলছেন।

বস্তুত ইঞ্জিনিয়ারিং দিক দিয়ে ফারাক্কা একটি ব্যর্থ প্রকল্প। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য এই বাধটি নির্মাণ করা হয়েছিল; কিন্তু তা সফল হয়নি। এখন এটাকে ভেঙ্গে ফেলা ও বন্ধ করাই উত্তম হবে। বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের জনগণের স্বার্থে, কল্যানে। পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলাই উচিত, এটা হচ্ছে আধুনিক চিন্তা। পরিবেশকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু পরিবেশের উপর জবরদস্তি করতে গেলে ফল খারাপ হবে। এই উপলব্ধি কি ভারত-বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের আছে?