Home » সম্পাদকের বাছাই (page 4)

সম্পাদকের বাছাই

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী আদৌ সক্ষম?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারন নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এখনকার জেনারেশন ভুলে গেলেও প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামানের “বিপুলা পৃথিবী” গ্রন্থ করতে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল। ড. আনিসুজ্জামান তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। লিখেছেন তিনি, “…. ৭ মার্চ ১৯৭৩ দেশের প্রথম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের সন্নিহিত এলাকায়। দুই গাড়ি করে আমরা একসঙ্গে ভোট দিতে গেলাম-উপাচার্য ইন্নাছ আলী, রেজিষ্টার মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, ইংরেজী বিভাগের মোহাম্মদ আলী আর আমি। স্বাধীন দেশে এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি-মনের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেলো। জানলাম, আমাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে”।

এক. বলা যায় ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগন তার স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশ করুক। শাসকশ্রেনী সবসময়ই ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন-শক্তিশালী, যোগ্য করে তুলতে চায়নি। সেই থেকে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রু টি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও এটি গ্রহনযোগ্য মান অর্জিত হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও  অর্থাৎ ২০০৮ সালে হুদা কমিশন যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিবাচকতা অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। যার একটি বড় উদাহরন দশম জাতীয় সংসদ  নির্বাচন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? সঠিক সময়ে, সব দলের অংশগ্রহনে মানসম্মত একটি নির্বাচন কি হবে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম? সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে অজস্র প্রশ্নবোধক ঝুলিয়ে দিয়েও তারা মনে করছেন, ঐ নির্বাচন সুষ্ঠ এবং অবাধ হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের আস্থা অর্জনে সক্ষম হলেও অন্যান্য দল ও জোটের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, যা এখন আজ-কালের ব্যাপার। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত বছর ২৪ আগষ্ট থেকে শুরু করে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে। আলোচনাকালে দলগুলি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রায় সাড়ে চার’শ প্রস্তাব উপস্থাপনা করেছিল। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটি ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসছে, এবং আসতেই থাকবে অন্তত: নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে; ১. নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? ২. নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে? ৩. নির্বাচনী আসনের সীমানা পুন:নির্ধারন করা হবে কিনা? ৪. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হবে কিনা? নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দল ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। সম্প্রতি ড. কামালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট, যার বড় অংশীদার বিএনপি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্বাকালীন সরকার প্রশ্নে একই মেরুতে।

সরকারী দল ও তার মিত্ররা বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। তারা সবাই এখন এটিকে ‘সাংবিধানিক’ মনে করছেন এবং এর বাইরে চুল পরিমানও নড়বেন না-এই বক্তব্য জোরে-সোরে জানান দিতে ভুল করছেন না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি জোরে-সোরে তুলেছেন। এজন্য তারা প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের কথাও বলছেন।

নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য মনে করে নির্বাচনে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে নিয়োগের প্রয়োজন মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং ক্ষমতাসীন দলও তাই চায়। এ ব্যাপারে অন্যান্য দলের অবস্থান অনড়, তারা ইভিএম ব্যবহার চান না। সীমানা পুন:নির্ধারন প্রশ্নেও তাদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে।

দুই. জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পর বিরোধী দাবি মেটানোর ক্ষমতা কমিশনের কতটুকু আছে এবং সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার ‘ইচ্ছাশক্তি’ আদৌ আছে কীনা? যদিও সুপ্রীমকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা আছে, সুষ্ঠ-অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন যে কোন আইন করতে পারবে – কিন্তু কোন কমিশনই এ পর্যবেক্ষণকে আমলে নিয়ে কোন আইন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং এই নির্বাচন কমিশনও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নতুন কোন নজির স্থাপন করবে বলে আভাস মেলেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের অতীত বলে, এখানে সবসময় নির্বাচন কমিশন সেই কার্যক্ষমতাই দেখিয়েছে, যেরকমটি নির্বাচনকালীন সরকার চেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলীয় হলে তাদের বিজয়ই অক্ষুন্ন থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। সে অর্থে নির্বাচন কমিশন সব সময় দলীয় সরকারের ইচ্ছেকেই প্রধান্য দিয়েছে।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলেও তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন সেভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্বাধীন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বাংলাদেশে তার কোন প্রমান অতীতে কোন নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলতে পারবে, নির্বাচনকালীন সরকারের ইচ্ছেকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়াসী হওয়ার মত সাহস বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেখাবে- আপাতত: এর চেয়ে দুরাশা আর কি হতে পাবে!

সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে অন্তত তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা অর্জণ করতে পারে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সরকারী কাজে গিয়ে নির্বাচন প্রচারনা চালাচ্ছেন, এটি মেনে নিয়ে কমিশন পূর্বতনদের নজির অব্যাহত রাখছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, অনুকূল পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত: নির্বাহী বিভাগের লাগামটি টেনে ধরতে পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হয় না। ইতিপূর্বে সিইসি আজিজ কমিশন, রকিব কমিশনের সাথে দৃশ্যত: বর্তমানটিও একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেলো নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীনতা ও পরাধীনতার যে নজির রেখে গিয়েছিল সেটি অব্যাহত থাকছে। ফলে ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটালে, মেরুদন্ড সোজা করে না দাঁড়ালে জনগনের আস্থা-বিশ্বাস সহসাই ফেরানো যাবে না।

তিন. এই দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনে কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। এখানে সংসদীয় ধারার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পিষ্ট করেছে জনগনকে। ফলে ক্ষমতাসীন কোন দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারণ দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স প্রকাশিত “বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫” সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত: এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোন নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহুদুরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-১

আনু মুহাম্মদ ::

 ‘মানুষ ছাড়া বন বাঁচে

বন ছাড়া মানুষ বাঁচে না।

মানুষ ছাড়া নদী বাঁচে

পানি ছাড়া মানুষ বাঁচে না।।’

তাই একটি দেশের বস্তুগত উন্নয়ন কতোটা মানুষের জন্য তা বুঝতে শুধু অর্থকড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি দেখলে হবে না।

তাকাতে হবে বন নদী পানিমানুষসহ সর্বপ্রাণের দিকে

 

পুঁজিবাদের বিকাশ ও উন্নয়নের পরিসংখ্যান :

সন্দেহ নেই, গত চারদশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে সকল ক্ষেত্রে। গত দুদশকে এর বিকাশ মাত্রা দ্রুততর হয়েছে। ধনিক শ্রেণীর আয়তন বেড়েছে। কয়েক হাজার কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে, স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের একটি স্তর তৈরি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটেছে। এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় দেশের সমাজ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্র এখন পুঁজির আওতায়, একইসাথে একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অঙ্গীভূত।

পুঁজিবাদের এই বিকাশ নিয়ে সরকারি উচ্ছ্বাস সীমাহীন। উন্নয়নে সরকার সার্থক বলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অর্থনীতিবিদদের মধ্যে স্তুতিগানের কমতি নেই। এই স্তুতি বন্দনায় বিশেষভাবে ৭০ দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বই-এর কথা টানা হয়, নাম – বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট [1]  এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জে . আর. পারকিনসন। এই গ্রন্থে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের দর্শন অনুযায়ী তাঁরা পুঁজিবাদ বিকাশের সম্ভাবনাই বিচার করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্যে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের এমনই অবস্থা যে, যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন হয় তাহলে বিশ্বের কোথাও উন্নয়ন কোনো সমস্যা হবে না। এই হতাশাব্যঞ্জক কথার সূত্র টেনে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক তুলনা করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু স্বাধীনতার পর বিপুল প্রত্যাশা আর তার বিপরীতে রাষ্ট্রের যাত্রা নিয়ে সেসময়ের অন্য আরও কিছু বই আছে যেগুলোর প্রসঙ্গ টানলে বিশ্লেষণ ভিন্ন হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই।[2]  যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষণ করি, যদি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনা করি, যদি স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে যে তিনটি লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিলো সেই সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা- বর্তমান উন্নয়ন ধারায় কতটা অর্জিত হয়েছে তার বিচার করি, তাহলে উচ্ছ্বাসের বদলে উন্নয়নের গতিধারা নিয়েই প্রশ্ন আসবে। যদি ধনিক শ্রেণীর আয়তন ও জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি কতো নদী বিনাশ হলো, কতো বন উজাড় হলো, বাতাস কতো দূষিত হলো, মানুষের জীবন কতো বিপন্ন হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা ও বৈষম্য কতোটা বাড়লো, শ্রেণী-লিঙ্গীয়-ধর্মীয়-জাতিগত বৈষম্য নিপীড়ন কী দাঁড়ালো তার হিসাব করি তাহলে  উন্নয়নের সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি এবং মাথাপিছু আয় এখন বার্ষিক ১৬শ’ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।[3]  গত ১০ বছরের গড় হিসাবে বিশ্বের সবচাইতে উচ্চহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে নাওরু, ইথিওপিয়া, তুর্কমেনিস্তান, কাতার, চীন এবং উজবেকিস্তানে। এক দশকের গড় হিসাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০। তবে ২০১৭ সালের প্রবৃদ্ধি হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। বাংলাদেশের চাইতে বেশি, সমান ও কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হার অর্জনকারী অন্যদেশগুলো হলো: ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, আইভরিকোস্ট ও সেনেগাল।[4]

ভারতে মাথাপিছু আয় ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার গত এক দশক ধরে বেশ ভালো দেখালেও তার পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে সেখানকার অর্থনীতিবিদরা অনেক প্রশ্ন তুলছেন, বিতর্ক হচ্ছে। ডাটা-র গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।[5]  ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের তথ্য উপাত্ত পরিসংখ্যান হিসাব নিকাশ প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ অনেক বেশি থাকলেও বাংলাদেশে এনিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই, কোনো বিতর্ক নেই। সরকারি ভাষ্যের সাথে মেলে না এরকম যুক্তি, তথ্য,  প্রশ্ন আর বিতর্ক সরকার পছন্দ করে না বলে প্রায় সকল অর্থনীতিবিদ, থিংক-ট্যাংক, মিডিয়াও বিনাপ্রশ্নে সব গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। যাইহোক, কতটা এবং কীভাবে তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের অবকাশ থাকলেও জাতীয় আয় নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।

কোনো দেশের অর্থনীতিকে জিডিপি/জিএনপি এবং মাথাপিছু আয় দিয়ে পরিমাপ করায় বিশ্বব্যাংক- আইএমএফ-ই প্রধান পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। এই পদ্ধতি সারা দুনিয়ার কর্পোরেট শাসকদের প্রিয়, কেননা এতে অনেক সত্য আড়াল করা যায়। বিশ্বব্যাংকই সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো হল: (১) নিম্ন আয়ভুক্ত দেশ (মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত)। (২) নিম্ন মধ্য আয়ভুক্ত দেশ (১ হাজার ২৬ মার্কিন ডলার থেকে ৪ হাজার ৩৫ ডলার); (৩) উচ্চ মধ্যম আয় (৪ হাজার ৩৬ মার্কিন ডলার থেকে ১২ হাজার ৪৭৫ ডলার)। (৩) উচ্চ আয়ভুক্ত দেশ (১২ হাজার ৪৭৬ মার্কিন ডলার থেকে বেশি )।

মাথাপিছু আয়সহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে জাতিসংঘেরও বিভাজন আছে। তাদের মাপকাঠি অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ গ্রুপের পরের ধাপ উন্নয়নশীল (developing)) দেশ; এই পর্বের দেশগুলোকে কম (less developed) বা অনুন্নত (underdeveloped)  দেশও বলা হয়। তাদের সর্বশেষ  তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের  ৪৭টি দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকায়। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আছে ১৩টি, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের মধ্যে একমাত্র হাইতি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এশিয়ার মধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ছিল আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও নেপাল। জাতিসংঘের বিবেচনায় সবচাইতে দরিদ্র এবং দুর্বল দেশগুলো নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ গঠন করা হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ এই তালিকাভুক্ত হয় ১৯৭৪-৭৫ সালে।

৪৭ বছর আগে এই গ্রুপ গঠন করবার পরে এর মধ্যে মাত্র ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে পুরোপুরি বের হতে পেরেছে। এগুলো হল বতসওয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ এবং সামোয়া। জাতিসংঘের কমিটি বলেছে, আগামী ৩ বছরে আরও দুটি দেশ ভানুয়াতু এবং এ্যাঙ্গোলা এই উত্তরণের তালিকায় আছে। নেপাল এবং তিমুরও শর্ত পূরণ করেছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের বিষয়টি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী সভায় বিবেচনার জন্য রাখা হয়েছে।

গত ১৫ মার্চ জাতিসংঘের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, লাওস এবং মিয়ানমার প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য শর্ত পূরণ হয়েছে। আরও কয় বছর দ্বিতীয় দফায় শর্ত পুরণ করতে পারলে চুড়ান্ত ভাবে এলডিসি তালিকা থেকে এ দেশগুলো বের হতে পারবে।[6]

একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও যে টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে, মাথাপিছু আয় বেশি হলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে এবিষয় স্পষ্ট করে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে নানাদেশে। অমর্ত্য সেন এবিষয় পরীক্ষা নিরীক্ষা নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। মাহবুবুল হকের সাথে ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ ধারণা প্রবর্তন করেছেন, যার ভিত্তিতে জাতিসংঘ এখন নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। জোসেফ স্টিগলিজসহ মূলধারার বহু অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে জিডিপি ব্যবহারের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।[7]

ভারতের ভেতরেই রাজ্য থেকে রাজ্য তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎ পাওয়া যায়। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, মধ্যম আয়ের বিবরণে তারা বাংলাদেশ থেকে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের প্রায় সমান, মানে তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। মিয়ানমারও একইসঙ্গে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাবার শর্তপূরণ করেছে। নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চাইতে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবেনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরও খারাপ। সেজন্য মানব উন্নয়ন সূচকে নাইজেরিয়া বাংলাদেশেরও পেছনে।

প্রকৃতপক্ষে জি ডি পি দিয়ে একটি দেশের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিতরণ, পরিষেবার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কারণ যেকোনো লেনদেন ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধিতেই জিডিপি বাড়ে। কিন্তু এরজন্য সামাজিক ও পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হলে তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সেকারণে এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ  মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না, অর্থনীতির গুণগত অগ্রগতিও বোঝা যায় না।

যেমন চোরাই অর্থনীতির তৎপরতাতেও জি ডি পি বাড়ে কিন্তু সমাজের বড় একটা অংশের জীবন জীবিকা তাতে বিপদগ্রস্ত হয়। নদীনালা, খালবিল, বন দখল ও ধ্বংসের মাধ্যমেও জি ডি পি বাড়তে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘ মেয়াদে  টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে না, বরং অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এসব তৎপরতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় না বরং জীবনমান বিপর্যস্ত হয়। দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও বড় দেখায়, জিডিপির অংকও বাড়ে। একইসময়ে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ কমে এসেছে তার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু এই ব্যয়বৃদ্ধি আবার জিডিপি বাড়ায়। অনিয়ন্ত্রিভাবে গৃহীত বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুন্ঠন ও পাচারও জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

দ্বিতীয়ত, যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয়ের হিসাব বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। একটি পরিবার যদি দশ লক্ষ টাকা আয় করে, পাশাপাশি অন্য একটি পরিবার যদি দশ হাজার টাকা আয় করে তাহলে উভয় পরিবারের গড় আয় হবে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এতে কি দুই পরিবারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়? বর্তমান মাথাপিছু আয় হিসাবে আমাদের দেশে চার সদস্যের পরিবারের বার্ষিক গড় আয় হয়  প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ মাসে প্রায় ৫৭ হাজার টাকা। তারমানে বাংলাদেশের সকল নাগরিক শিশু বৃদ্ধ নারীপুরুষ সকলেরই মাথাপিছু আয় মাসে এখন প্রায় ১৪ হাজার টাকা! অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন  মানুষের মাসিক আয় এর থেকে অনেক নিচে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় যত শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ পায় তার মাত্র ৩০ শতাংশ। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]Just Faaland, J.R. Parkinson: Bangladesh A Test Case of Development, S. chand, New Delhi, 1977.

[2]মো: আনিসুর রহমান: পথে যা পেয়েছি, ২য় পর্ব, অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০০৪। একই লেখকের Anisur Rahman: The Lost Moment, UPL,Dhaka, 1993. Ges Nurul Islam: Development Planning in Bangladesh, UPL, 1981. এছাড়া আরও দেখুন- – – Rehman Sobhan and  Muzaffar Ahmed: Public enterprise in an intermediate regime: a study in the political economy of Bangladesh. Bangladesh Institute of Development Studies,  1980.

[3] বাংলাদেশ সরকার: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮।

[4]https://www.gfmag.com/global-data/economic-data/countries-highest-gdp-growth-2017

[5]Amiya Kumar Bagchi:“What an Obsession with GDP Denotes”, Economic & Political Weekly EPW, September 1, 2018.

[6] একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে যে, ভুটান, কিরিবাতি সাওতোম এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ইতোমধ্যে সব শর্ত পূরণ করে অর্থাৎ জাতীয় আয় এবং শিক্ষা-চিকিৎসার শর্ত পূরণ করে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে বের হবার এবং উন্নয়নশীল দেশ কাতারে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের নাম এখন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) জাতিসংঘের ইকনমিক এ্যান্ড সোশাল কাউন্সিল এ পাঠাবে, সেখান থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গিয়ে তা চুড়ান্ত হবে।

[7]`দীপ্তি ভৌমিক: জিডিপি- উচ্ছ্বাস ও বাস্তবতা। সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।: : Debra Efroymson: Beyond Apologies: Defining and Achieving an Economics of Wellbeing, March 2015, Institute of Wellbeing, Dhaka.

বাংলাদেশের চাইতে ভুটানের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও বেশি। তারপরও ভুটান জিডিপির এই হিসাব পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর নাম মোট জাতীয় সুখ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। এতে সর্বমোট ৯টি ক্ষেত্র বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয় : মানসিক ভালো থাকা, সময়ের ব্যবহার, সম্প্রদায়, জীবনীশক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা, জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। এছাড়া এসসব ক্ষেত্রের সাথে মাথাপিছু আয় সহ ৩৩টি নির্দেশক আছে। অন্যান্য নির্দেশক হলো নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, সাক্ষরতা, বাস্তুতান্ত্রিক বিষয় এবং ঘুম এবং কাজে ব্যয়কৃত সময়।

 

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি : চীন-ভারত দ্বন্দ্ব চরমে

আসিফ হাসান

আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতির বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশগুলোর অন্যতম চীন আর ভারত।  চীনের তুলনায় ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে থাকলেও  উদীয়মান শক্তির মর্যাদা  পেয়ে গেছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে উভয়েরই।  আবার দেশ দুটির প্রতিবেশীরা তাদের তুলনায় ‘লিলিপুট’। গালিভাররের কাছে এই লিলিপুটরাই আবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে। দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির উভয়ের কাছ থেকে তারা যেমন কখনও কখনও সহায়তা পাচ্ছে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলোমেলোও হয়ে পড়ছে।  বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা বড় ধরনের পরিবর্তনই যেন অবধারিত করে তুলেছে।

বর্তমানে সময়টা এমনই যে অন্য কিছু ভাবার মতো অবস্থাও নেই।  চীন-ভারতের উত্থানের কারণেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ভারত মহাসাগর। চীন প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে। তাকে ভারত মহাসাগরের বাইরে কিছুই যেতে দেবে না মার্কিন নেতৃত্বাধীন  শক্তি।  আর এ কারণেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হোক যুক্তরাষ্ট্র  তা চায়। কিন্তু চীনও হার মানার পাত্র নয়। দীর্ঘ দিন ভারতের আধিপত্যের এলাকা হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে সে হানা দিচ্ছে জোরালোভাবে।

শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি সরকার পরিবর্তন যেভাবে ঘটেছে, তাতে করে মনে হচ্ছে, ওহানে নরেন্দ্র মোদি আর শি জিনপিঙের অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকের রেশ ধরে উপমহাদেশে শান্তির বাতাসের চেয়ে অশান্তির ঝড়ই দেখা যাচ্ছে অনেক বেশি।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঘরোয়া ইস্যুগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিও ওঠে আসছে বড়ভাবে।  রনিল বিক্রমাসিঙ্গের সাথে মহিন্দা রাজাপাকসের দ্বন্দ্বে পেছন থেকে ভারত আর চীনের কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি অবধারিতভাবেই অনুভব করা যাচ্ছে। বিক্রমাসিঙ্গে ভারতপন্থী আর রাজাপাকসে চীনপন্থী। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার বিক্রমাসিঙ্গের বদলে রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করাটা দেশীয় পরিসরেই বিবেচিত হচ্ছে না।

কলম্বোতে এই পরিবর্তনের ফলে শ্রীলঙ্কায় প্রস্তাবিত ভারতীয় বিনিয়োগ, বিশেষ করে মাত্তালা বিমানবন্দর, কলম্বোর ইস্ট কন্টেইনার টার্মিনাল, কেরাওয়ালাপিতিয়ায় এলএনজি প্লান্ট, জাফনার পালালে বিমানবন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে। আর ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে। এই পরিবর্তন নিয়ে চীন যে খুশি, তা বেশ নিশ্চিত। গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্রবন্দরসহ চীনা প্রকল্পগুলোও প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ছিল। ঘরোয়া অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চীনা ঋণের দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব নিয়ে সরকার উদ্বেগে পড়েছিল। কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে সহিংসতা ও বিরোধিতাও সৃষ্টি হয়েছিল। এখন রাজাপাকসাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ফলে এই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেবে, বেইজিং সুবিধা পাবে। এতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নতুন গতি পাবে, চীনা বিনিয়োগ বাড়বে।

প্রেসিডেন্ট থাকার সময় চীনের প্রতি রাজাপাকসে ঝুঁকেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। অভিযোগ রয়েছে, তাকে বিদায় করতে কোমর বেঁধেই নেমেছিল দিল্লি। সফলও হয়েছিল। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে দান উল্টে গেল। বিক্রমাসিঙ্গে আউট, রাজাপাকসে ইন। ্রপরেও যে সবকিছু ঠিকঠাক তা বলা যাবেনা।

তাহলে কি মালদ্বীপেও একই ঘটনা ঘটবে? মালদ্বীপে যে অবস্থা ছিল তাতে আবদুল্লাহ ইয়ামিন হেরে যাবেন, তা কেউ ভাবেনি। যেমন ২০১৫ সালে ভাবেননি রাজাপাকসে। কিন্তু নির্বাচনী সমীকরণ মেলাতে পারেননি রাজাপাকসে। ইয়ামিনও পারেননি। চীনের দিকে দেশকে বেশ ভালোভাবে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্ভব সবভাবে ভারতকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন। তার জের ধরে ক্ষিপ্ত হচ্ছিল পাশ্চাত্য বিশ্বও। তারা সবাই জোট বেঁধেছিল মালদ্বীপকে আবার নিজেদের বলয়ে ফিরিয়ে আনার জন্য।

মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে সবচেয়ে বড় মিলটি হলো উভয়েই দ্বীপ দেশ। আর তাদের অবস্থান ভারত মহাসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের একেবারে কাছে। এই রুটের নিয়ন্ত্রণ লাভ খুবই জরুরি। ফলে দেশ দুটির দিকে নজর একটু বেশিই।

মালদ্বীপে চীনাপন্থী প্রেসিডেন্টের পতনের কিছু দিনের মধ্যেই শ্রীলঙ্কায় পট পরিবর্তন কি বদলা নেয়া? এত দিন মনে হতো, চীন কেবল তার সফট পাওয়াই ব্যবহার করে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ঘটনায় কি মনে হয়, তারা ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছে? এমন আশঙ্কা কিন্তু আরো আগে থেকেই করা হচ্ছিল। মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কায় চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট শি’র ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য উভয় দেশই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এই দুটি দেশ অন্য দিকে গেলে চীনা উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি আঁতুর ঘরেই মরে যেতে পারে। ফলে নিজের দিক থেকে দেখতে গেলে মনে হবে, চীনের পিছু হটার সুযোগই ছিল না।

কিন্তু ভারত কি ছেড়ে দেবে? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ? এখানে ছাড় দেয়া মানে চীনের লাগাম ধরার পুরো পরিকল্পনাই ভণ্ডুল হয়ে যাওয়া।

একই কথা প্রযোজ্য নেপাল, ভুটানের ক্ষেত্রেও। এ দেশ দুটি আরো প্রবলভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল । ভুটান নিজ সিদ্ধান্ত কতোটা স্বাধীনভাবে নিতে পারে  সে প্রশ্নও ওঠে মাঝে মাঝে। নেপালও কাছাকাছি অবস্থায়। ভূবেষ্টিত দেশ দুটিকে ভারতের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়।  কয়েক বছর আগেও ভারতকে এই দেশ দুটি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এখন তার ঘুম হারাম হবার উপক্রম।

যদি বলা হয়, নেপাল এখন প্রায় ভারতের হাতছাড়া হয়ে গেছে, তবে বাড়িয়ে বলা হবে না।  কে পি ওলির নেপাল এখন দ্রুত গতিতে চীনের দিকে ঝুঁকছে।

ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিংয়ের অর্থনৈতিক এজেন্ডা হিমালয় অঞ্চলের এ দেশটির সাথে ভারতের সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির পর্যবেক্ষকরা  মন্তব্য করেছেন। সাবেক কূটনীতিক ও দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এসডি মুনি বলেন, তারা যদি তাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয় এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাইরে তাদের অর্থনীতিকে আরো সম্প্রসারণ করে, তাহলে ভারতের উপর নিশ্চিতভাবে এর প্রভাব পড়বে।

আবার গত বছরের দোকালাম-এ সামরিক অচলাবস্থার পর থেকে ভুটানে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণের দাবি উঠেছে। তাদের অভিযোগ ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের দ্বারা খুব বেশি  নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত । ফলে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিস্পত্তি করা যাচ্ছে না বলে অনেকে মনে করছে। তাদের মতে, ভারতই বাধা দিচ্ছে, নিষ্পত্তির দিকে না যেতে।

চীন ও ভুটান দু’দেশই দোকলামের উপর মালিকানা দাবি করছে। স্থানটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। ওই এলাকায় চীনা সৈন্যরা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারতীয় সেনারা গিয়ে বাধা দেয়। ভারতের কৌশলগত গুরত্বপূর্ণ ”চিকেন নেক” – শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে দোকলামের অবস্থান। এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো সংযুক্ত। ফলে এখানে ভারত ও চীনের ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে।

এদিকে, শেরিং যে অর্থনৈতিক রূপরেখা উত্থাপন করেছেন, তাতে করে অবধারিতভাবেই তাকে ছুটতে হবে চীনের দিকে।  ভুটানের তরুণরাও চাচ্ছে, তাদের দেশ যাতে কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত হতে চাইছে। আর তাতেই ভারতের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।

এক দশকের বেশি সময় আগে রাজা জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচক ভুটানে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালু করার পর থেকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার দেশটি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মাঝে থাকা ভুটানের অবস্থান কি হবে তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভারত যেহেতু এই অঞ্চলে তার ন্যায্য নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিসরনে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ভুটানে তার উপস্থিতি অতিমাত্রায় অনুভুত না হয়। ভুটানের জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থটিকেই মনে রাখতে হবে।

এমন প্রেক্ষাপটেই সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রাথমিক রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক ক্ষমতাসীন দল  পিপলস ডেমক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। জয়ী হন কিছুটা স্বাধীনচেতা ড. লোটে শেরিংয়ের দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি)।

এদিকে, চীনের সাথে সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে নেপালের। কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।  নেপালিরা যেন পণ করেছে, তারা ভারতের নাগপাশ ছিন্ন করবেই।  বিশেষ করে ২০১৫ সালের অঘোষিত অবরোধের পর নেপালি জনমত এখন প্রবল ভারতবিরোধী। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে চীন। তারা নানাভাবে নেপালে তাদের অবস্থান জোরদার করছে।

নেপাল ও ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে তাদের পক্ষে কোনোভাবেই ভারতের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা হলো একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তাতেই ভারতের ক্ষতি, চীনের লাভ।

এই লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে গিয়েই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নির্মমতার শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। ভূ-রাজনীতির যে খেলা চলছে মিয়ানমারে তাতে একটি বড় রণাঙ্গন হচ্ছে আরাকান রাজ্য। চীন সেখানে ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক জোন, তেলের ডিপো নির্মাণ করতছ ও আরো করতে চায়। কিন্তু পাশ্চাত্য কাজটি সহজে হতে দিতে চায় না। আর পরিণামে সেখানকার রোহিঙ্গারা দাবার ঘুঁটির মতো মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার হলো।

রোহিঙ্গাদের ওপর এমন অত্যাচার সত্ত্বেও  চীন ও ভারত  কিন্তু মিয়ানমারকে কাছে টানতে হেন কাজ নেই যা করছে না।  ভারতেরও অ্যাক্ট ইস্ট নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য মিয়ানমারকে প্রয়োজন।

 

সংলাপের ফলাফল : ধারনার বাইরে কিছুই ঘটেনি

আমীর খসরু ::

রাজনীতি নিয়ে সামান্য চিন্তা-ভাবনা করেন, ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন এবং সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা যাদের আছে- তারা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীনদের সাথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে গঠিত জাতীয় ঐক্যফন্টের ‘সংলাপ’-এর ফলাফল নিয়ে বোধকরি অবাক হননি। সংলাপের পরে ড. কামাল হোসেন যেমনটি বলেছেন, ‘বিশেষ সমাধান পাইনি’ এবং মির্জা ফখরুলের ‘আমরা সন্তুষ্ট নই’ ধরনের মন্তব্যের বিষয়টি আঁচ করা গিয়েছিল আগেই। কারণ ড. কামাল হোসেনের চিঠির জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে রাজি হওয়ার বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার একটি কথাই আগাম জানান দিয়েছিল যে, ‘সংবিধান সম্মত’ সব বিষয় নিয়েই তারা আলোচনা করতে রাজি। আর এই ‘সংবিধান সম্মত’ কথাটি উল্লেখ করেই সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, তার একটি  ইঙ্গিত   তাদের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়। ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দিয়েছে তার প্রথম দফাতেই-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে।

এছাড়া অপরাপর যে দাবিগুলো যেমন- নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ অন্যান্য বিষয় কতটা মানা হবে- তা যে কেউই বুঝতে পারবেন। একটি বিষয় বিবেচনা করলেই সংলাপের পুর্বাপর সম্পর্কে সবকিছু পরিষ্কার হবে যে, ক্ষমতাসীন দল ‘সংবিধান’ বলতে বিদ্যমান সংবিধানকেই গণ্য করে। ইতিপূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলসহ যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে- তা তারা বিবেচনায় নেবেন না, এটাই তাদের দিক থেকে স্বাভাবিক।

তাহলে সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, সে বিষয়ে যাবার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়ায় প্রয়োজন যে, বিএনপি যদি আন্দোলন সংগ্রামে যথেষ্ট শক্তিশালী ও সক্ষম হতো, রাজপথে সরব থাকতো, ক্ষমতাসীনদের সমান্তরাল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো,  প্রথাপ্রতিষ্ঠানগুলো  কিছুটা হলেও পক্ষপাতমুক্ত  হতো এবং রাজনীনৈতিক পরিস্থিতির ওপরে নূন্যতম নিয়ন্ত্রন থাকতো  তাহলে ঐক্যফ্রন্টের নামে তারা সংলাপে যেতোও না, এমনকি সংলাপ চাইতও না। এসব বিষয়গুলো অনুপস্থিত বলেই সংলাপ চাওয়া হয়েছে সমান্তরাল মাঠ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে।

সংলাপের ফলাফল বিষয়ে আরো দুটো বিষয় উল্লেখ করা জরুরি বলে মনে হয়- ১) সংলাপ সরকারের তরফে ডাকা হয়নি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সংলাপের আবদার করেছে। ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যাতে বিশেষ গুরুত্ব না পায় এবং অন্যান্য দলের সাথে সংলাপের মতোই সমান বলে বিবেচনা করা হয়, সে লক্ষ্যে  এখন সবার সাথে সংলাপ চলবে বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২) নভেম্বরের প্রথমের যেকোনো দিন তফসিল ঘোষণা করার আগে এ ধরনের সংলাপ চালিয়ে যেতে পারলে সরকারই লাভবান হবে, এ কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা- সব পক্ষের সাথে সংলাপ হচ্ছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে এবং এই লক্ষ্যে তারা যে কতোটা আন্তরিক, দেশী-বিদেশী সবাইকে এটা বোঝানো সহজ হবে বলে ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই বলা হচ্ছিল সংলাপের কোনোই প্রয়োজন নেই।

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে সংলাপের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়েছে- এমন নজির নেই বললে চলে। নব্বই পরবর্তী বেসামরিক শাসনের সময়কালেও অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেস দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতা এবং সংলাপ প্রচেষ্টাসহ এইবার ধরে এ সময়কালে অন্তত ছয়বার সংলাপ ও মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতের সংলাপে সভা-সমাবেশের অধিকারের যে কথা বলা হয়েছে তা এই প্রথম বলা হলো এমনটি নয়। প্রধানমন্ত্রী এর আগেও প্রকাশ্যে এমন কথা বলেছেন। আর গ্রেফতার-মামলা সম্পর্কে তালিকা চাওয়া হয়েছে। এই তালিকার ভবিষ্যৎ কি হবে সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সঠিক হবে বলে মনে করি না।

তবে বাহবা দিতে হয় এবং সাধুবাদ জানাতে হয় সেই সব মতলববাজ সংবাদমাধ্যম ও কতিপয় কথিত বিশ্লেষককে যারা এই সংলাপকে ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে জনমনে উচ্ছাস, উচ্চাশা, সমস্যা সমাধানের আশার-আলো জাগ্রত করার প্রানান্তকর চেষ্টা ও বড় কিছু পাওয়া যেতে পারে বলে ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বরাবরের মতোই-তাদেরকে। অবশ্য তারা এখনো যে থেমে থাকবেন, তা নয়।

আর সংলাপ ও নৈশভোজের নিট ফলাফল হচ্ছে- দু পক্ষের এক পক্ষ এখন ‘আন্তরিকভাবে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে; সমস্যার কিছু কিছু সমাধানও হয়েছে’ এবং অপরপক্ষ ‘পাইনি, হতাশ হয়েছি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে’- জাতীয় কথাবার্তা বলে সংলাপকে যে যার মতো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিএনপিসহ যেসব বিরোধী নেতারা টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে থাকেন তারা নেত্রীর বক্তৃতা শুনেছেন সামনাসামনি বসে।

খুব সংক্ষেপে সংলাপের ফলাফল হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভেদ, বিদ্বেষ, অনৈক্য ও চরম বৈরিতার ইতিহাসে আরো একটি নজির সৃষ্টি করা হয়েছে – যা জন-আকাঙ্খার সম্পূর্ণ বিপক্ষে, বিপরীতে।

চরমমাত্রার দমন-পীড়ন প্রহসন ও ভোট-ডাকাতির ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ : ক্যামেরুন স্টাইল

ফরেন পলিসি থেকে

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

রাজা না হয়েও পল বিয়ার বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ধরে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বহাল থাকাটা কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়। তিনি ক্ষমতায় আছেন ৩৬ বছর ধরে, এখন সপ্তম মেয়াদের জন্য ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশকে ‘‘পরিচালনার’’ করার আসল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। সাংবিধানিক পরিষদ তাকে ক্ষমতায় রেখেছে, বিষয়টি এমনও নয়। তিনি রীতিমত ‘‘নির্বাচনে জিতে’’ তবেই ক্ষমতার মসনদে আছেন!

বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতে, যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদন্ডেই গত ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ক্যামেরুনের নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ভয়াবহ রকমের কম। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভয়ের কারণে কোনো কোনো এলাকায় এক শতাংশেরও কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলে কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর পরিচালিত কঠোর দমন অভিযানের ফলে অনেক ভোটকেন্দ্র বন্ধ থাকে, বাকিগুলোতে মূলত সৈন্যদেরই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

তবে ওই  দেশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া আপনাকে জানাবে, নির্বাচন হয়েছে চমৎকার। আর তাদের বক্তব্যের সমর্থনে ’বাইরের পর্যবেক্ষকদের’ উদ্ধৃতিও দিয়ে হলেও প্রমাণ করতে চাইবে, নির্বাচন হয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ।

গত ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্যামেরুন রেডিও ও  টেলিভিশন (সিআরটিভি) একদল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সাক্ষাতকার প্রচার করে। এতে তারা দেশটির নির্বাচনের প্রশংসা করে একে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করেন। সিআরটিভিতে প্রদর্শিত ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নুরিট গ্রিনজার নামে অভিহিত এক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ক্যামেরুনের নির্বাচনকে ’চরমমাত্রার সুষ্ঠু’ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার ব্যবস্থা প্রতারণা করার কোনো পথ ছিল বলে আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

তবে এখানে একটু জটিলতা আছে বৈকি; ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ক্যামেরুনে কোনো নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠায়ইনি। আর সিআরটিভিতে যাকে দেখা গেছে, তার সাথে গ্রুপটির কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে খোদ ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ট্রান্সপেরেন্সি’র মুখপাত্র মাইকেল হর্নসবে বলেন, ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচয় দানকারী এই লোক কে, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। সংগঠনটির মুখপাত্র ফরেন পলিসিকে বলেন, তবে আমি মনে করি, বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করার পরও এক লোক বারবার বলছেন, তিনি আমাদের প্রশিক্ষিত লোক।

অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধতার রঙ দিতে স্বৈরশাসকরা নতুন পদ্ধতি হিসেবে এই আশ্চর্য ব্যবস্থাটিকেই ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার করছে। বহিরাগতদেরকে ব্যবহার করার এই বিশেষ কৌশলটি এখন দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আবার গণতন্ত্রী হিসেবে ভান করা দুনিয়ার সব স্বৈরাচারের মধ্যে পল বিয়া অন্যতম কড়িৎকর্মা। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনি অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বেশি ভুল করেছেন, কিন্তু তাতে তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল থাকতে কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না।

আফ্রিকায় গণতন্ত্র বিকাশে নিয়োজিত অমুনাফামূলক সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড আফ্রিকা’র নির্বাহী পরিচালক জেফরি স্মিথ বলেন, ক্যামেরুন ও অন্যান্য স্থানে সত্যিকার অর্থে যা ঘটছে তা অতি মাত্রায় অবমাননাকর, দমনমূলক। আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার কাজটি কোনো না কোনোভাবে করে নেবে।

এই কৌশলের মধ্যে যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য প্রধান শক্তি যাতে বিব্রতকর হওয়ার মতো কোনো অবস্থায় না পড়ে, সে দিকে নজর রাখা হয়। বিয়ার এলাকাটি ছোট হলেও অত্যন্ত শক্তিধর লবিং গ্রুপ আর গণসংযোগ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাইরের দুনিয়ার কাছ থেকে মর্যাদা কেনার প্রয়াসে তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির মিডিয়া ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সংস্পর্শ বজায় রাখে।

ক্যামেরুনে ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রথম নারী প্রার্থী কাহ উল্লাহ তার দেশকে ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের বিষয়টি মাথায় রেখেই ক্যামেরুনের বিরোধী দল বাস্তবে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, তার দল, আমলাতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও এমনকি বেসরকারি মিডিয়ার বেশির ভাগের (যেগুলো দলের ক্যাডার আর সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করে) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তিনি বলেন, ভোটের দিন আমাদের দলের প্রতিনিধিদের ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া হুমকি, ঘুষ প্রদানের ব্যাপার তো রয়েছেই। বিরোধী দল হিসেবে আমাদেরকে সারাক্ষণ ভোটকেন্দ্রগুলোর পাশে ধাওয়ার শিকার হতে হয়’’।

ক্যামেরুনের সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিল। এই পরিষদের সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান পল বিয়া। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই পরিষদের সদস্যদের অভিযোগ শোনার কথা ছিল। কিন্তু তারা প্রার্থীদের তাদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দাখিলের সুযোগ না দিয়েই চলে যান।

ক্যামেরুনের উচ্চমর্যাদার অ্যাংলোফোন মানবাধিকার আইনজীবী এনকোনখো ফেলিক্স অ্যাগবোর বাল্লা অতিসম্প্রতি সাংবিধানিক পরিষদে বলেন, যেকোনো নির্বাচনী চ্যালেঞ্জেই আসুক না কেন, রায় যাতে পল বিয়ার পক্ষে যায় সে ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছিলেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, বিচারকেরা যার ওপর নির্ভরশীল, তাকে তো আর ক্ষেপাতে পারে না, তারা তাদের প্রভূর বিরুদ্ধে যেতে পারে না। এসব লোক কখনোই বিয়াকে নির্বাচনে হারতে দেবে না।

বিয়া বছরের পর বছর ক্ষমতায় রয়েছেন তার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার এলিটদের কাছে টেনে, বিভক্ত বিরোধীদের দুর্বল করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে- যারা নির্বাচন নজরদারি করে, তাদের নতজানু করে।

সহিংসতা ও দীর্ঘ দিনের বেপরোয়া দুর্নীতি ক্যামেরুনের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিয়া তার পুনঃনির্বাচনের জন্য প্রধান প্রধান যুক্তি হিসেবে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকানের মতো প্রতিবেশীদের তুলনায় তার দেশের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।  স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাব-সাহারিয়ান আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নাটালি লেতসা বলেন, দশকের পর দশক ধরে বিয়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলে আসছেন, আমাদের প্রতিবেশীদের দিকে তাকান, নাইজেরিয়াকে দেখুন, কী বিশৃঙ্খলা চলছে। আমরা স্থিতিশীল, আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা গর্ব করার মতো শক্তিশালী দেশ।

তিনি বলেন, যেসব তথ্য সম্পর্কে দেশবাসী সহজে জানতে পারে না, সেগুলোই বিয়ার সরকার তোতাপাখির মতো আউরিয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচন : আবার ফিরে আসুক জনআস্থা ও শংকাহীন পরিবেশ

আমীর খসরু ::

গণতান্ত্রিক শাসন যে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ প্যাকেজ- তা জনগণের মনোজগত থেকে মুছে ফেলতে পারাটাই হচ্ছে  বিদ্যমান গণতন্ত্রের বড় সংকট। অনেক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণীর শাসকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টাটি অব্যহত ছিল যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাৎ নির্বাচনের অপরনাম গণতন্ত্র – এমন ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা। গণতন্ত্রকে সামগ্রিক বিবেচনা, পরিমন্ডল ও এর ব্যপ্তি থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারাটাই যেমন ওই শাসককূলের জন্য সাফল্যের বিষয়, তেমনি এটাই অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় ও জারী রাখা এবং শাসন ব্যবস্থায় জনঅংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা দূরে রাখার লক্ষ্যে ‘‘অগণতান্ত্রিক শাসন’’ একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম একট ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এর বিপরীতে ওই নির্বাচনকেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলে প্রতিষ্টিত করার যে প্রচেষ্টাটি শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়েছে। আর এখান থেকেই সামগ্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটের মধ্যে পড়ে। শুধুমাত্র ওই শাসন ব্যবস্থাই যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রও সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র এক কথা নয়, এটা হতেও পারে না। কিন্তু কতিপয় শাসক ও ক্ষমতাসীনদের সাফল্য হচ্ছে – ধীরে ধীরে এর বিপরীত কাছটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে পারা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের এক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি স্তর বা ধাপ হিসেবে গণ্য হতে হবে রাষ্ট্র এবং সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রায় বিদ্যমান গণতন্ত্র রয়েছে এমন রাষ্ট্রে কতৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র -এমন ধারণাটি এখন মোটামুটিভাবে জনমনেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর ফলে জনগণকে যেমন ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে বিতাড়ন করা যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব যে জনগণের বুঝ-ব্যবস্থার বিষয় বা এতে তাদের অংশগ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, তা মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে এমন ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে যে, জনগণ ভোট দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত প্রদান তাদের কর্ম নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মূল সংকট- যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।

নির্বাচনকেন্দ্রীক এই ধারণাটি এখন শুধুমাত্র আর দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রার গণতন্ত্রের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন দেশে কতৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যেও এটি সংক্রামিত হতে শুরু করেছে।

কাজেই গণতন্ত্রের এই পুরো অব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে জনগণকে বাদ দেয়া হচ্ছে,  শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অধিকার বিলুপ্ত হতে বসেছে এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তির’ পর্যায়ে নেই। আর এ কারণেই রাষ্ট্র এখন কতিপয়ের এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিও বিলুপ্তির পথে। এটি গণতন্ত্র তো বটেই, খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি সীমাহীন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের একটি বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান দুজন ব্যক্তি অর্থাৎ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিনকে স্মরণ করা যায়।

অমর্ত্য সেন ‘দ্য আউডিয়া অফ জাস্টিস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গনতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ সামির আমিন ‘প্রতিরোধের বিশ্বময়তা’ (ফরাসী ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থন’।

কাজেই গণতন্ত্র, শাসক, ক্ষমতাসীনদের মনের মধ্যে ও মনোজগতে সার্বক্ষণিক বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকতে হবে।

দুই.

বাংলাদেশেও আগামী জানুয়ারি নাগাদ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে এবং দেশে বিদেশে নানা মহলে। যদিও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদৌ সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে বিভিন্ন সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করেছে এবং জনগণকে ক্রমাগত ওই নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকেও দূরে সরিয়ে নেয়ার ও রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ গত কয়েক বছরের নির্বাচনগুলোর পরে জনমনে নির্বাচন সম্পর্কেই একদিকে যেমন শংকা, ভীতির সৃষ্টির হয়েছে, তেমনি নির্বাচন সম্পর্কে একটি অনাগ্রহের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি অনেকেরই বিশ্বাস যে, নির্বাচনে জনগণের অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ থাকতেই হবে- এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের এখন আর প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এবারের নির্বাচনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একই ঘটনার একইভাবে দ্বিতীয়বার আর ঘটে না।

তিন.

আগামী যে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনের একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাত্র মাস তিনেক আগে যেমন পরিস্থিতি, পরিবেশ ও প্রস্তুতি প্রত্যাশিত – তা নানা কারণে অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। বিরোধী দলগুলো থেকে বারবার বলা হচ্ছে- নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নেই। বিএনপি দাবি করছে, গেলো কিছু দিনেই নতুন করে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজারের বেশি মামলায় ৮৫ হাজার জনের নাম দেয়া হয়েছে। অজ্ঞাতনামা রয়েছে তিন লাখের বেশি। এসব মামলাকে গায়েবী বলছেন সংবাদমাধ্যমসহ অনেক বিশিষ্টজনরা। আগের মামলা তো রয়েছেই। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রীক একটি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের সমান সুযোগও অনুপস্থিত বলেই কার্যত দেখা যাচ্ছে। এর  সবকিছু মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশী-বিদেশীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি শংকা, সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এরই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অদ্ভূত এক জোটসঙ্গী এরশাদের কণ্ঠেও। গত শনিবার ঢাকায় এক জনসভায় খোদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না।’

শুধু যে রাজনৈতিক দল, দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন তা নয়, ঠিক একই সাথে জনগণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাশীল হতে চায়। এখন সরকারেরই দায়িত্ব হবে- হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থাকে পুনরায় যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রাটি আবার শুরু হোক-এমনটি প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অন্যায্য হবে না।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন : তাহলে প্রবল হবে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধুমাত্র শাসকদলই করে তা নয়, বিরোধী দল যখন পোলারাইজেশনের রাজনীতি করে- তখন সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবার সমান সুযোগ বিনষ্ট হয়, সেটাও প্রকৃতার্থে অবাধ নিরপেক্ষ হয়না।  অবাধ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু ধরনের মত ও পথ তৈরী হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যায্য ও নির্ভেজালভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রতিফলন ঘটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, জন্ম নিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হচ্ছে, ভোটের আগেই জয়লাভ নিশ্চিত ও ফলাফল অদৃশ্যভাবে নির্ধারণ করে রাখা। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুক্ষ্ম, স্থুল বহু ধরণের উপাদানে সমৃদ্ধ হতে পারে; কেন্দ্র ও বুথ দখল, জাল ভোট দেয়া, বুথ বা কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের কয়েকটি পদ্ধতির উদাহরন । আধুনিক গণতন্ত্রের এই যুগে ক্ষমতাশালীদের কেউ কেউ ও কোন কোন রাজনৈতিক  দল এ পদ্ধতি অনুসরন করে । ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল সুক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করে এবং কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে, নির্বাচনকালে গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনসহ সকল এ্যক্টর কোনভাবেই যেনো শাসকদলের নির্বাচনী নকশা বাস্তবায়নে শক্ত বাধা তৈরী না করে; বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধু স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অগ্রসর দেশেও ঘটছে। কিন্তু এসব অগ্রসর প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহ অধ:পতিত ভূমিকা পালন করেছেনা, কর্পোরেট বিনিয়োগ ও আনুকল্যে ওই নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ক্ল্যাসিক ‘কেইসে’ পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের শাসকদলের নক্সার এবং পদ্ধতির উত্তোরোত্তর বিকাশ ঘটছে। এই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেটা আমরা তুলে ধরবো।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের রাজনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের লক্ষ্য হচ্ছে- পূর্ব নির্ধারিত জয় ও ক্ষমতাকে রক্ষা করা। এটাকে কোনভাবে আমজনতার ভোটের উপর ছেড়ে না দেয়া। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে শুধু নিজের জয় নয়, জয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদন্ধীকে দমন ও অবরুদ্ধ করা। এমনকি তার রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা। এর সাথে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর কর্তৃত্ববাদী অহং। এই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অহংয়ের কারণে স্বাধীনতা উত্তর প্রথমদিকে ডাকসু নির্বাচনে পরাজয় ও প্রয়াত আলীম রাজী, মেজর (অব:) জলিল সহ কয়েকজনের বিজয় মেনে নেবার গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায়নি। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ধারাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

এই অবক্ষয় ‘৯০ এর যে অলিখিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্ট্রি হয়েছে। এখানে দু’দলই সমানতালে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের  উপাদানগুলিকে বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। আজকের শাসকদলই শুধু নয়, দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অন্য দলটিও সেই অবক্ষয়ের জন্য সমান দায়ী। নির্বাচনকালীণ কেয়ারটেকার সরকারকে ম্যানিপুলেট করতে গিয়েই ওই দলটি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। তারপরের ইতিহাস সকলের জানা- বিএনপিকে তাদের নিয়ন্ত্রন মুক্ত নির্বাচনে ক্ষমতায় হারতে হয়েছিল এবং নির্বাচনের ফলাফলকেও মেনে নিতে হয়েছিল। তারপর ২০১৪ নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে সংঘাত ও দ্বন্ধের নতুন অধ্যায় তৈরী হল। রাস্তার আন্দোলন ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বিএনপি নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, আর শাসকদল রাষ্ট্রশক্তিতে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের কর্তত্ব প্রতিষ্ট্রায় সফল হয়। এ সফলতা একদিকে যেমন আওয়ামীলিগকে কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত করে, অন্যদিকে, বিএনপিকে পরিণত করে দিশাহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট দলে ।

এখন প্রশ্ন শাসকদল  আওয়ামী লীগের এই আপাত সফলতার রাজনৈতিক ফ্যাক্টর গুলি কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারত ফ্যাক্টরকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এটা ইতিহাসের আয়রণি, দু’তিন দশক আগেও ভারত বিরোধীতাই ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা আরোহণের মুখ্য উপায়। এখন ভারতের আস্থা ও সহযোগিতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে পড়েছে। কেন এমন হলো? বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেকটা নির্বাক ভূমিকা পালন করেছে কার্যত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার জন্যে। এছাড়া ভারতের আরো শক্তি অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ভারতের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমান শাসকদল এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করতে দক্ষতা দেখিয়েছে। আভ্যন্তরীণভাবে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা শক্তিশালী শাসক হিসেবে সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। যুদ্ধপরাধীদের বিচার এর মধ্যে অন্যতম। দ্বিতীয়ত: পরপর দু’টার্ম ক্ষমতায় থাকার কারনে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সংকটকালে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কতোটা আনুগত্য বজায় রাখবে, সহায়ক ভূমিকা নেবে তাতে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি ভোটের বাক্সে তারা আওয়ামীলীগ প্রদত্ত সুবিধার কতটা প্রতিদান দেবে তাতেও সংশয় রয়েছে। হামজা আলাভী নামে একজন মার্ক্সবাদী বিশ্লেষক বাংলাদেশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার উত্তর ঔপনেবেশিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ঔপনেবেশিক লিগ্যাসি থেকে বের হতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের হাতে নাগরিকদের নিপীড়নের যন্ত্র। গত দশ বছর আওয়ামীলীগ ঔপনেবেশিক লিগ্যাসিকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রশক্তিতে নাগরিকের বিরূদ্ধে আরো নিপীড়নমুলক করেছে। এর পটভূমিতে ২০১৯ সনের ৪ঠা জানুয়ারীর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোথায় আছি? কিন্তু সন্দেহ নেই এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল ও বিচিত্র উপাদানে সমৃদ্ধ। বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ বা ২০১৯ এর মধ্যে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান এর দিকে এগুচ্ছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন কালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি ঘোষণা করেছে তারা খালেদা জিয়া ব্যতীত নির্বাচন করবে না। আওয়ামীলীগ মনে করেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নেবে। অগোছালো বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে, তাকে কিছু কিছু সিট ছেড়ে দিয়ে বিএনপিকে বিরোধী দলে আসনে বসিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার সরকার গঠন করতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও শাসকদল একটা যেনো  -তেনো নির্বাচন করে ফেলতে পারবে বলেই তাদের ধারনা। কাজেই বিএনপি’র এ উভয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত: ম্যাজিক সমাধান নেই। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাঝে ভোটের বাক্সের নীরব বিপ্লব কি সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। এরপর ২০১৮ আগষ্ট হয়ে পড়ল ঘটনা বহুল। এই ঘটনাগুলি এক. ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে  ঐক্যফ্রন্ট, দুই. ২১ শে আগষ্টের হত্যাকান্ডের রায়, তারেক জিয়ার যাবজ্জ্বীবন কারাদন্ড, তিন. নির্বাচন কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদারের ভিন্নমত ও বিরোধ। এই তিনটি ঘটনার কোনটিই আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কোন গুণগত পরিবর্তন  আনতে পারেনি। কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রণ্টের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রতিযোগিতায় নির্বাচন নিয়ন্ত্রনের আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জের একটা জানালা খুলে যেতে পারে। তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন বিএনপি নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব ও নিষ্ঠুরতাকে সামনে এনেছে। মাহবুব তালুকদারের বিরোধীতা এই নির্বাচন কমিশনের নৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অর্থনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের একটি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারাবার পর নেতৃবৃন্দ সহজ শিকার হন অর্থনৈতিক দূর্নীতির মামলায়। কাজেই নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে এ ধরনের হয়রানির আশংকা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা বন্টন করে যার প্রতিদান তারা ভোটের বাক্সে পেতে চায়। সুবিধা বন্টন শুধু ভোটারদেরকে নয়, যারা ভোটকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের কাছেও পৌছানো হয়, তার পরেও নির্বাচনে বিনিয়োগের ক্ষমতা সবসময় শাসকদলের অনেক অনেকগুনে বেশী থাকে। বর্তমান শাসকদলের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অর্থনৈতিক সুশাসনের ঘাটতি থেকে উৎসারিত হয়েছে বললে, তা বেশী বলা হবে না। বিদ্যুৎ রেন্টাল, নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মানসহ সকল সরকারী ব্যয়ই গুণগতভাবে প্রশ্ন সাপেক্ষ। কাজেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন একমাত্র সমাধান বলে সব শাসকদলই মনে করে।

অনিশ্চিত রাজনৈতিক সুশাসন : অবাধ, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর রাজনৈতিক সুশাসনের সুচনা হতে পারে। আর বিকাশ ঘটতে পারে রাজনৈতিক সুশাসনই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুশাসনের । মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুশাসন নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথকেই সুগম করে। কিন্তু সামনের নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবার সম্ভাবনা যেমন এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, তেমনি আস্থা তৈরী করতে পারেনি সবার মনেও। কাজেই রাজনৈতিক সুশাসনের অনিশ্চয়তা থাকবে কি থাকবেনা –তা বলার সময় এখনও আসেনি।