Home » শিল্প-সংস্কৃতি

শিল্প-সংস্কৃতি

শওকত আলী : ‘প্রদোষ’কালের পান্থজন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তরুণ শওকত আলী ঘুরেছেন অবিশ্রাম। বনে-বাদাড়ে, পথ-প্রান্তর, গ্রামীন অস্পৃশ্য জনপদ-বাদ যায়নি কোনকিছুই। লেখার প্লট খুঁজতে কলেজ শিক্ষকতার পাশাপাশি তার বেলা কেটেছে ওভাবেই। রাঢ় বঙ্গ, উত্তরের জনপদ, শহর আর গ্রামীন জীবনের নানান উপাখ্যান ধারণ করতে এই ঘোরাঘুরি স্বার্থক হয়ে ওঠে, যখন সুনিপুন দক্ষতায় শিল্পীর তুলির মত আঁচড় কাটেন মূর্ত বাস্তবতায়।

তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শোনা যাক- জায়গাটা ঠাকুরগাঁও জেলার বীরগঞ্জ। তেভাগা আন্দোলনের এলাকা। উত্তরাঞ্চলে শীত থাকে চোত মাস পর্যন্ত। বুড়ো সাঁওতাল, সবাই কান্ত মোড়ল বলে ডাকে, ‘৪৮’র কৃষক আন্দোলনে পুলিশের সাথে লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পা কাটা গিয়েছিল। বিকেলের মরে আসা রোদে মাঠে শুয়ে থাকে।

কান্ত’র পাশে বসে গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, শুয়ে থাকো কেন? ‘শুয়ে থাকতে হামার ভাল্লাগে’- নির্লিপ্ত জবাব কান্ত’র। কিরকম ভাল লাগে-শুধালাম। বল্লে, ‘আমি গান শুনতে পাই’। তারপর যে কথাটি বল্লে, বাংলা ভাষার কোন কবি এখনও বলেনি, ওরকম কবিত্বময় কথা। কান্ত জানালে, “মাটির তলার গান শুনতে পাই। বীজ ফেলা হচ্ছে, বীজ থেকে অঙ্কুর বেরুচ্ছে। একটা করে পাতা ফুঁটছে আর গান হচ্ছে। হামি সে গান প্রাণ ভরে শুনি”।

এটি আসলে কবিতা নয় বা কবিতার বিষয়ও নয়। অমন কবিতা কেউ লেখেনি কখনও। এটি পুরোটাই জীবনের গাণ।

সুনির্দিষ্টভাবেই এটি সুরিয়ালিজম বা স্বপ্ন-বাস্তবতার বিষয়। রিয়ালিজম’র বিস্তুৃতকরনটাই হচ্ছে, স্যুরয়ালিজম। যেখানে স্বপ্ন-বাস্তবতা, কল্পনা-মিথ পাশাপাশি থাকবে। আর যিনি লিখবেন, তার থাকবে সুনিপুন খনন দক্ষতা। প্রাক ও পরবর্তী ষাট দশক আমাদের সাহিত্য অবলোকন করতে শুরু করে সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন-বাস্তবতা। ইউরোপে যার সূচনা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। এই সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন বাস্তবতার খনন ও কথন দক্ষতা শওকত আলীকে আমাদের কথা সাহিত্যে করে তুলেছে মহত্তম।

শওকত আলী নিজেও জানাচ্ছেন, ‘আর্লি সিক্সটিতে যারা লেখালেখি শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে এটি পাওয়া যাবে’। তবে তার মতে, এই ধারায় ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) সবচেয়ে সফল। আশির দশকের শেষে দৈনিক কোলকাতায় শারদীয় সংখ্যায় শওকত আলী লিখেছিলেন, ‘তাবিজ’ নামের উপন্যাস।

এই উপন্যাসে শওকত আলী দেখিয়েছিলেন, মানবমুক্তির বিরুদ্ধে ধর্মাশ্রিত মিথ্গুলি কিভাবে কাজ করে। কিন্তু কোলকাতার কাগজ এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন; ‘তাবিজের নকশা’, ‘গরু’ এবং ‘জবাই’ শব্দগুলো বাদ দিয়েছিল। ফলে ১৯৯২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পুনর্বার এটি অবিকৃতভাবে প্রকাশিত হয়।

শওকত আলী নিজেই বলেছিলেন, “ওরা (কোলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকরা) ধর্মাশ্রিত মিথ্ আর মানবমুক্তির বিরোধটি বোঝেনি বলেই বিপ্লব হয়নি। বামপন্থা বিষয়টিই আধুনিকতা এবং প্রগতির ব্যাপার। মানুষের মুক্তির সংগ্রাম সব দেশে, সবসময় হয়েছে, রাশিয়া বা চীনে হয়েছে। ঠিক সেভাবে আমাদের দেশে হবে তা কিন্তু নয়”।

এখানকার ব্যর্থতা সম্পর্কে শওকত আলী জানাচ্ছেন, “… কিন্তু যারা বামপন্থার রাজনীতি করেছেন, কমিউনিষ্ট পার্টি করেছেন, তাদের প্রবলেম হয়েছে তারা ভদ্রলোকের ছেলে। কোলকাতার ঔপনিবেশিক কালচারের মধ্যে তারা লেখাপড়া শিখেছেন। আধুনিকতা বলতে ঐটাই বোঝায়। গ্রামের লোক মূর্খ-চাষা। চাষা শব্দটি হয়েছে গালি, ‘দুর ব্যাটা তুই একটা চাষা…’।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথক শওকম আলীর প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বামধারার “নতুন দিনের কথা” কাগজে। সেটি ছিল পঞ্চাশ দশকের মধ্যভাগ। এর পরে দীর্ঘ বিরতি। ‘৬২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস “পিঙ্গল আকাশ” এবং ৬৮ সালে প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ “উম্মুল ভালবাসা”।

১৯৪৭ এর বিভাগোত্তর কালে বাংলা সাহিত্যের মূল কেন্দ্রটি ছিল কোলকাতার দখলে। সোমেন চন্দ্র, রনেশ দাস গুপ্ত, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, অন্যদিকে মুসলিম সাহিত্য বা শিখাগোষ্ঠি পূর্ববঙ্গের হলেও তাদের দৃষ্টি সেই কোলকাতার দিকে। দেশ বিভাগের পর পরই পরিষ্কার হয়ে গেল, পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকাকেই নতুন করে শুরু করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে অগ্রযাত্রাটি।

ঢাকা কেন্দ্রিকতায় তখনকার পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে ভাষা ও অবয়ব নির্মাণ করেছিলেন যে ক’জন কথাশিল্পী, তাদের মধ্যে শওকত আলী ছিলেন পুরোথা। অর্থাৎ বিভাগোত্তরকালের ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যের ক্ষীণধারাটি এভাবেই পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। কিন্তু সে সময়ে শওকত আলীদের মত প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী লেখক-সাহিত্যিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সদ্য প্রসূত পাকিস্তানী “জজবা’র প্রতি অনেক লেখকদের উম্মাদনা। সে সময় কথিত জাতির পিতা জিন্নাহ্, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং আরবের বিজয়গাঁথা নিয়ে একরকম উম্মাদনা শুরু হয়েছিল।

এর মূল কারণ ছিল, কোলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যে এদের অভিগম্যতা কম থাকায় নব্য পাকিস্তানে অনেকটা রুদ্ধ আবেগ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে শাসকদের গুনগান এবং ধর্মীয় মিথ্গুলি নিয়ে লেখালেখি। সম্ভবত: এ কারনেই এসব লেখালেখি শুরুতেই পাক-শাসকগোষ্ঠির নজরে আসে, যার মধ্য দিয়ে একধরনের সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধি উস্কে দেয়ার প্রবণতা তৈরী হয়েছিল।

এরকম চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের অবয়বটি নির্মিত হয়েছিল। প্রগতি ও মানবিকতার সংমিশ্রনে এই দুরুহ কাজটি যাদের হাত দিয়ে এগোচ্ছিল- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত আলী, আহসান হাবীব নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ঐ ধারার। উত্তরকালে এটিকে শক্তিশালী করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং হাসান আজিজুল হকের মত কালোর্ত্তীণ কথা সাহিত্যিকরা।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লেখক-সাহিত্যিকদের নবচেতনার উন্মেষ ঘটে। ক্রমশ:“পাকিস্তানী জজবা’র উচ্ছাস কেটে যেতে থাকে। ফলে উল্লেখযোগ্য অংশটি প্রগতিশীল ধারায় সামনে এগোতে থাকেন। যদিও আমাদের তৎকালীন সাহিত্য ভাষা আন্দোলনকে শুধুমাত্র ‘ভাষাকেন্দ্রিকতা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে, অল্প-বিস্তর ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। এটি যে ছিল বাঙালী জাতির স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের সূচনা, সেই বিশ্লেষণটি সেকালের লেখালেখিতে কমই উঠে এসেছে।

ষাট দশকের ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য কলা-কৈবল্যবাদের নামে কথিত সৌন্দর্যবাদীতা এবং বামধারার যান্ত্রিকতার মধ্যে পড়ে খাবি খাচ্ছিলো। এমনকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও শুরু করেছিলেন এই নিরীক্ষা দিয়ে। পরে অবশ্য “খোয়াবনামা” ও “চিলেকোঠার সেপাই” -এর মত অবিস্মরণীয় উপন্যাস তাকে তথাকথিত কলা-কৈবল্যবাদের চর্চা থেকে ছিটকে দেয়। বাংলা সাহিত্যের জন্য এটি বড় সৌভাগ্য।

শওকত আলী কলা-কৈবল্যবাদ অথবা বামধারার যান্ত্রিকতার ঐ ধারায় সমর্পিত হননি। ফলে তাকে  “সেকেলে” গোছের তকমা এঁটে দেয়া হয়। কিন্তু তাতে কি! তিনি লিখেছেন, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির ওপর ভর করে। বামপন্থী সাহিত্যিক হলেও তার লেখাকে কখনও বামধারার অনেকের মত জঞ্জাল হতে দেননি, সৃষ্টি করেছিলেন মানবিকতা বোধসম্পন্ন সাহিত্য।

তার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ “প্রদোষে প্রাকৃতজন”-এ তিনি দেখিয়েছেন, দুঃখের সুদীর্ঘ এবং কঠোর অন্ধকার অতিক্রম করে প্রাকৃতজন ঝকমকে এক প্রত্যুষ অবগাহন করার প্রতীক্ষা করছে। বসন্ত দাসের বয়ানে,“যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতজন এভাবেই প্রতিরোধ করে লাঞ্চিত হয়, নিহত হয়, ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু তথাপি ঐ একই সঙ্গে সে প্রতিরোধ করতে ভোলেনা। হয়তো বিচ্ছিন্ন, হয়তো একাকী এবং শস্ত্রবিহীন; তথাপি তার দিক থেকে প্রতিরোধ থেকেই যায় !”

এই উপন্যাসে তার মূল মেসেজটি ছিল: যে রাজশক্তি প্রজাদলনে অভ্যস্ত, প্রজার কল্যাণ করে না, সে রাজশক্তি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়। সামান্য বহি:আক্রমনে ধ্বসে যায়। সেজন্যই তুর্কী খিলজী’র আক্রমনে নদীয়ার সেন রাজবংশ পালিয়ে যায়। আর এরই মাঝে সাধারন মানুষের প্রতিরোধ- সংগ্রামকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে কালজয়ী উপন্যাস “প্রদোষে প্রাকৃতজন” ।

আবার গ্রামীন লোক বিশ্বাসের ওপর আরেকটি অনবদ্য কাজ “মাদার ডাঙ্গার খেল্”। কোন ঘটনাই অলৌকিক নয়, প্রত্যেকটির পেছনেই থাকে কার্যকারন বা অন্তর্গত সত্য। সেটি না বুঝলে তৈরী হয় রহস্য, মিথ্ এবং ছড়ায় নানান ডালপালা। চাল-চুলোহীন হাটে হাটে ফেরি করে বেড়ানো ফুলমতী বেওয়ার ছেলে রাজ মোহাম্মদ বা রাজু পন্তিতের হঠাৎ ধনী হয়ে যাওয়ার গল্প এটি। এই নিয়েই সৃষ্ট রহস্য এবং উন্মোচনের গল্প “মাদার ডাঙ্গার খেল্”।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি “বিচিত্রা’য় প্রকাশিত ট্রিলজি ‘পূর্বদিন পূর্বরাত্রি’, ‘কুলায় কালস্রোত’ এবং ‘দক্ষিণায়নের দিন’ ধারন করে আছে ‘৬৯’র গণ অভ্যূত্থানের বিশাল ক্যানভাস। সেইসাথে সেজান এবং রাখিব ‘সুরিয়ালিষ্টিক’ভালবাসার অনবদ্য গল্পটি। এই ত্রয়ী উপন্যাসের সাথে সময় ও প্রেক্ষাপটের সাদৃশ্য রয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর সাথে। বাংলা সাহিত্যের খুব বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে এ সকল উপন্যাস।

আমরা দেখেছি, তার সময়কালের সাহিত্যিকদের মধ্যে সাধারন মানুষের জীবনাচার, দ্ব›দ্ব-সংঘাত, বিকাশমান জীবনের নানান উত্থাণ-পতন এবং শ্রেনীদ্ব›েদ্বর বিষয়, সংস্কৃতি, প্রথা অনেকটাই উপেক্ষিত হচ্ছে অথবা ভাসা ভাসাভাবে এসেছে। আমাদের লিখিয়েরা খুব উপরিকাঠামো থেকে দেখেছেন সাধারনের জীবন। খননের মধ্যে যাননি, কিংবা জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার তীব্র ঝাঁজ এবং বেঁচে থাকার কঠোরতার বিষয়গুলো উঠে আসেনি কারো লেখায়।

এখানেই শওকত আলীর ব্যতিক্রম। চরিত্রগুলি তিনি আবিস্কার করতেন। যেমনটি ঘটেছে, কান্ত মোড়লের ক্ষেত্রে। কান্ত মাটিতে কান পেতে থাকে। মাটির গান শোনে। বুঝতে পারে মাটির অভ্যন্তরে কিভাবে জীবনের উন্মেষ ঘটছে এবং এই হচ্ছে চরিত্র। বাস্তবতা হোক, স্বপ্ন-বাস্তবতা, অর্ধ বাস্তবতা, যাই হোক- এই একেকটি জীবন্ত চরিত্র। এর মাঝে শওকত আলীর তত্ত¡টা হচ্ছে, মানুষের সংগ্রামের। মানুষের মুক্তির সংগ্রামের যে কাহিনী, সেটিই জেগে ওঠে মাটির গানের মধ্যে। মুক্তির বিষয়টি থাকে মানুষের মাঝে গান হয়ে, ছবি হয়ে, স্বপ্ন হয়ে। সেখান থেকেই মানুষ মূলত: উদ্দীপনা পায়।

এটিই বাস্তবতা। কিন্তু স্বপ্ন-কল্পনার মাঝের অবস্থানটা প্রত্যক্ষ বাস্তবতা নয়। শওকত আলী মনে করছেন, এটিই সুরিয়ালিজম। রিয়ালিটি ও কল্পনার এই যে একত্র সমাবেশই মানুষকে আর সব থেকে আলাদা করে তোলে। এর সাথে লড়াই-সংগ্রামের মিথ্গুলি যুক্ত হয়ে বাঁচার লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা তৈরী করে। সেজন্যই তার লেখায় ব্রাত্যজন, অন্তজ বা সাধারনরা কখনও পরাজিত হয়না।

এজন্যই তিনি শওকত আলী। আমাদের সাহিত্যের ‘প্রদোষ’ কালের মানুষ। প্রগতিশীল বামপন্থী হয়েও গতানুগতিক নন। বড় লেখকরা কখনই নির্দিষ্ট ধারায় আটকে যান না। সেজন্যই তার প্রতিটি কাজ তাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তিনি মার্কসীয় সাহিত্য রচনা করেননি, যা করেছেন তা মানুষের জন্য। শিল্পের জন্য শিল্প নয়, মানুষের জন্য শিল্প। এ ব্যাপারে তার নিজেরই মত ছিল, মানুষের জন্য রচিত সকল সৎ সাহিত্যই হচ্ছে সত্যিকাবের মার্কসীয় ধারার সাহিত্য।

এই ধারায় সবচেয়ে সুনিপুন কারিগর ছিলেন শওকত আলী। সুরিয়ালিজম আর মিথ্’র সমাবেশীকরন দেখতে পাই ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ। সেজন্যই এটি বিশ্ব সাহিত্যতুল্য। আর সেখানেই তিনি প্রায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তার তুলনা করা যায় সমকালীন বাংলা সাহিত্যের আর দু’জনের সাথে। একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অপরজন হাসান আজিজুল হক। এই তিনজনের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শওকত আলী চলে গেছেন; আছেন হাসান আজিজুল হক।

এদের মাঝখানে প্রাক ষাট পর্বটি শওকত আলীর। সেকাল থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যের এই ধারায় তাদের হাত ধরেই কাজগুলি এগিয়েছে। তার ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’, হাসান আজিজুল হকের, ‘বিধবাদের কথা’ সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন-বাস্তবতার মহত্তম উদাহরন। আর এখানেই শওকত আলী আমাদের সমকালীন বাংলা সাহিত্যে ‘প্রদোষকালের পান্থজন’।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

১.‘সাপ্তাহিক’ পত্রিকায় প্রকাশিত শওকত আলীর সাক্ষাৎকার;

২. ৩০ জানুয়ারি ২০১৮ ‘প্রথম আলো‘য় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ;

বাঙালির সংস্কৃতি

আহমদ  শরীফ  ::

অন্যান্য প্রাণী ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এই যে, অন্য প্রাণী প্রকৃতির অনুগত জীবন ধারণ করে আর মানুষ নিজের জীবন রচনা করে। প্রকৃতিকে জয় করে, বশীভূত করে প্রকৃতির প্রভু হয়ে সে কৃত্রিম জীবনযাপন করে-এ-ই তার সংস্কৃতি ও সভ্যতা। অতএব, এইভাবে জীবন রচনা করার নৈপুণ্যই সংস্কৃতি। স্বল্প কথায় সুন্দর ও সামগ্রিক জীবনচেতনাই সংস্কৃতি। চলনে-বলনে, মনে-মেজাজে, কথায়-কাজে, ভাবে-ভাবনায়, আচারে-আচরণে অনবরত সুন্দরের অনুশীলন ও অভিব্যক্তিই সংস্কৃতিবানতা। সংস্কৃতিবান ব্যক্তি অসুন্দর, অকল্যাণ ও অপ্রেমের অরি। সুরুচি ও সৌজন্যেই তাই সংস্কৃতিবানতার প্রকাশ। সংস্কৃতিবান মানুষ কখনো  জ্ঞাতসারে অন্যায় করে না, অকল্যাণ কিছুকে প্রশ্রয় দেয় না, অপ্রীতিতে বেদনাবোধ করে এবং কৌৎসিতাকে সহ্য করে না। অন্য কথায়, যেখানে কথার শেষ সেখানেই সুরের আরম্ভ, যেখানে photography -র শেষ সেখান থেকেই শিল্পের শুরু, নক্সার ঊর্ধ্বেই সাহিত্যেই স্থিতি, তেমনি যেখানে স্থূল জৈব প্রয়োজনের শেষ, সেখান থেকেই সংস্কৃতি শুরু। সংস্কৃতিবান মানুষ জ্ঞানে-প্রজ্ঞায়, অভিজ্ঞতায়, প্রয়োজনবোধে চালিত হয়ে অনবরত জীবনকে রচনা করতে থাকে এবং পরিবেশকে স্নিগ্ধ ও সুন্দর করবার প্রয়াসী হয়। এ জন্য সংস্কৃতিবান ব্যক্তিমাত্রেই কেবল নিজের প্রতি নয়, প্রতিবেশীর প্রতিও নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্বীকার করে। এবং সচেতনভাবে এ সযত্নে নিজেকে সুন্দর করে, সৃষ্টি করে এবং নিজের আচার-আচরণে, মনে-মননে, কথায়-কাজে অপরের পক্ষে স্মরণীয়, বরণীয়, অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ও আকর্ষণীয় লাবণ্য ছড়িয়ে তৈরি করে প্রতিবেশীদের সুষ্ঠু জীবনের ভিত।

বীজের আত্মবিকাশের জন্যে যেমন কর্ষিত ক্ষেত্র প্রয়োজন, সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের জন্যেও তেমনি সুকর্ষিত মনোভূমি তথা প্রতিশ্রুত চেতনা আবশ্যক। তাই সংস্কৃতির স্রষ্টামাত্রেই বিজ্ঞ ও বিবেকবান, সুন্দরের ধ্যানী ও আনন্দের অন্বেষ্টা, বুদ্ধি ও বৃদ্ধির সাধক, মঙ্গল ও মমতার বাণীবাহক এবং প্রীতি ও প্রফুল্লতার উদ্ভাবক। চরিত্রবল, মুক্তবুদ্ধি ও উদারতার ঐশ্বর্যই এমন মানুষের সম্বল ও সম্পদ।

বেদনা-মুক্তি ও আনন্দ-অন্বেষাই মানুষের জীবনসত্য। এক্ষেত্রে সিদ্ধির জন্যে প্রয়োজন সুন্দর ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা। আর এই সৌন্দর্য-অন্বেষা কল্যাণকামিতাই সংস্কৃতি।

মানুষের জীবনে সম্পদ ও সমস্যা, আনন্দ ও যন্ত্রণা পাশাপাশি চলে, বলা যায় একটি অপরটির সহচর। কিন্তু এগুলো যখন আনুপাতিক ভারসাম্য হারায়, তখন সুখ কিংবা দুঃখ বাড়ে। সুখ বৃদ্ধি পেল তো ভালোই, কিন্তু সমস্যা ও যন্ত্রণার চাপে যখন জীবন-জ্বালা আত্যন্তিক হয়ে ওঠে, তখনই বিচলিত-বিপর্যস্ত মানুষ স্বস্তি-কামনায় সমাধান খোঁজে। এ-সমাধান দিতে পারেন এবং দেনও কেবল সংস্কৃতিবান মানুষই।

মানুষমাত্রই সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে সংস্কৃতিকামী। কিন্তু সাধনার মাত্রা ও পথ-পদ্ধতি সবার এক রকম নয়। তাই সংস্কৃতিতে আসে গৌত্রিক, আঞ্চলিক, সামাজিক, আর্থিক ও আত্মিক বৈষম্য ও বিভিন্নতা। এবং স্তরভেদে তা হয় নিন্দনীয় কিংবা বন্দনীয়, অনুকরণীয় কিংবা পরিহার্য।

আগের কথা জানিনে, কিন্তু ইতিহাসান্তর্গত যুগে দেখতে পাই বাঙালি মনোভূমি কর্ষণ করেছে সযত্নে এবং এই কর্ষিত ভূমে মানবিক সমস্যার বীজ বপন করে সমাধানের ফল ফসল পেতে হয়েছে উৎসুক। এই এলাকায় বাঙালি অনন্য। এ যেন তার নিজের এলাকা, সে এই মাটিকে ভালোবেসেছে, সে এ-জীবনকে সত্য বলে জেনেছে। তাই সে দেহতাত্ত্বিক, তাই সে প্রাণবাদী, তাই সে যোগী ও অমরত্বের পিপাসু। এ জন্যেই নির্বাণবাদী বুদ্ধের ধর্মগ্রহণ করেও সে কায়াসাধনায় নিষ্ঠ। তার কাছে এ-মর্ত্যজীবনই সত্য, পারত্রিক জীবন মায়া। মর্ত্যজীবনের মাধুর্যে সে আকুল, তাই সে মর্ত্যে অমৃতসন্ধানী। সে বিদ্রোহী, সে বলে,

কিংতো দীবে কিংতো নিবেজ্জে

কিংতো কিজ্জই মন্তহ সেব্ব।

কিংতো তিত্থ-তপোবন জাই

মোখক কি লবভই পানী-হ্নাই।

-কী হবে তোর দীপে আর নৈবেদ্য? মন্ত্রের সেবাতেই বা কী হবে তোর, তীর্থ-তপোবনই বা তোকে কী দেবে? পানিতে স্নান করলেই কি মুক্তি মেলে? অনেককাল পরে এই ধারারই সাধক-বাউলের মুখে শুনতে পাই:

সখিগো, জন্ম মৃতু যাঁহার নাই

তাঁহার সনে প্রেমগো চাই।

উপাসনা নাই গো তাঁর

দেহের সাধন সর্বসার।

তীর্থব্রত যার জন্য

এ দেহে তার সব মিলে।

জীবনবাদী বাঙালি তাই বৌদ্ধ হয়েও মর্ত্যরে জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার বাঞ্ছায় অসংখ্য উপ ও অপদেবতার সৃষ্টি ও পূজা করেছে। সাংখ্যকেই সে তার দর্শনরূপে এবং যোগকেই তার সাধনাপদ্ধতিরূপে গ্রহণ করেছে। তন্ত্রকেই সার বলে মেনেছে। দেহে-মনে আত্ম-অধিকার প্রতিষ্ঠাকেই জীবনকাঠি বলে জেনেছে। আর যোগ-তান্ত্রিক কায়সাধনার মাধ্যমে সে কামনা করেছে দীর্ঘ জীবন ও অমরত্ব। এ-জীবনকে সে প্রত্যক্ষ করেছে চলচঞ্চল ও তরঙ্গভঙ্গে লীলামহ মন-পবনের নৌকারূপে। বৌদ্ধ যুগে তার সাধনা ছিল নির্বাণের নয় বাঁচার; কেবল মাটি আঁকড়ে বাঁচার। মন-ভুলানো ভুবনের বনে বনে, ছায়ায় ছায়ায়, জলে-ডাঙ্গায় ভালোবেসে, প্রীতি পেয়ে মমতার মধুর অনুভূতির মধ্যে বেঁচে থাকার আকুলতাই প্রকাশ করেছে সে জীবনব্যাপী। হরগৌরীর মহাজ্ঞান, মীননাথ, গোরক্ষনাথ, হাড়িফা-কানুফা, ময়নামতী-গোপীচাঁদ প্রভৃতির কাহিনীর মধ্যে আমরা এ-তত্ত্বই পাই। অবশ্য এ বাঁচা স্থূল ও জৈবিক ভোগের মধ্যে নয়, ত্যাগের মধ্যে সূক্ষ্ম, সুন্দর ও সহজ মানসোপভোগের মধ্যে বাঁচা। কিন্তু এই জীবন-সত্যে সে কি নিঃসংশয় ছিল?-মনে হয় না। তাই বিলুপ্ত যোগীপাল, ভোগীপাল, মহীপাল গীতে তার দ্বিধা ও মানস দ্বন্দ্বের আবাস পাই। পাল আমলের গীতে মনে হয়, সে মধ্যপন্থা (Golden mean)) অবলম্বন করেছে। যোগেও নয়, ভোগেও নয়, মর্ত্যকে ভালোবেসে দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যেই যেন সে বাঁচতে চেয়েছে। চেয়েছে জীবনকে উপলব্ধি ও উপভোগ করতে। তার সেই জানা-বোঝার সাধনায় আজও ছেদ পড়েনি। বাউলেরা তাই গৃহী, যোগীরা তাই অমরত্বের সাধক, বৈষ্ণব বৈরাগীরা তাই ঘর করে, আর ফকিরেরা বাধে ঘর।

সেন আমলে এখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রবল হয়। লুপ্তপ্রায় বৌদ্ধসমাজ বর্ণে বিন্যস্ত হয়ে বল্লালসেনের নেতৃত্বে উগ্র ব্রাহ্মণ্যসমাজ গড়ে ওঠে। কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। গীতা-স্মৃতি-উপনিষদের মতো সে মুখে গ্রহণ করলেও মনে মানেনি। তার ঠোঁটের স্বীকৃতি বুকের বাণী হয়ে ওঠেনি। কেননা সে ধার করে বটে, কিন্তু জীবনের অনুকূল না হলে অনুকরণ কিংবা অনুসরণ করে না। তাই সে তার প্রয়োজনমতো জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রতীক দেবতা সৃষ্টি করে পূজো করেছে, আশ্বস্ত হতে চেয়েছে ঘরোয়া ও মানস জীবনে। তার মনসা, চণ্ডী, শীতলা ষষ্ঠী, শনি তার স্বসৃষ্ট দেবতা। জীবনের সামাজিক সমস্যার সমাধানে ও অধ্যাত্মজীবনের বিকাশসাধনে সে আরো এগিয়ে এসেছে। জীমৃতবাহন ও বল্লালসেন, রঘুনাথ, রামনাথ প্রভৃতির স্মৃতি ও ন্যায় দৈবকী-ধ্রুবানন্দ-পঞ্চাননের মেল-পটি প্রভৃতি গোত্র ও বর্ণবিন্যাস প্রয়াস, চৈতন্যের ভগবৎপ্রেম ও মানব-প্রীতিবাদ বাঙালিজীবনে রেনেসাঁস আনে। এবং তার প্রসাদে আপামর বাঙালির দেহ-মন-আত্মা গ্লানিমুক্ত হয়। এ নতুন কিছু ছিল না, গৌতমের করুণা ও মৈত্রীতত্ত্বের ঐতিহ্যে সুফিমতের প্রভাবেই মানব-মহিমা বাঙালিচিত্তে নতুন মূল্যে ও ঔজ্জ্বল্যে প্রতিভাত হয়। বাঙালি নতুন করে ‘জীবে ব্রহ্ম’ এবং ‘নরে নারায়ণ’ দর্শন করে। তখন বাঙালির মুখে উচ্চারিত হয় মানুষের মর্যাদা ও মনুষ্যত্বের মহিমা ‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ’। মানবিক সম্ভাবনার এ স্বীকৃতি সেদিন জীবন-বিকাশের নিঃসীম দিগন্তের সন্ধান দিয়েছে। তাই বাঙালির কণ্ঠে আমরা সেদিন শুনতে পেয়েছিলাম চরম সত্য ও পরম কাম্য বাণী-‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’

বাঙালি এই ঐতিহ্য আজও হারায়নি। আজও হাটে-ঘাটে-প্রান্তরে বাউলকণ্ঠে সেই বাণী শুনতে পাই। মানববাদী বাউলেরা আজও উদাত্তকণ্ঠে মানুষকে মিলন-ময়দানে আহবান জানায়, আজও তারা মানবতার শ্রেষ্ঠ সাধক ও চিন্তানায়কের কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সাম্য, সহঅবস্থান ও সম্প্রতির বাণী শোনায়। তারা বলে,

নানা বরণ গাভীরে ভাই

একই বরণ দুধ

জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম

একই মায়ের পুত।

কাজেই কাকেইবা দূরে ঠেলবি আর কাকেই বা কাছে টানবি। তোরা তো ভাই ফুল কুড়োতে কেবল ভুলই কুড়োচ্ছিস। কৃত্রিম বাছবিচারের ধাঁধায় কেবল নিজেকেই ঠকাচ্ছিস। গোত্রীয়, ধর্মীয় ও দেশীয় চেতনা বিভেদের প্রাচীরই কেবল তৈরি করেছে, বিদ্বেষ ও বিবাদ সৃষ্টি করেছে, হানাহানির প্রেরণাই কেবল দিয়েছে, তাই বাউল বলেন:

যদি ‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান

নারী লোকে কি হয় বিধান?

বামুন চিনি পৈতার প্রমাণ

বামনী চিনি কী ধরে?

একালে ইংরেজি শিক্ষিত কবি যখন বলেন,

‘সবারে বাসরে ভাল, নইলে তোর মনের কালি ঘুচবে না রে।’

কিংবা-

‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল

ভিতরে সবার সমান রাঙা।’

অথবা-

‘গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই

নহে কিছু মহীয়ান;

তখন তা আমাদের নতুন ঠেকে না। কেননা প্রাকৃত বাঙালির অন্তরের বাণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হতে দেখেছি আমরা কত কত কাল আগে।

ওহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের পূর্বে এখানে শরিয়তি ইসলামও তেমন আমল পায়নি। একপ্রকার লৌকিক তথা দেশজ ইসলাম লোকের অবলম্বন হয়েছিল। তখন পার্থিব জীবনের স্বস্তির ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্যে কল্পিত হয়েছিলেন দেবপ্রতীম পাঁচগাজী ও পাঁচপীর। নিবেদিত চিত্তের ভক্তি লুটেছে খানকা, অর্ঘ পেয়েছে দরগাহ আর শিরনি পেয়েছেন দেশের সেনানী-শাসক জাফর-ইসমাইল-খানজাহান গাজীরা এবং বিদেশাগত বদর-আদম-জালাল-সুলতান প্রভৃতি সুফিরা; তার পরেও প্রয়োজন হয়েছিল সত্যপীর-খিজির-বড়খাঁ-গাজী-কালুবনবিবি-ওলাবিবি প্রভৃতি। দেবকল্প কাল্পনিক পীরের। এঁরা বাঙালির ঐহিক জীবনের নিয়ন্তা দেবতা। জীবনবাদী বাঙালি এঁদের উপর ভরসা করেই সংসার-সমুদ্র ভাসাত জীবন-নৌকা। এখানেই শেষ নয়। চিন্তাজগতে বাঙালি চিরবিদ্রোহী। বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য ও মুসলিম ধর্ম সে নিজের মতো করে গড়তে গিয়ে যুগে যুগে সে চিন্তাজগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাহ্যত সে ভাববাদী হলেও উপযোগ তত্ত্বেই তার আস্থা ও আগ্রহ অধিক।

বৌদ্ধযুগে বৌদ্ধ বজ যান-সহজযান-কালচক্রযান, থেরবাদ, অবলোকিতেশ্বর ও তারা দেবতার প্রতিষ্ঠা এবং যোগতান্ত্রিক সাধনায় বিকাশ সাধন করে সে তার স্বকীয়তার, সৃষ্টিশীলতার মননবৈচিত্র্যের ও স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখে গেছে।

ব্রাহ্মণ্যযুগে জীবমৃতবাহন, বল্লালসেন, রামনাথ, রঘুনাথ, রঘুনন্দন প্রভৃতি নবস্মৃতি ও নবন্যায় সৃষ্টি করে তাঁদের চিন্তার ঐশ্বর্যে ও প্রজ্ঞার প্রভায় জ্ঞানলোক সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল করেছেন।

মুসলিম আমলে চৈতন্যদেবের নবপ্রেমবাদ, সত্যপীরকেন্দ্রী নবপীরবাদ, চাঁদ সদাগরের আত্মসম্মানবোধ ও তেজস্বিতা, বেহুলার বিদ্রোহ ও কৃচ্ছ্রসাধনা, গীতিকায় পরিব্যক্ত জীবনবাদ আমাদের সাংস্কৃতিক অনন্যতা ও বিশিষ্ট জীবনচেতনার সাক্ষ্য।

তার পরেও কি আমরা থেমেছি! রামমোহনের ব্রাহ্মমত, বিদ্যাসাগরের শ্রেয়বোধ, ওহাবি-ফরায়েজি মতবাদ, রবীন্দ্রনাথের মানবতা, নজরুল ইসলামের মানববাদ কি সংস্কৃতিক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে দেয়নি?

মনীষা ও দর্শনের জগতে বাঙালি মীননাথ, কানফা, তিলপা, শীলভদ্র, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ, জীমৃতবাহন, রঘুনাথ, রঘুনন্দন, রামনাথ, চৈতন্যদেব, রূপ-সনাতন-জীন-রঘুনাথাদি, গোস্বামী, সৈয়দ সুলতান, আলাউল, হাজি মুহম্মদ আলিরজা, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, কৃত্তিবাস-কাশীদাস-রামমোহন-বিদ্যাসাগর-মধুসূদন, তীতুমীর-শরীয়তুল্লাহ-দুদুমিয়া, বঙ্কিম-রবীন্দ্র-প্রমথ-নজরুল নির্মাণ করেছেন বাঙালি মনীষার ও সংস্কৃতির গৌরব-মিনার। এঁদের কেউ বলেছেন ঘরের ও ঘাটের কথা, কেউ জানিয়েছেন জগৎ ও জীবন রহস্য, কারো মুখে শুনেছি প্রেম, সাম্য ও করুণার বাণী, কারো কাছে পেয়েছি মুক্তবুদ্ধি ও উদারতায় দীক্ষা, কেউবা শিখিয়েছেন ঘর বাঁধা ও ঘর রাখার কৌশল, কেউ শুনিয়েছেন ভোগের বাণী, কেউ জানিয়েছেন ত্যাগের মহিমা, আবার কেউ দেখিয়েছেন মধ্যপন্থার ঔজ্জ্বল্য। আত্মিক, আর্থিক, সামাজিক, পারমার্থিক সব চিন্তা, সব মন্ত্রই আমরা নানাভাবে পেয়েছি এঁদের কাছে।

বাঙালির বীর্য হানাহানির জন্যে নয়, তার প্রয়াস ও লক্ষ্য নিজের মতো করে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকার। স্বকীয় বোধ-বৃদ্ধির প্রয়োগে তত্ত্ব ও তথ্যকে, প্রতিবেশ ও পরিস্থিতিকে নিজের জীবনের ও জীবিকার অনুকূল ও উপযোগী করে গড়ে তোলার সাধনাতেই বাঙালি চিরকাল নিষ্ঠ ও নিরত। এই জন্যেই রাজনীতি তত্ত্বের ( Theory) দিকটিই তাকে আকৃষ্ট করেছে বেশি-বাস্তব প্রয়োজনে সে অবহেলাপরায়ণ; কেননা তাতে বাহুবল, ক্রুরতা ও হিংস্রতা প্রয়োজন। এ জন্যেই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ বাঙালির মানস-সন্তান হলেও নেতৃত্ব থাকেনি বাঙালির। বিদেশাগত ভূঁইয়াদের নেতৃত্বে সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর পর মুঘল বাহিনীর সঙ্গে সংগ্রামে জানমাল উৎসর্গ করতে বাঙালিরা দ্বিধা করেনি বটে, কিন্তু নিজেদের জন্যে স্বাধীনতা কিংবা সম্পদ কামনা করেনি। কিন্তু মননের ক্ষেত্রে সে অনন্য। নতুন কিছু করার আগ্রহ ও যোগ্যতা তার চিরকালের। প্রজারা যেদিন ‘গোপাল’কে রাজা নির্বাচিত করেছিল, ইতিহাসের এলাকায় সেদিন ভারতের মাটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক চিন্তার বীজ উপ্ত হল। সেদিন এ বিস্ময়কর পদ্ধতির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ কেবল বাঙালির পক্ষেই সম্ভব ছিল।

ওহাবি, ফরায়েজি ও সশস্ত্র বিপ্লবকালে বাঙালির বল ও বীর্য, ত্যাগ ও অধ্যবসায় বাঙালির গৌরবের বিষয়।

স্বাতন্ত্র্য আসে উৎকর্ষে, অনন্যতায় ও অনুপমতায়-বৈপরীত্যে ও বিভিন্নতায় নয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যও তার উৎকর্ষে, নতুনত্বে ও অনন্যতায়। আমাদের দুর্ভাগ্য ও লজ্জার কথা এই যে, ইংরেজ আমলে ইংরেজি শিক্ষিত অধিকাংশ বাঙালি লেখাপড়া করে কেবল হিন্দু হয়েছে কিংবা মুসলমান হয়েছে, বাঙালি হতে চায়নি। হিন্দুরা ছিল আর্যগৌরবের ও রাজপুত-মারাঠা বীর্যের মহিমায় মুগ্ধ ও তৃপ্ত এবং মুসলমান ছিল দূর অতীতের আরব-ইরানের কৃতিত্ব স্বপ্নে বিভোর। এরা স্বাদেশিক স্বাজাত্য ভুলেছিল, বিদেশীর জ্ঞাতিত্ব-গৌরবে ছিল তৃপ্তমন্য। এদের কেউ স্বস্থ ও সুস্থ ছিল না। তাই বাঙলা সাহিত্যে আমরা কেবল হিন্দু কিংবা মুসলমানই দেখেছি। বাঙালি দেখেছি ক্বচিৎ। এ জন্যেই আমাদের সংস্কৃতি আশানুরূপ বিস্তার ও বিকাশ পায়নি। আজ বাঙালি পায়ের তলার মাটির সন্ধান নিচ্ছে। এই মাটিকে সে আপনার করে নিচ্ছে। এর মানুষকে ভাই বলে জেনেছে। আজ আর কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে সে চলে না। স্বদেশের ও স্বভাষার নামে পরিচিত হতে সে উৎসুক। দুর্যোগের তমসা অপগতপ্রায়-প্রভাত হতে দেরি নেই-সামনে নতুন দিন, নতুন জীবন। নিজেকে যে চেনে অন্যকে জানা বোঝা তার পক্ষে সহজ। আজ বাঙালি আত্মস্থ হয়েছে। তার আত্ম-জিজ্ঞাসা হয়েছে প্রখর, সংহতি ও কামনা হয়েছে প্রবল। শিক্ষিত তরুণ বাঙালি জেগেছে, তাই সে তার ঘরের লোককে জাগাবার ব্রত গ্রহণ করেছে। বলছে-‘বাঙালি জাগো।’ জাগ্রত মানুষই সংস্কৃতিচর্চা করে। এবার স্বস্থ ও প্রকৃতিস্থ বাঙালি জাগবে ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাবে। জীবনে ও জগতে সে নতুনকে করবে আবাহন এবং নতুন ও ঋদ্ধ চেতনায় হবে প্রতিষ্ঠিত।

(উত্তরণ প্রকাশিত ‘সংস্কৃতি ভাবনা’ গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত)

মৌসুমী শিল্প-সাহিত্য আর অর্থ সংস্কৃতি

ফ্লোরা সরকার ::

প্রাণীকুল এবং মানুষ্যকুল দুই কুলের সাথে সব থেকে বড় মিল হলো দুই কুলের মাঝেই পেটের ক্ষুধা একটা সাধারণ প্রকৃতিক নিয়ম। উভয় কুলই খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে বেঁচে থাকে বা বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়। এখন কথা হলো, শুধু খাবার খেয়ে বেঁচে থাকাটাই যদি মানুষের উদ্দেশ্য এবং একই সাথে কাজ হতো তাহলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কোনো তফাৎ আমরা করতে পারতাম না। এবং মানুষকে সকল জীবের সেরা জীব হিসেবে বলা তো দূরেই থাক। মানুষের মাঝে কিছু বিশেষত্ব আছে বলেই সে অন্যান্য প্রাণী থেকে বেশ আলাদা। তার মানে মানুষের ভেতর শুধু পেটের ক্ষুধা নেই, আরও ক্ষুধা তার ভেতর আছে, যে ক্ষুধার কারণে সে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। এবং সেটা হলো মানসিক বা মনের ক্ষুধা। মানুষ শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, কাজ ইত্যাদির মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকতে চায়না, এসবের অতিরিক্ত আরও কিছু সে চায়, যা তাকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায় এবং তাকেই আমরা বলছি মানসিক ক্ষুধা। প্রেরণা সম্পর্কে অভিনেতা উৎপল দত্তের চমৎকার একটা সংজ্ঞা আছে -‘প্রেরণা একটি নিবিড় অনুভূতি, প্রথম প্রেমের উন্মেষের মতন ; বারোয়ারি মন্ডপের বস্তু সে নয়’ (গদ্য সংগ্রহ, উৎপল দত্ত)। মানুষ তার মানসিক ক্ষুধা নিবারনের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার সেই প্রেরণা অনুভব করে যা প্রথম প্রেমের উন্মেষের মতো ; শারীরিক ক্ষুধার বারোয়ারি মন্ডপের বস্তু দিয়ে সেই ক্ষুধা সে মেটাতে পারেনা এবং এই কারণেই যে কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে শিল্প-সাহিত্যের এতো প্রয়োজন পরে। মানুষ যখন তার সেই মানসিক ক্ষুধা মেটাতে পারে, তখন শুধু সে বেঁচে থাকার প্রেরণাই পায়না, একই সাথে বেঁচে থাকাটাতে তার অর্থপূর্ণ মনে হয়।

পৃথিবীর সব থেকে কঠিনতম কাজ নিজের বা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখা। কোনো ব্যক্তি-মানুষ বা সমাজ কখনোই সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে বা নিজেদের দেখতে পায়না। যদি পারতো তাহলে, কোনো সমাজে অত্যাচার, অনাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি কিছুই হতোনা। মানুষ যখন তার নিজের জীবনকে প্রতিবিম্ব হিসেবে দেখতে পায় তখন তার ভুলগুলো সে ভালো ভাবে ধরতে পারে এবং সবাই না হলেও কেউ কেউ শুধরে নেয়ার চেষ্টা করে। কেউ সেই প্রতিবিম্ব আঁকেন তুলির আঁচড়ে, কেউ কলমের আঁচড়ে বা কেউ সিনেমা বা টিভি পর্দায় ক্যামেরার কলম দিয়ে। শিল্প-সাহিত্যের কাজ হলো নিজেকে বা নিজেদের মেলে ধরা। নিজেদের সঠিক প্রতিবিম্ব পাঠক বা দর্শকের সামনে সঠিক ভাবে মেলে ধরা। আমাদের দেশে শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে বর্তমান সময়ে, এই মেলে ধরার কাজটা কীভাবে, কতটুকু সংঘঠিত হচ্ছে বা আদৌও হচ্ছে কিনা সেটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ লিখলেই যেমন লেখা হয়না তেমনি টিভি বা সিনেমা পর্দায় কিছু ভেসে উঠলেই তা দেখার যোগ্য নাও হতে পারে। আজকের এই বিষয়গুলো একটু তলিয়ে দেখার চেষ্টা করবো।

আমরা যদি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের দিকে তাকাই তাহলে কি দেখতে পাই ? বিগত প্রায় দশ-পনের বছর ধরে একই ধারায় আমাদের শিল্পকর্মের কাজগুলো সংঘঠিত হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ উৎসবকে সামনে রেখে এর কাজগুলো হচ্ছে। যেমন, ঈদ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে ইত্যাদি বিশেষ দিনগুলোকে সামনে রেখে টিভিতে বিশেষ নাটক, গান, নাচ, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতে পাই। ভাবটা এমন, বিশেষ এসব দিন ছাড়া ভালো নাটক নির্মাণ বা ভালো কোনো অনুষ্ঠানের আয়জনের কোনো প্রযোজন নেই। আরও পরিতাপের বিষয় হলো, এই সবকিছু ( নাটক, গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি ) যেন শুধুই টিভিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। টেলিভিশন ছাড়া শিল্পকর্ম করার আর কোনো জায়গা নেই এবং টিভি পর্দায় দেখা দিলেই সে শিল্পী এবং না দেখা দিলে সে শিল্পী নয়। বাইরের মঞ্চ বা উন্মুক্ত জায়গাগুলোও যে শিল্পচর্চ্চার চমৎকার খেত্র হতে পারে তা কারোর মাথাতেই যেন থাকেনা। এর মাঝে সেই টিভিও যখন শুধু বিশেষ উৎসবের টিভি হয়ে যায় তখন মনে হয় উৎসবের বাইরে আমাদের কোনো শিল্পকর্ম নেই। বছরের বাকি দিন ভালো নাটক বা গান না হলেও কোনো অসুবিধা নেই। আসলে যেটা হয়, সেটা হলো উৎসবের সময় বানিজ্য বেড়ে যায়। অন্যান্য সময়ের চেয়ে সেই সময়ে দর্শক সংখ্যা বেড়ে যায়। দর্শক সংখ্যা বাড়া মানেই বানিজ্য বাড়া। দর্শক সংখ্যা বাড়ে কেনো ? কারণ উৎসবের ছুটি ছাড়াও, আরও যে একটা বিষয় দর্শকের ভেতর কাজ করে তা হলো, দর্শক ইতিমধ্যেই জেনে গেছে শুধুমাত্র উৎসবের দিনগুলোতেই কিছু অন্তত ভালো নাটক, গান বা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ থাকে, যা বছরের অন্যান্য দিনে থাকে না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিল্পকর্ম শুধুই বিশেষ মৌসুম কেন্দ্রীক হয়ে পড়ছে। অথচ শিল্পকর্ম কোনো বিশেষ বিশেষ সময়ের জন্যে না। তা সারা বছরের জন্যে। আমাদের সিনেমা শিল্প আলোচনার বাইরে রাখা হলো। কারণ এই বিভাগের অবস্থা এতোটাই করুণ যে আলোচনা করারও জায়গা নেই। এবারে দেখা যাক, সাহিত্যের খেত্রে কি হচ্ছে।

বইমেলা শুধুই এখন ‘একুশের বইমেলা’। ফেব্রুয়ারি মাসটা যেন শুধু বই প্রকাশের এক প্রতীকী মাস হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। বইমেলার আয়োজন দেখলে মনে হয়, শুধু এই একমাসেই সারা বছরের বই প্রকাশ করা হবে এবং পাঠকও শুধু এই এক মাসই বই পড়বে, বছরের বাকি দিন বইয়ে হাত না দিলেও চলবে। এখানেও মৌসুমী প্রকাশকদের ভিড়ে প্রকৃত প্রকাশকেরা জায়গা করে নিতে পারছেনা। বাংলা একাডেমি থেকে স্থান বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল এলাকা জুড়ে বইমেলার আয়তন বাড়ানো হয়েছে ঠিক, কিন্তু বাড়ে নাই ভালো বইয়ের সংখ্যা।  বই শুধু প্রকাশের মধ্যে দিয়েই তার কাজ শেষ করেনা। সেই বই পাঠযোগ্য কিনা সেটাই সব থেকে বড় প্রশ্ন। আমরা অনেক সময় পাঠককে দোষারোপ করে বলি যে, আজকাল কেউ বই পড়েনা। কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। যে মানষটা শুধু পড়তে এবং লিখতে শিখেছে, সেই মানুষ ভালো-মন্দ দুটোই বুঝতে শিখেছে। এবং একটা ভালো গল্প বা উপন্যাস বা কবিতা সাধ্য নেই কারো তা পড়া থেকে কাউকে বিরত রাখা। আমরা ভুলে যাই, ভালো গল্প বা উপন্যাস বিজ্ঞাপনের চাইতে, পাঠক থেকে পাঠকের কাছে দ্রুত ছড়িয়ে যায়। একটা গল্প যখন একজন পাঠকের মন ছুঁয়ে যায় সে তখন সেই ভালো লাগাটাকে শেয়ার করতে চায় অন্যের সাথে। এই শেয়ারের মধ্যে দিয়ে সেই গল্পের পাঠকের সীমানা বাড়তে থাকে। তাছাড়া বই পাইরেসির বিষয়টা এতো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে পাঠক দেশি বই রেখে ( দাম বেশি হবার কারণে ), পার্শ্ববর্তী দেশের সস্তা পাইরেট বই কিনতে বেশি আগ্রহি।

একটা দেশের শিল্প-সাহিত্যের উন্নয়নের উপর নির্ভর করে সেই দেশের সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন। যদিও সংস্কৃতির সংজ্ঞা বিশাল তবু আলোচনার সুবিধার্থে এখানে শুধুমাত্র শিল্প-সাহিত্যের উপর সীমিত রাখা হয়েছে। একটা উন্নত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে অন্যান্য বিষয়ের সাথে একটা পরিশীলিত সাংস্কৃতিক পরিবেশের বড় প্রয়োজন। আমাদের এখানে যেভাবে সিনেমা, নাটক, গান, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি নির্মিত এবং রচিত হচ্ছে, তা প্রধানত অর্থ  বা টাকা কেন্দ্রীক। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে টাকার প্রশ্নটাও জড়িত থাকে কিন্তু তার অর্থ এই না যে, কোনো রকমে একটা সিনেমা বা নাটক বানিয়ে আমরা শুধু লাভের অংকটার দিকেই তাকিয়ে থাকবো। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে অন্যান্য কাজের এখানেই বিশেষ পার্থক্য। কারণ, শিল্পকর্ম পণ্য হলেও, বানিজ্যিক পণ্য নয়। বানিজ্যিক পণ্য নয় বলেই সে, শারীরিক ক্ষুধা নয় মানসিক ক্ষুধা মেটানোর পথে চলে। মানুষের এই মানসিক ক্ষুধা থেকেই মূলত শিল্পকর্মের উদ্ভব। তা না হলে আমরা গুহা চিত্র পেতাম না, মুখে মুখে গান বা কবিতা রচিত হতোনা। শুধু টাকার দিকে তাকিয়ে যখন শিল্পকর্ম রচিত হয় তখন তা আরেক ধরণের সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলে আর তা হলো “ অর্থ সংস্কৃতি ”। সবকিছু তখন শুধু অর্থ দিয়েই মাপা হয়; যা বর্তমানে হচ্ছে। এই কারণে একটা সিনেমার গল্প বা কাহিনীর চেয়ে তার নির্মাণ খরচ, নায়ক-নায়িকার গ্ল্যামার, সেট, শুটিং স্পট ইত্যাদি বেশি আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। নায়ক বা নায়িকার চরিত্রের চেয়ে তার পোশাক বেশি জরুরী হয়ে উঠে। গায়কির চেয়ে গায়ক বা গায়িকার গানের ঢং (অঙ্গ সঞ্চালন), পোশাক, স্টুডিওর জাঁকজমক ইত্যাদি বেশি জরুরী হয়ে উঠে। অর্থ সংস্কৃতি দিয়ে আর যেটাই গড়ে তোলা যাকনা কেনো, কোনো সুস্থসংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব নয়। এসব তখনই হয়, মানুষ যখন শিল্পের চেয়ে বিশেষ মৌসুম আর টাকাকে মাথায় রেখে কিছু লিখে বা নির্মাণ করে। আমরা যদি এভাবে বিশেষ মৌসুমে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চ্চাকে এইভাবে অব্যহত রাখি, তাহলে তা দিয়ে হয়তো অর্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলা যাবে কিন্তু সুস্থ সংস্কৃতি কোনো ভাবেই নয় এবং মানসিক ক্ষুধা নিবারণ তো নয়ই। শেষে বলবো- শিল্পকর্ম বহমান নদীর মতো বয়ে চলে, কোনো বিশেষ মৌসুমে এসে শেষ হয়ে যায়না।

উগ্রজাতীয়তার কবলে হলিউড

ফ্লোরা সরকার ::

আমরা যখন ইতালীয় ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ অথবা ভারতের ‘হিরক রাজার দেশে’ অথবা  বাংলাদেশের ‘জীবন থেকে নেয়া’ দেখি তখন কি মনে হয় না, ছবিগুলোর ঘটনা, চরিত্র ইত্যাদির সঙ্গে যার যার নিজ নিজ দেশের সাথে কোথায় যেন মিলে যাচ্ছে? বাংলাদেশের একজন দর্শককে যেমন লাইফ ইজ বিউটিফুল বুঝতে অসুবিধা হয় না, ঠিক তেমনি ইতালীয় বা ভিন্ন ভাষার একজন দর্শকে হিরক রাজার দেশে বা জীবন থেকে নেয়া (ইংরেজি সাবটাইটলযুক্ত) বুঝে নিতেও কোনো অসুবিধা হয় না। ইরানের ‘দ্য ব্ল্যাকবোর্ড’ অথবা ‘দ্য সিক্রেট ব্যালট’ যখন দেখি এবং সেই ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক যখন সারা ছবি জুড়ে মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য হয়রান হয়ে ঘুরে বেড়ান অথবা ‘দ্য সিক্রেট ব্যালট’ ছবিতে দেশের নির্বাচন নিয়ে যে ঠাট্টা-মস্করা করা হয়, তা কি আমাদের মতো দেশের সঙ্গে মিলে যায় না? শুধু মিলেই যায় না, ছবিগুলো তখন আমরা আমাদেরই মনে করি। মনে হয়, আমাদের মনের কথা, আমাদের বাস্তবতা, অন্য ভাষায় দেখছি, শুনছি আর অনুভব করছি। এর নামই আন্তর্জাতিক ভাষা। সিনেমা থেকে শুরু করে সব শিল্পকর্মের ভাষা তাই আন্তর্জাতিক হয়ে থাকে। শিল্প-সাহিত্যের এই আন্তর্জাতিকতার কারণে অতীতেও যেমন শিল্পকর্ম হয়েছে, আজও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবে। সীমান্ত না মানা এসব কাজকে তাই কেউ দেশের সীমারেখা দিয়ে বেঁধে রাখতে পারেনা। কিন্তু এবারের অস্কার প্রতিযোগিতায় ‘এ সেপারেশন’ খ্যাত ইরানের চিত্রপরিচালক আজগার ফারহাদির ছবি ‘দ্য সেলসম্যান’ যখন মনোনীত হলো এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে গেলো, তখন শিল্পের এই আন্তর্জাতিকতার প্রশ্নটা আবার সামনে চলে আসলো। হলিউড শুধু সিনেমার বিশ্ববাজারের জন্য বিখ্যাত নয়, প্রতিবছর এখানকার একাডেমি থেকে বিদেশি ভাষার জন্য প্রতিযোগিতা বিভাগে যে এ্যওয়ার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়, সে কারণেও  হলিউড প্রশংসাযোগ্য। ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞা সেই প্রশংসার উপর যেন একটা আঘাত এনে দিলো। তবে আজগার ফারহাদির ঘটনাই প্রথম নয়, এর আগেও এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে।

সময়- ২০১৩ সাল, স্থান- লস এঞ্জেলেস এয়ারপোর্ট; প্যালেস্টাইনের নির্মাতা এমাদ বার্নাট নির্মিত, অস্কার মনোনীত ছবি ‘ফাইভ ব্রোকেন ক্যামেরাস’ এর জন্য যখন তিনি তার স্ত্রী এবং আট বছরের ছেলেকে নিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছালেন, তখন তাকে আটকে রাখা হলো প্রায় দেড় ঘন্টা। শেষে বিখ্যাত প্রামান্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল মুরের সহায়তায় বার্নাট মুক্ত হলেন এবং আমেরিকা প্রবেশের অনুমতি পেলেন। এই বিষয়ে মাইকেল মুর পরে হিটফ্লিক্সকে জানান, ‘বার্নাট যখন সাহায্য চেয়ে আমাকে টেক্স করলো, আসলে তখন যেটা হয়েছিলো, সেটা হলো, এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস অফিসারদের মাথায়ই ঢুকছিলো না যে, একজন প্যালেস্টাইনি কি করে অস্কারে মনোনীত হয়।’ এই হলো আমেরিকার ইমিগ্রেশন অফিসারদের বুদ্ধির দৌঁরাত্ম। মুর কিছুটা কটাক্ষ করে পরে বলেন, ‘আসলে নিমন্ত্রনপত্রের লেখাটা বোধহয় ঠিক মতো লেখা হয়নি, লেখা হলে এরকম বিতাড়িত হবার ভয় এমাদ বার্নাটকে পেতে হতোনা।’ তবে এই বিষয়ে বার্নাটের খুব বেশি উদ্বেগ ছিলো না। বার্নাট বলেন, ‘বিষয়টা কিছুটা বিব্রতকর। কিন্তু প্যালেস্টাইনে প্রায় প্রতিদিন আমাদের এইরকম বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। ওয়েস্টবাংকে ৫শ’ ইসরাইলি চেকপোস্ট, রোডবলক সহ আরও নানারকমের বাঁধাবিঘ্ন অতিক্রম করে প্রতিদিন আমাদের চলাফেরা করতে হয়, এটা তো একটা ছোট্ট ঘটনা মাত্র।’

ঘটনা ছোট হলেও এসব ঘটনাই পরে বড় আকার ধারণ করে। যেমন এবারের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ব্যপ্তি। তবে  ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক ফারহাদি, অস্কারে মনোনীত হলেও নিজেই ঘোষণা দিলেন যে, আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য অস্কার অনুষ্ঠানে যাবেন না। ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র তারানেহ আলীদুস্তি ফারহাদির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনিও যাবেন না এবারের অনুষ্ঠানে। ফারহাদি আরও বলেছেন, তাকে যদি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে যাওয়াও হয়, তবু তিনি যাবেন না। কেন যাবেন না?  ভ্যারাইটিতে (২৯ জানুয়ারি, ২০১৭) সে কারণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ফারহাদি বলেছেন, ‘একটা দেশের নিরাপত্তার জন্য মিথ্যা অজুহাতে, অন্য দেশের নাগরিকদের উপর সেই দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে যে অপমানিত বা হীন করা হয়, শত্রু তা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়, এগুলো ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, আমি আশা করবো- আমার দেশসহ আরও যে ছয়টা দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, সেসব দেশ এবং আমেরিকার জনগণের মাঝে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করবেনা।…… এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বিষয়টা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ। আমার দেশেও এমন কট্টরপন্থী অনেক আছে। বিগত বেশ কযেক বছর ধরে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই ধারের দেশগুলোতেই, এসব কট্টরপন্থীরা, বিভিন্ন জাতি এবং সংস্কৃতির পার্থক্যের জায়গায় অবাস্তব এবং ভয়াবহ বিরোধী মত গড়ে তুলছে। বিরোধ সৃষ্টি করে শত্রুতা, শত্রু তা সৃষ্টি করে ভয়।  চরমপন্থা এবং মৌলবাদের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া এই ধরণের ভয় অত্যন্ত ফলপ্রসু ও কার্যকর একটা অস্ত্র।’ অর্থাৎ মানুষ তখন খুব সহজেই সবকিছু বিশ্বাস করে ফেলে। কে শত্রু , কে বন্ধু তার এক গোলকধাঁধাঁর ভেতর ঘুরপাক খায়।

তবে শিল্পীরা সব সময় সচেতন নাগরিক। শিল্পের কাজ মানুষের মাঝে সচেতনা সৃষ্টি করা এবং সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়া। শিল্পের ইতিহাসে দেখা গেছে, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে শিল্পীরা প্রথমে এগিয়ে আসেন। কবি নাজিম হিকমতকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্যে পাবলো পিকাসো, পল রবিনসন, জ্যঁ পল সার্ত্রেসহ আরো অনেক দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক ১৯৪৯ সালে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করে কীভাবে প্যারিসে প্রচার-প্রচারনা শুরু করেন এবং তাকে কারামুক্ত করেন। জাফার পানাহীর  ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটছে। জাফর পানাহীকে গৃহবন্দী করার পর থেকে তার নিজের দেশের শিল্পীসাহিত্যিকসহ আন্তর্জতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের সেলিব্রিটিদের নিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের বর্তমান নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ গত ৮ জানুয়ারি গোল্ডেন গ্লোব অনুষ্ঠানে যে অসাধারণ বক্তৃতা দেন- তা এখন ইউটিউবে সবার হাতে হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মেরিল প্রথমেই হলিউডের কিছু বিখ্যাত শিল্পীদের নাম উল্লেখ করেন- যারা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে হলিউডকে সমৃদ্ধশালী করেছেন। এবং যাদের ছাড়া হলিউড একেবারেই অচল। এখন এসব শিল্পীকে যদি হঠাৎ করে দেশছাড়া করা হয় তাহলে হলিউডে ফুটবল খেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকবেনা। মেরিল রসিকতা করে বলেন, ফুটবল অবশ্য মার্শাল আর্ট তবে আর্ট (অর্থাৎ নির্ভেজাল শিল্প) নয় কিন্তু। তার ছোট্ট- নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় শুধু শ্লেষ ছাড়া আর কিছু ছিলোনা। একজন শিল্পী যখন সকল শিল্পীর হয়ে কথা বলেন, তখন তার উদারতার মাত্রা বুঝে নিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয়না। সেই সাথে ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও আন্তর্জাতিক একটা রূপ প্রস্ফুটিত হতে দেখা যায়। মেরিলের বক্তৃতা সেদিকেও একটা ইঙ্গিত দেয়। আমরা আশা করবো, শিল্পের যে আন্তর্জাতিক রূপের কথা আমরা জানি, হলিউড তা বজায় রাখতে সচেষ্ট হবে। আজগার ফারহাদি, এমাদ বার্নাটের মতো নির্মাতারা যেন বার বার হয়রানির শিকার না হন। যদি এভাবে নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকে তাহলে মেরিলের ভাষায় বলতে হয়  “অসম্মান শুধু অসম্মানকে ডেকে আনে, সন্ত্রাস ডেকে আনে আরেক সন্ত্রাসকে”।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস গুম-খুন আর অবরোধের ছবি – ‘আবলুকা’

ফ্লোরা সরকার ::

একটা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা যত বেশি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হতে থাকে, রাষ্ট্র তত নির্বিঘ্নে শাসন ও শোষণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। রাজনীতির কাজ শুধু নিজেদের সঙ্গে নিজেদের মোকাবিলা করা নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবিলা করা। তাতে করে রাষ্ট্র থেকে শোষণের বদলে সুশাসন পাওয়া যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভেতর পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে বিচ্ছিন্নতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এবং এসব বিচ্ছিন্নতা যখন যারযার মতামতকে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে থাকে, তখন সেটা একধরনের ‘মৌলবাদী’ রাজনীতির রূপ পরিগ্রহ করে। এই ধরণের মৌলবাদিতা এক ধরণের বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত রোগের উদ্ভব ঘটায়- যা নিরাময় অযোগ্য হয়ে পড়ে। এসব রোগ যত বেশি বাড়তে এবং ছড়াতে থাকে, রাষ্ট্র সেই সুযোগে তত বেশি শোষণ করার সুযোগ পেতে থাকে। রাষ্ট্রের শোষণ যত বাড়তে থাকে এই রোগের প্রকোপ তত বাড়তে থাকে। গত আলোচনায় আমরা দেখেছি এমিন আলপার পরিচালিত “বিয়ন্ড দ্য হিল” ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নির্ভর এক ছবি, যেখানে দেখেছি নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস আর সন্দেহ কীভাবে অজানা শত্রুর উদ্ভব ঘটায়, তার পরবর্তী ছবি “আবলুকা” বা “ফ্রেনিজ’’  আমাদের তার থেকেও আরও ভয়াবহ চিত্র দেখায়, যা নাগরিকদের ভেতর ও  উপরে বর্ণিত বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত রোগের উদ্ভব এবং বিস্তার ঘটায়। আজ আমরা এই ছবিটা নিয়ে আলোচনা করবো এবং বলাই বাহুল্য ২০১৫ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি স্পেশাল জুরি বিভাগে পুরষ্কৃত হয়।

মূল তুর্কি ভাষায় “আবলুকা” অর্থ অবরোধ। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক গোলযোগগুলো এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ মানুষ দেখতে পাচ্ছেনা। অনেকটা কাফকার “দ্য ক্যাসেল” উপন্যাসের সেই দূর্গের মতো, যেখানে কোনো এক অনির্ণেয় শক্তি, গল্পের নায়ক কে লক্ষ্য করে তাচ্ছিল্যের সাথে, কখনো মুচকি হেসে প্রশ্রয়ও দেয় তারপর তাকে মর্মান্তিক ভাবে আঘাত করে। যে পথ ধরেই গল্পের নায়ক যাত্রা করুক না কেনো, তাকে আবার সিসিফাসের মতো ঘুরে আসতে হয় আরম্ভে। সারাটা উপন্যাস আমাদের এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রাখে,  আবলুকা ছবির দ্বিতীয় অংশ ঠিক এভাবেই আমাদের শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় রাখে। আবলুকা ছবিটা তখন শুধু একটা দেশের ভেতরকার অবরোধ অবস্থা দেখিনা, তার সাথে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও অনেক দেশের অবরোধ দেখতে পাই, যে অবরোধ থেকে মানুষ অর্থাৎ সেসব দেশের নাগরিকেরা বের হয়ে আসতে পারছেনা।

ছবির মূল চরিত্র কাদের  (মোহাম্মদ ওজগুর) প্রায় বিশ বছর জেল খাটার পর, আরও দুই বছর বাকি থাকলেও প্যারলে মুক্তি পায়। ছবির শুরুতে জেল থেকে মুক্তি পাবার দৃশ্য আমরা দেখি। প্যারলে তাকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়। কাদেরকে যে শর্তযুক্ত কাজটা দেয়া হয়, তা হলো শহরের আবর্জনা কুড়িয়ে তোলা। কিন্তু তার প্রকৃত কাজ হলো সরকারের হয়ে গোয়েন্দাগিরি বা নজরদারির কাজ করা। আবর্জনার ভেতর কোনো রাসায়নিক বস্তু পাওয়া যায় কিনা- যা বোমা তৈরি কাজে লাগে- সেসব তথ্যসহ তার আশেপাশে থাকা সন্দেহজনক মানুষগুলোর খবর সরকারকে জানাবার দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। যে কারণে তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে, প্রশিক্ষন শেষে, সে যখন বাসে করে তার ছোট ভাই আহমেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, পথের মাঝে চেকপোস্টে গাড়ি থামিয়ে বাসের যাত্রিদের আইডি কার্ডসহ সবকিছু তদন্ত করা দেখে কাদের বেশ অবাক হয়। কেননা, বিশ বছর আগে জেলে যাবার আগে সে শহরের এরকম চিত্র দেখে নাই। এটা যেন নতুন কোনো এক শহরে সে ঢুকছে, যে শহর সে কখনো দেখে নাই। যেখানে জায়গায় জায়গায় চেকিং হয়। আর চেকিং মানেই সন্দেহ, অবিশ্বাস, ভয় ইত্যাদি।

দুই ভাইয়ের মধ্যে দেখা না হবার এই দীর্ঘ বিরতি এবং সেই বিরতির পর প্রথম মিলনের দৃশ্যটা আমাদের অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। কেননা, কাদের যতটা উত্তেজনা নিয়ে তার ভাইয়ের কাছে ছুটে যায়, যে ভাইয়ের বয়স এখন তিরিশের কাছাকছি, এতোদিন পর বড় ভাইকে দেখে আহমেদের ভেতর সেই উত্তেজনা আমরা দেখিনা। বরং এক ধরণের শীতলতা তার ভেতর দেখা যায়। রাতের খাবারের পর, দুই ভাইয়ের কথোপকথন আরও স্পষ্ট করে দেয়। কাদের যতটা আগ্রহ নিয়ে আহমেদকে উপদেশবানী শোনায়, আহমেদের ভেতর আগ্রহ দূরে থাক, খাওয়ার পরপরই উঠতে পারলে যেন সে বেঁচে যায়। দুই ভাই কাছাকাছি দুইবাড়িতে থাকে। কাদের থাকে আহমেদের বন্ধু আলী এবং তার বউ মেরালের বাড়ির উপর তলায়। আহমেদ থাকে কাছেই অন্য বাড়িতে। আহমেদের এই অনীহা কাদের বেশ ভালোভাবেই অনুভব করে এবং এক রাতে ভাইকে বলে, “এটা ভেবোনা যে তোমার কথা আমি ভাবতাম না। জেলে থাকতে প্রায়ই তোমার কথা আমার মনে পড়তো।…. মনে রেখো, আমরা দুজন ছাড়া, আমাদের কিন্তু আর কেউ নেই”। সংলাপটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে দুই ভাইয়ের কোনো শৈশব স্মৃতি নেই, যেসব স্মৃতি ভাইদের বন্ধন আরও দৃঢ় করে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝেও সেই বন্ধন থাকা চাই, যে বন্ধন নাগরিকদের বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে দৃঢ় করে। কিন্তু ছবিতে আমরা দেখি, দুই ভাইয়ের এই দীর্ঘদিনের দুরত্ব তাদের ভেতর এতোটাই দূরত্ব তৈরি করে ফেলে যে, কাছাকাছি আসা দূরে থাক বরং সন্দেহের পর্যায়ে নিয়ে যায়। যে কোনো দেশে রাজনৈতিক মতাদর্শিক দূরত্ব এভাবেই পারস্পরিক সন্দেহের বীজ বপন করে চলে। কাদের সন্দেহ করতে থাকে আলীর বউ মেরালের সঙ্গে আহমেদের কোনো অবৈধ সম্পর্ক হয়তো গড়ে উঠেছে কিনা। মাঝে মাঝে একারনেই কাদের দোতলার কাঠের মেঝেতে কান পেতে তাদের ফিসফাস শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, কাদের মনে করে আলী এবং মেরাল হয়তো কোনো সন্ত্রাসী কাজে নিয়োজিত আছে। সেই কাজের সাথে তাই ভাইও সম্পৃক্ত থাকতে পারে।

অন্যদিকে, আহমেদ যে কাজ করে সেটা হলো, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুরগুলো মেরে ফেলার কাজ। কাজটা তার একেবারেই ভালো লাগেনা কিন্তু বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে করতে হয়। এই কাজে তার অনিচ্ছার চুড়ান্ত প্রকাশ একটা দৃশ্যের মাত্র একটা শটে পরিচালক আমাদের দেখিয়ে দেন। যে বন্দুক দিয়ে দিনের বেলায় সে কুকুর মারতে যায়, একদিন রাতে সেই বন্দুক দিয়ে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ট্রিগারে টিপ দেয়ার মুহূর্তে কাদের এবং আলী এসে পড়ায় তা আর সম্ভব হয়না। তবে নিজের হাতে আহত করা একটা কুকুরকে সে বাড়িতে নিয়ে আসে। যে কুকুরের পরিচর্যার মধ্যে দিয়ে সে যেন এক ধরণের প্রায়শ্চিত্ত পালন করে- যা একদিক থেকে আনন্দের এবং অন্য দিক থেকে তার একাকিত্ব কাটানোর কৌশলও বটে। আহমেদ একাই থাকে, কেননা, তার বউ এবং বাচ্চা তাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগেই।  এই কুকুর মারার বিষয়টা পরিচালক অত্যন্ত কৌশলে অন্যকিছুর ইঙ্গিত আমাদের দিয়ে দেন; হতে পারে সেটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্মূলের কাজ অথব খুন-গুমের কাহিনী। রাষ্ট্র এভাবেই তার অপছন্দের মানুষগুলোকে গুম করে দেয়।

ছবির গতি যত এগিয়ে যায়, শহরে পুলিশ টহলের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এবং বাড়তে বাড়তে সেটা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে দুই ভাই দুইভাবে নিজেদের আড়াল করতে থাকে। একদিকে, আহমেদ মনে করতে থাকে তার বাড়িতে কুকুর আছে জানতে পারলে কর্তৃপক্ষ তাকে মেরে ফেলতে পারে, তাই ঘরের ভেতরেই সে আরেকটা ঘর বানায়, যাতে কুকুরের শব্দ বাইরে না পৌঁছায়। অন্যদিকে, কাদের নিরাপত্তাহীনতার উপর রিপোর্টের পর রিপোর্ট টাইপ করতে থাকে কর্তৃপক্ষকে দেয়ার জন্য, যেসব রিপোর্ট কোনো মূল্যই পায়না তার বসের কাছে। সারা দেশের অশান্ত চিত্র মেটাফরিক্যালি আরও চমৎকার করে পরিচালক দেখান। পুরো ছবি জুড়ে টিভির খবরে শুধু সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আমরা দেখি। এমনকি রাতের রাস্তাগুলোও যেন একেকটা ধ্বংসস্তুপ, এখানে সেখানে শুধু আগুন জ্বলতে দেখা যায়, বোমা ফাটতে শোনা যায়। দীর্ঘ বেলের শব্দ, ঘন ঘন ট্যাং আওয়াজের যাতায়াত, গাড়ির শব্দে দালান কেঁপে কেঁপে ওঠা, তীব্র আলো ইত্যাদি সব মিলিয়ে এমন এক আবহ ছবির গতির সাথে বাড়তে থাকে যে, শুধু চরিত্রগুলোই না, দর্শকের ভেতরেও এক ধরণের শ্বাসরোধকের মতো অবস্থা হয়, যে অবরোধ অবস্থা থেকে সবাই পরিত্রান পেতে চায়। যদিও সেই পরিত্রান শেষ পর্যন্ত দুই ভাইয়ের মৃত্যু দিয়ে (রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষই তাদের মেরে ফেলে) শেষ হয়। ছবিটি তাই দেখতে দেখতে দর্শক নিজেদের কথা ভাবতে থাকে এবং ছবিটি আর তুর্কি কোনো ছবি হয়ে থাকেনা, সেটা হয়ে দাঁড়ায় বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের ছবি।

 

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে এক অনন্য চলচ্চিত্র – বিয়ন্ড দ্য হিল

ফ্লোরা সরকার ::

আপাত নিরীহ অত্যন্ত ধীর গতির ছবি , ‘বিয়ন্ড দ্য হিল’ দেখলে মনেই হয়না সেখানে এতো শঙ্কা, সন্দেহ আর উদ্বেগ থাকতে পারে। সারা ছবি জুড়ে বিশাল পাহাড় ঘেরা মনোরম প্রকৃতিক দৃশ্য, নিবিড় বন আর এক্সট্রিম লং শটগুলো যেন একের পর এক চিত্রকর্ম এঁকে যায়। যেন ভাবনাহীন এক অনন্ত জীবনের গল্প আমরা দেখতে বসেছি। যেকোনো শহরে গেলে, তার বাইরের শান্তশিষ্ট রূপ দেখে যেমন সেই শহরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব জটিলতাগুলো বোঝা যায়না ঠিক তেমনি তুরস্কের পরিচালক এমিন আলপার নির্মিত ‘বিয়ন্ড দ্য হিল’ ছবির আপাত নিরীহ গল্প দেখে ঠিক সেরকম মনে হয়। ছবির শুরু থেকে যে ধীর গতি আমরা লক্ষ্য করি ছবির শেষ পর্যন্ত তা একই ছন্দে চলে। অথচ টানটান উত্তেজনা ছবির শুরু থেকেই আমরা অনুভব করি। সাধারণ এক পরিবারের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে পরিচালক আলপার আমাদের নিয়ে যান যেকোনো দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের রাজনীতির ময়দানে। আর তাই ছবিটি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, সিনেফোরাম এশিয়া ও আরব সিনেমা ফেস্টিভাল, ইস্তাম্বুল চলচ্চিত্র উৎসব সহ আরও অনেক উৎসবে ছবিটা পুরস্কৃত ও আলোচিত হয়।

ফাইখ নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মকর্তা স্থায়িভাবে আনাতলিয়ার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন। জমিদারি আভিজাত্যের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তার চরিত্রে পুরোদমে উপস্থিত। ফাইখের জমিজমা দেখাশোনা করার জন্য এবং কিছু জমি ভাড়া নিয়ে মোমেত নামের একজন মধ্যবয়সি তার পরিবার (বউ মরিয়ম এবং কন্যা সুলু) নিয়ে সেখানে বসবাস করে। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি ব্যক টু ক্যামেরায় একজন লোক প্রচন্ড শক্তিতে বনের পপলার গাছগুলো কাটতে কাটতে সামনে এগিয়ে যায়।  দৃশ্যটা পরিচালক পুরো ছবিতে বেশ অনেকবার দেখান। ছবির টেনশান বলা চলে এই গাছ গাটা থেকেই শুরু হয়ে যায়। কেননা, একটু পরেই আমরা জানতে পারি, ফাইখের ক্রমশই বিশ্বাস জন্মাচ্ছে, পাহাড়ের ওপারে অযাচিত কিছু যাযাবরের আগমন ঘটেছে- যারা তার অধিকারে থাকা এই গাছগুলো কেটে ফেলছে। অথচ যে লোকটা গাছগুলো কাটে তাকে সামনে থেকে আমরা কখনোই দেখতে পাইনা। কেনো তাকে দেখা যায়না বা দেখানো হয়না  ছবিতে। ছবির গল্প এগিয়ে গেলে আরও কিছু চরিত্রের আর্বিভাব ঘটে। শহর থেকে ফাইখের তালাকপ্রাপ্ত বড় ছেলে নুসরেত এবং নুসরেতের দুই ছেলে জাফের এবং কানের, ফাইখকে দেখতে এসে কিছুদিন সেখানে অবস্থান করে। ছবির গল্প তাদের এই অবস্থান এবং এই কয়জন চরিত্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়।

ফাইখের ছেলে আর নাতি আসার পর ফাইখের ভেতর পপলার গাছ উজাড় করার সন্দেহটা আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে নুসরেতের বড় ছেলে, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জাফের, ছবির অত্যন্ত একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। যে চরিত্রের মধ্যে দিয়ে পরিচালক আমাদের কোনো সংলাপ ছাড়া, মাত্র একটা দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে, কীভাবে একটা দেশে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ধীরে ধীরে দানা বাঁধে, অত্যন্ত মুন্সিয়ানায় তা পরিচালক দেখিয়ে দেন। ছবির প্রানোচ্ছল একটা মুহূর্ত্তে, জাফের তার ছোটা ভাই কানেরের খুনসুটির পর জাফের মহা-আনন্দে নদীতে গোসল করতে নামে। গোসলের একটা পর্যায়ে জাফের ডুব দিয়ে উঠেই যে দৃশ্যটা দেখে সেটা দেখে, জাফেরের সঙ্গে দর্শকও ভয়ে আঁতকে উঠে। জাফেরের ব্যাক টু ক্যামেরায় আমরা দেখি একজন একজন করে বেশ কিছু সংখ্যক সেনা মার্চ করে নদী পার হয়ে চলে যায়। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে ‘আংকল বুনমি হু ক্যান রিকল হিজ পাস্ট’ ছবির একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে আমরা দেখি অসুস্থ বুনমি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে শহরতলীর একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে অবস্থান করে । রাতের খাবার খেতে বসলে তার প্রয়াত বউ এবং ছেলে সেখানে এসে হাজির হয়। সারা ছবিতে বুনমি তাদের সঙ্গে কথা বলে যায় এবং মৃত মানুষগুলোকে অসম্ভব রকম জীবন্ত মনে হতে থাকে। জাফেরের সামনে দিয়ে যখন সেনাদল চলে যেতে থাকে এবং সেই সেনাদলের একজনও যখন ভুল করেও জাফেরের দিকে তাকিয়ে দেখেনা, এই অসম্ভব বিষয়টাও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে। শুধু একবার না, ফাইখের বন উজাড় করা দৃশ্যের মতো জাফেরের এই সেনাদলকে বেশ কয়েকবার দেখা যায়। আসলে ফাইখ এবং জাফের দুজনই কাল্পনিক শত্রুর অস্তিত্বের সন্দেহে ঘুরপাক খায়। ফাইখ মনে করে পাহাড়ের ওপারে কোনো যাযাবর জাতি তার বাগানের পপলার গাছগুলো কেটে তার ভূমি দখল করে নেবে। সেজন্য তার পরিবারের মানুষেরাও হয়তো তাদের সহায়তা করতে পারে। কাল্পনিক শত্রুকে মোকাবিলার জন্য, ফাইখ সবাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে কিছু দূরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে রাত কাটায়। অন্যদিকে, জাফের মনে করে তার দাদা (ফাইখ) যদি তাকে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে তাহলে সে সেই সেনাবাহিনীর সাথে যোগদান করবে কিনা। এমনকি মোমেতের বউ মরিয়মের পর্যন্ত বিশ্বাস পাহাড়ের ওপারে শত্রু আছে, যারা তাদের সম্পত্তি দখল করে নিতে পারে। এভাবে ছবির প্রায় সবগুলো চরিত্রের মধ্যে এক অজানা, অচেনা কাল্পনিক শত্রুর অস্তিত্বের সন্দেহের বীজ বুনে চলেন পরিচালক। আকাশের নিচে রাত কাটানো, বন উজাড়া করার দৃশ্য, সেনাবাহিনীর দৃশ্য, মরিয়মের বিশ্বাস এইসব কিছু ছবিতে চমৎকার মেটাফোরিক্যালি সাজানো হয় সেই ষড়যন্ত্র তত্তে¡র উপস্থিতি বোঝানোর জন্য। অথচ ছবির চরিত্র সেই ছোট্ট মেয়ে সুলুর মনে কিন্তু‘ এই ধরণের কোনো সন্দেহ দেখা দেয়না। ছবির একটা দৃশ্যে সে তার বাবাকে বলে, ‘পাহাড়ের ওপারে কোনো যাযাবর নেই’।

মনে হতে বাধ্য, ছবির এই ছোট্ট মেয়েটি যেন যে কোনো দেশের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে। নজরদারির নামে রাষ্ট্র যেসব সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, গোয়েন্দাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী নিরন্তর নিয়োজিত রাখে, নাগরিকদের তাতে কিছুই যায় আসেনা। কেননা তাদের ভেতর কোনো ষড়যন্ত্র তত্তে¡র কোনো শঙ্কা কাজ করেনা। রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত ফাইখ, জাফেরের মতো রাজ-প্রতিনিধিরাই কেবল ষড়যন্ত্র তত্তে¡র গন্ধ পায়। অজানা শত্রুকে (দেশি-বিদেশি) মোকাবিলা করতে গিয়ে একতার চেয়ে বিচ্ছিন্নতা, বিশ্বাসের চেয়ে সন্দেহ, মঙ্গোলের চেয়ে অমঙ্গোলই ডেকে আনা হয় বেশি। এতে করে সমাজ বা রাষ্ট্র শুধু বিভক্ত হয়েই পরেনা, পারস্পরিক শত্রুতে পরিণত হয়। পরিচালক এমিন আলপার আমাদের সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। ছবির বিশাল বিশাল ল্যান্ডস্কেপ, যা অধিকাংশই আমরা দেখি একস্ট্রিম লং শটে সেসব যেন একটা দেশের বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত বহন করে। যদিও শেষ পর্যন্ত একটা ধনাত্মক সমাধানে পরিচালক আমাদের পৌঁছে দেন, পরিবারের সবার বোধদয়ের মাধ্যমে; কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে দর্শক ভাবতেই থাকে। ছবির একবারে শেষ দৃশ্যের শেষ শটটা ছাড়া কোথাও কোনো আবহ সঙ্গীত শোনা যায়না। নদীর স্রোত বাতাস, মুরগির ডাক, গাছের পাতার শব্দ ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক অসাধারণ সঙ্গীতের কাজ করে। এসব প্রকৃতিক আবহ-সঙ্গীতের মতো মেটাফোরিকাল ছবিটা শেষ পর্যন্ত জীবন্ত বাস্তব হয়ে ওঠে। তুরস্কের অভ্যরীণ গোলযোগকে মাথায় রেখে এমিন আলপার ছবিটা নির্মাণ করেছেন বলে ২০১৬ সালের মাঞ্চেন চলচ্চিত্র উৎসবে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের চিন্তা করতে হবে- কি ধরণের সমাজ আমরা চাই? আমরা কি বদ্ধ এবং আদর্শবান একটা সমাজ চাই- যেখানে অভন্ত্যরীণ গোলযোগগুলোকে একেবারে অন্ধের মতো উপেক্ষা করা হয় ? নাকি আমরা তেমন সমাজ চাই, যারা একদিকে নিজেদের একেবারে ধোয়া তুলসি পাতা মনে করেনা; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোকে নিজেদের দুর্বলতা হিসেবেও দেখেনা এবং যে সমাজকে সংঘবদ্ধ হবার জন্য কোনো শত্রু বা যত দোষ নন্দ ঘোষের প্রয়োজন পড়েনা? মনে হয়, ছবিটি দেখার পর এসব বিষয় নিয়ে অনেকেই ভাববেন।’ শুধু এই ছবি নয়, তার পরের ছবি ‘ফ্রেনিজ’ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে।  পরবর্তী কোনো সময়ে আমরা সেই ছবি নিয়ে আলোচনা করবো।

যুদ্ধের নামে অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে : চলচ্চিত্র ‘ওয়ার ডগস্’

ফ্লোরা সরকার ::

‘উলফ অফ দ্য ওয়ালস্ট্রিট’ যেমন পুঁজিবাদ বিরোধী ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ তেমনি যুদ্ধ বিরোধী এক ছবি।  টড ফিলিপ পরিচালিত সাম্প্রতিক ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ মুক্তি পেতে না পেতেই আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। টড ফিলিপ ১৯৯৩ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ২২ এবং তখনও যিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সিনেমার ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নরত, সেই সময়ে পাঙ্ক সিঙ্গার নামে খ্যাত জিজি অ্যালিনকে নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে  সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নির্মাণ করেছেন ‘ওল্ড স্কুল’, ‘স্টারস্কি অ্যান্ড হাচ’ এর মতো কমেডি এবং ইতোমধ্যেই কমেডি নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তার কোনো ছবি এখন মুক্তি পেলে দর্শক বেশ আগ্রহ সহকারেই তার ছবি দেখতে যান। তার উপর ‘ওয়ার ডগস্’ নির্মিত হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে বুশ প্রশাসনের কাছে  দুজন অস্ত্র সরবরহকারীর কর্মকান্ডকে ঘিরে।  ছবির দুই প্রধান চরিত্রের (ইফরাইম ডিভরোলি ও ডেভিড পাকোজ) বাস্তব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে ছবিটি। যারা ২০০৭ এ এই অস্ত্র বিক্রি বাবদ তারা ৩০০ কোটি ডলার উপার্জন করে। যাদেরকে পেন্টাগন খুব কৌশলে নিয়োজিত করেছিলো।

ছবির এক ধারাভাষ্যে জানানো হয় যে, যুদ্ধ একটি বেশ বড় ধরণের লাভজনক ব্যবসা। ছবির হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় একেক জন সেনা নিয়োগে খরচ পড়ে ১৭,৫০০ ডলার এবং ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে কম করে হলেও দুই লাখ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিলো। গ্রীষ্মপ্রধান সেসব দেশের সেনাবাহিনীকে এয়াকন্ডিশনার সরবরাহ করতে হয়েছে তার জন্যেই প্রতি বছর আমেরিকাসহ যুদ্ধে লিপ্ত সরকারগুলোর খরচ করেছে সাড়ে ৪শ কোটি ডলার। ছবির ভিডিও ফুটেজে বুশ প্রশাসনের নানা কর্মতৎপরতা দেখানো হয় এবং কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে একটা অর্থনীতি। যারা এর ভিন্ন কিছু বলে, তারা বড় ধরণের একটা স্টুপিড’।

দুটো চরিত্র ইফরাইম এবং ডেভিডকে নিয়ে ছবির গতি এগিয়ে যায়। অস্ত্র ব্যবসার মধ্যে দিয়ে তাদের দিন বেশ এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু এর মাঝে বাঁধ সাজে ডেভিডের অন্তঃসত্তা বান্ধবী লিজকে নিয়ে। কারণ লিজ খুব কড়াভাবেই ইরাক যুদ্ধবিরোধী একজন নারী। ফলে ডেভিডকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় লিজের কাছে। সে জানায় কিছু চাদর বিক্রির কনট্রাক্ট নিয়েছে সে, সরকারের সঙ্গে। যদিও ছবির নায়ক ডেভিডকে, ছবির শুরুতেই দেখা যায়, সে-ও একজন যুদ্ধবিরোধী মানুষ, কিন্তু তাকে অস্ত্র বানিজ্যে জড়িয়ে পরিচালক যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, ডেভিড মূলত যুদ্ধ বিরোধী হলেও, অর্থ বিরোধী নয়। আসলে, ছবিটি ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে, বুশ প্রশাসনের সেই সময়কে নির্দেশ করে- যে সময়ে, ইরাক-আফগানিস্তানে যুদ্ধের সুযোগে অনেকে ভূঁইফোড় ধনী হবার চেষ্টায় অস্ত্র ব্যবসায় নিজেদের নিয়োজিত করেছিলো।

স্যাটায়ার ধারায় নির্মিত হলেও, ছবির পরিচালক অনেক সত্য প্রকাশ করে দেন ছবির গল্পের মধ্যে দিয়ে। আরো একটা বিষয় হলো, ছবিতে ইফরাইম আর ডেভিড, অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে শুধু যে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলে তা নয়, দুজন ট্যাক্সও ফাঁকি দিয়ে চলে। বিশেষ করে, ডেভিড তার বান্ধবীকে খুশি রাখার জন্য যতটা বিলাসী হওয়া যায় তার জন্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে চলে। যাইহোক ছবিতে, যত বিনোদনের মাধ্যমেই তাদের কাহিনী দেখানো হোক না কেনো, বাস্তবে, ট্যাক্স ফাঁকিসহ নানা কারণে ইফরাইমের চার বছরের জেল হয় এবং ডেভিডকে সাত মাসের জন্য গৃহবন্দী হতে হয়। ছবিতে সেসব দেখানোর প্রয়োজন পড়েনি। কারণ, পরিচালক টড ফিলিপের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, যুদ্ধের প্রকৃত কারণটা দেখানো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর, ‘যুদ্ধ’ নামক বিষয়টি নতুন ভাবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব যুদ্ধ এখন, শুধু যুদ্ধের জন্য যুদ্ধ হিসেবে সংগঠিত হচ্ছেনা, এসব যুদ্ধের পেছনে ‘অস্ত্র বানিজ্য’ নামে ভয়ানক এক বানিজ্যের খেলা শুরু হয়েছে। যে বানিজ্য পুঁজিবাদের অগ্রগামী ভয়ংকর এক অধ্যায়।