Home » প্রচ্ছদ কথা (page 16)

প্রচ্ছদ কথা

মোহাম্মদ আলী : যুদ্ধ আগ্রাসন বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’- এটাই তাকে বোঝানোর জন্য সবচেয়ে সহজ বাক্য। তার অনতিক্রম্য ৫৬-৫ রের্কড তাকে মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা পারফরমার প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ অবস্থায় তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি। লড়াইয়ে তার নজিরবিহীন দক্ষতা আর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস তাকে সত্যিকার অর্থেই ‘সর্ব যুগে সবার সেরা’ করেছে। মুষ্টিযুদ্ধের রিঙে ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য করে এবং মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে’ তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বিদের পর্যুদস্ত করতেন। তিন তিনবার হেভিয়েট শিরোপা জয় করে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানবে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে সনি লিস্টনকে হারিয়ে নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমিই বিশ্বের সম্রাট।’ তার সেদিনের সাম্রাজ্য কেবল হেভিওয়েট রিঙেই সীমিত ছিল। সেই রিঙও তিনি ডিঙিয়েছেন। তিনি কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই নয়, কিংবা সার্বিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, সর্বকালের সেরা মানুষদের একজনে পরিণত হয়েছেন। রিঙের ভেতরে ও বাইরে তিনি যে কৃতিত্ব স্থাপন করেছেন, তা তার আগে বা তার পরও দেখা যায়নি। হয়তো কোনো দিনই দেখা যাবে না। এমনকি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থায় থাকার সময়ও মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা, তার অনন্য মহাত্ম ফুটে ওঠতো। একজন শোম্যান, একজন প্রতিবাদী- বিদ্রোহী, একজন মানবাধিকার কর্মী, একজন সত্যিকার অর্থে ভালো মানুষ, একজন কবি- সব গুণেই তাকে অভিহিত করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, যুগ-নির্বিশেষে তিনি বিস্ময়কর ব্যক্তি, মহামানব। বস্তুত তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষে। এমনকি পৃথিবীর অনেক স্থান- যেখানে মুষ্টিযুদ্ধের কোনোই জনপ্রিয়তা নেই, সেখানেও তিনি মুকুটহীন সম্রাট। এক জন মুষ্টিযোদ্ধার নামও যদি কেউ জানে, তবে তিনি হলেন মোহাম্মদ আলী।

সেরা ফর্মের সময়ে তিনি ছিলেন এককথায় অপ্রতিরোধ্য। তবে তার লড়াই দেখতে যারা আসতো, তিনি তাদের পয়সা উসুল করিয়ে দিতেন। বহুদূর পৌঁছতে পারার সক্ষমতা, রহস্যময় সময় জ্ঞান, অসাধারণ পূর্বাভাস এবং চমৎকার আত্মরক্ষা কৌশল নিয়ে গড়ে উঠেছিল তার দুর্দান্ত দক্ষতা। তার ঘুষি মারার ক্ষমতাসহ যে সামান্য কিছু ঘাটতি ছিল, তা পুষিয়ে দিয়েছিল গতিময় ফুটওয়ার্ক এবং রিংকে ব্যবহারের সক্ষমতা।

তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, ‘আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ আর এই দাবি প্রমাণও করেছেন তিনি ভালোভাবে। আর তাকে ঘিরে থাকা কিংবদন্তিগুলো কেন হয়েছে, তার পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। তার মনমুগ্ধকর দৈহিক গড়ন এবং তারকা গুণাবলী তাকে পরিণত করেছিল, ‘সুন্দরতম’ হিসেবে। আর তার চাতুর্যপূর্ণ কথাবার্তা তাকে পরিণত করে ‘অনন্য’। তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তিনি তার জীবনীকার টমাস হাউসারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কখনো কি এমন কোনো যোদ্ধা ছিল যে কবিতা লিখতো, রাউন্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করতো, সবাইকে হারাতো, মানুষকে হাসাতো, মানুষকে কাঁদাতো এবং আমার মতো এতো লম্বা ও এতো সুন্দর ছিল? পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনা থেকে কখনো আমার মতো কোনো যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেনি।’ তিনি একবার তার এক প্রতিদ্বন্দ্বিকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমাকে হারানোর স্বপ্ন দেখে থাকো, তবে ঘুম থেকে উঠে ক্ষমা চাও।’ আর একবার তিনি মোহাম্মদ আলী নামক মুষ্টিযোদ্ধাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য যথার্থই নির্মম হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে শিরোপার দাবিদার আরনি টারেল বলেছিলেন, তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বির নতুন নামের স্বীকৃতি দেবেন না। আলী সেবার ইচ্ছে করেই লড়াইকে ১৫ রাউন্ড পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর বারবার অসহায় টারেলকে ঘুষিতে ঘুষিতে কাঁপিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘বল, আমার নাম কী? বল আমার নাম কী?’

ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় ফিট। আর তাই যেকোনো কঠিন আঘাতও সহ্য করে এগিয়ে যেতে পারতেন। অবশ্য এই সহ্য করার গুণের জন্য তাকে পরবর্তীকালে মূল্যটা দিতে হয়েছে বেশ চড়া। পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে তিনি অতীতের ছায়া হিসেবেই বেঁচে ছিলেন অনেক দিন। একসময়ের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটি মধ্য বয়সের পর ঠিকমতো হাতটিও নাড়াতে পারতেন না, কথাও ঠিকমতো বলতে পারতেন না। কিন্তু অসহায় অবস্থাতেও নানা কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন।

মুষ্টিযুদ্ধে তার শ্রেষ্ঠত্বের একটি নমুনা হলো তিনি ফলাফল কী হবে,তা চিন্তা না করেই জয়ের অদম্য ইচ্ছা নিয়ে লড়েছেন। তিনি জন্মেছিলেন লড়াই করার জন্য এবং জয়ের জন্য। তিনি যদি একটি আঘাত হজম করতেন, তবে দুটি কিংবা তিনটি আঘাত ফিরিয়ে দিতেন। আর এটাই এই মুষ্টিযোদ্ধার একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তার স্টাইল ছিল প্রথাসিদ্ধ নিয়মনীতির বেশ বাইরে। প্রচলিত নিয়মে তিনি তার হাত দুটি দিয়ে মুখকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে দুপাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য তিনি অসাধারণ রিফ্লেক্স এবং রিচ (৮০ ইঞ্চি) ব্যবহার করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিকে ক্লান্ত করে পর্যুদস্থ করার কৌশলের দিকে তিনি বেশি মনোযোগী থাকতেন।

মোহাম্মাদ আলী নামে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে। ক্যাসিয়াস (সিনিয়র) এবং ওডেসার প্রথম ছেলে ছিলেন তিনি। তার পিতা ছিলেন পেইন্টার। মোহম্মদ আলী ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তার ছোট ভাই রুডলফও মুসলমান হলেন। তার নাম হয় রহমান আলী। আলীর মেয়ে লায়লা আলী পরবর্তীকালে মুষ্টিযুদ্ধে সুনাম অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে আলী চারবার বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১৪ আগস্ট আল বিয়ে করেন সনজি রোইকে। দুটি সন্তান হওয়ার পর ১৯৬৬ সালে এই বিয়ে ভেঙে যায়। তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালিদা ‘বেলিন্দা’ আলীকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৭ আগস্ট। চারটি সন্তান হওয়ার পর তারা আলাদা হয়ে যান। ১৯৭৭ সালের ১৯ আগস্ট বিয়ে করেন ভেরোনিকা পোর্সে আলীকে। ১৯৮৬ সালে এই বিয়েও ভেঙে যায়। তার চতুর্থ ও শেষ স্ত্রী লনি উইলিয়ামস। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরের এই বিয়েটি টিকে থাকে। তারা আসাদ নামের এক ছেলেকে দত্তক নেন। আলীর সন্তানরা হলেন : রাশিদা, জামিলা, মরিয়ম, মিয়া, খালিয়াহ, হানা, লায়লা, মোহাম্মদ জুনিয়র ও আসাদ।

তার মুষ্টিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে একটি চমৎকার কাহিনী বলা হয়ে থাকে। দুই ভাইয়ের শিক্ষা জীবন শুরু হয় একইসাথে। দুভাই আমেরিকার ডুভাল জেনারেল হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। আলীর বয়স তখন ছিল ১২ বছর আর ভাইয়ের বয়স ১০ বছর। এ সময় তাদের বাবা ৬০ ডলার দিয়ে একটা সুন্দর বাইসাইকেল কিনে দেন। দু’ভাই সাইকেলে চড়ে খুব ফুর্তি করে বেড়াতেন। দু’ভাই পালাক্রমে সাইকেল চালাতেন। ১৯৫৪ সালের ঘটনা। সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায় দু’ভাই সাইকেলে করে এক প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলেন। সাইকেলটি রেখেছিলেন বাইরে। কিছুক্ষণ পরে এসে দেখেন, তাদের প্রিয় সাইকেলটি চুরি হয়ে গেছে। দু’ভাই তাতে বেশ দুঃখ পেয়েছিলেন। চোরকে পেটানোর বাসনায় মার্টিন (একইসাথে তিনি ছিলেন মুষ্টিযোদ্ধা প্রশিক্ষক) নামের এক পুলিশ অফিসারের কথাতেই আলী মুষ্টিযুদ্ধ শেখায় মনোযোগী হলেন। জন্ম হলো নতুন একজনের। পরবর্তী ২৭ বছর রিং মাতিয়ে রাখলেন তিনি।

১২ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় জিমে মুষ্টিযুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৬০ সালের অলিম্পিক্সের  জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ১০৮টি বাউট জেতেন, ৬ বার কেন্টাকি গোল্ডেন গে¬াভস চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দু’বার জাতীয় ‘এএইউ’ শিরোপাও জয় করেন।

রোম অলিম্পিকে তিনি লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জয় করেন। অ্যামেচার ক্যারিয়ারে এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ সাফল্য। কয়েকদিন পরই তিনি পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মাত্র ৮টি লড়াই এ জেতার পর তিনি ঠিক কত রাউন্ডে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেবেন, এমন ভবিষ্যদ্ববাণী করে রিঙে নামতে শুরু করলেন। ১৯৬০ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম পেশাদার লড়াইয়ে আলী তার প্রতিদ্বন্দ্বি পুলিশ অফিসার টানি হানসাকারকে পরাজিত করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সময়কালে আলী ১৯টি লড়াইয়ে নেমে ১৫টি নকআউটসহ সবগুলোতেই জয়ী হন। এদের মধ্যে আর্চি মুর, ল্যামার ক্লার্কের মতো দুর্ধর্ষ মুষ্টিযোদ্ধাও ছিল। এদের হারিয়েই তিনি হেভিওয়েট শিরোপার দাবিদার হন।

এর মাঝেই দেশে বর্ণবাদের বিষাক্ত বাস্পে তার হৃদয়-মন পুড়ে গেছে। অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী এই মুষ্টিযোদ্ধাকে একটি শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খাবার দিতে অস্বীকার করে । তিনি ওহিয়ো নদীতে তার পদক ছুঁড়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানান (যদিও অনেকে এটাকে সত্য বলে মনে করেন না; তারা মনে করেন পদকটি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন; ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাকে নতুন আরেকটি পদক প্রদান করে)। পরবর্তীকালের অনেক বড় বড় প্রতিবাদের এটিই ছিল প্রথম।

১৯৬৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব এক অবাক করা ঘটনা দেখলো। এদিন দানবীয় শক্তির অধিকারী সনি লিস্টনকে হারিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপা জয় করেন। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল এটি। বলা যায়, জীবনের অন্যতম জুয়া তিনি এখানেই খেলেছেন। পরবর্তীকালে তিনি যে আরো অনেকবার অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়বেন, তার ভবিষদ্বাণী যেন ছিল এতে। অথচ তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২২ বছর ৩৯ দিন। একদিকে তার বয়স কম। সেই সাথে মাত্র কিছুদিন আগে হেনরি কুপারের সাথে লড়তে গিয়ে চোয়াল ভেঙে ফেলেছিলেন। লিস্টনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আলী জিতবেন, এটা খুব কম লোকই ভাবতে পেরেছিল। লড়াইয়ের আগে আলী তাকে ‘কুৎসিত বুড়ো ভাল্লুক’ হিসেবে খ্যাপাতেন। আর বারবার করে বলতে থাকলেন, তাকে ৬ষ্ট রাউন্ডে নক আউট করবেন। এমনকি তিনি তার বাসার সামনে গিয়েও হৈচৈ করেছেন।

আলী তার কথা রেখেছিলেন। ৬ষ্ট রাউন্ডে এমন মার দিলেন, লিস্টন আর এলেন না পরের রাউন্ডে খেলতে। অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেলেন আলী। আলী রিঙে নেচে নেচে ঘোষণা করতে লাগলেন, ‘আমিই বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন।’ তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি, আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি।’ সত্যিই তিনি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কাঁপন এখনো থামেনি।

দুদিন পর বিশ্ব অবাক হয়ে আরেকটি সংবাদ শুনলো। লিস্টনকে হারানোর চেয়েও এটি ছিল চাঞ্চল্যকর। খবরটি হলো তিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছেন এবং নতুন নাম  নিয়েছেন মোহাম্মদ আলী। নতুন এক কিংবদন্তির জন্ম হলো। আলী তার ক্যাসিয়াস ক্লে নামকে অভিহিত করলেন, ‘দাসত্ব নাম’ হিসেবে। বিশ্বক্রীড়াঙ্গনে একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা হলো এভাবেই। প্রথমে তিনি এলিজা মোহাম্মদ ও ম্যালকম এক্সের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশন অব ইসলামের’ সাথে জড়িয়ে ছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি তাদের সংশ্রব ত্যাগ করেন।

যারা মনে করেছিল, আলীর লিস্টনকে হারানো স্রেফ একটি দুর্ঘটনা, তাদের জবাব দিতে বেশি দেরি হলো না। পরের বছরের (২৫ মে, ১৯৬৫) ফিরতি লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ডের প্রথম মিনিটেই আলী তার দানবীয় প্রতিদ্বন্দ্বি লিস্টনকে নকআউট করে দিলেন। তার শ্রেষ্ঠত্বের নিরঙ্কুশ স্বীকৃতি মিললো। আগের ম্যাচটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না বা পাতানো ছিল না, তাও প্রমাণিত হলো।

এরপর আলী তার শিরোপা রক্ষার জন্য আরো ৮টি লড়াই এ অবতীর্ণ হলেন (নভেম্বর, ১৯৬৫ থেকে মার্চ, ১৯৬৭ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত)- ফ্লয়েড প্যাটারসন, জর্জ শুভালো, হেনরি কুপার, ব্রায়ান লন্ডন, কার্ল মিল্ডেনবার্গার, ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস, আরনি টারেল এবং জোরা ফোলের বিরুদ্ধে। এতো অল্প সময়ে অন্য কোন মুষ্টিযোদ্ধাকে এতো বেশি লড়াইতে অবতীর্ণ হতে দেখা যায়নি।

তার থেকে কেউ শিরোপা নিতে পারেনি। বরং রিঙের বাইরেই তার প্রতিদ্বন্দ্বি সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল ভিয়েতনাম যুুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় আলীর শিরোপা কেড়ে নেওয়া হলো। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর তার লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত রাখা হলো। অথচ এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ ফর্মে থাকার সময়। ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সে তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময়টি রিঙে নয়, কারাগারেই কাটিয়েছেন।

বিশ্ব মুষ্টিযোদ্ধা সংস্থা মার্কিন সরকারের ইচ্ছানুযায়ী একটি মিনি টুর্নামেন্টের আয়োজন করলো। আর তার মাধ্যমে জো ফ্রেজিয়ারকে হেভিওয়েট শিরোপা দিয়ে দেওয়া হলো। শিরোপা রক্ষার জন্য আলীকে সুযোগ দেওয়া হলো না। অর্থাৎ আলী তার শিরোপা কোনো রিঙে হারাননি। বরং হারিয়েছেন নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে।

কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৭০ সালে জেরি কোয়ারির বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে আলী তার প্রত্যাবর্তনের কথা জানিয়ে দিলেন। কিন্তু তদান্তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জো ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলায় সুবিধা করতে পারলেন না তিনি। ‘দি ফাইট অব দি সেঞ্চুরি’ নামে খ্যাত মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ১৯৭১ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ১৫ রাউন্ডের সেই লড়াইয়ে অল্প পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে গেলেন। এই লড়াইয়ের আগে পর্যন্ত দুজনই ছিলেন অপরাজিত। তাই এনিয়ে বেশ আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আলী হাল ছাড়ার পাত্র নন। অবশ্য ফিরতি লড়াইয়ে নামার সুযোগ পেলেন না। তত দিনে জর্জ ফোরম্যান হেভিওয়েট শিরোপা জিতে নিয়েছে। তবে পরবর্তীকালে দু’বার ফ্রেজিয়ারকে হারিয়ে সেই পরাজয়ের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। ফ্রেজিয়ারের কাছে পরাজয়ের পর আলী কেন নরটনের কাছেও হেরে গিয়েছিলেন। আলী শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছিলেন জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে।

জায়ারের (পরবর্তী নাম কঙ্গো) কিনসাসায় নক আউট করেন জর্জ ফোরম্যানকে। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। আলী-ফোরম্যান লড়াইটি মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা লড়াইগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এটির নাম দেওয়া হয় ‘রাম্বল ইন দি জাঙ্গল।’ আলীর বয়স তখন ৩২ বছর। বয়সের ভারে তার সেই ফুটওয়ার্ক আর হাতের কৌশল অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ফোরম্যান তার সর্বোচ্চ ফর্মে। মাত্র ২৬ বছরের তাগড়া যুবক ফোরম্যান ৪০টি লড়াইয়ে অপরাজিত। এই লড়াইয়ে ফোরম্যান সহজেই জয়ী হবে বলে মনে করছিল অনেকেই। তাছাড়া এর আগে মাত্র একজন দ্বিতীয়বার হারানো শিরোপা ফিরে পেয়েছিলেন। তাই ফোরম্যানের দিকেই পাল্লা ভারী ছিল। তবে আলীর অতি উৎসাহী মনোবল তার সমর্থকদের উজ্জীবিত করে তুললো। টান টান উত্তেজনার সৃষ্টি হলো।

আলী সেই লড়াইয়ে ‘দি রোপ-এ ডোপ’ কৌশল উদ্ভাবন করেন। আলী বুঝতে পেরেছিলেন আফ্রিকার তাপমাত্রার জন্য তিনি তার সেই নৃত্য অব্যাহত রাখতে পারবেন না। তাই তিনি ফোরম্যানকে ক্লান্ত করতে তাকে ঘুষি মারতে উদ্বুদ্ধ করেন। আলী ফোরম্যানের মারাত্মক ঘুষিগুলো হজম করেন অবলীলায়। ইতিপূর্বে আর কোনো মুষ্টিযোদ্ধাই আলীকে এতো বেশি আঘাত করতে পারেনি। কিন্তু দেখা গেল, আঘাত হজম করে আলী যতটা না কাহিল হয়েছেন, আঘাত করে করে ফোরম্যান তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। ৬ষ্ট রাউন্ডে ফোরম্যানের ঘুষির শক্তি কমে এলো। ৭ম রাউন্ডে আরো কম। ৮ম রাউন্ড শেষ হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে আলী তার চূড়ান্ড আঘাতটি হানেন। নিউট্রাল কর্নারে ফাঁদে ফেলে আলী অরক্ষিত ফোরম্যানকে ডান হাতে ঘুষি দিতে শুরু করেন। সম্ভবত তিনটি লেগেছিল। নিজ কর্নারে ফিরে আসার আগে ফোরম্যানের চোয়ালে ডান হাত সোজা চালিয়ে দেন । প্রতিরোধের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেন ফোরম্যান। রেফারি ১০ গোনার আগে পুরোপুরি উঠতে পারেননি ফোরম্যান। প্রায় এক দশক আগে জয় করা বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপাটি এভাবেই পুনরুদ্ধার করেন আলী। আলী আবার সম্রাট হলেন। এই লড়াইয়ের ধকল কাটাতে অনেক বছর লেগেছিল ফোরম্যানের। এমনকি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে মুষ্টিযুদ্ধ থেকে অবসর নিতে হয়েছিল।

এই লড়ায়ের এক বছর পর আলী ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলা করেন। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। নাম দেওয়া হয় ‘থ্রিলা ইন ম্যানিলা।’ অনেকের মতে, এটা মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লড়াই। আর তার মাধ্যমেই সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবার তাকে ১৪ রাউন্ড লড়তে হয়েছিল। সেই সাথে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় জয়ের পতাকা উড়ালেন। অর্থাৎ পুরো বিশ্ব জয় করলেন তিনি। তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ এমন জয় পাননি।

টানা ১০বার শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার পর ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শিরোপা খোয়ান তার থেকে ১২ বছরের ছোট অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন লিয়ন স্পিনসকের কাছে। এটাও ছিল আকস্মিক একটি ঘটনা। আলী যখন সর্বজয়ী, তখন অখ্যাত এই অখ্যাত যোদ্ধার কাছে হেরে গেলেন। তবে ৮ মাস পর ফিরতি ম্যাচে তিনি স্পিঙ্ককে হারিয়ে তৃতীয় বারের মতো শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন। এই প্রথম কেউ তৃতীয়বার হেভিওয়েট শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো। আলীর সেই লড়াইটি দেখতে সারা বিশ্ব টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। তখন তার বয়স ৩৬ বছর। এই জয়ের পরপরই তিনি অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। তবে দু’বছর পর (লাস ভেগাসে ১৯৮০ সালের ২ অক্টোবর) তিনি আবার ফিরে  আসেন ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপার পুনরুদ্ধারের জন্য। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর আলী পুরোপুরি ফ্যামিলিম্যানে পরিণত হয়েছিলেন। হোমস ছিল তারই ছাত্র। তারুণ্যে আলীকেই আদর্শ মেনে মুষ্টিযুদ্ধে এসেছিলেন হোমস। তিনি চাচ্ছিলেন না আলীর ক্ষয়িঞ্চু শক্তিকে সবার সামনে মেলে ধরতে। তাই তিনি একটু অস্বস্তি নিয়েই গুরুকে মোকাবেলা করতে নামেন। আলী হয়তো ভেবেছিলেন, অলৌকিক কোনো ঘটনায় তিনি হয়তো জিতে যেতেও পারেন। কিন্তু তা হয়নি। আলী হেরে যান করুণভাবে। ১১ রাউন্ডে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন আলী। তিনি সেদিন তার সেই জৌলুষ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে আলী এই বলে তৃপ্তি পেতে পারেন, তিনি নক আউট হননি। রিঙে তার শেষ দৃশ্যপট মঞ্চস্থ হয় আরো ১৪ মাস পর ১৯৮১ সালের ১১ ডিসেম্বর। এবারের প্রতিপক্ষ ছিলেন জ্যামাইকার ট্রেভর বারবিক। বাহামায় অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে এবারো হেরে যান। ৪০ বছর বয়সে শেষবারের মতো রিং থেকে বিদায় নেন। এই দুটি পরাজয় তার বিশালত্বে তেমন প্রভাবই সৃষ্টি করতে পারেনি। হয়তো চাঁদের কলংকের মতো একটু দাগ কেটে গেছে।

বিশ্ব ইতিহাসে সাড়া জাগানো আরো অনেক মুষ্টিযোদ্ধাই আছে। কিন্তু তবুও আলী একটি ব্যতিক্রম নাম। তিনি নিছক পেশিশক্তির জোরেই জয়ী হননি। রিঙে তিনি যে কৌশলের পরিচয় দিতেন, সেখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত। তিনি আগে নিজে আঘাত না হেনে, প্রতিপক্ষকেই উস্কানি দিতেন আঘাত করার। নানা উত্তেজনাকর কথা বলে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতেন। তার পায়ের কারুকাজ আর ঘুরে  ফিরে প্রতিপক্ষকে ঘুষিগুলোকে এড়িয়ে যেতেন। ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য আর মৌমাছির মতো হুল ফুটাতেন’ তারপর। খুব সহজেই লড়াই শেষ করতে দিতেন না। এ কারণেই যারা খেলা দেখতে আসতো, তারা উপভোগ করতে পারতো। মুষ্টিযুদ্ধ যে শুধু দানবীয় একটি খেলা নয়, এটিও একটি শিল্প, তিনিই প্রথম এবং শেষবারের মতো সবাইকে বুঝিয়ে দেন।

আলী মানেই প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে নতুনত্বকে আহবান করার একটি নাম। ইসলাম ধর্মগ্রহণ করাটা তার জন্য খুব একটা সহজ ঘটনা ছিল না। আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্ট ধর্মের জয়জয়কার। বর্ণবাদ সুগভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে তিনি খ্রিস্টধর্মকে ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণকে অভিহিত করলেন, ‘মূলে’ ফিরে যাওয়া হিসেবে। তিনি তার পূর্বের পরিচয়কে দাসত্বের দাসখত হিসেবেও অবহিত করলেন। তার এই ঘোষণায় অনেক দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেল। শুধু শ্বেতাঙ্গরাই তার শত্রু তে পরিণত হয়নি, তার স্বগোত্রের তথা কালো খ্রিস্টানরাও তার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলো। তবে তিনি সাহস হারালেন না। নতুন দুয়ার নিজেই খুললেন।

তার আফ্রিকা সফর ছিল একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা। এই প্রথম আমেরিকার কোনো ক্রীড়াবিদ আফ্রিকা নামে কোনো মহাদেশের কথা সরাসরি স্বীকার করলেন। সারা বিশ্বে যখন আধিপত্যবাদের শিকল ছেঁড়ার আন্দোলন চলছে, তখন তাদের মাঝে তার উপস্থিতি ছিল একটি বিরাট ঘটনা। আমেরিকার মিডিয়া তার এই সফরকে ঢেকে রাখতে চেষ্টার ক্রুটি করেনি। উপনিবেশিক যাঁতাকল থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আফ্রিকান দেশগুলোতে তার আগমন ছিল একটি অভূতপূর্ব বিষয়। তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অথচ তাদের মতো কালো একজনকে নিজেদের মধ্যে পেল। অধিকন্তু তিনি আফ্রিকায় তার পূর্বপুরুষের অস্তিত্বের কথাও জানালেন।  তিনি ঘোষণা করলেন, ‘মুষ্টিযুদ্ধ রক্তপিপাসু কিছু লোকের সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। আমি আর ক্যাসিয়াস ক্লে নই। কেন্টাকির এক নিগ্রো হিসেবে আমি বিশ্বের, কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্বের। পাকিস্তান, আলজেরিয়া, ইথিওপিয়ায় সব সময় আমার বাড়ি আছে। টাকার চেয়ে এটা অনেক বেশি।’ ঘানায় প্রেসিডেন্ট এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা কোয়ামে এনক্রুমা তাকে বরণ করে নেন। এটাই ছিল কোনো রাষ্ট্রনেতার সাথে তার প্রথম কোলাকুলি। মার্কিন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের আলীর সাথে হ্যান্ডশেক করতে আরো এক দশক সময়  লেগেছিল।

আলী আসলে রিঙের বাইরেই সবচেয়ে বড় লড়াইটিতে লড়েছেন। যে দেশে তিনি থাকেন, সে দেশের প্রভুদের বিরুদ্ধেই তিনি আন্দোলন করেছেন।

১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করা সামান্য কোনো ঘটনা ছিল না। ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করার জন্য তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হলো। তিনি ঘোষণা করেন, “তারা কেন আমাকে ইউনিফর্ম পড়ে বাড়ি থেকে এক হাজার মাইল দূরে যেতে বলবে এবং বাদামি লোকদের উপর বোমা ও বুলেট ফেলতে বলবে যখন লুইসভিলে তথাকথিত নিগ্রো মানুষদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করা হচ্ছে? ভিয়েতকঙের সাথে আমার কোনো বিবাদ নেই। কোনো ভিয়েতমানি আমাকে কখনো ‘নিগার’ বলে ডাকেনি।” তিনি অস্বীকার করলেন সরাসরি। এমনকি তিনি যদি সেদিন চুপচাপ থাকতেন, তবুও তার উপর এতো চাপ আসতো না। কিন্তু আলী তা করলেন না। আলীকে প্রথমে নিজ দেশে নিষিদ্ধ করা হলো। তিনি টরন্টো, ফ্রাংকফোর্ট, লন্ডনে (দুবার) শিরোপা রক্ষা করলেন। এতে তার লাভই হলো। তার ফ্যানের সংখ্যা বহির্বিশ্বে বাড়তেই থাকলো। কিন্তু দেশে তিনি এমন সমস্যায় পড়লেন, যা তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ পড়েননি। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র আমেরিকান হিসেবে তার অবস্থান পরাশক্তিটির জন্য ছিল এক মহা অস্বস্তিকর ব্যাপার। এক কৃষ্ণাঙ্গ  আর মুসলমান তরুণ বিশ্বের অন্যতম পরক্রমশালী, শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্টান দেশটির সমালোচনা করবে, আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তা কোনোমতেই সহ্য করা যায় না। তাই সামরিক বাহিনী তাকে যুদ্ধে পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো। আইনজীবীরা তাকে কারারুদ্ধ করার ফন্দি আঁটলো। মিডিয়া তাকে তরুণ আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে কদর্য উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত করলো। তাকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে আনার জন্য অনেক কিছুই করা হলো। অবশ্য ফাঁকে ফাঁকে লোভনীয় নানা প্রস্তাব দিয়ে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টাও কম করা হয়নি। এমনকি সামরিক বাহিনী থেকে এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, আলী যদি শুধু নাম লেখান, তবেই যথেষ্ট। তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন, প্রদর্শনী লড়াইয়ে নামতে পারবেন। এমনকি চাইলে পেশাদার লড়াইয়ে নামতে পারবেন। কিংবা অসুস্থতার ভান করে দুই কূলই রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু আলীর সেই এককথা, ‘যুদ্ধ করা আমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। আমার বিবেক সায় দিলে আমি সহজেই রণাঙ্গনে যেতে পারতাম।’ তিনি বললেন, ‘তারা যখন লুইসভিলের তথাকথিত নিগ্রোদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করছে, তখন কেন তারা আমাকে ভিয়েতনামের বাদামি মানুষের বিরুদ্ধে বোমা আর বুলেট বর্ষণ করতে বলছে? আমি আমার বিশ্বাস আর অবস্থানে অটল থেকে কিছুই হারাবো না। আমি চার শ’ বছরও কারাগারে থাকতে পারি।’

তার এই প্রত্যয়ে তার নিজের ভবিষ্যতই ফ্যাকাসে বলে মনে হলো। তিনি শিরোপা হারালেন, কারারুদ্ধ হলেন, কোটি কোটি ডলার থেকে বঞ্চিত হলেন। মনে হলো, আলী একটি বিস্মৃত নাম। কিন্তু তা তো হবার নয়। পরে আলীর কথাই ঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন যে ভুল ছিল, তা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আর তিনি ফিরেছেন রাজসিকভাবে। এটা যে কতবড় জয়, তা এককথায় কি প্রকাশ করা যায়?

অন্যদিকে ফ্রেজিয়ার ও ফোরম্যানের বিরুদ্ধে তার জয় কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই সীমিত থাকেনি। এসব লড়াইকে স্রেফ মুষ্টিযুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করা হলে ভুল হবে। চামড়ায় কালো হলেও এই দু’জন ছিলেন আসলে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সরকারের, খ্রিস্টান ধর্মের প্রতিনিধি (এখানে তা একটি বিশ্বাসের নাম নয়, এটা আগ্রাসী সংস্কৃতির প্রতিভূ বিবেচনা করেছেন অনেকে। আর আলীর ইসলাম ছিল সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা সংস্কৃতি)। ভিয়েতনামে আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানানোর কারণে আলীর শিরোপা কেড়ে নিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফ্রেজিয়ারকে। তাকে তখন মার্কিন সরকারের অনুকূলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। অধিকন্তু তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে পদকজয়ী দুই অ্যাথলেটিক-টমি স্মিথ ও জন কার্লোস কালো দাস্তানা পরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তখন মুষ্টিযুদ্ধে স্বর্ণজয়ী ফোরম্যান এফবিআইয়ের পরামর্শক্রমে মার্কিন পতাকা দুলিয়েছেন। তাই এ দুজনের বিরুদ্ধে তার জয় ছিল প্রচলিত ও পরাক্রমশালী শক্তি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই বিজয়। কিনসাসায় ফোরম্যানের বিরুদ্ধে লড়ার আগে মোহাম্মদ আলী টিভি ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘আমি আল্লাহর জন্য এবং আমার জনগণের জন্য লড়ছি। আমি টাকার জন্য বা খ্যাতির জন্য লড়ছি না। আমি আমার জন্য লড়াই করছি না। আমি কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উন্নতির জন্য, যেসব কৃষ্ণাঙ্গের ভবিষ্যত নেই, যেসব কৃষ্ণাঙ্গ মদ আর মাদকাসক্তিতে ডুবে রয়েছে, তাদের জন্য লড়ছি। আমি আল্লাহর হয়ে কাজ করছি।’

এটিও সহজ কোনো ঘোষণা ছিল না। তিন আরো বলেন, ‘এই ফোরম্যান খ্রিস্টানত্ব, আমেরিকা এবং সেই পতাকার প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি তাকে ছেড়ে দেব না। সে কুকুরের মাংসের প্রতিনিধিত্ব করছে।’

তিনি তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই তাকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে সবাই। যে আলীকে একদিন যে শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খেতে দেওয়া হয়নি, সেখানে তিনি হয়েছিলেন পরম আকাংখিত ব্যক্তি। যে দেশ তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, সেই আমেরিকাতেই আলী সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছেন। যে পদকটি তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন একদিন, সেটি আবার নতুন করে তাকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাদা কালো, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নাম হলো আলী। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিক গেমসের মশাল প্রজ্জ্বলনের সম্মানটি তাকেই দেওয়া হয়। আলী যখন মশালটি প্রজ্জ্বলন করেন, তখন অনেককেই আবেগে কেঁদে ফেলেন। তবে অনেকেই বলে থাকে, পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার পর আলী যখন করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন, তখনই সাদা আমেরিকা তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে।

চলৎশক্তি হারিয়ে ফেললেও সবাই তাকে কাছে পেতে চায়। আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, পোপ, দালাইলামা সবাই তাকে আগ্রহভরে গ্রহণ করে। তৃতীয় বিশ্বে তিনি ক্রমাগত ছুটে চলেছেন নানা মিশনে। এমনকি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকজন মার্কিন পণবন্দিকে মুক্তির জন্য তিনি আলোচনা জন্য সাদ্দাম হোসেনের কাছে যান।

আলীর মুষ্টিযুদ্ধ জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটিকে ধরা যেতে পারে, মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অলিম্পিক স্বর্ণলাভ এবং হেভিওয়েট শিরোপা বিজয়। তারপরের ধাপটি হলো এক মানবতাবাদী নেতার আত্মপ্রকাশ। এই পর্যায়ে তিনি আফ্রিকা জয় করেছেন, মূলে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন তথা সর্বগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন। তারপর তৃতীয় পর্যায়ে তিনি হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করেছেন, এক নতুন যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আর সব শেষে তিনি বিশ্ব নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া শান্তি, সামাজিক দায়িত্ব, সম্মান এবং ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য তিনি কেন্টাকির লুইসভিলে নির্মাণ করেছেন মোহাম্মদ আলী সেন্টার। প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই কেন্দ্রটি ২০০৫ সালে উদ্বোধন করা হয়।

আলী শেষ জীবনে বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেখানেই যান, বাঁধভাঙা সংবর্ধনা পেয়েছেন। এতোকিছুর পরও তীক্ষ্ন রসবোধ হারিয়ে ফেলেননি। মুষ্টিযুদ্ধে তার গড়া রেকর্ড অক্ষুন্ন থাকেনি। কিন্তু মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, উজ্জ্বল তারকা হিসেবে তিনি বিশ্বের যে উচ্চতায় উঠতে পেরেছেন, তা তার আগে  কেউ পারেনি, হয়তো পরেও কেউ পারবে না।  তিনি যে প্রত্যয় নিয়ে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছিলেন, তাতে এই সম্মান কেবল তারই প্রাপ্য।

মোহাম্মদ আলীর ফ্যাক্টফাইল :

পুরো নাম : মোহাম্মদ আলী

জন্ম নাম : কেসিয়াস মার্সেলাস ক্লে, জুনিয়র

ডাক নাম: দি গ্রেটেস্ট, লুইসভিল লিপ।

জন্ম : ১৭ জানুয়ারি, ১৯৪২; লুইসভিল, কেন্টাকি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মৃত্যু : ৩ জুন, ২০১৬; ফিনিক্স এরিয়া হাসপাতাল, অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র।

শিরোপার বিভাগ : হেভিওয়েট।

অলিম্পিক গেমস স্বর্ণপদক লাভ : লাইট হেভিওয়েট, ১৯৬০, রোম।

মোট লড়াই : ৬১টি; জয় ৫৬, নক-আউটে জয় ৩৭, পরাজয় ৫, ড্র ০।

বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপার লড়াই : ২৫টি (সবগুলোই হেভিওয়েট) জয় ২২, পরাজয় ৩।

মোহাম্মদ আলীর হেভিওয়েট শিরোপার লড়াইগুলো

২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৪ : সনি লিস্টন; মিয়ামি, জয় (প্রতিপক্ষের পরাজয় স্বীকার, ৬ষ্ট রাউন্ড)।

২৫ মে, ১৯৬৫ : সনি লিস্টন, লুইস্টন; মেইন, জয় (প্রতিপক্ষ নক আউট, ১ম রাউন্ড)।

২২ নভেম্বর, ১৯৬৫ : ফ্লয়েড পিটারসন; লাস ভেগাস, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১২তম রাউন্ড)।

২৯ মার্চ, ১৯৬৬ : জর্জ চুভালো; টরেন্টো, জয় (পয়েন্টে)।

২১ মে, ১৯৬৬ : হেনরি কুপার; লন্ডন, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ৬ষ্ট রাউন্ড)।

৬ আগস্ট, ১৯৬৬ : ব্রায়ান লন্ডন; লন্ডন, জয় (নক আউট, ৩য় রাউন্ড)।

১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৬ : কার্ল মিল্ডেনবারজার; ফ্রাংকফুর্ট, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১২তম রাউন্ড)।

১৪ নভেম্বর, ১৯৬৬ : ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস; হিউস্টন, জয় (পয়েন্টে)।

৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৭ : আরনি টেরেল; হিউস্টন, জয় (পয়েন্টে)।

২২ মার্চ, ১৯৬৭ : জোরা ফলি; নিউ ইয়র্ক, জয় (নক আউট, ৭ম রাউন্ড)।

৮ মার্চ, ১৯৭১: জো ফ্রেজিয়ার; নিউ ইয়র্ক, পরাজয় (পয়েন্টে)।

৩০ অক্টোবর, ১৯৭৪: জর্জ ফোরম্যান; কিনসাসা, জায়ার, জয় (নক আউট, ৮ম রাউন্ড)।

২৪ মার্চ, ১৯৭৫ : চুক ওয়েপনার; ক্লিভল্যান্ড, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১৫তম রাউন্ড)।

১৬ মে, ১৯৭৫ : রন লাইলি; লাস ভেগাস, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১১শ রাউন্ড)।

১ জুলাই, ১৯৭৫ : জো বাগনার; কুয়ালালামপুর, জয় (পয়েন্টে)।

১ অক্টোবর, ১৯৭৫ : জো ফ্রেজিয়ার; ম্যানিলা, জয় (প্রতিপক্ষের পরাজয় স্বীকার, ১৪তম রাউন্ড)।

২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ : জিন পিয়েরি কুপম্যান; স্যান জুয়ান, জয় (নক আউট, ৫ম রাউন্ড)।

৩০ এপ্রিল, ১৯৭৬ : জিমি ইয়ং; ল্যান্ডওভার, ম্যারিল্যান্ড, জয় (পয়েন্টে)।

২৪ মে ১৯৭৬ : রিচার্ড ডান; মিউনিখ, জয় (নক আউট, ৫ম রাউন্ড)।

২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬ : কেন নরটন; নিউ ইয়র্ক, জয় (পয়েন্টে)।

১৬ মে, ১৯৭৭ : আলফ্রেডো ইভানজেলিস্টা; ল্যান্ডওভার, জয়, (পয়েন্টে)।

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ : আরনি শ্যাভার্স; নিউ ইয়র্ক, জয় (পয়েন্টে)।

১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮ : লিওন স্পিনসক; লাস ভেগাস, পরাজয় (পয়েন্টে)।

১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ : লিওন স্পিনসক; নিউ অরলিন্স, জয় (পয়েন্টে)।

২ অক্টোবর, ১৯৮০ : ল্যারি হোমস; লাস ভেগাস, পরাজয় (লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানো, ১০ম রাউন্ড)।

 

দিগম্বর থেকে কান ধরে ওঠ-বস্, এরপরে কী

শাহাদত হেসেন বাচ্চু::

ময়মনসিংহের মমিনুন্নেসা কলেজের শিক্ষক ফরিদ উদ্দিনকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে দিগম্বর করে ঘোরানো হয়েছিল। সেটি ২০১৪ সালের অক্টোবরের ঘটনা। খবরের কাগজে এটি প্রকাশিত হযেছিল তবে তা নিয়ে কেউই প্রতিবাদী হয়ে ওঠার সাহস পাননি! এক সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ উদ্দিন এখন কোথায় আছেন জানিনা, সংসদ সদস্যও সদ্য প্রয়াত, দিগম্বর করে ঘোরানোর বিষয়টিও চাপা পড়ে গেছে অজস্র ঘটনার আড়ালে।

ঘটনাটি উল্লেখিত হয়েছে এ কারণে যে, সম্প্রতি আরেকজন সংসদ সদস্য নারায়নগঞ্জের দোর্দন্ড-প্রতাপশালী সেলিম ওসমান কথিত ধর্ম অবমাননার ছুতোয় শ্যামল কুমার ভক্ত নামের একজন প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করিয়েছেন। সেখানে সরকারী কর্মকর্তারাসহ অনেক মানী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। কান ধরে ওঠ-বস করানোর সময় মাঠ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ বলে উল্লাসধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। মিডিয়ার কল্যাণে এর পূর্বাপর সকল ঘটনা এখন দেশবাসীর জানা। অচিরেই আরও কোন ঘটনার আবর্তে স্বাভাবিক নিয়মে এটিও চাপা পড়ে যাবে এবং নতুন ঘটনা নিয়ে মেতে উঠবেন সকলে।

সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।  তার নেতা হচ্ছেন এক সময়ের রাষ্ট্রপতি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত আলহাজ্ব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সেলিম ওসমানদের পরিবারের অভিভাবক হচ্ছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। ২০১৪ সালের জুন মাসে জাতীয় সংসদে মৃত্যুভীতির কথা বলেছিলেন এই পরিবারের আরেকজন- ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রীর সহানুভূতি ও তাদের পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পেয়েছিলেন।

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছিলেন, “… কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু কোন পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় বা ধ্বংস করার প্রচেষ্টা, সে বিষয়ে জাতিকে সজাগ থাকতে হবে, … যারা বারবার আঘাতের লক্ষ্যে পরিনত হন। ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য কিছু হলেও বড় করে দেখা হয়। অনেকে বড় বড় অপরাধ করে, কিন্তু তা কেউ দেখে না…”।

দলÑমত নির্বিশেষে ১৫ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী বিশেষ পরিবার, বিশেষ মানুষের পক্ষ নিতে পারেন এটি বিশ্বাস করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী যাকে “ক্ষেত্র বিশেষে সামান্য কিছু” বলেছিলেন, তা যে কত ভয়ঙ্কর সেটি জানেন নারায়নগঞ্জের মেয়র আইভি রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য কবরী, আকরাম হোসেন প্রমুখ। এরা সবাই সক্রিয় আওয়ামী লীগার। আরও জানেন, তিনি রাফিউর রাব্বি ও তার স্ত্রী। যাদের কিশোর সন্তান ত্বকীকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরে খুন করা হয়েছে। অসংখ্য সাধারন মানুষও জানেন, জিজ্ঞাসা করে দেখুন, জানা যাবে।

এই ধারাবাহিকতাই চলছে, যার সবশেষ শিকার শিক্ষক শ্যামল ভক্ত। স্কুল শিক্ষকদের এতদিন লাঠিপেটা করে, পিপার -স্প্রে দিয়ে শাসন করা হয়েছে। এখন ‘মাননীয় সংসদ সদস্য’ স্কুল শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করাচ্ছেন, নাকি বাংলাদেশ কান ধরে ওঠ-বস করছে! ঘটনা এখানেই থেমে নেই। শিক্ষক নির্যাতনের পরে তাকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মাঠে নামানো হয়েছে হেফাজতসহ ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে। তাদের মাধ্যমে দাবি তোলা হয়েছে ধর্ম অবমাননাকারী শিক্ষকের ফাঁসি। এমনিতেই দেশের প্রচলিত আইন ও শাসনব্যবস্থা প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ। এতসবের মধ্য দিয়ে যে সত্যটি মুখ ব্যাদান করে আছে তা হচ্ছে, দেশের অনেক জায়গায় ধর্মীয় উস্কানীর সাথে এখন সাঙ্গ-পাঙ্গরাই জড়িত।

ঢালাওভাবে বলার অবকাশ নেই, তারপরেও অনেক সংসদ সদস্য তাদের এলাকায় প্রাচীন সামন্ত প্রভু হয়ে উঠেছেন। তারা যেন অনেকটা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, সরকারের ভেতরে সরকার। সেলিম ওসমান, শামীম ওসমান, মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন, আমানুর রহমান রানা, আব্দুর রহমান বদি বা এদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বাংলাদেশে একেকটি রূপক মাত্র। আগের কথা বাদ দিলে গত দু’দশকে দেশে এরকম হাজারও মানুষ তৈরী হয়েছে নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির যাত্রায়। এরা জাতিকে দিগম্বর করছে, কান ধরে ওঠ-বস করাচ্ছে, সামন্ত্র প্রভুর আদলে মানুষের ওপর নির্যাতনের খাঁড়া নামিয়ে আনছে। শিশুকেও গুলি করতে দ্বিধা করছে না।

আইন কখনও-সখনও এদের নাগাল পেলেও বিচার নাগাল পায় না। একটি হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী টাঙ্গাইলের সংসদ সদস্য আমানুর রহমান রানাকে পুলিশ খুঁজেই পায়নি। অবশেষে দীর্ঘকাল পরে আমানুরের বাসায় একটি মাল ক্রোকের মহড়া দেখেছে সবাই। ২০১৪ সালে বিহারীদের উচ্ছেদ করতে মিরপুরে বিহারী ক্যাম্পে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনা চাপা পড়ে গেছে। ঐ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দূর্ঘটনা নামক পরিকল্পিত খুনের শিকার হয়েছে। অভিযোগঃ এ ঘটনায় সংসদ সদস্য জড়িত বলে মামলা এগোয়নি। খুলনায় বিথার হত্যাকান্ডের চার্জশীটভুক্ত আসামী  সংসদ সদস্যকে অধিকতর তদন্ত করে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সংসদ সদস্য শাওনের গাড়িতে তার পিস্তলের গুলিতে নিহত দলীয় কর্মী ইব্রাহিম হত্যা মামলায় চার্জশীট থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

অন্যায়, অপরাধ, এমনকি খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেবার জন্য রাষ্ট্র এখানে একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু করেছে। এই দায়মুক্তির বিষয়টি অতীতেও ছিল, কিন্তু এমন ঢালাওভাবে অতীতে প্রয়োগ হয়েছে বলে জানা যায় না। দলীয় কর্মীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এজাহারভুক্ত আসামী হলেও দু’জন সংসদ সদস্যকে দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে সংসদ সদস্যর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও এজাহার বা তদন্তে তার নাম আসেনি। ওপর মহলের চাপ ও একপেশে তদন্তের ফোঁকর দিয়ে নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও গডফাদাররা পার পেয়ে যাচ্ছেন।

সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি দন্ড মওকুফ করে দিচ্ছেন। অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ২২ জন আসামী দন্ড রদ করে দিয়েছেন রাষ্টপতি। এই ধারায় সবশেষ ফঁসির দন্ড মওকুফ করা হয়েছে প্রথমবার নাকচ হয়ে যাওয়া ফরিদপুরের যুবলীগ নেতা আসলাম ফকিরের। তার জন্য ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তত ছিল এবং অনেকটা চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের মত তার মৃত্যুদন্ড মওকুফের খবর আসে।

হত্যা মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ড বহাল থাকা আসামীদের দন্ড রদ করায় সকল অন্যায়- অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি উৎসাহিত হচ্ছে এবং দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত অপরাধীরা অনেকটা সুরক্ষিত এবং অভয়ারণ্য মনে করছে দেশটিকে। এই অন্যায্যতা-অন্যায় প্রতিহত করার জন্য দেশে রাজনৈতিক শক্তি অবশিষ্ট না থাকায় জনগন সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে।

দায়মুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে অনেকগুলি মাইলফলক স্থাপন করেছে। সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের যেসব সাবেক- বর্তমান মন্ত্রী-এমপিদের যে অস্বাভাবিক সম্পদ বিবরনী দাখিল হয়েছিল, তারা এখন দুদকের বিবেচনায় দায়মুক্ত। সম্প্রতি টেকনাফের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির বিপুল সম্পদ দায়মুক্ত হয়েছে। গত ১৮ জুন ২০১৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার সূত্র ধরে প্রথম আলো পরিবেশিত প্রধান খবরের শিরোনামে বলা হয়েছিল, “মানব পাচার, ইয়াবা, রোহিঙ্গা বৈধকরণ তিন তালিকাতেই এক নম্বর সংসদ সদস্য বদি’’। এরকম একজন ব্যক্তির নাগাল পাচ্ছে না রাষ্ট্র-আইন-বিচার আর দুদক তাকে দিচ্ছে বিশাল সম্পদ অর্জণের দায়মুক্তি।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের যে শক্ত প্রতিদ্বন্ধীতার মুখে পড়ার কথা ছিল সেটি হয়নি। তাদের কৃতকর্মের জবাবদিহিতা ব্যালটে দিতে হয়নি। একক ও প্রায় প্রতিদ্বন্ধীতাবিহীন নির্বাচনে সেটি তিরোহিত হয়। ফলে নির্বাচিতদের একটি বড় অংশই সবচেয়ে বেপরোয়া ও জবাবদিহিতাহীন মানুষ। কোন সমালোচনা বা বিরুদ্ধাচারণ কিংবা ইতিবাচক পরামর্শও তারা সহ্য করছেন না। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন প্রণেতা হিসেবে তারা শুধুমাত্র ব্যক্তির কাছে দায়বদ্ধ, জনগনের কাছে নন। এজন্যই এলাকায় একেকটি মিনি সাম্রাজ্য তারা কায়েম করেছেন, যার দন্ডমুন্ডের কর্তা তিনি।

পরিবারতন্ত্র, পরিবার, পরিবারের মান-মর্যাদা এগুলি সামন্ত সমাজের প্রতীক এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি পরিত্যাজ্য। কিন্তু বাংলাদেশ হাঁটছে পেছন যাত্রায়। এজন্য এখানে ব্যক্তি, পরিবার কৌলিন্য মুখ্য হয়ে উঠছে। এর মূল্য দিতে হচ্ছে জনগনকে। ইতিহাসের বড় শিক্ষাটি মনে রাখছেন না কেউ যে জনগনের সম্মিলিত ইচ্ছার কাছে ব্যক্তি ইচ্ছা মুখ্য হতে পারে না। জনগনের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটাতে রাজনৈতিক শক্তি কি দাঁড়াবে বাংলাদেশে? প্রয়াত লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ এক যুগ পরেও কতটা প্রাসঙ্গিক সেটি বোঝার জন্য তাকে উদ্বৃত করা হচ্ছে। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় সে সময়ে তিনি লিখেছিলেন; “সকাল থেকে মধ্যরাত, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত এখানে নিরন্তর গর্বিত মিথ্যাচার ও আরও মিথ্যাচারের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়। রাষ্ট্র অবিরল শেখায় যে মিথ্যাচারই সত্যাচার, দুর্নীতিই সুনীতি, অত্যাচারই জনগনকে সুখী করার পদ্ধতি, প্রতারণাই সুসমাচার, অনধিকারই অধিকার, বর্বরতাই সংস্কৃতি, অন্ধকারই আলোর অধিক, দাম্ভিকতাই বিনয়, সন্ত্রাসই শান্তি, মৌলবাদই মুক্তি, মুর্খ অসৎ অমার্জিত ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র তান্ডব আর নিষ্পেসনই গণতন্ত্র” (সূত্র: আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, হুমায়ুন আজাদ, পৃঃ ১৪-১৫  )।

অকাল প্রয়াত লেখক এটি যখন লিখেছিলেন তারচেয়ে কি বদলেছে কোনকিছু? এখন আমরা শুধু হুমায়ুন আজাদের আত্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি কথিত দিন বদলের বাংলাদেশে!

 

 

শুধু পশ্চিমবঙ্গের দিকে নয় আসামের দিকেও তাকান

আমীর খসরু ::

ভারতের চারটি রাজ্যের সদ্য সমাপ্ত বিধান সভা নির্বাচনের ফলাফলের গুরুত্ব দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিশেষ করে বিজেপি’র জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫’র শেষের দিকে বিহার এবং দিল্লীতে বিজেপি’র পরাজয়ের পরে ‘মোদী জোয়ার’-এ ভাটা পড়েছে বলে ভারতীয় বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন। এমনটাও বলা হচ্ছিল যে, এই দুটো রাজ্যে বিজেপি’র পরাজয়ের অর্থ অসহিষ্ণুতার পরাজয় এবং ভারতের বিজয়। যাহোক, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য চারটি রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশী ভারতের দুটো রাজ্য অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বের দাবি রাখে।

তবে বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস দ্বিতীয় দফায় জয়লাভ করেছে বিপুলভাবে এবং মমতা ব্যানার্জী শপথ নেবেন দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। এ সপ্তাহেই তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।

মমতা ব্যানার্জীর বিজয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা বেশ উৎফুল্ল এবং আনন্দিত। ত্বড়িৎগতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইচ মাহমুদ আলী এক বার্তায় মমতা ব্যানার্জীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই অভিনন্দন বার্তাটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দ্বিতীয় দফার বিজয়ে মমতার উদ্যোগে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অধিকতর উন্নয়ন হবে। তবে ক্ষমতাসীনদের মনে এই আশাবাদের জন্ম নিয়েছে যে, তিস্তা চুক্তি মমতার দ্বিতীয় দফায় সম্পন্ন হবে। কিন্তু বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিদের মমতার বিজয়ে উৎফুল্ল এবং আনন্দিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সমস্যাবলী সমাধানে প্রথম দফায় মমতার কর্মকান্ডগুলো একটু স্মরণে রাখা প্রয়োজন। তিস্তার পানিবন্টন নিয়ে তার ভূমিকা কী ছিল তা সবারই জানা। ভারতে কংগ্রেস সরকারের সময়ে অর্থাৎ ২০১১-এর সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরকালে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি হয়েই যাচ্ছে-এমন উচ্চ আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। কিন্তু মমতা তখন আসেনইনি, বরং তিস্তা চুক্তির খসড়ায়ও তিনি আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি না আসায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ কথাটি বলতে শুরু করলো যে, মমতার কারণেই তিস্তা চুক্তি হয়নি এবং হচ্ছে না। এরপর তিস্তা প্রশ্নে মমতাকে রাজি করানোর জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এটা মনে করা হচ্ছিল যে, মমতা রাজি হলেই তিস্তা চুক্তি হবে। কিন্তু এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, মমতা ব্যানার্জী যা কিছু করবেন তা ভারতের জন্য, নিজেদের স্বার্থেই। এখানে মমতা ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একই ভূমিকা নেবে এটাই নিশ্চিত; এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলেই তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির ভবিষ্যত কী তা সহজেই অনুমেয়। মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশনীতি শুধুমাত্র তিস্তা চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমনটা নয়। ফারাক্কা বাধের একটি স্লুইসগেইট /ভেঙ্গে যাবার কারণে বাংলাদেশ যখন কিছুটা পানি পেয়েছে, তখন এর বিপক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন মমতা। ফারাক্কা বাধ দিয়ে বাংলাদেশে কেন পানি যাচ্ছে তা নিয়ে ২০১২ সালের মার্চে মমতা ব্যানার্জী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন এবং সাক্ষাতও করেছিলেন। এ চিঠি এবং সাক্ষাতে বাংলাদেশ যাতে পানি না পায় সে লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে ফারাক্কার বাধ মেরামতের কাজ শুরু করার জন্য তিনি জোর অনুরোধও জানিয়েছিলেন। এছাড়াও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মমতার ভূমিকা কী তার অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব। কাজেই দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে এমনটা যারা বিশ্বাস করেন তাদের পুনরায় বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

বাংলাদেশের বরং বেশি মাত্রায় দৃষ্টিনিবদ্ধ করতে হবে আসামের বিধান সভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে। আসামে বিজেপি’র তেমন কোনো অস্তিত্ব ছিল না ইতোপূর্বেকার নির্বাচনগুলোতে। এবারে সেই বিজেপিই ১২৬টি আসনের মধ্যে একাই পেয়েছে ৬০টি এবং জোটগতভাবে পেয়েছে ৮৬টি। আসাম নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, বিজেপি’র প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ-সহ বাঘাবাঘা সব নেতারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন। নির্বাচনের আগে তারা সেখানে বসবাসকারী মুসলমানদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই চিহ্নিত করে এটিকেই প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে গ্রহণ এবং শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসামে বেশ কিছু নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়ে মুসলমানদের ভোটাধিকার থাকবেনাসহ এ জাতীয় নানা বক্তব্য দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং স্পষ্টভাষায় বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত সিল করে দেয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ঠেকানো হবে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেয়া হবে বলেও তিনিসহ পুরো বিজেপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাদের সবার মুখে ছিল একই কথা।

তবে বাংলাদেশের অনেক বিশ্লেষক এখন বলতে চাইছেন, এসব বক্তব্য নির্বাচনী বোল-চাল বা ইলেকশন রেটরিক্স। কিন্তু এই বিশ্লেষকদের সাথে পরিপূর্ণ একমত হওয়া বাস্তব পরিস্থিতিতেই যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয় না। আসামের বিধান সভা নির্বাচনে জয়লাভের পরে বিজেপি’র নতুন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সানোয়াল তার সরকারের অগ্রাধিকারগুলো কি হবে তার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে- আগামী দু’বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করে দেয়া হবে। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের ব্যাপারে তার সরকার কঠোর হবে এমন কথাও রয়েছে ওই অগ্রাধিকারের তালিকায়। আর এ লক্ষ্যে আসামের নাগরিকদের জন্য তথ্য ভান্ডার গড়ে তোলার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। কাজেই বিজেপি’র অনুপ্রবেশ ইস্যুটি নিছক নির্বাচনী রেটরিক্স বলে মেনে নেয়া কতোটা যুক্তিযুক্ত তা বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

আসামে বিজেপি’র উত্থান শুধুমাত্র অনুপ্রবেশকারী হঠাও বা সীমান্ত সিল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত হবেনা। কারন, আসামে বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যে আরও বিস্তার লাভ করবে তা নিশ্চিত। আসাম বিজেপি কেন্দ্রীয় বিজেপি’র মতোই অসহিষ্ণুতার রাজনীতির পথেই এগিয়ে যাবে বলেই ধারণা করা যায়। আর বিজেপি শুধুমাত্র আসামের মধ্যেই তাদের সীমাবদ্ধ রাখবে তা নয়, ক্রমান্বয়ে ত্রিপুরাসহ সাত রাজ্যের অন্যান্যগুলোর দিকেও তারা হাত বাড়াবে। এটা মনে রাখতে হবে, আসামে সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণু রাজনীতির বিস্তার এবং উত্থানের নানাবিধ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের উপরও পড়বে। বাংলাদেশের বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই রাজনীতিতে যারা বিশ্বাসী তারা এমন একটি পরিস্থিতির সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে-এটাই স্বাভাবিক।

কাজেই শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের দিকে না তাকিয়ে থেকে আসামের দিকেও দৃষ্টিনিবদ্ধ করা খুবই জরুরি।

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে ভারতেই তীব্র প্রতিবাদ-ক্ষতিপূরণ মামলা

ভারতের আদালতে ১৩ হাজার কোটি রুপির মামলা

অলোক গুপ্ত, থার্ডপোল.নেট ও ওয়েবসাইট অবলম্বনে

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটানো হলে যে কী ভয়াবহ মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে, সেটা প্রমাণ করার জন্য ভারতের অন্যতম নদী বিশেষজ্ঞ দিনেশ মিশ্র দেশটির দুটি বিশাল ব্যারেজের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিলেন। কোশি ব্যারেজ শেষ হয় ১৯৬২ সালে; এর উদ্দেশ্য ছিল কোশি নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু নদীর গতিপথ বারবার পরিবর্তন করার জন্যে অবকাঠামো নির্মানের কারনে বন্যায় ভাসিয়ে দেয় বলে একে বলা হয় ‘বিহারের দুঃখ’। অন্যদিকে, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করা হয় ১৯৭৫ সালে। উভয় ব্যারেজই উদ্দেশ্যসাধনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই প্রবল বন্যা বইয়ে চলেছে কোশি নদীতে। আর কোলকাতা বন্দরে ভরে যাচ্ছে পলিতে। কেবল এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশের নদীগুলোর পানিশূন্যতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য ফারাক্কা ব্যারেজকেই দায়ী করা হয়ে থাকে।

গঙ্গার পানির অভাবে ও বিরূপ প্রভাব যে শুধু বাংলাদেশের ক্ষতি করছে তা নয়। এর ভয়াবহ ক্ষতির কথা তুলে ধরছেন খোদ ভারতের মানুষও। আর এ নিয়ে রিট পিটিশন হয়েছে সেদেশের পরিবেশ আদালত অর্থাৎ ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে ৯ জন ভারতীয় নাগরিকের জনস্বার্থে করা এই রিট পিটিশনে মোট ৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবছর ১৩ হাজার ১০১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এডবিøউএআই-এর কাছে ৩৭৮ কোটি।  কেপিটি’র কাছে ২১৬ কোটি। সেচ বিভাগের কাছে ৪ হাজার ৯৫৭ কোটি। ৩ হাজার ২২৬ কোটি রুপি  ফারাক্কা ব্যারেজ প্রকল্পের কাছে। টিএইচডিসি’র কাছে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি। ইউজেভিএনএল’র কাছে ৭১৯.৪ কোটি রুপি প্রতিবছর। জেভিপিএল’র কাছে ৩৫৬.২ কোটি। এএইচপিসিএল’র কাছে ১ হাজার ৩৮১ কোটি রুপি। এ মাসেই গ্রিন ট্রাইব্যুনালে এই মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

গঙ্গার উপরে ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিবাদে এবার ভারতের বিহার রাজ্যে চলছে তীব্র প্রতিবাদ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চাভিলাষী পানিপথ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গঙ্গায় ছোট ছোট ১৫টি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উত্থাপনা করার প্রেক্ষাপটেই বিহারের মন্ত্রীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। ভারতীয় পার্লামেন্টে ‘ন্যাশনাল ওয়াটার ওয়ে অ্যাক্ট’ পাস করার অল্প কয়েক দিন আগে বিহারের মন্ত্রীরা প্রতিবাদ জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রাজ্য বিধানসভায় বিহারের পানিসম্পদ মন্ত্রী রাজিব রঞ্জন সিং বলেন, ‘এই পরিকল্পনা কেবল পরিবেশগত রীতিনীতির প্রতিই অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়নি, সেই সাথে রাজ্যে আরো বড় বন্যার হুমকিও সৃষ্টি করছে। পানিপথের জন্য এ ধরনের অনেক ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণের ফলে গঙ্গায় ব্যাপক পলি জমা হবে। এতে করে রাজ্যে নদীটির তীরজুড়ে থাকা অন্তত ৩৬টি শহরে বন্যার সৃষ্টি হবে।’

নৌপথ প্রকল্প : ভারতের অব্যবহৃত নদীগুলোকে পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করার জন্য বিলটিতে ১১১টি নদীকে জাতীয় নৌপথের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। প্রায় ১৪,৫০০ কিলোমিটার নাব্য নৌপথ নির্মাণ করার জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৭০হাজার কোটি রুপি (১০ বিলিয়ন ডলার)।

ভারতের সড়ক পরিবহন, মহাসড়ক ও জাহাজ চলাচলবিষয়ক মন্ত্রী নিতিন গাড়করি পার্লামেন্টকে অবহিত করেন, ভারতে নৌপথের মাধ্যমে বাণিজ্য হয় মাত্র ৩.৫ ভাগ। অথচ চীনে ৪৭ ভাগ, ইউরোপে ৪০ ভাগ, জাপানে ৪৪ ভাগ, কোরিয়া ও বাংলাদেশে ৩৫ ভাগ বাণিজ্য হয় নৌপথে। পরিবেশগত উদ্বেগের সাথে সুর মিলিয়ে গাড়করি বলেন, সড়ক পরিবহন অনেক বেশি দূষণ সৃষ্টিকারী, এতে প্রতি বছর ৫০ হাজার দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় প্রায় দেড় লাখ লোক নিহত হয়। অথচ পরিবেশবান্ধব জাহাজ চলাচল খাতের (বাজেট ৮০ বিলিয়ন রুপি, ১.২ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় সড়ক পরিবহনে বাজেট প্রায় ছয় গুণ বেশি (৫৫০ বিলিয়ন রুপি, ৮.৩ ডলার)।

প্রকল্পটিতে ছয়টি জাতীয় নৌপথের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘতমটি হবে ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-১। এটা হবে গঙ্গায় হালদিয়া থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত ১,৬২০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এটা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত হবে। ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ থেকে ৬ হবে ব্রহ্মপুত্র, ওয়েস্ট কোস্ট ক্যানেল, গোড়াবারি, কৃষ্ণা, ব্রহ্মমনি ও বরাক নদী দিয়ে।

ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে ১-এর জন্য এর মধ্যেই ৪২ বিলিয়ন কোটি রুপির প্রকল্প চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক এর অর্থায়ন করবে। এটা পুরো বিহার রাজ্য দিয়ে উত্তরপ্রদেশের বারানসি থেকে পশ্চিমবঙ্গের হালদিয়া পর্যন্ত পানিপথ রচনা করবে। পুরো বিহার সম্পৃক্ত থাকাতেই রাজ্যটির রাজনীতিবিদেরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেছেন।

ভয় ও শংকা: এই ১,৬০০ কিলোমিটারের এই নদীপথের প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মিত হবে। রঞ্জন বলেন, এই প্রকল্পের ফলে যে বিপুল পলি জমা হবে, তা নিয়ে কী করা হবে, সে ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা নেই। পলি জমে নদীর তলা উঁচু হবে, ফলে বন্যার সৃষ্টি হবে।

বিহার রাজ্যের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যটির ৭৪ ভাগ এলাকাই বন্যাপ্রবণ। রাজ্যের ৩৮টি জেলার ২৮টিই প্রায় প্রতিবছর বন্যায় আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ১৫টিতে প্রতি বছরই বর্ষায় বন্যাকবলিত হয় বলে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে বিহার সরকারের তীব্র প্রতিবাদকে দেখা হচ্ছে বিরোধী দলীয় শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার বিরোধ হিসেবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিকল্পনা নিয়ে ভীত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে রাজ্য সরকারের।

বিহারের স্টেট এনভায়ারমেন্ট ইমপ্যাক্ট এ্যসেসমেন্ট অথরিটির সদস্য নুপুর বোস বিহারের গঙ্গার পানিবিজ্ঞান ইউরোপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘নদীটির বিশাল অংশই রয়েছে ভূকম্প জোনে, এখানে ১৫টি ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণ হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’ তিনি আরো বলেন, প্রকল্পটির যথাযথ পরিবেশ মূল্যায়ন দরকার। তিনি দাবি করেন, নৌপথ প্রকল্পটির ব্যারেজ ও ড্যামের নক্সা প্রায় পুরোপুরি ফারাক্কা ব্যারেজের মতো। তিনি বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজ ইলিশ মাছকে নির্মূল করে দিয়েছে। আর নৌপথ গঙ্গার ডলফিনের আবাসকে শেষ করে দেবে।

তার এই কথা প্রকল্পটির সম্ভাবনা শেষ করে দেওয়ার জন্য নয়। গাড়করির মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, নৌপথ প্রকল্পটি ভারতের পরিবহন খাতে বৈপ¬বিক পরিবতন আনবে। তবে বাস্তবায়নের আগে এই বিশাল প্রকল্প নিয়ে আরো চিন্তাভাবনা করা দরকার।

বিপর্যয়কর প্রকৌশল : দিনেশ মিশ্র উল্লেখ করেন, ১৯৫২ সালে বিহারে মাত্র ৬০ কিলোমিটার বাঁধ ছিল। বর্তমানে তা ৩,৭০০ কিলোমিটারের বেশি। এসব ব্যারেজ ও বাঁধের অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণই বন্যার অন্যতম কারণ। ২০০৮ সালে একটি বাঁধে ফাটল ধরায় বিহারে ৩৫ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। কোশি নদীর তীরবর্তী সাতটি জেলার লোকদের উদ্ধারের জন্য প্রায় প্রতি বছরে বর্ষা মওসুমে ত্রাণ ক্যাম্প খুলতে হয়।

ফারাক্কা ব্যারেজের কথা উল্লেখ করে নুপুর বোস বলেন, কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত রেখে চলাচল উপযোগী করে রাখতে হুগলি নদীতে ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত করা দরকার। তার মতে, ‘ব্যারেজটি উদ্দেশ্যসাধনে ব্যর্থ হয়েছে, এটা এখন প্রকৌশলগত ব্যর্থতার সমাধিতে পরিণত হয়েছে।

২০১২ সালে একদল আইনপ্রণেতা ফারাক্কা ব্যারেজ ধ্বংস করার দাবি জানিয়েছিলেন। নুপুর বোস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘গঙ্গায় ১৫টি ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে কী ঘটবে, তা আমরা কল্পনা করতে পারি।’

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো পরিকল্পনা কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না বিহারের মন্ত্রীরা। জাতীয় পার্লামেন্টে পাস হওয়ার কোনো বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো সহজ নয়। আবার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যে বিপদ ঘনিয়ে আসবে, সেটাও ভয়াবহ। এ প্রেক্ষাপটে রাজিব রঞ্জন বলেন, ‘আমরা বিপর্যয়কর প্রকল্পটি রুখতে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করব।’

আতংক ভীতি ও শংকার ভেতর বসবাস

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

২০১৬ সালের ৮ মে, বাংলা ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের ১৫৫ তম জন্মবার্ষিকী রবীন্দ্র সুরের লহরী ভরা ছিল না। একই দিন বিশ্ব মা দিবসে অনেক মা কান্নার সাগরে ডুবেছেন। কার্যত: খুনরঙা সকালটি ছিল অনেকের জন্য বুকভাঙ্গা বেদনার। একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল, প্রাণ গেল আরো পাঁচ জনের, চতুর্থ দফা ইউপি নির্বাচন শেষে মোট নিহত ৬২ জন। অন্যান্য দৈনিকের শিরোনামে খুনের সংখ্যা ৮, মোট ৮৪ জন এবং রাজশাহীতে পীর খুন। প্রতিটি মিডিয়ায় এখন আকছার খুনের খবর প্রতিদিন।

প্রায় প্রতিটি সকালই এখানে খুনরঙা। ঘুম ভেঙ্গে দিন শুরু হয় হত্যার খবর শুনে। দিনে হত্যা, দুপুরে হত্যা, রাতে হত্যা। ২৩ এপ্রিল ২০১৬ কালের কন্ঠের প্রধান শিরোনাম ছিল সাড়ে তিনমাসে ১৫০০ খুন। চলতি মাসে যুগান্তর প্রধান শিরোনাম করেছিল প্রতিদিন গড়ে ১১ জন খুন হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান থেকেই তারা এ হিসেব বের করেছে। অপহরণ, গুম, দস্যুতা, নারী-শিশু নির্যাতন সবকিছু সীমা ছাড়িয়েছে।

খুন হচ্ছেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক-ব্লগার, রাজনৈতিক কর্মী, বিদেশী সংস্থার কর্মকর্তা, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, ছাত্র-ছাত্রী, গৃহবধূ, কথিত সন্ত্রাসী- কেউই রেহাই পাচ্ছে না। নাস্তিক আখ্যা দিয়ে, কাফের অথবা সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে, কারনে-অকারনে মানুষ খুন করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রায় ক্ষেত্রে খুনীরা থাকছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আবার দৃশ্যমান খুনীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রিগারহ্যাপি একদল মানুষ পাখি মারার মত মানুষ মারছে।

প্রতিটি খুনের খবর দুঃসহ। একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। গোটা সমাজে জিগীষা-জিঘাংসা বাড়ায়। সমাজের সকল স্থিতি ভেঙ্গে পড়তে থাকে। আরো দুঃসহ হচ্ছে, খুনীরা ধরা পড়ে না। বিচারহীনতার চলমানতা অব্যাহত থাকে। খুনের বয়ান নিয়ে আলোচনায় মাতে সরকার, বিরোধী দল, পুলিশ, সিভিল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়, সংবাদপত্র ও টিভি টক শো। শুরু হয় ব্লেইম গেমের পালা। হারিয়ে যায় নিহত মানুষ, পরিবার এবং খুনীরা। বদলে জায়গা করে নেয় অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের খেলা।

পুলিশ প্রায় ক্ষেত্রে খুনীদের গ্রেফতার করতে পারছে না। কিন্তু তারা নাকি কারণ অনুমান করতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রেজাউল করীম খুন হবার পরে তারা অনুমান করেছে,  ব্লগার অনলাইন এক্টিভিষ্টদের হত্যার সাথে মিল রয়েছে। পুলিশের আইজি গত ৩ মে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, তিন বছরে ৩৭টি জঙ্গী হামলার ৯০% কারণ তারা সনাক্ত করেছেন। এরমধ্যে একটি মামলায় বিচার শেষ হয়েছে, ৬ মামলা তদন্ত শেষ করে পুলিশ আদালতে চার্জশীট জমা দিয়েছে। ত্রু টিহীন অভিযোগপত্র দিতে চায় বলেই পুলিশ সময় নিচ্ছে। তার দাবি মতে, অভিযোগপত্র না দিলেও পুলিশ ৩৪ টি মামলার মূল কারণ উদঘাটন করেছে।

এগুলি হচ্ছে তথ্য বা পরিসংখ্যান। সরকারী তরফে ভাষ্যগুলো এখন জনগনের মুখস্থ। “কারণ জানে বা মূল রহস্য উদঘাটন হয়েছে, জাল গুটিয়ে আনা হচ্ছে, ৪৮ ঘন্টা বা অচিরেই সব আসামী ধরা পড়বে, কাউকে ছাড়া হবে না”- আকছার এসব শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল -এটি বলার পরেও তাদের কৃত পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১১। একেকটি খুন ও ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা থাকতে থাকতে নতুন এক বা একাধিক খুন আগেরটিকে চাপা দিয়ে দিচ্ছে। ধামাচাপা পড়ছে আগের ভয়াবহতা। এরকম শত শত খুনের কথা ভুলে যাচ্ছে মানুষ।

নিত্য ঘটে যাওয়া খুন-গুমের ঘটনা নিয়ে মিডিয়ার তাৎক্ষণিক সরবতা এবং পরবর্তী নিথরতা এখন বাস্তবতা। মানুষের প্রশ্ন- কেন একের পর এক এই হত্যাকান্ড? কেন ঘটছে, কারা ঘটাচ্ছে? এসবের মধ্য দিয়ে আরো বড় প্রশ্ন হচ্ছে- দেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে? উত্তর শোনা যাচ্ছে, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা, ইসলামিক ষ্টেট- ইসলামিক ষ্টেট নয় ইত্যাদি! এভাবেই খুনের কারণ উদঘাটন, অপরাধী গ্রেফতার ও বিচারের বদলে মানুষকে ফেলে দেয়া হচ্ছে গোলকধাঁধায়।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, কলাবাগানে জোড়া খুন, লেখক-ব্লগার-অনলাইন এ্যাক্টিভিষ্টদের খুনগুলি একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। হত্যাকারী, যারাই হোক, পেশাদার, প্রশিক্ষিত ও একধরনের ফ্যানাটিক। হত্যাকান্ডগুলি তাৎক্ষণিক উত্তেজনাপ্রসূত নয়, আচানক কোন ঘটনাও নয় এবং সুপরিকল্পিত তো বটেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সিরিয়াল কিলিংয়ের পেছনে মাষ্টারমাইন্ড কে বা কারা? সত্যি কি অন্ধকার জগতে এরকম পেশাদার-প্রশিক্ষিত খুনীদের দল গড়ে উঠেছে ,নাকি ভীতি-আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াতে ষড়যন্ত্রের নিপুন জাল বোনা হচ্ছে?

অতি স¤প্রতি একজন লেখক-ব্লগার খুন হয়েছেন। হত্যাকান্ডের বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে। কলেজ ছাত্রী তনু হত্যাকান্ড আড়াল হতে চলেছে। তনুর দ্বিতীয় ময়না তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। হত্যাকারী ধরা তো দুরে থাক, শনাক্ত করা যায়নি। ক্ষমতাবান কোন পক্ষ কি এগুলি আড়াল করতে কাজ করছে? রাষ্ট্র কোন সদুত্তর দিতে পারছে না। শুধুই গুজব ডাল-পালা মেলছে। মানুষের মনে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরী হচ্ছে। পারসেপশন স্থায়ী হচ্ছে, অনেক হত্যাকান্ডের মত এগুলিও অন্ধকারে চলে যাবে।

এই মে মাসে প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসবে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ও নজিরবিহীন তান্ডবের ঘটনা। ওই ঘটনায় দায়েরকৃত অর্ধশতাধিক মামলা ভাগ্যে কি ঘটেছে? হিমাগারে চলে গেছে আরও অনেক মামলার মত! সরকার ও হেফাজতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলির বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক জানাচ্ছে, একধরনের অলিখিত সমঝোতার ফলে হেফাজতের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলি নিস্ক্রিয় হয়ে আছে (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৬)।

তিন বছর আগের ৫ মে’র তান্ডবে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম এলাকা জ্বলছিল, সরকারী মহল ছিল চরম উৎকন্ঠায়। এ ঘটনায় রাজধানীসহ সারাদেশে নিহত হয়েছিল সরকারী হিসেবে ২৭ জন, আহতের সংখ্যা ছিল অনধিক দেড় হাজার। এসব ঘটনায় দায়েরকৃত ৫৩ টি মামলার তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের অনাগ্রহ লক্ষণীয়। ফলে এটি ধরে নেয়ার যথেষ্ট কারন রয়েছে যে, সরকার অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি উস্কে দিতে চাইছে এবং ক্ষেত্রবিশেষ পুরোন বা নতুন মামলার গতি ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া অনেক প্রশ্নের সুযোগ সৃষ্টি করছে।

এখন উন্নয়নের কাল! যে কোন মূল্যে উন্নয়ন একমাত্র প্রতীতি। গুলি করে, জবাই করে, দখল করে প্রতিদ্ব›দ্বীদের পরাস্ত করে জেতা এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকা মূল লক্ষ্য। এই প্রত্যয় ও উন্নয়নকামীতা ক্রমশ: হয়ে উঠছে প্রাণসংহারী। লাশ পড়ছে, কুচ পরোয়া নেই। উন্নয়ন এবং উন্নয়নই একমাত্র লক্ষ্য। সরকার তরফে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, পেট্রোল বোমায় মানুষ পুড়িয়ে মেরে সরকার পতনে ব্যর্থ হয়ে এখন তারা গুপ্তহত্যায় মেতেছে। আর বিএনপি নেতা বলছেন, সরকারকে সকল হত্যার দায় নিতে হবে। এই ব্লেইম গেমের পালায় খুনীরা আড়াল হয়ে গেছে, চাপা পড়ে যাচ্ছে খুনের ঘটনা।

পরিসংখ্যান দিয়ে খুনের ঘটনা মূল্যায়নের সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ক’টি খুন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সেটির সাথে তুলনা করে এ দেশের চিত্র মেলানো যাবে না। এখানে অপরাধের ধরণ, সংঘটিত হবার পর তদন্ত- বিচার এবং অপরাধ সংশ্লিষ্ট পূর্বাপর পরিবেশ দিয়েই গোটা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে হবে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর লাশ উদ্ধার, ইউপি নির্বাচনে ৮০ খুন, মঠবাড়িয়া ও বাঁশখালীতে ট্রিগারহ্যাপি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহতের ঘটনা ধরেই মূল্যায়নে যেতে হবে।

খুন, গুম, অপহরণ, নারী নির্যাতনের চিত্র পুরোনো। স্বাধীনতার পরে ৪৫ বছরে লক্ষাধিক পরিবার এসব ঘটনার ভিকটিম। বিচারহীনতার সংস্কৃতি স্থায়ী আকার লাভ করেছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা নানা মাত্রায় আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন নিয়ে সহিংসতা সামগ্রিক অপরাধের ক্ষেত্রে ভিন্নমাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছে।

পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নিরাপত্তাবোধহীনতার বিষয়টি এক্ষেত্রে সবার আগে চলে আসবে। অপরাধ প্রতিকার ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতার কারণে মানুষের মধ্যে সংশয়-অনিশ্চয়তা বাড়ছে, নিরাপত্তাবোধ ভাঙ্গা দালানের পলেস্তরার মত ঘসে পড়ে যাচ্ছে। সমাজে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ঘটনায় মানুষের কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, মেনে নিচ্ছে অবলীলায়। কিছু ঘটনায় ব্যাপক সোচ্চার হচ্ছে। আবার কিছু ঘটনা জনমনে দাগ কাটছে না। এভাবেই অপরাধের বিষয়টি সমাজ-রাষ্ট্রে সহনীয় হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠা এবং সাধারণ জনগোষ্ঠির নিস্ক্রিয় হয়ে যাওয়া যে কোন রাষ্ট্রের জন্য অশনী সংকেত। যে সকল ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকছে সেখানে মানুষ এগোচ্ছে না। কারণ, পরিনতিটা জানা হয়ে গেছে। এজন্যই অভিজিৎ রায়ের হত্যাকান্ডের সময়কালে তাকে বাঁচানোর জন্যে এগিয়ে আসার পরিবর্তে অনেকেই মোবাইলে ছবি তুলেছে। ওয়াসিকুর রহমানের ঘটনায় আসামী ধরে দিয়েছিল কয়েকজন হিজড়া; কিন্তু ওই আসামীদের পুলিশ ছেড়ে দেয়; অজুহাত যারা ধরিয়ে দিয়েছে তারা তৃতীয় লিঙ্গের। অন্যদিকে রানা প্লাজার ঘটনায় পরিনতির বিষয়টি মানুষের কাছে পরিষ্কার ছিল এজন্য তারা স্বেচ্ছায় এগিয়েছে। ফলে এটি এখন সুস্পষ্ট যে, একই জায়গায় মানুষ সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে এগোচ্ছে, অন্য জায়গায় স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয় থাকছে।

জনগনের এই অনুভূতি, ভীতি-আতঙ্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও শাসকদের ভূমিকা ছিল বেশি। সুতরাং এটি তাড়াতে তাদের দায়িত্ব বেশি। ভীতির পরিবেশ থেকে মানুষকে স্বস্তিতে ফিরিয়ে আনতে শাসকদের যে ন্যায়ানুগ আচরন প্রয়োজন তা সূদুর পরাহত হতে চলেছে। তারা অন্তত: একটি কাজ করতে পারেন, গুজবকে উস্কে না দিয়ে সত্য ও স্বচ্ছতার পরিবেশটি সৃষ্টি করতে পারেন। মানুষ উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পাশাপাশি দেখতে চায়। সেজন্য ভীতি তাড়িয়ে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে একইসাথে চলতে না দিলে শাসকদের আশঙ্কাই না সত্যে পরিনত হয়!

কয়লা বিদ্যুত : বাঁশখালীতে জায়েজ তবে চীনে নিষিদ্ধ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ওয়েবসাইট অবলম্বনে

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ করে কয়লার ব্যবহার নিয়ে সচেতন মহল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সোচ্চার

চীন সরকার সে দেশে কয়েক’শ কয়লা-বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিচ্ছে। আর এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহারের মৃত্যুঘণ্টা হঠাৎ করেই জোরালো হয়ে পড়ল।

অথচ তেল ও কয়লাই আধুনিক বিশ্বে জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎস। দুটিই আবার মারাত্মক পরিবেশ দূষণ করে। বিশ্বজুড়ে তা-ই বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ করে কয়লার ব্যবহার নিয়ে সচেতন মহল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সোচ্চার। এই প্রেক্ষাপটেই চীনা সিদ্ধান্তটি এলো।

চীন নিজ দেশে ইতোমধ্যে ২৫০শ’র বেশি কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করেছে এবং আরও বেশ কিছু বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ঠিক এর উল্টো নীতিটাই গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। চীনের তিনটি কোম্পানী চট্টগ্রামের বাঁশখালী, মহেশখালী এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পায়রায় তিনটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করবে, এমনটাই চূড়ান্ত হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সাথে। আর এই তিনটির প্রতিটি ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। চীন বাংলাদেশে আরও কয়েকটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। চীনের নীতি হচ্ছে এমন- নিজ দেশে নিষিদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে তা সঠিক এবং যথাযথ বলে তারা মনে করছে। চীনের এই দ্বৈত নীতি গ্রহণ স্বাভাবিক কারণেই তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ কতোটা প্রবল তা প্রমাণ করে।

অবশ্য কেবল চীন নয়, আরো অনেক দেশও এগিয়ে এসেছে এ দিকে। চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ খাত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই খাতে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার ছাড়িয়ে যাবে গ্যাস। যে যুক্তরাজ্যে কয়লাই শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছিল, সেখানকার স্কটল্যান্ড অতি সম্প্রতি তাদের শেষ কয়লা প্লান্টটি বন্ধ করে দিয়েছে। আর ইংল্যান্ড তার শেষ কয়লা খনিটিতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। পিবডি ও আর্চের মতো বিশাল কয়লা কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেখে অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো কয়লা প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দার রেশ ধরে কয়লা খাতে যে মৃদু সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা এখন এই কালো পদার্থটিকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

পরিবেশবাদী গ্রুপ সিয়েরা ক্লাবের পরিচালক মরা চোলির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতই নাড়িয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি চীনা মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, সরকার ২৫০ শ’র বেশি কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। বিভিন্ন প্রদেশে নির্মিয়মান এসব প্রকল্প থেকে ১৭০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা  জার্মানির মোট ব্যবহারের সমান, তা উৎপাদনের কথা ছিল।

বলা হচ্ছে, ভয়াবহ মাত্রায় বায়ু দূষণ সৃষ্টিকারী কয়লার ব্যবহার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই চীন এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এই নোংরা জ্বালানিটির বিরুদ্ধে দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমবর্ধমান হারে সোচ্চার হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারা এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে চীন নতুন কোনো কয়লা খনি চালু না করার কথা ঘোষণা করে। তাছাড়া ছোট ছোট বিভিন্ন খনিও তারা বন্ধ করে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহারের ফলে ছাই উদগীরণ, বিষাক্ত ধোয়া ছাড়াও আরো কিছু পরিবেশগত সমস্যা রয়েছে। এর একটি হলো বিপুল পরিমাণে পানির ব্যবহার। উত্তর চীনে এমনিতেই পানির দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে। কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে তাদের পানি সমস্যা আরো প্রকট হয়ে পড়ছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, চীন কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে? তাদের কাছে বিকল্প হিসেবে আছে জলবিদ্যুৎ এবং আরো কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা থেকে সরে আসার একটি কারণ ছিল তুলনামূলক সস্তায় গ্যাস প্রাপ্তি। এছাড়াও গত বছর প্যারিসে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, সরকার ও কোম্পানিগুলোকে অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ জ্বালানির দিকে মনোনিবেশন করতে হবে। এটিও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে।

বিশ্বজুড়ে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৫ সালে বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ হয়েছে রেকর্ড ২৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা কয়লা ও গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। আর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি হয়েছে জলবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য খাতে।

অর্থাৎ সারাবিশ্বই এখন কম খরচে করে বেশি বিদ্যুৎ প্রাপ্তির দিকে ঝুঁকছে।

তা-ই বলে কয়লা এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। চীনে থাকা অসংখ্য কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো আরো কয়েক বছর অব্যাহত থাকবে। হয়তো অর্ধশত বছর তাদের অস্তিত্ব থাকবে। তাছাড়া পরিবেশ-বান্ধব-এমন কথা বলে সেখানে নতুন নতুন কয়লা-চালিত প্রকল্প গড়ে ওঠতে পারে।

আর কেবল চীন নয়, ভারতও কয়লার ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে চলেছে। ভারতের বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো সৌর শক্তিকে কাজে লাগাতে চাইলেও তারা কয়লার ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কাটাতে চাইছে না। অনেকের আশংকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কয়লার ব্যবহার বাড়তে পারে। এমনকি জাপানের মতো উন্নত অর্থনীতির দেশও কয়লার দিকে ঝুঁকবে বলেই মনে করছে অনেকে। বিশেষ করে ২০১১ সালের ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎ প্লান্ট বিপর্যয়ের পর তারা এ দিকেই হাঁটবে বলে মনে হচ্ছে।

তিন সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ

হায়দার আকবর খান রনো ::
তিন সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, দলীয় বা ব্যক্তি সন্ত্রাস এবং ধর্মীয় মৌলবাদী সন্ত্রাস। এই তিন ধরনের সন্ত্রাসের মূল জায়গা কিন্তু একটাই। রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে গণতন্ত্রের অভাব। এমনকি অবাধ গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস প্রবাহিত থাকলে, কোন ধরনের উগ্রপন্থা বিস্তার লাভ করতে পারতো না-ইসলামী জঙ্গী মৌলবাদও নয়।
সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর আশা করা গিয়েছিল গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটবে। কিন্তু ঘটেনি। আর গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর গণতন্ত্র পুরোপুরি নির্বাসিত হয়েছে। এই রকম পরিস্থিতিতে অন্যান্য সকল গণতান্ত্রিক অধিকার তো দূরের কথা, প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে। একদা খালেদা ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে যে বিচার বহির্ভূত হত্যা শুরু করেছিলেন, তা ক্রমাগত ব্যাপকতর হয়েছে। সেদিন খালেদা জিয়া যে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছিলেন তা হলো ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময় যারা নির্যাতন করেছিল, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করেছিল তাদেরকে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন পার্লামেন্টে আইন পাস করে। সেই খালেদা জিয়া এখন গণতন্ত্রের দাবিতে চিৎকার করে গলা ফাটালেও তা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তাই তার ডাকে রাস্তায় মানুষ নামে না। অন্যদিকে, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এমন বিপর্যস্ত অবস্থা সরকারি দলকে কর্তৃত্ববাদী করে তুলেছে।
ক্লিনহার্ট অপারেশনের জায়গা নিয়েছে ক্রসফায়ারে। এক কথায় বিচার বহির্ভূত হত্যা। এইভাবে গুম, খুন, অপহরণ এবং বিচারহীনতা এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করেছে। রাষ্ট্র যখন নিজেই সন্ত্রাসের ভূমিকা নেয় তখন জনগণ বড় অসহায় বোধ করে। আর বিচার? সেও দুরাশা মাত্র। তনু হত্যার বিচার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘প্রশাসন চায় না, বিচার বিভাগ ঠিক মতো চলুক।’ (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৬)।
তনু হত্যা অবশ্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ঘুরে ফিরে রাষ্ট্র বা সরকার এসে পড়ছেই। কারণ ২০ মার্চ তনুর লাশ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের মতো কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এলাকায় পাওয়া গেলেও এবং দুই দুইবার ময়নাতদন্ত করা হলেও হত্যা রহস্যের কিছুই উদঘাটিত হলো না। জনমনে সন্দেহ- কিছু একটা আড়াল করা হচ্ছে। এমন সন্দেহ সরাসরি প্রকাশ করেছেন-মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেছেন, তনু হত্যার ব্যাপারে যেন কোন জজ মিয়ার নাটক না হয়।
এই রকম ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সাথে একাকার হয়ে যায়। কারণ বিচারহীনতা সন্ত্রাসকেই উৎসাহিত করে। ক্ষমতাসীন দলের দলীয় সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থেকে আসলে ভিন্ন কিছু নয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মাস্তানরা যখন পুলিশের উপস্থিতিতে অথবা পুলিশের সহায়তায় ক্ষমতার দাপট দেখায়, জমি দখল, সম্পত্তি দখল, টেন্ডার বাক্স দখল, হিন্দুদের উপর অত্যাচার, ব্যবসা-বাণিজ্য মাস্তানি ট্যাক্স বসায়, তখন তাকে অন্য আর কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবো। গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না।’
দলীয় সন্ত্রাস, খুনাখুনি পর্যন্ত পৌছায়। প্রতিপক্ষকে খুন, নারীর উপর যৌন নির্যাতন, টেন্ডার-দখল করতে গিয়ে খুন এবং নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ও লুটের ভাগ নিয়ে খুন। এমনি নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল মাতৃগর্ভের এক কন্যাশিশুও। বাস্তবেই বড় ভয়াবহ পরিস্থিতি।
গাইবান্ধার সরকার দলীয় সংসদ সদস্যে হাসতে হাসতে খেলার ছলে এক বারো বছরের বালককে গুলি করলেন; বালকের পা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। তিনি যে সংসদ সদস্য, ক্ষমতাবান ব্যক্তি, এটি সেই ক্ষমতার একটা প্রদর্শনী মাত্র। তিনি জামিনে মুক্তিলাভ করে এখন বহাল তবিয়তে আছেন। দুর্দান্ত প্রতাপে এলাকায় রাজত্ব করছেন। একটি শিশুকে গুলি করার জন্য সংসদ সদস্য পদও হারাতে হয়নি। দলীয় এ্যাকশনও নেয়নি শাসক দল আওয়ামী লীগ।
এই রকম ক্ষেত্রে বস্তুত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দলীয় সন্ত্রাস বা ব্যক্তি সন্ত্রাস একাকার হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সন্ত্রাস। ধর্মের নামে মানুষ খুন। ধর্মের নামে ধর্মবিরোধী কাজ। এরা সন্ত্রাসী গ্রুপ ; পেছন থেকে ছোবল মারে, কাপুরুষেরাই তো গোপনে হত্যা করে। মানুষ মারা যেন নেশা, তাও আবার পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে। তারা হত্যা করেছে অভিজিৎ রায়, আশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়, ফয়সাল আরেফীন দীপনকে। এর কোনোটিরই এখনো পর্যন্ত তদন্ত বা বিচার কিছুই হয়নি। এক বছরের বেশী অতিক্রান্ত হওয়ার পর অভিজিতের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অজয় রায় হতাশা ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের সরকার, গোয়েন্দা বাহিনী একটা নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে রয়েছে। ওদের খুনি ধরার ইচ্ছেও নেই, সক্ষমতাও নেই। প্রতিটি খুনের পর ওরা যেভাবে কথা বলছে, তাতে খুনিরা আশকারা পাচ্ছে।’ কথাটা মিথ্যা নয়। গত বছর আগস্ট মাসে ব্লগার হত্যা নিয়ে যখন সকলে উদ্বিগ্ন তখন হত্যাকারীকে ধরার ব্যাপারে পুলিশের সক্রিয়তা দেখা না গেলেও পুলিশ প্রধান ব্লগারদের নসিহত করেছিলেন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করতে। উপদেশ দেয়া রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মীর কাজ। পুলিশের কাজ অপরাধীকে ধরা। তাই অনেকেই পুলিশের আইজির বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘পুলিশ সঠিক সময় সঠিক বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সময় ব্লগার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের খুজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।’
দীপনের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও অধ্যাপক অজয় রায়ের মতো হতাশা ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, ‘বিচার প্রক্রিয়ায় আমার আস্থা নেই। শুধু অনাস্থা আছে।’
এমন পরিস্থিতিতে খুনিরা তো আরও উৎসাহিত হবে। বস্তুত এমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন খ্যাতনামা লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গত বছর নভেম্বর মাসে দীপন হত্যার পরপরই। হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, ‘টানা হত্যাকান্ড ঘটিয়ে যাওয়া একজনও কেন ধরা পড়ে না, তা কারো বোধগম্য নয়।’
শুধু বøগার-লেখক-প্রকাশকই নিহত হচ্ছেন না, ধর্মীয় মৌলবাদীদের চাপাতির আঘাতে অথবা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বিদেশী নাগরিক, খ্রিস্টান যাজক, মন্দিরের পূজারী, শিয়া মুসলমান, মহরমের তাজিয়া মিছিলে যোগদানকারী ধর্মপ্রাণ মুসলমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীতপ্রিয় শিক্ষক- কে না?
সরকার বলছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো। কিন্তু জনগণ তা বিশ্বাস করে না। বরং সাধারণ মানুষ এক ভয়াবহ পরিবেশে আতংকের মধ্যে রয়েছে। সরকার বলছে, এদেশে আইএস নেই। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যান্টনি ব্লিসকেন ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার উগ্রবাদী হামলাগুলোর জন্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করলেও আসলে বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠীর দায় স্বীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’
আইএস বা আল কায়েদা বা তালেবানের কোন শাখা আছে কি নেই, সেটা বড় কথা নয়। এটা পরিষ্কার যে, যারা ধারাবাহিক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে চলেছে, তারা আন্তর্জাতিক ইসলামিক জঙ্গী নেটওয়ার্কের সঙ্গে একই ভাবাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। সরকারের দায়িত্বহীন কথা ও আচরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জঙ্গীদের আরও উৎসাহিত করছে।
বহুমুখী সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ। আমরা কি দায়িত্ববান সরকারের কাছ থেকে জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করতে পারি না? এটা কি খুব বেশি দাবি হয়ে গেল?