Home » প্রচ্ছদ কথা (page 17)

প্রচ্ছদ কথা

কোনটা আগে : গণতন্ত্র না উন্নয়ন?

তাজ হাশমী :::
‘‘বাংলাদেশ কেন প্রতিষ্ঠাতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্রের উদগাতা লি, মাহাথির বা অন্যদের অনুসরণ করবে’’
অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ
অবিশ্বাস্য, তবে সত্য। কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রে উত্তরণের আগে প্রয়োজন ‘উন্নয়ন’! ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি : টাইম টু লুক টু দি ইস্ট’ শীর্ষক সা¤প্রতিক এক নিবন্ধে (ডেইলি স্টার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬) মোজাম্মেল খান যুক্তি দিয়েছেন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন একজন লি কুয়ান বা মাহাথির মোহাম্মদের। কানাডার শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট হওয়া সত্তে¡ও মোজাম্মেল খানের যুক্তি ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরশাসনের পক্ষে আইয়ুব খান ও সুহার্তো যেসব কথা বললেন, ঠিক সে রকমের।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মোজাম্মেল খানের মনগড়া ছবিটির ব্যাপারে আমার ভিন্নমতকে এখানে না টেনে আমি কেবল তার নিবন্ধের প্রধান বিষয়টার দিকে মনোনিবেশন করতে চাই, যাতে বলা হয়েছে : ‘… পাশ্চাত্যের উদার গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থার বদলে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রাচ্যের নীতি গ্রহণ করার এটাই সম্ভবত সঠিক সময়। এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর। এই উভয় দেশই গত ৫০ বছরে দৃষ্টান্তমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।’
আমার মনে হয় না, পৃথিবীতে কোনো দেশের উচিত নয়, তথাকথিত উন্নয়নের জন্য মানবাধিকার, মানব-মর্যাদা, গণতন্ত্র এবং সর্বোপরি স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দেওয়া। আমি উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন নিয়ে আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক, হামজা আলাভি এবং ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের (এছাড়া আরো অনেকে রয়েছেন) মতো মানুষেরা ১৯৭০-এর দশকে যে সমাধান দিয়ে ফেলেছেন, সে বিতর্কে যাচ্ছি না।
উপনিবেশবাদ এবং উপনিবেশ-পরবর্তী বৈশ্বিক পুঁজিবাদের আশ্রিত রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন মিথের সত্যিকারের যে স্বরূপ তারা উন্মোচন করেছেন, তা বিজ্ঞোজনোচিত। আমি মনে করি, যারা এখনো সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের উন্নয়নের তথাকথিত সাফল্যময় কাহিনীতে মুগ্ধ হয়ে আছেন, তাদের উচিত আবার গুন্ডার ফ্রাঙ্কের ‘ডেভেলপমেন্ট অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট’, ওয়ালেস্টেইনের ‘অ্যান্টি-সিস্টেমেটিক মুভমেন্টস, থিসিস এবং আলাভির ‘দি স্টেট ইন পোস্ট-কলোনিয়াল সোসাইটিস : পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’-এর দিকে মনোনিবেশন করা।
দশ বছর আমি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আধুনিক এশিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাস পড়িয়েছি। প্রায় দুর্নীতিহীন সরকার-ব্যবস্থা, চমৎকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি; চলনসই খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্যপরিচর্যা, শিক্ষা ও মেট্রোরেল; ‘সর্বোত্তম এয়ারলাইন’ এবং ‘সর্বোত্তম বিমানবন্দর’-সংবলিত পুরোপুরি পরিষ্কার, সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল নগর রাষ্ট্রটি কখনোই আমাকে এই ধারণা দিতে পারেনি যে, আমি উন্নত কোনো দেশে বাস করছি। সিঙ্গাপুর কিন্তু উন্নয়নের বিবেচনায় আরেকটি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার কোনো দেশ নয়।
নির্মম ‘ইন্টারন্যাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের’ মাধ্যমে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যেকোনো মানুষকে বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত কারাগারে রাখা যায়। দেশি-বিদেশী সস্তা শ্রমিক শোষণ, লুকানো-ছাপানোহীন দারিদ্র এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানব-মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে উপসাগরীয় এলাকার আরব স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর সমান্তরালে নিয়ে গেছে। এসব উন্নত নয়, বাংলাদেশের জন্য রোল মডেল হওয়ার মতো তো নয়ই।
মাহাথিরের শাসন ছিল লি কুয়ান ইয়েয়ুর মতোই স্বৈরতান্ত্রিক। জনৈক লেখক বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন : ‘… তার [মাহাথিরের] ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হওয়াটা ঘটেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মালয়েশিয়ার রাজার ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতা ও সুবিধার বিনিময়ে। তিনি বিতর্কিত ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ব্যবহার করেছেন অ্যাক্টিভিস্ট, অ-মূলধারার ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের, ১৯৯৮ সালে বরখাস্ত করা উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমসহ, আটক করার কাজে।’
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিয়ে লি কুয়ানের যে ধারণা ড. খান উদ্ধৃত করেছেন, তার চেয়ে অসার আর কিছু হতে পারে না। লি মনে করতেন, ‘গণতন্ত্র বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক।’ তিনি আরেক সুকর্ন বা আইয়ুব খানের ভাষায় কথা বলতেন :
কোনো রাজনৈতিক-ব্যবস্থার মূল্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো সেটা প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সমাজকে সহায়তা করতে পারে কি না। গণতন্ত্র হলো কাজটি সম্পন্ন করার একটি পন্থা, তবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনী-প্রক্রিয়া যদি আরো বেশি ফল দেয়, তবে আমি উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কোনো প্রক্রিয়া বাছাই করার মধ্যে ন্যায়-অন্যায় নেই।… গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো অপরিহার্য মূল্যবোধ নেই। আসল বিষয় হলো সুশাসন।
লি ও মাহাথির উভয়ে বিশ্বাস করতেন, শাসন পরিচালনাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ’ থেকে ‘এশিয়ার মূল্যবোধ’ ভিন্ন ও উন্নত। ‘গণতন্ত্রের আগে উন্নয়ন’ পরিভাষাটি আসলে স্বৈরাচারেরই নামান্তর, গৌরব ও ক্ষমতার জন্য স্বৈরাচারের অদম্য আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করার একটি গোপন হাতিয়ার।
তবে আমরা ‘উন্নয়ন’ বলতে কোনো দেশের কয়েকটি উঁচু ভবন ও ফ্লাইওভার; মসৃণ রাস্তার দৈর্ঘ্য; গণপরিবহন নেটওয়ার্ক; ঝলমলে গাড়ির সংখ্যা বুঝি না। সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন বলতে বোঝায় আমাদের মনন ও সংস্কৃতির বিকাশ। উন্নত দেশে জনগণ কোনো ধরনের ভয়-ভীতি ছাড়াই চিন্তা করতে পারে; অভিমত প্রকাশ করতে পারে; সরকার মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে; জাতি-বর্ণ-ধর্ম-জেন্ডার-নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। আর কেবল সত্যিকারের গণতন্ত্রই আইনের শাসন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকারকে সুরক্ষিত করে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার সিকি শতক পরও আজ এখনো যারা গণতন্ত্রকে বিশেষ কিছু হিসেবে মনে না করেন এবং বেসামরিক-সামরিক একনায়কদেরকে নির্বাচিত সরকারের মতোই বৈধ বিবেচনা করেন, তারা স্রেফ জানেন না, পরিবর্তনের হাওয়া (গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য) সবজায়গায় জোরালো হচ্ছে, এমনকি আরব দুনিয়াতেও। বাংলাদেশ এবং অন্য যেকোনো স্থানেই লি ও মাহাথিরের ‘সোনালি অতীতে’ ফিরে যাওয়ায় অনেক দেরি হয়ে গেছে। অতীতে বিদ্যমান মার্কসের প্রবাদসম ‘প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রকে’ আর কেউই টিকে রাখতে পারবে না, যদিও মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে।
অবশ্য ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্রের, স্নায়ুযুদ্ধকালে তাদের কেউ ছিল পাশ্চাত্যপন্থী এবং কেউ পাশ্চাত্যবিরোধী, প্রতি সাফাই গাওয়ার দিন দ্রæত শেষ হয়ে আসছে। ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও ইমেয়েনের মতো অনেক দেশে এ ধরনের সরকার ইতোমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরো কয়েকটি কোনোমতে টিকে থাকার কোশেশ করছে। মস্কো ও বেইজিং তাদের দুর্বৃত্ত ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন করে গেলেও ওয়াশিংটন দ্রæততার সাথে তাদের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
উদার গণতন্ত্র উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়, বরং গণতন্ত্রই উন্নয়ন। এটা হলো মানুষের অর্জন ও উন্নয়নের সারকথা, এটা ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো উদার গণতন্ত্র। শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাস-প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সন্ত্রাসবাদ উত্থানের পেছনে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মানব-মর্যাদা ইত্যাদি অস্বীকার করা। উত্তাল বাংলাদেশ পুরোপুরি উদার গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হওয়ার আগে ছলনাময়ী ‘উন্নয়নের’ জন্য অপেক্ষা করতে পারে না।
শেষ তবে সর্বশেষ কথা নয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের নেতা নির্বাচনে বাঙালিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করার ফলেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটেছিল। বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রধান কারণ গণতন্ত্র হওয়ায় অবাকই লাগতে পারে, দেশটি কেন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াইকারী এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে আপস করতে অস্বীকারকারী তার নিজের প্রতিষ্ঠাতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্রের উদগাতা লি, মাহাথির বা অন্যদের অনুসরণ করবে। মুজিব যদি তার জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে অসম্মানিত করতেন, তবে আমাদের ইতিহাস হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন তা গৌরবের কিংবা গর্বের বিষয় হতো না।
*লেখক Austin Peay State University –এর সিকিরিটি স্টাডিজের শিক্ষক। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে Global Jihad and America: The Hundred-Year War Beyond Iraq and Afghanistan (Sage, 2014)|

পরমতসহিষ্ণুতার বিদায়, চলছে অমানবিক অসহিষ্ণুতা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বহাল থাকার পরে জাতীয় সম্প্রচার আইন তৈরী হওয়া প্রমাণ করে যে, এই রাষ্ট্র থেকে পরমতসহিষ্ণুতা বিদায় নিতে চলেছে। জায়গা করে নিচ্ছে অমানবিক অসহিষ্ণুতা। ভিন্নমত দলনে রাষ্ট্র-সরকার সামষ্টিকভাবে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। এই অনুদার মনোভঙ্গী প্রতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিমানের অনুগত, দাসানুদাস ও আজ্ঞাবহ করে তুলেছে। এই পরম উৎসাহ গণতন্ত্রের বিকাশ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। মেইনষ্ট্রিম রাজনীতিতে বিভাজন ও হিংসা জন্ম দিচ্ছে উগ্রবাদ আর কট্টরপন্থা। সরাসরি খুনের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র- সরকার রাজনীতি এটিকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে। মধ্যপন্থী মূল রাজনৈতিক দলগুলি ক্রমশ কট্টর হয়ে উঠছে।

ধর্ম, রাষ্ট্র, ও মুক্ত চিন্তার নানান বিতর্কে উদার বিবেচনার বদলে জায়গা করে দেয়া হচ্ছে চরমপন্থাকে। ফলে ধর্মীয় কট্টরপন্থার পাশাপাশি  বড় সংকট হয়ে উঠছে এরা। আক্রান্ত করছে মুক্তচিন্তাকে এবং বলা হচ্ছে, এটা এক ধরনের নোংরামি। এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছে রাষ্ট্র-সমাজের অস্থিরতা। তাৎক্ষনিক উত্তেজনায় যে কোন কিছু মীমাংসার, যেন-তেন প্রকারে বিরোধী পক্ষকে হেনস্তা করার প্রবনতা ব্যক্তি সমাজকে বিপন্ন করে তুলেছে। ধীরস্থির ও উদারতার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহনের প্রক্রিয়া যেন লুপ্ত হতে চলেছে।

সংবিধানের সাথে স্পষ্টত; সাংঘর্ষিক ও মৌলিক অধিকার পরিপন্থী ৫৭ ধারায় বলা আছে কোন ব্যাক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রচার বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন, অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃংখলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ব্যাক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যাক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উষ্কানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ”। এই অপরাধে ব্যাক্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর এবং সর্বনিম্ন৭ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হইবেন।

ইতিহাসের নির্মম সত্য হচ্ছে, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারীর পর জেনারেল আইয়ুব খান মার্শাল ল রেগুলেশনের ২৪ নং ধারায় ঘোষনা করেছিলেন, কোন ব্যাক্তি মুখের কথায়, লেখনীর মাধ্যমে, কিংবা এমনকি আভাসে-ইঙ্গিতেও এমন কিছু বলিবে না- যাহাতে জনসাধারনের মধ্যে নৈরাশ্যের  জন্ম হইতে পারে কিংবা সেনাবাহিনী বা পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তাহাতে অসন্তোষ দেখা দিতে পারেএই ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হইবে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদন্ড”।

কি অদ্ভুত এবং অন্তর্গত মিল দু’টি আইনের সাথে। সামরিক আইনের আওতায় মৌলিক অধিকার হরনের জন্য একজন সামরিক একনায়ক যে আইন ঘোষনা করেছিল, অর্ধশতাধিক বছর পরে সেই আদলে একটি আইনের বিস্তৃতিকরন ঘটেছে। তফাত  এই যে, তখন দেশ ছিল পরাধীন ও সামরিক শাসনের কবলে, আর এখন স্বাধীন দেশে কথিত গনতান্ত্রিক সরকারগুলি সংবিধান পরিপন্থী এরকম একটি আইন প্রণয়ন করেছে, ২০০৬ সালে জারী হওয়া আইন আরো শক্তিশালী হয়েছে ২০১৩ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে।

সংবিধানের ৩৯নং: ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা পরিষ্কারভাবে লেখা রয়েছে;

১)চিন্তা বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চিয়তা দান করা হইল; ২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমুহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক, জনশৃংখলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা মানহানি বা অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গঁত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে; ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের; এবং খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল

এই দেশের রাজনীতিবিদরা কথায় কথায় সংবিধানের কথা বলেন। সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার কথা বলেন। কিন্তু সংবিধান জনগনের যে সকল মৌলিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে, কার্যক্ষেত্রে সেটি স্বীকার করেন না। ওই অধিকার রক্ষায় আইন করেন না, পরিপন্থী আইন করে জনগনের অধিকার হরণ করেন।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬ (এ) ধারাটিও প্রায় একই রকম ছিল। তবে সর্বোচ্চ শাস্তির মেয়াদ ছিল ৩ বছর। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ৬৬ (এ) ধারা বাতিল করে দিয়েছেন। শুনানীর সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের প্রশ্ন ছিল, “একজনের কাছে যা আপত্তিকর, আরেকজনের কাছে তা আপত্তিকর নাও হতে পারে কোনটি আপত্তিকর, কোনটি আপত্তিকর নয়, কোনটি আপত্তিকর তা কি করে নির্ধারন করবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা”?

উত্তরে সরকারপক্ষ দাবি করেছিল “এ ধারার অপব্যাবহার হবেনা”। এখানেই বিচারপতিরা যুগান্তকারী ও অনুসরনীয় মন্তব্যটি করেন, “সরকার আসবে, সরকার যাবে, কিন্তু ৬৬ (এ) ধারা থেকে যাবে”। ঐতিহাসিক একটি রায়ে নিবর্তনমূলক ও মৌলিক অধিকার পরিপন্থী এই ধারাটি বাতিলের ঘোষনা দেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। বাংলাদেশের সংবিধানের অভিভাবকবৃন্দ  এ বিষয়টি সদয় বিবেচনায় নিলে মৌলিক ও মনবাধিকার পরিপন্থী আইনের বিপক্ষে নাগরিকরা সুরক্ষিত থাকবেন।

২০০৬ সালে যখন বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তি আইনটি করা হয় তখন সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ১০ বছর, ২০১৩ সালের সংশোধনীতে এটি বাড়িয়ে ১৪ বছর করা হয়। এই সংক্রান্ত অপরাধের পুরো বিষয়টি বিবেচনা করবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অর্থাৎ পুলিশ। সুতরাং একজনের কাছে যা শ্লীল তা পুলিশের তাছে অশ্লীল বা অনেকের কাছে অশ্লীল তা পুশিশের কাছে শ্লীল মনে হতে পারে এবং এটি নির্ধারণও করবে পুলিশ। তারা বিবেচনা করবে কার মানহানি হয়েছে বা হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বা হতে পারে- তাও বিবেচনা করবে পুলিশ! কারও অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বা লাগতে পারে তার সিদ্ধান্ত নেবে পুলিশ! কেউ এসব বিষয়ে যে কোন একটি অভিযোগ করলে তা আমলে নিয়ে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেটি অজামিনযোগ্য। যে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের অসততা ও পার্টিজান ভূমিকা প্রশ্নাতীতভাবে স্বীকৃত, মৌলিক ও মানবাধিকার দলনের এমন ভয়ঙ্কর আইন তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন দেশের আইন প্রনেতারা!

তাদের তরফে একটি যুক্তি প্রায়শ:ই শুনতে পাওয়া যায়, দেশে যদি লেখার, বলার স্বাধীনতা না থাকে, তবে আপনারা এসব বলছেন কি করে; লিখছেন কি করে ? সরকার ও তার সুবিধাভোগীদের এটি একটি জোরালো যুক্তি। আমরাও মাঝে মাঝে ভাবি হ্যা, তাইতো এখনো অনেক কথা লিখছি, বলছি, কিস্তু সকলের জানা আছে, এরকম একটি দানবীর আইন চোখের সামনে রেখে স্বাধীনভাবে লেখা যায়না, কথা বলা যায়না। সরকার মহলে যে কোন সময় ব্যবস্থা নিতে পারে। পুলিশ তো এই আইনের সুযোগ নিতেই পারে।

একটি বহুল প্রচলিত গল্প বলে লেখাটি শেষ করতে চাই। সম্রাট আকবর ঘনিষ্ট সভাষদ বীরবলকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সাম্রাজ্যে ভিন্নধর্মাবলম্বীরা কেমন আছে? বীরবল খানিক চুপ থেকে জানালেন, জিল্লে জালালুহু তিনমাস সময় দিন, আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব। সম্রাট বল্লেন, তথাস্ত। বীরবল একটি মাঠে পাশাপাশি দু’টি খাঁচা রাখলেন। একটিতে বাঘ, অপরটিতে একটি নাদুস-নুদুস ছাগল, যাদের হররোজ ভাল খাবার ও যত্ন আত্তি করা হচ্ছিল। অরেকটি কৃশকায় ছাগলকে রাখা হল মুক্ত, যেটি মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছিল। তিন মাস পরে দেখা গেল বাঘের খাঁচার পাশের ছাগলটি কৃশ থেকে আরো কৃশকায় হয়েছে এবং মাঠে চড়ে বেড়ানোটি নাদুস-নুদুস ও তেল চকচকে হয়ে উঠছে। সম্রাটকে মাঠে নিয়ে আসা হল এবং বীরবল বল্লেন, জিল্লে জালালুহু খাঁচার ছাগলটিকে দেখুন, চমৎকার খাবার-যত্ন পেয়েও দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে-আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকছে। কারন ওর পাশে যে বাঘের খাঁচা।  আপনার সাম্রাজ্যে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের অবস্থা অনেকটা ওরকমই, বাঘের খাঁচার পাশের ছাগল!।

গল্পটির ঐতিহাসিক সত্যতা জানা নেই। প্রচলিত গল্প হয়তো। কিন্ত এই গল্প জানান দিচ্ছে, বাঘের খাঁচার পাশে ছাগলের স্বাধীনতা কেমন! আর এ থেকেই বোঝা যায়, কঠিন আইন-কানুন বজায় রেখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলাটা কতটা অর্থহীন।

 

 

 

বাংলাদেশ কী রাষ্টীয় অর্থ পাচার ও চুরির স্বর্গ

এম. জাকির হোসেন খান ::

‘টাকা বেড়েছে, তাই পাচার বেড়েছে। নতুন করে বাড়েনি। এটাও দেশের উন্নয়নের একটি চিত্র”। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে অর্থ পাচারের সম্পর্ক বিষয়ক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ নতুন তত্ত্ব কতখানি বাস্তবতা বা অর্থনীতির তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ ২০১১ সালের পর ১০ জুন অর্থমন্ত্রী বাড়তি টাকার উৎস যে অবৈধ তা উল্লেখ করতে গিয়ে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমান জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর আগে স্লাইডার, বুয়েন এবং ক্লডিও ২০০৭ সালে বাংলাদেশের কালো অর্থনীতির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ এবং হাসান ২০১০ সালে  ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ৩৮.১% থেকে ৩৯.২% বলে উল্লেখ করেন। আর কালো টাকার উপস্থিতি সরাসরি স্বীকার না করলেও  ভোটারবিহীন সংসদের নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটের ওপর বক্তব্যে বলেছিলেন, “দেশে কালো টাকা বলে কোনো টাকা নেই। যে টাকাকে কালো টাকা বলা হচ্ছে তা বিদেশে পাচার করে সাদা করা হয়”। আর  রাজস্ব সংস্কার কমিশন রিপোর্ট ২০০৩-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘কালো অর্থ পাচারের গন্তব্যস্থল বা নিরাপদ স্বর্গ হলো বিদেশী ব্যাংকগুলো যার মাধ্যমে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হয়” (পৃ.১৮৫)।

বিশ্বব্যাপী সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাঁচার সম্পর্কিত গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ২০০৩-২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাচার হয়, যা থেকে সরকার কমপক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন তারিখে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। ২০০৮ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কমলেও আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের আমানত বাড়ছে। ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ২০১২ সাল থেকে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়।

আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ পাচারকৃত অর্থের পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ হতে পারে; কারণ বেনামে বা অন্য কোন দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নামে গচ্ছিত অর্থ বা মূল্যবান গহনা ও দূর্লভ সামগ্রীর মূল্য অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাক্কলনের পরিমাণ খুবই কম। আর এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আর্থিক খাতে জালিয়াতির সাথে জড়িত তার প্রমাণ হলো শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানি জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও শুধু সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছে না বলে মনে করেন ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেন, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”। উল্লেখ্য, দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ ক্ষমতাবানরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা।

আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সংযোজন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকার ওপর রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে যা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ভয়াবহ পরিস্থিতিকেই নির্দেশ করে। পৃথিবীর কোনো দেশে রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির এরকম ভয়াবহতম ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী রেকর্ড নেই, সেক্ষেত্রেও রেকর্ড সৃষ্টি করল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পরও অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচার হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পেলো, তার মাধ্যমে জানা গেলো- কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্ত বৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাচার করছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ২০জন বাংলাদেশি বড় ব্যবসায়ী নিজ নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ‘‘কর স্বর্গ’’ বলে পরিচিত- যেমন জার্সি দ্বীপ এবং বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপসমূহে -অর্থ পাচার করার খবর নিউ এজ পত্রিকায় ২০১৩ সালেই প্রকাশ করা হয়। শুধু তাই নয়, আমেরিকা, দুবাই, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, মালয়েশিয়া এবং ভারতে নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ‘সেকেন্ড হোম’ বা ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে  প্রকৃত কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। উল্লেখ্য, ২০১৩ এর  শেষ দিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য সেকেন্ড হোম প্রকল্পে আবেদন করেছিলেন ৬৪৮ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি, যাদের অধিকাংশই সুবিধাভোগী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও আমলা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক অন্তত ৫০টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব টাকা লেনদেন হয়। আর সুইস ব্যাংক হলো এসবের প্রধান সিন্ডিকেট। যে টাকার কথা বলা হচ্ছে তা নগদ টাকা। এছাড়া বাড়ি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসার মাধ্যমে আরো অন্তত তিন লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার বেশি অর্থ পাঠানো যায় না। চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা, যেগুলো কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলো? বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের পর অন্য  কোনো কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় চাপা পড়ে যায়, আর ধরা পড়লেও প্রভাব খাটিয়ে অর্থ বাজেয়াপ্তের মতো ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে, কর কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে বাংলাদেশ থেকে সহজে মূলধন পাচার হয়ে যাচ্ছে আরো কম করহার ও কম আইনি জটিলতার দেশে। ২০০০ সালে প্রণীত বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশ যদি অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে এমন দেশের (যেমন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি) পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে নিয়ে আসতে পারতো, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অতিরিক্ত আরো ২.১৪% বৃদ্ধি পেয়ে  ৬% থেকে ৮.১৪% হতো”। অর্থাৎ মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১০-১১ অর্থ বছরে অর্থাৎ ৫ বছর আগেই ১০৪০ ডলারে পৌছতো। উল্লেখ্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ০-১০০ পয়েন্ট স্কেলে ২৫ পয়েন্ট পেয়ে ২০১৩ সালের তুলনায় তালিকার উচ্চক্রম অনুযাযী বাংলাদেশের ৯ ধাপ অবনতি হওয়ায় এটা সুনির্দিষ্টভাবে সমাজে অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং তা পাঁচারের ঘটনাতেই নির্দেশ করে।

‘দুর্নীতি সেখানেই বিস্তার লাভ করে যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বচ্ছতা এবং প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনীতি অনুপস্থিত থাকে; স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং কার্যকর আইন-শৃংখলা বাহিনী রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রধান নিয়ামক (কওফম্যান, ২০১০)।

‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)’ এর আওতায় ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’ এগমন্ট গ্রুপের আওতায় বিভিন্ন দেশকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। উল্লেখ্য, ভারত সরকার কালো টাকা তদন্তে বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করে এবং পানামা পেপার্সে ভারতীয়দের নাম আসায় তদন্ত করার জন্য একটি টিম করেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনা প্রথমে শুধু চেপেই রাখা হয়নি তার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংকের ওপর চাপানোর চেষ্টা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনের সিনেটে উন্মুক্ত শুনানির ব্যাবস্থার মাধ্যমে এসব পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে দিতে তৎপর থাকলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংসদ বা সংসদ সদস্যরা  নির্বিকার। এমনকি এ চুরির ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি বাস্তবে কতখানি সফল হবে এবং দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাতে পারবে তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। শেয়ার বাজার কেলেংকারি নিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিত খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলেও কোনো বিচার হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার চাইলে তথ্য বিনিময় এবং পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতি নির্ধারণে সুইস সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে পারে।

একথা মনে রাখা প্রয়োজন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে উপনীত হয় যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সাক্ষর করায় বাংলাদেশ সকল প্রকার দুর্নীর্তির মাধ্যমে অর্জিত কালো অর্থের উৎস বন্ধ এবং সুইস ব্যাংক সহ ‘‘কর-স্বর্গ” বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত সকল অবৈধ অর্থ উদ্ধারে সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইন মন্ত্রণালয়/এটর্নি জেনারেলের অফিসের সমন্বয়ে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

 

কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্ষমতাবানদের দাপট ও দুর্বলের অসহায়ত্ব

হায়দার আকবর খান রনো ::

১৯৯০ পরবর্তীকালে আজকের সরকারের মতো এতো শক্তিশালী সরকার আর আসেনি। আবার একই সঙ্গে এতো গণবিচ্ছিন্ন সরকারও এই সময়কালে কখনো ছিল না। গণবিচ্ছিন্ন তবু শক্তিশালী ? হ্যা, তাই। শক্তিশালী কারণ বিরোধী পক্ষও দুর্বল। প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি আজ একেবারে পর্যুদস্ত। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা-হামলার কারণে দাড়াতেই পারছে না দলটি। হয়তো জনসমর্থন আছে, কিন্তু সেই সমর্থনটা হচ্ছে নেগেটিভ। সরকার বিরোধী ভোটাররা জমায়েত হতে চায় বিএনপির পেছনে। কিন্তু সেই জনসমর্থনকে ইতিবাচক আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করার যোগ্যতা নেই বিএনপির। কারণ বিএনপি কোন আদর্শবাদী দল নয়। এই দলও ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা গণবিরোধী ভূমিকাই পালন করে এসেছে। তাছাড়া এখনো মুখে গণতন্ত্রের শ্লোগান তুললেও, জনগণের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে তারা একটি কর্মসূচি পালন করেনি। শ্রমিকের মজুরি, মধ্যবিত্তের শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য দাবি অথবা দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোন কর্মসূচি তাদের কর্মকৌশল, চিন্তা, ধারণা বা উপলব্ধির মধ্যেও নেই।

অন্যান্য উদারপন্থী বুর্জোয়া দল বলেও তেমন কিছু নেই। বামশক্তিও দুর্বল। এই অবস্থাটা সুযোগ করে দিয়েছে সরকারকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণবিচ্ছিন্নতা শাসক দলকে বাধ্য করেছে নির্ভর করতে পুলিশ প্রশাসনের উপর এবং দলীয় মাস্তানদের উপর। পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসন তাই এক ধরনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করছে। পাশাপাশি দলীয় মাস্তান এবং শাসক দলের নিচের পর্যায়ের নেতারাও অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে- লুটপাটের স্বাধীনতা, দুর্নীতির স্বাধীনতা, ক্ষমতার দাপট দেখানোর স্বাধীনতা। শাসক দলের উপরতলার নেতৃত্বকে যেন অসহায় বোধ করেন। দলের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে অরাজকতার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, শাসক দল ও প্রশাসনের ভয়ংকর ক্ষমতার দাপট এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চোখের সামনে দুর্নীতি ও লুটপাট হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায় না কেউ। কারণ বিচার বহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, নিখোজ হওয়া, গুম, খুন ইত্যাদির সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। অবস্থা এতোটাই খারাপ যে গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। খুব সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক আলোচনায় তনু হত্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রশাসন চায় না, বিচার বিভাগ ঠিক মতো চলুক’। (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৬)।

তবে তনু হত্যার ক্ষেত্রে দেখলাম মানুষ ভয়ভীতি কাটিয়ে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে। তনু হত্যার বিষয়টি খুবই রহস্যজনক। আরও রহস্যজনক পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাওয়া গেল সোহাগী জাহান তনুর লাশ। কিভাবে এমন জায়গায় লাশ এলো। তাকে কি সেখানেই হত্যা করা হয়েছিল, যেখানে বাইরের লোকের যাতায়াত খুব সহজ ব্যাপার নয়। প্রথম প্রদর্শনে পুলিশ সুপার অনুমান করেছিলেন যে, তাকে ধষর্ণের পর হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ময়না তদন্তে, যার রিপোর্ট বের হয়েছিল দুই সপ্তাহ পর, সেখানে কিছুই বের হলো না। এমনকি হত্যা না আত্মহত্যা তাও নির্দিষ্ট করে বলা যায়নি। প্রবল প্রতিবাদের মুখে দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত হল। তার রিপোর্টও এখনো বের হয়নি। প্রথম দিকে তনুর মা ও নিকট আত্মীয় ছাড়া আর কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। প্রথমে নেয়া হয় মাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু কখন? মধ্যরাতে ঘর থেকে মাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশের এই আচরণ রহস্যজনক। মিডিয়ায় বলা শুরু হলো, কাউকে রক্ষা করার জন্য নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘জজ মিয়ার নাটক সাজানো হলে তা মানা যাবে না’। এই মর্মে তিনি একটি চিঠিও দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

ড. মিজানুর রহমান প্রায়ই বেশ সাহসের সঙ্গে সত্য কথা বলে থাকেন। গত বছর আগস্ট মাসে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। কথাটা পুরোপুরি সত্য। তার মানে যারা ক্ষমতাবান, তারা বড় বড় অপরাধ করলেও পার পেয়ে যান। আর যারা দুর্বল তারা অত্যাচারের শিকার হন। তনুর বাবা নি¤œবিত্ত কর্মচারী মাত্র। তাই তার জন্য বিচারের দরজা বন্ধ। হত্যাকারী অথবা ধর্ষণকারী যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে আইন তাকে স্পর্শ করবে না। এই যে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, তা সমগ্র সমাজকে কলুষিত করেছে, গণতন্ত্রকে করেছে নির্বাসিত, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যা হচ্ছে সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

দুই একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গাইবান্ধার সংসদ সদস্য হাসতে হাসতে একটি বারো বছরের ছেলের পায়ে গুলি করে ছেলেটিকে পঙ্গু করেছিল। তারপরও তিনি জামিন পেয়ে বহাল তবিয়তে এবং দাপটের সঙ্গে সংসদ সদস্যও রয়ে গেছেন। দলও কোনো এ্যাকশন নেয়নি।

এক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যিনি ২০১৫ সালে অফিসে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক সম্বন্ধে বলেছিলেন যে, বাড়ি মেরামতের জন্য বাল আনা হয়েছে এবং এই ভাবে রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার করেছিলেন, সেই মন্ত্রী মায়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলা সত্তে¡ও তিনি মন্ত্রীত্বের গদিতে আরামেই বসে আছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ দুই মন্ত্রীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দন্ডাদেশ দিয়েছেন। দন্ডপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা কিন্তু এখনো মন্ত্রী আছেন। সংবিধানে শাস্তি প্রাপ্ত মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও নৈতিকতার কারণে তাদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। হায়! নৈতিকতা বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। এখানে চলছে দুর্নীতির রাজত্ব, ক্ষমতার দাপট ও ক্ষমতাহীনের অসহায়ত্ব।

দুর্নীতির এক এক করে রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। বড় বড় আর্থিক কেলেংকারির খবর আসে একটার পর একটা। রিজার্ভ চুরি, শেয়ারবাজার কেলেংকারি, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি- কোনোটারই বিচার হয়নি। শাস্তি পায়নি কেউ। একটা হিসেব বলে গত সাত বছরে আত্মসাৎ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের জন্য এটা কম টাকা নিশ্চয়ই নয়।

একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও অথনৈতিক নৈরাজ্য, অন্যদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কিন্তু কোথায় সেই প্রতিরোধ শক্তি?

শেষ ভরসা জনগণ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম। তনু হত্যার বিচার পায়নি তার গরিব বাবা-মা। কিন্তু ক্ষুব্ধ স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সারাদেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে, তারা কোনো দলের নয়। তারা সাধারণ ছাত্র, সাধারণ বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত জনগণেরই প্রতিনিধি। শেষ ভরসা এই নতুন প্রজন্মের উপরই রইল।

মাথাপিছু আয় আর জিডিপি বৃদ্ধির সরকারি প্যাচগোচ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সরকারি হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হবে এক হাজার ৪৬৬ ডলার-যা বিগত বছরের তুলনায় ১৫০ ডলার বেশি। তা ছাড়া এই অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশেরও বেশি হবে বলেও বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলনে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বলা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রাক্কলনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই অর্থ বছরে প্রথমবারের মতো জিডিপি সাত শতাংশ হয়েছে । প্রশ্ন হলো, জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বাড়লেই কি দেশের সব মানুষ ভালোভাবে খেতে, পড়তে পারছে। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তাসহ আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত জীবন-যাপন ও মানসম্পন্ন বাসস্থানের সুযোগ কি পাচ্ছে? মোটেই না। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের বৈষম্যের দিকে তাকালেই দেখা যাবে যে, একদিকে বহু মানুষ দিনে ১৫০ থেকে টাকা আয় করে অথবা কখনো সারাদিন উপোস করে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, কোন মানুষের দিনে এক লাখ টাকা আয় করে সংসার চালাচ্ছে। এভাবে কোন দেশের মাথাপিছু আয়ের প্রকট বৈষম্য রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে না, পেছনে পড়ে রয়েছে। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, এ ধরনের বৈষম্য রেখে দেশের মাথাপিছু আয়ের হিসাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হলেও সাধারন মানুষের কোনো লাভ নেই। একজনের আয় যদি হয় ১০০ টাকা এবং আরেকজনের হয় ২ টাকা, তাহলে গড় করলে দেখা যাবে দুই জনের গড় আয় ৫১ টাকা। তাহলে দুজনের প্রকৃত আয় কি সমান হলো? এ প্ররিপ্রেক্ষিতে যদি ধরে নেয়া হয়, যার বার্ষিক আয় ৪ থেকে ৫ লাখ ডলার এবং একজন দিনমজুরের আয় যদি হয় চার-পাঁচশ ডলার। তবে বলতে হবে দিনমজুরের আয়ের সাথে কোটিপতির আয় যুক্ত হয়ে হয়েছে ১৪৬৬ ডলার। আবার কোটিপতির আয় বছরে যে হারে বৃদ্ধি পায়, দিনমজুরের বৃদ্ধি তার থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে থাকে। কাজেই মাথাপিছু গড় আয়ের হিসাবে প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে না। এর মধ্যে বেকার তরুণ শ্রেণীও রয়েছে। তাহলে কি বেকারের আয়ও ১৪৬৬ ডলার? সরকারের তরফ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, গড় আয় বৃদ্ধির যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, তা সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত সরকার দিতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী বছর হয়তো এই আয় আরও বাড়বে। প্রশ্ন আসতে পারে, সরকার যেভাবে আয় ও জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব দিচ্ছে এবং অর্থনীতির যে গতি দেখাচ্ছে, আসলে কি এ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?

মাথাপিছু আয় পুরো সত্যটি তুলে ধরে না। কারণ এটি একটি গড় হিসাব। হাতি এবং পিঁপড়ার ওজনের গড় হিসাব করলে যে  গড়ের হিসাব পাওয়া ছাড়া আর কি? বাংলাদেশে দারিদ্র্য  হ্রাস পেলেও ধনবৈষম্য, আয়বৈষম্য প্রকট। সরকারি গিনি কোফিশিয়েন্টের হিসাবে সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ ধনাঢ্যদের ধনসম্পদ ও আয়ের পরিমাণ লুক্কায়িত থেকে যায়। জিডিপি শুধুমাত্র ‘খারাপগুলো’ যেমন- স্বাস্থ্যগত সমস্যা, দুর্ঘটনা, পরিবারের ভাঙ্গন, অপরাধ এবং দূষণ এগুলোর দায় অন্তর্ভুক্ত করে তাই নয়,  বরং এটা ‘ভালোগুলোকেও’ বাদ দেয়, যেমন- বাচ্চা মানুষ করার মত বিনা-বেতনের কাজ, সংসার চালানো, বন্ধু এবং প্রতিবেশীকে সাহায্য করা, দাতব্যসেবা ও স্থানীয় সামাজিক রাজনীতির মত কর্মকান্ড।

এসবই বাজারের বাইরে ঘটা কর্মকান্ড। কিন্তু এগুলোই আমাদের অর্থনীতির মূল মূল অংশ। আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের যেসব দিকগুলোর মূল্য পরিমাপ সবচেয়ে বেশি, যথারীতি এড়িয়ে গিয়ে জিডিপি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সামাজিক এবং পরিবেশগত মুল্যকে হিসাবের মধ্যে ধরে না। উদাহরণ হিসেবে, যা সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ফলে প্রভাব রাখে সেই জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলা যায়; অর্থনীতিবিদ নিকোলাস স্টার্নস এটাকে আখ্যা দিয়েছেন, ‘বাজার ব্যবস্থায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং সীমাহীন ব্যর্থতা।’ বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল সুফলভোগী ধনীরা। ধনীরা দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়াচ্ছে, ফলে আয় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। আর দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠি কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে। চলতি (২০১৪-১৫) অর্থবছরে দেশের উচ্চবিত্তদের একটি হিসাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানেও দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের বেশির ভাগের মালিক মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ। তাদের বার্ষিক আয় ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার উপর। এসব ব্যক্তির সম্পদ আছে কোটি টাকার বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকারও বেশী অর্থ-বিত্তের মালিক। হিসাবটি করা হয়েছে আয়কর জমার বিবরণী থেকে। ধারণা করা যায় -এতে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কেউ সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। সবাই রেখে ঢেকে তারপর সম্পদ বিবরণী জমা দেয়। অনেকে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা থেকে সম্পদ কম করে দেখায়। তারপরও দেশের অধিকাংশ সম্পদ ধনী শ্রেণীর হাতেই। প্রকৃত অর্থে সম্পদের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল সুবিধাভোগী। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে সব সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করছে ধনী শ্রেণী। কারণ সরকারের সুবিধা ভোগ করার মতো সব ধরনের ক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এটাই তাদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে একটি শ্রেণী দ্রুত অর্থ তৈরি করেছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। দারিদ্রের সম্পদ লুটে ধনী হয়েছে অনেকে। ফলে সমাজে ব্যাপক আয়-বৈষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু এ সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ অতি ধনীরা তথ্য দেয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে উচ্চবিত্তরা ও ধনীরা বেশি লাভবান হচ্ছে।

টমাস পিকেটি’র ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইটিতে বলেছেন, রাষ্ট্র যদি অত্যন্ত কঠোরভাবে আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টনকারীর ভূমিকা পালন না করে, তাহলে উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তে বাড়তে দ্রুত বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যাবে। সাইমন কুজনেৎস যে একপর্যায়ে উন্নত দেশগুলোতে বৈষম্য আর বাড়বে না বলে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেই ‘ট্রিকল ডাউন তত্ত্বকে’ পুরোপুরি বাতিল করেছেন পিকেটি। পিকেটি মনে করেন, প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থা, সম্পত্তি কর ব্যবস্থা ও বিশ্বব্যাপী পুঁজির ওপর ‘গ্লোবাল ট্যাক্স বসানোর মাধ্যমে এই আসন্ন মহাবিপদ ঠেকানোর প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের সরকার কি সেদিকে নজর দেবেন?

ওলামা লীগের ফতোয়া আর পহেলা বৈশাখে সরকারী নিষেধাজ্ঞা

আমীর খসরু ::

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই এবং বর্তমানে আরও তীব্রভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে যে, তারাই দেশের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক শক্তি ও ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারক-বাহক। এই প্রচার-প্রচারণার ভিত্তি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আর তারা এ কথাও বলছে যে, তারাই রক্ষা করে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকত্ব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাকি বিপন্ন হবে; সাথে সাথে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হবে ও ধর্ম নিরপেক্ষতা হবে বাধাগ্রস্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন পক্ষ ১৯৭২-এ মূল সংবিধানে ফিরে যাবার কথা বলে এমন কিছু বিষয় বহাল রেখেছে-যা আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতারা ধর্ম নিরপেক্ষতাকে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হিসেবেই স্থান দেননি, তাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে এ বিষয়টি ছিল অতিমাত্রায় সক্রিয়। ১৯৭২-এর সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য ক, সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, খ, রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, গ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, ঘ, কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে

কিন্তু এতোকাল পরে এসে আওয়ামী লীগ সংবিধান প্রণীত সেই মৌল চেতনার পরিপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এটা শুধুমাত্র যে রাজনৈতিক অবস্থান বা পথ পরিবর্তন তাই নয়, সামগ্রিকভাবেই তাদের মধ্যে এই বিষয়গুলো ক্রিয়াশীল রয়েছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনী লাভালাভের জন্যে ২০০৬-এ খেলাফত মজলিসের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল-যাতে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এ কথাটি মনে রাখতে হবে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক অতীতে বার বার সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের সাথে ক্ষমতাসীন মহলের যুক্ত থাকা এবং মদদদানের অভিযোগ করা হয়। তারা কয়েকজন মন্ত্রীসহ প্রভাবশালীদের নামও প্রকাশ্যে এবং সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছিলেন ও তালিকাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে যে কোনো কাজ হয়নি- তা দাবি করছেন ওই সংগঠনের নেতারাই।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে দীর্ঘকাল ধরে। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন এই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগ আবার ফতোয়া দিয়েছে এই বলে যে, পহেলা বৈশাখ পালন হারাম। তারা ওই ফতোয়া দেয়ার জন্য মানববন্ধনও করেছে। মানববন্ধনে শুধু পহেলা বৈশাখ পালনকে হারামই বলা হয়নি, বেশ কয়েকটি দাবি-দাওয়াও তাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। এমন দাবি-দাওয়া যে নতুন তা নয়। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর নেতা, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, তারা ওলামা লীগের বক্তব্যের সাথে একমত নন এবং ওই বক্তব্য তারা গ্রহণ করেন না। কিন্তু এই ব্যাখ্যাই যথেষ্ট বলে মনে হয় না। কারণ এর আগেও ওলামা লীগ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ব্যাপারেও কয়েক দফায় নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। ওলামা লীগ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে একজন হিন্দুকে প্রধান বিচারপতি রাখা যায় না। তখনো সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি দল থেকেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে-তারও কোনো নজীর খুজে পাওয়া যায় না।

এখানেই শেষ নয়, ২০১৫ সালের আগস্টে ওলামা লীগ সমাবেশ করে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছিল। এসব দাবি-দাওয়াগুলোর কয়েকটি ছিল এ রকম : নাস্তিক ব্লগার কর্তৃক বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইট, স্যোসাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ নাস্তিক্যবাদী লেখা বন্ধে ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন প্রণয়ন করা, ঈদের দিন হিন্দুদের রথযাত্রা করে মুসলমানদের ঈদের দিন ম্লান করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে, বিদেশী স্বার্থ রক্ষাকারী দেশদ্রোহী সিএইচটি কমিশনসহ বিদেশী দালালদের নিষিদ্ধ করতে হবে, ইসলাম বিরোধী রচনা পাঠ্যক্রম থেকে বাদ বিতর্কিত শিক্ষানীতি বাতিল করতে হবে, বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে কট্টর ইসলাম বিরোধী হিন্দু নাস্তিক লেখকদের লেখাকে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রদান করা হয়েছেউদাহরণস্বরূপ ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্প, কবিতা প্রবন্ধসমূহের মধ্যে মুসলমান লেখকদের তুলনায় বিধর্মী হিন্দু লেখকদের লেখাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছেযেমন ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত গল্প কবিতার সংখ্যা ১৯৩টিএর মধ্যে হিন্দু নাস্তিকদের লেখার সংখ্যা হলো ১৩৭টিযা সর্বনিম্ন শতকরা ৫৭ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ প্রাধান্য পেয়েছেএটা বন্ধ করতে হবে, মেয়েদের বিয়ের  কোনো বয়স নির্ধারণ করা যাবে না, সুন্নতি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কুফরী আইন বাতিল করতে হবে, প্রশাসনে হিন্দুতোষণ বন্ধ করা ইত্যাদিপাঠ্যক্রম সম্পর্কে ওলামা লীগের ওই সমাবেশে বলা হয়, ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি যাদের কোন আস্থা বা বিশ্বাস নেই বরং ইসলাম ধর্ম বিদ্বেষী এমন সব বামপন্থী ব্যক্তি; জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটির চেয়ারম্যান কবীর চৌধুরী, কো-চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, সদস্য ড. জাফর ইকবাল, অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সূত্র ধরদের দিয়ে বর্তমান শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করা হয়েছেঅথচ এসব কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী ব্যক্তিদের প্রণীত শিক্ষানীতি মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়তারা মূলত এদেশের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মন-মগজ থেকে দ্বীন ইসলাম উঠিয়ে দিয়ে নাস্তিক্যবাদী মন-মনন গড়তে শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করেছেএদেশকে নাস্তিক্যবাদী দেশ বানাতে এই ইসলাম বিরোধী শিক্ষানীতি তৈরী করা হয়েছে’প্রশাসন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘চাকরীর ক্ষেত্রে ৯৮ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের নিয়োগ আনুপাতিকহারে করতে হবেহিন্দুদেরকে মুসলমানদের চেয়ে বেশি নিয়োগ দিয়ে বৈষম্য করা যাবে নাপ্রশাসনকে হিন্দুকরণ চলবে নাকারণ ২০১৩ সালের অক্টোবরে পুলিশের এসআই পদে নিয়োগে ১৫২০ জনের মধ্যে হিন্দু নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩৩৪ জন যা মোটের ২১.৯৭ শতাংশ২০১১ সালে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইতে নিয়োগের ৯৩ জনের মধ্যে হিন্দু নিয়োগ করা হয়েছে ২৩ জনযা মোটের ২৪.৭৩ শতাংশসম্প্রতি ৬ষ্ঠ ব্যাচে সহকারি জজ পদে নিয়োগ দেয়া ১২৪ জনকেএর মধ্যে ২২ জনই হিন্দুশতকরা হিসেবে ১৭ শতাংশএসব বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মুসলমান দেশে মুসলমানদের প্রতি ব্যাপক বৈষম্যের দাবিই দৃঢ় হচ্ছে

সে সময়ও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে কারো জানা নেই। এমনকি ওলামা লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে নেয়া হয়েছে এমনটাও শোনা যায়নি। আওয়ামী লীগেরই কেন্দ্রীয় অফিসেই ওলামা লীগের অফিস। তাহলে এবারে ওলামা লীগের বক্তব্যের সাথে আওয়ামী লীগ একমত নয় বলে হানিফ যে বক্তব্যে দিয়েছেন তা কতোটুকু কার্যকরি হবে? এ কথা পরিষ্কার যে, ওলামা লীগ যে ভাষায় কথা বলছে তা অন্যান্য অনেক সাম্প্রদায়িক দলের বক্তব্যকেও হার মানায়।

ওলামা লীগের বিষয়টি যে শুধু ওলামা লীগের নিজস্ব সংকট তা মনে করার কোনো কারণ নেই। নেই এই কারণে যে, যদি থাকতো তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হতো।

ওলামা লীগ পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছে। অন্যদিকে, এবারের পহেলা বৈশাখে বিকাল ৫টার মধ্যে বাইরের সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবেসহ যেসব নির্দেশাবলীর মাধ্যমে পুলিশ যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাতেও কিছু প্রশ্ন ইতোমধ্যে উত্থাপিত হয়েছে। পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞা কি শুধুমাত্র নগন্য সংখ্যক যৌন সন্ত্রাসীর কারণে অথবা জঙ্গীবাদী-উগ্রবাদী কর্মকান্ডের আশংকায়? প্রথম বিষয়টি আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, গত বছরের পহেলা বৈশাখে যে হাতেগোনা কয়েকজন যৌন সন্ত্রাসীর তান্ডব প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী, এই এক বছরে তাদের ক্ষেত্রে কি আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? কেন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি? তাহলে কি নগন্য সংখ্যক যৌন সন্ত্রাসীর কাছে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা অসহায় অথবা অন্য কিছু? সামান্য কয়েকজন যৌন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারার দায় সরকার ও তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি অর্থাৎ জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদীদের আশংকায়ই যদি এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তাহলেও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সরকারের পক্ষ থেকে উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ মোকাবেলা করা গেছে এবং তারা সব সময় তৎপর রয়েছে-এ সব কি শুধুই কথার কথা? এই নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সমাজে ভীতির সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করবে। আর ওলামা লীগের বক্তব্যও জনমনে শংকার সৃষ্টি করবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওলামা লীগের বক্তব্য এবং পহেলা বৈশাখে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে কি এটা প্রমাণিত হয় না যে, বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে? অসীম সাহসী মানুষকে ক্রমশই পিছু হটতে বাধ্য করা হচ্ছে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা অতীব জরুরী। কারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং সবার সুরক্ষা প্রদান রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।

নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট কী দীর্ঘস্থায়ী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কী গভীর সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? সাধারণ অর্থে জনকর্তৃত্বের অনুপস্থিতি অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে সবক্ষেত্রে। কিন্ত বাংলাদেশে তো শাসকদের কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি নেই, শাসন ব্যবস্থা বড় বেশী সরল-রৈখিক, একক ও কর্তৃত্ববাদী। সুতরাং এই ধরণের ব্যবস্থা অস্থিরতার কারণ হতে পারে কীনা, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এরকম শাসনের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষ আইনকে শাসন করা হয়, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উস্কে দেয় । এই পরিস্থিতির সংকট সবক্ষেত্রে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তা  প্রবল হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাসীনদের অনেকেই আইনের আওতার বাইরে সুবিধে ভোগ করে থাকে।

দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার হবে নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার কর্তৃত্ববাদী হবে, এটি আমাদের বুধবার-এ প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পরই এবং এটি এখন বাস্তবতা। নৈতিকভাবে দুর্বল এই সরকার স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠছে প্রতিশোধপরায়ন ও ক্ষিপ্র। একটি একক নির্বাচনে এবং প্রায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচিত ক্ষমতাসীনদের এই পর্যায়ে জনগনের কাছে দায়বদ্ধতা বলে কিছু আছে কীনা, থাকলে কী আছে, প্রতিষ্ঠানগুলিসহ মিডিয়ার চেহারায় সেটি দৃশ্যমান। দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার বাসনা তৈরী হচ্ছে। সেই কারনেই অসহিষ্ণুতা ক্রমশ: সুস্থ সমালোচনাকে রুদ্ধ করতে চাইছে।

রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকলে নাগরিকদের মিত্র থাকতে পারে না। দুর্বল নাগরিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। রাষ্ট্রের গুনাগুনের পরীক্ষা অন্য কোথাও তেমন দিতে হয় না, যেমনটা হয় ব্যক্তি নাগরিকের জীবনে। কাদের সুবিধা হচ্ছে, কাদের জন্য ঘনিয়ে আসছে বিপদ, তা দেখেই বোঝা যায়- রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকল কিনা! রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সাথে সাথে ব্যক্তির ভাগ্যের পরিবর্তন, কিছু মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি অন্যদের দুর্ভোগ-এর রহস্য নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতিকদের কার্যকলাপের ভেতরেই। ব্যক্তি এখানে শক্তিহীন, এমনকি যাদের ভাগ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ফলে- তারাও কি শক্তিশালী?

গত কয়েকমাসে বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা এক গভীর সংকট ও অস্থিরতার ইঙ্গিঁত বহন করে। দেশে হত্যা গুম, অপহরন, ধর্ষন লুন্ঠনের বেশুমার ঘটনা ফিবছর ঘটে চলেছে। কিন্তু এর মাঝে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা এবং এ নিয়ে শাসক মহলের নিস্পৃহ আচরন চমকে দেয়ার মত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য, আদালতের প্রতিক্রিয়া, মন্ত্রীদ্বয়ের শর্তহীন ক্ষমা প্রার্থনা এবং অন্তিমে সংবিধান লংঘন করার অভিযোগে তাদের শাস্তির পরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা না নেয়া বিস্ময়কর হলেও কর্তৃত্ববাদী শাসনে এটিই স্বাভাবিক।

এ অবস্থায় শাসন ক্ষেত্রে সংকট ও অস্থিরতা দেখা দিলে শাসকদের প্রতিক্রিয়া থাকেনা । কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি স্বাধীনভাবে কাজ না করায় অখন্ড স্বত্তা হিসেবে আইন-কানুনের অনুশীলন করেনা। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় এমত অস্থিরতা দেখা দিয়েছে কিনা, এটি সমাজ বিজ্ঞানীদের গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষনের বিষয়। তবে শাদা চোখে মনে হবে যে, কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বে বসবাসরত দেশের জনগনের জন্য এই পরিস্থিতি দিনকে দিন নৈরাজ্যিক হয়ে উঠছে এবং পরিনামে দেশ গভীর সংকটের মধ্যে ও অস্থির হয়ে পড়ছে।

এই অনিবার্যতায় বাংলাদেশে এখন নির্বাচন ব্যবস্থার সংকট ও অস্থিরতা নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের মত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও একপেশে হতে চলেছে। দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ৭৭ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। অর্থ দাঁড়ায়, যে কোন প্রকারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের  প্রার্থীতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়েছে। গাদা গাদা অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন ছিল নির্লিপ্ত, নিস্ক্রিয়।

রাজনৈতিক দলের কথিত মনোনয়নের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য। দল যে প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেয় তা মেনে নেয়নি নিজ দলের প্রার্থীরা । ক্ষমতাসীন দলে বিদ্রোহের সংখ্যা বেশি, এখন এটি স্পষ্ট যে, দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিলনা। ধমক, চাপ, বহিস্কার, মামলা ও গ্রেফতার- এসব পথে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা তৃনমূলে গনতন্ত্র চর্চার বিষয়টি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

তৃনমূলের রাজনৈতিক দলগুলির এই প্রাতিষ্টানিক ব্যর্থতার ফাঁক গলে সহিংসতা, রক্তপাত, দূর্নীতি-অনাচার আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রার্থী মনোনয়নে তৃনমূলের মতামতের চাইতে আর্থিক লেনদেন ও নেতৃত্বের কোটারি স্বার্থের প্রভাব হয়ে উঠেছিল বড়, ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীর অবাধ্যতা না ঠেকাতে পেরে দলীয় নেতারা বহিস্কারের হুমকিসহ নেপথ্যে প্রভাব খাটিয়ে মামলা ও গ্রেফতার করে ক্ষোভ ঠেকাতে চেয়েছেন। নির্বাচনী মাঠ সমতল ছিলনা, প্রচার- প্রচারনা ছিলনা নির্বিঘ্ন। এরকম নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের বিজয় নিশ্চিত করতে পারে, পারেনা উৎসবের আমেজে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ।

সকল রাজনৈতিক দলের আমলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সব নির্বাচনে রকম-ফেরে প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়ে থাকে। কিন্তু জনরায় প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের বিপক্ষে যেতে দেখা গেছে এভারেই প্রথম প্রশাসনের সহযোগিতায় এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে যে, শুধুমাত্র পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে। নিস্ক্রিয়, নির্লিপ্ত ও অনুজ্জল নির্বাচন কমিশন শেষতক সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারসহ ৫ জন ওসিকে ডেকে ‘তিরস্কার’ করেছে, বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেখানকার নির্বাচন কমিশন ডিসি, এসপিসহ  ৩৮ জন কর্মকর্তাকে বদলী করেছে নিরপেক্ষ ভূমিকা না থাকার কারণে।

এ পযর্ন্ত দু’দফা ইউপি নির্বাচনে শিশুসহ কুড়িজন মানুষের প্রাণ করেছে। আহত হয়েছে অগনিত মানুষ । ২২ মার্চ মঠবাড়িয়া কলেজ কেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া গুলিতে মারা গেছে ৫ জন। এটি প্রমান করে যে, আমাদের  আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কতটা  ‘ট্রিগারহ্যাপি’ হয়ে উঠেছে এবং মানুষের প্রান কতটা সস্তা হয়ে গেছে! এই ঘটনার পর ঐ বাহিনীর ডিজি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নয় ) সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্দেশে তারা গুলি করেছে। এখানেই শেষ নয়, এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ঘটনায় পরবর্তীতে ১৩০০ জন অজ্ঞাতনামার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরে প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব অব্যাহত রেখেছে। প্রশাসনের এই বিষয়গুলি নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রন তো দূরে থাকে, আমলে নিয়ে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। ফলে নির্বাচনকালে ও নির্বাচন পরবর্তীতে সংঘটিত সহিংসতায় কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জালভোট ও ব্যাপক প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। নিকট অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন ন্যুনতম মানসম্পন্ন যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাগুলি অর্জন করেছিল, ২০১৪ থেকে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে তা আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

দুই দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে আরো অস্থির করে তুলেছে। ভোটবঞ্চিত জনগন ভয়ে ও ক্ষোভে আগ্রহ হারাচ্ছে তৃনমূল পর্যন্ত। এর মধ্য দিয়ে সহিংসতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিল তেকে ভোটের দিন পর্যন্ত এবং ভোট পরবর্তী প্রতিটি স্তরে সংঘটিত ক্ষমতাসীনদের দাপট তৃনমূলের সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে। এক দলের সঙ্গে অন্য দলের পাশাপাশি  নিজেদের দলের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা বাড়ছে। আশংকা বাড়ছে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তৃতীয় দফার নির্বাচনে নিচেরা ছাড়া আর কী কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনের মাঠে পাওয়া যাবে?

দেশের শাসনব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় এমত অস্থির পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে, সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিকে অদৃশ্য দলীয় নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিযে এটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সরকার দলীয় পরিচয়ের সাথে প্রতিষ্ঠানগুলিকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও সাংবিধানিক দায়িত্ব না ভেবে অনেকটা সরকারী কর্মকর্তাদের মত আচরন করছেন। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা  হারাচ্ছে রাষ্ট্র, জনআস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে।

এবারের নির্বাচন তৃনমূলের রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সমূলে বিনষ্ট করে দিয়েছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়নে এই অক্ষমতা সবরকম সামাজিক ভারসাম্য ধ্বংস করে দেবে। ফলে সমাজ জুড়ে আগত সংকট ও অস্থির পরিস্থিতি তৃনমূলকে বিপুল বেগে আঘাত করতে চলেছে। যার শিকার হবে প্রধানত: গ্রামীন জনগোষ্ঠি।  নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দল মিলে কি সেদিকেই যাত্রা করলো ?