Home » প্রচ্ছদ কথা (page 7)

প্রচ্ছদ কথা

ভারত বাংলাদেশে যা চায়

আনু মুহাম্মদ ::

ভারতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর ও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে অনেকরকম কথা হচ্ছে। এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে দেখা দরকার এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক কোথায় আছে, এই সফরে কি নতুন কিছু হবে নাকি আমরা বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতাই দেখতে পাবো সেটাই উপলব্ধির বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন পথ নির্ধারণে ভারতের সাথে যেসব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হচ্ছে তার অনেক কিছুই প্রকাশ্য আলোচনায় আসেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: (১) চট্টগ্রাম বন্দরে যাতে ভারত সরাসরি, ভিন্ন দেশ হবার কারণে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, প্রবেশ ও ব্যবহার করতে পারে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। (২) পারমাণবিক ব্যবস্থাপনায় ভারতের অংশীদারীত্ব নিশ্চিত করবার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। (৩) বঙ্গোপসাগরে ‘সমুদ্র অর্থনীতি’ বিকাশে ভারতের সাথে যৌথ ব্যবস্থাপনা। (৪) মোদী সরকারের ঘনিষ্ঠ আদানি ও রিলায়েন্স গ্রুপ বিদ্যুৎ খাতে একাধিক প্রকল্পের অনুমোদন পাচ্ছে। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহে বাধ্যবাধকতা এবং প্রায় তিনগুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ব্যবস্থা থাকছে তাতে। এসব চুক্তি হচ্ছে দায়মুক্তি আইন অনুযায়ী, কোনো স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই। এবং (৫) বাংলাদেশের উপগ্রহ ব্যবস্থাপনায় ভারত যুক্ত রাখার ব্যবস্থা।

গত বছরের ১৫ মে থেকে ‘ট্রানজিট’ নামে ভারতের পণ্যসামগ্রী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আবার ভারতেই নেবার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। ভারত থেকে রওনা হয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে আবার ভারতেই প্রবেশ, ট্রানজিটের এরকম দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে তুলনীয় একমাত্র দেশ পাওয়া যায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও লেসেথো। এরকম দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন হলেও এর আগে বাংলাদেশ অনেকবার ‘শুভেচ্ছাস্বরূপ’, ‘মানবিক’ কারণে’ ভারতীয় পণ্য পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে। তিতাস নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়েও ভারতের বিদ্যুৎ সরঞ্জাম নিতে দিয়েছে। এবারে শুরু হল শুল্ক বা মাশুলের মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞ কমিটি এর হার নির্ধারণ করেছিলো টনপ্রতি ১০৫৮ টাকা। ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহণ করলে প্রকৃতপক্ষে তার খরচ কমবে শতকরা ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ। এই খরচ কমিয়ে যে পরিমাণ লাভ হবে তাদের সেই তুলনায় টনপ্রতি ১০৫৮ টাকা অনেক কমই ছিলো। তবে সরকার তা গ্রহণ করেনি,  চূড়ান্তভাবে এই হার নির্ধারিত হয়েছে এর শতকরা ২০ ভাগেরও কম,  টনপ্রতি ১৯৮ টাকা। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান চেয়েছিলেন বিনা ফিতে এসব পণ্য যেতে দিতে, তাঁর ভাষায় এরকম মাশুল চাওয়া অসভ্যতা! তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও ছিলেন।

ভারতের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা ঋণচুক্তি প্রথম ঋণচুক্তির তুলনায় আরও কঠিন শর্তে স্বাক্ষর করা হয়েছে। এই পর্বে ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার। উল্লেখ্য যে, এর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতি দেড় মাসে দেশে প্রেরণ করেন। এই ঋণের টাকায় ভারত থেকে ৫০০ ট্রাক ও ৫০০ বাস কেনা, ট্রানজিট রুটে অবকাঠামো উন্নয়নসহ ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এই চুক্তির আওতায় বিভিন্ন নির্মাণ ও পণ্য ক্রয়ের শতকরা ৬৫ থেকে ৭৫ ভাগ কিনতে হবে ভারত থেকে। বিভিন্ন প্রকল্প পরামর্শকদের শতকরা ৭৫ ভাগ আসবেন ভারত থেকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ভারতীয়  ব্যক্তিদের কর ও ভ্যাট শোধ করবে বাংলাদেশ। বস্তুত বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণে ভারতের ট্রানজিট রুটই এখন সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের অন্য মহাসড়ক ও সড়কগুলোর দুর্দশা অব্যাহত আছে।

বলাবাহুল্য যে, ঋণ চুক্তির এই মডেল বহু পুরনো। ‘বিদেশি সাহায্য’ নামে এই ধরনের  ঋণ দিয়েই বিশ্বের পশ্চিমা দেশগুলো প্রান্তিক দেশগুলোতে নিজেদের পণ্য বাজার তৈরি করেছে, নাগরিকদের কর্মসংস্থান করেছে, বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিনিয়োগের পথ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবির মতো সংস্থাগুলো এই ঋণের ফাঁদে ফেলেই বহুজাতিক পুঁজির পথ প্রশস্ত করেছে। ভারতের বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সেরকম পরাশক্তির ভাব নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে এখন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী কখনো একই পথে ঐক্যবদ্ধ। সম্প্রতি নেপাল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের শক্তি প্রদর্শনের নমুনা দেখেছে, তাকে মোকাবিলাও করেছে। বাংলাদেশে কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতেই আসছে প্রতিরক্ষা সমঝোতা বা চুক্তি।

খেয়াল করলে আমরা দেখবো, ভারতের জনগণও সেদেশের বিদ্যমান উন্নয়ন পথের শিকার। বৃহৎ পুঁজির আত্মসম্প্রসারণের তাগিদ পূরণে ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতার একটি বড় ক্ষেত্র এখন ভ‚মি। কৃষকের জমি কিংবা সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে এখনো টিকে থাকা জমি উন্নয়নের নামে ব্যক্তিমালিকানায় অর্থাৎ বৃহৎ কর্পোরেট গ্রুপের হাতে তুলে নেবার জন্য আইন সংস্কার থেকে বল প্রয়োগ-সবই চলছে। ভারতে ২০০৫ সালে গৃহীত সেজ (স্পেশিয়াল ইকোনমিক জোন) অ্যাক্টের মাধ্যমে বৃহদায়তন কৃষিজমি খুব কম দামে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেবার আইনি ব্যবস্থা হয়। কর, শুল্ক ও বিধিমালা যতটা সম্ভব ছাড় দিয়ে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভারতে ‘জনস্বার্থে’ ভূমি অধিগ্রহণের নামে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর হাতে জমি তুলে দেওয়ার নীতি ও কর্মসূচি বিষয়ে গবেষণা করে সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল লেভিন দেখিয়েছেন, “রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীর জমির দালালে পরিণত হয়েছে”। কৃষকসহ গ্রামীণ মানুষদের উচ্ছেদ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিলাসবহুল হোটেল, গলফ মাঠ, ক্যাসিনো, বহুতল আবাসিক ভবন, সুপারমার্কেট তৈরির মহাযজ্ঞ চলছে। গ্রামীণ বেকারত্ব বাড়ছে, তবে গ্রামীণ ধনীদের জমির মূল্যবৃদ্ধিতে লাভ হচ্ছে, গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশও অনুরূপ পথে অগ্রসর হচ্ছে, এখানে ভারতের ব্যবসায়ীরাও যুক্ত আছেন।

কৃষি, বন, নদী, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক-এডিবি সমর্থিত বিভিন্ন প্রকল্প ভারতের জনগণের সম্পদ বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের আয়োজন করেছে। এসব প্রকল্প ভারতের মানুষকে ছাপিয়ে এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ সব সময়ই একটি মরণফাঁদ, আর এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে গজলডোবাসহ আরো অনেক বাঁধ এবং আরো ভয়ংকর আন্ত নদী সংযোগ প্রকল্প। বাংলাদেশ অংশে তিস্তাসহ অনেক নদী এখন মরণাপন্ন। ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দেবার চীনা পরিকল্পনা ভারত ও বাংলাদেশ দু’দেশের জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে। সুন্দরবন ধ্বংস করে হলেও ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এনটিপিসি তার বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বন, নদী, জমি দখল এখন এই অঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান ভাষা।

ভারতের এনটিপিসি পরিচালিত সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকার আবার অনেকরকম ছাড়ও দিচ্ছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী কোম্পানি ১৫ বছরের জন্য আয়কর মওকুফ পাবে, এখানে কর্মরত বিদেশি ব্যক্তিবর্গের আয়কর দিতে হবে না কমপক্ষে তিন বছর, বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর কর প্রযোজ্য হবে না, প্রকল্প নির্মাণে নির্বাচিত ভারতীয় হেভি ইলেকট্রিক কোম্পানির যন্ত্রপাতি আমদানিতেও কোনো শুল্ক দিতে হবে না।

ইতিমধ্যে সুন্দরবন প্রান্তের সমুদ্র এলাকায় ভারত বাংলাদেশের যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটা হয়েছে গত বছরের মার্চ মাসে যখন সুন্দরবনবিধ্বংসী রামপাল যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো সেইসময়। একই এলাকায় ভারতের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একবার বলেছিলেন, ‘জলে স্থলে অন্তরীক্ষে ভারত বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী থাকবে।’ এটি নিছক কথার কথা নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি-রাজনীতির গতিমুখ নির্ধারণে ভারতের ভূমিকা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির গতি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারক। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও হয়ে থাকলেও বাংলাদেশে ভারতের পণ্য আমদানি, নিয়োগ ও বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম প্রবাসী আয়ের উৎস। বাংলাদেশ থেকে ভারতের নাগরিকেরা বছরে এখন প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা দেশে প্রেরণ করে থাকেন। ট্রানজিটের মধ্য দিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অর্থনৈতিক  মানচিত্র পরিবর্তিত হবার পথে।

ভারতের বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের পণ্যের বাজার, কর্মসংস্থান এবং অধিক মুনাফার বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে নিশ্চিত করবার ব্যবস্থা দরকার। দরকার বাংলাদেশের কৌশলগত সকল ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ, দেখা যাচ্ছে সেপথেই সাজানো হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন পথ। নিরাপত্তার নামে উন্নয়নের নামে বাংলাদেশ তাই দ্রুত পরিণত হচ্ছে ভারতের বৃহৎ পুঁজির অগ্রযাত্রার অধীনস্ত প্রান্তে। ‘ট্রানজিট’ যাত্রা এই পথে এক বড় ধাপ। এরসাথেই সম্পর্কিত তথাকথিত ‘প্রতিরক্ষা’ চুক্তি।

কানেক্টিভিটির কথা বললেও বাংলাদেশকে তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ডিসকানেক্ট করে রেখেছে ভারত। শুধু তা-ই নয়, ‘কানেক্টিভিটির’ এই কালে অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলোর অবাধ পানি প্রবাহকেও ডিসকানেক্ট করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি মানবিকতা বা দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক আইনস্বীকৃত অধিকার, যা থেকে দশকের পর দশক বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে ভারত। সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বনাশ করতে উদ্যত হয়েছে দুইদেশের সরকার। কাঁটাতারের পেছনে বড় যুক্তি, বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাসী-জঙ্গির ‘অবাধ চলাচল’ ঠেকানো। প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্যও তাই। বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের থেকে ভারতকে নিরাপদ করাই যদি কাঁটাতার বা প্রতিরক্ষা চুক্তির উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেই সন্ত্রাসের ভ‚মি দেশের মধ্য দিয়ে ভারতের পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচল কিভাবে নিরাপদ হবে? কে নিশ্চয়তা দেবে?

এই কাঁটাতার রেখে, নদী আটকে রেখে, সুন্দরবন ধ্বংস করে বন্ধুত্ব আর কানেক্টিভিটি কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। কিংবা এই ‘বন্ধুত্ব’ আর অধস্তনতার তফাত কী, সে প্রশ্নেরও ফয়সালা হয়নি। নতুন সমঝোতা আর চুক্তি এই কাঠামোর বাইরে যাবে এরকম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ভারতের বৃহৎ পুঁজির উন্নয়ন যাত্রায়, তার চাহিদা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভূমিকা আরও নিশ্চিত করবার অয়োজনই দেখা যাচ্ছে।

ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি কী আসলেই প্রয়োজনীয়?

আবদুল হান্নান ::

দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে অভিন্ন হুমকির উপলব্ধি থেকেই সবসময় সামরিক সন্ধি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়ে থাকে। পঞ্চাশের দশকের স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যোগ দিয়েছিল সেন্টো ও সিয়াটো সামরিক জোটে। চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান কমিউনিস্ট প্রভাব প্রতিহত ও সংযত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ডের মতো পাশ্চাত্যের এবং থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইরান ও তুরস্কের মতো এশিয়ান দেশ সেন্টো ও সিয়াটোতে একত্রিত হয়েছিল। এর বিপরীতে রাশিয়ার ছিল ওয়ারশ সামরিক চুক্তি। ন্যাটো নামে পরিচিত পাশ্চাত্যের সামরিক জোটকে সংযত রাখার লক্ষ্যে রাশিয়ার কাছাকাছি থাকা নির্ভরশীল পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশগুলো ছিল ওয়ারশ-র সদস্য। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ন ভারত মহাসাগরে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব সংযত ও হটানোর লক্ষ্যে ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আমেরিকান সামরিক বিমান ও রণতরীগুলোর জ্বালানি সংগ্রহ এবং মেরামতি সুবিধা দেওয়াই এই চুক্তির লক্ষ্য। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে সম্ভাব্য চীন-আমেরিকান হস্তক্ষেপ বন্ধ করার লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তিতেও সই করেছিল ভারত। পরে একই ধরনের চুক্তি ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োগ করা হয়। সন্ত্রাসবাদ, বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবিলার জন্য ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৯টি ইসলামি দেশকে নিয়ে গঠিত হয় ইসলামি সামরিক জোট।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ কোনো মহল থেকে তেমন হুমকির মুখে আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের সত্যিকারের বা কল্পিত কোনো শত্রু নেই। ফলে ফলে যৌক্তিকভাবেই বলা যায়, কোনো দেশের সাথে কোনো সামরিক চুক্তিরও দরকার নেই আমাদের। জাতির পিতার বিবৃত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ হলো ‘কারো সাথে শত্রু তা নয়, সবার সাথে মিত্রতা’। আমরা জোট নিরপেক্ষ দেশ। ছোট দেশ হিসেবে বড় শক্তিগুলোর তাদের প্রভাব বলয় বিস্তার করার ধারণায় সামরিক জোট গঠেেন আমরা উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশের জনগণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বতিা  থেকে দূরে থাকতে চায়। এ কারণেই চীন, রাশিয়া, ভারত এবং এমনকি মিয়ানমারের সাথেও রয়েছে কৌশলগত অংশীদারিত্ব।

নাগরিক সমাজের সংবাদপত্রের আলোচনায়, বিশেষ করে সাবেক বাংলাদেশী কূটনীতিকরা সামরিক সহযোগিতা, বিক্রি এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পারস্পরিক সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করার জন্য ভারতের সাথে ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে ভারতের সাথে পর্যাপ্ত সামরিক সহযোগিতা তো রয়েছেই। ফলে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হবে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক।

ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার কারণে এ ধরনের সমঝোতার ব্যাপারে অধীর হয়ে ওঠেছে ভারত। ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে, গত দশকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের ৮০ ভাগ আমদানি হয়েছে চীনের কাছ থেকে। তারা উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের কাছে চীনের দুটি সাবমেরিন সরবরাহ করাটা ইঙ্গিত দিচ্ছে ‘ভারতের আঙিনায় চীনের পদচিহ্ন গভীর হয়ে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে ফেলেছে।’ এ কারণে ভারতীয় পদক্ষেপটি জোরদার হয়েছে। তারা আরো জানিয়েছেন, সাবমেরিন বিক্রির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে চমকে দিয়েছে, তারা আক্রমণকাজে ব্যবহারযোগ্য বলে বিবেচিত দুটি চীনা সাবমেরিন বাংলাদেশের কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা সাবমেরিন বিক্রিকে ‘ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা কৌশল’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রবাল ঘোষ ভারতীয় আউটলুক পত্রিকাতে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘বিক্রিটির কৌশলগত গুরুত্ব কোনোভাবেই বোঝা যাচ্ছে না।’ তিনি ‘বাংলাদেশের চীন কার্ড খেলা থেকে বিরত রাখার’ পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছেন।

তারা আরো উল্লেখ করেছেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের বাংলাদেশ সফরেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ওই সফরে চীন ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ওই সময় দুই দেশের সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অংশীদারিত্বেও উন্নীত করা হয়। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের চীনা ‘ওয়ান বেল্ট- ওয়ান রোড’ উদ্যোগে যোগদানও ভারতের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টির কারণ। এই সতর্ক ঘণ্টাই ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা সমঝোতা করতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব সুব্রামেনিয়াম জয়শঙ্করের ঢাকায় ছুটে আসতে উদ্দীপ্ত করেছে।

সব অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্যের আলোকেই প্রস্তাবিত চুক্তিটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারতীয় উদ্যোগ ও এ্যজেন্ডা। যে চুক্তি আমাদের স্বাধীন সামরিক বিকল্পগুলো ব্যাপকভাবে সীমিত ও বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলবে, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণ করার মাধ্যমে ভারত-চীন দ্বন্দ্বের অংশে পরিণত হওয়ার কোনো প্রয়োজন বাংলাদেশের নেই। প্রস্তাবিত চুক্তিটিতে গভীর অনিশ্চয়তা পরিপূর্ণ, সেইসাথে ভারতের সম্ভাব্য সংঘাতে আমাদের দেশকে বোকার মতো টেনে নেওয়ার ঝুঁকিও আছে এতে। বাংলাদেশকে না টেনেই নিজের শত্রু দের মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি আছে ভারতের। অধিকন্তু, ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্যের মান প্রশ্নাতীত নয় বলেই- ভারত হলো বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটি প্রশ্নে ভারতের অনেক ধরনের উদ্বেগের সুরাহা করেছে। গোলযোগপূর্ণ উত্তর পূর্বাংশের রাজ্যগুলোর ভারতীয় বিদ্রোহীদের জন্য বাংলাদেশের ভূমিতে স্থান হচ্ছে না; সড়ক, রেলওয়ে, নদীর মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য ও যাত্রীদের ট্রানজিট ও পরিবহন সুবিধা দিচ্ছে; এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরগুলোকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে সংযোগ সাধন করেছে। ভারত যা কিছু চেয়েছে, বাংলাদেশ থালা ভরে সবই দিয়েছে। আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশকে আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে ব্যবহার করতে দিয়েছি পালাটানা বিদ্যুৎ কোম্পানিতে ত্রিপুরায় ভারী সরঞ্জাম পরিবহন করার জন্য; আমাদের ভূখন্ড ব্যবহার করার মাধ্যমে ত্রিপুরায় ১০ হাজার টন চালও পরিবহন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তু তার পরও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করতে নানা টালবাহানা দেখা যাচ্ছে।

ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির বিপুল দান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমরা পাচ্ছি, কিন্তু কী আমরা দিচ্ছি।’ ভারতেরও উচিত নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করা, ‘আমরা বাংলাদেশের কাছ থেকে পেয়েছি, কিন্তু আমরা তাদেরকে কী দিয়েছি?’ কিছু দিতে না দিতে পারার ব্যর্থতা ভারতের এত বেশি যে, তাদের জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তির আশা করাটা মাত্রাতিরিক্ত।

সরকারের শক্তি নির্ভর করে জনগণের সমর্থনের ওপর, বাইরের সহায়তার ওপর নয়। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের জন্য অত্যন্ত কৃতিত্বের বিষয় হলো, সে সফলভাবে সমান দূরে থাকা চারটি টান টান দড়ির ওপর দিয়ে সফলভাবে হাঁটছে; কোনো একটির দিকে না ঝুঁকেই আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ও ভারতের সাথে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র্রনীতি অনুসরণ করছে। প্রতিরক্ষা চুক্তিটি করা হলে আমাদের স্বাধীন অবস্থানের সাথে ঘোরতরভাবে আপস করা হবে।

বিষয়টির ওপর বাংলাদেশের বর্তমান জনসাধারণের যে ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা হলো- এটা চরমভাবে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ। এটা করা হলে মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং ক্ষতিকারক পরিণাম সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের বিকাশমান অর্থনীতি এবং তাৎপর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্বৃত্তের কৃতিত্বের অধিকারী সরকার দৃঢ়ভাবে চালকের আসনে রয়েছে। জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক যে কোনো বহিরাগত চাপ এই সরকার রুখে দিতে পারবে। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের উন্নয়নের গতিতে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এ ধরনের একটি অসম ও অদ্ভূত চুক্তি প্রতিরোধ করতে পারবেন। বাংলাদেশ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তি জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এশিয়ায় ভারত ও চীন উভয়েই খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শক্তি। আমরা এমন কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারি না- যা ভারত-চীনের সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বতিাকে বাড়িয়ে দেবে।

লেখক : সাবেক কূটনীতিক -(সৌজন্য-ডেইলী স্টার)

‘ভারত চায় পরিপূর্ন প্রতিরক্ষা চুক্তি, বাংলাদেশ সমঝোতা স্মারক’- দ্য হিন্দুকে এইচ টি ইমাম

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন দিল্লি সফর নিয়ে ব্যাপক অনেক ধরনের কথাবার্তা চলছে। বিশেষ করে পুরোমাত্রার প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হবে কিনা, হলেও তা কোন মাত্রায় হবে, এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। এমনই এক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বুধবার ঢাকায় জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার সফরকালে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রশ্নে একটি ‘নথি’তে সই হবে। ঢাকায় ভারতীয় একদল সাংবাদিকের কাছে তিনি এ তথ্য প্রকাশ করেন।

এইচ টি ইমামের বরাত দিয়ে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিনিধি সুহাসিনি হায়দার জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে এটাই বাংলাদেশের প্রথম সরকারি ভাষ্য। এইচ টি  ইমাম সাংবাদিকদের কাছে তিস্তা নিয়ে আলোচনায় চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

ভারতীয় সাংবাদিকদের এইচ টি ইমাম বলেন, ভারত পরিপূর্ন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চাইছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে তেমন ধরনের কোনো  চুক্তি হবে না। ‘তবে সমঝোতা স্মারক ধরনের একটি নথিতে সই হবে। এটা হবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতামূলক নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক’।

দ্য হিন্দু পত্রিকায় বলা হয়েছে, যে সমঝোতা হবে তাতে বলা থাকবে, ‘ভারত বা বাংলাদেশের নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি হলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা একে অন্যকে সাহায্য করবো।’ তবে যৌথ সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র উৎপাদন এতে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না- সে ব্যাপারে এইচ টি ইমাম কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তাছাড়া সামুদ্রিক সহযোগিতা নিয়ে কতটুকু সম্পৃক্ততা থাকবে- সে ব্যাপারেও তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে এটুকু বলেছেন, ‘সহযোগিতার মধ্যে ‘তথ্য, পরামর্শ, সন্ত্রাসদমন প্রশ্নে অভিজ্ঞতা’ বিনিময়ের বিষয়গুলো থাকবে।

গত ডিসেম্বরে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের ঢাকা সফরের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়। এর মধ্যেই ভারতীয় সেনাপ্রধানের ঢাকা সফরের ফলে গুজবটির পালে জোর হাওয়া পায়।

‘বিপজ্জনক উদ্যোগ’ : পত্রিকায় বলা হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিরোধী বিএনপির প্রধান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জোরালোভাবে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। তিনি অভিযোগ করছেন, এই চুক্তি করা হলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘ভারতের অংশবিশেষে’ পরিণত হবে। বিএনপি জানায়, ‘ভারতের সাথে যেকোনো ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সমঝোতা স্মাক সই করা হবে বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক উদ্যোগ। ভারত চায় ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের কাছে তার সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র বিক্রি করতে।’

তবে বিএনপির এই বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন এইচ টি ইমাম।

এদিকে, বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি সংবাদপত্রগুলোও তিস্তা ইস্যুতে আন্দোলনের কথা বলছে। ভারতীয় পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জন্য চুক্তিটি আটকে আছে।

এইচ টি ইমাম অবশ্য সাংবাদিকদের বলেন, ‘ আমরা তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের উজান অঞ্চলে তথা চীনের দ্বারস্থ হতে পারি কি না তা আমরা ভাবছি। চীনকেও দৃশ্যপটে আনা উচিত। আমরা তাদের সাথেও কথা বলতে চাই।’ তিনি অবশ্য নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘এটা নিছকই তার ব্যক্তিগত অভিমত।’ বিষয়টা এখনো ভারতের কাছে উত্থাপিত হয়নি বলেও তিনি জানিয়েছেন। তিনি স্বীকারও করেছেন, ভারতের ঐতিহ্যগত নীতি হলো সব বিষয় দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করা, ত্রিপক্ষীয় আকারে নয়।

মমতাকে সম্পৃক্ত করা : তিস্তা আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার আশা করছে, দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সময় শেখ হাসিনা ও মমতা ব্যানার্জির মধ্যে একটি বৈঠক হতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে এইচ টি ইমাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হাসিনার রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান করাটা তাৎপর্যপূর্ণ। আমি জানি, ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে মমতার সম্পর্ক আন্তরিক।’ আর এ কারণেই সরকার আশাবাদী বলে জানান ইমাম।

ইস্যুটি নিয়ে ভারতীয় কর্মকর্তারা এখনো সতর্ক রয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তিস্তা ইস্যুটি ‘টেবিলে নেই।’ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘উভয় পক্ষের অনেক কিছু করার আছে।’ তিনি আরো জানান, ‘তিস্তা থাকুক বা না থাকুক, সফরটিই তাৎপর্যপূর্ণ।’

রেল প্রকল্প ও পরিবহন : হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত নতুন লাইন স্থাপনে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব দিয়েছে। কোনো প্রতিবেশী দেশকে দেওয়া এটাই সবচেয়ে বড় প্রস্তাব। আগামী সপ্তাহে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরকালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান। মশিউর রহমান জানিয়েছেন, ঋণের সাথে কোনো সময়সীমা থাকবে না। এটা হবে ২০১০ সালের ১ বিলিয়ন ডলার, ২০১৫ সালে দেওয়া ২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবটির রেশ ধরে।

জঙ্গীবাদ প্রতিরোধ : অভাব রাজনৈতিক অঙ্গীকারের

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার নারকীয়তার পরে সরকারের অঙ্গীকার ছিল, জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে দেশের প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় কমিটি গঠন করা হবে। এটি যে নিছকই একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা চমক সৃষ্টির প্রয়াস ছিল, তা অতিক্রান্ত বছর গড়িয়ে বোঝা যাচ্ছে। ‘জঙ্গীবাদ’-এটি দমন করার ক্ষেত্রে সরকারের ‘আন্তরিকতা’ এবং ‘রাজনৈতিক ব্যবহার’ বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। বন্দুকযুদ্ধ-ক্রসফায়ার, সশস্ত্র অভিযান, জঙ্গীদের বিচার-শাস্তি যে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়, সেটিও মোটামুটি প্রমানিত।

উল্টোদিকে, বিএনপি হলি-আর্টিজান আক্রমনের পর জঙ্গীবাদ দমনে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার কথা বলছে। বর্তমানে তারা বলছেন, সরকার এ বিষয়ে সাড়া না দিলে কি করার আছে তাদের! বিএনপির এই বক্তব্যও অসাড় এবং একধরনের স্ট্যান্টবাজিও বটে। গত বছর তারা জঙ্গীবাদ বিরোধী অবস্থান নিতে জোট ও জোটের বাইরের দলগুলির সাথে ‘ডায়লগ’ শুরু করলে জামায়াতের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নটি তোলা হলেই, বিএনপির জঙ্গীবাদ বিরোধী অবস্থান চুপসে গিয়ে ‘বক্তব্যেই’ থেমে আছে।

জঙ্গীবাদ নিয়ে ‘ব্লেইম গেম’ অনেক পুরোনো। বিএনপির ক্ষমতার মেয়াদে (২০০১-২০০৬) জেএমবি, হুজি নামের আউটফিটগুলি সামনে চলে আসে। শুরুতে গা করা হয়নি, কারন সরকারের ভেতরের প্যারালাল সরকার এবং কয়েকজন মন্ত্রীর সরাসরি সমর্থন ও সম্পৃক্ততা জঙ্গীবাদের ‘বিষবৃক্ষ’ পরিপুষ্ট করে তোলে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র প্রহরায় সে সময়ে রাজশাহী শহরে শায়খ রহমান, বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে মহড়ার সচিত্র রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও খবর ক্ষমতাসীনরা উড়িয়ে দিয়েছিল।

পরবর্তীকালে দেশের ৬৪ টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা করে জেএমবি’র ভয়াল আত্মপ্রকাশের পরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপে বিএনপি সরকার জঙ্গীদের শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেফতার ও  বিচারে ফাঁসি দেবার পরে অবস্থার সাময়িক সামাল দেয়। কিন্তু যে সকল কুশীলবরা জঙ্গীবাদকে সমর্থন ও শেল্টার দিয়েছিল তাদেরকে সে সময় তো বটেই, আজও পর্যন্ত বিচারের আওতায় আনা হয়নি। সেসব কুশীলবরা এখন অনেকেই জাতীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

বিএনপির অভিযোগ- সরকার জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, বিরোধী দলনে-দমনে; এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টিতে কোন আগ্রহ নেই তাদের। বিএনপি অবশ্য বক্তব্যের স্বপক্ষে এ পর্যন্ত কোন স্বাক্ষ্য-প্রমান জনসম্মুখে হাজির করতে পারেনি। তবে দেশের উগ্রবাদী সন্ত্রাস কবলিত এলকাগুলোতে সন্দেহভাজন জঙ্গী বা কট্টরপন্থীরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় নির্বচন পর্যন্ত করেছে-গণমাধ্যমে এরকম খবর প্রকাশিত হয়েছে। গেল ইউপি নির্বাচনে জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এরকম ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছে।

জঙ্গীবাদ পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাসীন দলের সকল অভিযোগের  আঙ্গুল বিএনপি-জামায়াতের দিকে। বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এটি শুধু অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমানের অভিযোগে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা বা অভিযোগ প্রমানিত হয়নি, যাতে করে এই অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। জামায়াত নিষিদ্ধকরনে দাবি থাকলেও সরকার এ নিয়ে রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশে ও কূটকৌশলে ব্যস্ত। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব হামেশাই অভিযোগ করছেন ; “সরকার পতনের লক্ষ্যে বিএনপি-জামায়াত জঙ্গীবাদ উস্কে দিচ্ছে”। এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ, কিন্তু বক্তব্যটি রাজনৈতিক কিনা, সে নিয়ে সংশয় রয়েছে।

রাজনীতির প্রতিহিংসা ও পরস্পরকে নির্র্মূলের প্রবণতা এমন এক বিষময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে, তার ‘আত্মঘাত’ এক শ্রেনীর তরুণ খুঁজে নিচ্ছে উগ্রবাদ ও চরমপন্থা। গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানের বিপরীতে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অভিযান এবং ওলামা লীগের নানা সময়ের মৌলবাদী হুঙ্কার কী ক্ষমতাসীনদের দ্বৈত রাজনীতির মঞ্চায়ন? জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে ‘ওয়ার অন টেরর’ মন্ত্রজপে পরিনত হওয়ার কারণ কী ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য-এই বিশ্লেষন কালক্রমে পরিষ্কার হবে নিশ্চয়ই।

এ দেশে গনতান্ত্রিক রাজনীতির অনুপস্থিতি, অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য, তিন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা  ও সামাজিক বিভাজন- প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জঙ্গীবাদ বিকাশে সহায়তা করছে। এই মূলগত সত্য অনুধাবনের বদলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমস্যার সমাধান খুঁজছে এডহক ভিত্তিতে। রাষ্ট্রের ভেতরে একটি বড় অংশের ধর্মাশ্রিত উগ্র-মনস্তত্ত্ব তৈরী হচ্ছে, তারা বহুত্ববাদের বিলোপ চাচ্ছে, কট্টরপন্থায় সংগঠিত হচ্ছে- এর সমাধান কতটা রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এ্যকশানে? বাহিনীসমূহের সাফল্য অনেক, সেটি এত সাময়িক যে তৃপ্ত হওয়ার আগেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে জঙ্গীরা।

পৃথিবীর অনেক দেশই সশস্ত্র জঙ্গী হামলার শিকার হচ্ছে। কি গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির মূলগত প্রবণতা যেখানে- হামলা হচ্ছে সব জায়গায়। পার্থক্য হচ্ছে, গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের হামলাকে জাতীয় সংকট হিসেবে দেখা হয়, সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হিসেবে নয়। ঘটনা তদন্তের আগেই কোন বিশেষ দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয় না। ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টাও করা হয় না। তদন্ত- বিচারের আগেই সমাধান দেয়াও হয়না।

ভয়ঙ্কর ঘটনার পর সংকট সমাধানে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা হয়। ঢাক-ঢাক, গুড়-গুড় করা হয় না! সমাজের কোন অংশ ঘটনার সাথে জড়িত, কেন জড়িত, এই আত্মঘাতী প্রবণতার উৎস কী- খুঁজে বের করে মূলোৎপাটনে মনোনিবেশ করা হয়। গভীর পরিতাপের বিষয়, এই পথে না গিয়ে কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর ঘরানায় সরকার এটি মোকাবেলায় সচেষ্ট। ফলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জঙ্গী ঘাঁটিগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও অচিরেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তারা অথবা সক্রিয় করা হচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও জিরো টলারেন্সের মধ্যেও জঙ্গীদের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা কতগুলি প্রবণতাকে ইঙ্গিত করছে। ইংরেজী মাধ্যমে পড়া, দেশে-বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক তরুন- যুবক একক বা সপরিবারে জঙ্গীবাদে উদ্ভুদ্ধ হচ্ছে, এমনকি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এর আগে জঙ্গীবাদ সম্পৃক্ততায় গ্রেফতার, বিচারে শাস্তি বা ক্রসফায়ারে মারা গেছে- এদের বড় অংশ দরিদ্র ও মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতায় সমাজের বিত্তবান ও নিম্নবিত্তের মধ্যে একটি যোগসূত্র কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিভাত হচ্ছে।

গুম ও গুপ্তহত্যা প্রবণতার মধ্যে অভিযোগ রয়েছে যে, সাদা পোষাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক পরিচয়ে অনেককে উঠিয়ে নিয়ে যায়। বিশেষত: বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ধারী অনেকেই এর শিকার। তাদের খোঁজও পাওয়া যায় না। কিন্তু এরই মধ্যে সমাজের বিত্তবান ও নিম্নবিত্তদের সন্তানরা সহসাই হারিয়ে যাচ্ছে। খোঁজ মিলছে না, কেউ হদিস করতে পারছে না। কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু থাকা দেশগুলোর মত এখানেও এসব তরুনদের সহসাই খোঁজ মিলছে জঙ্গীবাদের ‘মানব বোমা’ হিসেবে।

বাংলাদেশে ইসলামিক ষ্টেট (আইএস) আছে কি নেই, বিতর্ক আছে। বিতর্ক মাত্রা পায় ঢাকায় অনুষ্ঠিত পুলিশ প্রধানদের সম্মেলনের পর। জঙ্গীবাদ গবেষক রোহান গুনারত্নে সম্মেলনে বলেন, গুলশান হামলায় জড়িত ছিল আইএস, জেএমবি নয়। দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশের আইজি বলেছেন, আইএস-এর সঙ্গে এ দেশের জঙ্গীদের কোন যোগাযোগ নেই। হোম গ্রোন জঙ্গীরা আইএস অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে প্রশিক্ষণ বা কর্মকান্ডে অংশ নেয় এমন কোন প্রমান মেলেনি। তবে ভার্র্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে যোগাযোগ থাকতে পারে। প্রসঙ্গত: নেই প্রমান করতে আইএস হিসেবে গ্রেফতার চার্জশীটে নিউ জেএমবি হয়ে গেছে বলে খবরে প্রকাশ।

পুলিশের আইজির বক্তব্য সরকারের ধরে নিলে যেটি দাঁড়াচ্ছে, জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় সরকার যে কোন কারনেই হোক -এই অবস্থানে থাকতে বদ্ধপরিকর।

এই দেশে জঙ্গীবাদী হামলা অবশেষে ‘আত্মঘাত’ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহের  প্রচেষ্টার মধ্যে জঙ্গী কার্যক্রম চলছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলির প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়াচ্ছে, আইএস থাকুক আর নাই থাকুক-কথিত হোম গ্রোন জঙ্গীরাই ‘সুইসাইডাল স্কোয়াড’ গঠন করেছে। জঙ্গী নেতৃত্ব বাংলাদেশকে আত্মঘাতী হামলা প্রবণতার দিকে ধাবিত করছে। অন্তিমে ফলাফল যাই হোক, তারা চায় আন্তর্জাতিক প্রচার এবং তাতে সাফল্যও আসছে।

জঙ্গীরা কি নির্মূল হয়েছে? বরং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এলিট অংশে হামলা হলে তাদের সক্ষমতার নতুন বার্তা দিয়ে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করতে চাচ্ছে। তারা সম্ভবত: টার্গেট করেছে, এই দেশ যাতে আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক প্রচারনার শিকারে পরিনত হয়। কারন এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভাবমূর্তিগত সঙ্কট সুদুরপ্রসারী।

জঙ্গীবাদের সক্ষমতা তৈরী হওয়া যে কোন প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির জন্যও চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলির ব্লেইম-গেম এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা বিভীষিকা তৈরী করছে। রাজনৈতিক শক্তির বদলে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নির্ভর হওয়ার কারনে ঘাপটি মেরে থাকা শক্তি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিও সুযোগ গ্রহন করছে বলে প্রতীয়মান।

বাংলাদেশ এখন দুই পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান নীতিতে অটল থাকলে বিপদ কমবে না এই বিবেচনায় রাজনৈতিক-সামাজিক ঐক্য খুবই জরুরী। এই মূহুর্তে রাজনৈতিক বিভাজন জঙ্গীবাদকে আরো উস্কে দেবে। যে কট্টরপন্থার দিকে দেশে আর্থ-সামাজিক অবস্থা ধাবিত হচ্ছে, সহিষ্ণুতার অভাব ঘটছে সর্বত্র-সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকেই সবার আগে কর্তৃত্ববাদীতার খোলস ঝেড়ে ফেলতে হবে।

রোহান গুনারত্নে বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাতকারে আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন,“আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আমরা আফ্রিকা, এশিয়া, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে আইএস এর বিস্তার দেখতে পাচ্ছি। বিশেষত: মুসলিম দেশগুলো এর দ্বারা আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশের জন্য হুমকিটাও দীর্ঘদিনের জন্য থাকবে”। এ আশঙ্কা সত্যি হলে সামনে বড় বিপদ। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই গবেষকরা জঙ্গীবাদকে চিহ্নিত করতে গিয়ে ধর্মের সাথে এক করে ফেলে নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষদের  নেতিবাচক পরিনতির দিকে ঠেলে দেন। আসলে জঙ্গীবাদ ধর্মকে আশ্রয় করে, এর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই।

ভারতীয় দৃষ্টিতে বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা চুক্তি

জয়িতা ভট্টাচার্য ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭ থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফরকালে বেশ কয়েকটি চুক্তিতে সই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুই দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটিই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হওয়া দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এই চুক্তির ফলে আরো গভীর হবে।

চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা না হলেও মিডিয়ায় প্রকাশিত কিছু কিছু তথ্যের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, চুক্তিটির মেয়াদ হবে ২৫ বছর। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির মধ্যে ক্রয় বাণিজ্য, প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া এবং সন্ত্রাসদমন বিষয়ক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের সূচনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধ করে। কিন্তু বিপরীতক্রমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ভারতের সাথে দেশের সম্পর্ক নিয়ে সংশয়ে ছিল বলে ধারণা করা হয়।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত সফর বিনিময়ও হচ্ছে। দুই দেশ প্রশিক্ষণ বিনিময় করছে; যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ৬ষ্ট রাউন্ডের ‘অপারেশন সম্প্রীতিও’ হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক।

চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তিগুলো হচ্ছে- এটা দেশের স্বার্থবিরুদ্ধ এবং এতে করে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাছাড়া এই ভয়ও আছে যে, এর ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার এবং বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী চীন মর্মাহত হবে। চুক্তিটি নিয়ে এছাড়াও ভয়ের কারণ হলো, এর ফলে সার্বভৌমত্বে আঘাত দিয়ে, বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে ভারতীয় সৈন্যরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে চলাচল করতে পারবে। বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতার দিকে ইঙ্গিত করে কয়েকজন বিশ্লেষক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন পর্যন্ত তুলেছেন। অধিকন্তু, ভারতীয় অস্ত্রের মান নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।

এসব সংশয় সৃষ্টির বেশির ভাগ কারণ হলো ‘দাদাগিরি সিনড্রোম’; ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এতে বেশ ভুগেছে। ভারতকে প্রায়ই এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মানদন্ড দিয়ে বিচার করা হয়। এ ধরনের ভাবাবেগের সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশীরা প্রায়ই ’৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাছ থেকে আটক সব অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং চুক্তিটির ব্যাপারে তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসেবেও এই ঘটনাকে ব্যবহার করে।

অবশ্য পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে; বাংলাদেশ সব ব্যাপারে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে। দেশটি অনেক ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই পথিকৃতে পরিণত হয়েছে। মানব উন্নয়নে দেশটি রোল মডেল হয়েছে; বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হাসিল করেছে, বিশ্বে দেশটি সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির অন্যতম। সশস্ত্র বাহিনীর সামর্থ্য ভালোভাবেই স্বীকৃত, শান্তিরক্ষায় আন্তর্জাতিক সাফল্য পেয়েছে। দেশটির এই শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রতি স্বীকৃতি দেওয়ার এটাই সময়।

বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ। আর এর রয়েছে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও বিদেশনীতি । দেশটির চীন-নীতি প্রধানত ভারতের সাথে ভারসাম্য বিধানের জন্য বলে যে যুক্তি দেওয়া হয় তা ধোপে টেকে না এবং তা যুক্তিযুক্ত ও যতার্থও নয়। সার্বভৌম দেশের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক প্রণয়নের বেলায় তা হতে হবে- যেকোনো পক্ষপাতহীনতার  ভিত্তিতে এবং অবাধে, নিজস্ব নীতির আলোকে ।

অবশ্য মিডিয়ার ওপরও কিছু দায়দায়িত্ব বর্তায়। চুক্তিটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বেশির ভাগ আপত্তির সৃষ্টি হয়েছে কিছু মিডিয়া প্রতিবেদন ও ভূমিকার কারণে। ওইসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে চীনা প্রভাবের ভারসাম্য বিধানের উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশ দুটি চীনা সাবমেরিন কেনার পর। বাংলাদেশের জনগণ তাদের জাতিকে নিয়ে চরমভাবে গর্বিত। ফলে এ ধরনের প্রতিবেদন তাদের মর্যাদায় আঘাত হেনেছে, ভারতবিরোধী বাগাড়ম্বড়তায় রসদ জুগিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে আবেগ উস্কে দিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিরোধিতাকারী অংশটি এ ধরনের ভাবাবেগকে কৌশলে ব্যবহার করছে।

এ ধরনের চুক্তির সুবিধাগুলো উপলব্ধি করার সময় এসেছে। প্রথমত, একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সামরিক সহযোগিতার পরিমন্ডলে গ্রহণ করা উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকা নিশ্চিত করবে। আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ভর করে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের মানসিকতার ওপর।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতি ঘনিষ্ঠতার আলোকে বলা যায়, সন্ত্রাসপ্রতিরোধের মতো অনেক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ আছে তাদের সামনে। আর এগুলো যৌথভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এ কারণে সশস্ত্র বাহিনী দুটির মধ্যে আরো ভালো সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়া সশস্ত্র বাহিনী দুটির মধ্যে সামর্থ্যরে সামঞ্জস্য বয়ে আনবে, অভিন্ন হুমকি ব্যবস্থাপনা এবং চ্যালেঞ্জগুলো আরো ভালোভাবে মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।

তাছাড়া ভারতের অস্ত্র বাজার থেকেও বাংলাদেশ বিপুল ও ব্যপকভাবে উপকৃত হবে। বিশ্বে ভারত বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক, তবে শিগগিরই দেশটি প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশে পরিণত হবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া ইনিশিয়েটিভের’ কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এখন ভারতে তাদের অস্ত্র উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের বিকাশ ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করা। কারণ এর মাধ্যমে দেশের খুব কাছ থেকেই সেরা প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে পারবে। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও নৈকট্যের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে এসব প্রযুক্তি ও অস্ত্রের সাথে পরিচিত হওয়া অনেক সহজ হবে। এটা ‘‘কৌশলগত নিজস্বতা ও স্বকীয়তার’’ জন্য ও অস্ত্রের উৎস বৈচিত্র্যময় করতেও সহায়ক হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরে সুযোগ থাকায় এটা অস্ত্র তৈরিতে অগ্রগতি হাসিলেও বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ নিজেকে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ হিসেবে উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনকারীতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

বর্তমান সরকারের উচিত প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের অংশীদারীত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই দেখা এবং বিচার করা। এই প্রকল্পে বাংলাদেশ হলো ভারতের প্রধান অংশীদার। এই লক্ষ্য হাসিলে সবার সহযোগিতা প্রয়োজনীয়। চুক্তিটি উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো ঘনিষ্ঠ করবে, শান্তিতে অবদান রাখবে।

(লেখক : ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো। আর নিবন্ধটি ভারতের আউটলুক-এ প্রকাশিত)

তীব্র সামাজিক সংকট : একাংশের হাতে কেন্দ্রীভূত বিশাল সম্পদ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ধন-বৈষম্য । কিন্তু তা যদি একটা সীমা অতিক্রম করে যায়, তাহলে তা যে কোন  সমাজব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ বৈষম্য বাড়তে বাড়তে বর্তমানে তা বিপদরেখা অতিক্রম করেছে। বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য বৃদ্ধির হারটাও মারাত্মক বিপদের সংকেত দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকেই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, ঐতিহ্যগতভাবে লগ্নির প্রসার প্রকৃত অর্থনীতির সমৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে।…কিন্তু এখন আর তা নয়। এখন পুঁজির মালিক লগ্নি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে, প্রকৃত উৎপাদনশীল সম্পদে নয়। অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকেই অর্থনীতির এই ধরনের বিকৃত প্রক্রিয়া এবং সেই কারণে উদ্ভূত ফাটকা পুঁজির ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলেছিলেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত অক্সফামের প্রতিবেদনে ধনী-গরিবের বৈষম্যের বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিরাজমান বৈষম্য ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। বলা হয়েছে, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বড় কোম্পানির সূচক হলো এফটিএসই ১০০। এসব বড় কোম্পানির একজন প্রধান নির্বাহী এক বছরে যা আয় করেন, তা বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ১০ হাজার শ্রমিকের এক বছরের আয়ের সমান। আবার ভিয়েতনামের একজন গরিব মানুষের ১০ বছরের আয়, ওই দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির এক দিনের আয়ের সমান। আগামী ২০ বছরে ৫০০ ধনী তাদের উত্তরাধিকারীদের হাতে ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ তুলে দেবেন। এর পরিমাণ ১৩০ কোটি মানুষের দেশ ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের  (জিডিপি) চেয়ে বেশি। ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ গরিব মানুষের আয় প্রতিবছর গড়ে ৩ ডলার করে বেড়েছে। অন্যদিকে, ওই সময়ে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর আয় ১৮২ গুণ বেড়েছে। আর ১ শতাংশ ধনী গোষ্ঠীর হাতে যে সম্পদ আছে, তা বিশ্বের বাকি সব মানুষের সম্পদের চেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্রমাগত বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে অপরাধ বাড়ছে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে; দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। এর ফলে হতাশা ও আতঙ্কে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রশ্ন হলো, বৈষম্য যেখানে বেড়েই চলে, উচ্চবিত্তের উলম্ফন, নিম্নবিত্ত যেখানে নামছেই, সেই অর্থনীতির কার্যক্রমে নীতি- নৈতিকতা কোথায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর সমাজের উপরে থাকা ১০ শতাংশ মানুষের আয়ে বৃহৎ উলম্ফন ঘটেছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আপাতত বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। তাদের যুক্তি, অনুন্নয়নের অন্ধকার থেকে একটি দেশ যখন উন্নয়নের আলোর দিকে পা বাড়ায়, তখন অসাম্য বা বৈষম্য খানিকটা বাড়েই। তাই উন্নয়নের স্বার্থেই এই বৈষম্য মেনে নিতে হয়। প্রশ্ন হলো, এই মেনে নেয়াটা আর কতকাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ৪৫ বছর অতিক্রান্ত। স্বাধীনতার সময় যত গড়িয়ে চলছে, বাংলাদেশে বৈষম্য ততই বাড়ছে। এই বৈষম্য এখন সমাজ দেহের সর্বত্র ভয়ঙ্করভাবে ফুটে উঠে, তীব্র আর্থ-সামাজিক সঙ্কট সৃষ্টি করছে। এক শ্রেণী মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া বিশাল সম্পদরাজিই আজকের বাংলাদেশের মৌলিক সঙ্কট।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সময়ের সফল গবেষক, বতমান যুক্তরাজ্যের অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস আর ওসমানী সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ব্যাকগ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতি দশকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। উন্নয়নের গতি সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আয় বৈষম্যও। গত চার দশকে বৈষম্যের এ অনুপাত দ্বিগুণ হয়েছে। আয় বৈষম্য দেখাতে গিয়ে তিনি ‘পালমা অনুপাত’’ ব্যবহার করেছেন। আয় বৈষম্য পরিমাপে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় ‘জিনি সহগ’। তবে এর দ্বারা আয় বৈষম্যের ব্যাপকতার সঠিক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই পালমা অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে। পালমা অনুপাত-এর ক্ষেত্রে- একটি দেশের উচ্চবিত্ত মানুষের ১০ শতাংশের আয় ও নিম্নবিত্ত ৪০ শতাংশের আয়ের অনুপাত ব্যবহার করা হয়। এ অনুপাত যত বেশি হবে, আয় বৈষম্য তত বাড়বে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবর্তী পর্যায়ের ৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকে। তাই পালমা অনুপাত নির্ণয়ে তাদের অংশ বিবেচনা করা হয় না। তবে বৈষম্য পরিমাপে বিশ্বব্যাপীই জিনি সহগের ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। আশির দশকে বাংলাদেশে এ হার ছিল দশমিক ৩৭; ২০১০ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় দশমিক ৪৬। অর্থাৎ গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট অনুযায়ীও আমাদের আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

ড. ওসমানী দেখিয়েছেন, আশির দশকে বাংলাদেশে পালমা অনুপাত ছিল ১ দশমিক ৬৬। ২০১০-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১১। নব্বইয়ের দশকে এ অনুপাত ছিল ২ দশমিক শূন্য ৮ ও দুই হাজার-এর দশকে ২ দশমিক ৫৬। অর্থাৎ প্রতি দশকেই আয় বৈষম্য বেড়েছে। আর চার দশকে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও এ সময়ে অথনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। আশির দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৭২, নব্বইয়ের দশকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮, দুই হাজার-এর দশকে ৫ দশমিক ৮২ ও ২০১০ এর দশকে ৬ দশমিক ১৩। চারদিকে তাকিয়েও বলা যায়, বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে আয় বৈষম্য আরো  বেশি। কারণ উচ্চবিত্তের ১০ শতাংশ মানুষ কখনই তাদের আয়ের সঠিক হিসাব দেয় না। তাদের অনেকেই অবৈধভাবে জমি দখল করে এবং বিদেশে অর্থ পাচার করে। কিন্তু এসব হিসাব কোথাও থাকে না। তারা যে হিসাব দেয়, তা খুবই নগণ্য। তাই সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে পালমা অনুপাতে আয় বৈষম্য আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

সম্পদ যত বাড়ছে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বা দ্বন্দ্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি যে কোনো বিচারেই বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু যে সব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- বিত্তবান ও বিত্তহীনের ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। প্রতিবছর যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে তার বেশির ভাগ সুফল যাচ্ছে সামান্য কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারে’র (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিত্তবান-বিত্তহীনের ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে এবং বর্তমানে তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছর যে আয় হয় তার ৪৬ দশমিক ২ শতাংশই চলে যায় উপরের দিকে অবস্থানরত ১০ শতাংশ বিত্তবান মানুষের হাতে। আর একেবারে নিম্ন অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের হাতে যায় মাত্র ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ৪ হাজার ৯৬২ মার্কিন ডলার। সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ৩৫৯ মার্কিন ডলার। মাঝের ৪০ শতাংশের মাথাপিছু আয় ৮৬৭ মার্কিন ডলার। এই পরিসংখ্যানে আয় বৈষম্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে তা লক্ষণীয়। শহর এবং গ্রামের বিত্তবান মানুষের মধ্যেও আয় বৈষম্য দেখা হয়। রাজধানীর ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত মানুষের গড় আয় ১১ হাজার ৭৯১ মার্কিন ডলার। আয় বৈষম্যের এই চিত্র যে কোনোভাবেই উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

 

ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন

সি আর আবরার ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুবার স্থগিত হওয়া ভারত সফর ৭ থেকে ১০ এপ্রিল হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে আস্থা রাখলে অনুমান করা যেতে পারে, বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা পানিচুক্তিটি এই সফরে চূড়ান্ত হচ্ছে না। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সইয়ের জন্য দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও নথি চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার চুক্তি। এটা হবে ‘বৃহত্তর কানেকটিভিটির অংশবিশেষ- যার আওতায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত মালামাল পরিবহনের ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট করতে পারবে।’

বাংলাদেশ ও ভারত- উভয় দেশের নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে ধারণা রয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার জোরালো প্রয়াসের অংশ হিসেবে ভারতের উদ্বেগ নিরসনে অন্য যেকোনো প্রতিবেশীর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক বেশি সাড়া দিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ- বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে- প্রশমিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক প্রয়াস ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। একইভাবে মূল ভূখন্ড এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে আরো ভালো কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠার জন্য নদী ও স্থল রুটগুলো খুলে দেওয়াটা ছিল ভারতের সম্প্রসারিত জাতীয় স্বার্থের জন্যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

এ ধরনের বড় বড় ছাড় সত্ত্বেও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি প্রধান উদ্বেগও দূর করেনি। সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে অতি সামান্য অগ্রগতি হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ের চেয়ে অনেক নিচে রয়েছে। যদিও ২০১৫ সালের বহুল প্রশংসিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি বর্তমান ভারতীয় নেতৃত্বের শুভেচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ চার দশক আগেই ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে দেশের সংবিধান সংশোধন করার মাধ্যমে চুক্তিটি সাথে সাথেই বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিল। এটাও স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, শুষ্ক মওসুমে পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তির আগে ফারাক্কা বাধের কার্যক্রম শুরু হবে না- ১৯৭৪ সালে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে এমন  সমঝোতা হয়েছিল ফারাক্কা বাধ নিয়ে। বাধটির ফিডার ক্যানেলগুলো পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ মাত্র ১০ দিনের জন্য অনুমতি দিলেও, ভারত বাধটি চালু করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা অব্যাহত রাখে।

সম্প্রতি চীন থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন কেনার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফরটিকে নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে। সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দল নিয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর; বহু বিষয়াদি-সংশ্লিষ্ট  দীর্ঘ মেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি আদায়ে সাউথ ব্লকের প্রবল আগ্রহের মধ্যে ভারতের আঙিনায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে দিল্লি যে কতটা উদ্বিগ্ন তা-ই  এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের নৌ বাহিনী সংশ্লিষ্ট ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়টি দিল্লির প্রভাবশালী কোনো কোনো মহলে বড়ভাইসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ভারতীয় রাজ্যসভার ‘ইন্ডিয়াস ওয়ার্ল্ড’ নামের টিভি শোয়ে রাষ্ট্রদূত কানওয়াল শিবাল বলেছেন, প্রতিবেশী গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে পা রাখার জায়গা লাভের চীনা কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে ভারত এবং ভারত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছে, ‘শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ এটা দিচ্ছে।’ তিনি এমন অযাচিত পরামর্শও দেন যে, চীনের বদলে রাশিয়ার কাছ থেকেও বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনতে পারতো, ‘কারণ তা ভারতের জন্য কম সমস্যার সৃষ্টি করতো।’ তার বক্তব্যের বোঝা যাচ্ছে, কোন সূত্র থেকে সাবমেরিন কিনবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাংলাদেশের উচিত ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

টকশোতে উপস্থিতি বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আশ্চর্য হয়ে গেছেন, বাংলাদেশ যখন ‘তার সব সমুদ্রসীমা বিষয়ক সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে’ তখন কেন দেশটি সাবমেরিন কেনার উদ্যোগ নিল? ফলে এই প্রশ্নটি মনে উদয় হতেই পারে, ভারত যদি তার নিজস্ব সীমানা সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলে, তখন কি তার নিজস্ব বিমানবাহী রণতরী এবং সাবমেরিনগুলো বিক্রি করে দেবে?

সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানের শিক্ষাবিদ বিনা সিক্রি আরো এক ধাপ এগিয়ে ঊদ্ধত্যপূর্ণ দাবি করেছেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে ‘শেখ হাসিনার আমলে চীনপন্থী আমলাদের অব্যাহত শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে!’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।’ বাংলাদেশের এই স্বঘোষিত মঙ্গলকামীর এ ধরনের তথ্যের সূত্র জানতে খুবই ইচ্ছা জাগে। হাই কমিশনার সিক্রি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল চীন এবং দেশটি ‘তার বাবাকে’ সমর্থন করেনি। বাংলাদেশী ও ভারতীয়দের মধ্যে জনগণ পর্যায়ের যোগাযোগের সাফাই গাওয়ার সময় এই অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক তার সব কূটনৈতিক প্রশিক্ষন ও শিষ্টাচার পাশে সরিয়ে রেখে বলেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সব মন্ত্রীকে ‌‌”নানাপন্থায় বশ মানিয়ে রাখা হতে পারে। তিনি শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, চীনের গভীর গভীর পকেট আছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার সফরের পরিকল্পনা করার প্রেক্ষাপটে তার তদারকিতে নিয়োজিতদের উচিত নয়া দিল্লিতে বিরাজমান মনোভাব সম্পর্কে যথাযথ অবগত থাকা। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটাই সময় হাতে থাকা শেষ কয়েকটি দরকষাকষির বস্তুকে ধরে রাখা এবং নয়া দিল্লি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত বিনিময় চুক্তি না করা পর্যন্ত ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট ও পরিবহণ চুক্তিতে অগ্রসর না হওয়া।

(লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)