Home » অর্থনীতি

অর্থনীতি

ব্যবসায়ী ফাটকা পুজিপতিদের ‘রাজনীতি দখল’ : জিম্মি জনগন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য দিয়ে শুরু করা যাক। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “নির্বাচন বাণিজ্যে যারা অর্থ বিনিয়োগ করবে তারা সে অর্থ বহুগুন তুলে নেবে”। এই অপ-আকাঙ্খার কারনেই কি ৩’শ আসনে মনোনয়নপত্র জমা পড়ে হাজার চারেক?‌‌‌ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের মতে, ১৯৫৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল দশমিক ৫৪ শতাংশ। সে সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৮০-৮৫ শতাংশে। এভাবেই নির্বাচনকে শেষতক বাণিজ্যে পরিনত করা হয়েছে।

এক. প্রত্যেক ব্যবসায়ী দেশের একজন নাগরিক। কোন কোন ক্ষেত্রে ‘কমার্শিয়ালি ইম্পর্টেন্ট পারসন” (সিআইপি)। ফাটকা পুঁজিবাদী বা এমন পুঁজিবাদী সমাজে ব্যবসায়ীদের কদর আলাদা। ব্যবসায়ী মানে টাকার ক্ষমতা, বিনিয়োগের ক্ষমতা এবং এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা। রাজনীতিতে যুক্ত হতে বা কোন দলের নেতৃত্ব দিতে ব্যবসায়ীদের জন্য কোন সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ নেই। কিন্তু আছে নানা সন্দেহ-অস্বস্তি। বিশ্লেষকদেরও আছে নানা প্রশ্ন। আদর্শিক দলগুলো জোরে-সোরেই ব্যবসায়ীদের রাজনীতির বিরোধিতা করে। যদিও রাজনীতি করার অধিকার ব্যবসায়ীদের রয়েছে। ফলে কেউ রাজনীতিতে আসলে তাকে রাজনীতি দিয়ে থামানোর বিকল্প পথও এখন আর খোলা নেই।

আসলে ব্যবসায়ীদের কাজ হচ্ছে, অর্থ বিনিয়োগ করা এবং তা থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে মুনাফা তুলে নেয়া। যেহেতু  দেশের রাজনীতি দুর্নীতিমুক্ত নয়। ফলে রাজনৈতিক দলে নেতা হতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, নির্বাচন এলে মনোনয়ন পেতেও আবার অঢেল। সহজ কথায যার নাম-মনোনয়ন বানিজ্য। ব্যবসায়ীরা এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনছেন, নিরাপদ করছেন। এটি তাদের জন্য স্বাভাবিক হলেও জনগনের জন্য ক্ষতিকর, যখন জানা যায় দেশ থেকে মাত্র একবছরেই ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলি, বিশেষ করে শাসক দলগুলি তাদের নেতা-কর্মী ও জনগনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না; নির্ভর করতে পারছে না। সেজন্য নির্বাচনে জিততে বা ক্ষমতায় থাকতে ব্যবসায়ীদেরও দয়া-আনুকুল্য দরকার হয়ে পড়ছে। নানাসময়ে ক্ষমতার সাথে যুক্ত দলগুলি টাকার ওপর নির্ভর করেছে, টাকা দিয়েই অবস্থান তৈরী করতে চেয়েছে। সেজন্যই ব্যবসায়ীদের এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। এটি দুর্নীদির এক দুষ্টচক্রে আটকে ফেলেছে দেশের রাজনীতিকে।

মুশকিল হচ্ছে, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের অর্থবান হওয়ার ক্ষেত্রটি বেশিরভাগই অবৈধ ও অন্ধকার পথে। এটিকে তারা অবলীলায় কাজেও লাগান। এ ধরনের ব্যবসাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য রাজনীতির প্রয়োজন হয়। শেয়ার বাজার ও ব্যাংক লুঠ, মাদক-অস্ত্রের চোরাকারবার, মানবপাচার, খাদ্য পণ্যেও সিন্ডিকেট ও ভেজাল, দুর্নীতি-দখলসহ অবৈধ পন্থায় উপার্জিত হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা দিতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা। এজন্যই মানুষের যত অস্বস্তি, সন্দেহ এবং প্রশ্ন।

দুই. সামরিক সরকারগুলোর সময় ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ব্যবসায়ীদের উত্থান ঘটেছিল পেশাদার রাজনীতিবিদদের নানান দুর্বলতায়। আশির দশকের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সামরিক স্বৈরাচার তৃণমূল পর্যায়ে যে টাউট-বাটপার শ্রেনী তৈরী করেছিল, তারাই কালক্রমে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এই নবোত্থিত টাউট-ব্যবসায়ীরা অচিরেই অঢেল অর্থের মালিক হয়েছে, নব্বই দশকে নির্বাচিত সরকারগুলি দলে ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে এদেরকে।

আসছে সংসদ নির্বাচনে বড় দলগুলি কম-বেশি বড় ব্যবসায়ী ও ব্যবসা সংগঠনের নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছে। অনেক দল বা জোট মনোনয়ন দিয়েছে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ঋন খেলাপীর চিন্হিত মহানায়কদের। নির্বাচিত হয়ে যারা বাণিজ্য ও মুনাফাভিত্তিক নীতি প্রণয়নে সরকারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। পোশাক খাতের অন্তত: ৩০ জন ব্যবসায়ী চলতি সংসদের সদস্য। তাদের প্রবল রাজনৈতিক দাপটের কারনে সর্বোচ্চ আদালত কথিত “বিষাক্ত ক্ষত” বিজেএমই ভবন এখনও সপাটে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। উপেক্ষিত হয়েছে ভবন ভাঙ্গার নির্দেশ। এ দিয়েই বোঝা যাবে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের বর্তমান অবস্থান।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের সংসদে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহন ছিল অনধিক ১০ জন। সেটি এখন গিয়ে ঠেকেছে ৮০-৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ পেশাদার রাজনীতিকরা এখন সংখ্যালঘু। এদের কল্যাণে দ্রব্যমূল্য, পরিবহন, পোশাক খাত, ঔষধ, চিকিৎসা ব্যবস্থা- সবকিছুর নিয়ন্ত্রন চলে গেছে ব্যবসায়িক রাজনীতিকদের হাতে। জনগন ও রাজনীতি জিম্মি এদের কাছে। সব খাতে ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা ভোগ করছে। কর অবকাশ, নতুন ব্যাংক করা থেকে সব কিছুতেই পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুকূল্য।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে জনগন দেখছে বিভিন্ন ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুঠকারী বা তাদের পৃষ্ঠপোষক, মাত্র দশককাল আগেও কপর্দকহীন- বর্তমানে হাজার কোটি টাকার মালিকরা স্থানীয় জাতীয়সহ সকল নির্বাচনে রাজনৈতিক মনোনয়ন লাভ করছে। এভাবেই তৃণমূল পর্যন্ত একটি ‘গডফাদার কালচার’ গড়ে উঠেছে রাজনীতিতে। নির্বাচন বাণিজ্যে এই যে বিশাল বিনিয়োগ, সেটি পেশাদার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মূলধারার রাজনীতি থেকে অপসৃত করে দিচ্ছে। তারা হয়ে উঠছেন দয়া-দাক্ষিণ্যের পাত্র।

তিন. বিশ্বজুড়ে সরকারে থাকার কতগুলি সাধারন নৈতিকতা আছে। এই নৈতিকতার স্খলন অনেক রাষ্ট্রে সরকারের পতন ডেকে আনে। এর অন্যতম হচ্ছে, লাভজনক কোন প্রক্রিয়ায় নীতি-নির্ধারকরা যুক্ত হতে পারবেন না। অর্থাৎ সরকার বা সাংবিধানিক পদের অধিকারী কোন ব্যক্তি তার পদকে ব্যবহার করে কোন লাভজনক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবেন না। তাহলে তার ‘শপথ’ ভঙ্গ হবে এবং তিনি ঐ পদে থাকার নৈতিক যোগ্যতা হারাবেন। গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় পরিচালিত সরকারগুলি এটি মেনে চলেন।

কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম আকছার ঘটছে। ভরিষ্যতেও আরো বেশীভাবে যে ঘটবে   না, এরকম কোন গ্যারান্টি পাওয়া যায় না। এই অনৈতিকতাকে শাসক দলগুলি ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনেও নিয়েছে। এ নিয়ে কখনও কোন তাড়া বা চাপ তারা অনুভব করেনি। দেশের দলদাস, বিবেকবর্জিত সুশীল সমাজ এ বিষয়ে তেমন করে উচ্চকিতও নয়। তবে ক্ষীণ হলেও বিবেকবান অনেকে এখন বলতে শুরু করেছেন, এটি বন্ধ হতে হবে। কারন দেশ থেকে অবাধে অর্থপাচার, রিজার্ভ চুরিসহ আর্থিক খাতে ভয়ঙ্কর দুর্নীতির সাথে কারা জড়িত, সেটি এখন ওপেন সিক্রেট।

সংসদ সদস্য হিসেবে যে সকল ব্যবসায়ী নির্বাচিত হচ্ছেন, তাদের যেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, সেইখানে যেন নীতি-আইন প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের না দেয়া হয়-এটি অন্তত: নিশ্চিত করতে হবে। নইলে রাজনীতির ‘আনুষ্ঠানিক মৃত্যু’ আর অনানুষ্ঠানিক থাকবে না। এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে ওঠা দরকার। যেমনটি রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘‘রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই’’।

দেশের চলমান ঘটনাবলী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে, জাতীয় স্বার্থ দেখার মত কেউ নেই। সাধারন মানুষের স্বার্থ তো দুর কী বাত। রাজনীতি বাণিজ্যিকীকরনের প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে, ভোটের আগে জোট গঠন করা। উদ্দেশ্য জনগনের অধিকার রক্ষা নয়, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করা। এক সাক্ষাতকারে এরকমটিই মন্তব্য করেছেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- “নির্বাচনের এই খেলায় জনগন যে হারবে সেটি নিশ্চিত। আগেও হেরেছে তারা, এবারেও হারবে। কারন তাদের নিজস্ব দল নেই। যারা জিতবে তারা টাকাওয়ালা এবং বড় দলের লোক। নির্বাচনের পরের দিন থেকেই দেখা যাবে, তারা জনগনের প্রতিপক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন”।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-৩ : মুনাফার পাহাড় : প্রাণ প্রকৃতির বিপর্যয়

আনু মুহাম্মদ ::

তাই পুঁজি সংবর্ধনের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রাণ প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। কারণ এই ‘উন্নয়ন’ধারার মূল কথাই হলো প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণ ও দখল করা। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল বিবেচনা না করে, ভবিষ্যত প্রজন্মের বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সকল তৎপরতা পরিচালনা তাই এই দৃষ্টিতে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল- স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রং ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মৎস্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। বর্তমান নিরাপদ খাদ্যের সংকট, পানি দূষণ সবকিছুই ঐ বিদেশি ঋণনির্ভর ‘উন্নয়ন চর্চার’ ফলাফল।[1]

গত তিন দশকে একদিকে পাহাড় ও সমতলের বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে বিদেশী ঋণের টাকায় এমন সব আমদানি করা গাছ লাগানো হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।[2] এসব গাছে পাখি বসে না, এসব গাছপালা অন্যান্য গাছ কিংবা তরুলতা টিকে থাকতে দেয় না। ফুল, ফলহীন এসব গাছ গবাদিপশুকেও সমর্থন দেয় না। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি কিংবা শাল, গর্জন কিংবা বটগাছ না লাগিয়ে এসব আমদানি করা গাছ লাগানোর ফলে প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং নাজুকতা তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো প্রধানত বনাঞ্চল, সেখানে নিরাপত্তার নামে বনবিনাশ এবং পাহাড় দখল প্রক্রিয়া চলছে কয়েক দশক ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা, বনবিনাশ ও সামরিকীকরণের উৎসও একটি বিদেশি ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।[3]

নদীর কথা-

নদীর পানি প্রবাহের ওপরই বদ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম, নদী বিপন্ন হলে তাই বাংলাদেশের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। নদী হারানোর সর্বনাশ ১/২  বছরে,  ১/২ দশকে বোঝা যায় না। গত কয়দশকে বাংলাদেশে জিডিপি যে বহুগুণ বেড়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে আছে, কিন্তু একইসময়ে বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীমালার কতটা জীবনহানি ও জীবনক্ষয় হয়েছে তার ক্ষতির কোন পরিসংখ্যানগত হিসাব আমাদের কাছে নেই।

বাংলাদেশের নদীগুলো যে ভাবে খুন হচ্ছে, কারণ হিসেবে ভাগ করলে,এর পেছনে তিনটি উৎস সনাক্ত করা যায়। এগুলো হল: প্রথমত, ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তৎপরতা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নদী বিদ্বেষী উন্নয়ন কৌশল। এবং তৃতীয়ত, দেশের নদী দখলদারদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজস।

ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। এগুলোর সাথে সম্পর্কিত ছোট নদী, শাখা নদীর সংখ্যা বাংলাদেশে আগে ছিলো সহস্রাধিক। এখনও ২ শতাধিক নদী কোনভাবে বেঁচে আছে। কংক্রিটকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ বড় শিকার বাংলাদেশ ও ভারত দুইদেশেরই নদীমালা। বাংলাদেশ অংশে নদীর বিপন্নতা ঘটেছে তুলনায় অনেক বেশি। একতরফা আক্রমণে বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট নদী এখন একেকটি মৃতদেহ, কিংবা মুমূর্ষু। কার্যত বাংলাদেশের বৃহৎ চার নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা এখন বিপর্যস্ত এবং আরও আক্রমণের মুখে।[4]

ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারতের নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা গত চারদশকে বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও সম্পর্কিত অসংখ্য ছোট নদী খালবিলকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুকিয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন পানি প্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি। সেচের জন্য চাপ বাড়ছে ভ’গর্ভস্থ পানির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল প্রতিবেশগত সংকট তৈরি করছে।

শুধু তাই নয়, পদ্মা নদীর এই ক্ষয় তার সাথে সংযুক্ত নদীগুলোকেও দুর্বল করেছে যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে সুন্দরবন পর্যন্ত। সুন্দরবনের কাছে নদীর প্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লবনাক্ততা বেড়েছে আর তাতে ক্রমাগত ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে পানিনির্ভর বনের জীবন। ফারাক্কার বিষক্রিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশেপাশেও পড়ছে। একদিকে পানিশূন্যতা অন্যদিকে অসময়ের বন্যা এবং অতিরিক্ত পলি। সম্প্রতি বিহারের মানুষ শাবল নিয়ে মিছিল করেছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেবার দাবিতে।  বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও এই বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাও ভারতের বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীকে থামাতে পারেনি। তাছাড়া ভারতের শাসকদের চিন্তা পদ্ধতিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার বিষয় একেবারেই অনুপস্থিত। মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের প্রস্তুতি পুরোটাই চলেছে একতরফাভাবে। এখনও এর হুমকি চলে যায়নি। এই বাঁধ বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ নদী মেঘনার জন্য যে বড় হুমকি হবে তা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন।

ম্যাপ দেখলে দেখা যায় ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর বিভিন্ন স্থানে কাঁটার মতো সব বাঁধ। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ভাটির দেশকে না জানিয়ে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। গ্রীষ্মে তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল অঞ্চল পানির অভাবে খা খা করে। তিস্তা নদীর প্রবাহ এখন শতকরা ১০ ভাগে নেমে এসেছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা ছাড়াও মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরে কোদলা নদীর উপর বাঁধ, খোয়াই নদীর উপর চাকমা ঘাট বাঁধ, বাংলাবন্ধে মহানন্দা নদীর উপর বাঁধ, গোমতি নদীর উপর মহারানি বাঁধ এবং মুহুরি নদীর উপর কলসী বাঁধসহ আরও ১৫/২০টি অস্থায়ী কাঁচা বাঁধ কার্যকর রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। ভারত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্প অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি ১৪টি নতুন খননকৃত খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে প্রবাহিত করা হবে। এটি কার্যকর হলে অন্যান্য নদীর সাথে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ নদী যমুনা আক্রান্ত হবে। শুকিয়ে যাবে অধিকাংশ নদী উপনদী।

দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের নদনদী খাল অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পানি প্রবাহের উপর ৫০ দশক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ এসেছে ‘উন্নয়ন’ নামক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে।[5]  এই প্রকল্পগুলি করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার ঋণের টাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বাঁধসহ নির্মাণমুখি কর্মসূচি হিসেবে। দেখা গেছে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও একপর্যায়ে গিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয়নি, সেচসুবিধা কাজ করেনি এবং সর্বোপরি মূল লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন বা নির্মাণ কাজ প্রধানত বিদেশি ঋণের টাকায় হয়। ফলাফল যাই হোক, ঋণদাতা, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, আমলা এবং ভুমিদস্যুদের লাভ অনেক। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শুধু একটি দৃষ্টান্ত দেই।

বড়াল নদী বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী পদ্মা এবং যমুনার সংযোগ নদী।  দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার, ১২০ মিটার প্রস্থ, এর অববাহিকা ৭৭২ বর্গকিলোমিটার। এর সাথেই চলনবিল। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এই নদীর মুখে স্লুইস গেট, ক্রসড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, নৌপথ সম্পসারণ লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম তিনবছর উৎপাদন ভালোই দেখা যায়। এরপরে শুরু হয় বিপর্যয়। ফারাক্কার কারণে এমনিতেই পদ্মা নদীর প্রবাহ কম ছিলো, উপরন্তু বরাল নদীর মুখে স্লুইস গেট বসানোতে পদ্মা থেকে আসা পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। স্রোত কমে যায়, বহু জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়। যমুনায় যেখানে গিয়ে বড়াল গিয়ে মেশে সেখানে পানিপ্রবাহ খুবই নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় যমুনা নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভাঙ্গন বিস্তৃত হয়। অববাহিকার প্রায় ১ কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বড়াল শুকিয়ে যে জমি উঠেছে তা এখন নানাজনের দখলে।[6]

তৃতীয়ত, বিভিন্ন নদীর মরণদশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা সহজ। নদী বাঁচলে তার মূল্য/টাকার অংকে পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু মরলে তার থেকে উঠে আসা জমির দাম শত/হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সেজন্যই নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতে অনেকেই আগ্রহী। খোদ রাজধানীতে বুড়িগঙ্গা, পাশে তুরাগ, বালু নদীর পাশ দিয়ে যাবার সময় এই দৃশ্য আমাদের সবাইকে  জানিয়ে দেয় এই দেশে সরকারের কাজ শুধু দখলদারদের সমর্থন দেয়া, জনপ্রতিরোধের মুখে তাকে রক্ষা করা, নদীদূষণের মাধ্যমে দখলদারদের পথ প্রশস্ত করা।

শুধু নদী বা খালবিল নয়, অপরিকল্পিত প্রকল্প ও দুর্নীতিযুক্ত উন্নয়ন তৎপরতায় ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে। ২০০৬ ও ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এই সময়ে আশংকাজনক ভাবে নীচে নেমে গেছে। ঢাকার বেশ কয়েকটি নদীতে অক্সিজেন নেই।[7]  সরকারের কেন্দ্রে নদী বিষাক্ত হলে বা লেক দখল হয়ে গেলেও কোনো প্রতিকার দেখা যায় না। কারণ দখলদাররা ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্কিত।[8]

এতোসব বিপর্যয় বাংলাদেশের শাসকদের বা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করেনি। আগের প্রকল্পগুলোর ফলাফল নিয়ে কোনো যথাযথ পর্যালোচনাও নেই। বরং আশি দশকে সমালোচিত ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান এখন আরও বৃহত্তর আকারে বিপুল ব্যয়বহুল ডেল্টা প্ল্যান নামে সরকার গ্রহণ করেছে।

বন, সুন্দরবনের কথা

‘বঙ্গের দক্ষিণে সাগরকূ’লে যদি বিশাল অরণ্য না থাকিত, তাহা হইলে বঙ্গোপসাগরের মেঘসমূহ উত্তর মুখে দূরে চলিয়া গিয়া হিমালয়ের উপত্যকায় বারিবর্ষণ করিত; তখন দক্ষিণ বঙ্গ বালুকা প্রান্তরে পরিণত হইয়া একপ্রকার মানুষের বাসের অযোগ্য হইয়া পড়িত। এখন যেমন ভাটিরাজ্যের উত্তর হইতে দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইতে লাগিলে, প্রথমে পদ্মার প্রবল প্রবাহ, পরে নদীমাতৃক উচ্চদেশে মানুষের বসতি, তাহার পরে মানুষের খাদ্যের জন্য নিম্নতল উর্বর ক্ষেত্রে ধানের প্রাচুর্য এবং সর্বশেষে দুর্ভেদ্য প্রাকারের মত সুন্দরবনের এই নিবিড় জঙ্গলশ্রেণী- এমন দৃশ্য আর দেখা যাইত না। জঙ্গলের জন্য আরও অনেক বিপদ হইতে দেশ রক্ষা হইতেছে। সমুদ্রের জলোচ্ছাস একান্ত প্রবল হইলেও সম্পূর্ণভাবে দেশ ভাসাইতে পারে না; সমুদ্রের ঝটিকাবর্ত বা বায়ুপ্রবাহ বসতিস্থানসমূহ উৎখাত করিতে পারে না।’ [9]

সাধারণভাবে একটি দেশের প্রতিবেশগত ভারসাম্যের জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ভূমি বনে আচ্ছাদিত থাকা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ৭ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।[10]     বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যান-এ বলা হয়েছে, ‘সমতলের শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ প্রাকৃতিক শালবন এবং পার্বত্যাঞ্চলের শতকরা মাত্র ১১ ভাগ বন এখনও টিকে আছে আর সেগুলোর অবস্থাও খুবই খারাপ।’ [11]

বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকেই জানা গেছে, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি বন উজাড় হয়েছে উচ্চপ্রবৃদ্ধির এই এক দশকেই।..শুধু গাজীপুরেই এক দশকে ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ বনাঞ্চল।’  মন্ত্রণালয়ের ওই তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ‘১৯৩০-৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখন্ডে বার্ষিক বন উজাড়ের হার ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। ১৯৭৫-৮৫ সাল পর্যন্ত বন উজাড় হয় বার্ষিক দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে। ১৯৮৫-৯৫ সালে এ হার খানিকটা কমে দাঁড়ায় দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর থেকে বন উজাড়ের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বন উজাড়ের নিট হার ছিল দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বন উজাড় হয়েছে। এত বেশি হারে বন উজাড়ের ঘটনা এর আগে কোনো দশকেই ঘটেনি।[12]

‘উন্নয়ন’ নামে পুঁজি সংবর্ধনের উন্মাদনার সর্বশেষ শিকার সুন্দরবন, যাকে বলা যায় বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রাকৃতিক বন। এই সুন্দরবনের মোহনায় যত প্রজাতির মাছ আবিষ্কার করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে ইউরোপে তত প্রজাতির মাছ নেই। সুন্দরবনের যে বৃক্ষ এবং লতাগুল্ম, যে জীববৈচিত্র্য তৈরি করেছে সেটাও বিশ্বের গবেষকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের মানুষ ও সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সুন্দরবন বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্ট নানাবিধ প্রকৃতি বিধ্বংসী মুনাফামুখী তৎপরতার কারণে সুন্দরবন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সুন্দরবন এখনো প্রকৃতি-প্রাচীর হিসেবে রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। সুন্দরবনে বছর দশেক আগে সিডর যে আঘাত হেনেছে তাকে মোকাবিলা করে সুন্দরবন আবার নিজেকে নতুনভাবে পুনরুৎপাদন করেছে অন্তর্গত শক্তির বলেই।

প্রকৃতির মধ্য থেকে সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা সুন্দরবনের পক্ষে যে সম্ভব সেটা যেমন বারবার প্রমাণিত হয়েছে তেমনি এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের মুনাফা  লোভ সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা তার পক্ষে খুবই কঠিন।  মুনাফামুখী তৎপরতায় সেখানকার পানি লবণাক্ত হয়েছে, লবণাক্ত পানি সেখানকার প্রাণবৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের মধ্যেকার ভারসাম্য বিপন্ন হয়েছে। যে ফুলবাড়ী প্রকল্প উত্তরবঙ্গের পানি আবাদী জমি এবং মানুষ এমন কি দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবনের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছিল, শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটি দিয়ে দেশের কয়লা বিদেশে পাচারের এই প্রকল্পকেই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বলে ঢোল পেটানো হয়েছিলো। জনপ্রতিরোধে তা কার্যকর হয়নি। পরে এসেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ তিন শতাধিক বাণিজ্যিক প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার যৌথভাবে কার্যত সুন্দরবনের মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করেছে।

লবণ ও মিষ্টি পানির সমন্বিত প্রবাহে, ভূমি ও নদীর সম্মিলিত যোগে সুন্দরবন এক বিশেষ বাস্তুসংস্থান যা বিশ্বে বিরল এবং সেই কারণে প্রাণবৈচিত্রে তার সমাহার অনেক বেশি। পরিবেশদূষণ হ্রাসেও তার ক্ষমতা অনেক। একদিকে তা খুব নাজুক উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে, আবার তা প্রবল শক্তিধর প্রকৃতির দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ক্ষমতার কারণে। সেজন্যই বাংলাদেশের সুন্দরবন শুধু এদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক অতুলনীয় সম্পদ। যেহেতু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট এবং বিশ্ব ঐতিহ্য এই সুন্দরবন এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর  হিসেবে কাজ করে সেকারণেই উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ এই সুন্দরবনের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। আমরা সবাই জানি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম বিপদগ্রস্ত দেশ। এই বিপদের মোকাবেলায়ও আমাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন এই সুন্দরবন। তাছাড়া ৩৫-৪০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল। এগুলো বিনষ্ট হলে তাদের উদ্বাস্তু হওয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। আমাদের হিসাবে প্রতিদিনই ঢাকা শহরে ‘উন্নয়ন’-দুর্যোগে বা পরিবেশ উদ্বাস্তু হিসেবে মানুষের ভীড় বাড়ছে। তাঁদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে যদি সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।

সবার জানাকথা আমরা বারবারই বলি যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নাই। সুঁই থেকে রকেট, গণভবন থেকে তাজমহল সবই আমরা বানাতে পারবো, কিন্তু সুন্দরবন আর বানাতে পারবো না। সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প দিয়ে কিছু গোষ্ঠী দ্রুত মুনাফা বানাতে পারবে, বনবিনাশ করে জমি দখল করে টাকার জোয়ার তৈরি করতে পারবে, তাতে জিডিপিও বাড়বে কিন্তু বাংলাদেশ শিকার হবে চিরস্থায়ী বিপর্যয়ের। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]বাংলাদেশের মতো দেশে‘উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নী সংস্থা ও লুম্পেন কনসালট্যান্টদের আগ্রহ বরাবরই বেশি। কেননা এখানে বাছবিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার কোনো দরকার হয় না। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক জালসহ এসব বিষয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী লেখার জন্য দেখুন: Salim Rashid: Rotting from the Head, Donors and LDC Corruption, UPL, Dhaka, 2004.

[2]বনবিনাশ ও সামাজিক বনায়নের বিবরণী ও বিশ্লেষণের জন্য দেখুন- ফিলিপ গাইন (সম্পাদিত): বন, বনবিনাশ ও বনবাসীর জীবন সংগ্রাম, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)। ঢাকা, ২০০৪

[3]দেখুন: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: অধিকতর উন্নযনের আগমনধ্বনি’, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র, শ্রাবণ, ২০০০।

[4]বাংণাদেশের নদী ও পানিসম্পদ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য M Inamul Haque: Water Resources, Anushilon, Dhaka 2008.  মাহবুব সিদ্দিকী: গঙ্গা পদ্মা পদ্মাবতী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৪।

 

[5]বাংলাদেশে নদী বিষয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমস্যা ও বিকল্প নিয়ে বিশ্লেষণের জন্য দেখুন Nazrul Islam: Let the Delta be a Delta, Eastern Academic, Dhaka, 2016

[6]বড়াল নদীর দুর্দশার কারণ ও বরাল উদ্ধার চেষ্টার কাহিনীর জন্য পড়ুন- নথিবদ্ধ বড়াল-তথ্য তত্ত্ব ও সম্ভাবনা, রিভারাইন পিপল ও বড়াল রক্ষা আন্দোলন,  শ্রাবণ, ২০১১।

[7]প্রথম আলো ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

[8]প্রথম আলো, ‘২২ একর লেক দখল, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

 

[9]সতীশচন্দ্র মিত্র: যশোহর খুলনার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, দেজ, কলকাতা, পৃ. ২৫৩

 

[10]বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে প্রদত্ত বক্তব্য:  https://www.dhakatribune.com/bangladesh/environment/2018/03/23/experts-bangladeshs-forest-coverage-10

[11]Bangladesh Forest Department: Bangladesh Forestry Master Plan 2017-2036 (Draft Final) December 2016

[12]উদ্ধৃতি: ‘উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনের ক্ষত বাড়াচ্ছে’, বণিকবার্তা, নভেম্বর ৪, ২০১৭।

 

বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

জমো  সানদারাম ও আনিস চৌধুরী ::

আয় ও সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ – উভয় ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই বেড়েছে। বিশ শতকজুড়েই, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মোটা দাগে বৈষম্য ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, এতো ব্যাপক বৈষম্য  মানব ইতিহাসে আর কোনো কালেই ছিল না।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ দখল করে আছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক মাত্র ১২ ভাগ আয়ের অধিকারী। ইউরোপে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ পেয়েছে ১৮ ভাগ, নিচের অর্ধেক পেয়েছে ১৪ ভাগ।

অক্সাফামের ‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৮২ ভাগ চলে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের হাতে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব যারা অর্ধেকে রয়েছে তারা প্রায় ৩.৭ ভাগ মানুষ বলতে গেলে কিছুই পায়নি। ইতিহাসে ২০১৬ সালেই সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি দুদিনে একজন করে বিলিওনিয়ার সৃষ্টি হয় ওই বছরে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বাড়ে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, বৈষম্য বৃদ্ধি যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা ও সমাধান করা না হলে এটি নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

‘দি গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্র্যাসি ২০১৭ : এক্সপ্লোরিং ডেমোক্র্যাসিস রেসিলেন্স’ ধারণা করছে, বৈষম্য গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। বৈষম্যের ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, সামাজিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত করছে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও সমর্থন ধসিয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অগ্রগতির পথে বাধা :

আলেক্সি ডি টকভিল বিশ্বাস করেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে, সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণ সমাজে আয় ও সম্পদের মারাত্মক বিভেদের ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি উন্নতিতে তেমন কিছু করা না হয় বা অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক সাম্যের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ ধনীরা অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব রাখে ও কবস্তার করে,  গরিবরা এই ধরনের সুযোগ পায় না।

আর অমর্ত্য সেনের মতে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গরিবের ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ বা ‘সামর্থ্য’ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। যাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকে, তারা কেবল ইতিবাচক পুনঃবণ্টনেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, সেইসাথে তাদের নিজেদের অনুকূলে বিধিবিধান ও নীতি প্রণয়ন করে নেয়।

রবার্ট পুটনামের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আস্থার’ মতো নাগরিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

যোশেফ স্টিগলিসের মতে, বৈষম্য বাড়লে সামাজিক কাঠামো এবং সংযোগ শিথিল করে দেয়। সবক্ষেত্রে আস্থা হ্রাস, উদাসীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ প্রশ্নে আগ্রহের অভাব ও স্বভাব রুক্ষতা-কটুতা বাড়ায়। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ায়, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়ও নি:শেষ করে, সমাজবিরোধী আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অর্থপূর্ণ গণতন্ত্রের প্রয়োজন সামাজিক বিষয়াদিতে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তভুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মেরুকরণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ফাঁপা করে তোলে, নাগরিক সম্পৃক্ততা হ্রাস করে।

লোকরঞ্জকতা বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ হুমকি সৃষ্টি করে বহুত্ববাদকে। আলেক্সি ডি টকভিলের  কাছে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য গণতন্ত্রের ‘সাম্য’ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে, এমনকি উচ্চ আয়ের সমাজেও তা হতে পারে। ‘ধনবাদী লোকরঞ্জকবাদ বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বশেষ পরিচিতি রাজনীতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে।

জনসমাবেশ আর মিডিয়া ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য ‘অন্যদের’ তথা অভিবাসী ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন লোকদের দায়ী করে। অর্থাৎ ধনিকশ্রেণি  সুযোগ-সুবিধা ও ‘বিভক্ত করে শাসন করার’ চলতি পদ্ধতির ‘অধিকার’ ব্যবহার করে ‘তাদের জনগণকে’ সন্তুষ্ট রাখতে সফল হয় প্রায়ই।

মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে তারা প্রায়ই ধনিকতন্ত্র শাসনকে আড়াল করে রাখে, এমনকি সবচেয়ে জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে অনেক সময় সাফাইয়ের ব্যবস্থাও করে। যেমন নির্বাহী পদে থাকাদের ‘উচ্চ পারিতোষক’, টাইকুনদের উদারভাবে কর হ্রাস, বিনিয়োগ ইনসেনটিভ। আর এসবই করা হয় সামাজিক ব্যয় ও গণপরিষেবার ব্যয় ছাঁটাই করে।

বর্তমানের ‘বিজয়ী সবই নেবে’ বা “winner – take -all” এর মাধ্যমে  অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সফলভাবে লবি করে কর হার কম রাখতে সক্ষম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় থেকে এক শতাংশের হাতেই সর্বোচ্চ মাত্রায় আয় পঞ্জিভূত হচ্ছে।  আর ১৯৮০ সাল থেকে তলানিতে থাকা অর্ধেক আমেরিকান মোট প্রবৃদ্ধির মাত্র ৩ ভাগ অর্জন করতে পারছে। আধুনিক সময়ে এত ব্যবধান আর কখনো দেখা যায়নি।

অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে শীর্ষে থাকা ০.০১ ভাগ তথা ১৪ হাজার আমেরিকান পরিবার মার্কিন সম্পদের ২২.৩ ভাগের মালিক ছিল। আর নিচে থাকা ৯০ ভাগ তথা ১৩৩ মিলিয়ন পরিমার মাত্র ৪ ভাগের মালিকছিল। সবচেয়ে ধনী ১ ভাগ এক প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন আয়ে তাদের অংশ তিনগুণ করতে সক্ষম হয়।

একদিকে আইনগত ও অন্যান্য সংস্কার, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সবই ক্ষমতা বা প্রভাববঞ্চিতদের ভয়াবহ বিপরীত অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্প-আয়ের আমেরিকান পরিবারগুলোর ৭০ ভাগের বেশি আগের বছরের তুলনায়  ফৌজদারি মামলায় বেশী জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের ৮০ ভাগের বেশি পরিবার আইনগত সুবিধাও তেমন পাচ্ছে না।

তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়ায় তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়া ও বাদ পড়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেক আমেরিকান মোহমুক্তি ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে এই তারাই আবার ‘অন্য’ তথা আমদানি ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উগ্র দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতিতে অনেক বেশি সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।

নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়ারা

আনু মুহাম্মদ ::

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর পৃথিবীর বহুদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। বছরে বছরে এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চতাই বেড়েছে কেবল। এবারের নির্বাচন নিয়েও তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে নজরদারি, পরিবেশবিধ্বংসী প্রান্তস্থ পুঁজিবাদের বিকাশকালে জনগণের জীবন ও অধিকারের সীমা কেমন হতে পারে, উন্নয়নের নামে মুনাফা ও দখলদারিত্ব বিস্তার কী চেহারা নিতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ নির্বাচন তো বটেই, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। নির্বাচনের প্রতি ক্ষমতাবানদের অনীহা ও ভয় প্রকাশিত হচ্ছে বহুভাবে। এমনকি সামরিক শাসন থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাতেও শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বাচন-সন্ত্রস্ত চেহারা প্রকাশিত।

নির্বাচন বিষয়টি কী রকম পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তার একটি প্রমাণ নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ ও বাস্তব চেহারা। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুনে বড় দলের প্রার্থীরাসহ সবাই হাসে। সবাই জানে যে, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী তাদের বড় অংশ এই আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছে। এর একশ’গুণ খরচও অনেকের কাছে অপ্রতুল মনে হতে পারে। বড় দলের প্রার্থীদের টাকার কোনো অভাব নেই। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্য খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও কম ব্যয়বহুল নয়। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা একটা বিরাট সাধনা ও ধরাধরি শুধু নয়, অনেক টাকারও বিষয়। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক-শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এই অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’ ভদ্রভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহুগুণে ফেরত নিয়ে আসাই এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে, তার কারণগুলোর সারসংক্ষেপ করা যায় নিম্নরূপে:

প্রথমত, দুর্নীতি, লণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথ এর সুবিধাভোগীদের কখনও সুস্থির হতে দেয়নি। একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও  উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সাংসদদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ”এক নেতা এক দল’ নীতি” কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্বসংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে। এখন তার সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ভারত রাষ্ট্র ও সে দেশে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ পুঁজি। ১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী, ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর, বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত ‘নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতাবন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। ‘ক্রসফায়ারে’র মতো পদ্ধতি এই তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে এসব বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চতুর্থত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরও বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সবকিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত যা ‘সেবা খাত’ নামে পরিচিত, তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশন নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বাড়ছে, আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ও পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য; শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব।

পঞ্চমত, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, তত রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুই ধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে।

ষষ্ঠত, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপ-সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী। দেশের নীতিনির্ধারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল, তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবেন কোত্থেকে? শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে?

এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে না; একমাত্র তখনই নির্বাচন প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা। গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-২ : ধনিক শ্রেণী গঠন : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

আনু মুহাম্মদ ::

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে (ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮) ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছে অর্থাৎ বিশ্বে ধনিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ধনী ব্যক্তি বলতে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের বোঝানো হয়েছে।[1]

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশ প্রক্রিয়ায় ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই গঠনের প্রথম পর্বে ছিলো লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানী, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সাথে যোগ হয় ব্যাংক ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপীও বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা ও সরকারি ক্ষমতার মধ্যে যোগাযোগ ও চুক্তির নতুন বিন্যাস ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণীর উপস্থিতি যতো স্পষ্ট হতে থাকে ততো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় যাবার হার বাড়তে থাকে, আবার এই হস্তান্তরে ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ৮০ দশকের শুরুতেই ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক এর যাত্রা শুরু হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ খেলাপীদেরই নতুন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে। দেখা যায়, একজন যতো পরিমাণ ঋণ খেলাফী তার একাংশ দিয়েই তারা নতুন ব্যাংক খুলে বসে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে নামে বেনামে ঋণ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, লেনদেন ব্যবস্থা সম্পদ কেন্দ্রীভবনের একটি কার্যকর পথ হিসেবে দাঁড়াতে থাকে।

বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝাতে আমি ৮০ দশকের শুরুতে ‘লুম্পেন কোটিপতি’ পদ ব্যবহার করি। লুম্পেন কোটিপতি বলতে আমি বুঝিয়েছি এমন একটি শ্রেণী যারা নিজেদের বিত্ত অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল পথের চাইতে দ্রুত মুনাফা অর্জনে অন্যান্য সহজ ও চোরাই পথ গ্রহণে বেশি আগ্রহী থাকে, এগুলোর মধ্যে চোরাচালানি, মাদক ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ লোপাট, জবরদখল, জালিয়াতি ইত্যাদি অন্যতম। এরজন্য সব অপরাধের পথ তারা গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়।[2]

বাংলাদেশে ৮০ দশক ছিলো নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি সংহত করবার জন্য খুবই সুবর্ণ-সময়। একদিকে তখন বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র অধীনে সংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও থিংকট্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার মূল পথপ্রদর্শক ছিলো বরাবরই। বর্তমান বাংলাদেশেও তাদের মতাদর্শই উন্নয়ন পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করছে।[3]

যাইহোক, ৮০ দশক থেকেই  ক্ষমতাবানদের সাথে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিরা রাতারাতি তখন অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়, এরজন্য তাদের উদারভাবে ব্যাংক ঋণও দেওয়া হয়। [4] এটা সম্ভব হয় ক্ষমতার সাথে একটা অংশীদারীত্বের চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করবার কারণে। রাষ্ট্র-ব্যবসা-ধর্ম-লুন্ঠনের এরকম প্যাকেজ বাংলাদেশে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। দুর্নীতি-লুন্ঠন-ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যে ভিত্তি তখন নির্মিত হয় তা দিনে দিনে আরও শক্ত হয়েছে। কেননা সেইসময় বিন্যস্ত শাসন-দুর্নীতির পথেই পরবর্তী সরকারগুলোও অগ্রসর হয়েছে। তাই একদিকে দুর্নীতির শত হাতপা বিস্তার এবং অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতায় কেন্দ্রীভবন দুটোই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সেই হিসেবে ৮০ দশকের দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী শাসককে পরবর্তী শাসকদের গুরু হিসেবে উল্লেখ করা চলে। পরবর্তী সময়ের শাসকেরা বহুভাবে তাঁকে অনুসরণ করে লুন্ঠন দুর্নীতি ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের ক্ষেত্রে পরিমাণগত দিক থেকে ধাপে ধাপে বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

গত এক দশকে আমরা প্রবেশ করেছি পুঁজি সংবর্ধনের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংক ঋণের মধ্যে সম্পদ লুন্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্খা এবং সুযোগ দুটোই এখন অনেক বেশি। তাই পুরো ব্যাংক, ভবন, সেতু, সড়ক খেয়ে ফেলাই এখনকার সফল প্রজেক্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তার বাইরে নয়। শেয়ার বাজারও একটি লোভনীয় ক্ষেত্র। এটা প্রমাণিত যে, প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় সমর্থন বা অংশীদারীত্ব ছাড়া কোনো বড় দুর্নীতি ঘটতে বা তা বিচারের উর্ধ্বে থাকতে পারে না। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধ্বস হয়েছে। এর পেছনে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছিলো খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ফরাসউদ্দীন। কিন্তু দুটো তদন্ত কমিটির ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে অভিন্ন। পুরো রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়নি। মূল দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তারা ক্ষমতার ছড়ি নিয়ে আরও নতুন নতুন অপরাধের কাহিনী তৈরি করছেন।

শুধু ব্যাংক বা শেয়ার বাজার নয়, সর্বজনের (পাবলিক) সব সম্পদই এখন অসীম ক্ষুধায় কাতর এই শ্রেণীর লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি-নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা অনিয়মের রাস্তা তৈরিসহ পুরো দেশই এখন ভোগ্যবস্তু। আগেই বলেছি, পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিলো নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা  বা অংশীদারীত্বের ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশি-বিদেশি কর্পোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সাথে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়। উচ্ছিষ্টভোজী সমর্থক হিসেবে এমবেডেড বুদ্ধিজীবীর আয়তন বিস্তৃত হয়েছে গত এক দশকে। লুম্পেন শ্রেণীর সকল অংশের একটি বৈশিষ্ট অভিন্ন: এই দেশে সম্পদ আত্মসাৎ আর অন্য দেশে ভবিষ্যৎ তৈরি। সুতরাং শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, নদী, বায়ু, পরিবেশ বিপর্যস্ত করে এই দেশকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এই শ্রেণী যেভাবে সংহত হয়েছে তার সাথে রাজনীতির নির্দিষ্ট ধরনের বিকাশও সম্পর্কিত। নানা চোরাই পথে কোটি-কোটিপতি হবার চেষ্টা যারা করে তাদের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও অর্থবরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিদ্যাচর্চা-সংস্কৃতিচর্চা বিপদজনক। তাই এই গোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতা কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা, যাদের সাথে সহজেই সমঝোতা, অংশীদারীত্ব, চুক্তি করা সম্ভব। তাদের অংশীদার বানিয়ে তরতর করে বিত্তের সিঁড়ি অতিক্রম করা সহজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যতো অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক হবে ততো তাদের সুবিধা। তাদের জন্য তাই একই সাথে দরকার একটি নিপীড়ন মূলক শাসন ব্যবস্থা, স্বৈরতন্ত্রী আবহাওয়া যেখানে ভিন্নমত ও স্বাধীন চর্চার ওপর চড়াও হবার জন্য নানা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বা বিচার ব্যবস্থার আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

যেসব খাত এগিয়ে :

সরকার যেসব বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, নিচ্ছে তার আকার ও বরাদ্দ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দের কোন উর্ধ্বসীমা নেই, এর যৌক্তিক বিন্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা নেই, যৌক্তিকতা বিচারের কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও আর কার্যকর নেই। তার ফলে এগুলোর ব্যয় অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ২/৩ গুণ এমনকি ১০ গুণ বেশি হলেও তার জবাবদিহিতার কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং সরকারি অনুমোদন নিয়েই এগুলোর ব্যয় শনৈ শনৈ বেড়ে যাচ্ছে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সড়ক মহাসড়ক ফ্লাইওভার রেলপথ সেতু সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোনোদেশেই এতো ব্যয় হয় না।[5] এর পেছনে উর্ধ্বমুখি কমিশন এবং ঋণদাতা সংস্থা বা সরকার প্রভাবিত ঠিকাদার নিয়োগ অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়। গত ৬ বছরে এই অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধিতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন নির্মাণখাত সবচাইতে বর্ধনশীল। ইটভাটা অসংখ্য, বৈধ যত তার চাইতে অবৈধ সংখ্যা বেশি। সিমেন্ট কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শীতলক্ষাসহ বিভিন্ন নদীর বাতাসে পানিতে এর প্রবল ছোঁয়া পাওযা যায়। দূষণরোধের কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না। রডের উৎপাদন বেড়েছে। নিয়ম মেনে বা না মেনে বালু তোলার পরিমাণ বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। ফার্নিচারের ব্যবসাও বেড়েছে। এরজন্য বনের গাছের ব্যবসা ভালো। দেশে নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করায় প্রশাসন বরাবর সক্রিয় সহযোগী।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ বিনাশ ক্ষেত্রে অগ্রণী। দায়মুক্তি আইন এক্ষেত্রে অন্যতম রক্ষাকবচ। সরকার দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়মনীতি অমান্য করে দেশি বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চমূল্যে কাজ দিচ্ছে, আইনের  হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০১০ সাল থেকে সরকার চলছে ‘দায়মুক্তি আইন’ ঢাল দিয়ে, নানা সুবিধা ছাড়াও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় থেকে বাঁচানোর জন্য দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে রাশিয়ান ও ভারতীয়সহ বিদেশি কোম্পানিকেও (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রষ্টব্য)। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশি-বিদেশি কোম্পানির উচ্চলাভ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজি নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। বন, জমি, উপকূলবিনাশ, অধিক ঋণ ও বিদেশ নির্ভরতা এবং ব্যয়বহুল এই পথ নেয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদার কথা। কিন্তু যখন পরিবেশবান্ধব, সুলভ এবং টেকসই বিকল্প পথ দেখানো হচ্ছে তখন সরকার সেদিকে যাচ্ছে না কারণ সেই পথ দেশ ও জনগণের জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য হয়েও কর্পোরেট গোষ্টীর তাতে লাভ নেই, আমলা মন্ত্রীদের কমিশনের সুযোগ নেই।[6]

আরেকটি ক্ষেত্র সর্বজনের অর্থ দিয়ে বিশাল কেনাকাটা। যন্ত্রপাতি  কেনা হচ্ছে, কাজ নাই; বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই সেগুলো হাওয়া; ডেমু ট্রেন কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই তার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হচ্ছে; সিসিটিভি কেনা হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা নষ্ট; ঋণ করে সাবমেরিন সহ সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ করে শত শত বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই যেগুলো বিকল হচ্ছে;  কেনা হচ্ছে গাড়ি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার  মধ্যে গাড়ির মডেল পরিবর্তন করা, আরও বড় আরও দামি গাড়ি কেনার পথে প্রবল উৎসাহ। সর্বজনের অর্থ যে কোনোভাবে বরাদ্দে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নেই। কিন্তু এই অর্থ জোগাড়ে বাড়ছে মানুষের ওপরই চাপ। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, ভ্যাট বসছে সর্বত্র, খাজনা বাড়ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছুলোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হবার জায়গা। এর অন্যতম সুফলভোগী কতিপয় শিক্ষকও। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং আর টিউশনি নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন বিষময়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার কারণে গাইড বই, কোচিং এর বাণিজ্যের পথ খুলেছে। চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তাই একদিকে জৌলুস বাড়ছে অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নীচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম।[7]  ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লক্ষ শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার বহু প্রতিষ্ঠানের অনাহারী শিক্ষকেরা বারবার ঢাকা আসেন কিন্তু তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ হয়না। তাঁরা অনশনও করেছেন বহুবার। নন এমপিও এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন টিচারস এ্যান্ড এমপ্লয়ীজ  ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ  বলেছেন, ‘২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দাবি নিয়ে আমরা ২৮ বার ঢাকা শহরে এসেছি।[8]’  কোনো কাজ হয়নি।

উন্নয়নের ধরনে যদি দুর্নীতি অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা হীনতা, দখল, দূষণ থাকে অর্থাৎ যদি উন্নয়ন প্রকল্প অতি উচ্চ মাত্রায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি/বিপর্যয়ের কারণ হয় তাহলে তা কুশাসন অবধারিত করে তোলে। ব্যবসা- লবিষ্ট- রাজনীতিবিদ- প্রশাসনের দুষ্ট আঁতাত আরো অনেক অপরাধ-সহিংসতাকেও ডাকে। বলপূর্বক টেন্ডার দখল, জমি-ব্যবসা দখল করতে গিয়ে খুন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সহযোগিতা গুম, আটক বাণিজ্য, দরকষাকষি এগুলোও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায়। প্রশাসন আর দল একাকার হয়ে গেলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের বল্গাহীন প্রতিযোগিতা চলবেই। বাড়তেই থাকবে ধর্ষণ, নারী-শিশু- সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, ক্রসফায়ার, হেফাজতে নির্যাতন, এবং সরকারি দলে বিভিন্ন গোষ্ঠী হানাহানি। এসব কিছু মিলিয়েই পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির জৌলুস বাড়তে থাকে প্রাণ প্রকৃতির বিনাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা-অপমান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]https://www.wealthmanagement.com/sites/wealthmanagement.com/files/wealth-x-wealth-report.pdf

[2]পুঁজিপতি শ্রেণীর উৎপাদন বিচ্ছিন্ন-লুটেরা- ধরন বোঝাতে ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ প্রথম ব্যবহার করেন একজন অষ্ট্রিয়ান  লেখক, ১৯২৬ সালে। প্রথম ইংরেজী ভাষায় এর ব্যবহার করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত পলিটিক্যাল ইকনমি অব গ্রোথ গ্রন্থে। পরে এ শব্দবন্ধ বিশেষ পরিচিতি পায়  জার্মান-মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী  আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাংক এর (১৯৭২) লুম্পেন বুর্জোয়া লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট গ্রন্থের মাধ্যমে। তিনি এই গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থ প্রান্তস্থ দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ আলোচনায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন এমন একটি শ্রেণীর বিকাশ যারা সা¤্রাজ্যবাদের সাথে ঝুলে থাকে, নিজস্ব অর্থনীতির উৎপাদনশীল বিকাশের বদলে তারা যে কোনো ভাবে অর্থবিত্ত অর্জনের পথ গ্রহণ করে, নিজেদের স্বার্থে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে।

 

[3] আমার বেশ কয়টি বইতে এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। কয়টির নাম এখানে উল্লেখ করছি- কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, বিশ্বায়নের বৈপরীত্য, উন্নয়ন বৈপরীত্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারত প্রশ্ন।

 

 

 

[4]কয়েকদশকে ব্যাংকঋণ লোপাট কাহিনী ও তার বিবর্তনের বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- কল্লোল মোস্তফা: সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১৮। এছাড়া ব্যাংকের খেলাফী ঋণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এখনও বিষয়টি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। দেখুন মইনুল …..

 

[5] এবিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার সূত্র ধরে বিভিন্ন রিপোর্ট দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলো, বণিকবার্তা ছাড়াও এসম্পর্কিত আরও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি:https://www.jamuna.tv/news/24438, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2016/05/31/364233, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/14/451818, https://www.thedailystar.net/frontpage/road-construction-cost-way-too-high-1423132

[6]এ বিষয়ে দ্রষ্টব্য তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বিকল্প মহাপরকিল্পনার খসড়া। দেখুন: https://drive.google.com/file/d/1hPjRITBhY9cizuxfMJ2eAwieaSXP_EtI/view

[7]গত এক দশকের উন্নয়ন বরাদ্দের ধরন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- মাহতাব উদ্দীন আহমদ: বাজেট এবং এক দশকের ‘উন্নয়ন চিত্র’, সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১

[8] নিউ এইজ, জুলাই ৫, ২০১৮

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-১

আনু মুহাম্মদ ::

 ‘মানুষ ছাড়া বন বাঁচে

বন ছাড়া মানুষ বাঁচে না।

মানুষ ছাড়া নদী বাঁচে

পানি ছাড়া মানুষ বাঁচে না।।’

তাই একটি দেশের বস্তুগত উন্নয়ন কতোটা মানুষের জন্য তা বুঝতে শুধু অর্থকড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি দেখলে হবে না।

তাকাতে হবে বন নদী পানিমানুষসহ সর্বপ্রাণের দিকে

 

পুঁজিবাদের বিকাশ ও উন্নয়নের পরিসংখ্যান :

সন্দেহ নেই, গত চারদশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে সকল ক্ষেত্রে। গত দুদশকে এর বিকাশ মাত্রা দ্রুততর হয়েছে। ধনিক শ্রেণীর আয়তন বেড়েছে। কয়েক হাজার কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে, স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের একটি স্তর তৈরি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটেছে। এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় দেশের সমাজ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্র এখন পুঁজির আওতায়, একইসাথে একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অঙ্গীভূত।

পুঁজিবাদের এই বিকাশ নিয়ে সরকারি উচ্ছ্বাস সীমাহীন। উন্নয়নে সরকার সার্থক বলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অর্থনীতিবিদদের মধ্যে স্তুতিগানের কমতি নেই। এই স্তুতি বন্দনায় বিশেষভাবে ৭০ দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বই-এর কথা টানা হয়, নাম – বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট [1]  এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জে . আর. পারকিনসন। এই গ্রন্থে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের দর্শন অনুযায়ী তাঁরা পুঁজিবাদ বিকাশের সম্ভাবনাই বিচার করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্যে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের এমনই অবস্থা যে, যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন হয় তাহলে বিশ্বের কোথাও উন্নয়ন কোনো সমস্যা হবে না। এই হতাশাব্যঞ্জক কথার সূত্র টেনে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক তুলনা করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু স্বাধীনতার পর বিপুল প্রত্যাশা আর তার বিপরীতে রাষ্ট্রের যাত্রা নিয়ে সেসময়ের অন্য আরও কিছু বই আছে যেগুলোর প্রসঙ্গ টানলে বিশ্লেষণ ভিন্ন হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই।[2]  যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষণ করি, যদি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনা করি, যদি স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে যে তিনটি লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিলো সেই সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা- বর্তমান উন্নয়ন ধারায় কতটা অর্জিত হয়েছে তার বিচার করি, তাহলে উচ্ছ্বাসের বদলে উন্নয়নের গতিধারা নিয়েই প্রশ্ন আসবে। যদি ধনিক শ্রেণীর আয়তন ও জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি কতো নদী বিনাশ হলো, কতো বন উজাড় হলো, বাতাস কতো দূষিত হলো, মানুষের জীবন কতো বিপন্ন হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা ও বৈষম্য কতোটা বাড়লো, শ্রেণী-লিঙ্গীয়-ধর্মীয়-জাতিগত বৈষম্য নিপীড়ন কী দাঁড়ালো তার হিসাব করি তাহলে  উন্নয়নের সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি এবং মাথাপিছু আয় এখন বার্ষিক ১৬শ’ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।[3]  গত ১০ বছরের গড় হিসাবে বিশ্বের সবচাইতে উচ্চহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে নাওরু, ইথিওপিয়া, তুর্কমেনিস্তান, কাতার, চীন এবং উজবেকিস্তানে। এক দশকের গড় হিসাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০। তবে ২০১৭ সালের প্রবৃদ্ধি হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। বাংলাদেশের চাইতে বেশি, সমান ও কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হার অর্জনকারী অন্যদেশগুলো হলো: ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, আইভরিকোস্ট ও সেনেগাল।[4]

ভারতে মাথাপিছু আয় ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার গত এক দশক ধরে বেশ ভালো দেখালেও তার পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে সেখানকার অর্থনীতিবিদরা অনেক প্রশ্ন তুলছেন, বিতর্ক হচ্ছে। ডাটা-র গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।[5]  ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের তথ্য উপাত্ত পরিসংখ্যান হিসাব নিকাশ প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ অনেক বেশি থাকলেও বাংলাদেশে এনিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই, কোনো বিতর্ক নেই। সরকারি ভাষ্যের সাথে মেলে না এরকম যুক্তি, তথ্য,  প্রশ্ন আর বিতর্ক সরকার পছন্দ করে না বলে প্রায় সকল অর্থনীতিবিদ, থিংক-ট্যাংক, মিডিয়াও বিনাপ্রশ্নে সব গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। যাইহোক, কতটা এবং কীভাবে তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের অবকাশ থাকলেও জাতীয় আয় নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।

কোনো দেশের অর্থনীতিকে জিডিপি/জিএনপি এবং মাথাপিছু আয় দিয়ে পরিমাপ করায় বিশ্বব্যাংক- আইএমএফ-ই প্রধান পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। এই পদ্ধতি সারা দুনিয়ার কর্পোরেট শাসকদের প্রিয়, কেননা এতে অনেক সত্য আড়াল করা যায়। বিশ্বব্যাংকই সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো হল: (১) নিম্ন আয়ভুক্ত দেশ (মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত)। (২) নিম্ন মধ্য আয়ভুক্ত দেশ (১ হাজার ২৬ মার্কিন ডলার থেকে ৪ হাজার ৩৫ ডলার); (৩) উচ্চ মধ্যম আয় (৪ হাজার ৩৬ মার্কিন ডলার থেকে ১২ হাজার ৪৭৫ ডলার)। (৩) উচ্চ আয়ভুক্ত দেশ (১২ হাজার ৪৭৬ মার্কিন ডলার থেকে বেশি )।

মাথাপিছু আয়সহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে জাতিসংঘেরও বিভাজন আছে। তাদের মাপকাঠি অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ গ্রুপের পরের ধাপ উন্নয়নশীল (developing)) দেশ; এই পর্বের দেশগুলোকে কম (less developed) বা অনুন্নত (underdeveloped)  দেশও বলা হয়। তাদের সর্বশেষ  তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের  ৪৭টি দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকায়। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আছে ১৩টি, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের মধ্যে একমাত্র হাইতি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এশিয়ার মধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ছিল আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও নেপাল। জাতিসংঘের বিবেচনায় সবচাইতে দরিদ্র এবং দুর্বল দেশগুলো নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ গঠন করা হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ এই তালিকাভুক্ত হয় ১৯৭৪-৭৫ সালে।

৪৭ বছর আগে এই গ্রুপ গঠন করবার পরে এর মধ্যে মাত্র ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে পুরোপুরি বের হতে পেরেছে। এগুলো হল বতসওয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ এবং সামোয়া। জাতিসংঘের কমিটি বলেছে, আগামী ৩ বছরে আরও দুটি দেশ ভানুয়াতু এবং এ্যাঙ্গোলা এই উত্তরণের তালিকায় আছে। নেপাল এবং তিমুরও শর্ত পূরণ করেছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের বিষয়টি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী সভায় বিবেচনার জন্য রাখা হয়েছে।

গত ১৫ মার্চ জাতিসংঘের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, লাওস এবং মিয়ানমার প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য শর্ত পূরণ হয়েছে। আরও কয় বছর দ্বিতীয় দফায় শর্ত পুরণ করতে পারলে চুড়ান্ত ভাবে এলডিসি তালিকা থেকে এ দেশগুলো বের হতে পারবে।[6]

একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও যে টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে, মাথাপিছু আয় বেশি হলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে এবিষয় স্পষ্ট করে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে নানাদেশে। অমর্ত্য সেন এবিষয় পরীক্ষা নিরীক্ষা নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। মাহবুবুল হকের সাথে ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ ধারণা প্রবর্তন করেছেন, যার ভিত্তিতে জাতিসংঘ এখন নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। জোসেফ স্টিগলিজসহ মূলধারার বহু অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে জিডিপি ব্যবহারের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।[7]

ভারতের ভেতরেই রাজ্য থেকে রাজ্য তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎ পাওয়া যায়। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, মধ্যম আয়ের বিবরণে তারা বাংলাদেশ থেকে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের প্রায় সমান, মানে তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। মিয়ানমারও একইসঙ্গে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাবার শর্তপূরণ করেছে। নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চাইতে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবেনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরও খারাপ। সেজন্য মানব উন্নয়ন সূচকে নাইজেরিয়া বাংলাদেশেরও পেছনে।

প্রকৃতপক্ষে জি ডি পি দিয়ে একটি দেশের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিতরণ, পরিষেবার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কারণ যেকোনো লেনদেন ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধিতেই জিডিপি বাড়ে। কিন্তু এরজন্য সামাজিক ও পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হলে তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সেকারণে এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ  মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না, অর্থনীতির গুণগত অগ্রগতিও বোঝা যায় না।

যেমন চোরাই অর্থনীতির তৎপরতাতেও জি ডি পি বাড়ে কিন্তু সমাজের বড় একটা অংশের জীবন জীবিকা তাতে বিপদগ্রস্ত হয়। নদীনালা, খালবিল, বন দখল ও ধ্বংসের মাধ্যমেও জি ডি পি বাড়তে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘ মেয়াদে  টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে না, বরং অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এসব তৎপরতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় না বরং জীবনমান বিপর্যস্ত হয়। দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও বড় দেখায়, জিডিপির অংকও বাড়ে। একইসময়ে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ কমে এসেছে তার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু এই ব্যয়বৃদ্ধি আবার জিডিপি বাড়ায়। অনিয়ন্ত্রিভাবে গৃহীত বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুন্ঠন ও পাচারও জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

দ্বিতীয়ত, যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয়ের হিসাব বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। একটি পরিবার যদি দশ লক্ষ টাকা আয় করে, পাশাপাশি অন্য একটি পরিবার যদি দশ হাজার টাকা আয় করে তাহলে উভয় পরিবারের গড় আয় হবে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এতে কি দুই পরিবারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়? বর্তমান মাথাপিছু আয় হিসাবে আমাদের দেশে চার সদস্যের পরিবারের বার্ষিক গড় আয় হয়  প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ মাসে প্রায় ৫৭ হাজার টাকা। তারমানে বাংলাদেশের সকল নাগরিক শিশু বৃদ্ধ নারীপুরুষ সকলেরই মাথাপিছু আয় মাসে এখন প্রায় ১৪ হাজার টাকা! অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন  মানুষের মাসিক আয় এর থেকে অনেক নিচে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় যত শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ পায় তার মাত্র ৩০ শতাংশ। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]Just Faaland, J.R. Parkinson: Bangladesh A Test Case of Development, S. chand, New Delhi, 1977.

[2]মো: আনিসুর রহমান: পথে যা পেয়েছি, ২য় পর্ব, অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০০৪। একই লেখকের Anisur Rahman: The Lost Moment, UPL,Dhaka, 1993. Ges Nurul Islam: Development Planning in Bangladesh, UPL, 1981. এছাড়া আরও দেখুন- – – Rehman Sobhan and  Muzaffar Ahmed: Public enterprise in an intermediate regime: a study in the political economy of Bangladesh. Bangladesh Institute of Development Studies,  1980.

[3] বাংলাদেশ সরকার: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮।

[4]https://www.gfmag.com/global-data/economic-data/countries-highest-gdp-growth-2017

[5]Amiya Kumar Bagchi:“What an Obsession with GDP Denotes”, Economic & Political Weekly EPW, September 1, 2018.

[6] একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে যে, ভুটান, কিরিবাতি সাওতোম এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ইতোমধ্যে সব শর্ত পূরণ করে অর্থাৎ জাতীয় আয় এবং শিক্ষা-চিকিৎসার শর্ত পূরণ করে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে বের হবার এবং উন্নয়নশীল দেশ কাতারে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের নাম এখন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) জাতিসংঘের ইকনমিক এ্যান্ড সোশাল কাউন্সিল এ পাঠাবে, সেখান থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গিয়ে তা চুড়ান্ত হবে।

[7]`দীপ্তি ভৌমিক: জিডিপি- উচ্ছ্বাস ও বাস্তবতা। সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।: : Debra Efroymson: Beyond Apologies: Defining and Achieving an Economics of Wellbeing, March 2015, Institute of Wellbeing, Dhaka.

বাংলাদেশের চাইতে ভুটানের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও বেশি। তারপরও ভুটান জিডিপির এই হিসাব পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর নাম মোট জাতীয় সুখ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। এতে সর্বমোট ৯টি ক্ষেত্র বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয় : মানসিক ভালো থাকা, সময়ের ব্যবহার, সম্প্রদায়, জীবনীশক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা, জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। এছাড়া এসসব ক্ষেত্রের সাথে মাথাপিছু আয় সহ ৩৩টি নির্দেশক আছে। অন্যান্য নির্দেশক হলো নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, সাক্ষরতা, বাস্তুতান্ত্রিক বিষয় এবং ঘুম এবং কাজে ব্যয়কৃত সময়।

 

তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা

বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ৮ লাখ ২২ হাজার ১৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা- যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার ২৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে এর বাইরে অবলোপন করা ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে আছে। এ ঋণ হিসাবে নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তিন মাস আগে এই ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। অবলোপন করা ঋণ মন্দ-ঋণ হওয়ায় নীতিমালা অনুযায়ী এসব ঋণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এ ছাড়া তথ্য গোপন করে বিপুল অঙ্কের খেলাপিযোগ্য ঋণকে খেলাপি না দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনেও এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা আইনগত জটিলতা। খেলাপি গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্য আইনের বিভিন্ন ফাঁক-ফোকর বের করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রেণীকরণ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন করে স্থগিতাদেশ নিচ্ছেন। এ সুবাদে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিচ্ছেন। কারণ, একজন ঋণখেলাপি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এমনকি জাতীয় কোনো নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন ঋণখেলাপিকেই গ্রাহক হিসেবে গ্রহণ করছে। ওই গ্রাহক আবার খেলাপি হয়ে আবার আদালতে মামলা করছে। এভাবে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে তারা আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করছে। এটি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে, খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর তহবিল সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তা আদায় হচ্ছে না। আবার আমানত প্রবাহও কমে গেছে। এতে বেসরকারি ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার সামান্য বাড়িয়ে গ্রাহক টানার চেষ্টা করছে। তবে ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে অনেক বেশি। ২০১৮ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ২৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৬ শতাংশ। তিন মাস আগে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মার্চ শেষে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৩১ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ১৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ১ শতাংশ।

তিন মাস আগে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, এ সময়ে সরকারি মালিকানার দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তিন মাস আগেও এই ব্যাংক দুটির একই পরিমাণ খেলাপি ঋণ ছিল।

গত বছরের শেষ দিকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুন:তফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত ও আদায় জোরদায় করায় খেলাপি ঋণ এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসে। কিন্তু চলতি বছরে খেলাপি ঋণ আবার লাগামহীনভাবে বাড়তে শুরু করেছে। এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো তাদের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাই সেখানে ভালো অবস্থান দেখাতেই বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে থাকে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপি ঋণ পুন:তফসিল বা নবায়ন। আর বছরের শেষ সময়ে এসে এই সুবিধা দেয়া-নেয়ার প্রবণতাও বাড়ে। এ ছাড়া শেষ সময়ে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়। কিন্তু বছরের শুরুতেই ঋণ পুন:তফসিল যেমন কম হয়, তেমনি আদায় কার্যত্রমেও সে রকম গতি থাকে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পুন:তফসিল ও পুনর্গঠনে (নিয়মিত) বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আড়াই বছরেই এ সুযোগ নেন দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প গ্রুপ। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। এর বাইরে বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো নিজেরা আরো ৬৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করেছে। সব মিলে ওই সময় পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত করা হয়েছে। পরে ব্যাংক খাতে পাঁচ শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এ রকম ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এসব ঋণগ্রাহক যথাসময়ে ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে তা আবারো খেলাপি হতে শুরু করেছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় না আনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় যেসব ব্যবসায়ী ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছিলেন ওই সব ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। কারণ এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। যেসব ব্যবসায়ী খেলাপিতে পরিণত হয়েছিলেন ওই সব ব্যবসায়ী ক্রমন্বয়ে লোকসানের ঘানি টানতে টানতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এর ফলে তারা নবায়ন হওয়া খেলাপি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওই সব ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করছেন না। আবার রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ওই সব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা দায়ের করেও তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছে না।  তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকি ব্যবস্থাও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকির কারণে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংকসহ বড় বড় ঋণ-কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঋণ আর পরিশোধ না করায় তা খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। সব মিলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো তার আয় থেকে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।

একজন ঋণখেলাপি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এমনকি জাতীয় কোনো নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের সবচেয়ে বড় জটিলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে- আইনগত জটিলতা। শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে আইনি জটিলতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। খেলাপি গ্রাহকেরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্য বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর বের করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খেলাপি গ্রাহকরা  শ্রেণীকরন  হতে বেরিয়ে আসার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে শ্রেণীকরনের  ওপর স্থাগিতাদেশ নিচ্ছেন। এ সুবাদে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন ঋণখেলাপিকেই গ্রাহক হিসেবে গ্রহণ করছে। ওই গ্রাহক ফের খেলাপি হয়ে আবার আদালতে মামলা দায়ে করছেন। এভাবে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে তারা আইনি প্রত্রিয়া গ্রহণ করছেন। এতে ব্যাংকগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।