Home » অর্থনীতি (page 7)

অর্থনীতি

ভ্যাটের থাবায় সাধারণ মানুষ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অধিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবারের বাজেটে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি ও হার অনেক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। মোবাইল ফোন সেবার ওপর করহার বাড়ানো হয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখা হলেও পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কেক, বিস্কুট, সিআর কয়েলসহ বিভিন্ন পণ্যের নির্ধারিত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ‘বাড়তি’ কর আরোপ প্রস্তাব কার্যকর হলে পণ্য ও সেবার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ভোক্তাকে তখন বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে, সেবা পেতে হবে। এতে তাদের ওপর ব্যাপক চাপ আসবে।

বর্তমানে ২২টি খাত সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে বিশেষভাবে ভ্যাটে ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে আটটি খাতের বিশেষ কর সুবিধা উঠিয়ে বিদ্যমানের চেয়ে বর্ধিত হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মোটরগাড়ির গ্যারেজের ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। বর্ধিত হার কার্যকর হলে গাড়ির মালিককে মেরামতের পেছনে আরও বেশি বিল দিতে হবে। জাহাজ নির্মাণে ডকইয়ার্ডে ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

এতে জাহাজ নির্মাণের ব্যয় আরও বাড়বে। কনস্ট্রাকশন ফার্মের ভ্যাটহার সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত ভ্যাটহার কার্যকর হলে নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়বে। বর্তমানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনে আড়াই শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। এতে করে পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা সেবার ওপর বর্তমানে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। এই হার দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে ইমিগ্রেশনের সেবার জন্য ভোক্তাকে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। কোনো অনুষ্ঠানে স্পনরশিপ সেবার জন্য এখন সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হয়। এ সেবার ওপর ভ্যাট দ্বিগুণ করায় স্পনরশিপ সেবার খরচ আরও বাড়বে।

বর্তমানে দেশীয় তৈরি বিস্কুট, কেক, বিভিন্ন ধরনের পেপার, পেপার প্রোডাক্ট, জিপি শিট, সিআই শিট, রঙিন শিটসহ বিভিন্ন ধরনের এমএস প্রোডাক্টের নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্য ২০ শতাংশ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত হার কার্যকর হলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে সিগারেট, জর্দা ও গুলে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে বিড়ির। এতে করে ওই সব পণ্য আগের চেয়ে আরও বেশি দামে কিনতে হবে। গরিবের ব্যবহৃত হাওয়াই চপ্পলের ভ্যাট সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হার্ডবোর্ড, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, সাধারণ জনগণের খাবার পাউরুটি, বনরুটি ইত্যাদি পণ্যের জন্য ভ্যাটে যে বিশেষ ছাড় আছে তা তুলে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে গরিবের ব্যবহৃত ওই সব পণ্যের দাম বাড়বে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অধিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবারের বাজেটে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি ও হার অনেক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। মোবাইল ফোন সেবার ওপর করহার বাড়ানো হয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখা হলেও পরিমাণ বিদ্যমানের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ওপর ব্যাপক হারে কর আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কেক, বিস্কুট, সিআর কয়েলসহ বিভিন্ন পণ্যের নির্ধারিত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ‘বাড়তি’ কর আরোপ প্রস্তাব কার্যকর হলে পণ্য ও সেবার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ভোক্তাকে তখন বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে, সেবা পেতে হবে। এতে করে তাদের ওপর ব্যাপক চাপ আসবে। বর্তমানে ২২টি খাত সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে বিশেষভাবে ভ্যাটে ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে আটটি খাতের বিশেষ কর সুবিধা উঠিয়ে বিদ্যমানের চেয়ে বর্ধিত হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মোটরগাড়ির গ্যারেজের ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। বর্ধিত হার কার্যকর হলে গাড়ির মালিককে মেরামতের পেছনে আরও বেশি বিল দিতে হবে। জাহাজ নির্মাণে ডকইয়ার্ডে ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে করে জাহাজ নির্মাণের ব্যয় আরও বাড়বে। কনস্ট্রাকশন ফার্মের ভ্যাটহার সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত ভ্যাটহার কার্যকর হলে নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়বে। বর্তমানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনে আড়াই শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। এতে করে পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা সেবার ওপর বর্তমানে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। এই হার দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে ইমিগ্রেশনের সেবার জন্য ভোক্তাকে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। কোনো অনুষ্ঠানে সম্পরশিপ সেবার জন্য এখন সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হয়। এ সেবার ওপর ভ্যাট দ্বিগুণ করায় স্পনরশিপ সেবার খরচ আরও বাড়বে। বর্তমানে দেশীয় তৈরি বিস্কুট, কেক, বিভিন্ন ধরনের পেপার, পেপার প্রোডাক্ট, জিপি শিট, সিআই শিট, রঙিন শিটসহ বিভিন্ন ধরনের এমএস প্রোডাক্টের নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্য ২০ শতাংশ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত হার কার্যকর হলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে সিগারেট, জর্দা ও গুলে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে বিড়ির। এতে করে ওই সব পণ্য আগের চেয়ে আরও বেশি দামে কিনতে হবে। গরিবের ব্যবহৃত হাওয়াই চপ্পলের ভ্যাট সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হার্ডবোর্ড, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, সাধারণ জনগণের খাবার পাউরুটি, বনরুটি ইত্যাদি পণ্যের জন্য ভ্যাটে যে বিশেষ ছাড় আছে তা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে সাধারন মানুষের ব্যবহৃত ওই সব পণ্যের দাম বাড়বে।

সারাদেশের ছোট ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বছরে নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট পরিশোধ করেন। নতুন বাজেটে এটি শতভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ছোট ব্যবসায়ীরা বছরে ১৪ হাজার টাকা এককালীন ভ্যাট দেন। নতুন বাজেটে এটি বাড়িয়ে ২৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকার ছোট ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বছরে ১০ হাজার টাকা ভ্যাট দেন। তাদের দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। জেলা শহরের জন্য এখন আছে ৭ হাজার ২০০ টাকা। তাদের দিতে হবে ১৪ হাজার টাকা। তৃণমূল পর্যায়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় ভ্যাট আছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। তাদের দিতে হবে ৭ হাজার টাকা। যোগাযোগ করা হলে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এএসএম কিরন বলেন, প্যাকেজ ভ্যাট দ্বিগুণের প্রস্তাব কার্যকর হলে ব্যবসার খরচ বাড়বে। এতে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর।

ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি করদাতাদের দাবি ছিল করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করা এবং তা ছিল যৌক্তিক দাবি। কারণ নিম্ন-আয়ের মানুষের ওপরই করের আঘাত সরাসরি পড়ে। বাড়ি ভাড়ার খরচ ছাড়াও চারজনের একটি পরিবারে মাসে ২৫ হাজার টাকায় চলা অনেক কষ্টকর। তাই ন্যূনতম করমুক্ত সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হওয়া উচিত ছিল, সেখানে সরকার করমুক্ত সীমা তো বৃদ্ধি করেনি উপরন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যমান বিনিয়োগসীমা (৩০ ভাগ থেকে কমিয়ে ২০ ভাগ করা হয়েছে) সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে যারা কর দিচ্ছেন, তাদের একই আয়ে গতবারের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে করে ব্যয়যোগ্য আয় কমে যাবে। এমনিতেই আমাদের দেশে করহার বেশি, তার ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো কতখানি যৌক্তিক হয়েছে, তা নিশ্চয়ই মন্ত্রী তা বিবেচনায় আনবেন। এ নতুন কর কাঠামোয় আরেকটি যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে, তা হলো মানুষের সঞ্চয় কমে যাবে। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবেই হোক, মানুষ আয়কর ভার কিছুটা কমানোর জন্য হলেও সঞ্চয় করত। আমাদের দেশে এমনিতেই সঞ্চয় প্রবণতা কম। তার ওপর যদি সরকার এমনভাবে নিরুৎসাহিত করে তবে তা ভবিষ্যতে ভালো ফল বয়ে আনবে না। এ প্রবণতা ভবিষ্যতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের অভাব তৈরি করতে পারে।

আগামী রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে ১২০ টাকা মূল্য পর্যন্ত প্লাস্টিক ও রাবারের চপ্পল, জুতা-স্যান্ডেলের ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি বাতিল করা হয়েছে। এতে বড় বড় শপিং মলে যাওয়ার সক্ষমতা যাদের নেই, সেসব মানুষকে ফুটপাতের ছোট্ট দোকান থেকে এসব পণ্য কিনতে হবে বেশি দামে। শুধু জুতা-স্যান্ডেল নয়, আরো অনেক পণ্যে শুল্ক কর-ভ্যাট বসায় নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়তি ভ্যাটের আঘাত আসবে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের জীবনেও।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এখন পাড়া-মহল্লায়। জেলা পর্যায়েও কিন্ডারগার্টেন ছড়িয়ে পড়েছে। এসব স্কুলে বেতন বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করে দিলেন অর্থমন্ত্রী। এসব স্কুলের বেশির ভাগ পাঠ্যবই ও ব্যবহার্য সামগ্রী আমদানি করা হয়। নতুন বাজেট প্রস্তাবে শিশুদের ছবি ও অঙ্কনের বিদেশি বই আমদানির শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

আমাদের দেশে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যয় ক্ষেত্রবিশেষে এত বেশি যে অনেক সময়ই অর্থ সংকুলানে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। আসছে অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় আরো বাড়তে পারে। হাসপাতালের কিছু যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ধরা হয়েছে। এছাড়া ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম রেকর্ডিং পেপারের ওপর রাজস্ব আরোপ করা হয়েছে। মেডিটেশন সেবায়ও বাড়তি কর দিতে হবে।

বিদেশ ভ্রমণে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে অনেকে টিকিট কেনেন। এর জন্য যাত্রীর কাছ থেকে টিকিটের মূল্যের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হয়। আসছে অর্থবছরে  ট্রাভেল এজেন্সির ওপর নতুন কর বসানো হয়েছে। এতে বিদেশ যাত্রীদের বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। গাড়ি মেরামত, হোটেল ভাড়া, আইপিএস, ইউপিএসে এ রাজস্বের থাবা বসায় ভোক্তাকেই বাড়তি খরচ বহন করতে হবে। রড তৈরির কাঁচামাল বিলেট আমদানিতে শুল্ক বসছে। এতে নির্মাণ খাতের এ জরুরি পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হলো।

দেশীয় মোটরসাইকেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ছাড়া অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানিতে হ্রাসকৃত শুল্ক হারে রেয়াতি সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত দেশেই উন্নতমানের মোটরসাইকেল তৈরির পথ উন্মুক্ত করবে। তবে এ খাতে সিকেডি মোটরসাইকেলের আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক হার আশংকাজনক হারে হ্রাস করে ৪৫ শতাংশ থেকে শর্তসাপেক্ষে আগামী দু’বছরের জন্য ২০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোটরসাইকেল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভ্যাট অব্যাহতি প্রযোজ্য ছিল, যা উঠিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়। দেশ এখন মোটরসাইকেল শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ শিল্পকে সংরক্ষণ সুবিধা না দিয়ে উল্টো আমদানির পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ফলে আমদানিকৃত ও সংযোজনকৃত মোটরসাইকেলের বাজারমূল্য কমবে। আর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় মার খাবে।

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য : কোথায় এখন সরকারের সেই প্রতিশ্রুতি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

রমজান আসলে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। সরকারী তদারকির অভাবে, অনিচ্ছায় কিছু ব্যবসায়ী এ সময়কে পুঁজি করে অধিক মুনাফা হাসিলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। বানিজ্য মন্ত্রী যখন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারনে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, তখনই ব্যবসায়ীদের দায়মুক্তির চর্চ্চাটিকে জায়েজ করা হয়। আর এ মাসকে কেন্দ্র করে লাগামহীনভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দর। বিশেষ করে ইফতারের অনুষঙ্গ বেগুনের দামে ‘আগুন’ লেগেছে। ইতোমধ্যে ১২০ টাকা কেজি ছুঁয়েছে সবজিটির দাম। চিনির দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কিছু ব্যবসায়ীর মজুদদারীর কারনে । এছাড়া কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে  শশা, কাঁচামরিচ, লেবুসহ সব ধরনের সবজির দাম। পাশাপাশি ছোলাসহ সকল প্রকার ডালের বাজারও লাগামহীন। ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করার কোন নজীর নেই। সরকার টিসিবিকে দিয়ে কিছু চেষ্টা চালালেও তা বড় ধরনের ফল দেয় না। চাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্য সরবারহ পর্যাপ্ত থাকার পরও অগ্রিম মজুদ প্রবণতার জেরে দর বাড়ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ক্রেতাদের অভিযোগ সরবারহ বেশি থাকা সত্বেও বেশি দামে বিক্রি করছে বিক্রেতারা। পাইকারী বাজারে দাম বাড়ায় তাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলছেন খুচরা ব্যবসায়িরা। আর নিত্যপণ্যের লাগামহীন এ দামে বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

জানা গেছে, রমজান মাসে যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে তার সবগুলিরই দাম ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে তিন দিন আগেও যে লম্বা বেগুন বিক্রি হতো ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় (৭ জুন) তা  বেড়ে দাড়িয়েছে ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়। তাছাড়া রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতিকেজি কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পেপে ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা, শশা ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকা, গাজর ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা, লেবু প্রতিহালি মান ভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা, ধনিয়া পাতা ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ছোলা :  ব্যবসায়ীরা আগেই বলেছিলেন রমজানে ছোলার দাম ১০০ টাকা ছাড়াবে, হয়েছেও তাই। বাজারে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ভাল মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। এছাড়া মানভেদে প্রতিকেজি ছোলা ৯৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ছোলা খোলা বাজারে ট্রাক সেলে প্রতিকেজি ৭০ টাকায় বিক্রি করছে।

চিনি : খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চিনি ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহে দাম ছিল সর্বোচ্চ ৬০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৫ টাকা।  টিসিবি প্রতিকেজি চিনি দেশী চিনি ৪৮ টাকায় বিক্রি করছে।

ডাল : খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া অ্যাংকর (বুটের) ডাল ৬০-৬২ টাকা, খেসারির ডাল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, বুটের ডালের বেসন ১২০ টাকা, অ্যাংকর ডালের বেসন ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবি মশুর ডাল ৮৯ টাকা ৯৫ পয়সায় বিক্রি করছে।

পেঁয়াজ : খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি দেশী পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৩২ থেকে ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

রসুন : বাজারে চীন থেকে আমদানি করা রসুন ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকায় এবং দেশী রসুন ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

গরুর মাংস : সিটি করপোরেশন থেকে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৪২০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও দুয়েকটি বাজারে তা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা বাজারে প্রতিকেজি গরুর মাংস ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

ব্রয়লার মুরগি: বাজারে দুয়েকদিন আগের চেয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৭৫ টাকা থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সয়াবিন তেল : প্রতিকেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯৫ টাকায় (সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ টাকা বেড়েছে)। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৪৫৫ টাকায়। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৯২ টাকা থেকে ৯৫ টাকায়। তবে সরকারী সংস্থা টিসিবি প্রতিলিটার সয়াবিন তেল বিক্রি করছে ৮০ টাকায়।

বাংলাদেশের জনগণ- কৃষক শ্রমিক মধ্যবিত্তরা, এখন এক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে অস্থির। আগে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষের সময় শাকপাতা খেয়ে জীবনধারণের কথা বলা হতো। এখন শাকপাতা খাওয়াও অনেকের পক্ষে অসম্ভব। শাকপাতা যখন কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, তখন এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অথচ এই বাংলাদেশেও কিছুদিন আগে এই অবস্থা ছিল চিন্তার বাইরে। বিশ শতকের ষাটের দশকেও চালের দাম ছিল সেরপ্রতি দশ-বারো আনা, সরষের তেল চার টাকা, ঘি দশ টাকা, চিনি এক-দেড় টাকা, গরুর গোশত দেড় টাকা ইত্যাদি। ইলিশ মাছ পাওয়া যেত দুই-তিন টাকায়।

এটা এক সাধারণ নিয়ম যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সাধারণ অল্প আয়ের মানুষের ওপরই বেশি পড়ে। তারাই এর শিকার হয়ে চরমভাবে বিপর্যস্ত। যাদের আয় মাসে কমসেকম দুই লাখ টাকা তাদের কাছে চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা হলেও অসুবিধা নেই। নানা রকম শাকসবজি ৪০-৫০-৬০ টাকা কেজি হলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি এ রকম হলে মাসে ৩-৪-৫ হাজার টাকা আয়ের মানুষের সপরিবারে নুন-ভাত খাওয়াও কষ্টের। আগে মানুষ তরকারি ছাড়া ভাত খেলেও খেত নুন-মরিচ দিয়ে। এখন মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত! এ অবস্থায় গরিব মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকলেও তাদের দেহের পুষ্টির অবস্থা তা বুঝতে পারা কী খুব কঠিন?

অথচ বর্তমান সরকার ২০০৯-এ ক্ষমতায় এসেছিল দ্রব্যমূল্য কমানো হবে এমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ২০০৮-এর নির্বাচনে দেয়া নির্বচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ছিলো অগ্রাধিকারের একনম্বর। প্রথম প্রথম নানা হুংকার আর লোক দেখানো কিছু কাজকর্ম করলেও স্বল্পকালেই তা বন্ধ হয়ে যায় তারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন সেই শক্তি অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের কারণেই।

দায়হীন বাড়তি চাপের বাজেট

আনু মুহাম্মদ ::

গত ২ জুন অর্থমন্ত্রী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তার মোট আকার ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা। খেয়াল করবার বিষয় যে, এই বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে আছে আগের ঋণের সুদ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, আর আয়ের মধ্যে আছে নতুন কর ৫৩ হাজার কোটি টাকা, এবং ঋণ ৬০ হাজার কোটি টাকা।

‘স্বপ্ন অনেক বড় কিন্তু সামর্থ্য কম’, ‘বাজেট ভালো/উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ’, এগুলোই এখন বাজেট বিষযক আলোচনার মূল সুর। এগুলো ফাঁকিবাজী কথা। কী স্বপ্ন আর কী উচ্চাভিলাষ, তার বাস্তবায়ন মানে কী এসব আলোচনায় এগুলোর অনুসন্ধান খুব কমই পাওয়া যায়। সমস্যা বেশি অর্থনীতিবিদদের নিয়ে, যারা পরিসংখ্যানের ঘোরের মধ্যে নিজেরা আটকে থাকেন, অন্যদেরও থাকার আবহাওয়া তৈরি করেন। বরাদ্দের পরিমাণ নিয়েই তারা শোরগোল করেন, এই বরাদ্দের গুণগত দিক নিয়ে তাদের মাথাব্যথা কম। জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের হৈচৈ, এটাই তাদের কাছে স্বপ্ন বা উচ্চাভিলাষ, কী কাজ করে কীসের বিনিময়ে এই প্রবৃদ্ধির অংক তৈরি হচ্ছে তার কোন পর্যালোচনা নেই। ঋণ এবং করবৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার জনগণের ওপর নতুন নতুন বোঝা চাপাচ্ছে, লক্ষ কোটি টাকার গল্প দিয়ে তার ওপর ঢাকনা দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের কাছে জনগণের পাওনা কতটুকু পরিশোধ করছে সরকার তার পর্যালোচনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর একটি মুখস্ত কথা বারবার বলা হয়, কিন্তু সেই কর দিয়ে জনগণের কাজ কতটুকু হয় সেটা আলোচনায় আসে না। প্রকৃতপক্ষে এখন দরকার সার্ভিস-ট্যাক্স অনুপাত বের করা অর্থাৎ জনগণ কতো কর দিচ্ছেন আর তার বিনিময়ে কী পাচ্ছেন- সেই হিসাব দরকার। বলাইবাহুল্য তার চিত্র খুবই খারাপ।

এই কথা তো ভুললে চলবে না যে, আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য মোট যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে তার সমপরিমাণ অর্থ লক্ষাধিক কোটি টাকা বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে খেলাফী আকারে হাওয়া হয়ে গেছে, এর অর্ধেক এখন আর হিসাবেই নেই। বছরে এর চাইতে বেশি পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে জনগণের জামানত এখন কতিপয় দস্যুর পকেট। বাংলাদেশ ব্যাংকও এর বাইরে নয়। প্রকল্প ব্যয় যে অবিশ্বাস্য মাত্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তা অদক্ষতার কারণে নয়, খুবই দক্ষ চৌর্যবৃত্তি বা ডাকাতির কৌশল এগুলো। এদের সুবিধা বাড়ানোর জন্যই ঋণ আর করের বোঝা বাড়ে। মেগা প্রকল্প নিয়ে উচ্ছাস তৈরি করা হচ্ছে, যেনো এগুলোর বাস্তবায়নই একমাত্র আরাধ্য, বাংলাদেশের জনগণের সমৃদ্ধির পথ। অথচ এইসব মেগা প্রকল্প যে উন্নয়নের নামে জনগণ ও দেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে তা হাজারবার বলেও অনেক বিশেষজ্ঞ নামের ব্যক্তির মাথায় ঢোকানো যায় না। এর কারণ তাদের নির্বুদ্ধিতা নয়, তারা অনেকেই এসবের সুবিধাভোগীও বটে।

এরকম আলোচনায় এই সত্যটি আড়াল হয় যে, শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনের গুণগত মান পরিমাপ করা যায় না। জোসেফ স্টিগলিজ অমর্ত্য সেনসহ অনেক অর্থনীতিবিদও বলেছেন, তাছাড়া এটি কান্ডজ্ঞানের বিষয় যে, প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয়, কী কাজ করে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি নষ্ট করে ইটখোলা বা চিংড়ি ঘের, জলাভূমি ভরাট করে বহুতল ভবন, নদী দখল করে বাণিজ্য, পাহাড় উজাড় করে ফার্ণিচার, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি বেশি বাণিজ্যিকীকরণ, গ্যাস বিদ্যুতের অযৌক্তিক দামবৃদ্ধি, সুন্দরবনবিনাশী এবং দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলে ও ঋণগ্রস্ত করে রূপপুর বা বাঁশখালী দেশধ্বংসী প্রকল্পসহ বড় বড় প্রকল্প এর সবই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো জনগণের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করে। এগুলো আবার চোরাই টাকার আয়তনও বাড়ায়। দখলদারী অর্থনীতি, আতংকের সমাজ, আর সন্ত্রাসের রাজনীতি সবই পুষ্ট হয় উন্নয়নের এই ধারায়।

একই কারণে মাথাপিছু আয়ের গড় হিসাব দিয়ে শোরগোল তোলা যায়, কিন্তু তা সর্বজনের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে পারে না। বিশ্বে বাংলাদেশের চাইতেও দুর্বল অর্থনীতি আছে যাদের মাথাপিছু আয় তুলনায় অনেক বেশি। এরমধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় নিম্ন মধ্যম আয়ের কাতারে নিয়ে গেছে দেশকে। গত কয়েকবছর ধরেই অনেকগুলো অনুকূল উপাদান অর্থনীতির পরিমাণগত বিকাশে সহায়তা করেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকবছর ধরে জ্বালানী তেলের আন্তর্জাতিক দাম কম থাকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়া, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অন্যতম। রফতানি প্রবৃদ্ধি ভালো ছিলো, প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি শতকরা ১০ ভাগের ওপরে ছিলো। প্রবাসী আয় প্রবাহ অব্যাহত থাকায় এখন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। কৃষিজমি কমলেও উৎপাদন বেড়েছে। এসব অনুকূল শর্তের সুবিধা জনগণ কতোটা পেয়েছেন এবং সামনের অর্থবছরে পাবেন সেটাই এক বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যাদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে তাঁরা হলেন প্রধানত, কৃষক ও কৃষি শ্রমিক, গার্মেন্টস সহ বিভিন্ন কারখানা ও অশিল্প শ্রমিক এবং প্রায় ৮০ লক্ষাধিক প্রবাসী শ্রমিক। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যাদের অবদান অর্থনীতিতে বেশি তারাই রাষ্ট্রের অমনোযোগ ও বৈরিতার শিকার। অর্থমন্ত্রী বাজেটের আগে বিভিন্ন সংলাপে বসেন, কিন্তু এসব জনগোষ্ঠীর সাথে কখনোই নয়। কৃষকেরা বিশাল উৎপাদন করেও দাম অনিশ্চয়তায় দিশাহীন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায়ই দেখা যায় বকেয়া মজুরির জন্য রাস্তায় নামতে, রানা প্লাজা ধ্বসের তিনবছর পরও নিহত আহত শ্রমিকদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও কর্মসংস্থানের নিষ্পত্তি হয়নি। আর প্রবাসী শ্রমিক?  হিসাবে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে প্রায় ২৫ হাজার লাশ এসেছে দেশে। আর এখন প্রবাসী শ্রমিক হবার পথে গিয়ে সমুদ্রে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন অনেকে। দাসশ্রমের জাল কাজ করছে, জিডিপি বাড়ছে। অর্থনীতির ঐশ্বর্য বেড়েছে কিন্তু এখনও জাতীয় ন্যুনতম মজুরির অভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন প্রকৃত অর্থে কঠিন অনিশ্চয়তা ও দারিদ্রের মধ্যে আটকে আছে। বাজেটে কর্পোরেট কর কমানো হয়েছে, কিন্তু জাতীয় ন্যুনতম মজুরি বিষয়ে কোনো কথা নেই।

শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় গ্রহণে অস্বীকৃতির কারণে বাণিজ্যিক তৎপরতার বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক মাত্রায়। মুনাফার করাল গ্রাসে দুটো খাতই সর্বজনের আওতার বাইরে, ব্যয়বহুল এবং মানও নিম্নমুখি। দেশের জিডিপির বৃদ্ধিসহ সম্পদের বৃদ্ধি সত্ত্বেও শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ১৬১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫৫তম, স্বাস্থ্য খাতে  ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৯তম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ সবার নীচে। গত দেড় দশকে এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। অথচ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও অনেকের সাথে বাংলাদেশের অঙ্গীকার কমপক্ষে শতকরা ৬ ভাগ। ১০ বছর আগে যেখানে বাজেটের শতকরা ১৫.৯ ভাগ ছিলো সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১১.৬ ভাগ। অথচ শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন প্রাপ্তির অধিকার অর্জনের জন্য বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হচ্ছে। এবছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে বেতনবৃদ্ধির কারণে, তাও শতকরা ২.৫ ভাগ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনও শতকরা ১ ভাগ। অথচ আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী যথাক্রমে এর ৩ গুণ ও ৬ গুণ বাড়ানোর কথা। যদি এর কমও বাড়তো তাহলে শিক্ষকদের না খেয়ে পথে বসে আন্দোলন করতে হতো না, কাজের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে পুলিশের হামলায় নার্সদের রক্তাক্ত হতে হতো না।

সর্বজনের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, পরিবেশ সম্মত জ্বালানী ও নিরবচ্ছিন্ন সুলভ বিদ্যুৎ প্রাপ্তির জন্য জাতীয় সক্ষমতার বিকাশে প্রযোজনীয় অর্থ না থাকলেও অন্য অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক মাত্রায় ব্যয়বৃদ্ধিতে বরাদ্দের কোনো অভাব হচ্ছে না। এই বছরে অনেকগুলো বৃহৎ প্রকল্প বরাদ্দ আরও বৃহৎ হয়েছে। ইতিমধ্যে এই ঘটনা স্পষ্ট হয়েছে যে, মজুরি ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বিশ্বে সবচাইতে নীচের দিকে থাকা সত্ত্বেও  বাংলাদেশে সেতু ও সড়ক নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক। সরকারের খুবই আগ্রহের ফ্লাইওভার নির্মাণেও একই চিত্র। ভারত, চীন, মালয়েশিয়াতে ফ্লাইওভারে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় যেখানে ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকা, বাংলাদেশে সেখানে তা ১৩০ থেকে ৩১৬ কোটি টাকা। গত একবছরে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এগুলোই স্বপ্নের মেগা প্রকল্প!

চলতি অর্থবছরে অর্থকরী খাতে নৈরাজ্য, দুর্নীতি, অর্থ পাচার অভাবিত মাত্রা নিয়েছে। বাজেটে এই বিষয়ে কথা নেই যে, লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার কী যুক্তিতে জনগণের টাকা থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল যোগান দিচ্ছে? শেয়ারবাজার, বেসিক ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদিতে অপরাধীদের যথাযথভাবে সনাক্ত করবার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণেই অচিন্তনীয় দস্যুবৃত্তির ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ ব্যাংকে। দেশি বিদেশি দুর্বত্তরা জাল বিছিয়ে বাংলাদেশকে কীভাবে অরক্ষিত করে ফেলেছে তার সাক্ষাৎ প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক ফুটা করে অর্থপাচার। একটি দেশের অর্থনীতির কেন্দ্র হিসাবে যে প্রতিষ্ঠান সবচাইতে সুরক্ষিত থাকবার কথা সেটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে যে ফুটা তৈরি করা হয়েছে তার খবর ফিলিপাইনের পত্রিকায় বের না হলে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ জানতেন কিনা সন্দেহ আছে। ফিলিপাইনের পত্রিকায় এই খবর প্রকাশেরও অনেক পরে সরকারের উদ্বেগ দেখা যায়। ঘটনার প্রায় দেড়মাস পরে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এ থেকে এই প্রশ্নটিও তৈরি হয়েছে যে, আগেও আরও ঘটনা গোপন করা হয়েছে কীনা। তারও ইঙ্গিত পাওয়া যায় সোনালী ব্যাংকের এরকম একটি ধামাচাপা দেয়া ঘটনা উন্মোচিত হওয়ায়।

বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুন্ঠন ও পাচার অব্যাহত থাকার কারণেই সরকারকে আরও বেশি বেশি আয়ের উৎস খুঁজতে হচ্ছে। যেহেতু চোরাই কোটিপতিদের থেকে কর আদায়ে সরকার অনিচ্ছুক সেহেতু সহজ পথ জনগণের ঘাড়ে বোঝা চাপানো। সেজন্যই জ্বালানী তেলের দাম কমানো হয়নি, সেজন্যই ভ্যাট অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে বিস্তৃত ভাবে। সে কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমলেও সামনের বছরে বাংলাদেশের মানুষকে ঘরভাড়া, গাড়িভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বেশি দিতে হবে। জিনিষপত্র  কিনতে হবে আরও বেশি দামে। মোবাইলসহ সকল নিত্যব্যবহার্য পণ্যেই মানুষকে বাড়তি টাকা গুণতে হবে। ঋণ ও করবৃদ্ধি পেলেও জনগণের নিরাপত্তাহীনতা কমবে না বরং তার ওপর উন্নয়নের নামে সন্ত্রাস বাড়বে। সরকার কোনো ব্যাখ্যা দেবে না। কারণ জনগণের কাছে তার কোনো দায় নেই। আলোচনাও তেমন হবে না, কেননা স্তুতিগান ছাড়া বর্তমান সংসদেরও আর কোনো ভূমিকা নেই।

পানামা পেপারস : ধামাচাপা পড়ছে আগের মতোই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

এ যাবৎকালের আর্থিক খাতের অন্যতম তথ্য ফাঁসের ঘটনা ‘পানামা পেপারস’ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাপী। গোপনীয়তা রক্ষাকারী হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর অন্যতম প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকা- যেটি পানামার একটি আইনী সহায়তা প্রতিষ্ঠান- সেখান থেকেই সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে এক কোটি ১৫ লাখ নথিপত্র। যেখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অর্থপাচারের বিষয়ে শিহরণ জাগানিয়া তথ্য রয়েছে। যেখানে বিশ্বের ধনাঢ্য ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের গোপন সম্পদের তথ্য, আর কীভাবে আইনি প্রতিষ্ঠানটি এসব ব্যক্তির অর্থপাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং কর ফাঁকিতে সহযোগিতা করেছে, তার চিত্র। ওই নথিপত্রগুলোকেই বলা হচ্ছে পানামা পেপারস।

সুইজারল্যান্ড, সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন করমুক্ত দেশে মোসাক ফনসেকা কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিজ দেশের বাইরে অর্থ রাখার বিষয়ে দুনিয়াজুড়ে যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সেবা প্রদান করে তার মধ্যে মোসাক ফনসেকার অবস্থান চতুর্থ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তিন লাখেরও বেশি কোম্পানির হয়ে কাজ করে এটি। ব্রিটেনের সঙ্গে রয়েছে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এদের গ্রাহকের অর্ধেকেরও বেশির অবস্থান ব্রিটেনশাসিত এলাকাগুলোয়।

মোসাক ফনসেকার সম্পদশালী  মক্কেলেদের বিষয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়া। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসও তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। স্পেনের বিচার বিভাগীয় সূত্র জানিয়েছে, স্পেন এরই মধ্যে আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার-বিষয়ক তদন্ত শুরু হয়েছে। কেলেঙ্কারির ঘটনার কারণে আলোচিত পানামা সরকারও বিষয়গুলো তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। জানিয়েছে, যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে এবং আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে, আর তা প্রমাণিত হয়, তাহলে পুরস্কৃত করা হবে।

বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও তার বাবার নাম আছে এ তালিকায়। নথি অনুযায়ী, বাবা-ছেলে মিলে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মেগা স্টার এন্টারপ্রাইজের নামে অর্থ পাচার করেছেন। এখন স্পেনে কর ফাঁকি দেওয়ার একটি অভিযোগ আছে মেসির বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও অবমাননাকর।

তালিকায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কোর নাম থাকলেও তিনি কোনো ভুল করেননি বলে দাবি করেছেন। এ ছাড়া লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে ১৯৮৩ সালে চার কোটি ডলার মূল্যের ব্রিটিশ সোনা-রুপার বার ডাকাতির ঘটনায় লাখ লাখ ডলার ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে পানামার একটি শেল কোম্পানি সহায়তা করেছে।

পানামা পেপারস নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের মূলে রয়েছে এ নথিতে বিশ্বের অনেক বড় বড় ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আলোচিত, তারকা ব্যক্তিত্বের বিদেশে অর্থপাচারের গোপন নথি প্রকাশ হওয়া। পানামা পেপারসে দেখা যায় দুর্নীতি, লুটপাট করে অর্জিত সম্পদসহ অনেকে নিজ দেশে ট্যাক্স ফাকি দেয়ার জন্য বিদেশে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। লুটেরা ও স্বৈরশাসক, বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, দখলদারদের নানা উপায়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে তা পাচার বিষয়ে সাধারণ মানুষ সবসময়ই কমবেশি অবহিত। কিন্তু এভাবে যে তা সমূলে ফাঁস হয়ে যাবে তা যেন ছিল অনেকের কল্পনার বাইরে। বিভিন্ন দেশের অনেক ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দ চরম আতঙ্কে রয়েছেন পানামা পেপারস ফাঁস হওয়ার পর থেকে। ইতোমধ্যে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন সম্পদ পাচারে জড়িত হিসেবে তার নাম ফাঁস হয়ে যাওয়ায়। রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, চীনসহ অন্য অনেক দেশের ক্ষমতাসীনেরা বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন পানামা পেপারসে তাদের এবং তাদের পরিবার ও পরিচিত অনেকের নাম জড়িত থাকায়। বাংলাদেশেও অনেকে যেমন তীব্র আতঙ্কে রয়েছেন পানামা পেপারস বিষয়ে তেমনি অনেকে অপেক্ষা করছেন কার কার নাম ফাঁস হয় তা দেখার জন্য।

বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া: পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাসহ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অর্থ পাচার এবং কর ফাঁকির এ কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমন্ডুর ডেভিড গুনলাগসন। এর আগে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে দেশের প্রেসিডেন্টকে আহবান জানান তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট ওলাফুর র্যা গনার গ্রিমসন তাঁর আহবানে সাড়া দেননি।

অর্থ পাচারের তালিকায় নাম থাকা ধনশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। তদন্ত শুরু হয়েছে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও পানামায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, রাজনীতিক এবং চলচ্চিত্র ও ক্রীড়া জগতের তারকা ব্যক্তিদের অর্থ পাচারের খবর প্রকাশ হয়। এ ঘটনায় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি করার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কর ফাঁকি দেওয়াকে একটি বৈশ্বিক সমস্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কথা জানিয়ে তাঁর দল প্রগ্রেসিভ পার্টির উপনেতা ও কৃষিমন্ত্রী সিগুইডুর ইঙ্গি জোনাসন বলেন, পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন। এখন তিনি (কৃষিমন্ত্রী) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন বলে জানান।

মোসাক ফনসেকা নামে পানামার একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি ফাঁস হয়। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। নথিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নিকটাত্মীয়দের নাম আসে। এ তালিকায় আরও আছে সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান আল সৌদ, মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের এক ছেলে এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দুই ছেলে ও মেয়ের নাম। রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের পাশাপাশি ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং ভারতের চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন এবং তাঁর পুত্রবধূ ও অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়ার নামও অর্থ পাচারকারীদের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

মোসাক ফনসেকার ওই ১ কোটি ১৫ লাখ নথি অজানা সূত্র থেকে জার্মান দৈনিক জিটডয়েচ সাইতং-এর হাতে আসে। পত্রিকাটি সেসব নথি ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে) দেয়। ১৯৭৭ থেকে ২০১৫, প্রায় ৪০ বছরের এসব নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার কিছু অংশ আইসিআইজে প্রকাশ করে।

মোসাক ফনসেকার মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ কর রেয়াতকারী অঞ্চলে তথাকথিত প্রতিষ্ঠান (অফশোর কোম্পানি) তৈরির মাধ্যমে গচ্ছিত রেখেছিলেন পাচারকারীরা। এসব অঞ্চলের মধ্যে প্রায় সব কটিই যুক্তরাজ্যের রানীশাসিত নানা অঞ্চল (ব্রিটিশ টেরিটোরিজ)। এই অঞ্চলগুলো ‘করের স্বর্গ’ বা ‘ট্যাক্স হেভেন’ নামে পরিচিত। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি নিয়ে তাই বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবেন বলেন, এ অঞ্চলগুলো যদি যুক্তরাজ্য সরকারের কর নীতি না মানে, তাহলে ‘প্রত্যক্ষ শাসন’ জারি করা হোক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, কর ফাঁকি দেওয়াটা একটা বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কর আইনের ফাঁকফোকর বের করে অর্থ পাচার করছে।

ফ্রান্স ঘোষণা করেছে, তারা এ ঘটনার তদন্ত করবে। ফরাসি অর্থমন্ত্রী মিশেল সাপাঁ পার্লামেন্টে ঘোষণা দেন, ফ্রান্স কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করতে যেসব দেশ সহযোগিতা করে না, এর তালিকায় এখন পানামার নাম যুক্ত করবে। অস্ট্রেলিয়ার কর কার্যালয় তালিকায় নাম থাকা ৮০০ ব্যক্তির বিষয়ে তদন্তের ঘোষণা দেয়। অস্ট্রিয়ার আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বলেছে, তালিকায় নাম উঠে আসার পর দেশের দুটি ব্যাংক অর্থ পাচারে জড়িত ছিল কি না, তা নিয়ে তারা তদন্ত শুরু করেছে।

মোসাক ফনসেকার দেশ পানামাও তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। আদৌ অর্থ পাচার বা এ জন্য কোনো অপরাধমূলক কাজ হয়েছে কি না, সে লক্ষ্যেই হবে এ তদন্ত। পানামার প্রেসিডেন্ট জুয়ান কার্লোস ভারেলা বলেন, তাঁর সরকার আন্তর্জাতিক যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করতে রাজি। তবে তাঁর দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রেখেই তিনি সবকিছু করবেন।

যে ৫০০ ভারতীয়র নাম তালিকায় উঠে আসে, তাঁদের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর পরে মুখ খোলেন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। তিনি বলেন, যে চারটি জাহাজ কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম এসেছে, এগুলো তিনি চেনেন না। এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁর নাম ভুলভাবে এসেছে বলে তাঁর ধারণা। তিনি বলেন, ‘আমার প্রদেয় সব কর আমি শোধ করেছি। যেসব অর্থ বিদেশে ব্যয় করেছি, সেসবের করও আমি দিয়েছি।’ অমিতাভের পুত্রবধূ ঐশ্বরিয়া রাইয়ের গণমাধ্যম উপদেষ্টা রাইয়ের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এদিকে, এই কেলেঙ্কারিতে যেসব ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের অনেকেই নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের তিন সহযোগীর নাম উঠে এলে সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ আসে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে। আর ক্রেমলিনের মুখপাত্র এই কেলেঙ্কারিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, ‘আসলে এর মাধ্যমে রাশিয়ায় একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য।’

বাংলাদেশ : বাংলাদেশের বেশকিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে পানামা পেপারসে। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে তাদের কারো কারো নামও প্রকাশ হয়েছে। সরকার এদের সম্পর্কে তদন্ত করছে বলে বলা হলেও সবই আইওয়াশ ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পানামা পেপারস-এ বাংলাদেশীদের নাম প্রকাশিত হবার পরে দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতিই নেই। বিষয়টি যে ধীরে ধীরে ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে, তাও বোঝা যাচ্ছে। অথচ পানামা পেপারস-এর তথ্য প্রকাশের পরেই দুদক বলেছিল, ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশী কেউ দুর্নীতিতে জড়িত কিনা- তা খতিয়ে দেখতে দুদকের উপপরিচালক এসএম আখতার হামিদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয় এবং শিগগিরই এ টিম কাজ শুরু করবে বলেও বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। শিগগিরই পানামার কাছে তথ্য চাইবে বিএফআইইউ। একইসঙ্গে সংশি¬ষ্ট ওয়েবসাইট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব সংগ্রহ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদৌ এর কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, এনবিআরের অন্যতম কাজ দেশে-বিদেশে যেখানেই হোক বাংলাদেশীরা যদি ট্যাক্স ফাঁকি দেয় বা অর্থ পাচার করে তা যথা নিয়মে তদন্ত করা। আমরা বিষয়টি দেখব। রিপোর্টের গুরুত্ব বিচার করে যাদের নাম প্রকাশিত হয়েছে তাদের বিষয়ে খোঁজ নেব। এর আগে দেশ থেকে অবৈধভাবে সুইস ব্যাংক ও অন্যান্য স্থানে মুদ্রা পাচার হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে রাজস্ব বোর্ড তদন্ত করছে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু সব কিছুই যেন ধামাচাপা পড়ে গেছে।

সম্ভাব্য কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ ঘটনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ‘প্রকট দুর্নীতি-সহায়ক পরিস্থিতির দৃষ্টান্ত’ উল্লেখ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত এবং আইনি  প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক ও সংস্থাটি। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রকাশিত তালিকায় যেসব বাংলাদেশির নাম উল্লেখ আছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে সম্প্রতি  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগজনক হারে টাকা পাচারের প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের উদ্যোগে এসব টাকা ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের বাইরে নামে-বেনামে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা বা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাচারের মূল লক্ষ্য কর ফাঁকি। যার মূল্য জনগণকেই দিতে হয়। সরকারের উচিত এসব কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করা।

টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, পানামা পেপারসে প্রকাশিত তথ্য আংশিক। মোসাক ফনসেকার মতো আরও অনেক তথাকথিত আইন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত আছে। তাছাড়া এ দুষ্ট চক্রের সঙ্গে জড়িত বিশ্বের নামি-দামি  ব্যাংক ও অ্যাকাউন্টিং কোম্পানিসহ অসংখ্য মধ্যস্থতাকারী। তাই দেশীয় আইনি কাঠামো জোরদার ও কার্যকর করার মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রতিরোধে সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ ও অন্যদিকে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ কী আদৌ চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাবে?

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশের রাজকোষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার খোয়া যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ১৫ মে প্রাথমিক তদন্ত  প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সুইফট দায়ী। কারণ, সুইফট আরটিজিএফের সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার ফলে এটি ঘটেছে। সুইফট নিজেই তাদের সার্ভার ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার ব্যবস্থা করেছিল। এতে এই অর্থ চুরি হয়ে গেছে।  দুটি দেশের হ্যাকাররা রিজার্ভ চুরির জন্য বিশেষ একটি ম্যালওয়্যার তৈরি করে। এর মাধ্যমে এই অর্থ চুরি করা সম্ভব হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করেনি। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অসতর্কতা, অসাবধানতা, অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতা ছিল’’। এর আগে একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা এবং সিআইডি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেমের সঙ্গে সুইফট ম্যাসেজিং সিস্টেমকে যুক্ত করতে গিয়ে সুইফটের টেকনিশিয়ানরা নিরাপত্তায় কিছু ফাঁকফোকড় তৈরি করে গিয়েছিল’। এর আগে গত ১১ মে সুইফট’র পক্ষ থেকে প্রদত্ত বার্তায় দাবি করা হয়েছে, ‘‘এ অভিযোগ ভিত্তিহীন, মিথ্যা, বেঠিক এবং বিভ্রান্তিকর; অন্যান্য সুইফট ব্যাবহারকারীর মতো বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফট নেটওয়ার্ক সিস্টেম এবং এর সাথে যুক্ত পদ্ধতি এবং এর নিরাপত্তা বিধান ব্যবস্থা দায়ী, কোনোভাবেই সুইফট কর্তৃপক্ষ নয়’’। জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে একটি আর্থিক সম্মেলনে সুইফট’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত আমাদের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। আমাদের দৃষ্টিতে এটি গ্রাহকের প্রতারণা। আমার মনে হয় না এটাই প্রথম এমন একটি ঘটনা এবং এটাই শেষ’’। প্রশ্ন হলো, এ পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করা হলেও আসলে এ রাজকোষ চুরির জন্য কে বা কারা দায়ী? এভাবেই কি শেয়ার বাজার কেলেংকারিসহ অন্যান্য ব্যাংক কেলেংকারির মতো এটিও চাপা পড়ে যাবে?

রয়টার্স’র প্রতিবেদনে তদন্ত কাজে বাংলাদেশ নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ সূত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়, ‘‘ম্যালাওয়ার ভাইরাসের মাধ্যমে ৩টি হ্যাকার গ্রুপ আবারো সিস্টেমে আক্রমণ করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেটওয়ার্কে এখনো কিছুটা ঝুঁকি আছে। ব্যাংক গভর্নর এবং  বোর্ডকে এটা বুঝতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নেটওয়ার্ক এখনো নিরাপদ নয়, এখনো হ্যাকারদের আক্রমণের সম্ভাবনা আছে’’। ফেডারেল ব্যাংক ও ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সুইফট ম্যাসেজিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকে। উল্লেখ্য, রাজকোষ চুরির ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক এক মাসের বেশি চাপা দিয়ে রাখে এবং ফিলিপাইনের পত্রিকায় প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় হয়।

ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনা প্রকাশের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কেন নানামুখী তথ্য দিচ্ছে বা চরম গোপনীয়তা বজায় রাখছে তা স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা চুরি হয়েছে? গত ১৩ মে জানা যায়, বাংলাদেশের ৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কয়েক লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে। এভাবেই দেশি-বিদেশি বর্গীদের কবলে পড়েছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তদন্ত কাজে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থার সূত্রে রয়টার্সের ১৩ মে প্রতিবেদনে বলা হয়, হ্যাকারদের বাইরে ব্যাংকের ভেতরে সুইফট নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত দুটি গ্রুপ এ হ্যাকিংয়ের সাথে জড়িত এবং এর মধ্যে একটি একটি ‘জাতীয়-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (“nation-state actor”) -যা ধ্বংসাত্মক হিসাবে পরিচিত নয়, তবে তথ্য চুরির সাথে সরাসরি জড়িত। শুধু তাই নয়, ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ খোয়া যাওয়ার ঘটনার দায় নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে যায় লাগাতার। গত ১১ মে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, মার্কিন সংস্থা ‘এফবিআই’ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত একজন ব্যাংক কর্মী জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পেয়েছে। এফবিআই দাবি করেছে, সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণে ইঙ্গিত রয়েছে, আরও কয়েকজন বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার-ব্যবস্থায় ঢুকতে হ্যাকারদের সহযোগিতা করে থাকতে পারে।

এদিকে, বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কম্পিউটারে ঢুকে হ্যাকাররা গত ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার চুরির  চেষ্টা করেছিল। অর্থের একটি বড় চালান ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যায়। আর এটা সম্ভব হয়, কারণ ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবরে আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) নামে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের বিশেষ সফটওয়্যার বসানোর সময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে সাইবার ও আইটি নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত ফায়ারওয়াল সফটওয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তার অনুমোদন না নিয়েই কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, এ ফায়ারওয়াল উঠানোর আগে ২০১৫ সালের মে মাসেই ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাকাতি শাখার ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়- যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ জমা হয় এবং এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, সবগুলো অ্যাকাউন্টই ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, রিজার্ভ লুটের ৩ মাস আগে আরটিজিএস স্থাপনে নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল নেটওয়ার্ক হতে মুছে দেওয়া এবং ১০ মাস আগে ২০১৫ সালের মে মাসে ব্যাংকে ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা কি একই সূত্রে গাঁথা? এটা কি হ্যাকিং এর নামে রিজার্ভ আত্মসাতের পথ উন্মুক্ত করার জন্যই করা হয়েছিলো? অভিযোগ সত্যি হলে কারা, কি উদ্দেশ্যে সেই সফটওয়ারটা মুছে দিয়েছিলো?

শুধু তাই নয়, সুইফটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুসারে, সুইফট সিস্টেম পরিচালনায় কোনো তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়ার শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক আইটি বিভাগের দুই জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়। এমনকি শর্ত লংঘন করে সুইফট নেটওয়ার্কের কম্পিউটারের সঙ্গে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক স্থাপন করে। এবং কেন এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কম্পিউটারের সংযোগ দেওয়া হলো তার উত্তর জানা যায়নি। সুইফট সার্ভার যে কম্পিউটারে রক্ষিত থাকে সে কম্পিউটারকে অন্য কোন সিস্টেম বা লোকাল নেটওয়ার্কে সংযোগ না দেওয়ার শর্ত থাকলেও সুইফট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ও সে কম্পিউটারে আরটিজিএস সিস্টেম কার নির্দেশে এবং কারা সংযোগ করলো? উল্লেখ্য, আন্তঃব্যাংক লেনদেনে (দেশে-বিদেশে) দ্রুত বড় অঙ্কের তহবিল  স্থানান্তরের নামে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক ও বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) সিস্টেম বসানো হয়। সব ধরনের শর্ত উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কম্পিউটার দিয়েই সুইফট ও আরটিজিএসের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অর্থ লেনদেন করতো বাংলাদেশ ব্যাংক। আরটিজিএস বসানোর সময়ে নিরাপত্তা ফায়ার ওয়াল সরানোর কোনো দিকনির্দেশনা না থাকলেও কেন ঐসব কর্মকর্তারা তা তড়িঘড়ি ফেলে দিতে অতি উৎসাহী ছিলেন? এভাবে সিস্টেম দুর্বল করে পরিকল্পিতভাবে চক্রটি রিজার্ভের অর্থ হাতিয়ে নেয় এবং সুইফটের সঙ্গে অরক্ষিত আরটিজিএস সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে সুইফট পদ্ধতিতে দুর্বলতা দেখানোর উদ্দেশ্যেই কি এটা করা হয়েছিলো?

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে যে, দীর্ঘ দিন ধরে সুইফট সিস্টেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক লেনদেন করে আসলেও এতদিন এ সিস্টেমের মাধ্যমে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার পরপরই রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি কেন ঘটলো? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, আরটিজিএস সফটওয়্যারটি দ্রুত বসাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা অতি-উৎসাহী ছিলেন। আরটিজিএস বসানোর কার্যক্রমটি আইটি-কমিউনিকেশন বিভাগের হওয়ায় তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন একজন ডিজি’র (ডেপুটি গভর্ণর)’র অধীনে ছিল এবং আরটিজিএস বসানোর সকল কার্যক্রম তিনি তদারকি করছিলেন বলে দাবি করা হয়। কিন্তু আরটিজিএস সফটওয়্যার চুড়ান্তভাবে বসানোর জন্য ওই ডিজির দেশের বাইরে ছুটিতে থাকাকালীন সময়কে কেন বেছে নেওয়া হয়? কেন তার অবর্তমানে এভাবে দ্রুত আরটিজিএস বসানোর ক্ষেত্রে উর্দ্ধতন অনেক কর্মকর্তার বিরোধিতা সত্ত্বেও অন্য একজন ডেপুটি গভর্ণরকে দিয়ে  স্বাক্ষর করানো হয় নথিতে? বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে একজন নির্বাহী পরিচালক ও সিএমএ স্মল সিস্টেম এবি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সিএমএ’র স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশের মেসার্স স্পেক্ট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর। প্রশ্ন হচ্ছে, চলমান দেশি বিদেশি সব তদন্তের আওতায় তাদেরকে যথাযথভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে কি?

বাংলাদেশ ব্যাংক এক কোটি ৯৯ লাখ মার্কিন ডলার শ্রীলংকা থেকে ফেরত আনার দাবি করলেও আরো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন থেকে উদ্ধার করা যায়নি এখনো। যদিও ফিলিপাইন সরকার ব্যবসায়ী কিম অংয়ের কাছ থেকে কিছু ডলার উদ্ধার করতে পেরেছে বলে দাবি করেছে, তবে মূল কুশীলবদের এখনো বের করতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বলছে, অচিরেই এই টাকা ফেরত আসবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির শুনানিতে ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে যে অর্থ ফেরত দেয়া হয়েছে এবং অর্থ ফেরত দেয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার পরিমাণ ১ কোটি ডলারের মতো। বাকি আরও কিছু অর্থের সন্ধানের কথা তারা বলছেন, কিন্তু তার কোনো হদিস করা যায়নি। ফিলিপাইনের ইনকোয়ারার পত্রিকা বলছে, প্রায় চার কোটি ডলারের কোনো হদিস বা সন্ধান ওই দেশের সরকার পায়নি। বাংলাদেশের যে দাবি অর্থাৎ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তারও কোনো ভিত্তি নেই। ইতোমধ্যেই ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, আইনগত জটিলতার কারণে কতোদিন সময় লাগবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পুরো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফেরত পাওয়া যাবে এমন কথা ফিলিপাইনের সরকারও বলছে না, বরং এক্ষেত্রে একটি বড় আশংকার কথাই তাদের দিক থেকে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া ক্যাসিনো আইন আলাদা হওয়ায় ওই ব্যবসায়ীর ফেরত দেয়া অর্থ আদৌ বাংলাদেশ পাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়।  অর্থ চুরির তদন্ত করছে ফিলিপাইনের সিনেট ব্লু -রিবন কমিটি ও অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি)।

ফিলিপাইনের পত্রিকাগুলো দাবি করছে, দ্বিতীয় দফায় আরো ৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার – যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬,৯৬০ কোটি টাকা চুরি করে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। ফেডারেল রিজার্ভের সন্দেহ হওয়ায় তা আটকে দেয়া হয় এবং ফেডারেল রিজার্ভ সে অর্থ ফিরিয়ে নেয়। আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে মুখ খোলেনি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ ছাড়ে ফেডারেল রিজার্ভে সর্বমোট ৩৫টি আদেশ পাঠানোর দাবি করলেও তা যে অসত্য তার প্রমাণ পায় তদন্ত দল। তারা  কম্পিউটারের তথ্য থেকে জানতে পারে, আসলে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার পাঠানোর মোট ৭০টি আদেশ পাঠানো হয়েছিলো। সে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে না থাকায় ফেডারেল রিজার্ভে তা যায়নি। আর এ কারণেই লেনদেনে সন্দেহ হয় ফেডারেল রিজার্ভের, তাই প্রথম দিকের আদেশগুলো কার্যকর করলেও পরের আদেশের বিষয়ে কনফার্মেশন চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন সাড়া না পেয়ে অর্থ ছাড় আটকে দেয় ফেডারেল রিজার্ভ। প্রশ্ন হলো- অসংখ্য প্রশ্নের জবাব মিলছেনা বা কোন জবাবই নেই কেনো? এদিকে, সবশেষ তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থাসমূহ। রয়টার্স এক খবরে বলেছে, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে তিন মাসেরও বেশি সময়। এ অর্থের সিংহভাগ যাঁরা ফিলিপাইনের একটি ব্যাংক হয়ে ক্যাসিনোয় পাচার করেছিলেন, তাঁদের সবাই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদন্তে দেশটির ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকেও (এনবিআই) যুক্ত করা হয়নি পুরোমাত্রায়। সিনেটে যে শুনানি শুরু হয়েছিল, গত সপ্তাহে তাও শেষ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। ঝিমিয়ে পড়েছে ফিলিপাইনের তদন্তও।

লোপাট দুর্নীতি আর খেলাপী ঋণে বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

মন্দ বা কু-ঋণের ভারে জর্জরিত দেশের ব্যাংকিং খাত। আর এ দুর্নাম থেকে বের হতে নতুন পদ্ধতি নিয়েছে ব্যাংকগুলো। মূলত খেলাপী ঋণ কম দেখাতে ব্যাপকহারে ঋণ অবলোপন করতে শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। কু-ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণই মূলত অবলোপন করা হয়। তবে অবলোপন করার পরও যেহেতু আদায়ের সুযোগ থাকে তাই খেলাপী ঋণের পরিমাণ কম দেখাতে ঋণ অবলোপনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপী ঋণ কম দেখাতে ব্যাংকগুলো গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা অবলোপন করেছে। এর মধ্যে গত এক বছরে অবলোপন করা হয়েছে ৪ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত অর্ধেকের বেশি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের।

বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি মন্দ ঋণ অবলোপন করেছে ২০১৩ সালে। ওই বছর অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এতে বছর শেষে অবলোপন করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩০ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০১২ সালে অবলোপন হয়েছিল দুই হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালে ৬ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। ওই বছর শেষে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে অবলোপন করা হয়েছে চার হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এ ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে অবলোপন করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমান ছিল ১৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে তিন হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুই ব্যাংক অবলোপন করেছে ৫৫৫ কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৭ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালে ছিল ১৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা। আগের বছর শেষে ছিল ১২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ৪০৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০৫ কোটি টাকা। গত ২০১৩ সালে ছিল  ৪৩৪ কোটি টাকা। ঋণ অবলোপনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রচুর ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে খেলাপী ঋণ আরও বেশি হওয়ার কথা। গত ২০১৪ সাল শেষে খেলাপী ঋণ ছিল ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।

এদিকে রাজনৈতিক আধিপত্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির অভাব ও টানা কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকিং খাতে গভীর সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’। একই সঙ্গে আর্থিক নীতি প্রণয়নে অকার্যকারিতা, শিথিল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ তদারকির অভাব বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা প্রকট হয়ে উঠেছে বলেও মনে করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পর্যালোচনা ২০১৬’ এর মার্চ মাসের সংখ্যায় সামগ্রিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, শেয়ার মার্কেটে ধস, অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ প্রভৃতি ব্যাংকিং খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আর এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রতিরোধ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও তত্ত্বাবধায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ব্যাংকিং খাতে বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দিক সম্পর্কে উন্নয়ন অন্বেষণ জানায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ (নন পারফরমিং লোন) ৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে এসে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উপনীত হয়েছে। খেলাপি ঋণের এ হার ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর এসে বেড়ে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ উপনিত হয়েছে। এ ছাড়া খেলাপী ঋণ ও অবলোপণকৃত ঋণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ঋণ আদায়ে এ ব্যর্থতার জন্য ব্যাংকগুলোর অদক্ষতাকেই দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে প্রতিবছরই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অথচ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না; যা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতির অকার্যকারীতাকেই প্রমাণ করে। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছিল। অথচ অর্জিত হয়েছিল ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। অনুরূপভাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হলেও অর্থবছর শেষে মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ঋণের বিস্তার ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির মধ্যে যোগসূত্র নির্দেশ করে ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির শ্লথ গতি বিনিয়োগ হ্রাস করবে।

এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে নেওয়া নীতিসমূহ উচ্চ সুদের হার ও সুদের হারের ব্যবধান কমাতে এবং আর্থিক অর্ন্তভূক্তি ত্বরান্বিত করতে পারেনি। অন্যদিকে, সরকারি ও ব্যক্তিখাতে ব্যাংকের ওপর অধিকৃত পরিচালন ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অদূরদর্শিতা ব্যাংক কেলেঙ্কারি এবং ঋণ খেলাপির মতো সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ খাতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়ে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে; যা গত বছরের এই সময়ে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ ছিল। একইভাবে এ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশে উপনীত হয়েছে। খাতটিতে গত বছরের একই সময় ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকে তারল্য বাড়ছে। আশানুরূপ ঋণ চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর তারল্য জমে আছে। বেড়েছে ব্যাংকিং খাতের পরিচালন খরচ। পাশাপাশি কমেছে ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা। এতে ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে রয়েছে অতিরিক্ত তারল্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতবছর (২০১৫) শেষে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংরক্ষণের প্র্রয়োজন ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো রেখেছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত তারল্য ১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অথচ ওই বছরের জুনে এর পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ বিদেশ থেকে সরাসরি সহজ শর্তে ও তুলনামূলক সুবিধাজনক সুদে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছে। যার কারণে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি ঋণের চাহিদা কমে গেছে। ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণ বেড়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বছরের শেষ সময়ে এসে সব ব্যাংকই ঋণ আদায় করে। ফলে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও একই প্রবণতা হতে পারে। কারণ বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করে লোকসান গুনতে চাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে গেছে। তবে ব্যাংকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য থাকলে তা অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) তারল্য রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। এই ৫ ব্যাংকের তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪১ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা, তারল্য স্থিতি রয়েছে ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ১ লাখ ৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকার তারল্য স্থিতি রয়েছে। এসব ব্যাংকের তারল্যের প্রয়োজন ছিল ৬৯ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। বেসরকারি ইসলামিক ব্যাংকগুলোর তারল্য স্থিতি ৩০ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, প্রয়োজন ছিল ১৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ২১ হাজার ২২ কোটি টাকার তারল্য সম্পদ রয়েছে। এ সময়ে বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৬ হাজার ৯৬১ কোটি টাকার তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল।

জানা যায়, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে এ বছরের প্রথমার্ধ জানুয়ারি-জুনের মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদহার কমানোর ফলে সার্বিক ঋণ-আমানতে সুদহার কমেছে। ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ ও আন্তঃব্যাংক (কলমানি) মার্কেটে সুদহার নিম্নপর্যায়ে থাকায় নীতি সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর ব্যাংকগুলো গড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। কিন্তু গতবছর শেষে সেটা আরো কমে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে আমানতের সুদহার কমার সঙ্গে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদও কিছুটা কমিয়েছে। ২০১৪ সাল শেষে ব্যাংকগুলো গড়ে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। গতবছর সেটা কমে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে ভালো অবস্থায় নেই ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি।

বাংলাদেশ কী রাষ্টীয় অর্থ পাচার ও চুরির স্বর্গ

এম. জাকির হোসেন খান ::

‘টাকা বেড়েছে, তাই পাচার বেড়েছে। নতুন করে বাড়েনি। এটাও দেশের উন্নয়নের একটি চিত্র”। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে অর্থ পাচারের সম্পর্ক বিষয়ক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ নতুন তত্ত্ব কতখানি বাস্তবতা বা অর্থনীতির তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ ২০১১ সালের পর ১০ জুন অর্থমন্ত্রী বাড়তি টাকার উৎস যে অবৈধ তা উল্লেখ করতে গিয়ে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমান জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর আগে স্লাইডার, বুয়েন এবং ক্লডিও ২০০৭ সালে বাংলাদেশের কালো অর্থনীতির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ এবং হাসান ২০১০ সালে  ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ৩৮.১% থেকে ৩৯.২% বলে উল্লেখ করেন। আর কালো টাকার উপস্থিতি সরাসরি স্বীকার না করলেও  ভোটারবিহীন সংসদের নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটের ওপর বক্তব্যে বলেছিলেন, “দেশে কালো টাকা বলে কোনো টাকা নেই। যে টাকাকে কালো টাকা বলা হচ্ছে তা বিদেশে পাচার করে সাদা করা হয়”। আর  রাজস্ব সংস্কার কমিশন রিপোর্ট ২০০৩-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘কালো অর্থ পাচারের গন্তব্যস্থল বা নিরাপদ স্বর্গ হলো বিদেশী ব্যাংকগুলো যার মাধ্যমে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হয়” (পৃ.১৮৫)।

বিশ্বব্যাপী সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাঁচার সম্পর্কিত গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ২০০৩-২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাচার হয়, যা থেকে সরকার কমপক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন তারিখে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। ২০০৮ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কমলেও আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের আমানত বাড়ছে। ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ২০১২ সাল থেকে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়।

আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ পাচারকৃত অর্থের পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ হতে পারে; কারণ বেনামে বা অন্য কোন দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নামে গচ্ছিত অর্থ বা মূল্যবান গহনা ও দূর্লভ সামগ্রীর মূল্য অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাক্কলনের পরিমাণ খুবই কম। আর এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আর্থিক খাতে জালিয়াতির সাথে জড়িত তার প্রমাণ হলো শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানি জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও শুধু সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছে না বলে মনে করেন ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেন, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”। উল্লেখ্য, দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ ক্ষমতাবানরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা।

আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সংযোজন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকার ওপর রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে যা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ভয়াবহ পরিস্থিতিকেই নির্দেশ করে। পৃথিবীর কোনো দেশে রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির এরকম ভয়াবহতম ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী রেকর্ড নেই, সেক্ষেত্রেও রেকর্ড সৃষ্টি করল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পরও অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচার হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পেলো, তার মাধ্যমে জানা গেলো- কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্ত বৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাচার করছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ২০জন বাংলাদেশি বড় ব্যবসায়ী নিজ নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ‘‘কর স্বর্গ’’ বলে পরিচিত- যেমন জার্সি দ্বীপ এবং বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপসমূহে -অর্থ পাচার করার খবর নিউ এজ পত্রিকায় ২০১৩ সালেই প্রকাশ করা হয়। শুধু তাই নয়, আমেরিকা, দুবাই, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, মালয়েশিয়া এবং ভারতে নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ‘সেকেন্ড হোম’ বা ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে  প্রকৃত কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। উল্লেখ্য, ২০১৩ এর  শেষ দিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য সেকেন্ড হোম প্রকল্পে আবেদন করেছিলেন ৬৪৮ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি, যাদের অধিকাংশই সুবিধাভোগী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও আমলা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক অন্তত ৫০টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব টাকা লেনদেন হয়। আর সুইস ব্যাংক হলো এসবের প্রধান সিন্ডিকেট। যে টাকার কথা বলা হচ্ছে তা নগদ টাকা। এছাড়া বাড়ি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসার মাধ্যমে আরো অন্তত তিন লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার বেশি অর্থ পাঠানো যায় না। চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা, যেগুলো কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলো? বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের পর অন্য  কোনো কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় চাপা পড়ে যায়, আর ধরা পড়লেও প্রভাব খাটিয়ে অর্থ বাজেয়াপ্তের মতো ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে, কর কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে বাংলাদেশ থেকে সহজে মূলধন পাচার হয়ে যাচ্ছে আরো কম করহার ও কম আইনি জটিলতার দেশে। ২০০০ সালে প্রণীত বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশ যদি অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে এমন দেশের (যেমন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি) পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে নিয়ে আসতে পারতো, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অতিরিক্ত আরো ২.১৪% বৃদ্ধি পেয়ে  ৬% থেকে ৮.১৪% হতো”। অর্থাৎ মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১০-১১ অর্থ বছরে অর্থাৎ ৫ বছর আগেই ১০৪০ ডলারে পৌছতো। উল্লেখ্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ০-১০০ পয়েন্ট স্কেলে ২৫ পয়েন্ট পেয়ে ২০১৩ সালের তুলনায় তালিকার উচ্চক্রম অনুযাযী বাংলাদেশের ৯ ধাপ অবনতি হওয়ায় এটা সুনির্দিষ্টভাবে সমাজে অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং তা পাঁচারের ঘটনাতেই নির্দেশ করে।

‘দুর্নীতি সেখানেই বিস্তার লাভ করে যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বচ্ছতা এবং প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনীতি অনুপস্থিত থাকে; স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং কার্যকর আইন-শৃংখলা বাহিনী রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রধান নিয়ামক (কওফম্যান, ২০১০)।

‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)’ এর আওতায় ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’ এগমন্ট গ্রুপের আওতায় বিভিন্ন দেশকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। উল্লেখ্য, ভারত সরকার কালো টাকা তদন্তে বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করে এবং পানামা পেপার্সে ভারতীয়দের নাম আসায় তদন্ত করার জন্য একটি টিম করেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনা প্রথমে শুধু চেপেই রাখা হয়নি তার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংকের ওপর চাপানোর চেষ্টা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনের সিনেটে উন্মুক্ত শুনানির ব্যাবস্থার মাধ্যমে এসব পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে দিতে তৎপর থাকলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংসদ বা সংসদ সদস্যরা  নির্বিকার। এমনকি এ চুরির ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি বাস্তবে কতখানি সফল হবে এবং দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাতে পারবে তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। শেয়ার বাজার কেলেংকারি নিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিত খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলেও কোনো বিচার হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার চাইলে তথ্য বিনিময় এবং পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতি নির্ধারণে সুইস সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে পারে।

একথা মনে রাখা প্রয়োজন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে উপনীত হয় যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সাক্ষর করায় বাংলাদেশ সকল প্রকার দুর্নীর্তির মাধ্যমে অর্জিত কালো অর্থের উৎস বন্ধ এবং সুইস ব্যাংক সহ ‘‘কর-স্বর্গ” বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত সকল অবৈধ অর্থ উদ্ধারে সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইন মন্ত্রণালয়/এটর্নি জেনারেলের অফিসের সমন্বয়ে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।