Home » আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি : চীন-ভারত দ্বন্দ্ব চরমে

আসিফ হাসান

আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতির বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশগুলোর অন্যতম চীন আর ভারত।  চীনের তুলনায় ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে থাকলেও  উদীয়মান শক্তির মর্যাদা  পেয়ে গেছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে উভয়েরই।  আবার দেশ দুটির প্রতিবেশীরা তাদের তুলনায় ‘লিলিপুট’। গালিভাররের কাছে এই লিলিপুটরাই আবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে। দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির উভয়ের কাছ থেকে তারা যেমন কখনও কখনও সহায়তা পাচ্ছে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলোমেলোও হয়ে পড়ছে।  বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা বড় ধরনের পরিবর্তনই যেন অবধারিত করে তুলেছে।

বর্তমানে সময়টা এমনই যে অন্য কিছু ভাবার মতো অবস্থাও নেই।  চীন-ভারতের উত্থানের কারণেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ভারত মহাসাগর। চীন প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে। তাকে ভারত মহাসাগরের বাইরে কিছুই যেতে দেবে না মার্কিন নেতৃত্বাধীন  শক্তি।  আর এ কারণেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হোক যুক্তরাষ্ট্র  তা চায়। কিন্তু চীনও হার মানার পাত্র নয়। দীর্ঘ দিন ভারতের আধিপত্যের এলাকা হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে সে হানা দিচ্ছে জোরালোভাবে।

শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি সরকার পরিবর্তন যেভাবে ঘটেছে, তাতে করে মনে হচ্ছে, ওহানে নরেন্দ্র মোদি আর শি জিনপিঙের অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকের রেশ ধরে উপমহাদেশে শান্তির বাতাসের চেয়ে অশান্তির ঝড়ই দেখা যাচ্ছে অনেক বেশি।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঘরোয়া ইস্যুগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিও ওঠে আসছে বড়ভাবে।  রনিল বিক্রমাসিঙ্গের সাথে মহিন্দা রাজাপাকসের দ্বন্দ্বে পেছন থেকে ভারত আর চীনের কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি অবধারিতভাবেই অনুভব করা যাচ্ছে। বিক্রমাসিঙ্গে ভারতপন্থী আর রাজাপাকসে চীনপন্থী। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার বিক্রমাসিঙ্গের বদলে রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করাটা দেশীয় পরিসরেই বিবেচিত হচ্ছে না।

কলম্বোতে এই পরিবর্তনের ফলে শ্রীলঙ্কায় প্রস্তাবিত ভারতীয় বিনিয়োগ, বিশেষ করে মাত্তালা বিমানবন্দর, কলম্বোর ইস্ট কন্টেইনার টার্মিনাল, কেরাওয়ালাপিতিয়ায় এলএনজি প্লান্ট, জাফনার পালালে বিমানবন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে। আর ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে। এই পরিবর্তন নিয়ে চীন যে খুশি, তা বেশ নিশ্চিত। গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্রবন্দরসহ চীনা প্রকল্পগুলোও প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ছিল। ঘরোয়া অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চীনা ঋণের দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব নিয়ে সরকার উদ্বেগে পড়েছিল। কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে সহিংসতা ও বিরোধিতাও সৃষ্টি হয়েছিল। এখন রাজাপাকসাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ফলে এই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেবে, বেইজিং সুবিধা পাবে। এতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নতুন গতি পাবে, চীনা বিনিয়োগ বাড়বে।

প্রেসিডেন্ট থাকার সময় চীনের প্রতি রাজাপাকসে ঝুঁকেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। অভিযোগ রয়েছে, তাকে বিদায় করতে কোমর বেঁধেই নেমেছিল দিল্লি। সফলও হয়েছিল। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে দান উল্টে গেল। বিক্রমাসিঙ্গে আউট, রাজাপাকসে ইন। ্রপরেও যে সবকিছু ঠিকঠাক তা বলা যাবেনা।

তাহলে কি মালদ্বীপেও একই ঘটনা ঘটবে? মালদ্বীপে যে অবস্থা ছিল তাতে আবদুল্লাহ ইয়ামিন হেরে যাবেন, তা কেউ ভাবেনি। যেমন ২০১৫ সালে ভাবেননি রাজাপাকসে। কিন্তু নির্বাচনী সমীকরণ মেলাতে পারেননি রাজাপাকসে। ইয়ামিনও পারেননি। চীনের দিকে দেশকে বেশ ভালোভাবে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্ভব সবভাবে ভারতকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন। তার জের ধরে ক্ষিপ্ত হচ্ছিল পাশ্চাত্য বিশ্বও। তারা সবাই জোট বেঁধেছিল মালদ্বীপকে আবার নিজেদের বলয়ে ফিরিয়ে আনার জন্য।

মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে সবচেয়ে বড় মিলটি হলো উভয়েই দ্বীপ দেশ। আর তাদের অবস্থান ভারত মহাসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের একেবারে কাছে। এই রুটের নিয়ন্ত্রণ লাভ খুবই জরুরি। ফলে দেশ দুটির দিকে নজর একটু বেশিই।

মালদ্বীপে চীনাপন্থী প্রেসিডেন্টের পতনের কিছু দিনের মধ্যেই শ্রীলঙ্কায় পট পরিবর্তন কি বদলা নেয়া? এত দিন মনে হতো, চীন কেবল তার সফট পাওয়াই ব্যবহার করে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ঘটনায় কি মনে হয়, তারা ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছে? এমন আশঙ্কা কিন্তু আরো আগে থেকেই করা হচ্ছিল। মালদ্বীপ আর শ্রীলঙ্কায় চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট শি’র ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য উভয় দেশই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এই দুটি দেশ অন্য দিকে গেলে চীনা উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি আঁতুর ঘরেই মরে যেতে পারে। ফলে নিজের দিক থেকে দেখতে গেলে মনে হবে, চীনের পিছু হটার সুযোগই ছিল না।

কিন্তু ভারত কি ছেড়ে দেবে? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ? এখানে ছাড় দেয়া মানে চীনের লাগাম ধরার পুরো পরিকল্পনাই ভণ্ডুল হয়ে যাওয়া।

একই কথা প্রযোজ্য নেপাল, ভুটানের ক্ষেত্রেও। এ দেশ দুটি আরো প্রবলভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল । ভুটান নিজ সিদ্ধান্ত কতোটা স্বাধীনভাবে নিতে পারে  সে প্রশ্নও ওঠে মাঝে মাঝে। নেপালও কাছাকাছি অবস্থায়। ভূবেষ্টিত দেশ দুটিকে ভারতের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়।  কয়েক বছর আগেও ভারতকে এই দেশ দুটি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এখন তার ঘুম হারাম হবার উপক্রম।

যদি বলা হয়, নেপাল এখন প্রায় ভারতের হাতছাড়া হয়ে গেছে, তবে বাড়িয়ে বলা হবে না।  কে পি ওলির নেপাল এখন দ্রুত গতিতে চীনের দিকে ঝুঁকছে।

ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিংয়ের অর্থনৈতিক এজেন্ডা হিমালয় অঞ্চলের এ দেশটির সাথে ভারতের সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির পর্যবেক্ষকরা  মন্তব্য করেছেন। সাবেক কূটনীতিক ও দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এসডি মুনি বলেন, তারা যদি তাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয় এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাইরে তাদের অর্থনীতিকে আরো সম্প্রসারণ করে, তাহলে ভারতের উপর নিশ্চিতভাবে এর প্রভাব পড়বে।

আবার গত বছরের দোকালাম-এ সামরিক অচলাবস্থার পর থেকে ভুটানে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণের দাবি উঠেছে। তাদের অভিযোগ ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের দ্বারা খুব বেশি  নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত । ফলে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিস্পত্তি করা যাচ্ছে না বলে অনেকে মনে করছে। তাদের মতে, ভারতই বাধা দিচ্ছে, নিষ্পত্তির দিকে না যেতে।

চীন ও ভুটান দু’দেশই দোকলামের উপর মালিকানা দাবি করছে। স্থানটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। ওই এলাকায় চীনা সৈন্যরা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারতীয় সেনারা গিয়ে বাধা দেয়। ভারতের কৌশলগত গুরত্বপূর্ণ ”চিকেন নেক” – শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে দোকলামের অবস্থান। এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো সংযুক্ত। ফলে এখানে ভারত ও চীনের ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে।

এদিকে, শেরিং যে অর্থনৈতিক রূপরেখা উত্থাপন করেছেন, তাতে করে অবধারিতভাবেই তাকে ছুটতে হবে চীনের দিকে।  ভুটানের তরুণরাও চাচ্ছে, তাদের দেশ যাতে কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত হতে চাইছে। আর তাতেই ভারতের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।

এক দশকের বেশি সময় আগে রাজা জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচক ভুটানে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালু করার পর থেকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার দেশটি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মাঝে থাকা ভুটানের অবস্থান কি হবে তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভারত যেহেতু এই অঞ্চলে তার ন্যায্য নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিসরনে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ভুটানে তার উপস্থিতি অতিমাত্রায় অনুভুত না হয়। ভুটানের জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থটিকেই মনে রাখতে হবে।

এমন প্রেক্ষাপটেই সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রাথমিক রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক ক্ষমতাসীন দল  পিপলস ডেমক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। জয়ী হন কিছুটা স্বাধীনচেতা ড. লোটে শেরিংয়ের দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি)।

এদিকে, চীনের সাথে সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে নেপালের। কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।  নেপালিরা যেন পণ করেছে, তারা ভারতের নাগপাশ ছিন্ন করবেই।  বিশেষ করে ২০১৫ সালের অঘোষিত অবরোধের পর নেপালি জনমত এখন প্রবল ভারতবিরোধী। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে চীন। তারা নানাভাবে নেপালে তাদের অবস্থান জোরদার করছে।

নেপাল ও ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে তাদের পক্ষে কোনোভাবেই ভারতের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা হলো একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তাতেই ভারতের ক্ষতি, চীনের লাভ।

এই লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে গিয়েই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নির্মমতার শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। ভূ-রাজনীতির যে খেলা চলছে মিয়ানমারে তাতে একটি বড় রণাঙ্গন হচ্ছে আরাকান রাজ্য। চীন সেখানে ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক জোন, তেলের ডিপো নির্মাণ করতছ ও আরো করতে চায়। কিন্তু পাশ্চাত্য কাজটি সহজে হতে দিতে চায় না। আর পরিণামে সেখানকার রোহিঙ্গারা দাবার ঘুঁটির মতো মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার হলো।

রোহিঙ্গাদের ওপর এমন অত্যাচার সত্ত্বেও  চীন ও ভারত  কিন্তু মিয়ানমারকে কাছে টানতে হেন কাজ নেই যা করছে না।  ভারতেরও অ্যাক্ট ইস্ট নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য মিয়ানমারকে প্রয়োজন।

 

চরমমাত্রার দমন-পীড়ন প্রহসন ও ভোট-ডাকাতির ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ : ক্যামেরুন স্টাইল

ফরেন পলিসি থেকে

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

রাজা না হয়েও পল বিয়ার বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ধরে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বহাল থাকাটা কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়। তিনি ক্ষমতায় আছেন ৩৬ বছর ধরে, এখন সপ্তম মেয়াদের জন্য ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশকে ‘‘পরিচালনার’’ করার আসল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। সাংবিধানিক পরিষদ তাকে ক্ষমতায় রেখেছে, বিষয়টি এমনও নয়। তিনি রীতিমত ‘‘নির্বাচনে জিতে’’ তবেই ক্ষমতার মসনদে আছেন!

বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতে, যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদন্ডেই গত ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ক্যামেরুনের নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ভয়াবহ রকমের কম। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভয়ের কারণে কোনো কোনো এলাকায় এক শতাংশেরও কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলে কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর পরিচালিত কঠোর দমন অভিযানের ফলে অনেক ভোটকেন্দ্র বন্ধ থাকে, বাকিগুলোতে মূলত সৈন্যদেরই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

তবে ওই  দেশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া আপনাকে জানাবে, নির্বাচন হয়েছে চমৎকার। আর তাদের বক্তব্যের সমর্থনে ’বাইরের পর্যবেক্ষকদের’ উদ্ধৃতিও দিয়ে হলেও প্রমাণ করতে চাইবে, নির্বাচন হয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ।

গত ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্যামেরুন রেডিও ও  টেলিভিশন (সিআরটিভি) একদল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সাক্ষাতকার প্রচার করে। এতে তারা দেশটির নির্বাচনের প্রশংসা করে একে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করেন। সিআরটিভিতে প্রদর্শিত ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নুরিট গ্রিনজার নামে অভিহিত এক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ক্যামেরুনের নির্বাচনকে ’চরমমাত্রার সুষ্ঠু’ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার ব্যবস্থা প্রতারণা করার কোনো পথ ছিল বলে আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

তবে এখানে একটু জটিলতা আছে বৈকি; ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ক্যামেরুনে কোনো নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠায়ইনি। আর সিআরটিভিতে যাকে দেখা গেছে, তার সাথে গ্রুপটির কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে খোদ ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ট্রান্সপেরেন্সি’র মুখপাত্র মাইকেল হর্নসবে বলেন, ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচয় দানকারী এই লোক কে, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। সংগঠনটির মুখপাত্র ফরেন পলিসিকে বলেন, তবে আমি মনে করি, বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করার পরও এক লোক বারবার বলছেন, তিনি আমাদের প্রশিক্ষিত লোক।

অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধতার রঙ দিতে স্বৈরশাসকরা নতুন পদ্ধতি হিসেবে এই আশ্চর্য ব্যবস্থাটিকেই ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার করছে। বহিরাগতদেরকে ব্যবহার করার এই বিশেষ কৌশলটি এখন দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আবার গণতন্ত্রী হিসেবে ভান করা দুনিয়ার সব স্বৈরাচারের মধ্যে পল বিয়া অন্যতম কড়িৎকর্মা। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনি অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বেশি ভুল করেছেন, কিন্তু তাতে তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল থাকতে কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না।

আফ্রিকায় গণতন্ত্র বিকাশে নিয়োজিত অমুনাফামূলক সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড আফ্রিকা’র নির্বাহী পরিচালক জেফরি স্মিথ বলেন, ক্যামেরুন ও অন্যান্য স্থানে সত্যিকার অর্থে যা ঘটছে তা অতি মাত্রায় অবমাননাকর, দমনমূলক। আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার কাজটি কোনো না কোনোভাবে করে নেবে।

এই কৌশলের মধ্যে যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য প্রধান শক্তি যাতে বিব্রতকর হওয়ার মতো কোনো অবস্থায় না পড়ে, সে দিকে নজর রাখা হয়। বিয়ার এলাকাটি ছোট হলেও অত্যন্ত শক্তিধর লবিং গ্রুপ আর গণসংযোগ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাইরের দুনিয়ার কাছ থেকে মর্যাদা কেনার প্রয়াসে তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির মিডিয়া ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সংস্পর্শ বজায় রাখে।

ক্যামেরুনে ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রথম নারী প্রার্থী কাহ উল্লাহ তার দেশকে ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের বিষয়টি মাথায় রেখেই ক্যামেরুনের বিরোধী দল বাস্তবে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, তার দল, আমলাতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও এমনকি বেসরকারি মিডিয়ার বেশির ভাগের (যেগুলো দলের ক্যাডার আর সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করে) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তিনি বলেন, ভোটের দিন আমাদের দলের প্রতিনিধিদের ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া হুমকি, ঘুষ প্রদানের ব্যাপার তো রয়েছেই। বিরোধী দল হিসেবে আমাদেরকে সারাক্ষণ ভোটকেন্দ্রগুলোর পাশে ধাওয়ার শিকার হতে হয়’’।

ক্যামেরুনের সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিল। এই পরিষদের সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান পল বিয়া। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই পরিষদের সদস্যদের অভিযোগ শোনার কথা ছিল। কিন্তু তারা প্রার্থীদের তাদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দাখিলের সুযোগ না দিয়েই চলে যান।

ক্যামেরুনের উচ্চমর্যাদার অ্যাংলোফোন মানবাধিকার আইনজীবী এনকোনখো ফেলিক্স অ্যাগবোর বাল্লা অতিসম্প্রতি সাংবিধানিক পরিষদে বলেন, যেকোনো নির্বাচনী চ্যালেঞ্জেই আসুক না কেন, রায় যাতে পল বিয়ার পক্ষে যায় সে ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছিলেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, বিচারকেরা যার ওপর নির্ভরশীল, তাকে তো আর ক্ষেপাতে পারে না, তারা তাদের প্রভূর বিরুদ্ধে যেতে পারে না। এসব লোক কখনোই বিয়াকে নির্বাচনে হারতে দেবে না।

বিয়া বছরের পর বছর ক্ষমতায় রয়েছেন তার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার এলিটদের কাছে টেনে, বিভক্ত বিরোধীদের দুর্বল করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে- যারা নির্বাচন নজরদারি করে, তাদের নতজানু করে।

সহিংসতা ও দীর্ঘ দিনের বেপরোয়া দুর্নীতি ক্যামেরুনের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিয়া তার পুনঃনির্বাচনের জন্য প্রধান প্রধান যুক্তি হিসেবে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকানের মতো প্রতিবেশীদের তুলনায় তার দেশের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।  স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাব-সাহারিয়ান আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নাটালি লেতসা বলেন, দশকের পর দশক ধরে বিয়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলে আসছেন, আমাদের প্রতিবেশীদের দিকে তাকান, নাইজেরিয়াকে দেখুন, কী বিশৃঙ্খলা চলছে। আমরা স্থিতিশীল, আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা গর্ব করার মতো শক্তিশালী দেশ।

তিনি বলেন, যেসব তথ্য সম্পর্কে দেশবাসী সহজে জানতে পারে না, সেগুলোই বিয়ার সরকার তোতাপাখির মতো আউরিয়ে যাচ্ছে।

ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি : দিল্লির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র

আসিফ হাসান ::

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের হুমকিকে তোয়াক্কা না করে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে ভারত।  কেবল এই ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরকালে দুই দেশ আরো কয়েকটি চুক্তিতে সই করেছে।  এতে করে ভারতের মনোভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে ; আর তা প্রকাশ করতে রাখঢাকও করছে না ওয়াশিংটন।

বিশেষ করে মার্কিন সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরাই এখন ভারত-রুশ সামরিক চুক্তি নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। এই চুক্তির ফলে রুশ ও চীনা অস্ত্রের বিপরীতে মার্কিন অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে ধারণা যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে আসছিল, তাতেও চিড় ধরেছে।  মার্কিন অস্ত্র বাদ দিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অস্ত্র কেনার এই উদাহরণটি অন্যান্য দেশও ব্যবহার করতে পারে। তাতে আরো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র- এমনটাই এখন আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের।

সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড ওয়াশিংটন এক্সামিনারকে বলেন, রুশ-ভারত চুক্তিটি ভারত-মার্কিন সমঝোতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা যখন রুশ অস্ত্র কেনা নিয়ে কথা বলে, তখন এর কী অর্থ হতে পারে, তা খুবই পরিষ্কার।

রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যে এস-৪০০ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তির ফলে ভারতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে বড় ধরনের অস্ত্র কিনলে তাদের ওপরও অবরোধ আরোপ করা হবে।

তাছাড়া রুশ-ভারত ওই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতামূলক চুক্তি ‌”সিওএমসিএএস”-এর কার্যকারিত হ্রাস হতে পারে বলেও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান বব কোরকার বলেন, ভারতের সাথে সিওএমসিএএসএ চুক্তি সই করা ছিল বিরাট এক অগ্রগতি। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছিল। ভারতের উচিত হবে না মার্কিন অবরোধ আরোপ হয় এমন কিছু করে এই অগ্রগতি হ্রাস করা।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইক পম্পেইও এবং ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে সই হওয়া ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারতের কাছে স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তর ও গোয়েন্দা তথ্য তাৎক্ষণিক সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

বেশকিছুদিন ধরে   ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের মোদি সরকার যেমন অতি-আগ্রহী ছিল, যুক্তরাষ্ট্রও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিল ব্যবসার সাথেসাথে আঞ্চলিক ও ভারত মহাসাগরকেন্দ্রীক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকা আর হিন্দু ভারতের মিলন বেশ সহজ মনে হতব বলে মনে করা হচ্ছিল।

এর মধ্যেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্য নয়াদিল্লীতে যে ২+২ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের অংশীদারিত্বের সম্পর্ক অনেকখানি এগিয়ে যায়।

যেকোনো দিক থেকেই ওয়াশিংটনের জন্য এটা ছিল বিজয়। বহু বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ব্যবসার চুক্তির দুয়ার এখন খুলে যাবে-এটাই ছিল প্রত্যাশা। একই সাথে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্রশান্ত জোটের দিকেও ভারতকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। এভাবেই ২+২ সংলাপ থেকে একক বৃহৎ যে অর্জনটা হয়েছে সেটা হলো কমিউনিকেশান্স কমপ্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট (সিওএমসিএএসএ) চুক্তি স্বাক্ষর। এই চুক্তির অধীনে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়বে, আমেরিকা ভারতের কাছে স্পর্শকাতর প্রযুক্তি রফতানি করতে পারবে এবং মার্কিন গোপন তথ্যভাণ্ডারের সুবিধা পাবে ভারত।

২+২ সংলাপের পর যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছে, সেখানে দুই বাহিনীর পারস্পরিক বিনিময়ের মাত্রার দিকটিতে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘অন্যতম প্রতিরক্ষা সহযোগি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এছাড়া এতে রয়েছে – ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক রফতানি (১৬ বিলিয়ন ডলার); ভারতের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রফতানির উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া; লাইসেন্স-মুক্তভাবে মার্কিন প্রযুক্তি কেনার জন্য ভারতের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়গুলো।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ২+২ সংলাপকে যেভাবে ‘সবচেয়ে ফলপ্রসু, ইতিবাচক ও সুফলদায়ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, সেটাকে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে : আজকের বৈঠক একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রার সূচনা করল… আমাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বের ব্যাপারে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সবচেয়ে প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে.. । এই অর্জন.. একটা বৃহৎ ইতিবাচক শক্তি সৃষ্টি করেছে, যেটা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে… আমাদের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছেন যে, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই… আমাদের আলোচনা ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ককের ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। আমাদের অভিন্ন স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা এ অঞ্চল ও এ অঞ্চলের বাইরে শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এক সাথে কাজ করতে পারব।’

এই প্রেক্ষাপটেই সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার মন্তব্য করেছিলেন মোদির ‌‌”মেক ইন ইন্ডিয়া”র সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও বাণিজ্য উদ্যোগের সমন্বয় সাধন ঘটেছে। আর ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ভারসাম্যের পুনঃব্যবস্থার সমন্বয় ঘটে। কার্টার বলেন, ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যবাহী মিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করেছে।। মার্কিন নেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্কের সাথে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াও সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে।

সবই যখন মিলে যাচ্ছিল, তখনই মঞ্চে রাশিয়ার উপস্থিতি ঘটে।  যুক্তরাষ্ট্রের সব হিসাব পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের হুমকিতে পড়ে গেছে ভারত। তবে ভারতের সেনাপ্রধান একে গুরুতর কিছু নয় বলে মনে করছেন।

জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেন, রাশিয়ানরা যখন আমেরিকান অবরোধের কথা জানতে চেয়েছিল, আমার জবাব ছিল ”এই যে হ্যাঁ আমরা জানি যে আমাদের ওপর অবরোধ আরোপ করা হতে পারে। কিন্তু আমরা স্বাধীন নীতি অবলম্বন করব। আমরা আমেরিকান প্রযু্ক্তি গ্রহণ করব। তবে অনুসরণ করব স্বাধীন নীতি ”।

ভারত স্নায়ুযুদ্ধের সময় জোট নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিল। তারা ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে জোট গড়তে চায়নি। তবে ওই সময় সামরিক সম্ভারের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। এর রেশ ধরেই বর্তমানে রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠেছে ভারতের জন্য।

এই অস্ত্র কেনা সত্ত্বেও ভারতের ওপর যাতে অবরোধ আরোপ না করা হয়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস এই লবিটি বেশ জোরালোভাবে করছেন।

কিন্তু সেটি ফলপ্রসূ হবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সাথে রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে। রুশ-ভারত সম্পর্কে সে বিষয়টির দিকেও নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

ল্যাঙ্কফোর্ড বলেন, দিল্লির সাথে সামরিক চুক্তির ফলে ভারতে সরবরাহ করা মার্কিন অস্ত্র সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা পেয়ে যাবে রাশিয়া।

তবে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতে মোতায়েনের আগে পর্যন্ত ভারতের ওপর মার্কিন অবরোধ আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে।

সাংবাদিক খাশোগি ‘হত্যা’ : সৌদি রাজতন্ত্রের ভবিষ্যত কী ?

এম. জাকির হোসেন খান ::

জামাল খাশোগি একজন প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক- যিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েত অভিযান, ওসামা বিন লাদেনের উত্থানসহ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সংবাদ কভার করেছেন। গত বছর আমেরিকায় যান স্বেচ্ছা নির্বাসনে এবং ওয়াশিংটন পোস্টে প্রতি মাসে কলাম লিখতেন- যেখানে তিনি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখা লিখেছেন। প্রথম কলামেই তিনি লেখেন, যুবরাজ সালমান বাদশাহ সালমানের স্থলাভিষিক্ত হলে খাশোগি ভিন্নমত পোষণের কারণে গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস প্রিয়ার সান্নিধ্যে যাওয়ার প্রস্তুতিপর্বেই জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়, প্রথমে বলা হয়েছিল ‘‘দুর্বৃত্তরাই’’ ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত কনস্যুলেট ভবনের ভেতরেই সাংবাদিক জামাল খাশোগির মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করেছে সৌদি আরব। সৌদি দাবি, হাতাহাতি থেকে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গোয়েন্দা উপপ্রধান ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এক উপদেষ্টাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৮ জন সৌদি নাগরিককে। নানা নাটকীয়তার পর এর মধ্য দিয়ে খাশোগির ব্যাপারে তুরস্কের দাবি সত্য বলে প্রমাণিত হলো। ঘটনার ১৭  দিন পর ‘হাতাহাতির একপর্যায়ে খাসোগির মৃত্যু’ হয়েছে বলে বিবৃতি দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর আগ পর্যন্ত ঘটনার ব্যাপারে টানা অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল দেশটি।

খাশোগি ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি কনসুলেটে প্রবেশ করার পরপর সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়। তাদের তদন্তকারীদের হাতে নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। আল জাজিরা ছাড়াও রয়টার্স খবর দিয়েছে, তুরস্কের কর্তৃপক্ষের কাছে একটি ১১ মিনিটের অডিও রেকর্ড রয়েছে, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। ১১ মিনিটের অডিওর টেকনিক্যাল ভয়েস বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, সেখানে খাশোগি ছাড়াও ৩ সৌদি পুরুষ কণ্ঠের আওয়াজ পাওয়া যায়। অডিও থেকে আরও বোঝা যায়, কনস্যুলেটে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই আক্রমণের শিকার হন তিনি। জামাল খাশোগির হাতে থাকা অ্যাপল ওয়াচে ধারণকৃত অডিওর চেয়ে ভিন্ন আরেকটি সূত্র থেকে এই অডিও হস্তগত হয়েছে তুর্কি কর্তৃপক্ষের কাছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই অডিও অনেক দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবও রয়েছে। তুরস্কের দাবি ছিল, এখন আমরা কনস্যুলেটের মধ্যে নিখাদ প্রমাণ সংগ্রহের পর্যায়ে রয়েছি। তুরস্কে আসা ১৫ সদস্যের একটি সৌদি দল এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ আঙ্কারার। তবে তখন পর্যন্ত খাশোগিকে হত্যার কথা কড়া ভাষায় অস্বীকার করেছে সৌদি আরব। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে খাশোগিকে কনসুলেট ভবনের ভেতরে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে, এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে গণমাধ্যমগুলোতে।

অন্তত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, খাশোগির সম্ভাব্য হত্যার পুরো ঘটনাটিই বেঁধে দেওয়া ছক অনুসারেই সাজানো ছিল। আর তা বাস্তবায়নে ১৫ জনের যে দলটি সৌদি আরব থেকে ইস্তাম্বুলে  যায় তার অন্তত দুজন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, দেশে-বিদেশে একাধিকবার তাদের দেখা গেছে যুবরাজের পাশে। শুধু তাই নয়, ১৫ জনের ১১ জনই সৌদি নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য। তিনজন বিন সালমানের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। সৌদি আরবের বহু কর্মকর্তাই মনে করেন, ৩৩ বছর বয়সী প্রিন্স বিন সালমানের অজ্ঞাতে এত বড় কান্ড ঘটতে পারে না, তাঁর অনুমোদন সাপেক্ষেই খুন হন খাশোগি। নিখোজ হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল যে খাশোগী কনস্যুলেট হতে বেরিয়ে গেছেন, তুরস্কের পক্ষ থেকে এর প্রমাণ চাওয়া হলে তা সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে রিয়াদ। তাছাড়া, কেন খাশোগির নিখোঁজের দিন তার কনসুলেটে প্রবেশের আগেই কেন কনসুলেটের কর্মচারিদের চলে যেতে বলা হলো। সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি দায়ী নাই হয়ে থাকবে তবে কেন তুরস্কের ইস্তানবুলে নিযুক্ত সৌদি আরবের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ আল-ওতাইবির বাসভবন তল্লাশির আগেই তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে গেলেন।

উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহ আগে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট ভবন থেকে সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায় ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে প্রথমবারের মতো তুরস্কের একটি তদন্তকারী দল কনসুলেট ভবনে অনুসন্ধান এবং সৌদি আরবের কনসাল জেনারেলের বাড়িতে তল্লাশি চালায় তুর্কি পুলিশ। ওই নয় ঘণ্টার অনুসন্ধানে খাশোগিকে হত্যার আলামত পেয়েছেন বলে দাবি করেছে তুর্কি পুলিশ। অনুসন্ধানের বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, মিশনে তারা বিষাক্ত বস্তুর সন্ধান করেছেন। তিনি বলেন, আমি আশা করি যত দ্রুত সম্ভব আমরা আপনাদের গ্রহণযোগ্য উপসংহার দিতে পারব। কথায় বলে, অপরাধী তার অপরাধের সাক্ষ্য কোনো না কোনভাবে রেখে যায়। স্বীকার করেছে সৌদি আরব স্বীকার করে ও জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে আপাতত চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে- এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত নির্দেশদাতা কে ছিলেন?

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে- খাশোগির পরিবার তার অন্তর্ধানের ঘটনা তদন্তে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের আবেদন জানিয়েছে। জামাল খাশোগি নিখোঁজের ঘটনায় যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা খাশোগির নিখোঁজের ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতিই আঙুল তুলেছেন। সৌদি আরবের ইস্তাম্বুল কনসুলেট ভবনে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার রেকর্ডকৃত প্রমাণ চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তুরস্ক সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেওয়ার পরও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘‘আমি মনে করি সেখানে কী ঘটেছিল, প্রথমে তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আপনারা ভাবছেন, নিরপরাধ (?) প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী, কিন্তু আমি এমনটি মনে করি না”। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যা ধামাচাপা দিতে সৌদি আরবকে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, খাসোগির ভাগ্যে কী ঘটেছে, দ্রুত সেই রহস্য উন্মোচিত হোক এমনটাই চান তিনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সাথে মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং এই সম্পর্কের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইহুদি বা ইসরাইল লবির ভূমিকা আছে বলেও এখন বলা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কথিত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে মোকাবেলা বিন সালমানের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে আবির্ভূত হন আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কাতার এবং তুরস্কের সাথে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বিরোধ জটিল আকার ধারণ করে। পশ্চিমা বিশ্বে প্রথম দিকে মোহাম্মদ বিন সালমানকে তুলে ধরা হয়েছে একজন সংস্কারকামী রাজপুত্র হিসেবে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া সাংবাদিক টমাস ফ্রিডম্যান প্রশংসা করে লিখেছিলেন, ‘সৌদি আরবে আরব বসন্ত শুরু হয়ে গেছে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের নিজের সমাজের জন্য আছে বড় বড় পরিকল্পনা।’ সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি প্রদান, সিনেমা হল চালু করা, স্টেডিয়ামে এক সাথে নারী ও পুরুষের খেলা দেখার অনুমতি দেয়াকে মোহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কারের নমুনা হিসেবে পশ্চিমা গণমাধ্যমে হাজির করা হলেও এর আড়ালে ঢাকা পড়েছে ‘ইসলামী ব্রাদারহুড’ সমর্থকসহ ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর নিপীড়ন ও সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের রক্তাক্ত ঘটনা। বিন সালমানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের পেছনে বড় কারণ ছিল বিপুল অঙ্কের অস্ত্র কেনার চুক্তি এবং ইরানকে কোণঠাসা করতে ইসরাইল ঘেঁষা নীতি বাস্তবায়ন। একই সাথে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি ট্রাম্প ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এমবিএস’র অস্তিত্ব যেন হুমকির মুখে না পড়ে, সেজন্যই এ ঘটনা ধামাজাপা দিতে ওই লবি সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে অনেকেরই ধারনা।

বাস্তবে এমবিএস’কে রক্ষা করার নামে ‘ডলার মেশিনকে’ রক্ষা করতেই এরা সবাই অবস্থান নিয়েছে। সাংবাদিক খাশোগির নিখোঁজ রহস্যের জবাব পেতে সৌদি আরব সফর করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক  পম্পেও এবং খাশোগির ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেয়ায় বাদশাহ সালমানকে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, এমবিএস কর্তৃক ইয়েমেনে অনৈতিক গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতার দাপট দেখানোর ফলে লাখ লাখ শিশুর জীবন হুমকির মুখে, প্রতিনিয়ত শত শত নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। এর আগে কাতারকে একঘরে করতে অবরোধ করলে তুরস্ক কাতারের পাশে দাড়ায়। এমনকি মোহাম্মদ বিন সালমান লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে রিয়াদে ডেকে সেখানে বসেই পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য করলেন, বিভিন্ন নাটকীয়তার পর তিনি দেশে ফিরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। আর প্রতিপক্ষ ইরানকে কোণঠাসা করতে সৌদি যুবরাজ সম্ভাব্য সবকিছুই করে চলছেন, এমনকি যে কারো সঙ্গে হাত মেলাতে তাঁর দ্বিধা নেই এবং ফিলিস্তিনের ওপর গণহত্যা চালানো ইসরায়েল এখন সৌদি রাজতন্ত্রের বড় ‘দোস্ত’। সৌদ পরিবারের কট্টর সমালোচক খাশোগি হত্যাকান্ডের মাধ্যমে এমবিএস বহির্বিশে^ তার সমালোচকদের একটা কড়া বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। আর তা যে বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করেই করেছেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। জামাল খাশোগির অন্তর্ধান এমবিএস কর্তৃক ভিন্ন মতাবলম্বীদের কঠোরভাবে দমনের নীতির একটা চিত্র মাত্র। কিছু দিন আগেও ধর্মপ্রচারক সালমান আল আওদাহকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। রাজপরিবারের সদস্যসহ অনেককেই অন্তরীণ রাখা হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে জামাল খাশোগি আন্তর্জাতিক অপরাজনীতির শিকার। প্রচন্ড আন্তর্জাতিক চাপে আছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে একঘরে হওয়ার উপক্রমে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে হুংকার দিলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফেলে সালমান প্রশাসনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। সৌদি রাজতন্ত্রকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ লুটতে দুর্বল বা লেজিটেমেসিহীন সরকারই তো তাদের পছন্দ হওয়ার কথা!

উল্লেখ্য, নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা যায়, সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও যখন সৌদি আরব সফর করছিলেন, তখন সৌদি সরকার সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সহায়তার জন্য গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসনকে সৌদি আরবের প্রতিশ্রুত ১০০ মিলিয়ন ডলার সৌদি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, জামাল খাশোগির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছিল এই অর্থ প্রদানের মাধ্যমে তা অনেকটা স্বাভাবিক হবে।

এর আগে সৌদি আরবকে উসকিয়ে কাতারের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সৌদি আরবের সাথে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা করে ট্রাম্প প্রশাসন। তাছাড়াও সম্প্রতি সৌদি সরকারি মালিকানাধীন তেল কোম্পানী আরামকো’র ৫% শেয়ারের মালিকানা বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সাম্প্রতিক তা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ শেয়ার যেন চীন বা অন্য কোনো প্রতিদ্ব›দ্বীর হাতে না যায় সেজন্যই সৌদ প্রশাসনকে চাপে রাখতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। জামাল খাশোগির অন্তর্ধান সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মোহাম্মদ বিন সালমান  রাজপরিবার ও সৌদি নাগরিকদের সমর্থন অনেকটা হারিয়েছেন। জামাল খাশোগি হত্যার সাথে সৌদি সম্পৃক্ততায় বিন সালমানের ওপর হোয়াইট হাউজের সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে আসল কার্ড তুরস্কের হাতে থাকায় আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদ প্রশাসন তুরস্কের সাথে অর্থনৈতিক ও ক‚ুটনৈতিক ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার মাধ্যমে সমস্যার সমধাধানের চেষ্টা করবে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের পতন হলে সবচেয়ে বেশি ‘ক্ষতিতে পড়তে হবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে। তবে সৌদি আরবের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসসহ নানা মহল থেকে চাপ অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের তাঁবুকে রাশিয়ার সেনাঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়া  যেখান থেকে সিরিয়া, ইসরাইল, লেবানন ও ইরাকে নজরদারি করা যাবে। তেল অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি বাস্তবে করতে চাইলে এমবিএস’র পরিবর্তে হোয়াইট হাউজ নতুন ক্রাউন প্রিন্স বেছে নিতে পারে, যা আঞ্চলিক রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-৪ : ব্যয় এখনো চূড়ান্ত নয়, পরামর্শকও রাশিয়ার

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ব্যয় বলা হচ্ছে এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ১৩২০ কোটি মার্কিন ডলার)। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় চারটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। কিন্তু এটাই রূপপুর প্রকল্পের সব ব্যয় নয়। এই প্রকল্পের জন্য আরো অনেক ব্যয়ের হিসাব নিকাশ বাকি আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুস্কাল (অন্তত ৬০ বছর) জুড়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ, স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়া, যে কোনো সময় রাশিয়ার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া, পরামর্শক নিয়োগসহ এখনও রাশিয়ার সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন বাকি আছে। এর প্রতিটি চুক্তির সঙ্গেই আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। তবে সেই অর্থের পরিমান কত তা চুক্তিগুলো না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয় বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পে মালামাল সরবরাহের জন্য নতুন কিছু রেল লাইন স্থাপন, নদীপথ খনন এবং সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য উন্নত মানের সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ আনুসঙ্গিক অনেক কাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সব মিলে এখন পর্যন্ত যে হিসাব সংশ্লিষ্টরা করেছেন তাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্রয় হতে পারে ১৮০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রাশিয়ারই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রুশ সরকারের পক্ষে সে দেশের যে কোম্পানিগুলো রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাদের কাজ যথাযথ হচ্ছে কি না, প্রকল্পের যে সব ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি সেগুলো নির্ধারণে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে কথা বলা, রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চুক্তি অনুযায়ী সব যন্ত্রপাতি ও আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র দিচ্ছে কি না, এ সবই দেখবে এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হল—রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজকর্ম তদারক করে রাশিয়ারই একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে বা করতে পারেব।

ব্যয়: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ব্যয় কত হওয়া উচিৎ এবং কত হচ্ছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মোট ২৪০০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সই করা চুক্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ১২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যয়কে বলা হচ্ছে ‘ফার্ম অ্যান্ড ফিক্সড’। অর্থাৎ এই ব্যয় আর বাড়বে না।

তবে এর বাইরে সমীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন (৫৫ কোটি) ডলার ব্যয় করা হয়েছে। ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩২০ কোটি ডলার। তাতে প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ব্যয় দাঁড়ায় এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ১৩২০ কোটি ডলারের ৯০ শতাংশ (১১৮৮ কোটি ডলার) রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ঋণ হিসেবে। ঋণের সুদ হবে লন্ডন আন্ত:ব্যাংক লেনদেনের সুদের হার (লাইবর) ও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশের যোগফল। অর্থাৎ লাইবর যখন  এক শতাংশ হবে তখন এই সুদের হার হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাধারণত: লাইবর ১ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করে। এই ঋণ পরিশোধের জন্য ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। তার পরবর্তী ১৮ বছরে সম্পূর্ণ ঋণ সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার।

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ১৩২০ কোটি ডলার ব্যয় ধরেও যদি প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় (ইন্সটলেশন কস্ট) হিসাব করা হয়, তাহলে রূপপুর কেন্দ্রের জন্য তা দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আমাদের এই অঞ্চলে রাশিয়ার তৈরি যে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে সেগুলোর। এ রকম একটি হচ্ছে ভারতের তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। এই দুটি ইউনিটে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় হয়েছে ১৩০০ ডলার।

এরপর ওই একই কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য স্থাপন ব্যয় পড়ছে তিন হাজার ডলার। ১৩০০ থেকে বেড়ে যে তিন হাজার ডলার হয়েছে তার একাধিক কারণ আছে। যেমন, গত ১০/১২ বছরে নির্মাণ সামগ্রির দাম বেড়েছে। ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বাড়ানো হয়েছে। সে জন্যই এই ব্যয় বৃদ্ধি।

কুদনকুলমের সঙ্গে রূপপুরের পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। কুদনকুলমের রিঅ্যাক্টর ভিভিইআর-১০০০ মডেলের। আর রূপপুরের রিঅ্যাক্টার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের। শুধু এই কারণে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের স্থাপন ব্যয় আড়াই হাজার ডলার বেশি হওয়া অস্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পরামর্শক রাশিয়ার: রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের বাইরে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা ছিল। বলা হচ্ছিল, আমরা অনেক ছোটখাট সাধারণ প্রকল্পের জন্যও পরামর্শক নিয়োগ করি। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত একটি বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের জন্য, দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ব্যয়ের প্রকল্পের জন্য কোনো পরামর্শক নিয়োগ করছি না কেন।

তা ছাড়া, পরমাণু প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের জানাশোনাও যখন খুব কম, তখন পরামর্শক নিয়োগ করা খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তখন সরকার এ কথা কানে তোলেনি। তবে এখন, প্রকল্পের মূল নির্মাণপর্বে এসে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘রোসটেকনাদজর টিএসও জেএসসি ভিবিও সেফটি’ নামের একটি রুশ কোম্পানিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে পাঠিয়েছে। এই কোম্পানির পরামর্শক সেবা নেওয়ার জন্য ১২ কোটি (১২০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি হবে।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্রের সব কিছুই করবে রাশিয়া, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি এমনই। সে ক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ ছিল একটা স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ করা যারা আমাদেরকে আমাদের কাজে সাহায্য করবে এবং আমাদের স্বার্থ সুরক্ষা করবে। কিন্তু তা না করে আমরা নিয়োগ করেছি এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে যেটি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিরই একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাঁদের আনুগত্য কোথায় থাকবে, আমাদের প্রতি নাকি তার ‘প্যারেন্টস কোম্পানি’র প্রতি? যদি প্যারেন্টস কোম্পানির প্রতি তার আনুগত্য থাকে সে কি আমাদের সঠিক পরামর্শ দেবে? নাকি সেই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে যেটুকু দেওয়া যায় সেটুকু দেবে?

স্বতন্ত্র পরামর্শক থাকলে তাঁরা রাশিয়ানদের বলতো-এই যে তোমরা ১২৬৫ কোটি ডলার দাম নির্ধারণ করেছ এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমাদের রাশান কনসালট্যান্ট কি আমাদের সে কথা বলবে যে তোমরা বেশি টাকা দিচ্ছ? এই জিনিসগুলো হলো ‘ম্যাটার অফ এথিকস’ (নৈতিকতার বিষয়)। এই এথিকস কি অমান্য করবে? যদি না করে, তাহলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে কী ধরণের পরামর্শ সেবা পেতে পারি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

 

 

পাকিস্তান : নেপথ্য শক্তির ঝুলন্ত পার্লামেন্ট

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, পাকিস্তান থেকে ফিরে

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারেও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। ২৫ জুলাই হবে পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক এক মাস বাকি থাকতে বাংলাদেশ সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সাথে করাচি পৌঁছে অবাক। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন- কিছুই নেই। বাংলাদেশে নির্বাচনের সম্ভাবনা আঁচ পেলেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রপাগান্ডায় অতীষ্ট হওয়ার যোগাড় দেখে অভ্যস্ত। তার ওপর এখন বিশ্বকাপ মওসুম। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা পতাকায় মোড়া পুরো দেশ। কিন্তু করাচিতে কিছুই নেই। ওই দিন সন্ধ্যায় একটি উর্দু দৈনিকে যাওয়ার পথে গলির মুখে একটি পোস্টার দেখে স্থানীয় এক লোককে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, এটি নওয়াজ শরিফের এক প্রার্থীর। পরের দিনও করাচি ছিলাম, ঘোরাফেরা একেবারে কম হয়নি। কিন্তু আর কিছুই চোখে পড়েনি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও না। পরে ৩ ও ৪ জুলাই ঢাকা ফেরার পথে করাচিতে যাত্রাবিরতি করেছি। এবার কয়েকটি পোস্টার দেখা গেল। কিন্তু আহামরি কিছু নয়। করাচি হলো পিপিপি ঘাঁটি। কিন্তু রাজপথ অন্তত কাঁপানোর জন্য কিছু করতে দেখা যায়নি।

তবে টেলিভিশন ছিল সরব। নির্বাচনের খবরই প্রায় পুরো সময় প্রচারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা উপস্থিত আছেন পর্দায়, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে তারাও জবাব দিচ্ছেন সাবলীলভাবে।

তবে সরকার গঠন করবে কোন দল তা নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে। বছর খানেক আগে মনে হচ্ছিল, নওয়াজ শরিফ অবলীলায় জিতে যাবেন। কিন্তু পর্দার অন্তরাল থেকে ঘুঁটি চালে তিনি পর্যুদস্ত। গত সপ্তাহে আরেক মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী যুদ্ধের বদলে তাকে জেলের ঘানি টানতে হবে।

নওয়াজ শরিফ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, অন্তত নির্বাচন পর্যন্ত যাতে দুর্নীতির মামলার রায় আটকে রাখা যায়; কিন্তু হয়নি। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো লন্ডনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় মামলায় তাকে সাজাই দিয়েছে। তার মেয়ে মরিয়মকে দেওয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদন্ড । নওয়াজ শরিফকে আগেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদচ্যুত করেছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তখনই তাকে সব ধরনের সরকারি বা রাজনৈতিক পদে থাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার তার কারাদন্ড  হলো।

এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেশ বিপাকেই পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও বেশ বড় ধরনের ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। তার স্ত্রী কুলসুম ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি লন্ডনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশে ফিরে তাকে কারাগারেই যেতে হয়েছে; মেয়ে মরিয়মকেও যেতে হয়েছে কারাগারে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ‘জিহাদ’ শুরু করেছে, তার প্রথম বড় ধরনের শিকার হলেন নওয়াজ শরিফ। পানামা গেট নামের যে মামলায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাতে তিনি বরখাস্ত হবেন, তা কেউ ভাবতে পারেনি। বরং দ্বিতীয় মেয়াদে যখন জয়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনার মুখে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছিল।

পাকিস্তানের রাজনীতির জন্য এটি বড় ধরনের একটি ঘটনা। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দলীয় প্রধানকে এমন জটিলতায় ফেলা মানে ওই দলের সম্ভাবনা বেশ কমে যাওয়া। নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগের (এন) বেলাতেও তা-ই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি পদচ্যুত হয়েছেন, কারাদন্ডের শাস্তি পেয়েছেন বলেই নয়, আরেকটি কারণেও দলটির অবস্থা নাজুক। যেই মাত্র তিনি বরখাস্ত হয়েছেন, সাথে সাথে তার দলের অনেক সদস্য অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। বড় অংশ যোগ দিয়েছেন ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফে (পিটিআই)।

এই মুহূর্তে ইমরান খানই এগিয়ে আছেন। যে দুর্নীতির মামলায় নওয়াজ সাজা পেয়েছেন, সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্যই তার সেরা অস্ত্র। অনেকেই মনে করছে, এবার তার কাছে এসেছে সুবর্ণ সুযোগ। ১৯৯২ সালে যেমন সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, এবারো তিনি চমক দেখাবেন। তিনিই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশে কি জনপ্রিয়তা কিংবা দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় আসা যায়? সম্প্রতি পাকিস্তান সফরকালে কিছু অন্য ভাষ্যও পাওয়া গেছে। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনার কথাই বিশ্লেষকদের মন্তব্যে ওঠে এসেছে।

পাকিস্তানের সুপরিচিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল জোর দিয়েই বললেন, নওয়াজ শরিফ বা ইমরান খান- কারো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। সে ক্ষেত্রে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি। আর ওই সরকার গঠন করতে পারেন নওয়াজ শরিফ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা চৌধুরী নিসার কিংবা সদ্য বিদায়ী বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী মির আবদুল কুদ্দুস বিজেনজো।

একই ধারণা পোষণ করেন করাচিভিত্তিক উর্দু দৈনিক র্ফাজের এডিটর ইন চিফ মুখতার আকিলও। স্বতন্ত্র সদস্য হয়েও যেভাবে মির আবদুল কুদ্দুস বেজেনজো বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি সম্ভবত ওই ঘটনাকে পুরো পাকিস্তানের জন্য টেস্ট কেস হিসেবে দেখছেন।

উল্লেখ্য, নওয়াজের পতনের সাথে সাথেই চৌধুরী নিসার দল ত্যাগ করেছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে দেশটির রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের প্রবল ধারণা। একই কথা প্রযোজ্য বেজেনজোর ব্যাপারেও।

তৃতীয় পক্ষ যে ক্ষমতায় আসছে, তা করাচি, ইসলামাবাদ ও লাহোরে বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তবে তারা তা করেছেন পরিচয় না করার শর্তে। তাদের অভিমত, ইমরান খান প্রচার-প্রপাগান্ডায় যতই এগিয়ে থাকুন না কেন, তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না। নওয়াজ শরিফের পক্ষেও সম্ভব হবে না পুরো পাকিস্তান থেকে সমর্থন জোগার করা। ফলে নির্বাচনের পর নিসার বা বেজেনজোদের কেউ দল গঠন করে সরকার চালাতে পারেন। আর তাদের সহায়তায় আসতে পারে পর্দার অন্তরালে থাকা কোনো গ্রুপ।

তবে নওয়াজের দল কিংবা ইমরান খানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাপারে আশাবাদী লোকের সংখ্যাও কম নয়। লাহোর যাওয়ার পথে ইসলামাবাদ বাস স্টেশনে কথা হলো দুবাই প্রবাসী তানভির তাহিরের সাথে। তিনি জোরালোভাবে বলছেন, ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি অবশ্য স্বীকার করলেন, পাঞ্জাব হলো শরিফদের ঘাঁটি। এখানে তাদের হারানো কঠিন। তবে এখান থেকে ইমরান যদি ৫০ ভাগ আসনও পান, তবে তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। অন্য কোনো প্রদেশে শরিফরা ভোট পাবেন না। শরিফদের দুর্নীতির কথা তিনিও জোরেসোরে জানালেন। তার মতে, এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন কেবল ইমরান খান। তিনি জানান, তাদের মতো লোকজন বিদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান, সেই অর্থ নওয়াজদের মতো লোকজন বিদেশে পাচার করে দেন।

কিন্তু সেই পাঞ্জাবই অন্য সবার দুশ্চিন্তার বিষয় আর শরিফদের জন্য স্বস্তির কারণ। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা ৩৪২। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন হয় ১৭২টি। এক পাঞ্জাবেই আছে ১৭৪টি আসন। বাকিগুলোর মধ্যে সিন্ধুতে ৭৫, খাইবার পাকতুন খাওয়ায় ৪৮টি, বেলুচিস্তানে ২০টি, ফাটায় ১২টি, কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ৩টি।

শরিফের দল যদি পাঞ্জাবে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে তবে অন্যান্য প্রদেশ থেকে সামান্য কিছু সমর্থন নিয়ে তারা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। যে শক্তিটি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে, তারা তাদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে।

লাহোরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফয়সালও এই বক্তব্য সমর্থন করলেন। তার মতে, সহানুভূতির ভোট শরিফদের পক্ষেই যাবে। নওয়াজ শরিফের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, তিনি একটি প্রভাবশালী মহলের শিকার হয়ে অপদস্থ হচ্ছেন। এটিই পরিণামে তাকে ফিরিয়ে আনব। আর পক্ষত্যাগ পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। সবসময়ই হয়। তবে পক্ষত্যাগীরা ব্যতিক্রম ছাড়া ভালো করতে পারেন না। আবার যে দলে তারা যোগ দেন, তাতেও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

ইসলামাবাদে সামা টিভির ব্যুরো চিফ খালিদ আজিম চৌধুরীও মনে করেন, নওয়াজ শরিফের দল আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অন্যরা যতই লাফালাফি করুক, শেষ পর্যন্ত পারবে না। অবশ্য চূড়ান্ত রায়ের জন্য ২৫ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে অনেক হিসাবই পাল্টে যেতে পারে।

হতাশার কাছে হার মানা খুব সহজ কাজ: নোয়াম চমস্কি

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। ভারতের ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় অংশ এখানে প্রকাশিত হলো।

প্রশ্ন : আপনি আর অ্যাডওয়ার্ড এস. হারম্যান ১৯৮৮ সালে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে আপনারা জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। অবশ্য আপনার প্রকাশনার পর মিডিয়া জগতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে খবর ও তথ্যে ঐতিহ্যবাহী একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই কমে গেছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো ‘স্বাধীনতার’ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার দৃশ্যপটে পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

নোয়াম চমস্কি : বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। এতে দেখানো হয়, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। আমরা ২০০২ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করি। ততদিনে ইন্টারনেট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু আমরা পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে করিনি। আমরা সম্প্রতি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি, তবে তেমন কোনো পরিবর্তনের গরজ অনুভব করিনি। অবশ্যই অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মিডিয়ার কর্মসম্পাদন দক্ষতায় প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানগুলোতে মনে হচ্ছে- বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মূলধারার মিডিয়া তাদের সব সুবিধা ও ত্রুটি সত্ত্বেও এখনো খবর ও তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে বহাল রয়েছে।

যারা উদ্যোগ নেয়, কেবল তাদের জন্যই ইন্টারনেট বিপুল মাত্রার উৎসে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে। গবেষণার জন্য এটি বেশ সহায়ক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিস্তৃত তথ্য ও অভিমত জানার সুযোগের ফলে ব্যাপক জ্ঞানার্জন ও উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারে- এমন ইঙ্গিত সামান্যই পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে তা থেকে সুবিধা গ্রহণও প্রয়োজনীয় বিষয়। তাছাড়া প্রায়ই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক বিস্তৃত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বদলে যা শুনতে আগ্রহী তাতেই সীমাবদ্ধ থাকার কৃত্রিম স্বস্তিদায়ক এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করাও সহজ মনে হয়।

প্রশ্ন : বেশ কয়েকটি ল্যাতিন আমেরিকান দেশে বাম শক্তিগুলো নির্বাচনী পরাজয় ও নানা ধরনের বিপর্যয়ে পড়েছে। ল্যাতিন আমেরিকায় বাম আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে? ল্যাতিন আমেরিকায় বামদের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে অনেক স্থায়ী অর্জনও আছে এবং আগের চেয়ে তা অনেক ভালোও। ইতিহাস অগ্রগতি ও প্রত্যাগতি লিপিবদ্ধ রাখে। তবে সাধারণ অগ্রগতি রয়েছে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত পরিভাষাটি ধার করে বলতে পারি যে. ন্যায়বিচারের পথে চলতে ইতিহাসের বাঁক নির্মাণ করতে পারি আমরা। হতাশার কাছে হার মানা ও সবচেয়ে খারাপটি ঘটানোকে নিশ্চিত করতে সহায়তা করা খুব সহজ কাজ। বিচক্ষণতা ও সাহসের পথ হলো প্রাপ্য বিপুল সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে তাদের সাথে যোগ দেওয়া যারা আরো উন্নত দুনিয়া নির্মাণের জন্য কাজ করছে।

প্রশ্ন : পূর্বসূরিদের বিপরীতে গিয়ে পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বে প্রভাব ফেলছে এমন নানা আর্থ-সামাজিক ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত প্রগতিমূলক অবস্থান গ্রহণ করে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। আমরা জানি যে. আপনি প্রকাশ্যে ঘোষিত নাস্তিক। পোপতন্ত্রের সাথে আপনার আদর্শগত পার্থক্য যাই হোক না কেন, পোপ ফ্রান্সিস সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? আপনি কি আশা করেন, তার ব্যক্তিগত অবস্থান ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামিতে পরিবর্তন আনবে?

নোয়াম চমস্কি  : অতীত নিয়ে আমি তেমন একমত নই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পোপ ত্রয়োদশ জনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশংসনীয় রেকর্ড ছিল। পোপ ফ্রান্সিসও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রশংসনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ফলে আমি মনে করি, চার্চের ওপর তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি আশাবাদী।

(অসমাপ্ত)