Home » আন্তর্জাতিক (page 6)

আন্তর্জাতিক

নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়- ট্রাম্পের মুসলিম নিষিদ্ধকরণ : কাপুরুষোচিত ও বিপজ্জনক

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

প্রথমত, সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের পুনঃবসতিস্থাপন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতকরণ এবং মুসলিম প্রধান সাতটি দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের নিষ্ঠুরতার বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। এই নিষেধাজ্ঞার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওইসব পরিবার ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্ভোগে পতিত হয়, যারা নিজেদের দেশে হত্যাযজ্ঞ এবং স্বৈরতন্ত্র থেকে রক্ষা পেতে অনন্য আশাবাদী  হয়ে এই দেশে পৌঁছেছে বলে বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ ছিল।

এই গোঁড়ামিপূর্ণ, কাপুরুষোচিত, আত্ম-পরাজয়মূলক নীতির প্রথম শিকার হয়েছিল হাস্যকর ‘প্রকেটটিং দি নেশন ফ্রম ফরেন টেরোরিস্ট এনট্রি ইনটু দি ইউনাইটেড স্টেটস’ শিরোনামের নির্বাহী আদেশটি কার্যকর করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, আমেরিকান বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়া লোকজন। ওই ব্রুকলিনের ফেডারেল বিচারপতি জরুরিভিত্তিতে স্থগিতাদেশ দিয়ে রায় দেন, বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়া লোকজনকে তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে নির্বাহী আদেশটির অন্য সব বিষয়ের ভবিষ্যতই অমীমাংসিত থেকে গেছে।

এটাকে অবশ্যই ওইসব উদ্বাস্তুর জন্য ভাগ্যের নির্মম খেলা হিসেবে অনুভব করতে হবে, যাদেরকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির দেয়ালে বছরের পর বছর ধরে কঠিন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার শিকার হতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞা ভিসা পেয়ে আমেরিকায় জীবনযাপন করতে আসা লাখ লাখ অভিবাসীর জীবন ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্ত করবে। নিষেধাজ্ঞাটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন নগরীতে গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউজ নীতিটির প্রয়োগসীমা সামান্য কমিয়ে এনে বৈধ স্থায়ী অধিবাসীদের রেহাই দেয়।

দম বন্ধ করা এবং কর্কশ ভাষায় ঘোষণা করা নির্দেশটি ‘হলুকাস্ট রিমেমব্রান্স ডে’-এ ইস্যু করাটা আমেরিকার নিজের মূল্যবোধের প্রতি গভীরতম শিক্ষার প্রতি প্রেসিডেন্টের নির্মমতা ও উদাসীনতাই প্রতিফলিত করেছে।

আদেশটির পেছনে কোনো ধরনের যৌক্তিকতা নেই। এতে যুক্তি হিসেবে ১১ সেপ্টেম্বর হামলার কথা বলা হয়েছে, অথচ ছিনতাইকারীদের সবাই যেসব দেশের নাগরিক সেই সব দেশ এবং সেই সাথে, কাকতালীয়ভাবে সম্ভবত নয়, যেসব দেশের সাথে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা আছে- সে সব দেশকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নথিটিতে কোনো ধর্মের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। কিন্তু তবুও মুসলমানদের বাদ দিয়ে অন্যান্য ধর্মের লোকজনকে গ্রহণ করার সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দেওয়াটা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক কাজ।

নির্দেশটির ভাষা যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে তা হলো- মি. ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময় আবেগ সৃষ্টিকারী ‘বিদেশী-ভীতি’ ও ‘ইসলাম-ভীতি’ তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদেও বহাল থাকবে। বিষয়টা ছিল অ-আমেরিকান, কিন্তু এখন সেটাই আমেরিকান নীতি। ‘যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, এই দেশে যারা প্রবেশ করে, তারা এর প্রতি এবং এর প্রতিষ্ঠার নীতিমালার প্রতি বৈরী মনোভাব ধারণ করতে পারবে না,’ বলে যে নির্দেশটি জারি করা হয়েছে, তা দিয়ে এই বিভ্রান্তিপূর্ণ ধারণা প্রচার করা হয়েছে যে, সব মুসলিমকেই হুমকি বিবেচনা করা হবে। (এতে নারীদের প্রতি সহিংস কর্মকান্ড পরিচালনাকারী লোকজন এবং বর্ণ, জেন্ডার ও যৌনতা-সংক্রান্ত আইনভঙ্গের কারণে শাস্তি পাওয়া লোকজনকে রেহাই দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। যৌন হয়রানির কথা গর্বভরে প্রচারকারী এক প্রেসিডেন্ট এবং সমকামীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকারী নীতি সমর্থনকারী একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজেদের ওই মানদন্ডের জন্য ভীত হতে পারেন।)

এই নতুন নীতির ভ্রষ্ঠতার কারণেই আদালত, কংগ্রেস এবং মি. ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীল  সদস্যদের উচিত অবিলম্বে এটি বাতিল করার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা।  তবে তা করার জন্য এর চেয়েও আরো যে বড় কারন রয়েছে : এটা চরম বিপজ্জনক। চরমপন্থী গ্রুপগুলো এই ধারণাটি জোর গলায় নির্দেশটি প্রচার করে বেড়াবে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যভাবে, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামকেই টার্গেট করে, এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা একটি ভীতিপূর্ণ, বেপরোয়া, যুধ্যমান আমেরিকার চেয়ে বড় কিছু চায় না। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা যদি কিছু করে, সেটা হবে উত্তেজিত ও অনভিজ্ঞ প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আরো বেশি প্রতিক্রিয়া উস্কে দিতে, আমেরিকায় আঘাত হানতে আরো জোর প্রচেষ্টা চালানো।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান মিত্ররা যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করবে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা যেখানে তাদের ধর্মকে নিন্দা করছে, সেখানে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করবে এবং তার প্রতি কেন শ্রদ্ধাশীল হবে? আমেরিকার সামরিক অভিযান সমর্থনকারী আফগান ও ইরাকিরা তাদের দেশে বোমা ফেলার ব্যাপারে যথেষ্ট সাহসী হলেও, তাদের সবচেয়ে দুর্বল স্বদেশবাসীদের এবং সম্ভবত তাদেরও আশ্রয় দিতে অত্যন্ত ভীত সরকারের জন্য বিপুল ঝুঁকি নেওয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা- তা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই পারে। কংগ্রেসের যেসব নীরব রিপাবলিকান রয়েছেন কিংবা কৌশলে নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন দিচ্ছে, তাদের বোঝা উচিত, ইতিহাস তাদেরকে ভীরু হিসেবে স্মরণ করবে।

এই নীতি স্থগিত করার ব্যাপারে  মি. ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের চেয়ে ভালো অবস্থায় সম্ভবত আর কেউ নেই। নির্বাচনের সময় প্রস্তাবিত মুসলিম নিষেধাজ্ঞার বিপদ সম্পর্কে মি. ম্যাটিসের যথার্থ ধারণা থাকায় তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার মিত্ররা যৌক্তিকভাবেই ভাববে, ‘আমরা সত্যিই যুক্তির প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি’ কিনা। তিনি আরো বলেছেন, ‘এ ধরনের বিষয় এই মুহূর্তে আমাদের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিকব্যবস্থায় এটা খুবই খারাপ বার্তা পাঠাচ্ছে।’

আমেরিকার নিরাপত্তার প্রতি তার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নিয়ে প্রশংসাকারী সবাই এখন তার নীরবতা উদ্বিগ্ন। এই হাস্যকর ঘটনায় যে তাদের সুনাম কোনোভাবেই বাড়বে না, সেটা মি. ম্যাটিস এবং সরকারের অন্য সিনিয়র কর্মকর্তারা ভালোভাবেই জানেন। বরং তা করা হলে সেটা তাদের পেশাগত সুনাম শেষ করার চেয়েও বড় কিছু হবে। এটা তাদেরকে আমেরিকান মূল্যবোধ পরিত্যাগ এবং তাদের দেশের অন্য নাগরিকদের বিপদগ্রস্ত করার ভুল পথে ঠেলে দেবে।

ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্তর্গত সঙ্কট

পুলাপ্রে বালাকৃষ্ণান ::

ভারতের অর্থনীতি প্রায়ই মনোযোগ আকর্ষণ করলেও, প্রধানত খাদ্য সঙ্কট এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিভ্রাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, দেশটির গণতন্ত্রের কার্যকারিতা আলোচনার মধ্যে পড়ে না। এটা আত্মতৃপ্তির বিষয়টি প্রতিফলিত করে।

মজার ব্যাপার হলো, দেশটির যে দিকেই তাকানো হোক না কেন, অবহেলা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সমাজের ভেতর ও বাইরে- উভয় ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এর ফলে পাশ্চাত্য বিশ্বের শাসকেরা যখন মুক্তবাজার কাঠামোর আপাত শ্রেয়তর রীতিনীতি থেকে বিচ্যুতির জন্য ভারতকে তিরস্কার করেন, তখন ভারতের জাতীয়তাবাদী এলিটরা পাশ্চাত্য আধিপত্যের মধ্যে সমস্যাটি শনাক্ত করেন। উভয় পক্ষই ভারতের গণতন্ত্রের মধ্যেই ব্যর্থতার বীজ নিহিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে গুরুত্ব হারান। তারা বুঝতে চান না, সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতের একমাত্রিক গণতন্ত্র মোটামুটিভাবে একই অবস্থায় রয়ে গেছে।  এই মাত্রাটি হলো- জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠকে দুর্বল সামর্থ্যরে মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাহীনতা : সামর্থ্য হলো ব্যক্তিদের- তাদের দৃষ্টিতে মূল্যবান বিবেচিত পন্থায় জীবন যাপন করতে পারা। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এটাকেই সত্যিকারের স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন;  এবং এ কারণে সব উন্নয়ন প্রয়াসে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আইডিয়াটা মৌলিক এই দৃষ্টিতে যে, এটা উন্নয়নের সংকীর্ণ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংজ্ঞার বাইরে নিয়ে যায়। নিজেদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে না পারাটা পরাধীনতা- আমাদের জনসাধারণের বিপুল অংশ যতক্ষণ এমন অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ আমাদের সংবিধানে আমরা যতই ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ঢুকাই না কেন,  রাজ্য বা বাজার যতই আমরা পাই না কেন, তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

ভারতের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের ভিশন যা-ই হোক না কেন, ভারতীয় গণতন্ত্র তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বরং বাস্তবতা হলো, তা আরো খারাপ হয়েছে। অতীতের বছরগুলোতে সে তার নিষ্ক্রিয় চরিত্রে প্রান্তিকতার দিকে সহিংসতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। পাশ্চাত্যে ভারতীয়রা বর্ণবাদী মর্যাদাহানির শিকার হওয়ার খবর আমাদের বসার ঘরে প্রবেশ করলে, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণী দ্রুত আহত হয়।

ভারত থেকে এই দৃশ্য একটা পুরো শতক পরে এসেছে। আর দলিত তরুণরা কেবল মৃত গরুর চামড়ার অধিকারী হতো। ভারতীয় সমাজ ঐতিহাসিকভাবে তাদেরকে এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল। তাদেরকে এই কাজের মধ্যে আটকে রেখে তাদের মর্যাদাই কেবল প্রত্যাখ্যান করা হয়নি, সেইসাথে তাদের জীবিকাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। যেকোনো সভ্য সমাজে এই অপরাধের অপরাধীরা কেবল আদালতের লম্বা হাতের কাছে ধরাই পড়তো না, প্রকাশ্যে লজ্জিতও হতো।

গুজরাট নিঃসন্দেহে দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্র একটি স্থান। এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে, উত্তর ভারতজুড়ে এটা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল এবং দক্ষিণ ভারতও তা থেকে মুক্ত ছিল না; তামিল নাড়– বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এটাও ঠিক, দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ের সৃষ্ট বিষয় নয়। ভারতে তাদের নির্যাতন সঙ্ঘবদ্ধ এবং অনেক গভীরে নিহিত। মধ্য বর্ণের নেতাদের মাধ্যমে অ-কংগ্রেসীয় শাসন দীর্ঘ দিন ধরে রয়েছে তামিল নাড়–, বিহার ও উত্তর প্রদেশে। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এসব রাজ্যে অনেকবারই দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দেখা গেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় মধ্য বর্ণভিত্তিক দলগুলো সমাজ পিরামিডের শীর্ষের প্রতি তাদের আক্রমণ নিচের দিকে থাকাদের দমনে চালিত করে।

সমাজবাদী ক্যারিশমা : তাহলে আমরা কী করতে পারি? ক্ষমতার করিডোরের বাইরে থাকাদের দায়িত্ব হলো- ভারতীয় গণতন্ত্রের ধারা গড়ে দেওয়া। তাদের লক্ষ্য হতে হবে- দুর্বল সব গ্রæপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানব উন্নয়নের দিকে নতুন নজর নিবদ্ধ করা। এজন্য শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ার সাথে কোনোভাবেই সঙ্ঘাতময় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তেজদীপ্ত বাজারসহ শক্তিশালী অর্থনীতি স্বাধীনতা প্রকাশের একটি বিষয়। বেসরকারি উদ্যোগে বিধিনিষেধ সমাজের প্রান্তিকদের ক্ষমতায়নে কিছুই করতে পারে না। তাদের ক্ষমতায়ন আসতে পারে কেবল তাদের সামর্থ্য বিকাশে প্রত্যক্ষ সরকারি কার্যক্রমের মাধ্যমে।

বস্তুত, সমাজবাদের প্রতি সত্যিকারের প্রতিশ্রুতিই এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্রকে এমন নীতি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন- যেখানে ‘প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে, তার প্রয়োজন অনুযায়ী পাবে।’ কিন্তু এর বদলে ভারত রাষ্ট্রের সরকারি আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্র আবদ্ধ থেকেছে সরকারি খাতে ফলাফল হিসাব না করেই এবং ঐতিহাসিকভাবে অচ্ছ্যুৎ হয়ে থাকাদের জন্য পরিণতি না ভেবেই পণ্য উৎপাদনে। সামাজিক পরিমন্ডলে অর্থনীতি এবং অবাধ বাজারে হস্তক্ষেপের জন্য রাষ্ট্র গর্ব করেছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি সহায়ক এমন প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ায় কাজটি বাস্তবে রূপ নেয়নি। ঐতিহাসিকভাবে অচ্ছ্যুৎদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা আসলে পিছিয়ে থাকাদের সহায়তা না দেওয়ার নৈতিক অবস্থান গ্রহণের মতোই ব্যবস্থা।

নীতি পরিবর্তন : শেষ পর্যন্ত কর্ম অনুযায়ী ফল পাওয়া গেল। বর্তমান ভারতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দুর্বলভাবে শিক্ষিত ও খারাপ স্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষের বাস। ক্রয় ক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অথনীতি হওয়া সত্তে¡ও এটা একটা উন্নয়ন বিপর্যয়। বঞ্চিতের মাত্রাটি বোঝার জন্য যে কেউ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় ভারতীয় রেলওয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে, যেভাবে ‘গান্ধী করেছিলেন’, চড়ে দেখতে পারেন এবং কিভাবে এর সমাধানের নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে, সেটা অনুমান করে নিতে পারেন। ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের’ নামে ভারতীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে সিকি শতাব্দী ব্যয় করা হয়েছে। এখন পরবর্তী একটা দশক মানব বঞ্চনার দিকে নজর দিলে তা হবে লাভজনক। ভারতের সবচেয়ে বঞ্চিত নারী ও দলিতদের সামর্থ্য বিকাশের জন্য প্রথমে পরিকল্পনা করে সেদিকে সম্পদ চালিত করতে হবে।

গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার জন্য ব্যক্তির ওপর নজর দেওয়ার চেয়েও আরো বড় কিছু করা প্রয়োজন। প্রত্যেকেই যাতে স্বতন্ত্র থেকেও সমান হতে পারে- সেটা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এখানে জনকল্যাণ সামনে আসতে হবে; অংশগ্রহণকারী সাম্যের ভিত্তিতে ভারতীয়রা যাতে মিলতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এই দেশের মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সংগ্রাম করতে থাকায় স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, সমাধিস্থলে ব্যাপকভিত্তিক সরকারি পরিষেবার মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে। মতবিনিময়ের ব্যাপক ব্যবস্থাই অভিন্ন মানবতা প্রকাশ করে; আমরা সত্যিকারের কী তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা করে দেয়।

ভারতের সরকারি নীতি নির্ধারণে জনসাধারণের অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে মতবিনিময়ের সুযোগ খুবই কম। অনেক দেশই এ ব্যাপারে অনেক কিছু করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘পুঁজিবাদী’ সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে সরকারি আবাসনে সব ‘বর্ণ’ তথা চীনা, ভারতীয় ও মালয়দের একসাথে থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই বৈশ্বিক ফোরামে সন্ত্রাসবাদের অগ্রহণযোগ্যতার কথা বলে থাকেন। এমনটা বলার অধিকার তিনি রাখেন। এখন গুজরাটে দলিতদের ওপর আক্রমণ, দেশজুড়ে নারীদের ধর্ষণ এবং উত্তর-প্রদেশে মুসলিমদের ভীতিপ্রদর্শন আমাদের মধ্যেই সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি থাকার বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এসবের অনেক কিছু তার দিল্লিতে আগমনের আগে থেকেই থাকলেও, তার পর থেকে ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলো সুরক্ষা পেয়ে ওই কাজ করতে উৎসাহিত হচ্ছে- এমনটা বিশ্বাস করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।

এসব শক্তিকে সংযত করার অক্ষমতায় ভারতীয় গণতন্ত্রকে ক্রমাগত ম্লান হতে দেখা যায়। বার্নান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আমরা কখনো দিতে পারি না, যদি আমরা অন্যদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিতে পারি’। দলিতদের নির্যাতনে ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরকে একইরকম মানুষের মর্যাদা অন্তত দেওয়া হয়েছে। তারা কেবল সম্মিলিতভাবে মরা পশুর সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। তারা পানি সরবরাহ বিষাক্ত করেনি। (দ্য হিন্দু অবলম্বনে)

ট্রাম্পের অভিবাসননীতি : ঝুকি-শংকায় লক্ষ কোটি মানুষ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর বিশ্লেষন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে যেসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, তা ফলতে শুরু করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেগুলো বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তিনি যে আদেশ জারি করেছেন, তা ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তিনি যেন কারেন-জাল দিয়ে সবাইকে আটকিয়ে বহিষ্কার করতে চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫ জানুয়ারি অভিবাসন ও সীমান্তনীতি নিয়ে যে দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন তাতে কোটি কোটি অভিবাসী ও আমেরিকান নাগরিক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

আদেশ দুটিতে অভিবাসন বাধ্যবাধকতা ব্যাপক পরিসরে কার্যকর করার কথা বলায় কোটি কোটি অবৈধ নাগরিক, এমনকি যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই, তাদের ওপরও প্রযোজ্য হবে। আদেশ দুটিতে অভিবাসীদের তথাকথিত ‘আশ্রয় প্রদানকারী নগরী’ এবং রাজ্যগুলোকে শাস্তি প্রদান, অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে শাস্তিমূলক বহিষ্কার-প্রক্রিয়া অবলম্বন এবং আটক রাখার মেয়াদ আরো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে ইচ্ছুকদের প্রবেশে বাধাদানের জন্য কড়াকড়িভাবে সীমান্তনীতি কার্যকর করতে বলা হয়েছে। এছাড়া লিন্ডন বি. জনসনের আমল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু আইন মেনে চলছিল, সেটা লঙ্ঘন করে অভিবাসীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউএস প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক অ্যালিসন পার্কার বলেছেন, ‘এক বড় ধাক্কা দিয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতি তুচ্ছ- কিংবা কোনো ধরনের- অপরাধমূলক কাজ না করা কোটি কোটি মানুষকে মারাত্মক বিপদে ফেলে দিতে পারেন, মার্কিন নাগরিক পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এই আদেশ অতিরিক্ত অন্তর্ভূক্তিমূলক ধর-পাকড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে- যা যুক্তরাষ্ট্র ও শংকিত, আতংকিতও সন্ত্রস্ত্র সম্প্রদায়গুলোর সাথে দীর্ঘ দিন ধরে সম্পর্ক রক্ষাকারী মানুষজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

‘অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ আনা যেতে পারে, এমন কর্ম সম্পাদানকারী’ যে কাউকে দূর করার অগ্রাধিকার প্রদানের ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ব্যাপক মানবাধিকার উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ট্রাম্পের নীতির ফলে আইনসম্মত অধিবাসীসহ দোষী সাব্যস্ত নয় এবং যাদের সর্বোচ্চ অপরাধ তারা কেবল অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করেছে- এমন লাখ লাখ মানুষকে ঢালাওভাবে ঝুঁকিতে ফেলে দেবে। বাস্তবে এটা অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রে বেআইনিভাবে প্রবেশকারী এক কোটি ১০ লাখ মানুষের অর্ধেকের বেশিসহ অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশকারী যে কাউকে বহিস্কার করার সুযোগ এনে দেবে।

ট্রাম্পের আদেশে ঢালাওভাবে ও নির্যাতনমূলক মার্কিন অভিবাসন আটকব্যবস্থার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো, ফেডারেল সংস্থাগুলোর আটক করার সামর্থ্য দ্রুত বৃদ্ধি এবং বহিষ্কার-প্রক্রিয়ার ফলাফল ঝুলে আছে- এমন প্রায় সব নাগরিকের আটক করার কথা বলা হয়েছে। অভিবাসন আটক-প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের ফলে মানুষজন কেমন বিপজ্জনকভাবে আটক থাকে এবং তা তাদের ন্যায্য বহিষ্কার শুনানির অধিকারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে- সে ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে নথিপত্র আছে।

আরেকটি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প এমন সীমান্ত আইন কার্যকর করার কথা বলেছেন, যা মানুষজনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকারকে ঝুঁকিগ্রস্ত করবে। এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশকারী মানুষদের বহিষ্কার এবং অপরাধমূলক কাজের বিচার-প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পরিচিত কার্যক্রমের প্রয়োগ বাড়িয়ে দেবে। ওই আইনের ফলে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষা কামনাকারী আশ্রয়প্রার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছে, যাদের অনেকের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, এবং সেইসাথে নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে আসা শিশুসহ বিভিন্ন মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প আরো ঘোষণা করেছেন, অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব দিতে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর সাথেও সমঝোতায় পৌঁছাবে তার প্রশাসন। যেসব নগরী ও রাজ্য ফেডারেল অভিবাসন আইন কার্যকর সীমিত করার জন্য ‘আশ্রয় দানকারী’ নীতি প্রণয়ন করেছে, তিনি তাদেরকে ফেডারেল তহবিল স্থগিত করার নীতিও গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।

এ ধরনের ব্যবস্থার ফলে সমাজগুলোকে অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলবে বলে ট্রাম্পের দাবিটিকে ভ্রান্ত এবং সেইসাথে বিপজ্জনক হিসেবে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ক্রমবর্ধমান অভিবাসনের ফলে অপরাধ বাড়ে বলে যে কথাটি বলা হয়ে থাকে, বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, তা স্রেফ মিথ, তাতে কোনো সত্যতা নেই।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন আইন প্রয়োগে স্থানীয় পুলিশকে সম্পৃক্ত করার ফলে অনেক দেশে অভিবাসীরা ধর্ষণের মতো সহিংস অপরাধের মতো ঘটনার শিকারও হন। অনেকে এ কারণে পুলিশের কাছে এসব অপরাধের কথা বলতেও ভয় পান। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ অভিবাসীদের মর্যাদা-নির্বিশেষে অপরাধের ব্যাপারে রিপোর্ট করার জন্য সমাজের সদস্যদের উৎসাহিত  করার নীতির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে এই বিশ্বাসে যে, প্রত্যেকের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার এটাই সর্বোত্তম উপায়। তবে ট্রাম্প যার সমালোচনা করেছেন। অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলার নীতি ও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বড়তা বিদ্বেষপূর্ণ সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে ইন্ধন বাড়ানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি করে।

পার্কার বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকানদের ‘‘প্রথম” করার জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি! কিন্তু বাস্তবে এসব পদক্ষেপ পরিবারগুলোকে একত্রে রাখা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখার মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কংগ্রেস এবং আদালত এবং সেইসাথে জনসাধারণের উচিত এসব পদক্ষেপ প্রতিরোধ করা এবং সবার অধিকারের জন্য দাঁড়ানো।

অভ্যন্তরীন প্রতিরোধের মুখে ট্রাম্প : বিশ্বজুরে উদ্বেগ

সি রাজা মোহন ::

আমেরিকান জাতীয়তাবাদের প্রতি জোরালো আবেদন জানিয়ে এবং ‘আমেরিকা প্রথম’ ধ্বনি দিয়ে আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন, উম্মুক্ত সীমান্ত এবং বিপুল আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আমেরিকার দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান প্রতিশ্রুতির অবসানের ঘোষণা দিলেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা গুটিয়ে নেয়ায় এবং বিশ্বে তার ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করার প্রেক্ষাপটে ভারতকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার অনেক নেতিবাচক পরিণতি সীমিত করতে হবে। একই সাথে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ওয়াশিংটনের সাথে কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সুযোগগুলো ভারতকে অবশ্যই লুফে নিতে হবে।

আমেরিকার সংরক্ষণবাদের দিকে ঝুঁকে পড়াটা নিশ্চিত করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই আমাদের চাকরিগুলো ফিরিয়ে আনবো। আমরা অবশ্যই আমাদের সীমান্তগুলো ফিরিয়ে আনবো।’ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ নিয়ে নাটকীয় অবস্থান প্রকাশ করে ট্রাম্প আবারো জোর দিয়ে বলেছেন, পৃথিবী-পৃষ্ঠ থেকে ‘চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসকে’ মুছে ফেলার জন্য রাশিয়া এবং অন্যান্য সভ্য দেশের সাথে তিনি কাজ করবেন।

ট্রাম্পের কাছ থেকে আসা এসবের থিমের কোনোটিই অবাক করা কিছু নয়। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকালে ট্রাম্প এসব ইস্যুর কথা বারবার বলেছেন। ট্রাম্পের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ওয়াশিংটনে প্রবল ও স্থায়ী বিরোধের মুখে অনেকেই আশা করেছিলেন, ট্রাম্প তার অবস্থান পরিশীলিত ও সংশোধন করবেন। কিন্তু পেছনে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নেয়া আমেরিকার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিক্রমণ পরিবর্তন করার উচ্চাভিলাষী ধারা গঠনে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।

আমেরিকার ব্যাপারে ট্রাম্পের নতুন ভিশন ভারতে রাজনৈতিক এবং সেই সাথে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন করে গুরুতর চিন্তাভাবনা করার অবকাশ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় এলিটরা অন্য জাতিগুলোকে দমন করার জন্য বিশ্বায়নকে ব্যবহার করা কিংবা গণতন্ত্রের মতো রাজনৈতিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে হস্তক্ষেপ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছিল। তাদেরকে এখন এই দু’টির কোনোটিই না থাকা ট্রাম্পের সাথে কাজ করতে হবে।

ট্রাম্প তীব্রভাবে বিশ্বায়ন এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আমেরিকার দীর্ঘদিনের লালিত নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা বিদেশি শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি, অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়েছি, অথচ আমাদের সামরিক বাহিনীর দু:খজনক শূন্য হওয়াকে অনুমোদন করেছি। আমরা অন্য জাতির সীমান্তকে রক্ষা করেছি, কিন্তু আমাদের নিজেদের সীমান্তকে রক্ষা করতে অস্বীকার করেছি।’

তার এই নতুন ভিশন বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের শাসকদের মেরুদন্ডে  শীতল অনুভূতি প্রবাহিত হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ‘বাণিজ্য, কর, অভিবাসন, পররাষ্ট্র ইত্যাদি প্রশ্নে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে আমেরিকান শ্রমিকদের কল্যাণের দিকটি লক্ষ রেখে। আমাদের সীমান্তকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে, অন্যান্য দেশ যাতে আমাদের পণ্য বানিয়ে লুটপাট করতে না পারে, আমাদের কোম্পানি চুরি করতে না পারে, আমাদের চাকরি ধ্বংস করতে না পারে।’

ট্রাম্প নতুন আমেরিকার জন্য দু’টি সরল নিয়মকে চিহ্নিত করেছেন: ‘আমেরিকান ক্রয় করো, আমেরিকান ভাড়া করো।’

ভারতকে কেবল আরো সংরক্ষণবাদী আমেরিকার জন্যই প্রস্তুতি নিলে চলবে না, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা, রক্তপাত ঝরানো ও সম্পদ লুণ্ঠনের পরিকল্পনা না করার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে হবে। ‘আমরা আর আমাদের জীবন ধারা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেব না, বরং একে একটি উদাহরণ হিসেবে উজ্জ্বল হতে দেব।’

নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং তারপর থেকে ট্রাম্প ন্যাটোর মতো আমেরিকার পুরনো জোটগুলোকে ছুঁড়ে ফেলেছেন। ক্ষমতা নেবার রাতে তিনি বলেছেন, ‘আমরা পুরনো মিত্রদের শক্তি বাড়াবো, নতুন নতুন জোট গড়বো, চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সভ্য দুনিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করবো। এসবের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবো।’ এটা নজিরবিহীন একটি প্রক্রিয়া। এতে বিশ্বজুড়ে বন্ধু ও অংশীদারদের প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ট্রাম্প এখানে নিজেকে ‘মুক্ত বিশ্বের’ কিংবা ‘পাশ্চাত্যের’ নেতা হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেননি। এর বদলে তিনি ‘সভ্য দুনিয়াকে’ ঐক্যবদ্ধ করার কথা বলেছেন, যাতে সুস্পষ্টভাবে রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ট্রাম্প সব সময় জোর দিয়ে বলে আসছেন, আইএসআইএস এবং অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া হতে পারে অংশীদার।

আট বছর ধরে ওবামা ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করছেন না। তিনি পছন্দ করছিলেন ‘সহিংস চরমপন্থী’ পরিভাষাটি। পরিভাষাগত এই একটি পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি এবং তা দমন করার জন্য অংশীদারদের প্রকৃতির ব্যাপারে ট্রাম্পের আমেরিকার ভাবনায় নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনাটি ফুটিয়ে তুলেছে।

যেকোনো মানদন্ডেই  ট্রাম্পের দেয়া ভাষণ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বে এর ভূমিকা নিয়ে আমেরিকান এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান বিশ্বাসের সাহসী ও দ্ব্যর্থহীন প্রকাশ ঘটিয়েছে। বিশ্বায়নের ব্যয়, উন্মুক্ত সীমান্ত এবং হস্তক্ষেপমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার প্রশ্ন উত্থাপনে বিপুলসংখ্যক ভোটারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে।

ক্ষীণ সম্ভাবনাও আছে যে, ট্রাম্প হয়তো আমেরিকার আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা নতুন করে গড়ে নিতে পারবেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নতুন করে সংগঠিত করতে পারবেন। অবাধ বাণিজ্য সীমিতকরণ, আমেরিকার অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং আরো সংযত পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হাসিল প্রশ্নে দ্বিদলীয় জোট গঠনের অবকাশ নিশ্চিতভাবেই তার আছে।

তবে নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের ভিশন এস্টাবলিশমেন্টের কাছ থেকে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়বে। কিন্তু তারপর আমেরিকার জনগণের জন্য ফলপ্রসূ কাজ করার জন্য এস্টাবলিশমেন্টের সাথে লড়াই করার জন্য নিজেকে একজন বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। এর ফলে আগামী চার বছরে আমেরিকার ভবিষ্যৎ অভিমুখের জন্য প্রচন্ড রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ তৈরি হবে।

বহিরাগতদের জন্য ট্রাম্পের আমেরিকাকে বোঝার জন্য সম্ভবত একটিমাত্র পথনির্দেশনা রয়েছে: ভবিষ্যতের জন্য অতীত ভালো গাইড নয়।

(লেখক : পরিচালক, কার্নেগি ভারত এবং দি ইন্ডয়িান এক্সপ্রেস পত্রিকার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সম্পাদক)

নেপাল নিয়ে চীন-ভারত লড়াই

কমল দেব ভট্টরাই ::

অনুবাদ : আসিফ হাসান

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ঘোষণা করে, প্রথমবারের মতো তারা নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে চীনা সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও চীন এই প্রথম যৌথ মহড়ার প্রস্তাব দিল এবং নেপালও তা গ্রহণ করল।

ভারতের সঙ্গে ১৯৫০ সালে করা শান্তি ও মৈত্রী চুক্তিটি কিছু ধারা পরিবর্তনের জন্য নেপাল ওই প্রস্তাব করার প্রেক্ষাপটে যৌথ মহড়ার আয়োজন চলছে। অথচ ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে ভারতকে জানাতে হবে অথবা ভারতের সম্মতি নিতে হবে নেপালকে।

সামরিক সরঞ্জাম কেনাসহ নিরাপত্তা ইস্যুগুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়- এমনভাবে চুক্তিটিতে সংশোধন চাইছে নেপাল। এখনো অবশ্য নেপাল সেনাবাহিনীর সামরিক সরঞ্জামের বৃহত্তম সরবরাহকারী দেশ ভারত। ১৯৫০ সাল থেকে দুই দেশের সেনাপ্রধানদের একে অন্যকে সম্মান প্রদর্শনের রীতি প্রচলিত রয়েছে। এটা দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তাৎপর্য বহন করে।

এই ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা পরিষ্কার যে, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কে পরিবর্তন আনতে চায় নেপাল। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় যৌথ সামরিক মহড়াটির কথা চীন যখন ঘোষণা করে, তখন এ নিয়ে ভারত তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে এ নিয়ে ভারতের দিকথেকে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করা না হলেও, ভারতীয় মিডিয়ার খবর ও বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, নয়া দিল্লি এমন সিদ্ধান্তে খুশি নয়।

নেপাল-চীন সামরিক মহড়ার বিষয়ে ভারতের উদ্বিগ হওয়ার কোনো কারণ নেই। নেপালের সাথে কেবল চীনেরই সামরিক মহড়া হয়, বিষয়টি কোনোভাবেই এমন নয়। নেপাল ও ভারতের মধ্যে সেনাবাহিনীর বার্ষিক মহড়া হয়ে থাকে। একইভাবে বার্ষিকভিত্তিতে নেপাল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক মহড়াও হয়ে থাকে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে (এক্ষেত্রে চীন) নেপাল কোনো সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে পারবে না- এমনটা বলার অধিকার নেই ভারতের। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার সার্বভৌম অধিকার আছে নেপালের।

উপরন্তু চীনের সঙ্গে নিজস্ব যৌথ সামরিক মহড়া চালায় ভারত। এমনকি পরমাণু সরবরাহ গ্রুপে ভারতের যোগ দেওয়ার ভারতের চেষ্টায় সমর্থন দিতে চীনের অনীহাসহ বিভিন্ন কারণে ২০১৬ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হলেও দু’দেশই ২০১৬ সালের নভেম্বরে ১৩ দিনের যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। এটা চীন-ভারতের ৬ষ্ঠ সামরিক মহড়া। চীনের সাথে ভারতের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এই দৃঢ়বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, যৌথ মহড়া একই ধরনের কৌশলগত স্বার্থের ইঙ্গিত নয়।

তবুও ভারতের বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন। নয়াদিল্লিতে চীনা বিশেষজ্ঞ জয়দেব রানাদে সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, নেপাল-চীন সামরিক মহড়ার তাৎপর্যের প্রতি ভারতের উচিত সতর্ক দৃষ্টি রাখা; দেখতে হবে এটা সেনাবাহিনী-সেনাবাহিনীর মধ্যকার সম্প্রসারিত মাত্রার সম্পর্ক সৃষ্টি করছে নাকি এই মহড়াতেই সবকিছুর ইতি ঘটছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মহড়াটি নয়া দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ ভারত মনে করছে, তাদের দোরগোড়ায় চীন ঢুকে পড়ছে। ভোয়াকে রানাদে বলেন, ‘আমরা [ভারত] নেপালকে দেখি আমাদের কৌশলগত দেশ ও স্থান হিসেবে; আর সেখানেই কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।’

ভারত চায় নেপালকে তার ‘প্রভাব বলয়ে’ রাখতে, আর চীন চায় তার শক্তি বাড়াতে । ভারতের দৃষ্টিতে নেপালে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুধু ব্যবসা বাণিজ্যের সাথেই সম্পর্কিত নয়, বরং তা দক্ষিণ এশিয়াকে বৃত্তাবদ্ধ করার তাদের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্যের অংশবিশেষ।

সত্যিকার অর্থেই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোতে নেপালে ভারত ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালে ভারত প্রায় বিশেষ প্রভাব উপভোগ করেছে। অবশ্য গত দশকে, প্রধানত ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলোপের পর, অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়, বিশেষ করে চীন, প্রধানত রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নেপালে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে।

একই সময়ে নেপালে চীন তার কূটনীতিকে ‘নীরব কূটনীতি’ থেকে ‘সরব’ কূটনীতিতে নিয়ে গেছে। নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি নিয়ে চীন তাদের উদ্বেগ ক্রমবর্ধমান হারে প্রকাশ করছে, ঠিক যেভাবে ভারত দীর্ঘ দিন করেছে। গত বছর নেপালের সরকার পরিবর্তন খেলায় চীনকেও টেনে আনা হয়েছিল।

২০১৫ সালে নেপাল তার সংবিধান চূড়ান্ত করে এবং ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে নেপাল ও চীনের মধ্যকার লেনদেন ও আদানপ্রদান ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নেপাল-ভারত সীমান্তে ভারতের অবরোধ আরোপ করার অভিযোগের পর (ভারত তা অস্বীকার করে) নিত্যপণ্যের প্রয়োজন মেটানোর জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে, যদিও চীনের সাথে তার বাণিজ্য পর্যাপ্ত নয়।

নেপাল ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনার ফলে বিশেষ করে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করে চীনের জন্য। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) অথবা সিপিএন-ইউএমএল চেয়ারম্যান কে পি ওলি’র নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার চীনের সঙ্গে ব্যবসা ও  ট্রানজিটবিষয়ক চুক্তি সই করে। এর মধ্য দিয়ে তারা নেপালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটায়।

একইভাবে নেপাল-ভারত যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ে সম্প্রসারণ ও সড়ক সংযোগসহ বেশ কিছু প্রকল্প গতি পায়। ওলি সরকারের সঙ্গে কাজ করে স্বস্তিতে ছিল চীন সরকার। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত দ্য গ্লোবাল টাইমসসহ চীনা মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়। ওলির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর এবং পুস্প কমল দাহাল ওরফে প্রচন্ডের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর চীনা মিডিয়ায় ওলির আমলে করা চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

এদিকে, ভারত আশা করে, প্রচন্ডের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের প্রতি আরো বেশি অনুকূল হবে। একইভাবে তারা আশা প্রকাশ করে, নেপালে চীনের প্রভাবও কমে গিয়ে ভারতকে তার আগের প্রভাবমূলক অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেবে। তবে ক্ষমতায় এসেই প্রচন্ড ঘোষণা করেন, তিনি ভারত ও চীনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ে বিশেষ দূত পাঠিয়ে তার সরকারের অগ্রাধিকার এবং সেইসাথে উভয়ের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার আকাক্সক্ষা সম্পর্কে দু’দেশের সরকারকে অবহিত করেন।

কিন্তু এ ধরনের বাগাড়ম্বরতার মধ্যেও প্রচন্ডের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের ঝুঁকছে বলে অভিযোগের মুখে পড়ে। নতুন সরকার গঠনের এক মাস পর তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যান। তার এই সফরের পর পরই ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী নেপাল সফর করেন। ১৮ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেপাল সফর করলেন।  তবে নেপালে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে নেপাল ও চীনের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ে কোনো সফর হয়নি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ডের চীন সফর ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের নেপাল সফরের বিষয়টি অচলাবস্থায় রয়েছে।

২০১৬ সালে নেপাল সফরে আসার কথা ছিল শি জিন পিংয়ের। কিন্তু হিমালয় রাষ্ট্রটিতে ‘এক অঞ্চল -এক সড়ক’ (ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড) উদ্যোগটি বাস্তবায়ন না করায় সফরটি হয়নি। পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত চীনের এই বিশাল কানেকটিভিটি প্রকল্পটি নিয়ে কয়েকটি চুক্তিতে সই করার জন্য পরে চীন চাপ দিতে থাকে। তবে এক্ষেত্রে ভারতের সাড়া ইতিবাচক নয়।

এ সমস্যা কেবল প্রচন্ডের জন্য নয়। নেপালের সাম্প্রতিক সব প্রধানমন্ত্রীই এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, নেপালের প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনীতিবিদেরা অল্প সময়ের মধ্যেই হয় চীনপন্থী কিংবা ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। অথচ দেশের সমৃদ্ধির জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক কল্যাণ হাসিল করতে উভয় প্রতিবেশীর সাথেই আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টি করা উচিত।

(কমল দেব ভট্টরাই : নেপালি সাংবাদিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ক বিশ্লেষক। নিবন্ধটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেয়া)

২০১৭-এর বিশ্ব রাজনীতি : ১০টি ভবিষ্যদ্বাণী

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

১.সত্য-পরবর্তী বিশ্ব – সংকটে গণতন্ত্র : অব্যাহত বৈষম্য, ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ, ‘ভুয়া খবরের’ সয়লাব এবং লোকরঞ্জক প্রার্থীরা বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। এই ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা আরো কঠিন করে দেবে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশগুলো কেবল তাদের ‘সফট পাওয়ার’ আরো খানিকটা হারিয়েই ফেলবে না, সেইসাথে রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ানোর উৎস হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। লোকরঞ্জকেরা সাধারণভাবে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রপন্থী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দেওয়ার খাতে আরো কম অর্থ ব্যয় করবে এবং স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর ওপর চাপও হ্রাস করবে।

২. পাশ্চাত্য-পরবর্তী বিশ্বে বিভক্ত পাশ্চাত্য : বহুমুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সময়টাতে বেক্সিট- যেভাবেই তা হয়ে থাকুক না কেন- ইউরোপের রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং পাশ্চাত্য-পরবর্তী বিশ্বের বৈশ্বিক বিষয়াদি গঠনে ও এর সামর্থ্য কমিয়ে দেওয়ায় পাশ্চাত্য কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্রে  ট্রাম্পের বিজয়  ট্রান্স-আটলান্টিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা দুর্বল করে দেবে। ব্রিটেন ও ইউরোপ মহাদেশীয় অঞ্চলের মধ্যকার ‘উইন-উইন’ সম্পর্ককে বেক্সিট ‘জিরো-সাম গেইমে’ পরিণত করে ফেলেছে। এটা ফ্রান্স এবং আরো কয়েকটি দেশের ইউরোপ থেকে সরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

আগামী দশকগুলোকে ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের নেতৃত্বে দুই মেরুর বিশ্বব্যবস্থা দেখা যাবে এবং আটলান্টিকের চেয়ে এশিয়াতেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বেশি নিহিত রয়েছে- এমন বিবেচনা মাথায় রেখে বলা যায়, ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বৈশ্বিক বিষয়াদিতে ইউরোপের ভূমিকা আরো কমে যাবে। চীন ‘সমান্তরাল-ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হতে থাকায় বর্তমানের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প তৈরি হতে পারে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাশ্চাত্যের জন্য নতুন নতুন অংশীদারিত্বের উত্থান ঘটতে পারে। দিল্লী ও টোকিও যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে কম প্রভাবশালী দেখবে, তখন তাদের মধ্যকার সম্পর্ক আরো বিকশিত হবে। চীন অবাধ বাজারব্যবস্থার প্রধান ধারক ও বাহক হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ঝুঁকবে সংরক্ষণবাদের দিকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে দেখার আশা করতে পারি।

৩. যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে জটিলতা : হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নমনীয়ও হন, তবুও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটি সাবলীল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বাণিজ্য, তাইওয়ান এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা ইস্যুতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কণ্টাকীর্ণই থাকবে। বেইজিংয়ে নিযুক্ত ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত যদিও তুলনামূলকভাবে শি জিন পিংয়ের ঘনিষ্ঠ বলে কথা চালু আছে, তবুও অভ্যন্তরীণ কারণে হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে চীনা হুমকিকে সজীব রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নজিরবিহীন উত্তেজনার ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, কিংবা সামরিক সঙ্ঘাত – যাই হোক না কেন, তাদের মধ্যকার বৈরিতার বৈশ্বিক প্রভাব সাথে সাথে দেখা যেতে বাধ্য।

৪. চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার পথ : নীতিনির্ধারকেরা তাদের বাজারগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব কিভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক শুরু করে দিয়েছেন। ওবামার মতে, চীনের নেতৃত্ব গ্রহণ একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি। ল্যাতিন আমেরিকাতেও এ ধরনের বিতকের্র সৃষ্টি হয়েছে; সেখানেও চীনের প্রভাব বাড়ছে। ভেনেজুয়েলাতে তো ওয়াশিংটনের চেয়ে বেইজিংয়ের প্রভাব অনেকগুনে বেশি। চীন বিনিয়োগ ও অর্থ সহায়তার প্রদানের নীতি অবলম্বন করছে; আর তা গ্রহণ থেকে বিরত থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার।

৫. উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য খারাপ খবর : এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও অত্যন্ত চটুল ও পরস্পরবিরোধী কথাবার্তার জন্য বেশ পরিচিত,  তারপরও ক্রমবর্ধমান হারে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ব্যাপকভিত্তিক কর হ্রাস এবং সরকারি ব্যয় বাড়ানোর ফলে বড় রকমের মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। এর ফলে উদীয়মান বাজারগুলো থেকে উপচেপড়া পুঁজি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছুটবে। ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের পতন রুখতে বেইজিংকে বেশ কষ্ট করতে হবে। অবশ্য এতে করে চীনা কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণ বা প্রবৃদ্ধিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। ২০১৭ সালটি ল্যাতিন আমেরিকার জন্য কেমন হবে? স্বল্প প্রবৃদ্ধি, জনসাধারণের মধ্যে নিজ দেশ সম্পর্কে স্বল্প আশাবাদ এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যাপক এবং অনেক বিক্ষোভ দেখা দেবে সেখানে।

৬. বিশৃঙ্খল মধ্যপ্রাচ্য, পাশ্চাত্য প্রভাবে ধ্বস : আলেপ্পোর পতনে সবচেয়ে বড় যে ইঙ্গিতটি দিচ্ছে তা হলো- ২১ শতকের সবচেয়ে রক্তাক্ত সঙ্ঘাতে পরিণত হওয়া ঘটনাবলীতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা পাশ্চাত্যের শক্তিগুলোর হ্রাস পাওয়া। এর বিপরীতে মাত্র কিছু দিন আগেও অসম্ভব বিবেচিত আসাদকে ক্ষমতায় রাখাটা তার মিত্র রাশিয়া ও ইরান প্রায় সম্ভব করে ফেলেছে। অবশ্য ২০১৭ সালেও সিরিয়া যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই থাকবে। অন্যদিকে, রুশ বিমানবাহিনী এবং আসাদ সরকারের নির্বিচারে বেসামরিক লোকজন হত্যা করার পরিণতিতে ইসলামিক স্টেটের বা আইএস-র সমর্থন বাড়ানোর ক্ষমতা অটুট রাখবে। এছাড়া ইরাক, লিবিয়া ও ইয়েমেনের সঙ্ঘাত অব্যাহত থাকবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের উদ্বাস্তু সঙ্কটটি আরো দীর্ঘায়িত করবে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার শুদ্ধি অভিযান বহাল রাখবেন, তুরস্কে পাশ্চাত্য প্রভাব আরো কমতে থাকবে। তুরস্কের ভেতরে এবং পুরো অঞ্চলে থাকা কুর্দি গ্রুপগুলোর সাথে তুরস্কের সহিংসতা আরো তীব্র হবে। ডেভিড ফ্রিডম্যানকে ইসরাইলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক ভূমিকা পালনের যেকোনো সম্ভাবনা কার্যত শেষ করে দিয়েছে।

৭. মানবাধিকারের ওপর বৈশ্বিক দমন-পীড়ন : ২০১৬ সালে বেশ কিছু খারাপ খবর দেখা গেছে। বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক ও ব্লগারকে আটক করা হয়েছে; তারা আক্রান্ত হয়েছে। অনেক এনজিও হয়রানির শিকার হয়েছে, বিপুলসংখ্যক বিরোধী রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট বা সক্রিয়বাদী  নিহত হয়েছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক সরকার ২০১৭, দমনমূলক আইন করবে, নাগরিক সমাজগুলোকে হুমকি দেবে। এর মধ্যে  অনেক গণতান্ত্রিক সরকারও রয়েছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশই লাখ লাখ সংগঠনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে; এটা আরো বাড়তে পারে। এটা বিশ্বের কোনো এক অঞ্চলে সীমিত থাকবে না। তবে কয়েকটি স্থানে সত্য কথা বলাটাও হবে সবচেয়ে বিপজ্জনক।

৮. সাইবার হামলা : সাইবার হামলা গত বছর বেশ আলোচিত ছিল। সাইবার হামলায় মার্কিন নির্বাচন প্রভাবিত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে বিষয়টি আরো নতুন মাত্রা পাবে। নতুন নতুন স্থান এতে আক্রান্ত হবে।

৯. আফগানিস্তান – সবসময়ের দুঃস্বপ্ন : গত কয়েক শতাব্দী ধরে আফগানিস্তান যে ধরনের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, তার নজির খুবই কম। এই দুর্ভোগের অবসান ঘটবে- এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বরং মার্কিন নেতৃত্বাধীন হামলার পর ২০১৭ সালটিতে সহিংসতা বাড়বে বলেই আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে। তালেবান হামলায় সরকারের পতন পর্যন্ত ঘটতে পারে। আফগানিস্তান ছাড়াও আরো কয়েকটি দেশ আক্রান্ত হতে পারে। এতে করে চীনের ‘এক অঞ্চল, এক সড়ক’ (ওয়ান বেল্ট- ওয়ান রোড) উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কাবুলের ব্যাপারে পাকিস্তান প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখবে। জার্মানিতে আফগান উদ্বাস্তুদের ভিড় বাড়তে থাকতে পারে।

১০. অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় : অপ্রত্যাশিত অনেক বিপর্যয় ঘটতেই পারে। অতীতে অনেকবারই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জাপানের পার্ল হার্বার আক্রমণ, আফ্রিকার উপনিবেশমুক্ত হওয়া, ইরানি বিপ্লব, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, নাইন ইলেভেন কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন একেবারেই অপ্রত্যাশিত বিবেচিত হতো। ২০১৭ সালে অপ্রত্যাশিতভাবে কোন কোন ঘটনা ঘটার প্রত্যাশা করা যেতে পারে?  চীনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভানবনা রয়েছে; আর এর ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সৌদি রাজপরিবারের পতন এবং সেখানে কট্টর ইসলামপন্থীদের উত্থানের  মতো নাটকীয় ঘটনার সম্ভাবনা আছে। এটাই যদি হয় তবে তা হবে ১৯৭৯ সালের ঘটনার মতোই। ইতালির ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোর পতন ঘটতে পারে। এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট ট্রায়ালও দেখতে হতে পারে এই ২০১৭-তে! (সূত্র : পোস্টওয়েস্টার্নওয়ার্ল্ড ডটকম)

২০১৬ : বিশ্বজুড়ে উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদের উত্থান

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফিলিপাইনে রডরিগো দুদার্তে, রাশিয়ায় ভ্লামিদির পুতিন, ভারতে নরেন্দ্র মোদি, জাপানে শিনজো অ্যাবে, চীনে শি জিনপিং, তুরস্কে রজব তাইয়্যেপ এরদোগান, মিসরে আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, …। তালিকাটা ছোট নয়। তাদের মধ্যে মিল কোথায়?

সবাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়ী। তবে উদার, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশের যে স্বপ্ন তাদের পক্ষ থেকে দেখানো হয়েছিল, তারা এখন সবাই ওই পথের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকের যাত্রী। যুক্তির কথা, সহমর্মিতার ভাষা, ভালোবাসার স্বপ্নের বিপরীত পথের অগ্রগামী পথিক। শঙ্কা জাগছে, ১৯৩০-এর দশকের পর উদার গণতন্ত্র এখনই সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখে পড়েছে। অবশ্য কারো কারো মতে, পরিস্থিতি এখনো তত খারাপ হয়নি; বরং সামনে আরো খারাপ দিন আছে। কিছু দিনের মধ্যে ইউরোপে গুরুত্বপূর্ণ ৯টি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এগুলো ইউরোপকে বদলে দিতে পারে। সেই স্রোত পৃথিবীর প্রতিটি কোণে অনুভূত হতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সে নির্বাচন হবে আগামী এপ্রিল-মে মাসে; অস্ট্রিয়ায় ডিসেম্বরে। সেখানে নাৎসিদের প্রতিষ্ঠিত কট্টর অভিবাসনবিরোধী, মুসলিম বিদ্বেষী ফ্রিডম পার্টিই ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, এবং তা বেশ বড় ব্যবধানেই। জার্মানিতে নির্বাচন অক্টোবরে। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে মুসলিমবিদ্বেষী ‘আলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি’ বেশ ভালো ফল করেছে। অ্যাঙ্গেলা মারকেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টির করুণ অবস্থা ফুটে ওঠেছে। উদার অভিবাসননীতির কারণেই তার এই দশা হয়েছে বলে অনেকে মনে করছে। ইতালিতে  ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচন হবে। ডিসেম্বরের গণভোটে হেরে গেছে প্রধানমন্ত্রী ম্যাত্তিও রেনজির দল। সেখানে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট ভালো ফল করতে পারে।

তা হলে কী ফরাসি বিপ্লব যে স্বপ্নের হাতছানি দিয়েছিল, সেটির অবসান হতে চলেছে? ফরাসি বিপ্লবে কেবল প্যারিসের নয়, সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা ছিল। নেপোলিয়নের রাজকীয় সেনাবাহিনী ফ্রান্সের সাথে সাথে মুক্তি, সাম্য আর ভ্রাতৃত্ববোধেরও গৌরবও প্রচার করেছিল। অবশ্য মনে রাখতে হবে, এর কয়েক দশক পর ঐক্যবদ্ধ জার্মানিতে যে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়, তা বিশ্বের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর জয়ধ্বনি তোলা হয়। জাতীয়তাবাদের উপাদান কোনো না কোনোভাবে সব সমাজেই ছিল এবং রয়েছে। রাষ্ট্র, নাগরিক এবং বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য এর দরকার রয়েছে বলেই মনে করা হয়।

কিন্তু এখন অনেক দেশই সার্বজনীন, নাগরিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি উদারনৈতিক চেতনা প্রত্যাখ্যান করে একই রক্ত ও একই মাটিকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের দিকে ছুটছে। সবাইকে নিয়ে, সবার সাথে এগিয়ে যাওয়ার নীতি বাদ দিয়ে নিজেরা আরো জমাটবদ্ধ হয়ে অন্যদের দূরে ঠেলে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে।

তাহলে কি নাৎসিবাদের মতো উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসছে? ১৯৩০-এর দশকের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়। উত্তর কোরিয়ার মতো দুই একটি দেশ বাদ দিলে সর্বগ্রাসী, সর্বব্যপ্ত একনায়কতন্ত্র অন্য কোথাও নেই। কিন্তু তবুও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের স্রোত বইছে বিপুল বেগে; কিন্তু অন্যভাবে; তবে এখানেও মিল আছে। হিটলার, মুসোলিনিরা ভোটে জয়ী হয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। এখনকার সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও ভোটেই তারা নির্বাচিত হচ্ছেন। আর যেসব দেশে গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি, সেখানে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা উন্নয়নের কথা বলছেন, অনেক সময় অন্ন, বস্ত্র নিশ্চিত করার কথা বলে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে? প্রশ্নটা অনেক দিন ধরেই ঘোরাফেরা করছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৬১তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ভাবনাটি জোরালো করেছে। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার করার মতো ঘোষণা জোরেসোরে দিয়েই তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটে জয়ের জন্য জাতিগত বা বর্ণগত সংহতি কাজে লাগানোর চেষ্টা একেবারে নতুন নয়। এই ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও তা করেছেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট বাগাতে তিনি একবার বলেছিলেন, মিট রমনি পাস করলে ‘আবার তোমাদের শৃঙ্খলে বাঁধবেন।’ তবে সেটা ওই একবারই; সেটা তেমন জোর পায়নি। আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসে ট্রাম্পের মতো উগ্র শ্লোগান আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টপ্রার্থী দেননি। তার কথা আর কাজের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু হবে, কেউ জানে না।

ট্রাম্পের জয় বিশ্বজুড়ে সমমনা নেতাদের উৎসাহিত করেছে। যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির নাইজেল ফারাগে, বেক্সিটের অন্যতম পুরোধা, ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের সাথে দেখা করে তাকে অভিনন্দিত করে এসেছেন। হাঙ্গেরির অভিবাসনবিরোধী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান উল্লসিত হয়ে বলেছেন, ‘আমরা আসল গণতন্ত্রে ফিরতে পারি… কী সুন্দর পৃথিবী!’

এই ফলাফল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। ফরাসিরা এখন ধরে নিতে পারে আগামী বছরের নির্বাচনে ন্যাশনাল ফ্রন্টের ক্যারিশমেটিক নেতা ম্যারিঁ লে পেন হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। এর মানে বিশ্বায়ন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে ফ্রান্সের সরে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত। লে পেন আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে ফ্রান্সকে ইউরো থেকে সরিয়ে আনবেন, ইইউ’র সদস্যপদ থেকে বের হওয়ার জন্য ফ্রেক্সিটের ব্যবস্থা করবেন। ফ্রান্সের বিদায় মানে একক ইউরোপিয়ান মুদ্রারও পতন। আবার ফ্রান্সের সরে যাওয়া মানে ইইউ’র নিশ্চিত মৃত্যু।

অথচ মাত্র কিছু দিন আগেও ইউরোপিয়ান এলিটরা মনে করেছিলেন, জাতীয় পরিচিতি লুপ্ত হয়ে মহাদেশীয় চরিত্র রূপ নেবে। কিন্তু ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, হাঙ্গেরির ফিদেজস, পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিজ পার্টি, অস্ট্রেয়ার ফ্রিডম পার্টি তাদের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে দিয়েছে। মিস লে পেনের কথাই মূলত তাদের মুখ দিয়েও উচ্চারিত হচ্ছে। ফ্রান্সকে আবার গ্রেট করার বুলি কপচিয়ে তিনি মাত করতে যাচ্ছেন।

ট্রাম্পের মতো মুসলিম অভিবাসী বিরোধী কথা খোলামেলাভাবে লে পেন বলেন না। আইনজীবী হওয়ার কারণে তিনি আইনের মারপ্যাঁচ ভালোই জানেন। তিনি কেবল জানিয়েছেন, তিনি প্রকাশ্য জীবন থেকে ধর্মকে সরিয়ে রাখবেন। তবে আসলে তিনি কী চান, তার একটা মহড়া হয়েছে ২০১৫ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনের সময়। তখন দুই নারীকে সামনে আনা হয়েছিল। একজনের গালে ছিল তিন রঙা ফরাসি পতাকা আাঁকা, অপরজন বোরকা পরা। দুজনের সামনে লেখা ছিল : ‘প্রতিবেশী হিসেবে কাকে চান, তার আলোকে ভোট দিন।’

অভিবাসীবিরোধী অবস্থান থেকে সুইডেনও পিছিয়ে নেই। ২০১০ সালে জাতীয়তাবাদী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটস বলেছিল, মুসলিম ঢলের কারণে তাদের কল্যাণ তহবিলে অর্থের টান পড়ছে। অভিবাসীবিরোধী শ্লোগানের জেরেই দলটির জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়ছে।

নেদারল্যান্ডসের গির্ট উইল্ডার্সও মুসলিমবিরোধী নেতা। তিনিও তার দেশে বেশি মুসলিম দেখার আশা করছেন না। আগামী মার্চের নির্বাচনে তার দল প্রথম না হলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তার জাতীয়তাবাদী শ্লোগান। দেশটি নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও ক্রিমিয়া দখল করে নেওয়া, ইউক্রেনের একটি অংশে হামলা চালানো রুশদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চীনের অবস্থাও প্রায় একই ধরনের। সেখানেও শি জিনপিং ‘চীনা স্বপ্ন’ দেখাচ্ছেন। সেখানে দেশপ্রেম শিক্ষার আয়োজন চলছে প্রাথমিক থেকে ডক্টরেট পর্যায় পর্যন্ত। চীনারা মনে করছে, তার হাত ধরে আবার মহাচীন বাস্তবে ধরা দেবে।

মিসরের স্বৈরতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ সিসি দেশের সব সম্পদ ব্যয় করছেন এই আইডিয়া প্রচার করতে যে, তিনিই তার জাতির পিতা। তার সরকার সবকিছুর জন্যই ইসলামপন্থীদের দায়ী করছেন। এমনকি গত বছর আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবল বর্ষণের পর বন্যা দেখা দিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুসলিম ব্রাদারহুডকে দায়ী করে বলেছিল, তারা সব ড্রেন বন্ধ করে দিয়েছে। নিজেকে ফারাওদের সমমর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই মূলত তিনি মহা-জাকজমকের সাথে ৮ শ’ কোটি ডলারের নতুন সুয়েজ খালের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন করেছেন।

তুরস্কের রজব তাইয়েব এরদোগান ‘নতুন তুরস্ক’ গড়ার পথে এগুচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি ১৪৫৩ সালের কনস্টানটিনোপল জয়ের বার্ষিকীতে বিশাল সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। অনেকেই বলছে, তিনি বিরোধীদের নির্মূল করতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন।

ভারতে ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল বিজয় ঘটে। নরেন্দ্র মোদির হিন্দুৎভায় বা হিন্দুত্ববাদিতায় অ-হিন্দুদের স্থান রয়েছে অতি সামান্যই। সর্বগ্রাসী হিন্দুত্ব থেকে কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় প্রাধান্যকে কেন্দ্র করে সেক্যুলারবাদীদের কোণঠাসা করে ফেলছে।

এমনটা কেন হচ্ছে? অনেক তত্ত্বের কথাই বলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়া। উন্নত দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি যত কমছে, বৈষম্য তত বাড়ছে, বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থনও পাল্লা দিয়ে  হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষিতরা হয়তো ভালোই করছে, কিন্তু কায়িক শ্রমিকদের অবস্থা করুণ হচ্ছে। আউটসোর্সিং উন্নত দেশের গরিবদের অবস্থা আরো খারাপ করে দিচ্ছে। দায় চাপছে বিশ্বায়ানের ওপর। এর বিরুদ্ধে কথা বলে এই কায়িক শ্রমিক শ্বেতাঙ্গ ভোটাররাই জিতিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্পকে। লে পেনও এই সূত্র ধরে আগামী নির্বাচনে ভালো করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোনো কোনোটিতে প্রবৃদ্ধি উচ্চতর মাত্রায় দেখা যায়, বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থনও বেশি মনে হয়। কিন্তু লোভাতুর কর্মকর্তা, নোংরা বাতাস লোকজনকে ভয়ঙ্কর সমস্যায় ফেলছে। সিসি কিংবা পুতিনের মতো জাতীয়তাবাদী লৌহমানবেরা সব ভুল থেকে দৃষ্টি সরাতে সস্তা জাতীয়তাবাদকে ভালোভাবেই ব্যবহার করছেন।

আবার মুসলিম সংখ্যা বড় করে দেখিয়েও উগ্রপন্থীরা ভীতি ছড়াচ্ছে। মুসলিমরা ইউরোপ, আমেরিকা দখল করে নেবে- এমন ভয় সেখানকার লোকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট।

আরেকটি কারণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও নতুন জাতীয়তাবাদের গতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেসবুক আর টুইটার লোকজনকে মূলধারার মিডিয়ার পরিশীলিত তথ্যকে এড়িয়ে সমমনা গ্রুপ তথ্যের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগও থাকে না। আবার যখন যাচাই-বাছাই হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। ট্রাম্পের টুইট মুহূর্তেই কোটি কোটি লোকের কাছে চলে যায়।

অর্থনীতি একটা বড় কারণ। একটা কথা অনেকেই জোর দিয়ে বলছেন, উদীয়মান মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা ক্ষমতাসীনেরা পূরণ করতে পারছে না। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত যেভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তা এখন আর কোনোভাবেই হচ্ছে না। অনেকে এর দায়ভার সরলভাবে বিশ্বায়নের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বায়ন নয়, বরং নতুন নতুন প্রযুক্তিই সম্ভবত এর জন্য দায়ী। প্রযুক্তি নিজের কাজটি করছে ঠিকই, কিন্তু আগের সময়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আয় যেভাবে বাড়তো, এখন তা হচ্ছে না। প্রযুক্তি আর জীবনমানকে সেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে না।

তাছাড়া মানুষের প্রত্যাশা যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে তারা পাচ্ছে না। ফলে যে ব্যবধান বাড়ছে, তা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। এর ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, তাদের সন্তানরা তাদের চেয়েও খারাপ অবস্থায় পড়বে; এটা তাদেরকে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় তথা নিজেরা ভালো থাকাটা আমাদেরকে সংকীর্ণ লাভ-লোকসানের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে থাকে। আমরা নিজেরা যখন ভালো করতে থাকি, তখন কিন্তু অন্যরা কে কী করলো, তা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাই না। ওই সময়টাতেই আমরা কিন্তু বঞ্চিত, অভাবগ্রস্তদের দিকে তাকাই, তাদের প্রতি উদার, সহিষ্ণু হই। কিন্তু আমরা যতটুকু পাওয়ার আশা করি, ততটা না পেলে অন্যদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হই। তখনই আমাদের নবাগতদের দেখলে ভয় জাগে, মনে হয় তারা বুঝি আমাদের অধিকারটাই কেড়ে নিচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকারজুড়ে অভিবাসী ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষ দেখা যায়, তার নেপথ্যে এই কারণটিই সক্রিয় বলে অনেকের ধারণা। সেখানকার মানুষজন মনে করছে, তারা বুঝি তাদের চাকরি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেড়ে নেবে।

চরম ডানপন্থীরা এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছে। আর তাদের বিরুদ্ধে উদারপন্থীরা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। কারণ বন্ধ্যাত্ব তো তাদের আমলেই হয়েছে। অবস্থা আরো করুণ হচ্ছে, তারা যেন নেতৃত্বশূন্যও হয়ে পড়ছে। বিকল্প যেন চোখেই পড়ছে না। ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে উদার গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অনেকে বলেছিলেন, উদার গণতন্ত্রই ইতিহাসের শেষ কথা। কিন্তু ইতিকথার পরও যে আরো কথা থাকে, সেটাই যেন সামনে এসে পড়েছে।

তবে আশার কথাও আছে। উদারমনারাও সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার করতে পারে। ফেসবুক, টুইটারকেন্দ্রিক স্রোত হয়তো স্থায়ী হবে না। আবার মূলধারায় ফিরে যেতে পারে সবাই।

আরেকটি আশার কথা হলো, শিক্ষিত লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে মাত্র ৫ ভাগ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেত, বর্তমানে যায় ৪০ ভাগ; তারা উদার ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য।

আর যে অভিবাসীসহ যেসব কারণে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেটাও নতুন পথে  চলতে শুরু করেছে। তরুণরাও কিন্তু ঠিকই উদার পথে ঝুঁকবে। কারন ওটাই হচ্ছে-আশার, প্রত্যাশার, প্রাপ্তির; আর ওই পথই- নিজকে, সমাজেকে এবং সমন্বিতভাবে ভালোবাসার পথ!