Home » আন্তর্জাতিক (page 7)

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের ‘বিকৃত’ দৃষ্টিভঙ্গি কী পাশ্চাত্যকে হুমকিতে ফেলবে?

ক্রিস প্যাটেন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

আমি আমার পুরো রাজনৈতিক জীবন কাটিয়ে দিয়েছি ‘পাশ্চাত্য’ (দি ওয়েস্ট) নামে পরিচিত কোথাও না কোথাও । না, এটা আক্ষরিকভাবে ‘পাশ্চাত্য’ নয়, তবে এর কেন্দ্রভূমি পশ্চিম ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দূরের বহু দূরের দেশও রয়েছে। একে বরং অভিন্ন আশা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটা সম্প্রদায় বলা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিফলনকারী এই ‘পাশ্চাত্য’ যুক্তরাষ্ট্রের ‘হার্ড পাওয়ার’ দিয়ে সুরক্ষিত এবং ‘সফট পাওয়ার’ দিয়ে গঠিত।

পাশ্চাত্য অনেক দিন ধরেই বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে যাচ্ছে। সম্ভবত এটাই এ যাবৎকালের সবচেয়ে সফল ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়েছে, সমবায়ের ব্যবস্থা করেছে এবং অভিন্ন সমস্যাবলীর অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থাপন করেছে। শান্তি বজায় রাখা এবং বিশ্বের বেশির ভাগ এলাকায় সমৃদ্ধি বাড়ানোর এর দৃষ্টিভঙ্গি ও মূলনীতি কোটি কোটি অনুসারীকে আকৃষ্ট করেছে।

অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় এই পুরো ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তিনি তার রূঢ় ও অর্বাচীনমূলক নির্বাচনী প্রচারণাকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বাস্তবায়ন যদি  করেন, তবে অত্যন্ত পরিশীলিত সৃষ্টিগুলো ধ্বংস করে ফেলবেন। অথচ এটা সৃষ্টি হতে লেগেছে অনেক দশক এবং এতে কোটি কোটি মানুষ উপকৃত হয়েছে। আমেরিকানদের মতো আমরা যারা এ থেকে লাভবান হয়েছি, আমাদেরকে এটা টিকে থাকা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

ট্রাম্পকে কোনোভাবেই একটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। সেটা হলো বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ। বিশ্বায়নের কারণে আয় বৈষম্য বাড়ছে, আমেরিকার শ্রমজীবী শ্রেণীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে – এই বিশ্বাসে তিনি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো বাতিল করতে চাইছেন এবং নতুন নতুন চুক্তি করার আলোচনা থেকে সরে আসতে চাইছেন। অথচ আমেরিকার শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক দুর্দশার আসল কারণ হলো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কর-ও-ব্যয় নীতিগুলো ধনীদের অনুকূলে থাকা।

ট্রাম্প যদি মেক্সিকো ও কানাডাকে নিয়ে নর্থ আমেরিকান ফ্রি-ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফতা) থেকে সরে আসেন, ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ অনুমোদন না করেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন, তবে তা তাকে ভোট দেওয়া লোকজনকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে। আর তিনি বিদেশে বন্ধু ও প্রভাব খোয়াবেন।

ট্রাম্প আরেকটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ নিতে পারেন। সেটা হলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ এবং ন্যাটোর মতো সংস্থার সাথে করা আমেরিকার নিরাপত্তা চুক্তি থেকে সরে আসা। ট্রাম্পের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না তার মিত্রদের ‘মাগনা’ নিরাপত্তা দেওয়া। তাদের উচিত নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করা।

বাস্তবে এ ধরনের অবস্থান অত্যন্ত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী। তেমনটি করা হলে পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক দেশগুলো থাকবে রাশিয়ার দয়ায়। আর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু বিস্তারের ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ে থাকতে না পারলে নিজেদের পরমাণু অস্ত্র ভান্ডার গড়ার পথ ধরবে। অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, এ ধরনের অবস্থান গ্রহণযোগ্য।

ট্রাম্প ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেউ কি মনে করে, ইরান আবার তার অস্ত্র কর্মসূচি আবার শুরু করলে সৌদি আরব বসে থাকবে? বারাক ওবামার অন্যতম সেরা অর্জন ওই চুক্তিটির- সমালোচনা করে ট্রাম্প নির্বাচনী ফায়দা লুটেছেন, তবে বাস্তবে তিনি তা বাতিল করতে চাইলে বিশ্ব আরো বেশি বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হবে।

ট্রাম্পের ঘোষিত জলবায়ু পরিবর্তন দৃষ্টিভঙ্গি স্রেফ সমস্যা প্রবণ। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরন কমিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরার প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসার কথাও তিনি ঘোষণা করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অস্বীকারকারী ম্যারোন ইবেলকে তিনি ইতোমধ্যেই অন্তর্বর্তীকালে মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তদারককারী নিয়োগ করেছেন।

ট্রাম্পের বিশ্বাস, মানুষের কার্যক্রমের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের যে কথা প্রচার করা হচ্ছে, তা স্রেফ ধোঁকাবাজি। মার্কিন শিল্পকে কম প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য চীন এটা উদ্ভাবন করেছে। চীনের বিরুদ্ধে এই একটি অভিযোগ করেই ক্ষান্ত থাকেননি ট্রাম্প। এই দেশটির বিরুদ্ধে বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবের ফলে ইতোমধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্পের আমলটি অস্তিত্বগত হুমকিও সৃষ্টি করতে পারে। প্রান্তিক গ্রুপগুলোর প্রতি- মুসলিম, মেক্সিকান, নারী ও অসমর্থ্য লোকজন- তার অবমাননাকর মন্তব্য আমেরিকার মূল পরিচিতি এবং বিশ্বে আমেরিকার স্থান এবং পাশ্চাত্যকে এক সুতায় বেঁধে রাখার ব্যবস্থাকেই ঝুঁকিগ্রস্ত করে ফেলেছে।

মার্কিন নেতৃত্বে ধসের ফলে ১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত সমাপ্তি কিভাবে ঘটাতে পারে, সেটা যারা এখনই বুঝতে পেরেছেন, তাদের অন্যতম হলেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল। ট্রাম্পের জয়ে তার প্রতিক্রিয়া ছিল জলদগম্ভীর ও শক্তিশালী : জার্মানি ও আমেরিকা গণতন্ত্র, স্বাধীনতার মূল্যবোধ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের মর্যাদা, উৎস, গায়ের রং, ধর্ম, জেন্ডার, যৌন আচার বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বাধীনতার মূল্যবোধে সম্পর্কযুক্ত।’ মারকেল ঘোষণা করেছেন, এসব মূল্যবোধের ভিত্তিতেই তিনি ট্রাম্পের সাথে কাজ করবেন।

আমেরিকার সব মিত্র ও বন্ধুর উচিত এভাবেই তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা। মারকেলের মতোই আমাদের সবারই উচিত পাশ্চাত্যের অবস্থান এবং এর অর্জন নিয়ে কথা বলা। আইনের শাসন এবং মুক্ত সমাজের ধারণা সঙ্কুচিত করার ট্রাম্পের যেকোনো পদক্ষেপকে আমাদের সমালোচনা করতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই মুক্ত বাণিজ্যের জন্য কথা বলতে হবে। কারণ মানব জাতির জন্য এর সুদূরপ্রসারী কল্যাণ রয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি সমুন্নত রাখা এবং বিশ্বজুড়ে পরমাণু বিস্তার রোধের জন্য লড়াই করতে হবে।

পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে রুশ অভিযানের বিরুদ্ধেও আমাদের প্রতিশ্রুতি আবারো প্রকাশ করতে হবে।

পরিশেষে আমাদের জোরালোভাবে বলতে হবে, আমরা পাশ্চাত্য যদিও চীনের বণিকবাদী নীতি এবং দেশে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের সাথে একমত নই, কিন্তু তবুও আমরা তাদের সাথে কাজ করতে চাই, তাদেরকে প্রান্তিকীকরণ এবং অবদমিত করতে  চাই না।

‘পাশ্চাত্য’ হলো আমেরিকার সেরা অর্জনগুলোর অন্যতম ; অবশ্য এতে আরো অনেক দেশ অবদান রেখেছে। বিশ্বের জন্য এটা হবে সত্যিকারের বিপর্যয়- যদি আমেরিকা আত্মধ্বংসী অধঃপতনমূলক কাজ করে এই মহৎ, বাস্তবতাপূর্ণ ও উদ্দীপনাময় সৃষ্টিকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে।

রোহিঙ্গা নিধন : সু চি’র হাতে কিভাবে এখনও নোবেল শান্তি পুরস্কার?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, সিএনএন ও ইকোনমিস্ট অবলম্বনে

‘ভাইয়েরা, দেখো, এটা দেখো,’ লোকটা একটা পোড়া বাড়ির ছবি তুলছিলেন। কাদা আর ছাইয়ের মধ্য থেকে লাশগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বাংলাদেশ লাগোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে গুটিকতেক যে ভয়াবহ ভিডিও বাইরের দুনিয়ায় এসেছে, এটা তারই একটা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্যানুযায়ী, গত মাসের সহিংসতার পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী চলমান দমন অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রামের পর গ্রাম ধরে শত শত বাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, স্থানীয় জঙ্গি গ্রুপগুলো এসব আগুন লাগিয়েছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্য ভিন্ন। গত কয়েক দিনে সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসারও চেষ্টা করেছে।

সহিংসতা ও নীরবতা :

রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বশেষ দফার সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে অক্টোবরের প্রথম দিকে। ওই সময় ৩০০’র মতো সশস্ত্র একটি গ্রুপের হামলায় কয়েকজন সৈন্য ও পুলিশ নিহত হয়। তারপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী অভিযান শুরু করে। এতে কয়েক ডজন নিহত হয়, গ্রেফতার হয় অন্তত ২৩০ জন। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর হিসাব মতে, মৃতের সংখ্যা কয়েক শ’ হবে।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরাট অংশের বাস। রাষ্ট্রহীন এই সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীটি বছরের পর বছর ধরে বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার তাদেরকে ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাদের মতে, এরা হলো অবৈধ বাঙালি অভিবাসী।

অনেকেই আশা করেছিল, মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার, বিশেষ করে নোবেল পুরস্কারজয়ী অঙ সান সু চি সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন।

গত বছরের জাতীয় নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) বিপুল বিজয় লাভ করে। এতে করে দুই যুগের বেশি স্থায়ী নির্মম সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।

অবশ্য সাবেক জান্তার প্রণীয় সংবিধানের আওতায় সামরিক বাহিনী পার্লামেন্টের ২৫ ভাগ আসন ধরে রেখেছে। নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিও তারা তদারকি করে।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর, তাতমাডো, নেতৃত্বে আছেন সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হ্লাইঙ। সাবেক লৌহমানব থান শু ২০১১ সালে তার উত্তরসূরি হিসেবে তাকে নিয়োগ করেছিলেন।

রাখাইনে অভিযান চালাচ্ছে সামরিক বাহিনী। তবে সরকার কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় মানবাধিকার গ্রুপগুলো হতাশা প্রকাশ করেছে।

ব্যাংককভিত্তিক ফোরটিফাই রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘সরকার সরাসরি মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। সরকার যে ধরনের লংঘনকে অস্বীকার করছে, তা দেশের সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি :

মিয়ানমারে এক কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, রাখাইনে এ ধরনের সহিংসতা অব্যাহত থাকলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

জাতিসংঘ দূত জয়নব হাওয়া বাঙ্গুরাও নারীদের প্রতি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ভয়াবহ জাতিবিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতার উল্লেখ করেছেন। ওই অঞ্চলে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমার সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।

সিএনএন অনেকবার সু চি’র অফিসের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

হতাশা :

গত সেপ্টেম্বরে সিএনএনের সাথে এক সাক্ষাতকারে সু চি বলেছিলেন, তার সরকার আমরা যেমন চাই, তেমন সম্প্রীতি, সমঝোতা ও সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় অনেক ঝামেলার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, এটাই আমাদের সামনে আসা একমাত্র সমস্যা নয়। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়  এটার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি কফি আনান কমিশনের দিকে ইঙ্গিত করেন।

তবে এখন সু চি’র এ ব্যাপারে ভয়াবহ নীরবতা মনে হচ্ছে, তিনি কিছুই শুনছেন না। আর এটাই বিশ্লেষকদের কাছে ভয়াবহ উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রবল অনুভূতি রয়েছে। দেশটির মূলধারায় মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বরতা দিন দিন বাড়ছে। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা।

সামরিক বাহিনীর নির্যাতন :

গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের আগে ও পরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের ভয়াবহ অনেক অভিযোগ ছিলে ও আছে। সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের অনেক ঘটনা মানবাধিকার সংস্থাগুলো তুলে ধরেছে। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। রাখাইন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সামরিক বাহিনী। তারা নানা আশঙ্কার কথা বলে অন্য কাউকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ দিতে চায় না।

ম্যাথু স্মিথের মতে, এখন রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘নির্মূল অভিযান’ শুরু হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

তিনি বলেন, অক্টোবরের কথিত হামলার আগেই রাখাইন রাজ্য কর্তৃপক্ষ মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তি ধ্বংস করার কাজ শুরু করেছিল। আরেকটি ঘটনার জের ধরে তারা বর্তমান কাজটি করছে।

ইকোনমিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে, চার শতাধিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর বাস্তুহারা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি। ১,২৫০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এসব নির্যাতন, নৃশংসতায় একটুও শব্দ করছেন না শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি। তার এই দুর্বোধ্য আচরণে বিশ্ববিবেক হতবাক। অনেকে ক্ষোভে, ক্রোধে তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে। এমন অশান্তির মধ্যেও যে শান্তিতে ঘুমাতে পারে, তার হাতে কিভাবে শান্তি পুরস্কার থাকতে পারে, সে প্রশ্ন তারা তুলছে।

ট্রাম্পের জয় কী প্রভাব ফেলবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে?

সি রাজা মোহন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

একটি আতঙ্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আতঙ্ক ইউরেশিয়াকে তাড়া করে ফিরছে। কারণ ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ ও এশিয়া প্রশ্নে আমেরিকান কৌশলের মূলনীতি তিনি বাতিল করে দেবেন। ইউরেশিয়াজুড়ে তথা প্যারিস থেকে টোকিও, ব্রাসেলস থেকে সিঙ্গাপুর, বার্লিন থেকে সিউল পর্যন্ত সরকারগুলো ট্রাম্পের একেবারে অপ্রত্যাশিত বিজয়ের পরপরই সম্ভাব্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন শুরু করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় সামরিক জোট গঠনের মাধ্যমে ইউরেশিয়ান নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে দূরবর্তী শক্তি আমেরিকা প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ১৯৭০-এর দশকের সূচনায় পূর্ব সুয়েজ থেকে গ্রেট ব্রিটেন নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় উপকূলজুড়ে প্রধান বহিঃশক্তিতে পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্র।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনান্ড ট্রাম্প আমেরিকান গাঁটছড়ার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরেশিয়ান অংশীদারদের মধ্যকার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পুনঃবণ্টন দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যদি তাদের প্রতিবেশীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে তবে তিনি তাতেও তেমন উদ্বিগ্ন হবেন না।

রাজনৈতিক দৃশ্যপটে থাকা উভয় পক্ষের হস্তক্ষেপবাদীদের বিপরীতে ট্রাম্প জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধকে মারাত্মক ভুল হিসেবে সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, সর্বজনীন মূল্যবোধ বিকাশের কল্পনার পিছু ধাওয়া না করে এবং বিশ্বজুড়ে ব্যয়বহুল ও অসফল জাতিগঠন কাজে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বরং আত্ম-স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া।

‘রুশ হুমকি’ প্রশ্নে ওয়াশিংটনের কান্ডজ্ঞানহীন অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন ট্রাম্প। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, তার সাথে কাজ করা যায়। ইরাক ও সিরিয়ার আইএস-কে পরাজিত করতে তিনি মস্কোর সাথে অংশিদারিত্বের আহবান জানিয়েছেন। তিনি দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চরম পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দক্ষিণ থেকে অভিবাসন ঠেকাতে তিনি একটি দেওয়াল নির্মাণ করবেন, এবং এজন্য মেক্সিকোকে খরচ দিতে বাধ্য করবেন। তিনি আমেরিকায় বেইজিংয়ের ‘অর্থনৈতিক ধর্ষর্ণের’ সমাপ্তি টানার জন্য যে সস্তা চীনা পণ্যরাজি আমেরিকান চাকরিগুলো শেষ করছে, তার ওপর বিপুল মাত্রায় কর আরোপ করবেন।

ট্রাম্পের নির্বাচন ও  জয় ন্যাটো ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দফতর  ব্রাসেলসে ভয়াবহ ভীতির সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাটো কমান্ডাররা ইউরোপ থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারে ট্রাম্পের নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতারা রোববার জরুরি এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ট্রাম্পের নির্বাচন বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশন এবং ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি এবং ভবিষ্যতে আমেরিকার সাথে যুদ্ধপরবর্তী জোটের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা নির্বাচনী প্রচারণার সময় পুতিনের সাথে ট্রাম্পের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের জয়ের ফলে ইউরোপে উগ্র জনপ্রিয় দলগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠবে বলেও মূলধারার ইউরোপিয়ান দলগুলো ভীত।

আমেরিকার এশিয়ার মিত্ররা তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল, সে ব্যাপারে ট্রাম্পের কাছ থেকে নতুন করে আশ্বাস চাচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সাথে বৈঠকে বসবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। জাপানের সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী জোটের ব্যাপারে ট্রাম্পের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করবেন তিনি।

নির্বাচনের পরপরই চীনা নেতা শি জিনপিং টেলিফোনে আলাপ করেছেন ট্রাম্পের সাথে। তিনি বলেছেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একমাত্র পথ হলো দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা। শি ছিলেন

কার্যত: বেশ বিনীত। কিন্তু দেশটির পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বেশ অসংযত মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক কর বসায় তবে সেটার সমুচিত জবাব দিতে চীন প্রস্তুত। সোমবারের সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি ট্রাম্পকে হুঁশিয়ার করে জানায়, তিনি চীনের সাথে নিশ্চিত পরাজয়মূলক বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িত হয়, তবে তাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন, অজ্ঞ ও অযোগ্য হিসেবে নিন্দিত হতে হবে।’

বিশ্বের একেবারে প্রত্যেকেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের গদি লাভ নিয়ে আতঙ্কে ভুগছে, এমন নয়। ট্রাম্পকে নিয়ে ভালো কিছু হওয়ার আশা করতেই পারে রাশিয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। জাপানের অনেক আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের জোট নিয়ে নতুন সমঝোতা হবে এবং এতে করে এই অঞ্চলে টোকিওর নিরাপত্তাগত ভূমিকা বৈধ ও সম্প্রসারিত হবে। বারাক ওবামার বিদায়ে মধ্যেপ্রাচ্যের ইসরাইল, মিশর ও সৌদি আরব খুশি হয়েছে। তারা এই অঞ্চলে বন্ধুদের পরিত্যাগের জন্য ওবামাকে দায়ী করে ট্রাম্পের কাছ থেকে আশা করতে পারে, তিনি পুরনো মিত্রতা ঝালাই করবেন, ইরানের প্রতি আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবেন।

আপনি যদি বড় শক্তি হন এবং আপনার মন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে অনেক দেশের সামনেই আপনার নীতি মেনে নিতে বাধ্য হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। আমেরিকার প্রতিবেশী ও বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডা ইতোমধ্যেই নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নিয়ে নতুন করে আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায় এই চুক্তিটি হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড় চাকরিখোর।

অবশ্য অনেকে এমন আশাও করছেন, ওয়াশিংটনে দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে চরম বাগাম্বড়তাপূর্নতা ছেড়ে ট্রাম্প মধ্যপন্থাই অবলম্বন করবেন। অন্য কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে নানা ধরনের বিপরীতমুখী বক্তব্য ছিল। এগুলো প্রয়োগ করা সহজ নয়।

তবে দিল্লির কর্মকর্তাদের উচিত ওয়াশিংটনে ধারাবাহিকতার বদলে ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা। ট্রাম্প অবশ্যই ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের সাথে কোনো না কোনো ধরনের খাপ খাওয়ানোর পন্থা খুঁজে নেবেন। কিন্তু তবুও তার অনেক সমর্থকের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি প্রবল ভাবাবেগকে তিনি স্রেফ উড়িয়ে দিতে পারবেন না। ট্রাম্প তার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতিতে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে এলেও ইউরেশিয়ার ভূরাজনীতি আর আগের মতো থাকবে না।

লেখক : পরিচালক, কার্নেগি ইন্ডিয়া, দিল্লি এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সম্পাদক

‘আরব বসন্তে’র আর্থিক ক্ষতি ৮৩ হাজার কোটি ডলার

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও বিবিসি অবলম্বনে বুধবার-এর বিশ্লেষণ

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো ‘আরব বসন্ত’। সবচেয়ে স্থবির, স্বৈরতান্ত্রিক, জটিল একটি অঞ্চল হঠাৎ করেই জেগে ওঠেছিল ওই সময়টাতে। অবশ্য, এখন আর সেই সময় নেই; ওই বসন্তের পর এখন ভয়াবহ শীত নেমেছে। তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র কোনোভাবে টিকে থাকলেও মিশরে আরো ভয়াবহ মাত্রায় একনায়কতন্ত্র চেপে বসেছে, লিবিয়া, ইয়েমেন আর সিরিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তির সার্বিক সহায়তায়। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে সরকারের বজ্রমুষ্টি আরো জোরালো হয়েছে।

অবশ্য কেবল রাজনৈতিকই নয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও কম ছিল না আরব বসন্তের। দুবাইয়ে প্রকাশিত আরব স্ট্র্যাটেজি ফোরামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ২০১১ সালের ওই ঘটনার জের ধরে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৩০ বিলিয়ন ডলার বা ৮৩ হাজার কোটি ডলার। এটা ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের মোট জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশের সমান।

বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যের আলোকে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। তারা চার বছরের স্টক ও বিনিয়োগ, জিডিপি, অবকাঠামোগত ক্ষতি, হতাহত, পর্যটন খাতে মন্দা এবং উদ্বাস্তু জটিলতাগুলো হিসাবে নিয়েছে।

তবে এই হিসাবের মধ্যে প্রাণহানিজনিত ক্ষতি কিংবা উদ্বাস্তুদের মানসিক বিপর্যয়ের মূল্যটি হিসাব করা হয়নি। সেটা সম্ভবও নয়। তাছাড়া কোন দেশে ঠিক কত পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সেটাও এই প্রতিবেদনে জানানো হয়নি।

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব বসন্তের নামে যে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে তাতে বিনাশ হয়েছে ৬১৪ বিলিয়ন ডলার বা ৬১ হাজার ৪শ কোটি ডলার। আর এই অর্থের পরিমাণ ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সমগ্র আরব জামানার দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র ৬ শতাংশের সমান। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের হিসেবে বলা হয়েছে, এই আরব বসন্ত ৪টি দেশে যুদ্ধ বয়ে এনেছে। সাথে সাথে গোটা এলাকায় এনে দিয়েছে ঋণ নির্ভরতা, চরম বেকারত্ব, উচ্চ মাত্রার দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়া শরণার্থী পরিস্থিতির। যদিও কতিপয় অর্থনীতিবিদ আরব বসন্তের আগে উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধির নানা গল্প আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করেছিল নির্দ্ধিধায়।

আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিশিয়ায়। মোহাম্মদ বুআজিজি নামের এক তরুণ ফলবিক্রেতা বেকারত্ব আর সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন। তার আত্মহত্যায় তার দেশে গণবিস্ফোরণ ঘটে। প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করে নির্বাসনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই আগুন মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার আরো কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মিশর, ইয়েমেন, বাহরাইন, লিবিয়া, ওমান, জর্ডান ও মরক্কোতে প্রবলভাবে তা অনুভূত হয়। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা কার্যকর আর দুর্নীতি অবসানের দাবিতে জনসাধারণ রাজপথে নেমে আসে। মিশরে গণতন্ত্রের জয় হয়। আরো কয়েকটি দেশ প্রয়োজনীয় সংস্কারে রাজি হয়।

তবে নানা কারণে গণমানুষের জয়টি বহাল থাকেনি। স্বৈরতন্ত্রী আরো জোরালোভাবে চেপে বসে। লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়া এখনো গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত। মিশরে স্বৈরাচার আরো কঠোরভাবে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।

হয়তো শীতের অবসান হবে। আবার বসন্ত আসবে। তবে তার মাঝখানে ক্ষতি হয়ে গেল বিপুল।

তবে এতোদিন পরে এসে আরব বসন্তের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি ছিল একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য। আর এর বৈরী হাওয়া বিশ্বকেও করেছে টালমাটাল। দুর্ভাগ্য এই কারণে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে, স্বাধীন, মুক্ত, স্বচ্ছল জীবনের আশা-আকাঙ্খা নিয়ে আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল-তা আসলে আখেরে বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তিকেই বড় মাপের এক সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় : সিস্টেমে ধস

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়কে বিশ্লেষকেরা নজিরবিহীন হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে এটাকে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক ঘটনা । কিন্তু ট্রাম্পের জয় কি সত্যিই পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল? সাম্প্রতিক  সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে যেসব সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিলে ট্রাম্পের জয়কে একেবারে স্বাভাবিক পরিণতিই বলা যায় ।

‘যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেম’ এতোদিন ধরে প্রচার-প্রচারণাসহ নানা মাধ্যমে ধামা-চাপা দিয়ে আসছিল যে, ওই সমাজটিতে কোনো বিভক্তি নেই, বিভাজন নেই, কোনো ভাঙ্গন নেই। কিন্তু এই নির্বাচনের অনিবার্য ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভক্তি, ভাঙ্গন আর ফাটল এখন স্পষ্টাকারে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ঐক্যবদ্ধ সমাজ নয়; বিভক্ত । এই বিভক্তি আর ফাটল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকসহ সব ক্ষেত্রেই। ওই সমাজটিতে ধনী-গরীবের, সাদা-কালোর অর্থাৎ বর্ণবৈষম্যের, নারী-পুরুষের, বিশ্বাস আর আস্থার এমনকি সামগ্রিকভাবে  বিভক্তি বিদ্যমান । ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সংকট কবলিত সমাজেরই সত্যিকারের একজন প্রতিনিধি, এক বড় মাত্রার উদাহরণ, প্রতিচ্ছবি।

যদিও আশ্বাস রয়েছে, আশ্বস্ত করা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘‘গ্রেট এগেইন’’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে; কিন্তু বহু মার্কিনীর এতে রয়েছে অবিশ্বাস আর অনাস্থা । এ জন্যই তারা মাঠে নেমেছেন, প্রতিবাদ করছেন । যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভোটের ইতিহাসে এ ধরনের অবিশ্বাস অনাস্থা রীতিমতো অবিশ্বাস্য বলেই তারা মনে করছেন । সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল হচ্ছে ভাঙ্গন কবলিত সিস্টেমে ধস ।

আর এই সিস্টেমের ধস উপলব্ধি করে, ভাঙ্গন কবলিত সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখে সমগ্র বিশ্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ।

এসব সঙ্কট প্রকটভাবে চোখে পড়েনি; বরং চাপা পড়ে ছিল । বার্নি স্যান্ডার্সদের চোখে অবশ্যই পড়েছিল এবং তারা প্রবলভাবে তা বলেছিলেন । স্যান্ডার্স তৃতীয় কোনো ধারার সৃষ্টি করে রিপাবলিকান প্রার্থীর জয় আগে-ভাগে নিশ্চিত না করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্ধারে নেমেছিলেন । কিন্তু দুর্ভাগ্য তার এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির; সেইসাথে আমেরিকা ও বিশ্ববাসীরও । তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ফলাফল এখন সবার সামনে ।

স্যান্ডার্স সঙ্কটগুলো চাপা না রেখে সমাধানের কথা বলেছিলেন । তিনি মনোনয়ন লাভের প্রয়াসে যেসব প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন, তাতে মার্কিন যুবসমাজে চমক সৃষ্টি হয়েছিল। এসব প্রশ্ন ছিল তাদের মনেও। ফলে তাদের মধ্যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটন কিন্তু এসব সঙ্কট সমাধানের দিকে যাননি । ফলে ভোটাররাও তার সাথে চলতে মন থেকে উৎসাহ পায়নি । হিলারি বরং নতুন নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন । একদিকে নিজের অবৈধ উপার্জন, ই-মেইল কেলেঙ্কারিতে বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের উল্টা-পাল্টা কথা ও কাজ থেকে ফায়দা হাসিলের সহজ পথে চলতে থাকায় নতুন নতুন জটিলতায় পড়েছেন।

মিডিয়া বিশ্লেষকেরা এখন এই ফলাফল নানাভাবে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চাইছেন কেন এমনটা হলো। তারা মোটামুটিভাবে বিভিন্ন বর্ণগত ও পরিচিতিমূলক গ্রুপে ভোটারদের বিভক্ত করে তাদের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা এই সত্যটা অগ্রাহ্য করছেন, নির্বাচনটা পরিণত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যস্ত সামাজিক সঙ্কট ও পঙ্কিলতার ব্যাপারে একটা গণভোট। আর তাতে ট্রাম্প ঝোপ বুঝে কোপ দিতে পেরেছেন এবং বাজিমাত করেছেন।

ট্রাম্প কিন্তু নিজে কোনো ফ্যাক্টর নয়। তিনি বরং একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই গোষ্ঠীটি হলো যুদ্ধবাজদের দল। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ অর্থনীতি হিসেবে দেখতে চায়। যুদ্ধের ‘ম্যাকানিজম’ বহাল রাখতে হলে তাদের এমন একজন প্রার্থীর প্রয়োজন ছিল। ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রচারকালে প্রায়ই আবোল-তাবোল বকতে দেখা যেত। একটু ভালোভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, এগুলো মোটেই প্রলাপ ছিল না। অনেকের মনের কথাই তিনি এভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন।

কাজেই ট্রাম্পের বিজয় সত্যিকার অর্থে কোনো অঘটন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পরাশক্তিটি যেভাবে চলছিল, তার স্বাভাবিক পরিণতি ফুটে ওঠেছে এই ফলাফলে।

এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শ্রেণী যুদ্ধ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং পুলিশি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবেন। নির্বাহী শাখা ছাড়াও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ, সুপ্রিম কোর্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলে যাবে চরম ডানপন্থীদের হাতে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা ‘আবার গ্রেট’ হবে না, ঐক্যবদ্ধ থাকবে না, বরং নানাভাবে বিভক্ত হয়ে জঘন্য ধরনের পঙ্কিলতায় ডুবে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে সীমিত ভোটাধিকার, গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসন এবং এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও সম্ভবত আর থাকলো না।

এই কিছু দিন আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের সরে যাওয়া নিয়ে হৈ চৈ হয়েছিল। এর ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই ভয়ঙ্করভাবে এমনটা প্রত্যক্ষ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ বছর আগে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আসলে সেটা এখনো থামেনি। ধনী-গরিব লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্য রাজপথে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের কৃষ্ণাঙ্গদের গুলি করে হত্যার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, পুলিশি কুকুরের হানা, মরিচ স্পে, টেসার বুলেট নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণ ইত্যাদি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় আফ্রিকান আমেরিকানদের দিকে তাক করা হয় তিন গুণ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৬টি রাজ্যে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। এর ফলে এসব রাজ্যে আয় বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এসব রাজ্যেই শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

অনেক রাজ্যে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্লোরিডা। সেখানে এখনই ১০ লাখের বেশি লোকের ভোটাধিকার নেই। বঞ্চিতদের বেশির ভাগই আফ্রিকান আমেরিকান। নানা বিধিনিষেধের বেড়াজাল দিয়ে এসব লোককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এসব সমস্যার আর সুরাহা হচ্ছে না, এমনটাই ধরে নেওয়া যায়। অনিশ্চয়তার পথে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে না। তারা অবিশিষ্ট বিশ্বকেও একই দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেটা আরো বড় ভয়ের কারণ।

এশিয়ায় অনিশ্চয়তা আর অস্বস্তি :: চীন-মার্কিন বানিজ্য যুদ্ধ!

ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ ::

অনেক অনেক দিন আগে থেকে আমেরিকান গ্র্যান্ড স্ট্যাটেজি তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং তা থেকে সৃষ্ট সমৃদ্ধি; জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত দৃঢ় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিত্রতা; এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ। আমেরিকার নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এগুলোর কোনোটিকে পরোয়া করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার বিজয়ে এশিয়ায় আমেরিকান শক্তি ও মর্যাদায় বিরাট আঘাত বিবেচিত হচ্ছে।

বাণিজ্য দিয়ে শুরু করা যাক। কয়েক বছর ধরেই ওবামা প্রশাসন সবার জন্য সমান সুযোগ-সংবলিত, স্বচ্ছ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে ১২ জাতি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপকে (টিপিপি) এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। দেশে এটা সহজে গ্রহণযোগ্য হবে না মনে হলেও, ধারণা করা হচ্ছিল রিপাবলিকান প্রাধান্যপূর্ণ কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত এটা পাশ করে দেবে। এখন তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আইনপ্রণেতারা জাতীয় মনোভাবের প্রতি স্পর্শকাতর এবং ট্রাম্পের ভোটাররা আর যা-র জন্যই ভোট দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত এশিয়ার সাথে ওই বাণিজ্য চুক্তির জন্য নয়।

সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ ভাগ কঠিন কর আরোপের কথা ভাবছেন। এ ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভবত আমেরিকাই হবে এর বৃহত্তম শিকার। আর তা এশিয়ায় বিস্তৃত উৎপাদন নেটওয়ার্ক দিয়ে ধেয়ে চাকরি শেষ করে দেবে, আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানবে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের মধ্যে থাকা একমাত্র অর্থনীতিবিদ (বাকিরা আসলে ব্যবসায়ী) পিটার ন্যাভ্যারোর মতে, আমেরিকার উৎপাদন খাতে ধস সৃষ্টির জন্য দায়ী চীন। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাকে তিনি মনে করেন বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। মূলধারার জনমতে এসব দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আলোচিত। তবে যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনে ন্যাভ্যারো বিশেষ গুরুত্ব পাবেন, তাই তার মনোভাবকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেবেন, চীনের সাথে বারাক ওবামার করা জলবায়ু সমঝোতা, যেটাকে সাইনো (চীন) -আমেরিকান সম্পর্কের গুটিকতেক উজ্জ্বল বিন্দুর অন্যতম মনে করা হয়, বাতিল করে দেবেন।

বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রাণবন্ত মহাদেশ হিসেবে এশিয়ার প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিতে বারাক ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ধারণা বিকশিত করে তুলেছিলেন। এটাও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তার জয়ে এশিয়ায় আমেরিকার মিত্ররা বেশ অস্বস্তিতে পড়বে। বারাক ওবামা চেয়েছিলেন চীনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে সংযত করতে। তা না হলে এই দেশটি দূরপাল্লার পরমাণু বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হতে পারে। হিলারি ক্লিনটন সেটা বুঝতেন। আর তা-ই জয় নিশ্চিত মনে করে তিনি এশিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করে ফেলেছিলেন।

ট্রাম্প কিন্তু এসব কিছু বোঝেন না। এসব ব্যাপারে কে তাকে পরামর্শ দেবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনী প্রচারকাজের সময় তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার আশ্বাসে বসে না থেকে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজ নিজ প্রতিরক্ষা খাত জোরদার করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

তার এসব কথার সূত্র ধরে বলা যায়, তিনি এশিয়ার সাথে তেমনভাবে সম্পৃক্ত থাকবেন না। আর সেটাই যদি হয়, তবে তা হবে চীনের জন্য মহাসুযোগ। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, চীন হলো উদীয়মান শক্তি, আর আমেরিকার অবস্থা ভাটার দিকে।

ট্রাম্পের জয় আসলে আমেরিকার দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত  গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য সম্ভবত চীনের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাবে। আমরা এখন কেবল তাকে অবাধে তার কাজ করার সুযোগ দিয়ে তিনি কত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে পারি।’

যুক্তরাষ্ট্রে এ কেমন নির্বাচন : যুদ্ধ মন্দা বর্ণবাদ জন-সংকটও কোনো ইস্যু নয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :: ফ্রন্টলাইন অবলম্বনে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য আমেরিকানরা নভেম্বরে ভোটে যাচ্ছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, ২০১২ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত ভোটারদের অর্ধেকের সামান্য বেশি তথা ৫৭.৫ ভাগ ভোট দিয়েছিল। বাকি ভোটারেরা নির্বাচনের পরোয়া করেনি। তারা হয় ভোট দিতে যাওয়ার মতো সময় পাননি (সেখানে নির্বাচন হয় কর্মদিবসে) কিংবা কাজটি করার জন্য ভেতর থেকে তেমন ধরনের তাগিদও সৃষ্টি হয়নি। এবারের নির্বাচন সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থী দুজন সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত, বিতর্কিত দুই ব্যক্তি। জনমত জরিপে দেখা যায়, হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প একে অপরের খুবই কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছেন। ভোটাররা উদ্দীপ্ত হয়ে তাদের ভোট দিতে চান, এমন নয়। বরং প্রতিদ্বন্দ্বিকে অপছন্দ থেকে তারা ভোট দিতে চান।

এবারের নির্বাচনে কোন কোন ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে? তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, কোটি কোটি আমেরিকানের দুরবস্থায় পড়া নিয়ে কোনো গভীর আলোচনা হচ্ছে না, নাগরিক অধিকার, জেন্ডার বৈষম্যও সেভাবে আলোচিত হচ্ছে না। প্রার্থী দুজনের কেউই এসব বিষয়কে প্রকাশ্য বিতর্কের মতো ইস্যু মনে করছেন না। যেসব ইস্যু ভেসে আসছে, সেগুলো যৌক্তিকাপূর্ণ কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এগুলোর মধ্যে দুটির কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় : হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্য এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজ। এগুলোই আকাশ-বাতাস মুখর করছে। ক্ষুধা আর অনাহার, ও যুদ্ধ, পুলিশের সহিংসতা, ভূমি অধিকারের মতো মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় আসছে না।

সামনে যা আসছে : একসময় ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিদদের অন্ধ গলিতে যেসব বিষয় ঘুরপাক খেত, এখন সেগুলোই প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করছে। ৯/১১ বার্ষিকীতে হিলারি ক্লিনটনের প্রায় পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি এই ধারণা উস্কে দিয়েছে, তিনি মারাত্মক অসুস্থ। হিলারি শিবির থেকে বলা হলো, তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। কিন্তু সেটাই পর্যাপ্ত বিবেচিত হলো না। তার বিশ্বাসযোগ্যতা কম হওয়ায় চরমপন্থীরা তিনি যে মিথ্যা বলছেন, সেটা প্রচার করার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। ক্লিনটন ফাউন্ডেশন, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুর্নীতি এবং ক্লিনটন পরিবারের সদস্যদেরও বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর মতো যৌক্তিক বিষয়গুলোও তেমন ঝড় তুলতে পারছেন না খোদ অভিযোগকারীদের একনিষ্ঠতার অভাবে। হিলারি ক্লিনটনের কাশিই সত্যি সত্যি তিনি আরো বড় কিছু গোপন (ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে করা চুক্তির কথা বলা যায় উদাহরণ হিসেবে) করছেন বলে অভিযোগ করাটা অবৈধ।

আবার মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটি বেশ বড় অংশ ট্রাম্পকে অবিশ্বাস ও অপছন্দ করে। তার ধুম-ধারাক্কা চালচলন, বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি উন্নাসিকতা, চাপাবাজি উদারপন্থীদের কাছে তাকে অভিশাপে পরিণত করেছে। তাকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিত্রিত করা সহজ। বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো উপযুক্তি নন, তিনি খুবই অস্থিরমতি, অনেকটাই ভাঁড়ের মতো। আর এটাই যারা হিলারি ক্লিনটনের প্রতি উৎসাহী নন, তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাবে। এখানে সাধারণভাবে যে বিষয়টা কাজ করছে, তা হলো ‘বিকল্পের দিকে তাকান,’ কিংবা আরো সহজভাবে বলা যায়, ‘দুই খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপকে ভোট দিন।’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে ট্রাম্প যে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন, ডেমোক্র্যাট শিবির সেটা লুফে নিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, পুতিন শক্তিশালী নেতা। আর বিস্ময় সৃষ্টি করে তিনি বলে ফেলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চেয়েও ভালো পুতিন। এটা উদারপন্থীদের মধ্যে ক্রোধের সৃষ্টি করেছে, তারা বাগাড়ম্বরতার সুচটি স্নায়ুযুদ্ধের এলাকায় সরিয়ে নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুতিন একটি বড় হুমকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। বিষয়টি ইউক্রেন ও সিরিয়ায় রুশ সম্পৃক্ততায় এবং ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ইন্টারনেট সিস্টেম রাশিয়ার হ্যাক করার সন্দেহের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

এসব বিষয়গুলো সিএনএন, ফক্স, এনবিসি এবং অন্যান্য নেটওয়ার্কে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। গণতন্ত্র তাদের কাছে অনেকটা মার্বেল স্লাবে রাখা মরা ভেড়া বা মুরগির দেহ থেকে টেনে আনা বস্তু। বিশ্লেষক ও নির্বাচন সমীক্ষাকারীরা ভেবে মরছেন, হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্য কিংবা ট্রাম্পের বর্ণবাদ কিংবা স্রেফ পুতিন সত্যিই  আদৌ কোনো ইস্যু কি না। মার্কিন সমাজকে অস্থিরকারী রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর দিকে তারা তাকিয়েও তারা দেখছেন না। পুলিশের সহিংসতা, মার্কিন সমাজে ছড়িয়ে থাকা বন্দুক নিয়ে বলতে গেলে কোন আলোচনাই হয়নি। মিডিয়া যখন হিলারি-ট্রাম্প প্রতিযোগিতা নিয়ে মেতে রয়েছে, তখন টায়ার কিং নামের ১৩ বছরের এক আফ্রিকান-আমেরিকান শিশুকে পুলিশ অফিসাররা গুলি করে মেরে ফেলেছে। হত্যা করার সময় কিংয়ের হাতে একটা খেলনা বন্দুক ধরা ছিল। ঘটনাস্থল ওহাইয়োর কলম্বাস নগরীর মেয়র বলেছেন, ‘এই দেশে কিছু একটা ভুল রয়েছে। এটা আমাদের রাস্তায় মহামারী ডেকে আনছে। ১৩ বছর বয়সী ছেলেটা মারা গেল বন্দুক আর সহিংসতার প্রতি আমাদের আচ্ছন্নতার কারণে।’ এই সাংস্কৃতিক সমস্যাটি থাকা দরকার ছিল বিতর্কের সামনে ও কেন্দ্রে। কিন্তু স্থান পাচ্ছে এক প্রান্তে, কোনোক্রমে। ন্যাশনাল রাইফেল এসোসিয়েশনের সদস্য ট্রাম্প। আর মুভমেন্ট ফর ব্ল্যাক লাইভস এবং পুলিশ ইউনিয়নের মধ্যকার চাপে পৃষ্ট হচ্ছেন। তাদের কেউই বন্দুকবাজদের সাথে লড়াই করতে কিংবা বেকারত্ব, পুলিশের নির্মমতায় ছিন্নভিন্ন সমাজে কল্যাণ বয়ে আনতে আন্তরিক নন।

যে নিরন্তর যুদ্ধগুলো বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দুর্ভোগ বয়ে আনছে, সেগুলো অবসানের বিষয় বলতে গেলে বিবেচনাতেই আসছে না। হিলারি কিংবা ট্রাম্প কারোরই কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু দুজনের কেউই প্রতিদিন যে ২০ জন করে যুদ্ধফেরত সৈনিক আত্মহত্যা করছে, তা নিয়ে কোনো কথা বলছেন না। ২০১৪ সালে প্রায় ৭,৪০০ যুদ্ধফেরত সৈনিক আত্মহত্যা করেছেন। সংখ্যাটা ৯/১১-এ নিহতের দ্বিগুণ। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ব্যাপারে সামান্যই বক্তব্য রয়েছে। অথচ আমেরিকান সামরিক শক্তির চাবুকে এশিয়ার এক প্রান্ত থেকে আফ্রিকার অপর প্রান্ত পর্যন্ত লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাচ্ছে।

এই যুদ্ধের কোনো শেষ সীমা নেই। এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটা হতে পারত একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের কর্তব্য অবহেলা প্রসঙ্গে ‘বেনগাজি’র (লিবিয়ার এই নগরীতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ চারজন নিহত হয়েছিল) কথা উল্লেখ করা হয়- লিবিয়ার বিধ্বস্ত দ্বিতীয় নগরী হিসেবে নয়।

কোটি কোটি আমেরিকানের মারাত্মক দুর্ভোগ নিয়ে আলোচনাই হচ্ছে না। অথচ পাঁচ কোটি আমেরিকান গরিব অবস্থায় রয়েছে, তাদের অনেক মারাত্মক ক্ষুধায় মরছে। মহামূল্যবান সরকারি সম্পদ চলে যাচ্ছে সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সে। সম্প্রতি ওবামা ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বাবদ ৩৮ বিলিয়ন ডলার প্রদানের একটি চুক্তিতে সই করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে প্রতিটি মার্কিন করদাতার কাছ থেকে ৩০০ ডলার করে নেওয়া হবে। আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। পরিমাণটা ধারণারও বাইরে। নিজ দেশের জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের বদলে পুলিশ আর যুদ্ধের পেছনে অর্থ ঢালা যেন এই সিস্টেমের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

নভেম্বরে আমেরিকানরা ভোট দিতে যাচ্ছে। যে প্রার্থীকে অপছন্দ করে, তার ভয়ে তারা ভোট দেবে। আমেরিকান সমাজের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আলোচনায় থাকবে না। চাকরির নিরাপত্তা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, নিত্যপণ্যের মূল্য, ছুটি কাটানোর টাকা না থাকা, আরো সুন্দর জীবন কাটানোর স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের দুর্ভাবনা নিয়ে কারোই মাথাব্যথা নেই। তাদের এসব দুর্ভাবনা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের কথার কথায় কেবল স্থান পাচ্ছে। রাজনৈতিক-প্রক্রিয়ায় আস্থা রয়েছে সর্বনিম্ন অবস্থানে। বাক্সে ভোট ফেলার জন্য হাত বেশ দ্রুতই ওঠবে, কিন্তু এই তাড়াহুড়াকে উদ্দীপনা মনে করে যেন ভুল করা না হয়। এটা আসলে হতাশার লক্ষণ।