Home » মতামত (page 2)

মতামত

কোনটা আগে : গণতন্ত্র না উন্নয়ন?

তাজ হাশমী :::
‘‘বাংলাদেশ কেন প্রতিষ্ঠাতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্রের উদগাতা লি, মাহাথির বা অন্যদের অনুসরণ করবে’’
অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ
অবিশ্বাস্য, তবে সত্য। কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রে উত্তরণের আগে প্রয়োজন ‘উন্নয়ন’! ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি : টাইম টু লুক টু দি ইস্ট’ শীর্ষক সা¤প্রতিক এক নিবন্ধে (ডেইলি স্টার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬) মোজাম্মেল খান যুক্তি দিয়েছেন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন একজন লি কুয়ান বা মাহাথির মোহাম্মদের। কানাডার শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট হওয়া সত্তে¡ও মোজাম্মেল খানের যুক্তি ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরশাসনের পক্ষে আইয়ুব খান ও সুহার্তো যেসব কথা বললেন, ঠিক সে রকমের।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মোজাম্মেল খানের মনগড়া ছবিটির ব্যাপারে আমার ভিন্নমতকে এখানে না টেনে আমি কেবল তার নিবন্ধের প্রধান বিষয়টার দিকে মনোনিবেশন করতে চাই, যাতে বলা হয়েছে : ‘… পাশ্চাত্যের উদার গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থার বদলে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রাচ্যের নীতি গ্রহণ করার এটাই সম্ভবত সঠিক সময়। এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর। এই উভয় দেশই গত ৫০ বছরে দৃষ্টান্তমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।’
আমার মনে হয় না, পৃথিবীতে কোনো দেশের উচিত নয়, তথাকথিত উন্নয়নের জন্য মানবাধিকার, মানব-মর্যাদা, গণতন্ত্র এবং সর্বোপরি স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দেওয়া। আমি উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন নিয়ে আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক, হামজা আলাভি এবং ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের (এছাড়া আরো অনেকে রয়েছেন) মতো মানুষেরা ১৯৭০-এর দশকে যে সমাধান দিয়ে ফেলেছেন, সে বিতর্কে যাচ্ছি না।
উপনিবেশবাদ এবং উপনিবেশ-পরবর্তী বৈশ্বিক পুঁজিবাদের আশ্রিত রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন মিথের সত্যিকারের যে স্বরূপ তারা উন্মোচন করেছেন, তা বিজ্ঞোজনোচিত। আমি মনে করি, যারা এখনো সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের উন্নয়নের তথাকথিত সাফল্যময় কাহিনীতে মুগ্ধ হয়ে আছেন, তাদের উচিত আবার গুন্ডার ফ্রাঙ্কের ‘ডেভেলপমেন্ট অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট’, ওয়ালেস্টেইনের ‘অ্যান্টি-সিস্টেমেটিক মুভমেন্টস, থিসিস এবং আলাভির ‘দি স্টেট ইন পোস্ট-কলোনিয়াল সোসাইটিস : পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’-এর দিকে মনোনিবেশন করা।
দশ বছর আমি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আধুনিক এশিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাস পড়িয়েছি। প্রায় দুর্নীতিহীন সরকার-ব্যবস্থা, চমৎকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি; চলনসই খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্যপরিচর্যা, শিক্ষা ও মেট্রোরেল; ‘সর্বোত্তম এয়ারলাইন’ এবং ‘সর্বোত্তম বিমানবন্দর’-সংবলিত পুরোপুরি পরিষ্কার, সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল নগর রাষ্ট্রটি কখনোই আমাকে এই ধারণা দিতে পারেনি যে, আমি উন্নত কোনো দেশে বাস করছি। সিঙ্গাপুর কিন্তু উন্নয়নের বিবেচনায় আরেকটি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার কোনো দেশ নয়।
নির্মম ‘ইন্টারন্যাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের’ মাধ্যমে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যেকোনো মানুষকে বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত কারাগারে রাখা যায়। দেশি-বিদেশী সস্তা শ্রমিক শোষণ, লুকানো-ছাপানোহীন দারিদ্র এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানব-মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে উপসাগরীয় এলাকার আরব স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর সমান্তরালে নিয়ে গেছে। এসব উন্নত নয়, বাংলাদেশের জন্য রোল মডেল হওয়ার মতো তো নয়ই।
মাহাথিরের শাসন ছিল লি কুয়ান ইয়েয়ুর মতোই স্বৈরতান্ত্রিক। জনৈক লেখক বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন : ‘… তার [মাহাথিরের] ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হওয়াটা ঘটেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মালয়েশিয়ার রাজার ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতা ও সুবিধার বিনিময়ে। তিনি বিতর্কিত ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ব্যবহার করেছেন অ্যাক্টিভিস্ট, অ-মূলধারার ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের, ১৯৯৮ সালে বরখাস্ত করা উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমসহ, আটক করার কাজে।’
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিয়ে লি কুয়ানের যে ধারণা ড. খান উদ্ধৃত করেছেন, তার চেয়ে অসার আর কিছু হতে পারে না। লি মনে করতেন, ‘গণতন্ত্র বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক।’ তিনি আরেক সুকর্ন বা আইয়ুব খানের ভাষায় কথা বলতেন :
কোনো রাজনৈতিক-ব্যবস্থার মূল্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো সেটা প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সমাজকে সহায়তা করতে পারে কি না। গণতন্ত্র হলো কাজটি সম্পন্ন করার একটি পন্থা, তবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনী-প্রক্রিয়া যদি আরো বেশি ফল দেয়, তবে আমি উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কোনো প্রক্রিয়া বাছাই করার মধ্যে ন্যায়-অন্যায় নেই।… গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো অপরিহার্য মূল্যবোধ নেই। আসল বিষয় হলো সুশাসন।
লি ও মাহাথির উভয়ে বিশ্বাস করতেন, শাসন পরিচালনাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ’ থেকে ‘এশিয়ার মূল্যবোধ’ ভিন্ন ও উন্নত। ‘গণতন্ত্রের আগে উন্নয়ন’ পরিভাষাটি আসলে স্বৈরাচারেরই নামান্তর, গৌরব ও ক্ষমতার জন্য স্বৈরাচারের অদম্য আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করার একটি গোপন হাতিয়ার।
তবে আমরা ‘উন্নয়ন’ বলতে কোনো দেশের কয়েকটি উঁচু ভবন ও ফ্লাইওভার; মসৃণ রাস্তার দৈর্ঘ্য; গণপরিবহন নেটওয়ার্ক; ঝলমলে গাড়ির সংখ্যা বুঝি না। সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন বলতে বোঝায় আমাদের মনন ও সংস্কৃতির বিকাশ। উন্নত দেশে জনগণ কোনো ধরনের ভয়-ভীতি ছাড়াই চিন্তা করতে পারে; অভিমত প্রকাশ করতে পারে; সরকার মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে; জাতি-বর্ণ-ধর্ম-জেন্ডার-নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। আর কেবল সত্যিকারের গণতন্ত্রই আইনের শাসন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকারকে সুরক্ষিত করে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার সিকি শতক পরও আজ এখনো যারা গণতন্ত্রকে বিশেষ কিছু হিসেবে মনে না করেন এবং বেসামরিক-সামরিক একনায়কদেরকে নির্বাচিত সরকারের মতোই বৈধ বিবেচনা করেন, তারা স্রেফ জানেন না, পরিবর্তনের হাওয়া (গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য) সবজায়গায় জোরালো হচ্ছে, এমনকি আরব দুনিয়াতেও। বাংলাদেশ এবং অন্য যেকোনো স্থানেই লি ও মাহাথিরের ‘সোনালি অতীতে’ ফিরে যাওয়ায় অনেক দেরি হয়ে গেছে। অতীতে বিদ্যমান মার্কসের প্রবাদসম ‘প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রকে’ আর কেউই টিকে রাখতে পারবে না, যদিও মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে।
অবশ্য ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্রের, স্নায়ুযুদ্ধকালে তাদের কেউ ছিল পাশ্চাত্যপন্থী এবং কেউ পাশ্চাত্যবিরোধী, প্রতি সাফাই গাওয়ার দিন দ্রæত শেষ হয়ে আসছে। ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও ইমেয়েনের মতো অনেক দেশে এ ধরনের সরকার ইতোমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরো কয়েকটি কোনোমতে টিকে থাকার কোশেশ করছে। মস্কো ও বেইজিং তাদের দুর্বৃত্ত ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন করে গেলেও ওয়াশিংটন দ্রæততার সাথে তাদের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
উদার গণতন্ত্র উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়, বরং গণতন্ত্রই উন্নয়ন। এটা হলো মানুষের অর্জন ও উন্নয়নের সারকথা, এটা ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো উদার গণতন্ত্র। শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাস-প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সন্ত্রাসবাদ উত্থানের পেছনে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মানব-মর্যাদা ইত্যাদি অস্বীকার করা। উত্তাল বাংলাদেশ পুরোপুরি উদার গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হওয়ার আগে ছলনাময়ী ‘উন্নয়নের’ জন্য অপেক্ষা করতে পারে না।
শেষ তবে সর্বশেষ কথা নয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের নেতা নির্বাচনে বাঙালিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করার ফলেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটেছিল। বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রধান কারণ গণতন্ত্র হওয়ায় অবাকই লাগতে পারে, দেশটি কেন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াইকারী এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে আপস করতে অস্বীকারকারী তার নিজের প্রতিষ্ঠাতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্রের উদগাতা লি, মাহাথির বা অন্যদের অনুসরণ করবে। মুজিব যদি তার জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে অসম্মানিত করতেন, তবে আমাদের ইতিহাস হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন তা গৌরবের কিংবা গর্বের বিষয় হতো না।
*লেখক Austin Peay State University –এর সিকিরিটি স্টাডিজের শিক্ষক। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে Global Jihad and America: The Hundred-Year War Beyond Iraq and Afghanistan (Sage, 2014)|

ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকেই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :

এশিয়া কাপ হলো, টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব হলো। এর আগে আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক আসর হলো। তাসকিন আহমেদ এগুলোতে দোর্দন্ড প্রতাপে খেললেন। তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। এমনকি যে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচের সুবাদে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো, সেখানেও কিন্তু তার একটি বলও ‘নো’ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাসকিন আর আরাফাত সানির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেওয়া হলো। তাদের বোলিং ভঙ্গি সন্দেহজনক। তারপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা। আর সেখানে যথারীতি ব্যর্থ। তাদের ওপর নেমে এলো নিষেধাজ্ঞার খড়গ।

এই নিষেধাজ্ঞা কেবল তাদের ওপরই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উদীয়মান শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকেই চেপে ধরা। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটাকে সূচনাতেই শেষ করে দেওয়া।

বাংলাদেশকে হতদমিত করলে ভারতের কী লাভ? সবচেয়ে বড় লাভ তাদের ক্রিকেটীয় বর্ণবাদ সমুন্নত থাকবে। ক্রিকেটের শুরুতে কিন্তু এমন মানসিকতা ছিল। ব্রিটিশ প্রভূরা ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে রাজি ছিল না। লর্ডদের এই বিনোদনকে তারা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে উপনিবেশভুক্ত কয়েকটি দেশে মাত্র এই খেলাটি প্রচলিত হয়। অলিম্পিকের মতো আসরে ক্রিকেট নেই। ফুটবল যেখানে সবাই খেলতে পারে, ক্রিকেটে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানা তথাকথিত নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে অন্যদের ক্রিকেট থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। চাইলেও তারা ক্রিকেট খেলতে পারবে না। শুরুতে এই কাজটি করেছে ইংল্যান্ড। তারপর অস্ট্রেলিয়া। এখন করছে ভারত।

জগমোহন ডালমিয়া যখন আইসিসির সভাপতি ছিলেন, তখন কিন্তু অন্য রকম পরিস্থিতি ছিল। তিনি চাইছিলেন জোটবদ্ধ এশিয়াকে নিয়ে অ-এশিয়ানদের প্রতিরোধ করতে। তিনি তার এই কাজে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছিলেন। ওই প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পর জোটবদ্ধ থাকার প্রয়োজন আর অনুভব করেনি ভারত। এর মধ্য অবশ্য আরো দুটি ঘটনা ঘটে গেছে। ডালমিয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ভারতে কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের আবির্ভাব। এসব খেলোয়াড় ভারতকে ভালো দলে পরিণত করেছে। একইসাথে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে এন শ্রীনিবাসনের মতো একনায়কদের। এই বর্ণবাদী চরিত্রগুলো ন্যূনতম প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা শুরুতেই শেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর। আইসিসি এখন এদের দখলেই। শ্রীনিবাসন সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার তুলনায় বেশ নমনীয়, ডালমিয়ার কাছাকাছি। কিন্তু অন্যরা তো রয়ে গেছে। তার ফল হলো তাসকিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

নিজেদের মাতব্বরি অব্যাহত রাখার জন্য ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইসিসিকে কুক্ষিগত করেছে। তাদের কেউ বলে তিন মাতবর, কেউ তিন জমিদার, কেউ তিন মোড়ল। তারাই এখন অঘোষিত। ভারত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এখন ভারতের সব আবদার মেনে নিচ্ছে। এর জের ধরে কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এই তিন দেশের বাইরের ক্রিকেটারদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা।

ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ চৌধুরী একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। ওই তিন দেশের কোনো ক্রিকেটার এখন পর্যন্ত অবৈধ ঘোষিত হননি। গত আইসিসি বিশ্বকাপের আগে সুনীল নারায়ন, সাইদ আজমল, মোহাম্মদ হাফিজের মতো বেশ কয়েকজন বোলারদের হঠাৎ করে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা কি বিশ্বকাপে মাতব্বরদের পথ পরিষ্কার করার আগাম কার্যক্রম ছিল? তখনই অনেকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন।

ভারত এখন যে কাজটি করছে, এই কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড তা-ই করত। মুত্তিয়া মুরালিধরনের ব্যাপারটাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এখন উভয় দেশই মুরালিধরনের ব্যাপারে উচ্ছ¡সিত, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু এই লঙ্কান বোলার যখন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তখন শেন ওয়ার্নের চেয়েও সফল ছিলেন, তখন তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলে তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তবে শ্রীলঙ্কা হাল ছাড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে মুরালির পাশে ছিল। মুরালির সৌভাগ্য তিনি বোর্ডের পাশাপাশি অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো একজন অধিনায়ক পেয়েছিলেন। হাফিজ, আজমলরা পাননি। তাসকিনরা কি পারবেন?

কাজটা খুবই কঠিন। গত আইসিসি বিশ্বকাপের সময় ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে বাংলাদেশকে অন্যায়ভাবে হারিয়ে দেওয়ার পর ওই সময়ে সংগঠনটির সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল (পরিকল্পনামন্ত্রী) অভিযোগ করে মন্তব্য করেছিলেন- ‘আইসিসি এখন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলেরই নামান্তর’। তিনি সংগঠনটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেই এমন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পেছনে ডালমিয়ার অবদান ছিল। তবে সাধারণভাবে ভারতের বড় অংশই চাচ্ছিল না, বাংলাদেশ তাদের সমান মর্যাদার হোক। বর্তমানে তাদের ওই মানসিকতা আরো জোরদার হয়েছে। এর একটি প্রমাণ হলো, এত বছর পরও বাংলাদেশকে টেস্ট খেলার জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ কি হাল ছেড়ে দেবে? না। হাল যে ছেড়ে দেবে না, সেটা বাংলাদেশ এর মধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে। তাসকিন নেই, সানি নেই, অসুস্থতার কারণে তামিম ইকবাল নেই, কিন্তু তবুও তারা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করেছে। অল্পের জন্য ম্যাচটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ লড়াই করার যে মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটাই তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সেই বাঘ কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বাংলাদেশও করবে না। নিজেরা তো এগিয়ে যাবে, সেইসাথে বঞ্চিত অন্য দেশগুলোকে নিয়ে আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

সেই মার্চ আর এই মার্চ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
মার্চ ১৯৭১। উদ্বেল বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, স্বাধীনতার অপার আকাঙ্খায়। জাতির জীবনে সোনালী প্রত্যয়, শৃঙ্খল, প্রতিরোধ আর আত্মোৎসর্গে ভাস্বর। সেই বসন্তের আগুনঝরা সময় জুড়ে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের পথে হেঁটেছিল বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, যা ছিল স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত ধাপে পদার্পন। সাংবিধানিক ধারায় ক্ষমতায় যাওয়া যখন বাধাগ্রস্ত তখনই ১ থেকে ২৫ মার্চ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল জাতির আকাঙ্খার স্ফুরণ।
ব্যক্তি সেখানে হয়ে উঠেছিল গৌণ, মূখ্য হয়ে উঠেছিল আপামর জনসাধারণের স্বাধিকার অর্জনের প্রাণান্তকর আকাঙ্খা। তাকে শক্তি দিয়ে দমিত করছে চেয়েছে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি। হত্যা, গুম, ধর্ষণ আর অজস্র লাশ দিয়ে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই আকাঙ্খাকে। কিন্তু সাগরের ঢেউয়ের মত উপচে পড়া জনস্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সবকিছু। সেই এক সময়। ঘনঘোর অন্ধকার সময়। কিন্তু মানুষ থামেনি। মানুষ জেগেছে ভেতরের শক্তিতে। কারণ জনগনের ইতিহাস তো বিজয়গাঁথার। কে রোখে তাকে!
সাহস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর পরার্থপরতার অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল সেই বসন্তে। এজন্যই সামষ্টিক কল্যাণে ব্যক্তি উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে, ভবিষ্যত কল্যাণের জন্য। সেই মার্চে সকল রাজনৈতিক দল এবং জনগন ছিল ঐক্যবদ্ধ। বিপরীতে জামায়াত, মুসলিম লীগসহ ধর্মের কথিত ধ্বজাধারীরা দাঁড়িয়েছে জনআকাঙ্খার বিপরীতে। পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংসতায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কোরামিন দিয়ে বাঁচাতে চেয়েছে মৃতপ্রায় পাকিস্তানকে।
এর বিরুদ্ধে মানুষ একাট্টা হয়েছিল। আলবদর, আলসামস, রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন অকুতোভয়। মৃত্যুপুরীর মধ্যে থেমে থাকেনি জীবনের জয়গান। নিজের জীবনের বিনিময়ে আগত নাগরিকদের জন্য চেয়েছে স্বাধীন দেশ। শেখ মুজিবের ডাকে শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ। শেষতক তা ব্যক্তি, দলের সীমানা অতিক্রম করেছে। পরিনত হয়েছে জনযুদ্ধে। সেই বসন্তে মানুষের এই অসামান্য জাগরন এই জাতির এখনও সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রকৃত অর্থে সেই বসন্ত ছিল রাষ্ট্রের অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক সাহসী পদক্ষেপ। ছিল সকল প্রকার রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বৈষম্য বিলোপের অপারাজেয় সাধনা। ছিল রাষ্ট্রকে অধিকতর গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলার প্রাণপণ লড়াই। স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন সমাজ তৈরীর। জাতি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র অর্জনে। প্রণোদনা ছিল আগামী উজ্জল ভবিষ্যত। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছিল। মুক্তি অর্জনে আর কোথাও এত মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে? ইতিহাসের এরকম উদাহরণ একটিই।
সাড়ে চার দশক পেরিয়ে সেই বসন্তের গৌরবময়, আত্মসম্মানের বলীয়ান, মহিমান্বিত মূল্যবোধ এই বসন্তে কি চেহারা পেয়েছে? অত্যুদ্ভুত দশম সংসদ নির্বাচনের পরে দুই বছরের বাংলাদেশ, পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে নতুন আদলের সংবিধান এই দেশকে কোন জাগ্রত চেতনার দিকে ঠেলছে। জাতীয় সংসদে সরকার-বিরোধী দল একাকার, কে সরকার, কে বিরোধী চেনার উপায় নেই।
এই প্রশ্নগুলি উঠলে একাত্তরের মার্চের দিকে তাকাতে কুন্ঠা জাগে। বিদ্বেষ-হিংসা প্রসূত ক্ষমতার কামড়া-কামড়ি জাতির সামগ্রিক বিবেক-বিবেচনাকে অতলে নিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের প্রথম সূচক নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। শাসক ও শাসিতদের মধ্যে টেনে দেয়া হয়েছে ভেদরেখা। ধর্মকেও নিরাপদ রাখা যাচ্ছে না। ধর্ম হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা বা না থাকার অন্যতম হাতিয়ার। মানুষে মানুষে বাড়ছে বৈষম্য। আর এই বৈষম্য যত বাড়ছে, অস্থির সমাজ ততটাই হিংস্র হয়ে উঠছে। এর অনিবার্যতায় এই দেশ এখন শিশু ও নারীর বধ্যভূমিতে পরিনত।
একাত্তরের মার্চে জাতির মধ্যে ছিল এক রাষ্ট্রের চিন্তা। যে ন্যায্য রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সকলের। কিন্তু সাড়ে চার দশক পরে বিভাজনের খেলায় এখন জন্ম নিচ্ছে এক রাষ্ট্রের মধ্যে বহু রাষ্ট্রচিন্তার। মূল কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি জনআকাঙ্খার বিপরীতে এক দলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ন্যায্য রাষ্ট্রচিন্তা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। এর ফল এত বছর পরেও রাষ্ট্রের সারা অঙ্গে সুস্পষ্ট।
স্বাধীনতা লাভের প্রথম দশকে এজন্যই রাষ্ট্রের স্থপতিরা প্রাণ দিয়েছেন স্বাধীনতা বিরোধী এবং দলের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত ক্ষমতালোভী চক্রের ষড়যন্ত্রে, আন্তর্জাতিক শক্তি যার সাফল্য নিশ্চিত করেছিল। স্থপতিরা জানতেন না, জনআকাঙ্খার বিপরীতে যেমন নিজেকে রক্ষা করা যায় না, তেমনি গোটা দেশ-জাতি নিমজ্জিত হয় ঘোর অমানিশার মাঝে।
এই আত্মপর রাষ্ট্রচিন্তা ২০১৬ সালের মার্চে এসে যে বাংাদেশ তৈরী করে দিয়েছে, তা একাত্তরের মার্চের আকাঙ্খার সাথে সাংঘর্ষিক। নয়া রাষ্ট্রের এই দুর্বলতা অসামান্য দূরদর্শিতায় স্থপতিদের দু’একজন ভাবেননি তা নয়। এটি আঁচ করতে পেরেছিলেন মাওলানা ভাসানী ও তাজউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্র হবে, সাথে রাষ্টানুগ শাসক হতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে সেই রাষ্ট্র কতটা বাসযোগ্য হবে, সন্দেহ জেগেছিল উভয় নেতার মনে। সঠিক সময়ে তার গুরুত্ব বিবেচিত না হওয়ায় অচিরেই উল্টো যাত্রায় সামিল হতে হয়েছিল দেশ ও জাতিকে।
সমষ্টির উন্নতিই রাষ্ট্রের উন্নতি। রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা বৈষম্যহীন, তার রাজনৈতিক সুস্থিতি কতটা শুভভারাপন্ন তার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা কল্যাণকামী। স্বার্থক রাষ্ট্র মাত্রই অধিকসংখ্যক জনগনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। যে রাষ্ট্র কতিপয় উন্নতিকে গুরুত্ব দেয়, যে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উ্ন্নয়ন কতিপয়কে পরিপুষ্ট করে, সে উন্নয়ন যতই চোখধাঁধানো হোক অন্তিমে তা হয়ে ওঠে জনবিনাশী। কারণ এই উন্নয়ন শুধু বৈষম্যই বাড়ায়। একাত্তরের মার্চে সংগঠিত হওয়া এবং আন্দোলন ও যুদ্ধের অন্যতম স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্র আর কখনই বৈষম্য উস্কে দেবে না।
এক সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এই রাষ্ট্রকে গ্রাস করতে চলেছে। অধিকসংখ্যক জনগোষ্ঠিকে রাষ্ট্র অসুখী করে রেখেছে। এই কারণে রাজনৈতিক সুস্থিরতা নেই। বর্তমানে যে নিস্তরঙ্গ ও উত্তাপহীন পরিস্থিতি দেখে ক্ষমতাসীনরা সুখী বোধ করে, শান্ত ও সুস্থিত বলে তৃপ্ত হয়, ২০১৬ সালের এই মার্চে সেটি হয়তো তাদের মনোজগতের ভাবনায় আছে। কিন্তু সামগ্রিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্য এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু বা নারীরা নির্মমতার শিকার হয়ে জীবন দিচ্ছেন। পরিবারও এখন আর শিশুদের জন্য নিরাপদ নেই।
সুস্থিত রাজনীতি, গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সুশাসনহীনতায় রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন কিছু কিছু অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটায় বটে। কারণ শাসকশ্রেনী যাদের ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকে, তাদের সুযোগ-সুবিধে নিশ্চিত করতে উন্নয়ন ঘটাতে হয়। এই কথিত উন্নয়ন টেকসই নয় এবং তা সর্বজনকে সুবিধা দেয় না। কর্তৃতববাদী শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে দমন-পীড়ন এবং যে কোন উপায়ে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে রাখা হয়ে ওঠে মূলনীতি। ফলে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির বদলে জায়গা করে নেয় হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি।
উন্নয়ন তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন, Political development along democratic line is as important as economic development- এই তত্ত্বে বিশ্বাস করলে মানতেই হবে, বিদ্বেষপ্রসূত হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলে সুফলগুলি কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। পরিনামে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি উন্নয়নের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে। হয়ে পড়ে ভাগ্য ও নিয়তি নির্ভর। এই নির্ভরতা তাদের বিপথে চালিত করে এবং হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে জঙ্গীবাদী গোষ্ঠিগুলোতে তরুনদের যুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণই হচ্ছে এটি।
স্বৈরাচারী শাসকের পতনের পর দেশের জনগন এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভিকটিম হিসেবে পরিগনিত। তারপরেও পাঁচ বছর পরে তাদের সামনে একটি সুযোগ অন্তত ছিল, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে উন্নত কিছুর প্রত্যাশা করা। যদিও সে আশা ভোটাধিকারের মাধ্যমে তারা কখনই প্রতিফলিত করতে পারেননি। এর মূল কারণ হচ্ছে, সামরিক শাসনের আদলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন অব্যাহত থাকা। এই দুর্বৃত্তায়নে রাজনীতিকদের জায়গা দখল করে নিয়েছে উঠতি ব্যবসায়ী শ্রেনী, যাদের অর্থের মূল উৎস মূৎসুদ্দী পূঁজি ও ঋণের নামে ব্যাংক লুটের অর্থ। ফলে রাজনীতিতেও গুনগত পরিবর্তন ঘটেছে গত আড়াই দশকে এব্ং কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এই লুটেরা ব্যবসায়ী শ্রেনীর স্বার্থ।
রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল নাগরিকদের জন্য সবক্ষেত্রে ন্যায্যতার সূচনা করা। যা একটা সময়েই ন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। ব্যক্তি বিশেষকে অন্যায় সুবিধে দিয়ে সুরক্ষা প্রদান রাষ্ট্রের কোন নৈতিকতার সাথে যায় না। রাষ্ট্রের কাজ সামষ্টিক লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখা। রাষ্ট্র যে পদ্ধতিতে কাজ করে সেখানে পক্ষপাতিত্ব, বিশেষ সুবিধে প্রদান যে অন্যায্যতা সৃষ্টি করে, তা এক সময়ে পুরো ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত করে দেয়। ২০১৬ সালের মার্চে এসে এই অবস্থাটি সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পরে যে চোখধাঁধানো উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তা কতটা টেকসই? গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং সুশাসন ছাড়া এটি কতটা অর্থহীন তা প্রমান করতে বেশিদুর যাওয়া লাগবে না। সারাদেশের আশি ভাগ সম্পদ ও অর্থ কাদের হাতে কুক্ষিগত এই প্রশ্নটির উত্তরে নিহিত রয়েছে উন্নয়ন স্থায়ীত্বশীলতা। ক্ষমতায় থাকতে চোখে ঠুলি পড়ে উন্নয়নের ঢাক বাজানো এবং সবকিছুকে জায়েজ মনে করেন ক্ষমতাসীনরা। ক্ষমতা হারালে চোখ খুলে যায় এবং তখন প্রতিপক্ষের সবকিছুকে মনে হয় অবৈধ।
এজন্য মার্চ এলেই সামনে আসে স্বাধীনতার কথা, মুক্তির কথা। একাত্তরের পয়তাল্লি¬শ বছর পরে ২০১৬ সালের এই মার্চ সামনে নিয়ে আসছে ব্যর্থতা, বিতর্ক, বিভেদ, বিদ্বেষ, সন্দেহ। আবার জিজ্ঞাসা, যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়িত হবে? রাজনীতির কূটিল খেলায়, অর্থের ছড়াছড়িতে জনদাবি কি মিলিয়ে যাবে? এ কূটতর্কে জড়িয়ে পড়েছে সরকার, সর্বোচ্চ বিচারালয় পর্যন্ত। ছড়ানো হচ্ছে বিভেদ-বিদ্বেষ। রাষ্ট্র কি এখান থেকে বেরুতে পারবে? পারবে কি সবক্ষেত্রে ন্যায্যতার সূচনা করে জন-মানুষের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে?

শিক্ষার মান :: পড়ছে দশমে জ্ঞান পঞ্চমের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

শিক্ষা একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার; যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃতি। একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ সার্বিক অবস্থার প্রকৃত সূচক প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার উপরই নির্ভরশীল। তাই শিক্ষার কোন বিকল্প কোনদিন কোন কিছুতেই হতে পারে না।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অর্জিত মান ১০ বছর পিছিয়েছে। এর কারণ হিসেবে কোন সুযোগসুবিধা না দিয়ে শুধুমাত্র প্রাথমিক স্কুলগুলোকে সদ্য জাতীয়করণ করাকে দায়ী করা হয়েছে। কারন সেখানে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। পাঠদানসহ স্কুলের নানা কর্মকাণ্ডে সেসব স্কুল পিছিয়ে রয়েছে। বিস্তারিত »

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৬)

১৯৭১

আনু মুহাম্মদ

Last 5চীন নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক গ্রন্থে মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘসময়ের কর্মকর্তা হেনরী কিসিঞ্জার ১৯৫৬ সালে মস্কোতে মাও সেতুং এর বক্তৃতার কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে মাও বলেছিলেন, ‘এখনও কেউ কেউ এরকম আছেন যারা চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন একসাথে দাঁড়াচ্ছে এরকম একটি অবস্থা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন চীনের উচিৎ একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সেতু হিসাবে কাজ করা। যদি চীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দাঁড়ায় তার অবস্থান সুবিধাজনক ও স্বাধীন মনে হলেও আসলে চীন স্বাধীন থাকতে পারবে না। বিস্তারিত »

জলবায়ু রাজনীতি :: এখন যা ঘটছে (শেষ পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Last 6হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ প্রকৃতিকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। কিন্তু মানুষও প্রকৃতির মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থেকেছে। শিল্প বিপ্লব ও পুজিবাদী যুগেই এই সম্পর্ক অন্য রূপ নিয়েছিল। আর বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পুজিবাদ প্রকৃতিকে নির্মমভাবে শোষণ করতে শুরু করে। তার ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিণতি এখন অনুভূত হচ্ছে।

কার্ল মার্কসের চোখেই প্রথম পুজিবাদের এই ধ্বংসাত্মক ভূমিকাটি চোখে পড়েছিল। অবশ্য মার্কসের আগেও অনেক দার্শনিক প্রকৃতিবাদী ছিলেন। তারা প্রকৃতির কোলে ফিরে যাবার আকুতি জানিয়েছেন। মার্কস কিন্তু সেভাবে বলেননি। তবে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের দিকটি তিনিই প্রথম তুলে ধরেছিলেন। বিস্তারিত »

মাহবুব হোসেন :: চলে গেলেন কৃষি অর্থনীতির প্রধান পুরুষ

মুস্তফা কে মুজেরী

Mahbub Hossain. মাহবুব হোসেনের অকাল প্রয়াণে মন ভারাক্রান্ত। বিশেষ করে খবরটি আমার জন্য বড় শোকের একটি বিষয়। আমি তাকে মাহবুব ভাই বলেই ডাকি। আশির দশক থেকেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কাজের সুবাদে তাকে আরো কাছ থেকে দেখেছি। গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ড. মাহবুব যথাযথ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উভয় ক্ষেত্রে তার কৃতিত্ব রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি গবেষণায় তার যুগান্তকারী অবদান রয়েছে।

আমাদের গ্রামীণ সমাজে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে তিনি যে গবেষণা করেছেন, সেটিকে বলা হয় পাথব্রেকিং ওয়ার্ক। এখনো এটিকে একাডেমিক ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ‘রেফার’ করা হয়। বিস্তারিত »