Home » বিশেষ নিবন্ধ

বিশেষ নিবন্ধ

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ক্রমাগত ভাঙ্গন : সম্পর্কের নতুন মাত্রা আওয়ামী লীগের সঙ্গে

জহির উদ্দিন বাবর ::

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একটি প্রভাব বরাবরই ছিল। তারা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে না যেতে পারলেও বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলে অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এবং নিজেদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য করার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব দলের অবস্থান মূলত; আওয়ামী ও বাম শিবিরের বিপরীতে। তবে জামায়াতসহ কোনকোন দল কৌশল ও নিজেদের অতীত কর্মকান্ডের কারনে মানসিক দূরত্বের আওয়ামী লীগের সাথেও ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তুলেছে। তবে ডানপন্থি বিএনপির সঙ্গে সার্বিকভাবে তাদের সখ্য দীর্ঘদিনের। তবে বামঘেষা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামপন্থিদের দূরত্ব আগের চেয়ে অনেকটা ঘুচে গেছে। বিভিন্ন কারণে ইসলামি দলগুলো আর আগের মতো আওয়ামী বিরোধিতা করে না। আওয়ামী লীগও আর ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে আগের মতো তাদের প্রতিপক্ষ ভাবে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, ‘এককালের বাম ও সেক্যুলার ভাবধারার আওয়ামী লীগে ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যাই বেশি’। বাস্তবতা হলো, ধর্মভিত্তিক শক্তির মূলধারাটি এখনও আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই চলছে। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্টতার নানা কারণে ধর্মভিত্তিক দলের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে ইসলামপন্থিদের একটি বড় অংশ এখনও আওয়ামী লীগ ও বামধারার রাজনীতির প্রতি আগের অবস্থান ও মনোভাব থেকে সরে আসেনি।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যেও আছে নানা ধারা-উপধারা। জামায়াতে ইসলামীকেন্দ্রিক ধারাটি সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ; এখনও মাঠ পর্যায়ে তারাই বেশি শক্তিশালী। যদিও যুদ্ধাপরাধ অপরাধের মামলায় দলের প্রথম সারির নেতাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার পর তাদের আগের সেই অবস্থান আর নেই। চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে দলটির অনুসারীরা। দলটি একটা সময় এদেশে আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে আছে আওয়ামীবিরোধী শিবিরে। সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও আছে বিএনপি জোটের সঙ্গেই। তবে জামায়াতে ইসলামী নিছক ধর্মভিত্তিক দল নয়, সংসদীয় মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে তাদের সামঞ্জস্য থাকার কারণে তাদেরকে ইসলামি দল হিসেবে মানতে অনেকের আপত্তি আছে।

ইসলামপন্থিদের আরেকটি ধারার সম্পর্ক মাজার ও দরবারকেন্দ্রিক। তারা সাধারণত পীর, খানকা, দরবার, মুরিদ এসবের দ্বারা আবর্তিত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে বরাবরই আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালো। বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার তারা। জামায়াতে ইসলামী ও কওমিপন্থিরা যেন আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ভিড়তে না পারে এ ব্যাপারে তারা সবসময় তৎপর থাকে।

দেশে ইসলামপন্থিদের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশটি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলেমদের নেতৃত্বে পরিচালিত। দেশের ধর্মীয় অঙ্গন মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন তারাই। সমাজের মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ততটা না থাকলেও প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তাদের আছে। দেশের কয়েক লাখ মসজিদ, হাজার হাজার মাদ্রাসা সরাসরি তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সাধারণ জনগণকে নিজের মতের পক্ষে নাড়া দিতে পারে।

কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রায় দেড়শ বছর ধরে সরকারের কোনো স্বীকৃতি ও হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কয়েক মাস আগে জাতীয় সংসদে কওমি সনদের স্বীকৃতি বিল পাস হওয়ার পর তারা সমাজের মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ঐতিহ্যগত দিক থেকে কওমি আলেমদের মধ্যে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। বৈষয়িক প্রাপ্তির নানা সমীকরণ যুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না এটাই চরম সত্য।

দুই.

দেশে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বেশ কিছু দল রয়েছে। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনেকটা মিল থাকলেও তাদের মধ্যে মতভিন্নত প্রকট। বিভাজন হয়নি, ব্র্যাকেটবন্দি হয়নি – এমন ইসলামি দল খুব কমই আছে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুরের হাত ধরে কওমিপন্থিদের ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আগমন। হাফেজ্জি হুজুরের সেই খেলাফত আন্দোলন থেকে এখন এক ডজনের বেশি দল হয়েছে। দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে, নেতৃত্বের লড়াই অব্যাহত আছে বছরের পর বছর ধরে। নব্বই দশকের শেষ দিকে সবগুলো ইসলামি দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল ইসলামী ঐক্যজোট। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সেই ইসলামি ঐক্যজোট ভেঙে যায়। এরপর প্রচলিত ধারার স্বার্থের রাজনীতির চর্চা শুরু হয়ে যায় এখানে। কখনও এর সঙ্গে, কখনও ওর সঙ্গে করতে করতে এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলো অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। প্রায় কোনো দলেরই আগের সেই অবস্থান নেই। প্রতিটি দলই একটি সুনির্দিষ্ট গন্ডিতে আবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা খুব একটা নেই। মসজিদ-মাদ্রাসা আর ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের বেশির ভাগ কর্মসূচি। ফলে ইসলামি দলগুলো এখনও এদেশের জনগণের কাছে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে পারেনি।

সবশেষ ২০১৩ সালে ইসলামপন্থিদের বড় একটি উত্থান চোখে পড়ে। সেই সময় অনলাইনে ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে নাস্তিক ব্লগারদের বিচার দাবিতে চাঙা হয়ে উঠে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। ওই বছরের ৬ জুলাই মতিঝিলে ঐতিহাসিক লংমার্চে তারা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়। অনেকে এটাকে ‘নতুন শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে ঠিক এর এক মাস পর ৫ মে শাপলা চত্বরেই পতন ঘটে হেফাজতের। এরপর আর হেফাজত মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। বিভিন্ন সময় নানা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তা হালে পানি পায়নি। তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই হেফাজতে ইসলাম এখন আর আওয়ামী লীগের শত্রু  নয়, পরম বন্ধু। সংগঠনের আমির ও দেশের সবচেয়ে প্রবীণ আলেম আল্লামা আহমদ শফী নিজেই আওয়ামী লীগের প্রশংসা করেছেন। জাতীয় সংসদে স্বীকৃতি ঘোষণার পর কওমি আলেমরা ঘটা করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথিত শুকরিয়া মাহফিলের নামে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। এর দ্বারা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই সংবর্ধনা নিজেদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। এর আগে কোনো সরকার প্রধানকে এভাবে সব আলেম একমঞ্চে এসে সংবর্ধনা জানানোর নজির নেই।

শাসক দলের সঙ্গে এভাবে আলেমদের মাখামাখিকে ভালো চোখে দেখছে না খোদ ইসলামপন্থিদের অনেকেই। তবে নানা কারণে কেই সরাসরি বিরোধিতাও করতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে নানা অসন্তোষ ও ক্ষোভ কাজ করলেও কেউ তা প্রকাশের সাহস করছে না। আর নেতৃত্বের আসনে থাকা আলেমরাও নানা কারণে সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে গেছেন। একদিকে প্রলোভন আরেক দিকে নানা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে ঊঠে তারা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারছেন না বলে মনে করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ এটা কৌশল হিসেবে দেখছেন। সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় টিকে থাকার স্বার্থে আলেমরা একটু কৌশলী ভূমিকা নিয়েছেন বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তিন.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলোও আছে আলোচনায়। তবে এবারের নির্বাচনে কোনো দলই তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। মার্কাহীন, নিবন্ধনবিহীন জামায়াতে ইসলামীর কথা বাদ দিলে বর্তমানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই নির্বাচনে দলটি তিনশ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। এই নির্বাচনে তারাই একমাত্র ইসলামী দল যারা সব আসনে একক প্রার্থী দিয়েছে। যদিও একটি আসনেও পাস করার মতো অবস্থান গড়ে উঠেনি তাদের। এই দলটির বিরুদ্ধে বরাবরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ করে আসছে অন্যান্য ইসলামি দলগুলো। যদিও এর কোনো ‘‘দালিলিক প্রমাণ’’  নেই ।

তবে একটি বিষয় দৃশ্যমান, অন্যান্য ইসলামি দলকে আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে চরমোনাই পীরের দলকে সেটা মনে করে না। কয়েকটি সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থী তৃতীয় অবস্থান লাভ করে বেশ আলোচনায় আসে। অনেকে মনে করেন, তারা ইসলামপন্থিদের যে ভোট কাটেন তা সাধারণত বিএনপির বাক্সে যাওয়ার কথা ছিল। সরাসরি না হলেও তাদের ভোট কাটা সুবিধা করে দেয় আওয়ামী লীগকে। মূলত এই কারণে আওয়ামী লীগ তাদেরকে অনেকটা আনুকূল্য দেয় বলে কারও কারও ধারণা। যদিও তারা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এই অভিযোগ। অন্যান্য দলের সঙ্গে বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তারা যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই এটার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করেছে।

মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলাম ঐক্যজোট দীর্ঘ সময় বিএনপি জোটে থাকলেও বছর দুয়েক আগে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনের আগে ইসলামী ঐক্যজোট নৌকায় চড়ছে বলে জোর প্রচারণা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় তারা নৌকা পায়নি। পরে কয়েকটি আসনে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। যদিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও খুবই মধুর। তাদেরকে নির্বাচনী খরচসহ নানা সুবিধা আওয়ামী লীগ দিচ্ছে বলে কানাঘুষা আছে। তবে তাদেরকে জোরে বা কৌশলে বিএনপি জোট থেকে বের করতে পারাই আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য। তবে মুফতি আমিনীর জীবদ্দশায় তাকে নানাভাবে চেষ্টা করেও নত করা যায়নি। নিঃসন্দেহে এটা তাদের কৃতিত্ব। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামি ঐক্যজোটকে বিএনপি জোট থেকে বের করলেও একটি ভগ্নাংশ এখনও রয়ে গেছে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে। যদিও অ্যাডভোকেট আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন অংশটির কার্যক্রম খুব একটা নেই।

শায়খুল হাদিস আল্লাম আজিজুল হকের দল খেলাফত মজলিস ভেঙে যায় তার জীবদ্দশায়ই। দুই ভাগে বিভক্ত খেলাফত মজলিসের যে অংশটির সঙ্গে শায়খুল হাদিসের পরিবারের সম্পৃক্ততা আছে তারা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে নিবন্ধন পায়। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করে এই দলটি আলোচনায় আসে। যদিও এক-এগারোর পর সেই চুক্তি কার্যকারিতা পায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের নৌকা প্রতীকে ভোটও করা হয়নি। সেই দলটি চলতি বছর নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জোট হলেও চরমভাবে হতাশ হয় দলটি। জাতীয় পার্টি যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের ভাগ-ভাটোয়ারা মেটাতে হিমশিম খেয়েছে সেখানে শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য কিছুই করতে পারেনি। এখন হাতে গোনা কয়েকটি আসনে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে কোনোরকম মুখরক্ষা করেছে দলটি। শায়খুল হাদিসের ইন্তেকালের পর দলটির আভ্যন্তরীণ অবস্থা তেমন ভালো নয়। শায়খুল হাদিসের পরিবারের বলয়ে কোনোরকম টিকে আছে।

শুধু ‘খেলাফত মজলিস’ নামে নিবন্ধন পাওয়া দলটির নেতৃত্বে আছেন মাওলানা ইসহাক ও আহমদ আবদুল কাদের। দলটি এখনও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে। এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তারা হবিগঞ্জের দুটি আসন পেয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসন দুটিতে তাদের পাস করে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।  এই দলটিতে জামায়াতে ইসলামীর কিছুটা ছায়া আছে। এই দলের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের একসময় ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। যদিও পরে জামায়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তিনি হাফেজ্জি হুজুরের তওবার রাজনীতির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। প্রাচীন এই দলটি এখন দুই অংশে বিভক্ত। একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা আবদুল মুমিন। তবে বয়োবৃদ্ধ এই আলেম ততটা পরিচিত নন। সামনে রয়েছেন মহাসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমি। মূলত মাওলানা কাসেমির নামেই পরিচিত এই অংশটি। অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। তিনি এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চারদলীয় জোট সরকারের সাংসদ ছিলেন। এবারের নির্বাচনেও তিনি যশোরের একটি আসন থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এবারের নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দুই অংশ মিলে বিএনপির কাছ থেকে তিনটি আসন পেয়েছে। অন্তত দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

হাফেজ্জি হুজুরের হাতেগড়া খেলাফত আন্দোলন এখন আছে অনেকটা করুণ অবস্থায়। এই দলটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর উপকণ্ঠ কামরাঙ্গীচরে নুরিয়া মাদ্রাসার বাইরে তাদের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। হাফেজ্জি হুজুরের পরিবারের সদস্যদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই মূলত দলের এই করুণ দশা। অন্যদিকে অনেক প্রাচীন দল নেজামে ইসলামের অবস্থাও হ-য-ব-র-ল। দলটি যে কয়টি অংশে বিভক্ত খুঁজে বের করাও মুশকিল। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম, আরেকটি অংশের নেতৃত্বে মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, তিনি আবার ইসলামী ঐক্যজোটেরও চেয়ারম্যান। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন অ্যাডভোকেট আবদুর রকিব। একসময় মিসবাহুর রহমান চৌধুরী একটি অংশের নেতৃত্বের দাবি করলেও তিনি এখন ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত। এছাড়া মাওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য আন্দোলন একসময় আলোচনায় থাকলেও এখন তেমন কোনো কার্যক্রম নেই দলটির। এ ধরনের আরও কিছু দল তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এসবের কোনো প্রভাব আমাদের সমাজ বা রাজনীতিতে খুব একটা নেই।

চার.

মূলত ইসলামি দলগুলোর এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য দায়ী পরিকল্পনাহীনতা। তারা কী করতে চায়, কোন পথ ধরে এগুতে চায়, আর এর জন্য কী করতে হবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো ছক নেই ইসলামি দলগুলোর। গতানুগতিক ধারায় চলছে দল ও রাজনীতি। দলগুলোর গঠনতন্ত্র থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা অনুসরণ করা হয় না। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি, পরিবার বা বলয়েই চলছে দল। এখানে তাদের কথাই মুখ্য; গঠনতন্ত্রের কোনো মূল্য নেই। ব্যক্তি ও পরিবার পূজা ইসলামি দলগুলোর বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামি রাজনীতি এখনও পরিচালিত হয় মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। বেশির ভাগ দলেরই মূল জনশক্তি কোনো না কোনো মাদ্রাাসা। সারা দেশ থেকে নানা মত ও পথের মানুষের সন্তানেরা রাজধানীর মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে আসে। কিন্তু মাদ্রাসাটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বলয়ে হলে ওই ছাত্রটিকেও বাধ্যতামূলক এই দলটির কর্মী হয়ে যেতে হয়। কোনো ইস্যুতে মিটিং-মিছিলের প্রয়োজন হলে তাকে নামতে হয় রাজপথে। ওই দলটির মূল জনশক্তি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তারা কেউ বুঝে আবার কেউ বাধ্যতামূলকভাবে দলীয় কর্মী হয়ে মাদ্রাসা পরিচালক বা কর্তৃপক্ষের রাজনীতির হাতিয়ার হন। এর বাইরে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর নেই তেমন কোনো প্রভাব। কেউ কেউ পীর হিসেবে মুরিদদেরও দলীয় কর্মী মনে করেন। কিন্তু নির্বাচনের সময় ওই মুরিদেরাও দলকে ভোট দেয় না।

সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর তেমন কোনো যোগসূত্রতা নেই। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদারও হয় না ইসলামি দলগুলো। শুধু ধর্মীয় কোনো ইস্যু তৈরি হলেই ইসলামি দলগুলো সরব হয়। অন্যথায় তেমন কোনো কার্যক্রমই থাকে না এ দলগুলোর। সাধারণ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক নানা সমস্যার ব্যাপারে মাথা ঘামান না ইসলামি দলের নেতারা। ইসলাম সম্পর্কে কেউ কটূক্তি করলে ইসলামি দলগুলো বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেটা দেখা যায় না জাতীয় কোনো ইস্যুতে। এসব কারণে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব দিন দিন কমে আসছে। এক সময় দেশের শীর্ষ আলেমরা ইসলামি দলগুলোর নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু এখন এসব দলে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে নেতৃত্ব সংকট। তাছাড়া নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে বারবার আপস করায় ইসলামি দলগুলোর ভেতরেই তৈরি হয়েছে সংকট। তাদের নিজেদের কর্মী সংখ্যা তেমন বাড়ছে না, বরং উল্টো দলীয় কর্মীরা নানা কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। সবমিলিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

ব্যবসায়ী ফাটকা পুজিপতিদের ‘রাজনীতি দখল’ : জিম্মি জনগন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য দিয়ে শুরু করা যাক। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “নির্বাচন বাণিজ্যে যারা অর্থ বিনিয়োগ করবে তারা সে অর্থ বহুগুন তুলে নেবে”। এই অপ-আকাঙ্খার কারনেই কি ৩’শ আসনে মনোনয়নপত্র জমা পড়ে হাজার চারেক?‌‌‌ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের মতে, ১৯৫৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল দশমিক ৫৪ শতাংশ। সে সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৮০-৮৫ শতাংশে। এভাবেই নির্বাচনকে শেষতক বাণিজ্যে পরিনত করা হয়েছে।

এক. প্রত্যেক ব্যবসায়ী দেশের একজন নাগরিক। কোন কোন ক্ষেত্রে ‘কমার্শিয়ালি ইম্পর্টেন্ট পারসন” (সিআইপি)। ফাটকা পুঁজিবাদী বা এমন পুঁজিবাদী সমাজে ব্যবসায়ীদের কদর আলাদা। ব্যবসায়ী মানে টাকার ক্ষমতা, বিনিয়োগের ক্ষমতা এবং এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা। রাজনীতিতে যুক্ত হতে বা কোন দলের নেতৃত্ব দিতে ব্যবসায়ীদের জন্য কোন সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ নেই। কিন্তু আছে নানা সন্দেহ-অস্বস্তি। বিশ্লেষকদেরও আছে নানা প্রশ্ন। আদর্শিক দলগুলো জোরে-সোরেই ব্যবসায়ীদের রাজনীতির বিরোধিতা করে। যদিও রাজনীতি করার অধিকার ব্যবসায়ীদের রয়েছে। ফলে কেউ রাজনীতিতে আসলে তাকে রাজনীতি দিয়ে থামানোর বিকল্প পথও এখন আর খোলা নেই।

আসলে ব্যবসায়ীদের কাজ হচ্ছে, অর্থ বিনিয়োগ করা এবং তা থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে মুনাফা তুলে নেয়া। যেহেতু  দেশের রাজনীতি দুর্নীতিমুক্ত নয়। ফলে রাজনৈতিক দলে নেতা হতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, নির্বাচন এলে মনোনয়ন পেতেও আবার অঢেল। সহজ কথায যার নাম-মনোনয়ন বানিজ্য। ব্যবসায়ীরা এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনছেন, নিরাপদ করছেন। এটি তাদের জন্য স্বাভাবিক হলেও জনগনের জন্য ক্ষতিকর, যখন জানা যায় দেশ থেকে মাত্র একবছরেই ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলি, বিশেষ করে শাসক দলগুলি তাদের নেতা-কর্মী ও জনগনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না; নির্ভর করতে পারছে না। সেজন্য নির্বাচনে জিততে বা ক্ষমতায় থাকতে ব্যবসায়ীদেরও দয়া-আনুকুল্য দরকার হয়ে পড়ছে। নানাসময়ে ক্ষমতার সাথে যুক্ত দলগুলি টাকার ওপর নির্ভর করেছে, টাকা দিয়েই অবস্থান তৈরী করতে চেয়েছে। সেজন্যই ব্যবসায়ীদের এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। এটি দুর্নীদির এক দুষ্টচক্রে আটকে ফেলেছে দেশের রাজনীতিকে।

মুশকিল হচ্ছে, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের অর্থবান হওয়ার ক্ষেত্রটি বেশিরভাগই অবৈধ ও অন্ধকার পথে। এটিকে তারা অবলীলায় কাজেও লাগান। এ ধরনের ব্যবসাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য রাজনীতির প্রয়োজন হয়। শেয়ার বাজার ও ব্যাংক লুঠ, মাদক-অস্ত্রের চোরাকারবার, মানবপাচার, খাদ্য পণ্যেও সিন্ডিকেট ও ভেজাল, দুর্নীতি-দখলসহ অবৈধ পন্থায় উপার্জিত হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা দিতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা। এজন্যই মানুষের যত অস্বস্তি, সন্দেহ এবং প্রশ্ন।

দুই. সামরিক সরকারগুলোর সময় ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ব্যবসায়ীদের উত্থান ঘটেছিল পেশাদার রাজনীতিবিদদের নানান দুর্বলতায়। আশির দশকের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সামরিক স্বৈরাচার তৃণমূল পর্যায়ে যে টাউট-বাটপার শ্রেনী তৈরী করেছিল, তারাই কালক্রমে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এই নবোত্থিত টাউট-ব্যবসায়ীরা অচিরেই অঢেল অর্থের মালিক হয়েছে, নব্বই দশকে নির্বাচিত সরকারগুলি দলে ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে এদেরকে।

আসছে সংসদ নির্বাচনে বড় দলগুলি কম-বেশি বড় ব্যবসায়ী ও ব্যবসা সংগঠনের নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছে। অনেক দল বা জোট মনোনয়ন দিয়েছে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ঋন খেলাপীর চিন্হিত মহানায়কদের। নির্বাচিত হয়ে যারা বাণিজ্য ও মুনাফাভিত্তিক নীতি প্রণয়নে সরকারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। পোশাক খাতের অন্তত: ৩০ জন ব্যবসায়ী চলতি সংসদের সদস্য। তাদের প্রবল রাজনৈতিক দাপটের কারনে সর্বোচ্চ আদালত কথিত “বিষাক্ত ক্ষত” বিজেএমই ভবন এখনও সপাটে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। উপেক্ষিত হয়েছে ভবন ভাঙ্গার নির্দেশ। এ দিয়েই বোঝা যাবে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের বর্তমান অবস্থান।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের সংসদে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহন ছিল অনধিক ১০ জন। সেটি এখন গিয়ে ঠেকেছে ৮০-৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ পেশাদার রাজনীতিকরা এখন সংখ্যালঘু। এদের কল্যাণে দ্রব্যমূল্য, পরিবহন, পোশাক খাত, ঔষধ, চিকিৎসা ব্যবস্থা- সবকিছুর নিয়ন্ত্রন চলে গেছে ব্যবসায়িক রাজনীতিকদের হাতে। জনগন ও রাজনীতি জিম্মি এদের কাছে। সব খাতে ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা ভোগ করছে। কর অবকাশ, নতুন ব্যাংক করা থেকে সব কিছুতেই পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুকূল্য।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে জনগন দেখছে বিভিন্ন ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুঠকারী বা তাদের পৃষ্ঠপোষক, মাত্র দশককাল আগেও কপর্দকহীন- বর্তমানে হাজার কোটি টাকার মালিকরা স্থানীয় জাতীয়সহ সকল নির্বাচনে রাজনৈতিক মনোনয়ন লাভ করছে। এভাবেই তৃণমূল পর্যন্ত একটি ‘গডফাদার কালচার’ গড়ে উঠেছে রাজনীতিতে। নির্বাচন বাণিজ্যে এই যে বিশাল বিনিয়োগ, সেটি পেশাদার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মূলধারার রাজনীতি থেকে অপসৃত করে দিচ্ছে। তারা হয়ে উঠছেন দয়া-দাক্ষিণ্যের পাত্র।

তিন. বিশ্বজুড়ে সরকারে থাকার কতগুলি সাধারন নৈতিকতা আছে। এই নৈতিকতার স্খলন অনেক রাষ্ট্রে সরকারের পতন ডেকে আনে। এর অন্যতম হচ্ছে, লাভজনক কোন প্রক্রিয়ায় নীতি-নির্ধারকরা যুক্ত হতে পারবেন না। অর্থাৎ সরকার বা সাংবিধানিক পদের অধিকারী কোন ব্যক্তি তার পদকে ব্যবহার করে কোন লাভজনক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবেন না। তাহলে তার ‘শপথ’ ভঙ্গ হবে এবং তিনি ঐ পদে থাকার নৈতিক যোগ্যতা হারাবেন। গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় পরিচালিত সরকারগুলি এটি মেনে চলেন।

কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম আকছার ঘটছে। ভরিষ্যতেও আরো বেশীভাবে যে ঘটবে   না, এরকম কোন গ্যারান্টি পাওয়া যায় না। এই অনৈতিকতাকে শাসক দলগুলি ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনেও নিয়েছে। এ নিয়ে কখনও কোন তাড়া বা চাপ তারা অনুভব করেনি। দেশের দলদাস, বিবেকবর্জিত সুশীল সমাজ এ বিষয়ে তেমন করে উচ্চকিতও নয়। তবে ক্ষীণ হলেও বিবেকবান অনেকে এখন বলতে শুরু করেছেন, এটি বন্ধ হতে হবে। কারন দেশ থেকে অবাধে অর্থপাচার, রিজার্ভ চুরিসহ আর্থিক খাতে ভয়ঙ্কর দুর্নীতির সাথে কারা জড়িত, সেটি এখন ওপেন সিক্রেট।

সংসদ সদস্য হিসেবে যে সকল ব্যবসায়ী নির্বাচিত হচ্ছেন, তাদের যেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, সেইখানে যেন নীতি-আইন প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের না দেয়া হয়-এটি অন্তত: নিশ্চিত করতে হবে। নইলে রাজনীতির ‘আনুষ্ঠানিক মৃত্যু’ আর অনানুষ্ঠানিক থাকবে না। এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে ওঠা দরকার। যেমনটি রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘‘রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই’’।

দেশের চলমান ঘটনাবলী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে, জাতীয় স্বার্থ দেখার মত কেউ নেই। সাধারন মানুষের স্বার্থ তো দুর কী বাত। রাজনীতি বাণিজ্যিকীকরনের প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে, ভোটের আগে জোট গঠন করা। উদ্দেশ্য জনগনের অধিকার রক্ষা নয়, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করা। এক সাক্ষাতকারে এরকমটিই মন্তব্য করেছেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- “নির্বাচনের এই খেলায় জনগন যে হারবে সেটি নিশ্চিত। আগেও হেরেছে তারা, এবারেও হারবে। কারন তাদের নিজস্ব দল নেই। যারা জিতবে তারা টাকাওয়ালা এবং বড় দলের লোক। নির্বাচনের পরের দিন থেকেই দেখা যাবে, তারা জনগনের প্রতিপক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন”।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-৩ : মুনাফার পাহাড় : প্রাণ প্রকৃতির বিপর্যয়

আনু মুহাম্মদ ::

তাই পুঁজি সংবর্ধনের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রাণ প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। কারণ এই ‘উন্নয়ন’ধারার মূল কথাই হলো প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণ ও দখল করা। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল বিবেচনা না করে, ভবিষ্যত প্রজন্মের বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সকল তৎপরতা পরিচালনা তাই এই দৃষ্টিতে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল- স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রং ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মৎস্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। বর্তমান নিরাপদ খাদ্যের সংকট, পানি দূষণ সবকিছুই ঐ বিদেশি ঋণনির্ভর ‘উন্নয়ন চর্চার’ ফলাফল।[1]

গত তিন দশকে একদিকে পাহাড় ও সমতলের বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে বিদেশী ঋণের টাকায় এমন সব আমদানি করা গাছ লাগানো হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।[2] এসব গাছে পাখি বসে না, এসব গাছপালা অন্যান্য গাছ কিংবা তরুলতা টিকে থাকতে দেয় না। ফুল, ফলহীন এসব গাছ গবাদিপশুকেও সমর্থন দেয় না। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি কিংবা শাল, গর্জন কিংবা বটগাছ না লাগিয়ে এসব আমদানি করা গাছ লাগানোর ফলে প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং নাজুকতা তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো প্রধানত বনাঞ্চল, সেখানে নিরাপত্তার নামে বনবিনাশ এবং পাহাড় দখল প্রক্রিয়া চলছে কয়েক দশক ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা, বনবিনাশ ও সামরিকীকরণের উৎসও একটি বিদেশি ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।[3]

নদীর কথা-

নদীর পানি প্রবাহের ওপরই বদ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম, নদী বিপন্ন হলে তাই বাংলাদেশের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। নদী হারানোর সর্বনাশ ১/২  বছরে,  ১/২ দশকে বোঝা যায় না। গত কয়দশকে বাংলাদেশে জিডিপি যে বহুগুণ বেড়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে আছে, কিন্তু একইসময়ে বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীমালার কতটা জীবনহানি ও জীবনক্ষয় হয়েছে তার ক্ষতির কোন পরিসংখ্যানগত হিসাব আমাদের কাছে নেই।

বাংলাদেশের নদীগুলো যে ভাবে খুন হচ্ছে, কারণ হিসেবে ভাগ করলে,এর পেছনে তিনটি উৎস সনাক্ত করা যায়। এগুলো হল: প্রথমত, ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তৎপরতা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নদী বিদ্বেষী উন্নয়ন কৌশল। এবং তৃতীয়ত, দেশের নদী দখলদারদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজস।

ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। এগুলোর সাথে সম্পর্কিত ছোট নদী, শাখা নদীর সংখ্যা বাংলাদেশে আগে ছিলো সহস্রাধিক। এখনও ২ শতাধিক নদী কোনভাবে বেঁচে আছে। কংক্রিটকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ বড় শিকার বাংলাদেশ ও ভারত দুইদেশেরই নদীমালা। বাংলাদেশ অংশে নদীর বিপন্নতা ঘটেছে তুলনায় অনেক বেশি। একতরফা আক্রমণে বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট নদী এখন একেকটি মৃতদেহ, কিংবা মুমূর্ষু। কার্যত বাংলাদেশের বৃহৎ চার নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা এখন বিপর্যস্ত এবং আরও আক্রমণের মুখে।[4]

ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারতের নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা গত চারদশকে বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও সম্পর্কিত অসংখ্য ছোট নদী খালবিলকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুকিয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন পানি প্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি। সেচের জন্য চাপ বাড়ছে ভ’গর্ভস্থ পানির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল প্রতিবেশগত সংকট তৈরি করছে।

শুধু তাই নয়, পদ্মা নদীর এই ক্ষয় তার সাথে সংযুক্ত নদীগুলোকেও দুর্বল করেছে যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে সুন্দরবন পর্যন্ত। সুন্দরবনের কাছে নদীর প্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লবনাক্ততা বেড়েছে আর তাতে ক্রমাগত ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে পানিনির্ভর বনের জীবন। ফারাক্কার বিষক্রিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশেপাশেও পড়ছে। একদিকে পানিশূন্যতা অন্যদিকে অসময়ের বন্যা এবং অতিরিক্ত পলি। সম্প্রতি বিহারের মানুষ শাবল নিয়ে মিছিল করেছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেবার দাবিতে।  বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও এই বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাও ভারতের বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীকে থামাতে পারেনি। তাছাড়া ভারতের শাসকদের চিন্তা পদ্ধতিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার বিষয় একেবারেই অনুপস্থিত। মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের প্রস্তুতি পুরোটাই চলেছে একতরফাভাবে। এখনও এর হুমকি চলে যায়নি। এই বাঁধ বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ নদী মেঘনার জন্য যে বড় হুমকি হবে তা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন।

ম্যাপ দেখলে দেখা যায় ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর বিভিন্ন স্থানে কাঁটার মতো সব বাঁধ। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ভাটির দেশকে না জানিয়ে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। গ্রীষ্মে তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল অঞ্চল পানির অভাবে খা খা করে। তিস্তা নদীর প্রবাহ এখন শতকরা ১০ ভাগে নেমে এসেছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা ছাড়াও মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরে কোদলা নদীর উপর বাঁধ, খোয়াই নদীর উপর চাকমা ঘাট বাঁধ, বাংলাবন্ধে মহানন্দা নদীর উপর বাঁধ, গোমতি নদীর উপর মহারানি বাঁধ এবং মুহুরি নদীর উপর কলসী বাঁধসহ আরও ১৫/২০টি অস্থায়ী কাঁচা বাঁধ কার্যকর রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। ভারত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্প অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি ১৪টি নতুন খননকৃত খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে প্রবাহিত করা হবে। এটি কার্যকর হলে অন্যান্য নদীর সাথে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ নদী যমুনা আক্রান্ত হবে। শুকিয়ে যাবে অধিকাংশ নদী উপনদী।

দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের নদনদী খাল অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পানি প্রবাহের উপর ৫০ দশক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ এসেছে ‘উন্নয়ন’ নামক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে।[5]  এই প্রকল্পগুলি করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার ঋণের টাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বাঁধসহ নির্মাণমুখি কর্মসূচি হিসেবে। দেখা গেছে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও একপর্যায়ে গিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয়নি, সেচসুবিধা কাজ করেনি এবং সর্বোপরি মূল লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন বা নির্মাণ কাজ প্রধানত বিদেশি ঋণের টাকায় হয়। ফলাফল যাই হোক, ঋণদাতা, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, আমলা এবং ভুমিদস্যুদের লাভ অনেক। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শুধু একটি দৃষ্টান্ত দেই।

বড়াল নদী বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী পদ্মা এবং যমুনার সংযোগ নদী।  দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার, ১২০ মিটার প্রস্থ, এর অববাহিকা ৭৭২ বর্গকিলোমিটার। এর সাথেই চলনবিল। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এই নদীর মুখে স্লুইস গেট, ক্রসড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, নৌপথ সম্পসারণ লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম তিনবছর উৎপাদন ভালোই দেখা যায়। এরপরে শুরু হয় বিপর্যয়। ফারাক্কার কারণে এমনিতেই পদ্মা নদীর প্রবাহ কম ছিলো, উপরন্তু বরাল নদীর মুখে স্লুইস গেট বসানোতে পদ্মা থেকে আসা পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। স্রোত কমে যায়, বহু জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়। যমুনায় যেখানে গিয়ে বড়াল গিয়ে মেশে সেখানে পানিপ্রবাহ খুবই নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় যমুনা নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভাঙ্গন বিস্তৃত হয়। অববাহিকার প্রায় ১ কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বড়াল শুকিয়ে যে জমি উঠেছে তা এখন নানাজনের দখলে।[6]

তৃতীয়ত, বিভিন্ন নদীর মরণদশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা সহজ। নদী বাঁচলে তার মূল্য/টাকার অংকে পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু মরলে তার থেকে উঠে আসা জমির দাম শত/হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সেজন্যই নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতে অনেকেই আগ্রহী। খোদ রাজধানীতে বুড়িগঙ্গা, পাশে তুরাগ, বালু নদীর পাশ দিয়ে যাবার সময় এই দৃশ্য আমাদের সবাইকে  জানিয়ে দেয় এই দেশে সরকারের কাজ শুধু দখলদারদের সমর্থন দেয়া, জনপ্রতিরোধের মুখে তাকে রক্ষা করা, নদীদূষণের মাধ্যমে দখলদারদের পথ প্রশস্ত করা।

শুধু নদী বা খালবিল নয়, অপরিকল্পিত প্রকল্প ও দুর্নীতিযুক্ত উন্নয়ন তৎপরতায় ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে। ২০০৬ ও ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এই সময়ে আশংকাজনক ভাবে নীচে নেমে গেছে। ঢাকার বেশ কয়েকটি নদীতে অক্সিজেন নেই।[7]  সরকারের কেন্দ্রে নদী বিষাক্ত হলে বা লেক দখল হয়ে গেলেও কোনো প্রতিকার দেখা যায় না। কারণ দখলদাররা ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্কিত।[8]

এতোসব বিপর্যয় বাংলাদেশের শাসকদের বা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করেনি। আগের প্রকল্পগুলোর ফলাফল নিয়ে কোনো যথাযথ পর্যালোচনাও নেই। বরং আশি দশকে সমালোচিত ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান এখন আরও বৃহত্তর আকারে বিপুল ব্যয়বহুল ডেল্টা প্ল্যান নামে সরকার গ্রহণ করেছে।

বন, সুন্দরবনের কথা

‘বঙ্গের দক্ষিণে সাগরকূ’লে যদি বিশাল অরণ্য না থাকিত, তাহা হইলে বঙ্গোপসাগরের মেঘসমূহ উত্তর মুখে দূরে চলিয়া গিয়া হিমালয়ের উপত্যকায় বারিবর্ষণ করিত; তখন দক্ষিণ বঙ্গ বালুকা প্রান্তরে পরিণত হইয়া একপ্রকার মানুষের বাসের অযোগ্য হইয়া পড়িত। এখন যেমন ভাটিরাজ্যের উত্তর হইতে দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইতে লাগিলে, প্রথমে পদ্মার প্রবল প্রবাহ, পরে নদীমাতৃক উচ্চদেশে মানুষের বসতি, তাহার পরে মানুষের খাদ্যের জন্য নিম্নতল উর্বর ক্ষেত্রে ধানের প্রাচুর্য এবং সর্বশেষে দুর্ভেদ্য প্রাকারের মত সুন্দরবনের এই নিবিড় জঙ্গলশ্রেণী- এমন দৃশ্য আর দেখা যাইত না। জঙ্গলের জন্য আরও অনেক বিপদ হইতে দেশ রক্ষা হইতেছে। সমুদ্রের জলোচ্ছাস একান্ত প্রবল হইলেও সম্পূর্ণভাবে দেশ ভাসাইতে পারে না; সমুদ্রের ঝটিকাবর্ত বা বায়ুপ্রবাহ বসতিস্থানসমূহ উৎখাত করিতে পারে না।’ [9]

সাধারণভাবে একটি দেশের প্রতিবেশগত ভারসাম্যের জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ভূমি বনে আচ্ছাদিত থাকা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ৭ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।[10]     বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যান-এ বলা হয়েছে, ‘সমতলের শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ প্রাকৃতিক শালবন এবং পার্বত্যাঞ্চলের শতকরা মাত্র ১১ ভাগ বন এখনও টিকে আছে আর সেগুলোর অবস্থাও খুবই খারাপ।’ [11]

বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকেই জানা গেছে, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি বন উজাড় হয়েছে উচ্চপ্রবৃদ্ধির এই এক দশকেই।..শুধু গাজীপুরেই এক দশকে ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ বনাঞ্চল।’  মন্ত্রণালয়ের ওই তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ‘১৯৩০-৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখন্ডে বার্ষিক বন উজাড়ের হার ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। ১৯৭৫-৮৫ সাল পর্যন্ত বন উজাড় হয় বার্ষিক দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে। ১৯৮৫-৯৫ সালে এ হার খানিকটা কমে দাঁড়ায় দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর থেকে বন উজাড়ের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বন উজাড়ের নিট হার ছিল দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বন উজাড় হয়েছে। এত বেশি হারে বন উজাড়ের ঘটনা এর আগে কোনো দশকেই ঘটেনি।[12]

‘উন্নয়ন’ নামে পুঁজি সংবর্ধনের উন্মাদনার সর্বশেষ শিকার সুন্দরবন, যাকে বলা যায় বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রাকৃতিক বন। এই সুন্দরবনের মোহনায় যত প্রজাতির মাছ আবিষ্কার করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে ইউরোপে তত প্রজাতির মাছ নেই। সুন্দরবনের যে বৃক্ষ এবং লতাগুল্ম, যে জীববৈচিত্র্য তৈরি করেছে সেটাও বিশ্বের গবেষকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের মানুষ ও সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সুন্দরবন বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্ট নানাবিধ প্রকৃতি বিধ্বংসী মুনাফামুখী তৎপরতার কারণে সুন্দরবন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সুন্দরবন এখনো প্রকৃতি-প্রাচীর হিসেবে রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। সুন্দরবনে বছর দশেক আগে সিডর যে আঘাত হেনেছে তাকে মোকাবিলা করে সুন্দরবন আবার নিজেকে নতুনভাবে পুনরুৎপাদন করেছে অন্তর্গত শক্তির বলেই।

প্রকৃতির মধ্য থেকে সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা সুন্দরবনের পক্ষে যে সম্ভব সেটা যেমন বারবার প্রমাণিত হয়েছে তেমনি এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের মুনাফা  লোভ সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা তার পক্ষে খুবই কঠিন।  মুনাফামুখী তৎপরতায় সেখানকার পানি লবণাক্ত হয়েছে, লবণাক্ত পানি সেখানকার প্রাণবৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের মধ্যেকার ভারসাম্য বিপন্ন হয়েছে। যে ফুলবাড়ী প্রকল্প উত্তরবঙ্গের পানি আবাদী জমি এবং মানুষ এমন কি দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবনের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছিল, শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটি দিয়ে দেশের কয়লা বিদেশে পাচারের এই প্রকল্পকেই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বলে ঢোল পেটানো হয়েছিলো। জনপ্রতিরোধে তা কার্যকর হয়নি। পরে এসেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ তিন শতাধিক বাণিজ্যিক প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার যৌথভাবে কার্যত সুন্দরবনের মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করেছে।

লবণ ও মিষ্টি পানির সমন্বিত প্রবাহে, ভূমি ও নদীর সম্মিলিত যোগে সুন্দরবন এক বিশেষ বাস্তুসংস্থান যা বিশ্বে বিরল এবং সেই কারণে প্রাণবৈচিত্রে তার সমাহার অনেক বেশি। পরিবেশদূষণ হ্রাসেও তার ক্ষমতা অনেক। একদিকে তা খুব নাজুক উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে, আবার তা প্রবল শক্তিধর প্রকৃতির দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ক্ষমতার কারণে। সেজন্যই বাংলাদেশের সুন্দরবন শুধু এদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক অতুলনীয় সম্পদ। যেহেতু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট এবং বিশ্ব ঐতিহ্য এই সুন্দরবন এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর  হিসেবে কাজ করে সেকারণেই উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ এই সুন্দরবনের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। আমরা সবাই জানি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম বিপদগ্রস্ত দেশ। এই বিপদের মোকাবেলায়ও আমাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন এই সুন্দরবন। তাছাড়া ৩৫-৪০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল। এগুলো বিনষ্ট হলে তাদের উদ্বাস্তু হওয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। আমাদের হিসাবে প্রতিদিনই ঢাকা শহরে ‘উন্নয়ন’-দুর্যোগে বা পরিবেশ উদ্বাস্তু হিসেবে মানুষের ভীড় বাড়ছে। তাঁদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে যদি সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।

সবার জানাকথা আমরা বারবারই বলি যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নাই। সুঁই থেকে রকেট, গণভবন থেকে তাজমহল সবই আমরা বানাতে পারবো, কিন্তু সুন্দরবন আর বানাতে পারবো না। সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প দিয়ে কিছু গোষ্ঠী দ্রুত মুনাফা বানাতে পারবে, বনবিনাশ করে জমি দখল করে টাকার জোয়ার তৈরি করতে পারবে, তাতে জিডিপিও বাড়বে কিন্তু বাংলাদেশ শিকার হবে চিরস্থায়ী বিপর্যয়ের। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]বাংলাদেশের মতো দেশে‘উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নী সংস্থা ও লুম্পেন কনসালট্যান্টদের আগ্রহ বরাবরই বেশি। কেননা এখানে বাছবিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার কোনো দরকার হয় না। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক জালসহ এসব বিষয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী লেখার জন্য দেখুন: Salim Rashid: Rotting from the Head, Donors and LDC Corruption, UPL, Dhaka, 2004.

[2]বনবিনাশ ও সামাজিক বনায়নের বিবরণী ও বিশ্লেষণের জন্য দেখুন- ফিলিপ গাইন (সম্পাদিত): বন, বনবিনাশ ও বনবাসীর জীবন সংগ্রাম, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)। ঢাকা, ২০০৪

[3]দেখুন: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: অধিকতর উন্নযনের আগমনধ্বনি’, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র, শ্রাবণ, ২০০০।

[4]বাংণাদেশের নদী ও পানিসম্পদ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য M Inamul Haque: Water Resources, Anushilon, Dhaka 2008.  মাহবুব সিদ্দিকী: গঙ্গা পদ্মা পদ্মাবতী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৪।

 

[5]বাংলাদেশে নদী বিষয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমস্যা ও বিকল্প নিয়ে বিশ্লেষণের জন্য দেখুন Nazrul Islam: Let the Delta be a Delta, Eastern Academic, Dhaka, 2016

[6]বড়াল নদীর দুর্দশার কারণ ও বরাল উদ্ধার চেষ্টার কাহিনীর জন্য পড়ুন- নথিবদ্ধ বড়াল-তথ্য তত্ত্ব ও সম্ভাবনা, রিভারাইন পিপল ও বড়াল রক্ষা আন্দোলন,  শ্রাবণ, ২০১১।

[7]প্রথম আলো ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

[8]প্রথম আলো, ‘২২ একর লেক দখল, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

 

[9]সতীশচন্দ্র মিত্র: যশোহর খুলনার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, দেজ, কলকাতা, পৃ. ২৫৩

 

[10]বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে প্রদত্ত বক্তব্য:  https://www.dhakatribune.com/bangladesh/environment/2018/03/23/experts-bangladeshs-forest-coverage-10

[11]Bangladesh Forest Department: Bangladesh Forestry Master Plan 2017-2036 (Draft Final) December 2016

[12]উদ্ধৃতি: ‘উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনের ক্ষত বাড়াচ্ছে’, বণিকবার্তা, নভেম্বর ৪, ২০১৭।

 

‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্ত নির্বাচন কমিশন

আমীর খসরু ::

গত কয়েকদিন সবার জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়েছে কি হয়নি – তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এখনো যে হচ্ছে না তা নয়, তবে বেশ কিছুটা কমেছে। কমার কারণ, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়ে গেছে- এমনটা নয়, এটা হয়নি একবিন্দু-বিসর্গও। বরং এটা যারা নিশ্চিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবেন সেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েই আমজনতা ধন্ধে পড়েছেন; বড় আকারে প্রশ্ন উঠেছে। আবার প্রশ্নের মধ্যদিয়ে উত্তর খোজারও চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকগণ। সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে ‘‘আসলে তারা কোনো কিছু দেখতে না চাইলে, জোর করে তো আর তাদের দেখানো যাবে না’’ বলে ডেইলি স্টারকে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন এই সোমবারে। বদিউল আলম মজুমদারের মতো ড. শাহদীন মালিকসহ অন্যান্যরাও উদ্বেগ ও শংকা প্রকাশ করছেন নির্বাচন কমিশনের একপেশে নীতি নিয়ে।

কিন্তু এসব বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকগণ সম্ভবত নির্বাচন কমিশনের উপসর্গগুলোই দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু আসল রোগটি ধরতেই পারেননি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার হচ্ছে, হ্যামিএ্যনোপিয়া (Hemianopia) নামের চোখের একটি রোগ-যা দৃষ্টিশক্তির সাথে জড়িত। এ রোগটির প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে, কোনো জিনিসের অর্ধেক দেখতে পাওয়া বা দৃষ্টিশক্তি অর্ধেকটা সাময়িক অথবা স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যিনি বা যারা হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত তারা অর্ধেকটাই শুধু দেখতে পাবেন; বাকি অর্ধেকটা তাদের দৃষ্টিশক্তির বাইরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক উন্নয়ন ঘটেছে-রোগটির নানা ধরন-ধারন এবং কারণও কালোক্রমে আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী  এও বলছেন, এটি মানসিক বিষয়াশয়ের সাথে জড়িত। যেহেতু আমি চিকিৎসক নই, তাই এ রোগটির বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলেও- রাজনীতির মাঠেও নিশ্চয়ই ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্তদের দেখা মিলছে বলে ধারণা করি। রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়ার লক্ষণও নিশ্চয়ই অর্ধেক দেখা এবং এর সাথে রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত বলে ধারণা করা যায়। রাজনৈতিক এই রোগটির উপসর্গ হচ্ছে, যতোটুকু দেখার ততোটুকু দেখবে এবং যতোটুকু দেখতে চাইবে না তা দেখবে না-এমন জাতীয়। নির্বাচন কমিশন এখন ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় সবচেয়ে বেশিভাবে আক্রান্ত।

ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. শাহদীন মালিক থেকে শুরু করে নির্বাচন বিষয়ক সব বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকসহ তাবৎ আমজনতার এ কথাটি জানা উচিত যে, দুর্ভোগ্যজনকভাবে আগের মতো এবারের নির্বাচন কমিশনটিও রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত। আর এটা বুঝতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে অর্থাৎ নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হলো কিনা, এর ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে দেশবাসী দেখলো কিনা, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়েছে কি হয়নি ইত্যাকার নানা বিষয় নিয়ে আর উদ্বেগ, শংকা তো থাকবেই না, কোনো প্রশ্নও মনের মধ্যে উকিঝুকিও দেবে না।

নির্বাচন কমিশনের আসল রোগটি জানা থাকলে– কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে কোথায় বদলি করে আবার কোথায় পদায়ন করা হয়েছে; কোন কোন কর্মকর্তা কার হয়ে কার পক্ষে কাজ করছেন; কেন গায়েবী মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আগে এবং এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে; কেনই বা একজন জীবিত মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকায় আসার পরে তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করতে হলো; কেনই বা তফসিল ঘোষণার পরে ৬ জন দলীয় অর্ন্তদ্বন্দ্বে নিহত হওয়ার পরেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এবং উল্লিখিত ঘটনাবলীর কোনো ব্যবস্থা কোনোদিনই নেয়া হবে না – সে সব নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।

তবে রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগের মুশকিলটি হচ্ছে- এই রোগে আক্রান্তরা কোন অর্ধেক দেখতে পাবেন বা দেখবেন আর কোন অর্ধেক দেখবেন না? এখানে বলা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনবিরোধী প্রচারণা বা নির্বাচনে গুজব সৃষ্টিকারী কোনো কিছু প্রকাশিত হলো কিনা তা দিনের ২৪ ঘন্টাই  মনিটর করতে থাকবে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, এটা নির্বাচন কমিশনের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে কিনা। ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের জন্যও নানা নিয়মনীতি জারি করা হয়েছে – যা অতীতে কখনো দেখাও যায়নি, শোনা তো দূরে থাক।

আগেই বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত। আর আক্রান্ত হওয়ার কারণে বর্তমানে সবার মনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শংকা বিদ্যমান রয়েছে-তারও কোনো কারণ খুজে ফেরার প্রয়োজন আর বোধকরি দরকার হবে না। আগামী নির্বাচনে আমজনতা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন কিনা, সব ভোটারের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত হলো কি হলো না – তারও খোজখবর এবং জবাব প্রাপ্তিরও কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ রোগটি যে ধরা পড়ে গেছে-তা ক্রমান্বয়ে সবাই জানতে থাকবে।

তবে এখন সম্মিলিতভাবে সবার পক্ষ থেকে প্রার্থনা হওয়া উচিত, নির্বাচন কমিশন যেন রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগটি থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। অবশ্য একটি সুখবর হচ্ছে, হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগের একটি ধরন আছে; আর তা হলো- এই রোগটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িক স্থায়ী হয়। আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা ও  প্রত্যাশা করি, এই রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া যেন সাময়িক হয়। প্রার্থনা করা ছাড়া আমভোটারদের আর সাধারণ মানুষের কিই বা করার আছে। তাই আসুন সবাই সম্মিলিতভাবে নির্বাচন কমিশনের রোগমুক্তির প্রার্থনায় মিলিত হই। আমীন!

বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

জমো  সানদারাম ও আনিস চৌধুরী ::

আয় ও সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ – উভয় ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই বেড়েছে। বিশ শতকজুড়েই, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মোটা দাগে বৈষম্য ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, এতো ব্যাপক বৈষম্য  মানব ইতিহাসে আর কোনো কালেই ছিল না।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ দখল করে আছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক মাত্র ১২ ভাগ আয়ের অধিকারী। ইউরোপে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ পেয়েছে ১৮ ভাগ, নিচের অর্ধেক পেয়েছে ১৪ ভাগ।

অক্সাফামের ‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৮২ ভাগ চলে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের হাতে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব যারা অর্ধেকে রয়েছে তারা প্রায় ৩.৭ ভাগ মানুষ বলতে গেলে কিছুই পায়নি। ইতিহাসে ২০১৬ সালেই সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি দুদিনে একজন করে বিলিওনিয়ার সৃষ্টি হয় ওই বছরে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বাড়ে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, বৈষম্য বৃদ্ধি যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা ও সমাধান করা না হলে এটি নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

‘দি গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্র্যাসি ২০১৭ : এক্সপ্লোরিং ডেমোক্র্যাসিস রেসিলেন্স’ ধারণা করছে, বৈষম্য গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। বৈষম্যের ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, সামাজিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত করছে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও সমর্থন ধসিয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অগ্রগতির পথে বাধা :

আলেক্সি ডি টকভিল বিশ্বাস করেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে, সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণ সমাজে আয় ও সম্পদের মারাত্মক বিভেদের ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি উন্নতিতে তেমন কিছু করা না হয় বা অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক সাম্যের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ ধনীরা অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব রাখে ও কবস্তার করে,  গরিবরা এই ধরনের সুযোগ পায় না।

আর অমর্ত্য সেনের মতে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গরিবের ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ বা ‘সামর্থ্য’ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। যাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকে, তারা কেবল ইতিবাচক পুনঃবণ্টনেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, সেইসাথে তাদের নিজেদের অনুকূলে বিধিবিধান ও নীতি প্রণয়ন করে নেয়।

রবার্ট পুটনামের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আস্থার’ মতো নাগরিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

যোশেফ স্টিগলিসের মতে, বৈষম্য বাড়লে সামাজিক কাঠামো এবং সংযোগ শিথিল করে দেয়। সবক্ষেত্রে আস্থা হ্রাস, উদাসীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ প্রশ্নে আগ্রহের অভাব ও স্বভাব রুক্ষতা-কটুতা বাড়ায়। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ায়, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়ও নি:শেষ করে, সমাজবিরোধী আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অর্থপূর্ণ গণতন্ত্রের প্রয়োজন সামাজিক বিষয়াদিতে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তভুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মেরুকরণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ফাঁপা করে তোলে, নাগরিক সম্পৃক্ততা হ্রাস করে।

লোকরঞ্জকতা বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ হুমকি সৃষ্টি করে বহুত্ববাদকে। আলেক্সি ডি টকভিলের  কাছে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য গণতন্ত্রের ‘সাম্য’ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে, এমনকি উচ্চ আয়ের সমাজেও তা হতে পারে। ‘ধনবাদী লোকরঞ্জকবাদ বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বশেষ পরিচিতি রাজনীতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে।

জনসমাবেশ আর মিডিয়া ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য ‘অন্যদের’ তথা অভিবাসী ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন লোকদের দায়ী করে। অর্থাৎ ধনিকশ্রেণি  সুযোগ-সুবিধা ও ‘বিভক্ত করে শাসন করার’ চলতি পদ্ধতির ‘অধিকার’ ব্যবহার করে ‘তাদের জনগণকে’ সন্তুষ্ট রাখতে সফল হয় প্রায়ই।

মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে তারা প্রায়ই ধনিকতন্ত্র শাসনকে আড়াল করে রাখে, এমনকি সবচেয়ে জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে অনেক সময় সাফাইয়ের ব্যবস্থাও করে। যেমন নির্বাহী পদে থাকাদের ‘উচ্চ পারিতোষক’, টাইকুনদের উদারভাবে কর হ্রাস, বিনিয়োগ ইনসেনটিভ। আর এসবই করা হয় সামাজিক ব্যয় ও গণপরিষেবার ব্যয় ছাঁটাই করে।

বর্তমানের ‘বিজয়ী সবই নেবে’ বা “winner – take -all” এর মাধ্যমে  অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সফলভাবে লবি করে কর হার কম রাখতে সক্ষম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় থেকে এক শতাংশের হাতেই সর্বোচ্চ মাত্রায় আয় পঞ্জিভূত হচ্ছে।  আর ১৯৮০ সাল থেকে তলানিতে থাকা অর্ধেক আমেরিকান মোট প্রবৃদ্ধির মাত্র ৩ ভাগ অর্জন করতে পারছে। আধুনিক সময়ে এত ব্যবধান আর কখনো দেখা যায়নি।

অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে শীর্ষে থাকা ০.০১ ভাগ তথা ১৪ হাজার আমেরিকান পরিবার মার্কিন সম্পদের ২২.৩ ভাগের মালিক ছিল। আর নিচে থাকা ৯০ ভাগ তথা ১৩৩ মিলিয়ন পরিমার মাত্র ৪ ভাগের মালিকছিল। সবচেয়ে ধনী ১ ভাগ এক প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন আয়ে তাদের অংশ তিনগুণ করতে সক্ষম হয়।

একদিকে আইনগত ও অন্যান্য সংস্কার, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সবই ক্ষমতা বা প্রভাববঞ্চিতদের ভয়াবহ বিপরীত অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্প-আয়ের আমেরিকান পরিবারগুলোর ৭০ ভাগের বেশি আগের বছরের তুলনায়  ফৌজদারি মামলায় বেশী জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের ৮০ ভাগের বেশি পরিবার আইনগত সুবিধাও তেমন পাচ্ছে না।

তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়ায় তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়া ও বাদ পড়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেক আমেরিকান মোহমুক্তি ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে এই তারাই আবার ‘অন্য’ তথা আমদানি ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উগ্র দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতিতে অনেক বেশি সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।

নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়ারা

আনু মুহাম্মদ ::

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর পৃথিবীর বহুদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। বছরে বছরে এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চতাই বেড়েছে কেবল। এবারের নির্বাচন নিয়েও তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে নজরদারি, পরিবেশবিধ্বংসী প্রান্তস্থ পুঁজিবাদের বিকাশকালে জনগণের জীবন ও অধিকারের সীমা কেমন হতে পারে, উন্নয়নের নামে মুনাফা ও দখলদারিত্ব বিস্তার কী চেহারা নিতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ নির্বাচন তো বটেই, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। নির্বাচনের প্রতি ক্ষমতাবানদের অনীহা ও ভয় প্রকাশিত হচ্ছে বহুভাবে। এমনকি সামরিক শাসন থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাতেও শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বাচন-সন্ত্রস্ত চেহারা প্রকাশিত।

নির্বাচন বিষয়টি কী রকম পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তার একটি প্রমাণ নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ ও বাস্তব চেহারা। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুনে বড় দলের প্রার্থীরাসহ সবাই হাসে। সবাই জানে যে, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী তাদের বড় অংশ এই আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছে। এর একশ’গুণ খরচও অনেকের কাছে অপ্রতুল মনে হতে পারে। বড় দলের প্রার্থীদের টাকার কোনো অভাব নেই। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্য খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও কম ব্যয়বহুল নয়। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা একটা বিরাট সাধনা ও ধরাধরি শুধু নয়, অনেক টাকারও বিষয়। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক-শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এই অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’ ভদ্রভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহুগুণে ফেরত নিয়ে আসাই এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে, তার কারণগুলোর সারসংক্ষেপ করা যায় নিম্নরূপে:

প্রথমত, দুর্নীতি, লণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথ এর সুবিধাভোগীদের কখনও সুস্থির হতে দেয়নি। একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও  উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সাংসদদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ”এক নেতা এক দল’ নীতি” কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্বসংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে। এখন তার সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ভারত রাষ্ট্র ও সে দেশে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ পুঁজি। ১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী, ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর, বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত ‘নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতাবন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। ‘ক্রসফায়ারে’র মতো পদ্ধতি এই তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে এসব বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চতুর্থত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরও বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সবকিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত যা ‘সেবা খাত’ নামে পরিচিত, তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশন নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বাড়ছে, আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ও পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য; শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব।

পঞ্চমত, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, তত রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুই ধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে।

ষষ্ঠত, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপ-সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী। দেশের নীতিনির্ধারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল, তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবেন কোত্থেকে? শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে?

এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে না; একমাত্র তখনই নির্বাচন প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা। গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী।

মন শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধির নির্বাচন কমিশনের দাওয়াই

আমীর খসরু ::

অনেকেই প্রত্যাশার পারদ উপরে উঠিয়ে এমনটা ধারণা করেছিলেন যে, বিএনপিসহ বিরোধী দল ও পক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে নির্বাচন কমিশনে কর্তাব্যক্তিদের – মন মস্তিষ্ক ও মনোজগতে সামান্য হলেও একটা ঝাকুনি লাগলেও লাগতে পারে। কারো কারো এমনটাও মনে হয়েছিল যে, পুরো নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে জনমনে যে বদ্ধমূল  নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে – তা বদলের চেষ্টায় হলেও তারা অন্তত ‘কিছু একটা করবে’ এবং সেটি হবে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব প্রত্যাশা উল্টিয়ে, ‘যা আগে ছিল তাই পরে রয়ে গেল’। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিটি করপোরেশনের সময়ের মন্তব্যের পথ ধরে একজন নির্বাচন কমিশনার এবার আগে ভাগেই আগামী নির্বাচনটি কেমন হতে পারে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আগাম জানান দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর কোনো দেশে শতভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হয় না, বাংলাদেশেও হবে না’’। (প্রথম আলো- ১৬ নভেম্বর)। এর আগে-পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শোনানো হলো নিয়ম-নীতির নামে নানা নসিহত। নির্বাচন কমিশন সচিব ১১ নভেম্বর স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিলেন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ভোট কেন্দ্রের ছবি তুলতে পারবেন না, সংবাদ মাধ্যমের সাথে নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া, মতামত প্রকাশ, এমনকি আনুষ্ঠানিক কথা পর্যন্ত বলতে পারবেন না। তাদের ‘মূর্তির মতো’ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই ধারায় আরও কয়েক দফা নীতিমালা ঘোষণা করা হলো পর্যবেক্ষকদের জন্য। সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্যও ইতোপূর্বে এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই যেসব নিয়মনীতি ও নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে-তাতে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদেরও সরাসরি ‘মূর্তি’ হতে না বললেও প্রায় ‘মূতির্’ হওয়ার নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এবার চোখ পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপরেও।  নির্বাচন কমিশনের সচিব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যাতে তারা ভাষায় ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য ওই মাধ্যম মনিটর করা হবে। সরকার কথিত ‘প্রোপাগান্ডা’রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে; নানা বিভাগ ও নানা উদ্যোগে এ কাজটি কৌশলে বহুদিন ধরে করা হচ্ছে। সম্ভবত নির্বাচন কমিশন এতেও নিশ্চিত হতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কাকে প্রোপাগান্ডা বলছে ও বলবে। এবং এর মাপকাঠি কি? ইতোমধ্যে কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, কিছুসংখ্যক সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাকে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলে দিয়েছে। তাহলে এই কর্মকর্তারাই কি ঠিক করবেন প্রোপাগান্ডা কোনটি এবং কোনটি প্রোপাগান্ডা নয় ?

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য এবং আমলা সচিবের বক্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা যা বলছেন তা তারা সহি ও সত্য কথা বলছেন বলেই মনে করাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ তারা আগেভাগেই ‘হয়তো’ জানান দিয়ে যাচ্ছেন যে, আগামী নির্বাচনটি তারা কেমন ভাবে করতে চান বা অনুষ্ঠিত হবে। তাদের এই মনোবাসনা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এই কারণে যে, ভোটারসহ দেশবাসী এবং বিদেশীরা আশাহতের বেদনায় যেন ভবিষ্যতে হঠাৎ করে বড় ধরনের নিরাশার মুখোমুখি না হন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন কেমন হতে পারে তার জন্য সাধারণ মানুষের বা আম-ভোটারের মন শক্ত ও কঠিন করার লক্ষ্যে, সহ্যক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে – মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতোই- এক ধরনের দাওয়াই দিয়ে যাচ্ছেন।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। সর্বসাম্প্রতিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তার ব্যাপারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি তালিকা দিয়ে তাদের বদলি করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু এতোদিন নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এক চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ওই কর্মকর্তাদের কোনোক্রমেই বদলি করা উচিত হবে না। এক পক্ষের দিক থেকে চিঠির পর চিঠি যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু এসব অভিযোগের ব্যাপারে কমিশন নিশ্চুপ রয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক্ষেত্রে তারা মতামত জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিটি অভিযোগই খতিয়ে দেখতে হবে’। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে পথে হাটছে না। হাটছে না যে, তার আরও উদাহরণ আছে। রাজধানীর আদাবরে ২জন এবং নরসিংদিতে ২জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে তফসিল ঘোষণার পরে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। যশোর বিএনপির একজন নেতার মরদেহ কয়েকদিন নিখোজ থাকার পরে ঢাকায় নদী থেকে উদ্ধার করা হলো এবং এক্ষেত্রে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক্ষেত্রে বরাবরের মতোই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন বলে তার কর্মসম্পাদন করেছেন। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সমর্থকদের ভিড়কে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী উচ্ছাস হিসেবে দেখেছেন; আবার বিএনপি অফিসের সামনের ভিড়কে তারা দেখেছেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফ করাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো তেমন কোনো আমলেই নিলেন না। শত শত নেতাকর্মীকে তফসিল ঘোষণার পরে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলে দিয়েছেন এই মামলাগুলো তফসিল ঘোষণার পরে হয়নি। তিনি এও বললেন, বিএনপি অনেক মামলার বিস্তারিত নথিপত্রই দিতে পারেনি। পুলিশ সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একই। তিনি জোরের সাথেই বলেছেন, পুলিশ বিনা কারনে কাউকে গ্রেফতার করেনা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব বাদ দিয়ে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের দিকেই পুরো মনোযোগী হয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায় বললেও, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন ইভিএম ব্যবহার থেকে তারা পিছপা হবেন না। যে ব্যবস্থাটির সামান্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হলো না, এমন কি জনসম্মুখে যেসব ত্রু টির কথা বলা হচ্ছে তা যে সঠিক নয়- তা জনসম্মুখে ওই ইভিএম মেশিন ব্যবহার করেই পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী পর্যন্ত না করে ‘অসীম আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে’ ইভিএম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী ভারতেও ইভিএম-এর ত্রু টি যে কতো ভয়াবহ হতে পারে, নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার ক্ষেত্রে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে বিজেপি, কংগ্রেসসহ সবদলের সামনে আম-আদমী পার্টির পক্ষ থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশনের সময়েই একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে দেখানো হয় যে, কিভাবে ইভিএম ব্যবহারে ফলাফল ম্যানিপুলেশন করা যায়।

এতোসব পরিস্থিতির মধ্যেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বাক্যটি হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। এমন প্রত্যাশার আসল অর্থ হচ্ছে এখানে যে, এই পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান নেই। অর্থাৎ এর চরম অনুপস্থিতি রয়েছে। এই চরম অনুপস্থিতির বিষয়টি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনে অনুভূত হয়নি। কারণ ওই নির্বাচনটি ’৯০ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারে সবার জন্য সমান সুযোগের অভাবটি অনুভূত হচ্ছে সব দল ও পক্ষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে। এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, যোগ্যতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হচ্ছে-একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাদের মনেপ্রাণজুড়ে ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি অনুপস্থিত বলেই জনগণ ধারণা করে নেতিবাচক এবং এ কারণে জনমনে শংকা, উদ্বেগ ভীতির সৃষ্টি হয়। এই শংকা, ভীতি ও উদ্বেগ আরও বহু গুণে বেড়ে যায় সরকারের ভূমিকার কারণে।

আর এ কারণেই জনগণ এখন পর্যন্ত আস্থাশীল হতে পারছে না যে, আগামী নির্বাচনটিতে তারা নির্বিঘ্নে, নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এটাই হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এখন পর্যন্ত প্রধান অন্তরায়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এমন পরিস্থিতির নিশ্চয়তা নির্বাচন কমিশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটাই নির্বাচন কমিশনের বড় ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের বড় সাফল্য।