Home » বিশেষ নিবন্ধ (page 6)

বিশেষ নিবন্ধ

ন্যায্য দাবি নিয়ে আক্রান্ত তরুণেরা

আনু মুহাম্মদ ::

কোটা সংস্কারের আন্দোলন তৈরি হয়েছে কাজের খোঁজে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। কাজ না করে চাঁদাবাজি বা অপরাধ করে জীবিকা অর্জনের পথে তারা যেতে চায় না। তারা মেধা ও যোগ্যতায় নিজেদের তৈরি করতে পারবে, তার ভিত্তিতে কাজ পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে এটাই তাদের দাবি। সরকার পক্ষ বারবার এই দাবিকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করেছে, অপপ্রচারের পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে। এই দাবি জানাতে গিয়ে তারা যখন সরকারের ভয়ংকর রোষের শিকার হয়, যখন পুলিশ- ছাত্রলীগের আঘাতে জর্জরিত হয় ন্যায্য দাবি জানানো সাধারণ শিক্ষার্থীরা, তখন সেই আঘাত প্রতিটি নাগরিকের ওপরই এসে পড়ে। স্পষ্ট হয় শিক্ষা ও জনস্বার্থের প্রতি সরকারের বৈরী  ভূমিকা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বেকারত্বের হার বেশ কম, শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকেও কম। সর্বশেষ ‘শ্রমশক্তি জরীপ ২০১৬-১৭’ অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ, গত বছরের তুলনায় বেকারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ লাখ। প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা অনেক বেশি। কাজ পেতে আগ্রহী কেউ সপ্তাহে একঘন্টা কাজ করলেই যদি কর্মরত বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বলতে হবে বাংলাদেশ এখন পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরে আছে! কারণ বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কর্মসন্ধানী সবাই কিছু না কিছু উপার্জনমুখি বা উপার্জন বিকল্প কাজ করে। সাধারণত কর্মসময় ১৫ বছর বয়স থেকে ৬৫ বছর ধরা হলেও বাংলাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কাজ শুরু হয় ৫-৭ বছর থেকেই, আর তা অব্যাহত থাকে (যদি বেঁচে থাকতে পারেন) ৬৫ বছরের পরেও। এদেশে যারা নিজেদের শৈশবকে শৈশব হিসেবে পার করতে পেরেছেন তারা বিশেষ সুবিধাভোগী।

বেকারত্বের সংকীর্ণ সংজ্ঞা দিয়ে কর্মসংস্থান মাপা খুবই বিভ্রান্তিকর। কর্মঘন্টা, ধরন, আয়, নিশ্চয়তা এগুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। প্রবাসে প্রায় এক কোটি মানুষ কাজ করেন। তারপরও দেশে কাজের পরিমাণগত ও গুণগত অবস্থা ভালো নয়। কৃষিখাতের অনুপাত কমেছে, কর্মসংস্থানেও। কিন্তু শিল্প কারখানা খাতের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে পরিসেবা খাত। সেখানে স্থায়ী নিরাপদ কাজের সুযোগ খুবই কম। তাই অপ্রতিষ্ঠানিক কাজ, স্বকর্মসংস্থানেই বেশির ভাগ মানুষের নির্ভরতা। সরকারি সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরীপ অনুযায়ী দেশে কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এসব ক্ষেত্রে কাজের কোনো স্থিরতা নেই, আয় তুলনামূলক ভাবে অনেক কম, নিরাপত্তাও কম। স্নাতক  পর্যায়ের শিক্ষা নিয়েও অনেককে এ ধরনের কাজই খুঁজতে হচ্ছে। দোকান, মোবাইল, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, টিউশনি, কোচিং সেন্টার, অনলাইন বিভিন্ন সার্ভিস, কুরিয়ার, পরিবহণ, বিক্রয় প্রতিনিধি সহ এজেন্ট হিসেবে কাজ এগুলোই এখন শিক্ষিত তরুণদের কাজের এলাকা। ব্যাংক, এনজিও, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বিশেষ আগ্রহের জায়গা। সবচাইতে গুরুত্ব পাচ্ছে এখন বিসিএস ক্যাডার।

সচিব, যুগ্মসচিবসহ উচ্চ পদগুলোতে সংখ্যার তুলনায় নিয়োগ বেশি হলেও প্রয়োজনীয় নিয়োগে সরকারের অনীহা প্রবল। সর্বজন (পাবলিক) স্কুল কলেজে বহু হাজার পদ এখনও খালি। সরকারের বাজেট ক্রমশ বেড়ে যায়, অভূতপূর্ব উচ্চ ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেয় সরকার, কিন্তু প্রয়োজনীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে বলে টাকার অভাব। এসব পদপূরণ যে শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিরোধ করবার জন্যই যে দরকার সে বোধটুকু সরকারের মধ্যে দেখা যায় না। সরকার একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ করতে গেলে বলে অর্থ নেই। বছরের পর বছর কলেজগুলোতে পদ শূণ্য, শিক্ষক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ না করেই পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। বহু প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকের অভাবে ঠিকমতো ক্লাশ হয় না।

অন্যদিকে প্রায় ক্ষেত্রেই মেধা বা যোগ্যতার সাথে কাজ পাবার সম্পর্ক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে চাকুরির কথা উঠলেই ‘কতো টাকা’ লাগবে এই প্রশ্ন নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।  অদ্ভূত নৈরাজ্যে বা বাজারী সমাজের মধ্যে পড়েছি আমরা। নিয়োগের সময় মেধা বা যোগ্যতার চাইতে কে কত টাকা দিতে পারবে সেই প্রশ্ন ওঠে। চাকুরি এখন কিনতে হয়। যে টাকায় কেনা, তার চাইতে বেশি টাকা তোলার চেষ্টা তাই অনিবার্য। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের এসব জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখতে হয় নিয়মিত। এদেশে যোগ্যতা অর্জন কঠিন, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া আরও কঠিন।

বিসিএস ক্যাডারের বিষয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ তরুণদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে আগের যেকোন সময়ের চাইতে বেশি। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক কলেজ শিক্ষার্থীদের এখন প্রধান ব্যস্ততা। স্নাতক উত্তীর্ণ হবার অনেক আগে থেকে এই বিষয়ে পড়াশোনাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ স্থায়ী নিরাপদ কর্মসংস্থানের আর কোনো ক্ষেত্র নেই।কিন্তু এতো ভরসা যার উপর সেখানে কোটার প্রতিবন্ধকতা দিনে দিনে ক্ষোভ বৃদ্ধি করেছে শিক্ষার্থীদের।

খুবই স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কোটা নিয়ে আলোচনা কারণ শতকরা ৫৬ ভাগের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য (এখন নাতি নাতনি যোগ হয়েছে)। এ বিষয়ে তাই কথাবার্তা খুব না হলেও ক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়েছে। এবারই তার বহি প্রকাশ ঘটেছে বেশি। স্পর্শকাতর হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানের কথা বিবেচনা করেই এ বিষয়ে কথা বলা উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো থেকেই আলোচনা হওয়া দরকার বেশি। এই আন্দোলনের প্রথম দিকে, ২০১৩ সালেই কেউ কেউ বলেছেন। বাবা মা উভয়েই মুক্তিযোদ্ধা, এরকম একজন সন্তান তানিম আহমেদ তখনই এতোটা কোটা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। বলেছেন, কোটার সুবিধা দেয়া হয় অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য। মুক্তিযোদ্ধারা অনগ্রসর নয়। https://opinion.bdnews24.com/2013/07/13/freedom-fighters-quota-a-son-explains-his-burden/

লায়লা হাসিন আমার ছাত্রী, এখন বিভাগে সহকর্মী। মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে লায়লা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, কখনও বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কোনো সুবিধা নিতে চাইনি। বাবা আমাকে যোগ্য করে তুলেছেন, নিজের যোগ্যতার বলেই এ পর্যন্ত এসেছি। আমার সন্তানদের  আমি কোনো করুণার বস্তুতে পরিণত করতে চাই না। ওরা নিজেদের যোগ্যতা বলেই নিজেরা যতদূর যেতে পারে যাবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার, একজন শহীদের, নির্যাতিত মানুষদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে অবদান তাতে তাঁদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের ঋণ পরিশোধযোগ্য নয়। কিন্তু সেই মানুষদের তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ। শহীদদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই খন্ডিত। এগুলোর জন্যও সরকারের সাথে যেরকম যোগাযোগ ও চুক্তির ক্ষমতা লাগে, সেটা কজন মুক্তিযোদ্ধার আছে? কটি শহীদ পরিবার সে পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে? তারফলে গ্রামে প্রামে, শহরে বন্দরে এমন অনেক পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ ত্যাগ করে, সর্বোচ্চ লড়াই করেও পরে নিগৃহীত, বঞ্চিত হয়েছেন। শহরের সুবিধাভোগী পরিবারের কেউ কেউ এই পরিচয় নিয়ে নানাভাবে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারলেও শ্রমিক, ক্ষেতমজুরসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।  সরকার যদি সমস্যাজর্জরিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যথাযথভাবে যোগ্য করে তুলতে  ভূমিকা পালন করতো তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সম্মানজনক হতো।

মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে এখনও বির্তক এবং প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। এতো বছরেরও মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, যুদ্ধাপরাধী তালিকা সম্পূর্ণ হয়নি। আর তার কারণে সরকার বদলের সাথে সাথে তালিকার পরিবর্তন ঘটে। এক সরকারের অধীনেও বদলাতে থাকে। এখনও মাঝে মধ্যে পত্রিকায় খবর আসে রাজাকারের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়, ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে উচ্চ পদে আসীন। ক্ষমতাবানদের স্পর্শ থাকলে যে রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় তার প্রমাণ আমরা বহু পেয়েছি।

কোটা পরিচয় নিয়ে বর্তমানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানেরা তাই বড় যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। করুণা নয়, সম্মান তাঁদের প্রাপ্য। সরকার যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অনুপাত শতকরা ৩০ ভাগ করেছে, সন্তানের পর এখন নাতি পুতি পর্যন্ত কোটা সম্প্রসারিত করেছে এটা কি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসার জন্য, তাদের প্রতি দায়বোধের জন্য? বাস্তব পরিস্থিতি তা বলে না। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায় যে, সরকার এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাবানদের বেশি বেশি কোটা রাখার আগ্রহ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা নিজেরা নিজেদের পছন্দমতো লোকজনকে চাকুরি দিতে পারে, সুবিধামতো নিয়োগ বাণিজ্য করতে পারে। সেজন্য ভুয়া সার্টিফিকেট এর জোয়ারে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর তাদের সন্তাননেরাও ভেসে যাচ্ছে। অলিখিত প্রবল একটি কোটা এখন অন্যসব কোটা পরিচালনা করছে সেটা হল ‘সরকারি দলের কোটা’। কোটা সংস্কারের পাশাপাশি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ- ‘সরকারি দলের কোটা’ বা দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের উৎস দূর করা।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির ও ভিতর ব্যাপারটা প্রথমেই পরিষ্কার করে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির বলতে, যা কিছু প্রকাশিত, ঘোষিত এবং প্রতিটি পক্ষই নিজের বক্তব্য মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভিতরের ব্যাপারটা অতটা প্রকাশিত নয়, কেউ বললেও প্রত্যাখান করছেন বা নিরব থাকছেন। আমরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যা কিছু গণমাধ্যমে পাচ্ছি সেটা বেশিরভাগ বাইরের রূপ। দ্বন্দ্বের বাইরের রূপটা মিথ্যা বা অসত্য বলছি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেতরের বিষয়টা প্রকাশিত ও জানা না গেলে দ্বন্দ্বটা পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবেনা। ভিতরের সত্য ঘিরে সব যুগে রহস্য থাকে। আমরা যাকে রাজনৈতিক গসিপ বলি তা দ্বন্দ্বের ভিতরের উপাদান ঘিরে। কিন্তু এটাও ঠিক চলতি রাজনৈতিক ধারায় ও ভিতরের সত্য জানার ও উদঘাটনের প্রচেষ্টা আছে। স্ট্রিং অপারেশন সেরকম একটি প্রচেষ্টা। স্ট্রিং অপারেশন এর মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যমে ও শাসকদলের মধ্যে অর্থের বিনিময় সহযোগিতার করার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রিং অপারেশন বাইরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার – রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতরে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হচ্ছে; সময় ও ইতিহাস ভিতরে সত্যটা তুলে ধরে। ভিতরের সত্য অনুসন্ধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দর্শণ গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরের বিষয় বলতে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ক্ষেত্রে নয়া উদারনৈতিক, রক্ষণশীল, কর্তৃত্ববাদী দর্শনের পার্থক্যের কারণে ভিতরের বিষয় ব্যাখা বিশে¬ষণে পার্থক্য হয়। বলা হয়ে থাকে কোন চোখ থেকে দেখছি। এ চোখ তৈরী হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তি ও শ্রেণী স্বার্থে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়, দেখার চোখ এক হয়না। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনীতির বাইরের ও ভেতরের বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বাইরের বিষয়গুলো অর্থাৎ নিবার্চন ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; এর ভিতরের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা ও রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন আনার বহুমুখী কৌশল।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহিরের দিকটায় রূপান্তর হয়েছে- এখন জোরেশোরে উন্নয়নের নামে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর শুরু ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন থেকে। এ নির্বাচনকে প্রতি-নির্বাচনই (Counter Election)  বলবো। নির্বাচনকে নির্বাচন দিয়ে ধ্বংস  না করা হলেও এর ক্ষয় করা হয়েছে। ১৫৪ জন সাংসদ প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন; এধরনের একটি নির্বাচনের বৈধতা অর্জন দেশে বিদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শাসকদলে। কিন্তু শাসকদল গিনেস বুক রেকর্ড তৈরী করে এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সব প্রশ্নকে নিঃশেষ করতে সফল হয়েছেন।

শাসকদল এমন একটা অবস্থা তৈরী করলেন, নির্বাচন কিভাবে হয়েছে সেটা বড় কথা নয়- দেশ কিভাবে চলছে দেখুন, দূর্বল নয়, শক্তিশালী’র শাসন। শক্তিশালী শাসক ও শাসন আপনাকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পৌঁছে দেবে- এভাবে কারো ধারণা থেকে নয়, শাসকদের অন্তর্গত দর্শণ থেকে বেরিয়ে আসে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে সকলে যে যার কাজ করতে পারবেন, তবে কেউই সীমা লংঘন করতে পারবেন না, সীমা লংঘন করলেই শাস্তি ও বিতাড়ন। সীমার মধ্যে থাকলে শান্তি ও পুরষ্কার। মিলিয়ে দেখুন প্রধান বিচারপতি যতদিন সীমার মধ্যে ছিলেন, পুরষ্কার পেয়েছেন, যখনই সীমা লংঘন করেছেন তখনই ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। খালেদা জিয়া যখন আন্দোলন পরিহার করে ব্যক্তিগত দলীয় জীবন যাপন করেছেন, তখন বড় কোন শাস্তি ছিলনা, কিন্তু খালেদা জিয়া উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের হুমকি হতে পারেন, তখনই ভিন্ন পরিস্থিতি। তাদের মনোবাসনা, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে ‘‘তাদের নির্বাচন’’ উন্নয়নের অন্তরায় না হয়। কাজেই ৫ই জানুয়ারী-২০১৪ এর মতো অতোটা নয়, ২০১৮/১৯ এর পোষাক পড়িয়ে ভদ্র নির্বাচন করা, যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করবে, সাংসদ নির্বাচিত হবেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বর্তমান শাসক দল ও সরকার গঠন করবেন তারা-এটাই ভাবনা। বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরের চেহারাটা এরকমই দাড়িয়েছে।

ভিতরটা বোঝার মত তথ্য উপাত্ত কম। দ্বন্দ্বের ভিতরটা পরিষ্কার নয়, বিরোধী দলের কাছে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে  খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন না আন্দোলন? এর মধ্যে আন্দোলনের কোন ঈঙ্গিত নাই, দানা বাঁধেনি আন্দোলনের বিষয়; আন্দোলনের খতম। এখানে প্রশ্ন দাড়িয়েছে নির্বাচন হবে, না নির্বাচন বয়কট। শ্লোগান কী হবে- খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন হবে না।

দ্বন্দ্বের ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে, কিভাবে শাসকদলে বৈরিতা করছে, করবে? নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় শক্তির সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে সরকারী কর্মচারীদের আগাম পুরস্কৃত করা হচ্ছে, গত দু’আমলে একদল উপকারভোগী তৈরী হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সফল যাত্রা শুরু হবে কি? রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এখন বর্তমান বাইরের ও ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। আপাতত: সকল অনুগত, সকল নিয়ন্ত্রিত নাগরিক কিন্তু সকলের চিন্তা, মনন প্রক্রিয়া, রাগ হিংসা নিয়ন্ত্রন পরিধির বাইরে থেকে যায়, এখানেই ভয়। এই ভীতি  শুধু যে শাসকদলের তাই নয়, জনগণেরও। কারণ চাপা রাগ-হিংসা বিষ্ফোরণ খুবই বিপজ্জনক হয় সকলের জন্যই।

 

 

শিষ্টাচার মিথ্যাচার অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু:

এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিনে সাড়ে ছয়টা মিথ্যা কথা বলেন! অবাক হচ্ছেন তো? তথ্যটি ওয়াশিংটন পোষ্টের একটি জরীপের। তাদের হিসেব অনুযায়ী ক্ষমতারোহনের ৪৬৬ দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৩ হাজার ১টি মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনের গড় ৬ দশমিক ৪। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১’শ দিনে তার মিথ্যা বলার হার ৪ দশমিক ৯। কিন্তু গত এপ্রিল-মে মাসে এই হার বেড়েছে দ্বিগুন। অর্থাৎ দিনে ৯টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনের পোষ্টের পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, অনেক মিথ্যা আছে যা তিনি বারবার বলছেন। এরকম ১১৩ টি মিথ্যা রয়েছে – যা ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন। উপসংহারে বলা হয়, শাসনকাল যত পুরানো হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের মিথ্যা বলা তত বাড়ছে। সিএনএন ভাষ্যকার ক্রিস সিলিজার জানাচ্ছেন, ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলেন এমন কোন প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় আগে কখনও ছিলেন না। জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা দিনে কতবার মিথ্যা বলেছেন তার হিসেব কেউ রাখেনি। কারন ট্রাম্পের মত তারা কেউ মিথ্যা বলতে এবং সেই মিথ্যা বারবার আওড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন না।

ট্রাম্প যা বলেছেন তার মধ্যে মিথ্যা আবিস্কৃত হচ্ছে এবং গণমাধ্যম তা জানিয়ে দিচ্ছে। কারন সে দেশে রয়েছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের দায়। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রেসিডেন্টের মিথ্যাকেও সনাক্ত করার সক্ষমতা  পেয়েছে। গণতন্ত্র চর্চার ফল হিসেবে গণমাধ্যম সত্য সংবাদ পরিবেশনে কাউকে পরোয়া করছে না। বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠানসমুহ দুর্বলতর হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। বিপরীতে কর্তৃত্ববাদ প্রধান হয়ে উঠেছে।

এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র যেহেতু সবসময় ব্যক্তিমুখীন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলিও ব্যক্তির মুখের দিকে চেয়ে  বলতে ও চলতে অভ্যস্থ। শক্তিমান নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনস্বার্থের বদলে এখন ব্যক্তি ও দলকে সন্তষ্ট করার সাংবাদিকতা সবকিছু ছাপিয়ে উঠছে। ফলে শীর্ষ ব্যক্তিদের কথিত সত্যভাষণ জনমানুষকে খুশি করছে না ব্যথিত করছে-এই প্রশ্ন গণমাধ্যম তুলতে সক্ষম নয়। বরং তারা সামিল হয়েছেন, ক্ষমতার সাথে ইদুর-বেড়াল খেলায়। রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতা ও স্থিতিশীলতার অভাবই কী এইসব রাজনৈতিক-সামাজিক মনোবৈকল্যের কারন?

দুই. প্রাচীন কবিরা বলে গেছেন, “যে কহে বিস্তর, মিথ্যা কহে বিস্তর”। আবার চালু প্রবাদটি হচ্ছে, “কথায় কথা বাড়ে”। সেসব কথার কতটুকু সত্য-কতটুকু মিথ্যা তাও বিবেচনা ও প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের রাজনৈতিক নেতারা কথা বলতে ভালবাসেন। এমনকি সেসব কথা দল বা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও পরোয়া নেই। কথা বলতেই হবে। জনগনও কথা শুনতে ভালবাসে। শীর্ষে যারা থাকেন তাদের কথা মানুষ শোনে আগ্রহভরে। কারন কথামালার রাজনীতি এখানে জনপ্রিয়। নেতা কম কথা বলবেন এটি প্রত্যাশিত নয়। আর সরকার প্রধান বা দলপ্রধান হলে তো কথাই নেই!

রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক বিষয়ে মনোভাব বোঝা যায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য থেকে। প্রধানমন্ত্রী সবশেষ সংবাদ সম্মেলন করেছেন গত ২ মে ২০১৮ তারিখে। সেখানে তিনি কথা বলেছেন, সাম্প্রতিককালের বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে, বেশ খোলামেলাভাবে। তিনি কথা বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, সড়ক দুর্ঘটনা, আগত জাতীয় নির্বাচন এবং স্বভাবতই প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার কারাদন্ড নিয়ে। বলেছেন আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা নিয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার বলেছেন,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেলো তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)।

তিন. প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি  চুড়ান্ত সত্য ! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কি রাজীবের হাত হারানো এবং অন্তিমে মৃত্যু কিংবা গৃহকর্মীর পা হারানোর মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হয়েছে রাজীবকে। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

দেরী করেননি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেন “সড়ক পথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, আবার কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৮)।

অতিসম্প্রতি ঢাকায় একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি চাপায় একজন নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে সংসদ সদস্যের পুত্র গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেটি অস্বীকার করতে গিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ঐ সংসদ সদস্যের স্ত্রী, যিনি একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, যা বলেছেন তা প্রধানমন্ত্রীর কথারই প্রতিধ্বনি মাত্র। তিনি দাবি করেছেন, পথচারী সতর্ক না হলে ড্রাইভারের কি করার থাকতে পারে!

চার. গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

‘ন্যাশনাল কমিটি টু প্রোটেক্ট শিপিং, রোডস এ্যন্ড রেলওয়ে’ নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপোরোয়া গাড়ি চালনা। ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ক্রুটিপূর্ণ  যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

এবারের ঈদযাত্রায় ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় অপ্রতিরোধ্য গতি পেয়েছে দুর্ঘটনার মৃত্যু। শুধু সড়কে নয়, রেলপথ-নৌপথ, কল-কারখানা সর্বত্রই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না, কারন তারা সংগঠিত। এসব সংগঠনের সাথে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ ব্যক্তিরা যুক্ত থাকে, সমর্থনও থাকে। কোন ব্যবস্থার সূচনা ঘটলেই ধর্মঘট, অবরোধসহ দেশকে তারা জিম্মি করে ফেলে।

সরকারপক্ষ, যখনই যারা ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে পরিবহন সেক্টর এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করছে। সরকার থেকে দায়িত্বশীল কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফল হয়েছে ব্যক্তিখাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা সঙ্গী করে। রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের নিয়ে মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তুলছে, মালিক হচ্ছে বিপুল অর্থ-বিত্তের।

এই বিশৃঙ্খল অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে সড়কে মানুষ মরছে। পৃথিবীতে দুর্ঘটনা বন্ধের কথা না ভাবা হলেও কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। কিন্তু এই দেশে সেটি তো দুরে থাক, বিশৃঙ্খল ও মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত করে একটি সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও কি আছে?

নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকার-১ : ‘ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি অশুভ ও অলুক্ষণে ঘটনা’

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। মানব ইতিহাসে যাদের উদ্ধৃতি সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত হয়েছে, তাদের অন্যতম এই চমস্কি। তাকে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনকও বলা হয়ে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তার সোচ্চার ভূমিকা তাকে লাইমলাইটে এনে দিয়েছিল। তার ১৯৬৭ সালের যুদ্ধবিরোধী রচনা ‘দি রেসপনসিবিলিটি অব ইন্টিলেকচুয়ালস’ ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এখনো তার রচনাটি ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত। তবে এর জন্য তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার কারণে তাকে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার বরণ করতে হয়, এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কুখ্যাত ‘শত্রু  তালিকায়’ও তার নাম ছিল।

তার ভূমিকার কারণে পূর্ব তিমুরসহ অনেক দেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছিল, অনেক স্থানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি এখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, নব্যউদারবাদ, সমসাময়িক পুঁজিবাদ, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন ইত্যাদি বিষয়ে সোচ্চার। ২০১১ সালে তিনি সিডনি পিস প্রাইজে ভূষিত হন।

তিনি বই লিখেছেন শতাধিক। এসবের মধ্যে রয়েছে আমেরিকান পাওয়া অ্যান্ড দি নিউ ম্যান্ডারিন্স, ফর রিজন্স অব স্টেট, ম্যানুফেকচারিক কনসেন্ট : দি পলিটিক্যাল ইকোনমিস অব দি মাস মিডিয়া, দি অ্যাবুইস অব পাওয়ার অ্যান্ড দি অ্যাসাল্ট অন ডেমোক্র্যাসি

বর্তমানে চমস্কি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইনস্টিটিউট প্রসেফর এমেরিটাস ও ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার লরেট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৮৯ বছর বয়সেও চমস্কি ক্লান্তিহীন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, ন্যায়বিচার ও শান্তি কামনায় আগ্রহী।

সম্প্রতি তিনি জিপসন জন ও জিথেশ পিএমকে একটি বিশেষ সাক্ষাতকার দিয়েছেন। এতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল, ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি প্রদান, মার্কিন শক্তির পতন, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, ল্যাতিন আমেরিকান বাম, পোপ ফ্রান্সিস, ইসলামফোবিয়া, সিরিয়া যুদ্ধ, ইরানের সাথে পরমাণু যুদ্ধ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বের হয়ে যাওয়া, বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। এখানে তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো। ফ্রন্টলাইন ইন্ডিয়া থেকে বিশেষ সাক্ষাতকারটির বাংলা অনুবাদ করেছেন-হাসান শরীফ

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল :

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের শেষ নির্বাচনের সময় আপনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল নিয়ে বিশ্বের চরমভাবে আতঙ্কিত হওয়া উচিত।’ এখন তিনি হোয়াইট হাউস দখল করে আছেন। তার নীতি ও ঘোষণাগুলো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব ও করপোরেট এজেন্ডার সমন্বিত রূপেরই প্রতিনিধিত্ব করে। অনেকে তাকে হোয়াইট হাউসের ‘দানব’ পর্যন্ত বলে থাকে। তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বিশ্বের জন্যও কোন বিপদ নিয়ে আসছেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পূর্বসূরীদের থেকে তার ‘পার্থক্য’ কোথায়?

নোয়াম চমস্কি : এককভাবে সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো-সত্যিকারের অস্তিত্বগত সঙ্কট বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান। এই মারাত্মক হুমকিটি মোকাবিলা করতে অবশিষ্ট বিশ্ব অন্তত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপ পর্যাপ্ত না হলেও অন্তত কিছু তো করেছে। একই কথা প্রযোজ্য কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের কিছু এলাকার ক্ষেত্রেও। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে রিপাবলিকান এস্টাবলিশমেন্টের সার্বিক সমর্থনে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ শক্তিশালী ফেডারেল সরকার কেবল এসব প্রয়াস থেকে প্রত্যাহারই করেনি, সেইসাথে ধ্বংস প্রতিযোগিতা বেগবান করতে সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হয়েছে। এটি স্তম্ভিত করার মতো ঘটনা। বিধ্বংস শক্তি এখন অনেক দূরে ছুটে চলেছে।

প্রশ্ন : ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ট্রাম্পের ঘোষণাটির ফলে মনে হচ্ছে শান্তিপ্রক্রিয়া ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প এর মাধ্যমে কোন বার্তা দিতে চাচ্ছেন? এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রচেষ্টায় এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বড় ধরনের আঘাত না হলেও ‘শান্তিপ্রক্রিয়া’ তেমনভাবে সক্রিয় ছিল না। আমার মনে হয়, অনেকটা ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘাঁটি ও তহবিল দাতাদের অনেকেই পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ সম্প্রসারণের আবেগময়ী সমর্থক।

প্রশ্ন : আগে আপনি লিখেছিলেন, বিশ্বব্যাপী মার্কিন শক্তির পতন ঘটছে। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কাঠামোগত কোন ধরনের পরিবর্তন ঘটছে? আমরা কি বহু মেরুর বিশ্বের দিকে যাচ্ছি?

নোয়াম চমস্কি : আমেরিকার জাতীয় শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে (ঐতিহাসিকভাবে নজিরবিহীন) সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছে। তার ক্ষয় শুরু হয়- যাকে বলা হয়ে থাকে- ‘চীনকে হারানো’র মাধ্যমে। এটি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। অন্যান্য শিল্প সমাজ যুদ্ধকালীন বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়ায় এবং উপনিবেশমুক্তকরণ যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় বিশ্বসমাজ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল তিনটি মেরুতে পরিণত হয়। এর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উত্তর আমেরিকা, দ্বিতীয়টি জার্মানভিত্তিক ইউরোপ এবং তৃতীয়টি ছিল জাপানভিত্তিক উত্তর-পূর্ব এশিয়া। চীনের উত্থানের ফলে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বে ক্ষয় আরো বাড়ে। বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে চীনে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে মারাত্মক কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে চীন এখনো গরিব দেশ। আবার সামরিক খাতসহ কয়েকটি বিষয়ে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব বহাল রয়ে গেছে। আবার এই কথাও মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে জাতীয় হিসাব এখন আগের চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে বৈশ্বিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা ২০ ভাগেরও কম হলেও, মার্কিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিমে।বর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। জোর দিয়ে বলা যায়, এগুলো একটি জটিল চিত্রের কেবল অবয়বটুকুই প্রকাশ করছে।

ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব :

প্রশ্ন :বিশ্বের  প্রায় সব অংশে আমরা ডানপন্থী শক্তির আতঙ্কজনক বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে টি পার্টি মুভমেন্ট, ভারতে সংঘ পরিবার, ফ্রান্সে লে পেনের ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট এবং বিভিন্ন দেশে নানা ইসলামি দল শক্তি বাড়াচ্ছে। মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ অধ্যাপক সামির আমিন এই শক্তি বৃদ্ধিকে ‘সমসাময়িক পুঁজিবাদে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আপনি কি ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব নিয়ে এই শঙ্কার সাথে একমত?

নোয়াম চমস্কি : রাজনৈতিক আলোচনার বেশির ভাগ পরিভাষার মতো ‘ফ্যাসিবাদ’ও যথাযথ পরিভাষা নয়। ফ্যাসিবাদী সরকার ও সংস্থাগুলোর তৎপরতার কারণে সহজাতভাবে এটি এখন একেবারে অসহ্যকর একটি সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে। অনেক অনেক আগে পরিভাষাটি আরো যুৎসই প্রায়োগিক অর্থ প্রকাশ করত। উদাহরণ হিসেবে ভেবলেনবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ রবার্ট ব্রাডির কথা বলা যায়। তিনি ১৯৩০-এর দশকজুড়ে ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলোর আলোকে পরিভাষাটি দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজগুলোর অবস্থা বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিভাষাটি যতটা না কার্যকর, তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী।

বর্তমান সময়ে ডানপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি অশুভ ও অলুক্ষণে ঘটনা। এমনকি ওই পরিভাষাটি যদি ব্যবহার করা না হয়, তবুও। বিষয়টিকে শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাম্প্রতিক নির্বাচনে নব্য-উদারবাদী সময়ে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পতনের আলোকে বিশ্লেষণ করা উচিত।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রে [বার্নি] স্যান্ডার্সের আন্দোলন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু বিপুল তহবিলপুষ্ট প্রচারণা ও ব্যাপক মিডিয়া সমর্থনে এক বিলিয়নিয়ারের জয়ের ঘটনাটি নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল স্যান্ডার্সের প্রচার-তৎপরতা। তিনি ভোট কেনাবেচার দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ভেঙে দিয়েছেন।

বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ টমাস ফারগুসন। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তি শক্তির অনেক উপাদানের একটি তহবিল সংগ্রহ নির্বাচনে জয়ের একটি শক্তিশালী নির্ধারক। স্যান্ডার্সের ব্যক্তিগত সম্পদ বা করপোরট সম্পদ থেকে কোনো তহবিল সংগ্রহ করেননি, তার কোনো মিডিয়া সমর্থন ছিল না। তিনি সম্ভবত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন লাভ করতে এবং এমনকি নির্বাচনেও জয়ী হতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি দলের ব্যবস্থাপকদের কল-কাঠি নাড়ায়। তবে তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

এটি হলো নব্য-উদারবাদী যুগে মধ্যপন্থী প্রতিষ্ঠান ও তাদের নীতির প্রতি জনপ্রিয় বৈরিতার আরেকটি প্রকাশ। বিষয়টি অন্যান্য স্থানেও দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে জেরিমি করবিনের ব্রিটিশ লেবার পার্টির দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা যায়। যা ঘটছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য আগেকার আমল সম্পর্কে গ্রামসির পর্যবেক্ষণের কথা এখানে বলা যায় : ‘যখন পুরনোটি মরে যাচ্ছে; নতুনটি জন্ম নিতে পারছেনা- এই অন্তর্বর্তী অবস্থায় নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।’ তবে আমরা এর সাথে যোগ করে বলতে পারি, আশার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

প্রশ্ন : ভারতে হিন্দু ডানপন্থী শক্তির ভিন্নমতালম্বী কণ্ঠস্বরগুলোকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মোদি সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

নোয়াম চমস্কি : আমি এসব খবরের কিছু কিছু পড়েছি। এতে যা বোঝা যায়, তাতে নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে পরিস্থিতি জঘন্য। এতে মনে হচ্ছে, মোদি সরকার এসব অপরাধ সহ্য করে নিচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতে বর্তমান সরকার সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করা হলে জাতীয়তাবিরোধী অভিযোগ উত্থাপন ঘটতে পারে। লেখক অরুন্ধতী রায়, মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট ড. বিনায়ক সেন (২০১০) এবং আরো সাম্প্রতিক সময়ে জওহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন সরকার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছে। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদবিরোধীর মধ্যকার সীমারেখা আপনি কোথায় স্থান দেবেন?

জবাব : এটি আমার কাছে কোনো ইস্যু মনে হয় না। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা নিয়ে কেউ যে চিন্তাই করুক না কেন, মুক্ত সমাজে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ সুরক্ষিত ও সুস্পষ্ট থাকতে হবে।

জাতীয়তাবিরোধী তৎপরতার’ অভিযোগ চরমভাবে ভয়াবহ।

(অসমাপ্ত)

উদার গণতন্ত্রের তিন সঙ্কট

গনেশ সীতারামন

গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : আসিফ হাসান

গত কয়েক বছর ধরেই আমি ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের ২০০৫ সালে কেনিয়ন কলেজে দেওয়া উদ্বোধনী বক্তৃতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ওয়ালেস দুটি মাছের সাঁতার কাটার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন। পাশ দিয়ে আরেকটি বড় মাছ সাঁতরে যাওয়ার সময় বলল, ‘সুপ্রভাত বাছারা, পানি কেমন?’ বড় মাছটা দূরে চলে যাওয়ার পর একটি অপরটিকে বলল, ‘আজব কথা, পানি আবার কেমন হবে?’

কোন জিনিসটা ট্রাম্পের আর বেক্সিটের ভোটারদের নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে অনেক আলোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে পড়ছে দেখে উদ্বেগেরও সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক লোক টুইটার-ঝড় থেকে টুইটার-ঝড়ে দৌড়ঝাঁপ করতে থাকায় পানিতে কী হচ্ছে- অর্থাৎ বৈশ্বিক  গণতন্ত্রের সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার মূল কারণের প্রতি নজর পড়ছে তুলনামূলকভাবে কম।

ইয়াসচা মনকের অনন্য গ্রন্থ ‘দ্য পিপল ভার্সেস ডেমোক্র্যাসি’তে উদার গণতন্ত্র কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টির স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, বোধগম্য ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ওই পরিবেশ নস্যাতই কেনো বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রের বর্তমান সঙ্কটের উৎস তা জানিয়েছেন। উদার গণতন্ত্র যে পানিতে সাঁতার কাটে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অচিন্তনীয় বলে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন।

মনক দেখিয়েছেন, উদার গণতন্ত্রের সফলতা ও স্থিতিশীলতা সমাজজীবন-সম্পর্কিত তিনটি ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রথমত, নাগরিকেরা তুলনামূলকভাবে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিল। কারণ, সম্প্রচার করা খবর, সংবাদপত্র, রেডিও ইত্যাদি সবই ছিল এককেন্দ্রিক অনেক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে দ্বাররক্ষকেরা খবর ও তথ্যকে মূলধারার মধ্যে থাকা নিশ্চিত করত। এর অর্থ হলো, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ও অভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অভিন্ন কথাবার্তা বলত।

দ্বিতীয় ধারণাটি ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও তুলনামূলক অর্থনৈতিক সাম্যতা। বিশ^ ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ই মূলত কোনোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল না। কেবল শিল্প বিপ্লব সূচনায় প্রবৃদ্ধি আকাশচুম্বি হওয়ার পরই লোকজন উচ্চতর জীবনযাত্রার আকক্সক্ষা প্রকাশ করতে পেরেছিল। আর সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশকের মধ্যে প্রবৃদ্ধির সাথে নিম্ন পর্যায়ের অর্থনৈতিক বৈষম্যের অর্থ ছিল এই যে, উচ্ছসিত জোয়ারে সত্যিকার অর্থেই সব নৌকাকেই উপরে ওঠেছিল।

আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।

আর চূড়ান্ত ধারণা ছিল সামাজিক সমরূপতা। মনক যুক্তি দিচ্ছেন, বিশ্ব জুড়ে স্থিতিশীল উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে চোখে পড়ার মতো তুলনামূলক সমরূপ জনসংখ্যা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপে গণতন্ত্রের উত্থান ও বহুভাষিক অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্প্রাজ্যের মতো সাম্রাজ্যগুলোর ভাঙন ছিল ওতপ্রোতভাবে জাতীয়তাবাদের সাথে সম্পর্কিত।

মনক বলছেন, গত প্রজন্মে এবং বিশেষ করে গত বছর ১৫ সময়কালে ওই তিনটি ধারণাই মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়েছে। সামাজিক মিডিয়া যেকোনো ব্যক্তিকে সম্প্রচারকারীতে পরিণত করেছে, লোকজন যে খবর, তথ্য ও মতামত শুনতে চায়, তাদেরকে কেবল তা-ই শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে এটি চরমপন্থী ও প্রান্তিক আদর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ সম্প্রসারিত করেছে। এক প্রজন্ম ধরে গড়পড়তা শ্রমিকের প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে রয়েছে, লোকজন আশঙ্কা করছে যে তাদের সন্তানের প্রজন্ম আর্থিকভাবে স্থবির হয়ে পড়বে। পরিশেষে বলা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে অভিবাসন বাড়তে থাকায় বিশেষভাবে যেসব এলাকায় দ্রুত বৈচিত্র্য বাড়ছে, সেসব স্থানে চরমপন্থা ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

মনকের মতে, এর পরিণতিতে উদার গণতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। আমরা ‘অনুদার গণতন্ত্রের’ উত্থান দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ সরকারগুলো জাতির ‘সত্যিকারের’ লোকজনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও ব্যক্তিগত অধিকার বা সাংবিধানিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করছে সামান্যই। অনেকে এসব আন্দোলনকে লোকরঞ্জক হিসেবে অভিহিত করছে। একইসাথে অন্যরা মনকের ভাষায় ‘অগণতান্ত্রিক উদারবাদের’ সাথে দহরম-মহরম করছে। এই ধরনের সরকারব্যবস্থায় অধিকার সংরক্ষিত থাকলেও তা হয় গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার মূল্যে। এটি অনেকটা এলিট টেকনোক্র্যাটদের পরিচালিত সরকারের মতো, সাধারণ মানুষের ওপর এদের আস্থা আছে সামান্যই।

আরো ঝামেলাপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুটি ব্যবস্থা একে অপরের শক্তি বাড়াচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের লেকচারার মনক এ নিয়ে খুব বেশি কথা না বললেও এই সময়ের জন্য এখানেই বিরাম নেওয়া ভালো। লোকরঞ্জকবাদীদের শক্তি সংগ্রহের সময়টিতে তাদের প্রতিপক্ষরা সম্ভবত অগণতান্ত্রিক উদারবাদের গুণাগুণ দেখছে। অগণতান্ত্রিক উদারবাদ শক্তিসঞ্চয় করলে অনেক সাধারণ মানুষের মনে খাচাবদ্ধ হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, সরকারি নীতি সাধারণ মানুষের দাবির প্রতি সাড়া দেয় না। ফলে তাদের মনে এলিটদের উৎখাত করার বাসনা জাগে। এমন অনিবার্য পরিস্থিতিতে যার পরাজয় অবধারিত হয়ে যায় তা হলো উদার গণতন্ত্র।

মনকের বইটির সবচেয়ে বড় একটি শক্তি হলো এই যে তিনি সহজ, একক ব্যাখ্যার ওপর অবস্থান করেছেন। এর ফলে সমাধান পাওয়া গেছে সহজেই। উদার গণতন্ত্রকে তার শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য মনক তিনটি নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম বণ্টন দূর করা ও প্রযুক্তিগত এবং বিশ্বায়ণের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডাই হবে সবচেয়ে বড় সমাধান। ন্যূনতম কার্যকর সমাধান- সম্ভবত এটিই সবচেয়ে কঠিন- হবে এমন এজেন্ডা তৈরি যা ‘নাগরিক বিশ্বাস,’ তথ্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা, নাগরিক সৌজন্যতাবিষয়ক আমাদের অনুভূতি ফিরিয়ে আনবে। এই বিষয়ে আরো নজর দেওয়া উচিত। কারণ যে প্রান্তিক সমাজে খুব কম লোকই বাস্তবতা অনুসরণ করে এবং যেখানে নাগরিক শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে, সেখানে নীতিগত পরিবর্তন সাধন কিভাবে সম্ভব তা অস্পষ্ট।

অবশ্য সবচেয়ে আগ্রহ সৃষ্টিকারী পরামর্শ সম্ভবত নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদের কল্পনা করা। মনক একে অভিহিত করেছেন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ।’ প্রান্তিকতাপূর্ণ জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রতি সাড়া দেওয়ার বদলে স্বপ্নিল বহুজাতিকতার এগিয়ে যেতে হবে। মনক বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন ‘পরিশীলিত জাতীয়তাবাদের’। তিনি সমন্বিত সমাজের একটি স্বপ্নদর্শনও প্রস্তাব করেছেন। এখানে জাতীয়তাবাদ লোকজনকে বিভক্ত না করে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

যারা গড্ডালিকা প্রবাহ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করে, তাদের কাজে এই এজেন্ডার তিনটি অংশই অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক সংস্কার সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী লোকজন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। নাগরিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার অর্থ হলে সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গোত্রবাদ ভেঙে ফেলা। অন্তর্ভুক্তমূলক জাতীয়তাবাদ ডান ও বাম উভয় ধরনের বাগাড়ম্বড়তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।

মধ্যবিত্তের উপরে অর্থমন্ত্রীর কেনো এতো গোস্বা?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল খুব একটা নেই। বাজেট কখন উত্থাপিত হয়, কখন পাস হয়, সাধারণ নাগরিকরা তা নিয়ে ভাবেন না; অনেক সময় খোঁজখবরও রাখেন না। তবে সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা হচ্ছে কোন কোন জিনিষের দাম সরকার বাড়ালো, কিংবা কতো টাকার আর্থিক চপ বেেস পড়লো । এছাড়া তখনই চিন্তাটা দেখা দেয় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আবার একশ্রেণির ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার আগেই বাজারে সংকেত দেওয়া শুরু করে বাজেট আসন, দাম  বাড়বে! ওসব ব্যবসায়ী বাজেট পাসের আগেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনার পর বাজেট ভাবনাকে আর অগ্রাহ্য করেনা।

সাধারণত মধ্যবিত্ত হিসেবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীর সেই অংশকে বিবেচনা করা হয়, যারা সীমিত আয়ের জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশে পেশা বিচার করলে এদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, গবেষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ছোট ঠিকাদার, গ্রামীণ উদ্যোক্তা এবং মাঝারি কৃষকেরা পড়েন।

বাজেটের বিশাল আকারের ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ বাজেটের মূল লক্ষ্যবস্তু যেহেতু প্রবৃদ্ধি সেহেতু এর আকার ওই টার্গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। প্রবৃদ্ধি ভিন্ন এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি পুরোনো কথা। নতুন কথা হলো, প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয় এবং প্রবৃদ্ধি নিজে গিয়ে সব মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটবে না বা  তাদের জন্য উন্নয়ন আসবে না। সেজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও  বণ্টনমূলক ব্যবস্থা।

বাজেটে সাধারণ জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে- স্থানীয় মধ্যবিত্ত যেসব পণ্যের চিহ্নিত গ্রাহক বাজেট বক্তৃতায় সেগুলোর ওপর বাড়তি করারোপের উল্লে¬খ করেছেন অর্থমন্ত্রী। নানা সেবাকেও ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে সরকারের। বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেই এমন উদ্যোগ। এটি অসহায় বাস্তবতা যে, চ‚ড়ান্ত বিচারে সিংহভাগ ভ্যাট মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকেই গুনতে হবে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে এবার। তেমন কোনো প্রস্তাব আসেনি। তার মানে আয়করের প্রধান টার্গেটও ওই মধ্যবিত্তই এবং এক্ষেত্রে আহরণ সুবিধাই প্রধান বিবেচ্য বলে প্রতীয়মান। অথচ প্রয়োজন ছিল আয়করের ক্ষেত্রে আয়ের উচ্চস্তরে জোরটা বেশি দেওয়ার । মধ্যবিত্তকে কর বেশি দিতে হয়, এ নিয়ে কারও আক্ষেপ থাকা উচিত নয়। কেননা গুটিকয়েক দেশ বাদ দিলে সাধারণভাবে মধ্যবিত্তরাই সর্বজনীন বৃহত্তম করদাতা (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর) গোষ্ঠী এবং অর্থনীতির মেরুদন্ড ।

প্রস্তাবিত বাজেটে সিটি করপোরেশন এলাকার কারও যদি আট হাজার বর্গফুট বা এর বেশি আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাহলে ওই বাড়িওয়ালার আয়করের ওপর সারচার্জ বসবে। এই সারচাজের্র পরিমাণ ওই বাড়িওয়ালার আয়ের ১০ শতাংশ বা কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। বাড়িওয়ালা স্বাভাবিকভাবেই নিজের খরচ কমাতে ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন।

মধ্যবিত্তদের যাতায়াতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনতে শুরু করেছিল রাইড শেয়ারিং উবার, পাঠাওয়ের মতো গাড়ি ও মোটরসাইকেল। উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বসিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমনকি এসব রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ওপর ৩ থেকে ৪ শতাংশ উৎসে করও বসানো হয়েছে। এতে এসবের সেবা নেওয়ার খরচ বাড়বে।

কর বসেছে পোশাকেও। দেশি ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ কিনতে এখন থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে। আগে ভ্যাট ছিল ৪ শতাংশ, এখন হয়েছে ৫ শতাংশ। খরচের কথা চিন্তা করে দেশি ব্র্যান্ডের পোশাক বাদ দিলেও রক্ষা নেই। বড় দোকান থেকে জামাকাপড় কিনলেও ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে, যা আগে ছিল না।

বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন সব মধ্যবিত্তেরই থাকে। কিন্তু এই বাজেটের পর ছোট ফ্ল্যাট কিনতে গেলে খরচ বাড়বে। ১১০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাটে ভ্যাট দেড় থেকে দুই শতাংশ আরোপ করা হয়েছে। এতে ৫০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে অন্তত ২৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হবে। আবার নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, রিকন্ডিশন্ড গাড়িতেই ভরসা মধ্যবিত্তের। বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয়ন সুবিধাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতে গাড়ির দাম বাড়বে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শিগগিরই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাবেন। আবার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগও কমানো হয়েছে।

নৈরাজ্যের ব্যাংকিংখাতের উল্টো নীতিতে চলছে সরকার। পরিবারের পরিচালক সংখ্যা ও মেয়াদ আগেই বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ কোন সুবিধা পাবে না। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারাও কোনো সুবিধা পাবেন না। এই ছাড়ের কারণে বৃহৎ করদাতাদের কাছ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য বন্ধ না করে, ব্যাংক ব্যবসায়ীদের চাপে করপোরেট কর হার কমানোর সিদ্ধান্ত অনিয়মকে আরো উস্কে দেবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এখন সবচেয়ে দুর্বলতম দিক চলতি হিসাব ঘাটতি। বৈদেশিক বিনিময়ের লেনদেন কাঠামো। বর্তমানে মেগাপ্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যাপক আমদানি করা হচ্ছে। তাছাড়া আমদানির মাধ্যমে বাইরে অর্থ পাচারও হচ্ছে। এসব যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে টাকার মূল্যমানের উপর চাপ সৃষ্টি হবে।

চলতি হিসাবের ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বাজেটে কিছু বলা হয়নি। আমদানি ব্যয় গড়ে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ার ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ডলারের বিনিময় মূল্য স্থিতিশীল না থাকলে বাণিজ্য ভারসাম্য নষ্ট হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থ পাচারের আশঙ্কাও থেকে যায়।

যুগে যুগে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় উন্নয়নে মধ্যবিত্তের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের দেশও এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। কেননা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ সুষ্ঠু চিন্তার ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মধ্যবিত্তের একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রের মৌল-কাঠামো অর্থনীতি কার্যত রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামাজিক উন্নয়নের সূচক বৃদ্ধি করে। তখন মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও যে তিনটি ভিত্তি ছিল অর্থাৎ মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার- তা এখনো পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি যে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি নিরন্তর জীবন-সংগ্রাম করে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল- সেটাও আজ এক ধরনের সংকটে নিপতিত।  একই সঙ্গে সমাজের স্থিতি ও পরিশুদ্ধ সামাজিক সংস্কার যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে হয়, নানা আর্থিক টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আজ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ সামাজিক ঐতিহ্যসম্পন্ন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বজনরা হচ্ছে অবহেলিত, উপেক্ষিত। রাষ্ট্রে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে আর্থিক শৃংখলা না থাকায় প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কতিপয় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। এতে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।  ফলে এই কোঠারিভুক্ত স্বার্থান্বেষী সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তারা খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে মধ্যবিত্তসহ সাধারন মানুষ।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ- ৩ :: প্রকল্পে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন !

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে কিছু সহায়তা নিচ্ছে। এর একটা বড় অংশ জাতীয় পরমাণু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি। পাশাপাশি রূপপুর প্রকল্পের জন্যও জনবল প্রশিক্ষণসহ কিছু সহায়তার বিষয় আছে। এর বাইরে রাশিয়াও রূপপুর প্রকল্পের মৌলিক কাজে রাশিয়াকে যুক্ত করেছে। ফলে ভারতের অংশগ্রহণ হয়ে উঠছে সার্বিক।

এ ধরণের একটি পরিকল্পনা ভারতের ছিল। রাশিয়ার ছিল আগ্রহ। গত ১ মার্চ (২০১৮) মস্কোতে বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) সই হয়েছে তা এই দুয়েরই ফল। এর মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার সহযোগিতার সম্পর্ক যেমন নুতন মাত্রা পেল তেমনি ভূ-রাজনীতির মঞ্চে ও আন্তর্জাতিক পরমাণু ক্লাবে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলো। এর মাধ্যমে ভারত চীনকেও বাগে রাখতে রাশিয়াকে পাশে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে এই সমঝোতার অংশ হয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে বা করতে চাচ্ছে সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি।

ওই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ভারত শুধু যে তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং প্রকল্পের জন্য পরামর্শ সেবা দিয়ে সহায়তা করবে তা নয়। প্রকল্পের স্বার্থে ভারতীয় কোম্পানিগুলো প্রকল্পের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন, এমনকি ভারতে উৎপাদিত কিছু সামগ্রী (ম্যাটেরিয়াল) এবং কিছু কিছু যন্ত্রপাতিও (নন-ক্রিটিক্যাল ক্যাটাগরি) সরবরাহ করবে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর রোসাতোমের উপ মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) নিকোলাই স্পাস্কি এক বিবৃতিতে এ সব কথা বলেছেন। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ এবং ভারতের কিছু কিছু গণমাধ্যম এই খবর প্রকাশ করেছে। ওই সমঝোতা স্মারকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন মস্কোতে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সাইফুল হক, মস্কোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত পংকজ শরণ এবং রোসাতোম তথা রাশিয়ার পক্ষে নিকোলাই স্পাস্কি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) কাজ করেছেন এধরনের কয়েকজন পেশাজীবী  বলেছেন, ভারত পৃথিবীর পরমাণু বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ (এনএসজি)-এর সদস্য নয়। এই গ্রুপের সদস্য ছাড়া কোনো দেশ পরমাণু চুল্লি (রিঅ্যাক্টর) নির্মাণে সরাসরি অংশ নিতে পারে না।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) অনুযায়ী, প্রকল্পের পূর্ণ (এ টু জেড) বাস্তবায়নের দায়িত্ব রোসাতোম তথা রাশিয়ার। অর্থাৎ এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতির নকশা প্রণয়ন, উৎপাদন, সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ তাঁদেরই করার কথা। তাই এ সব কাজে অন্য কোনো দেশ বা তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করা বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ কিনা এনিয়ে আইনগত প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া, তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা সামগ্রীর মান ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী নিশ্চিত হবে কিনা, এ সব সামগ্রির দাম ওই চুক্তিতে ধরা দামের সমান হবে কিনা- এ সব প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে।

তবে ত্রিদেশীয় সমঝোতা স্মারক হওয়ায় বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী, কোম্পানি ও চুক্তি আইনে অভিজ্ঞ তানজীব-উল আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, ক্রেতার (বাংলাদেশ) যদি কোনো আপত্তি না থাকে, প্রকল্পের ক্রেতা যদি তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ মেনে নেয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তির বরখেলাপ বা আইনের ব্যত্যয় হবে না।

আর তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা জিনিসপত্রের মান ও দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী, যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৩০ বছর কর্মকাল শেষে অবসর নেওয়া মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করার কথা রাশিয়ার। ভারতের সরবরাহ করা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতির কারণে, তা যতই মাইনর হোক না কেন, যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তার দায় কে নেবে? বাংলাদেশ, রাশিয়া নাকি ভারত?’

মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও এর কিছু সামগ্রি তৈরিতে ভারত অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রয়োজন হলে আমরা আলাদাভাবে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে সে সব বিষয়ে সহায়তা নিতে পারি। জনবল প্রশিক্ষনসহ কিছু কিছু বিষয়ে তা নেওয়াও হবে বলে দুই দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সমঝোতা হয়ে আছে। এর বাইরে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কোনো চুক্তির আওতায় আমরা ভারতের সহায়তা নেব কেন? তাহলে তো রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তি সংশোধন করে নেওয়া উচিৎ।’

রূপপুর প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে বলেন রোসাতোমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্সি লিখাচেভ। গত বছর জুন মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে রূপপুর সংক্রান্ত এক আলোচনায় লিখাচেভ বলেন, ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনের সময় ভারতের পক্ষ থেকে তাঁদের দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের ধারণাটি উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেনি।

এরপর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আইএইএর সাধারণ সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণকারী উর্ধতন কর্মকর্তারা রূপপুর প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ সামগ্রি (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস) সরবরাহের প্রস্তাব দেন। ‘রোসাতোম নিউজলেটার বাংলাদেশ’-এর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের সংখ্যায় (ইস্যু ০০৮) এই খবর প্রকাশিতও হয়েছে।

ওই সময় ভারতের ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর এক খবরে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কিভাবে একটি অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে রাশিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে ভারত। বিদেশের মাটিতে রূপপুরই হবে ভারতের প্রথম কোনো পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহন।

২০১৪ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার ‘স্ট্রাটেজিক ভিশন ফর স্ট্রেনদেনিং কো-অপারেশন ইন পিসফুল ইউসেজ অফ অ্যাটমিক এনার্জি’-তে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশে রাশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সেখানে ভারতের নির্মাণ সামগ্রি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সেবা প্রদান করা যায় কিনা দুই দেশ তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবে। গত ১ মর্চের এমওইউ এই স্ট্রাটেজি (কৌশল) বাস্তবায়নের মাধ্যম হতে যাচ্ছে।

গত বছর (২০১৭) এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও উন্নয়নে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে তার আওতায় ভারতের কাছ থেকে রূপপুর প্রকল্পের জন্য পরামর্শক সেবা নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশী পেশাজীবীরা তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরুও করেছেন।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পের জন্য সরকার ভারতের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ (জিসিএনইপি)’-এর কাছ থেকে পরামর্শক সেবাও নিতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে জিসিএনইপির সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি সই হওয়ার কথা। এগুলো সবই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে রাশিয়া রূপপুর প্রকল্পে তাঁদের কাজের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করার জন্য ১ মার্চের এমওইউ করেছে যার অংশ হয়েছে বাংলাদেশ।

রূপপুর প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ‘ইউরেশিয়ারিভিউ ডট কম’ নামের একটি ইন্টারনেটভিত্তিক পত্রিকায় বলা হয়েছে, ভারতের জন্য এই সমঝোতা স্মারক অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, রূপপুর প্রকল্পে অংশগ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ভারত এক্সপোজার পাবে। রুশ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে প্রকল্পের সকল পর্যায়ের নির্মাণকাজে অংশ নিতে পারবে যা ভবিষ্যতে ভারতকে রুশ প্রকৌশলী ও বাংলাদেশের পেশাজীবীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য সম্পর্কে জানা এবং সে সব তথ্য ব্যবহারের সামর্থ্য অর্জিত হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। এই অভিজ্ঞতা তাঁরা অন্য দেশেও কাজে লাগাতে পারবে। মোট কথা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘নলেজ পার্টনার’ হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অঙ্গনে ভারত একটি দায়িত্ব সম্পন্ন দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানকার অভিজ্ঞতা নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সদস্যপদ পেতে সহায়ক হবে। সব জেনে-বুঝেই ভারত সুপরিকল্পিতভাবে রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার সঙ্গী হয়েছে।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ১২৬৮ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে বাংলাদেশ-রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তিতে। এই ব্যয়ের ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। তবে এর বাইরেও, এই প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের জন্য আরও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা।