Home » বিশেষ নিবন্ধ (page 7)

বিশেষ নিবন্ধ

বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতা : রাষ্ট্রে মানুষে বিরোধ চরমে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

বিচ্ছিন্নতা মঙ্গলময় নয়। অনিশ্চিত ভয়ের জগৎ, বড় বিপদের। গনতান্ত্রিক রাজনীতি এবং বহুত্ববাদী সমাজ রাষ্ট্র এজন্যই যে, মানুষে মানুষে মেলবন্ধ তৈরী করে ন্যায্য রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে। কিন্ত রাষ্ট্রের শাসকদের মূল লক্ষ্যই হয় ক্ষমতা এবং অধিকতর ক্ষমতা, আর  শাসকরাই বিচ্ছিন্নতা উস্কে দেয়। কারণ জনগণ বিচ্ছিন্ন থাকলে কর্তৃত্ববাদ জারি রাখা সহজ হয়। এটাই বিপদের মূল কথা। এটা শুধু রাষ্ট্রের  নয়, সমাজ ও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, সংযোগ কমছে। রাষ্ট্রের সাথে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানের সাথে মানুষের, সমাজের সাথে ব্যক্তির, এমনকি পরিবারের ভেতরেও বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। গণতান্ত্রিক সমাজ ভাঙছে, কর্তৃত্ববাদ, একনায়কতান্ত্রিকতা স্থান করে নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমুহের নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে মাফিয়া ডনদের হাতে। একটি ‘ঠিকাদারী’ সমাজ তৈরী হয়েছে-বিচ্ছিন্নতার ষোলকলা পূর্ণ করে।

ছোট-বড় নগরীর দিকে তাকান! খাল-বিল-জলাধার ভরাট ও দখলের মচ্ছব চলছে। মানুষ ক্রমাগত বিপদাপন্ন হচ্ছে। রাষ্ট্র-সমাজে মুক্তচর্চার জায়গাগুলি বদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে। চর্চা চলছে অন্ধত্বের-চরম ভাবাপন্নতায়। মানুষের মধ্যে বাড়ছে অসহনশীলতা। রাষ্ট্র-সরকার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে গণতন্ত্র-সুশাসন থেকে। কর্তৃত্ববাদের নিয়ন্ত্রণে বেড়ে ওঠা  বিচ্ছিন্নতায় অসহনশীলতার মাঝে সমাজ ক্রমশ: সহনশীলতা সম্প্রীতির জায়গা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে।

প্রযুক্তির বিকাশে ডিজিটালাইজেশনের ছাপ সর্বত্র। সংযুক্ত হবার পথ অনেক। বিকাশের সাথে সাথে বিকৃতিও ভর করছে। সংযোগের পথগুলি খুলে গেলেও ‘ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড’ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত করছে ‘ছোট মন’ নিয়ে, সমস্যার মূল সেখানেই। ‘ছোট মন’ নিয়ে বড় জাতি হয়ে ওঠা যায় না। বড় জাতি হয়ে উঠতে হলে সকল জনগনের জন্য বিস্তৃত ক্ষেত্র নির্মান করা প্রয়োজন। বড় এবং বহুমাত্রিকতায় ফিরে যাওয় এখন এই দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে।

গত কয়েক দশকে আলো ফেললেই অন্ধকার যাত্রার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। গণতন্ত্রের নামে নানা বিধি-নিষেধ আর নিয়ম বেধে প্রতিষ্ঠানগুলিতে জনগনের সুযোগ ও অভিগম্যতা সীমিত করা হয়েছে। সর্বত্র ‘সংরক্ষণের নামে বহুজনের অবাধ সুযোগকে প্রতিহত করে জনগণকে ‘প্রান্তিক’ করে দেয়া হয়েছে। প্রভাব পড়েছে অবকাঠামোগুলিতে। মানুষ বিচ্ছিন্ন বোধ করছে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে। সরকারের মদতে দখল এবং সংরক্ষণ চেষ্টার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতা উস্কে ফল হয়েছে দু’রকম; এক. বহুজনের সুযোগ ও অভিগম্যতাকে প্রতিহত করায় সুযোগ তৈরী হয়েছে কতিপয়ের। দুই. এই কতিপয়ের হাতে পূঞ্জীভূত  রাষ্ট্রের সকল সম্পদ, ক্ষমতার অনুষঙ্গ হিসেবে তৈরী হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা, অন্তিমে হত্যা-গুম- রক্তপাত। এই ‘কতিপয়’রা হচ্ছেন, ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতা কাঠামোয় যুক্ত সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, কথিত সুশীল সমাজ ইত্যাদি; এবং যথানিয়মে জনগন এদের থেকে যোজন যোজন দুরত্বে।

বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই বিপদজনক, অন্তত: জনগনের জন্য তো বটেই। কারন বিচ্ছিন্নতা সমাবেশহীন, জনমানবহীন ধূ-ধূ মরুপ্রান্তর। তাতে উৎসাহী হয়ে ওঠে অপরাধীরা। মানুষ যত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে, ততই প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাঁকিয়ে বসে অপরাধীরা। ক্ষমতাবানরা অবৈধ দখলে নিয়ে নেয় জনগনের প্রতিষ্ঠানসমূহ। গণতত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতা না থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় অপরাধীদের ভাগারে।

ব্যক্তির সাথে সমাজের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। আধুনিকতার নামে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পরিবারগুলি ভাঙছে-বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে; এমনকি স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যেও। প্রাইভেসির নামে মানুষ ক্ষুদ্র হতে হতে খোপের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া সুযোগবঞ্চিত শিশু-কিশোর ঢুকে পড়ছে ফেসবুক-ট্যুইটার-ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতে। বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কল্পজগতের আত্মহননে সাড়া দিচ্ছে।

বিচ্ছিন্নতা শুধু বিভাজন তৈরী করে না, ভয়ঙ্কর বিক্ষুব্ধতার জন্ম দেয়, পাল্টে দেয় মনোজমিন। গণতন্ত্রের জন্য খুব বড় বিপদের নাম বিচ্ছিন্নতা। মানুষকে বহু ধারার চিন্তা- ভাবনা, মত প্রকাশ- সব কিছু থেকে সরিয়ে দেয়। ভয়-আতঙ্কের অদৃশ্য জগৎ সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়।  যার সবচেয়ে বড় দৃশ্যমানতা হচ্ছে, উগ্রবাদী সহিংসতা, যা কেবল মৃত্যুময় অন্ধকার এক জগত। তাতেও কি স্বস্তি মিলছে! এভাবেই হনন ও আত্মহনন হয়ে দাঁড়াচ্ছে অমোঘ নিয়তি।

সংযোগ খুবই জরুরী। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, পরিবার থেকে সমাজে, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানে-সংযোগ খুবই প্রয়োজন। সংযোগ গড়তে হলে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার এবং নির্বিঘ্ন, গ্রহনযোগ্য ভোটের বিধান থাকতে হবে। সংযোগহীনতা অপরাধ এবং দুর্বত্তায়নের পথ করে দেয়। অপরাধী, সন্ত্রাসীদের জন্য বড় স্পেস তৈরী করে দেয়। অপরাধী মনোজমিন রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান, পরিবার-সব জায়গা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে কতিপয় মানুষ হয়ে ওঠে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ও সর্বেসর্বা।

রাজনীতির সংযোগ হচ্ছে আম-জনতা। রাজনৈতিক দলগুলো সংযোগ করতে মানুষের কাছে যায়। এই সংযোগের মূল হচ্ছে দলীয় আদর্শ ও কর্মসূচি। সেগুলি নিয়েই জনগনের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করে। ভোটপ্রাপ্তির মাধ্যমে দলটি বুঝিয়ে দেয়, জনগন তার আদর্শ-কর্মসূচির সাথে কতটা যুক্ত কিংবা কতটা বিচ্ছিন্ন। এই সুযোগে বাইরের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় রাষ্ট্রের রাজনীতি, বানিজ্য এবং তথ্য প্রবাহ পর্যন্ত। সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই সুযোগ করে দেয় শক্তিধর দেশগুলিকে।

বিচ্ছিন্নতা বড় বিপদ। গণতন্ত্র, সুশাসন এবং অধিকারের ক্ষেত্রে। জনগনের ইচ্ছার সাথে, অপ্রাপ্তির সাথে শাসনের কর্মকান্ড বিপরীত হলে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। শাসক এতটাই অসহনশীল হয়ে পড়ে যে, জনগনের যে কোন দাবি হামলা-মামলা অথবা অস্ত্রের ভাষায় দমন করে। জনগন ও সরকারের মাঝে সৃষ্ট যোজনব্যাপী দুরত্ব অবদমিত জনরোষে পরিনত হয়।

এই রোষ এবং ইচ্ছা প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ হলে জনগন, বিশেষ তরুণ যুব জনগোষ্ঠি ধ্বসাংত্মক পথ বেছে নেয়। আর সেটিই হচ্ছে চরমপন্থার পথ। বিচ্ছিন্নতা তাকে নিয়ে চরমপন্থার সহিংসতা বা কোন মতাদর্শিক সহিংসতার পথে। বিচ্ছিন্নতার নেতিবাচক পরিনতি এদেশের মানুষ দেখেছে হলি অর্টিজানের নৃশংস হত্যাকান্ডে; শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে বোমা হামলায়।

একদিকে বিচ্ছিন্নতার ব্যাপ্তি ঘটছে, বিভাজন বাড়ছে। কতোটা, সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসহিষ্ণু গা হিম করা সব মন্তব্য দেখলে তরুণ-যুবদের মনোজমিন আঁচ করা যায়। গনতন্ত্র ভাঙ্গা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদ জায়গা নিচ্ছে, আবার উন্নয়ন দিয়ে সব মানুষকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করছি। এই স্ববিরোধিতা কাজে আসছে না। মানুষের আয় বাড়ছে, তারচেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে বৈষম্য। দারিদ্য কমার কথা বলা হচ্ছে, কিন্ত সব সম্পদ কুক্ষীগত হচ্ছে মুষ্টিমেয়’র হাতে।

সেজন্যই বিচ্ছিন্নতা পরিহার করা এখন খুব বড় কাজ। সরকার, ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলসমূহের সাথে জনগনের নিয়মিত সংযোগ গড়ে বিভাজন কমিয়ে আনা খুব দরকার। বিচ্ছিন্নতার বিভেদ এই দেশ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সংযোগ মানুষকে উদার করে, পরার্থপর করে তোলে। বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনে মৃত্যু, সংযোগ ফিরিয়ে আনে স্বস্তি-শান্তির সুবাসিত জীবন।

বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এই দেশ অবধারিতভাবেই এগোচ্ছে নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার দিকে। মানুষ নি:সঙ্গ হয়ে পড়ছে, অপরাধের মনোজমিন জায়গা পাচ্ছে, নিষ্ঠুরতার আবেগকে ন্যায্যতা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিপদের মূল জায়গা এটি। রাষ্ট্র-সমাজ, ব্যক্তি সব ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। এখান থেকে ফিরে আসতে হলে বিচ্ছিন্নতার চাষাবাদ বন্ধ করে সংযোগের নয়া আবাদ গড়ে তোলা জরুরী।

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বতত্ত্ব !

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্ধ কি? অনেকগুলো সরল উত্তর আছে। এক বাক্যে বলা যায়, আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপি’র দ্বন্ধ। অনেকে আর একটু স্থূল করে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কারারূদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। কৈশোর উত্তর রাজনীতির যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, সেখানে মুলদ্বন্ধ হচ্ছে, যে দ্বন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরী হয়। আর গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধের অধীন। অর্থাৎ গৌণ দ্বন্ধ রাজনীতির পরিবর্তন ধারায় কখনো মূল ঘটক নয়। তবে অনেক সময় গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধ রূপে নিয়ে পরিবর্তনের লাইম লাইটে আসে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধ কতকটা আদর্শের কারণে, কতকটা ক্ষমতার কারণে সে প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী। তবে আদর্শকে আর একটু প্রায়োগিকভাবে রাজনৈতিক মত ও পথ বলতে পারি। রাজনৈতিক মত ও পথ এর কারণে একই আদর্শের অনুসারীদের মাঝেও দ্বন্ধের সূচনা হতে পারে। এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন- একই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে প্রথম যে দ্বন্ধ থাকে সেটা অবৈরী অর্থাৎ শক্রতা মূলক হয়না, পরে সেটা বৈরী বা শক্রতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতার কারণে রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও প্রতিযোগিতা অন্ততঃ আধুুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতায় হিসেবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক ক্ষমতার চুড়ান্ত রূপ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার বহুমাত্রিক, যে কোন সংগঠনের পদ অর্জন রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে। কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্ব›দ্ব শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের ভোট, নিরস্ত্র বা সশস্ত্র অভ্যুথানের মধ্যে সীমিত নয়। আমাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর প্রবেশ ঘটে। রাজনৈতিক দ্বন্ধের হিংসা ও অহিংসা শুধু আদর্শগত কারণে নয়- লক্ষ্য অর্জনের কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অহিংসা রাজনীতিতে বিশ্বাসীরা ও হিংসাআশ্রিত কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। এ পর্যন্ত আমি যা বলছি তা বাংলাদেশের রাজনীতির মূল দ্বন্ধ ও গৌণ দ্ব›দ্ব নিয়ে আলোচনার ভনিতা মাত্র। আমরা যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্ধকে প্রধাণ দ্বন্ধ হিসেবে মেনে নেই, তবে এ দ্বন্ধের গতি প্রকৃতি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা। অন্য দিকে এ মূল দ্বন্ধের আশে পাশে যেসব গৌণ দ্বন্ধ নিয়ে আলোকপাত করা। এ গৌণ দ্বন্ধ এর মধ্য থেকে কোন একটি সামনে এসে মূল দ্বন্ধে পরিণত হতে পারে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুপাক্ষিক। যদিও বাহ্যিকভাবে মূলদ্বন্ধ ঘিরে এ দুই পক্ষ থাকে- তবে এই দু পক্ষের কাঠামোর বাইরে; ভিতরে-বাইরে আরো অনেকগুলো পক্ষ থাকে। এর সাথে আরো একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজনৈতিক মূল দ্বন্ধে নিরব ভোটারদের ভূমিকা কি? বা নাগরিকরা কিভাবে দ্বন্ধকে প্রভাবিত করেন বা নিজেরা প্রভাবিত হোন। বাংলাদেশে ১৯৯১ এর পর আওয়ামী লীগ বিএনপির দ্বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভিত্তিতে দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে। এই মুল দ্বন্ধের সরল বৈশিষ্ট্যের ভিতরে অনেক জটিল উপাদান রয়েছে। মূল দ্বন্ধের জটিল উপাদানগুলি দু’পক্ষের অভ্যন্তর থেকে আসে। দুই পক্ষের প্রান্ত অর্থাৎ ঢাকার বাইরে থেকে তৈরী জটিল উপাদান শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয় দুই ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যেমন- প্রধানমন্ত্রী ও তার পছন্দের বলয়, অন্যদিকে খালেদা জিয়া ও তার পছন্দের বলয়, এটাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের বিশেষ দিক। বাইরের বিষয়গুলি কোনটি গৌণ নয়, যেমন বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের সমর্থনের মাত্রা; দ্বিতীয়তঃ ভারতের বাইরেও অন্য বিদেশী শক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। তৃতীয়তঃ সশস্ত্র বাহিনীর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সংবেদনশীলতা ও সাড়া দেবার প্রবণতা। চতুর্থতঃ রাজনৈতিক মেরুকরণের ধারা। পঞ্চমতঃ সরকারের ক্রাইসিস ম্যানেজম্যাণ্ট কৌশলের সফলতা।

উপরোক্ত পাচটি ধারা থেকে আসা রাজনৈতিক পরিবর্তনকামী উপাদানগুলি চিহ্নিত করতে পারলে, বর্তমান  রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের পরিনতির আভাস পাওয়া যেতে পারে।

বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে গণতন্ত্র : বাড়ছে বৈষম্য দমনপীড়ন, কমছে স্বাধীনতা

আসিফ হাসান ::

ক্ষমতার জন্য স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন ও লোকরঞ্জক ক্ষুধার প্রয়োগ অর্থাৎ দমনপীড়ন আরো কঠোর করার জন্য স্বৈরশাসকেরা সব হাতিয়ারই ব্যবহার করছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকারও ক্রমবর্ধমান হারে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর সামাজিক বিভাজন অনেক অনেক আগে যতটুকু ছিল, তার চেয়েও গভীর হয়েছে। জার্মানভিত্তিক গবেষনা সংস্থা  বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’ এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ এবং কোন কোন দেশ বিশেষভাবে এসবে আক্রান্ত, তা-ই তুলে ধরেছে।

গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও শাসনকাজের মান গত ১২ বছরে বৈশ্বিক গড়ে সর্বনিম্ন স্থানে নেমে গেছে। জার্মানীর গবেষনা সংস্থা বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’-এর প্রধান তথ্য হিসেবে এটিই ওঠে এসেছে। ২০০৬ সাল থেকে সংস্থাটি  ১২৯টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তাদের সিদ্ধান্ত হলো : অধিকতর উন্নত গণতান্ত্রিক কয়েকটি দেশসহ ৪০টি সরকার গত দুই বছরে আইনের শাসন খর্ব করেছে, ৫০টি দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ দেখা গেছে। অনেক দেশের শাসকই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি অথর্বতার পরিচয় দিয়ে গরিব ও প্রান্তিক লোকজনের ওপরই পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছে। অনেক সরকার ক্রমবর্ধমান সামাজিক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারেনি কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি এসব উত্তেজনায় ইন্ধনও দিয়েছে।

বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এই তালিকায় থাকা অনেক সরকারের নিম্নমানের বা বাজে দক্ষতার প্রধান কারণ হলো- তারা সংলাপ ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক সংঘাতে সাড়া দিতে আগ্রহী নয় কিংবা সক্ষম নয়। সূচক অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ৫৮টি দেশের চেপে থাকা সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। নির্বাচিত হওয়ামাত্র অনেক শাসকই নিজেদের রাজনেতিক ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করেছে। এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক লোকরঞ্জকদের মধ্যে রয়েছে হাঙ্গেরি ও তুরস্ক। অথচ এসব দেশের সরকার তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের আর্ট ডি গস গবেষণার তথ্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, অনেক শাসকই দমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নেতৃত্বে তাদের অবস্থান পোক্ত করেছে। অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানো ও সংলাপে না বসার পরিণতি হয় খারাপ।’

বাড়ছে বৈষম্য, কমছে স্বাধীনতা :

গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের দিকে উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা হলো অসন্তোষজনক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭২টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশে ব্যাপক দারিদ্র্য ও উচ্চ মাত্রার সামাজিক বৈষম্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২টি দেশে- এদের মধ্যে রয়েছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভেনেজুয়েলা- আর এইসব দেশগুলোর গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাত্রার অবনতি ঘটেছে। একই মেয়াদে দেশগুলোর মাঝারি থেকে ভালো মানের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশে নেমে গেছে।

আগের চেয়ে অনেক বেশি লোক কেবল কম বৈষম্যের মধ্যেই দিন গুজরান করছে না, তারা আরো বেশি দমনমূলক পরিবেশেও বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ৩শ ৩০ কোটি লোক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে রয়েছে (৪শ ২০ কোাটি  লোক রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনে)। সমীক্ষা শুরুর পর থেকে এত বেশি লোক কোনোকালেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে থাকতে দেখা যায়নি। যে ১২৯টি দেশে সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে বিটিআই ৫৮টিকে স্বৈরতান্ত্রিক  এবং ৭১টিকে গণতান্ত্রিক  হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই – এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যার বিষয় হলো নাগরিক অধিকার খর্ব ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পর্যন্ত আইনের শাসনের অবনতির বিষয়টি। ব্রাজিল, পোল্যান্ড ও তুরস্কের মতো সাবেক গণতান্ত্রিক বাতিঘর বিবেচিত দেশগুলোই এখন রূপান্তরশীল সূচকে পড়েছে সবচেয়ে বেশি করে।

আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে কেবল বারকিনা ফাসো ও শ্রীলঙ্কাই গণতন্ত্রের পথে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হাসিল করেছে। বিপরীতে মোজাম্বিক, তুরস্ক ও ইয়েমেনসহ মোট ১৩টি দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এসব দেশের পাঁচটি এখন আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদÐও পূরণ করতে পারছে না। এই পাঁচটি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা। স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর অধীনে বছরের পর বছর ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারসাম্য বজায় রাখার যে ব্যবস্থা নির্বাচন, সেটির মানে ঘাটতির কারণেই অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে।

স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে গণতান্ত্রিক শাসন অনেক ভালো :

এসব ঘটনা অনেক দেশের নাগরিকের জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ দুর্নীতি, সামাজিক বর্জন ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা স্বৈরতান্ত্রিক সময়ে অনেক বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। বিটিআইয়ের মতে, ১২টি গণতান্ত্রিক দেশ সফলভাবে দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয়েছে, আর স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে পেরেছে মাত্র একটি। মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ সমান সুযোগ যথাযথভাবে অর্জন করতে পেরেছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে এই সফলতা পেয়েছে ১১টি। ২৭টি গণতান্ত্রিক ও মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা ভালোভাবে সক্রিয় রাখতে পেরেছে। বিটিআই সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে গণতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই অধিকতর স্থিতিশীল ও কার্যকরব্যবস্থা নয়।

অবশ্য চীনের ক্ষেত্রে সত্যি যে – গত ১০ বছরেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশটি সবচেয়ে বিকশিত হয়েছে – অনেকের ধারণা স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান উদাহরণ। অবশ্য যারা চীনের অর্থনৈতিক সফলতার অবদান এর রাজনৈতিকব্যবস্থার ওপর আরোপ করতে চান, তারা সার্বিকভাবে স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর বাজে অর্থনৈতিক ফলাফলের বিষয়টি বুঝতে অক্ষম। রাশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভেনেজুয়েলার মতো অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিকব্যবস্থায় বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্সের’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক – উভয়টির বিকাশই বছরের পর বছর স্থবির হয়ে আছে।

(প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২২ মার্চ, ২০১৮)

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-২ : তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও দুর্ঘটনার দায় নিয়ে দুশ্চিন্তা

অরুন কর্মকার ::

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দুটি বিষয় হলো এর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং দুর্ঘটনা। তেজস্ক্রিয় বর্জের ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত বিষয়। এ জন্য প্রযুক্তি যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন উন্নতমানের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল। এর কোনোটাই বাংলাদেশের নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই আলোচনা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে যে, রূপপুর প্রকল্পের জ্বালানি যেমন রাশিয়া সরবরাহ করবে, তেমনি এখানকার স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত জ্বালানির অবশিষ্টাংশ) রাশিয়া ফেরত নেবে। কিন্তু স্পেন্ট ফুয়েল আর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কি এক? এই প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার।

অন্যদিকে, পারমাণবিক দুর্ঘটনার দায় (নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি) গ্রহন এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মত সামর্থ্য এরও কোনোটা বাংলাদেশের নেই। অথচ রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে যে চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) সই করেছে তাতে বাংলাদেশকেই এই দুর্ঘটনার দায় নিতে হবে। সরকার অবশ্য এই ভেবে নিশ্চিন্ত আছে যে, দুর্ঘটনা ঘটবে না। উন্নততর প্রযুক্তি দুর্ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়া (কনসিকোয়েন্সেস) ঠেকাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হবে তা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পারমাণবিক বর্জে্যর ভয়বহতা সম্পর্কে সবাই অবহিত ও সচেতন। অনেকের ধারণা স্পেন্ট ফুয়েলই হল পারমাণবিক বর্জ্য। আসলে তা নয়। স্পেন্ট ফুয়েল হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি‌র (ইউরেনিয়াম ২৩২) অবশিষ্টাংশ। একটি নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ৬ মাস) পর পর এই স্পেন্ট ফুয়েল বের করে নিয়ে রিঅ্যাক্টরে নতুন জ্বালানি ভরা রড স্থাপন করা হয়।

বের করা স্পেন্ট ফুয়েল রিসাইকেল করে তিনটি জিনিস পাওয়া যায়—কিছুটা ইউরেনিয়াম -যা পুনরায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা যায়, প্লুটোনিয়াম -যা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য এবং তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বর্জ্য যার পরিমান খুব কম, কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ। এই বর্জ্য সিলিকার সঙ্গে মিশিয়ে গলিত কাঁচের মত একটা পদার্থ বানিয়ে তা স্টেইনলেস স্টিলের কনটেইনারে ভরে কংক্রিট দিয়ে শিল্ডিং করে কোনো নির্জন ও শুকনা স্থানে শত শত বছর সংরক্ষণ করতে হয়।

এই স্থানটা হতে হয় এমন যেখানে কোনোদিন পানি আসেনি। এটা মূলত রাখা হয় পরিত্যাক্ত লবন খনিতে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের এটাই মূল পদ্ধতি। কিন্তু এই ধরণের কোনো স্থান বাংলাদেশে নেই। এ ছাড়া, একটা হেভি কংক্রিটের স্ট্রাকচার তৈরি করে একটা জনমানবশুন্য স্থানেও সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটাও ঝুকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।

রূপপুরের প্রসঙ্গে বলা হয়, রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে রিসাইকেল করে প্রকৃত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তাঁরা রেখে দেবে, না কি আমাদের ফেরত দেবে। এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেবে বলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি এখনো হয়নি। চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্পেন্ট ফুয়েল ছাড়াও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আরও দুই ধরণের বর্জ্য হয়। একটি কঠিন (বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রপাতিসহ ধাতব বস্ত্ত) এবং অন্যটি তরল বর্জ্য। কঠিন বর্জ্যটা খুব বেশি বিপজ্জনক নয়। কারণ সেগুলো ধুয়ে-মুছে পরিস্কার করা যায়। কিন্তু ওই ধোয়া-মোছার পানিসহ তরল বর্জ্য মারাত্মক। সেগুলো বিশেষ ধরণের ট্যাংকে সংরক্ষণ করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩০ বছরের কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের হ্যানফোর্ড রিজার্ভেশনে রাখা তরল পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে তরল বর্জ্য রাখা ১৫৯টি ট্যাংক আছে। একেকটি ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা ২০ হাজার থেকে ১০ লাখ গ্যালন। তিনি বলেন, প্রথমে তাঁরা বানিয়েছিল সিঙ্গেলশেল ট্যাংক, কোকাকোলার ক্যানের মত। তাঁদের ধারণা ছিল ২০ বছরের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে। কিন্তু সেটা পারেনি। ইতিমধ্যে ট্যাংকগুলো ছিদ্র হতে শুরু করে। তখন তাঁরা ডাবলশেল ট্যাংক তৈরি করে। একটা কোকের ক্যান আরেকটা ক্যানের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখার মত ব্যবস্থা আর কি। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। এখন ডাবলশেল ট্যাংকও ছিদ্র হতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে হ্যানফোর্ডে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ (৫৪ মিলিয়ন) গ্যালন তরল পারমাণবিক বর্জ্য আছে। এই বর্জের ‘হাফ লাইফ (তেজস্ক্রিয়তা সহনীয় মাত্রায় নেমে আসা)’ হলো ১০ হাজার বছর। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নেভাদায় ভূপৃষ্টের আধা মাইল নীচে একটা ডিপজিটরি তৈরি করেছে। সেখানে বর্জ্যগুলো রাখা হয়েছে ডাবলশেল স্টেইনলেস স্টিলের কনটেইনারে। এরপর কি হবে, এগুলো নিয়ে কি করা যাবে তা কেউ জানে না। সবার আশা হলো একটা বড় ভূমিকম্প হলে ওগুলো চিরদিনের মত মাটির তলায় চাপা পড়বে।

হ্যানফোর্ডে যে ৫৪ মিলিয়ন গ্যালন তরল পারমাণবিক বর্জ্য আছে এর ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ করার জন্য যে প্লান্ট তৈরি করা হচ্ছে তার সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫০ কোটি ডলার। প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা এখন ২০ শতাংশ করতে চাচ্ছে। তাতে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ কোটি ডলার। এটা বলা হচ্ছে মাত্র একটি কেন্দ্রে সংরক্ষিত বর্জের ২০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ করার কথা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কেন্দ্রে তো আরও অনেক বর্জ্য সংরক্ষিত আছে।

‘নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি’: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে (জেনারেল কন্ট্রাক্ট), তাতে এই শিরোনামে একটি ক্লজ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের কাজে দেশে এবং দেশের বাইরে যে কোনো ধরণের দুর্ঘটনা কিংবা ড্যামেজ হলে তার দায় এককভাবে বাংলাদেশের।

অর্থাৎ রাশিয়ায় যন্ত্রপাতি তৈরির সময়ও যদি কোনো ড্যামেজ হয় সে দায়ও বাংলাদেশকে নিতে হবে। অথচ প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করছে রাশিয়া। এই যে তাঁরা করছে, কি করছে, কীভাবে করছে সেটা আমরা তত্ত্বাবধানও করছি না বা করার সামর্থ্যও আমাদের নেই। সুতরাং এই দায় আমরা কেনো নেব এবং কিভাবেই বা নেবো এগুলো গুরুত্বপ্রশ্ন প্রশ্ন যার সমাধান হওয়া দরকার।

আন্তর্জাতিক আইন ও প্রটোকল অনুযায়ী যে দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে অর্থাৎ যে দেশ এই কেন্দ্রের স্বত্ত্বাধিকারী, দুর্ঘটনার দায় তাদের। বিদ্যুৎকন্দ্রের নির্মাণকারী, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কিংবা অন্য কোনো ঠিকাদারের ভুল-ত্রুটির দায়ও স্বত্ত্বাধিকারীকেই নিতে হবে। এই আইন করা হয়েছে এ জন্য যে, কোনো দেশ যখন এ ধরণের বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে তখন তারা যেন সবকিছু বুঝে-শুনে করার মত সামর্থ্য অর্জন করার পর করে। কিন্তু বাংলাদেশ তো তা করেনি।

এ ক্ষেত্রে ভারত একটা কাজ করেছে। যদিও তাঁদের বুঝে-শুনে করার মত সামর্থ্য আছে, তারপরও ২০১০ সালে তাঁরা একটা আইন করে পারমাণবিক দুর্ঘটনার দায় সরবরাহকারী অর্থাৎ রাশিয়ার ওপরও চাপিয়েছে। ওই আইনে বলা হয়েছে, যদি সরবরাহকারীর সরবরাহ করা কোনো যন্ত্রপাতির নিম্নমান বা অন্য কোনো ত্রুটি দুর্ঘটনার কারণ হয় তাহলে তার দায় সরবরাহকারীকেও নিতে হবে।

এই আইন পাস হওয়ার পর রাশিয়া অনেক দিন কুদনকুলম ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের জন্য চুক্তি করা থেকে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আইন মেনেই তাঁরা চুক্তি সই করতে রাজি হয়। অবশ্য এ কারণে তাঁরা ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে। কেননা দুর্ঘটনার দায় যদি তাঁদের নিতে হয় তাহলে বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই বীমার প্রিমিয়ামের জন্য বাড়তি খরচ হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশেরও উচিৎ ভারতের ওই আইনের আলোকে একটি আইন করার কথা ভেবে দেখা। কারণ মানুষ যে জিনিস তৈরি করে তা যে শতভাগ নিরাপদ সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। ‘মারফিস ল’ বলে একটা তত্ত্ব আছে। তত্ত্বটি হচ্ছে—‘ইফ দেয়ার ইজ নাথিং গোজ রং, সামথিং উইল’। যে কোনো যন্ত্রপাতি যে কেনো সময় বিগরাতে পারে। যখনই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখনই বলা হয়, এইটা যে হতে পারে তা তো জানা ছিল না। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটার কারণটুকুই শুধু শুধরানো হয়। চেরনোবিলের ভুল শুধরানো হয়েছে। ফুকুশিমার ভুল শুধরানো হয়েছে। কিন্তু অন্য কোনো রকম ভুল হচ্ছে কিনা তা কি কেউ বলতে পারে?

 

ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন : রাজি নয় বিদেশী দাতারা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

প্রত্যন্ত একটি দ্বীপে এক লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে সরিয়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পনায় দাতা ও সাহায্য সংস্থা এবং দেশগুলোকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। নতুন স্থানটিতে রোহিঙ্গারা সাইক্লোন, বন্যা ও মানব পাচারকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দাতা ও সাহায্য সংস্থা এবং দেশগুলো। বার্তাসংস্থা রয়টার্স এমন খবরই দিয়েছে।

কক্সবাজারের জনাকীর্ণ উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ উদ্বাস্তু বাস করছেন। তারা আসন্ন বর্ষা মওসুমে বন্যা, ভূমিধস ও নানা রোগের হুমকির মুখে রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিকল্প স্থান হিসেবে কয়েক মাস ধরে গড়ে তুলছে ভাসান চরকে। তবে চরটির অবস্থা দেখার জন্য সাহায্য সংস্থাগুলোকে অনুমতি দেয়নি সরকার। তবে ৪ এপ্রিল ব্রিফিংয়ের সময় তাদেরকে চরটি নিরাপদ- এমনটি বোঝাতে ব্যর্থ হন কর্মকর্তারা।

মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ‘স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপের’ (এসইজি) নেতৃত্বে কক্সবাজার ক্যাম্পগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা ইন্টার-সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি) ওই পরিকল্পনার ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের বক্তব্যে আইএসসিজি জানায়, দ্বীপটিতে বসবাস করার উপযোগী পরিবেশ নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। তারা জানায়, সরকার পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ায় তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে দ্বীপটি অনুমোদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী বিদ্রোহীদের দমনের নামে শুদ্ধি অভিযান শুরু করার পর থেকে প্রায় সাত লাখ উদ্বাস্তু বাংলাদশে প্রবেশ করে। মিয়ানমারের সৈন্যরা বেসামরিক লোকজনকে টার্গেট করেছে বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা ওই দেশের সরকার অস্বীকার করে আসছে।

সাহায্য সংস্থাগুলো উদ্বাস্তুদের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউএনএইচসিআর গত মার্চে এক বিবৃতিতে জানায়, দুই লাখ তিন হাজার লোক বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কায় রয়েছে। বৃহত্তম ক্যাম্পটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানায়, জায়গা খুবই দুর্লভ। বিদ্যমান ক্যাম্পটির আশপাশে উপযুক্ত কোনো স্থান পাওয়া যায়নি।

মেঘনা নদীর মোহনায় পলি জমে জমে ভাসান চরের (অর্থাৎ ভাসমান দ্বীপ) উদয় হয়েছে। সরকার এটিকে স্থায়ী ভূখন্ড ও উদ্বাস্তুদের সাময়িক আশ্রয়স্থল হিসেবে তৈরি করার জন্য ২৮০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘোষণা করেছে।

সরকারি স্লাইড প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে ১২০টি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বন্যা মোকাবিলার জন্য ১৩ কিলোমিটার বাধও নির্মাণ করা হবে।

গত এপ্রিলে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডা মিশনে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বলা হয়, মে মাসের মধ্যে কাজের বড় অংশ সমাপ্ত হবে, জুনে এক লাখ উদ্বাস্তুকে সেখানে নেওয়া যাবে।

কিন্তু জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইসিআরের একটি নিজস্ব প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য ঝুঁকি ছাড়াও সাইক্লোন ও বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়ে গেছে। তাছাড়া অরক্ষিত লোকজনকে একটি এলাকায় আবদ্ধ করে রাখা হলে তারা মানব পাচারকারী ও চরমপন্থীদের খপ্পরে পড়ে যেতে পারে।

দাতাদের সামনে উপস্থাপিত স্লাইডে দেখা যায়, সরকার উদ্বাস্তু ও নিরাপত্তা কর্মীদের থাকার ব্যবস্থার পাশাপাশি সাহায্য সংস্থাগুলোর জন্যও স্থাপনা নির্মাণ করছে।

ভাসান চর প্রকল্পকে সমর্থন করার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএমের মুখপাত্র ফিওনা ম্যাকগ্রেগর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি একটি ইমেইলে বলেন, আমরা এখন কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছি, পরিস্থিতি আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছি।

বিশ্বকাপের রাজনীতি আর অর্থনীতি

আসিফ হাসান ::

খেলা কেবল খেলাই নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি। ক্রীড়া প্রতিযোগিতাটি যত বড় হবে, তাকে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মারপ্যাচ ততো বেশি থাকে। রাশিয়ায় যে বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে, সেটিও এর বাইরে নয়। মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য বিশ্ব যখন বিভিন্ন ইস্যুতে রাশিয়াকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে; আবার রাশিয়া যখন তার হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে- ওই সন্ধিক্ষণেই ওই দেশটিতেই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় একক বৃহত্তম ক্রীড়ানুষ্ঠানটি। অলিম্পিক গেমসে এর চেয়ে বেশি দেশ অংশ নেয়, কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়, তা অন্য কোনো ইভেন্টে দেখা যায় না।বিশ্বকাপে শিরোপার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে যেমন ৩২টি দলকে বিপুল প্রয়াস চালাতে দেখা যায়, তেমন এই আসর আয়োজন করার দাবিদার হতেও কম কাঠখড় পোড়াতে হয় না। বরং বিশ্ব-রাজনীতির কলকাঠিগুলো তীব্র বেগে নড়াচড়া করতে থাকে আয়োজক দেশ হওয়ার লড়াইয়ে। নানা সমীকরণ কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সবচেয়ে জনপ্রিয় আসরটির আয়োজক হওয়ার দৌড়ে জয়ী হওয়া সম্ভব হয়।বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে এটিও কম সম্মানের ব্যাপার নয়। এখানে লড়াইটি কম জমজমাট নয়।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক হতে চেয়েছিল রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্ধী অনেক দেশই। খোদ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়াও ছিল। কিন্তু তারা বাদ পড়েছে কিংবা রুশ সমীকরণের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কিন্তু রাশিয়া একদফা জিতে আছে।  রাশিয়া যে আবার সোভিয়েত আমলের  প্রভাব সৃষ্টি করতে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে, বিশ্বকাপ আয়োজনের কৃতিত্ব লাভ তারই একটি আলামত। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপে তারা যে এখনো মার্কিন প্রভাবিত বিশ্বের সাথে লড়াই করতে পারে, সেটিই তারা দেখিয়েছে এই আসর আয়োজনের মাধ্যমে। আর ভ্লাদিমির পুতিন এর মাধ্যমে দেশে ও সেইসাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে ও তার দেশকে তুলে ধরার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন।

কয়েক মাস ধরেই পুরো বিশ্বের নজর রাশিয়ার দিকে। আর বিশ্বকাপ চলাকালে রাশিয়াই থাকছে বিশ্বের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের প্রধান খবর। দুনিয়াজুড়ে এই মাতামাতির প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন আছে, তেমনি আছে পরোক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব। একে পুঁজি করে অনেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাশিয়া তাই হিসাব কষেই এই পথে নেমেছিল।

অনেক সময়ই দেখা গেছে, নিজেরা না পারলেও প্রতিদ্বন্দ্ধী কোনো দেশ যাতে এই সম্মান লাভ করতে না পারে, সেই চেষ্টা দেখা যায়। রাশিয়ার ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। রাশিয়ায় যাতে বিশ্বকাপ না হতে পারে, সেই চেষ্টা একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত ছিল। কিন্তু রাশিয়া শেষ পর্যন্ত তার অবস্থানে টিকে থাকতে পেরেছে। যে দেশটিকে বয়কট করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইন করেছে, এমনকি তৃতীয় দেশ বড় ধরনের ব্যবসা করলে তাদেরও অবরোধের মুখে পড়তে হবে বলে হুমকি দিচ্ছে, সেই দেশের দিকেই সবার নজর পড়াটা কম কৃতিত্বের বিষয় নয়।

রাশিয়া অবশ্য কেবল রাজনীতিতেই লাভ খুঁজছে না, অর্থনীতিতেও এর মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বকাপ আয়োজন করতে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ লাগে। নতুন নতুন স্টেডিয়াম বানাতে হয়, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে দেদারসে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু তারপরও আয়োজক দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিপুল লাভবান হয়। সংগঠকরা আশা করছেন, বিশ্বকাপের মাধ্যমে রুশ অর্থনীতিতে ৩১ বিলিয়ন ডলারের প্রভাব ফেলবে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে দেশটির জিডিপি ১.৬২ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ১.৯২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই রুশ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ আয়োজনে মোট ব্যয় হচ্ছে ১১ বিলিয়ন ডলার (৬৮৩ বিলিয়ন রুবল)। এতে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার চাকরি সৃষ্টি হয়েছে।

জাঁকজমক আয়োজন করে লাভবান হওয়ার ইতিহাস রাশিয়ার সাম্প্রতিক অতীতেও আছে। এই ২০১৪ সালের সোচিতে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিক গেমসে রাশিয়া ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে চমক দেখিয়েছিল। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শীতকালীন গেমসে পরিণত হয়েছিল।

বিপুল ব্যয়ের পরিণামে সোচি এখন সারা বছর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ওঠে এসেছে। বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে এর চেয়েও বেশি লাভবান হবে বলে অনেকে মনে করছে।

তবে চূড়ান্ত লাভ-লোকসানের হিসাব মেলে অনেক পরে। সেই হিসাব মেলানোর কাজটির জন্য আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

 

শওকত আলী : ‘প্রদোষ’কালের পান্থজন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তরুণ শওকত আলী ঘুরেছেন অবিশ্রাম। বনে-বাদাড়ে, পথ-প্রান্তর, গ্রামীন অস্পৃশ্য জনপদ-বাদ যায়নি কোনকিছুই। লেখার প্লট খুঁজতে কলেজ শিক্ষকতার পাশাপাশি তার বেলা কেটেছে ওভাবেই। রাঢ় বঙ্গ, উত্তরের জনপদ, শহর আর গ্রামীন জীবনের নানান উপাখ্যান ধারণ করতে এই ঘোরাঘুরি স্বার্থক হয়ে ওঠে, যখন সুনিপুন দক্ষতায় শিল্পীর তুলির মত আঁচড় কাটেন মূর্ত বাস্তবতায়।

তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শোনা যাক- জায়গাটা ঠাকুরগাঁও জেলার বীরগঞ্জ। তেভাগা আন্দোলনের এলাকা। উত্তরাঞ্চলে শীত থাকে চোত মাস পর্যন্ত। বুড়ো সাঁওতাল, সবাই কান্ত মোড়ল বলে ডাকে, ‘৪৮’র কৃষক আন্দোলনে পুলিশের সাথে লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পা কাটা গিয়েছিল। বিকেলের মরে আসা রোদে মাঠে শুয়ে থাকে।

কান্ত’র পাশে বসে গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, শুয়ে থাকো কেন? ‘শুয়ে থাকতে হামার ভাল্লাগে’- নির্লিপ্ত জবাব কান্ত’র। কিরকম ভাল লাগে-শুধালাম। বল্লে, ‘আমি গান শুনতে পাই’। তারপর যে কথাটি বল্লে, বাংলা ভাষার কোন কবি এখনও বলেনি, ওরকম কবিত্বময় কথা। কান্ত জানালে, “মাটির তলার গান শুনতে পাই। বীজ ফেলা হচ্ছে, বীজ থেকে অঙ্কুর বেরুচ্ছে। একটা করে পাতা ফুঁটছে আর গান হচ্ছে। হামি সে গান প্রাণ ভরে শুনি”।

এটি আসলে কবিতা নয় বা কবিতার বিষয়ও নয়। অমন কবিতা কেউ লেখেনি কখনও। এটি পুরোটাই জীবনের গাণ।

সুনির্দিষ্টভাবেই এটি সুরিয়ালিজম বা স্বপ্ন-বাস্তবতার বিষয়। রিয়ালিজম’র বিস্তুৃতকরনটাই হচ্ছে, স্যুরয়ালিজম। যেখানে স্বপ্ন-বাস্তবতা, কল্পনা-মিথ পাশাপাশি থাকবে। আর যিনি লিখবেন, তার থাকবে সুনিপুন খনন দক্ষতা। প্রাক ও পরবর্তী ষাট দশক আমাদের সাহিত্য অবলোকন করতে শুরু করে সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন-বাস্তবতা। ইউরোপে যার সূচনা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। এই সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন বাস্তবতার খনন ও কথন দক্ষতা শওকত আলীকে আমাদের কথা সাহিত্যে করে তুলেছে মহত্তম।

শওকত আলী নিজেও জানাচ্ছেন, ‘আর্লি সিক্সটিতে যারা লেখালেখি শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে এটি পাওয়া যাবে’। তবে তার মতে, এই ধারায় ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) সবচেয়ে সফল। আশির দশকের শেষে দৈনিক কোলকাতায় শারদীয় সংখ্যায় শওকত আলী লিখেছিলেন, ‘তাবিজ’ নামের উপন্যাস।

এই উপন্যাসে শওকত আলী দেখিয়েছিলেন, মানবমুক্তির বিরুদ্ধে ধর্মাশ্রিত মিথ্গুলি কিভাবে কাজ করে। কিন্তু কোলকাতার কাগজ এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন; ‘তাবিজের নকশা’, ‘গরু’ এবং ‘জবাই’ শব্দগুলো বাদ দিয়েছিল। ফলে ১৯৯২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পুনর্বার এটি অবিকৃতভাবে প্রকাশিত হয়।

শওকত আলী নিজেই বলেছিলেন, “ওরা (কোলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকরা) ধর্মাশ্রিত মিথ্ আর মানবমুক্তির বিরোধটি বোঝেনি বলেই বিপ্লব হয়নি। বামপন্থা বিষয়টিই আধুনিকতা এবং প্রগতির ব্যাপার। মানুষের মুক্তির সংগ্রাম সব দেশে, সবসময় হয়েছে, রাশিয়া বা চীনে হয়েছে। ঠিক সেভাবে আমাদের দেশে হবে তা কিন্তু নয়”।

এখানকার ব্যর্থতা সম্পর্কে শওকত আলী জানাচ্ছেন, “… কিন্তু যারা বামপন্থার রাজনীতি করেছেন, কমিউনিষ্ট পার্টি করেছেন, তাদের প্রবলেম হয়েছে তারা ভদ্রলোকের ছেলে। কোলকাতার ঔপনিবেশিক কালচারের মধ্যে তারা লেখাপড়া শিখেছেন। আধুনিকতা বলতে ঐটাই বোঝায়। গ্রামের লোক মূর্খ-চাষা। চাষা শব্দটি হয়েছে গালি, ‘দুর ব্যাটা তুই একটা চাষা…’।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথক শওকম আলীর প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বামধারার “নতুন দিনের কথা” কাগজে। সেটি ছিল পঞ্চাশ দশকের মধ্যভাগ। এর পরে দীর্ঘ বিরতি। ‘৬২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস “পিঙ্গল আকাশ” এবং ৬৮ সালে প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ “উম্মুল ভালবাসা”।

১৯৪৭ এর বিভাগোত্তর কালে বাংলা সাহিত্যের মূল কেন্দ্রটি ছিল কোলকাতার দখলে। সোমেন চন্দ্র, রনেশ দাস গুপ্ত, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, অন্যদিকে মুসলিম সাহিত্য বা শিখাগোষ্ঠি পূর্ববঙ্গের হলেও তাদের দৃষ্টি সেই কোলকাতার দিকে। দেশ বিভাগের পর পরই পরিষ্কার হয়ে গেল, পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকাকেই নতুন করে শুরু করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে অগ্রযাত্রাটি।

ঢাকা কেন্দ্রিকতায় তখনকার পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে ভাষা ও অবয়ব নির্মাণ করেছিলেন যে ক’জন কথাশিল্পী, তাদের মধ্যে শওকত আলী ছিলেন পুরোথা। অর্থাৎ বিভাগোত্তরকালের ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যের ক্ষীণধারাটি এভাবেই পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। কিন্তু সে সময়ে শওকত আলীদের মত প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী লেখক-সাহিত্যিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সদ্য প্রসূত পাকিস্তানী “জজবা’র প্রতি অনেক লেখকদের উম্মাদনা। সে সময় কথিত জাতির পিতা জিন্নাহ্, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং আরবের বিজয়গাঁথা নিয়ে একরকম উম্মাদনা শুরু হয়েছিল।

এর মূল কারণ ছিল, কোলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যে এদের অভিগম্যতা কম থাকায় নব্য পাকিস্তানে অনেকটা রুদ্ধ আবেগ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে শাসকদের গুনগান এবং ধর্মীয় মিথ্গুলি নিয়ে লেখালেখি। সম্ভবত: এ কারনেই এসব লেখালেখি শুরুতেই পাক-শাসকগোষ্ঠির নজরে আসে, যার মধ্য দিয়ে একধরনের সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধি উস্কে দেয়ার প্রবণতা তৈরী হয়েছিল।

এরকম চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের অবয়বটি নির্মিত হয়েছিল। প্রগতি ও মানবিকতার সংমিশ্রনে এই দুরুহ কাজটি যাদের হাত দিয়ে এগোচ্ছিল- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত আলী, আহসান হাবীব নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ঐ ধারার। উত্তরকালে এটিকে শক্তিশালী করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং হাসান আজিজুল হকের মত কালোর্ত্তীণ কথা সাহিত্যিকরা।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লেখক-সাহিত্যিকদের নবচেতনার উন্মেষ ঘটে। ক্রমশ:“পাকিস্তানী জজবা’র উচ্ছাস কেটে যেতে থাকে। ফলে উল্লেখযোগ্য অংশটি প্রগতিশীল ধারায় সামনে এগোতে থাকেন। যদিও আমাদের তৎকালীন সাহিত্য ভাষা আন্দোলনকে শুধুমাত্র ‘ভাষাকেন্দ্রিকতা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে, অল্প-বিস্তর ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। এটি যে ছিল বাঙালী জাতির স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের সূচনা, সেই বিশ্লেষণটি সেকালের লেখালেখিতে কমই উঠে এসেছে।

ষাট দশকের ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য কলা-কৈবল্যবাদের নামে কথিত সৌন্দর্যবাদীতা এবং বামধারার যান্ত্রিকতার মধ্যে পড়ে খাবি খাচ্ছিলো। এমনকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও শুরু করেছিলেন এই নিরীক্ষা দিয়ে। পরে অবশ্য “খোয়াবনামা” ও “চিলেকোঠার সেপাই” -এর মত অবিস্মরণীয় উপন্যাস তাকে তথাকথিত কলা-কৈবল্যবাদের চর্চা থেকে ছিটকে দেয়। বাংলা সাহিত্যের জন্য এটি বড় সৌভাগ্য।

শওকত আলী কলা-কৈবল্যবাদ অথবা বামধারার যান্ত্রিকতার ঐ ধারায় সমর্পিত হননি। ফলে তাকে  “সেকেলে” গোছের তকমা এঁটে দেয়া হয়। কিন্তু তাতে কি! তিনি লিখেছেন, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির ওপর ভর করে। বামপন্থী সাহিত্যিক হলেও তার লেখাকে কখনও বামধারার অনেকের মত জঞ্জাল হতে দেননি, সৃষ্টি করেছিলেন মানবিকতা বোধসম্পন্ন সাহিত্য।

তার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ “প্রদোষে প্রাকৃতজন”-এ তিনি দেখিয়েছেন, দুঃখের সুদীর্ঘ এবং কঠোর অন্ধকার অতিক্রম করে প্রাকৃতজন ঝকমকে এক প্রত্যুষ অবগাহন করার প্রতীক্ষা করছে। বসন্ত দাসের বয়ানে,“যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতজন এভাবেই প্রতিরোধ করে লাঞ্চিত হয়, নিহত হয়, ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু তথাপি ঐ একই সঙ্গে সে প্রতিরোধ করতে ভোলেনা। হয়তো বিচ্ছিন্ন, হয়তো একাকী এবং শস্ত্রবিহীন; তথাপি তার দিক থেকে প্রতিরোধ থেকেই যায় !”

এই উপন্যাসে তার মূল মেসেজটি ছিল: যে রাজশক্তি প্রজাদলনে অভ্যস্ত, প্রজার কল্যাণ করে না, সে রাজশক্তি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়। সামান্য বহি:আক্রমনে ধ্বসে যায়। সেজন্যই তুর্কী খিলজী’র আক্রমনে নদীয়ার সেন রাজবংশ পালিয়ে যায়। আর এরই মাঝে সাধারন মানুষের প্রতিরোধ- সংগ্রামকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে কালজয়ী উপন্যাস “প্রদোষে প্রাকৃতজন” ।

আবার গ্রামীন লোক বিশ্বাসের ওপর আরেকটি অনবদ্য কাজ “মাদার ডাঙ্গার খেল্”। কোন ঘটনাই অলৌকিক নয়, প্রত্যেকটির পেছনেই থাকে কার্যকারন বা অন্তর্গত সত্য। সেটি না বুঝলে তৈরী হয় রহস্য, মিথ্ এবং ছড়ায় নানান ডালপালা। চাল-চুলোহীন হাটে হাটে ফেরি করে বেড়ানো ফুলমতী বেওয়ার ছেলে রাজ মোহাম্মদ বা রাজু পন্তিতের হঠাৎ ধনী হয়ে যাওয়ার গল্প এটি। এই নিয়েই সৃষ্ট রহস্য এবং উন্মোচনের গল্প “মাদার ডাঙ্গার খেল্”।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি “বিচিত্রা’য় প্রকাশিত ট্রিলজি ‘পূর্বদিন পূর্বরাত্রি’, ‘কুলায় কালস্রোত’ এবং ‘দক্ষিণায়নের দিন’ ধারন করে আছে ‘৬৯’র গণ অভ্যূত্থানের বিশাল ক্যানভাস। সেইসাথে সেজান এবং রাখিব ‘সুরিয়ালিষ্টিক’ভালবাসার অনবদ্য গল্পটি। এই ত্রয়ী উপন্যাসের সাথে সময় ও প্রেক্ষাপটের সাদৃশ্য রয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর সাথে। বাংলা সাহিত্যের খুব বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে এ সকল উপন্যাস।

আমরা দেখেছি, তার সময়কালের সাহিত্যিকদের মধ্যে সাধারন মানুষের জীবনাচার, দ্ব›দ্ব-সংঘাত, বিকাশমান জীবনের নানান উত্থাণ-পতন এবং শ্রেনীদ্ব›েদ্বর বিষয়, সংস্কৃতি, প্রথা অনেকটাই উপেক্ষিত হচ্ছে অথবা ভাসা ভাসাভাবে এসেছে। আমাদের লিখিয়েরা খুব উপরিকাঠামো থেকে দেখেছেন সাধারনের জীবন। খননের মধ্যে যাননি, কিংবা জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার তীব্র ঝাঁজ এবং বেঁচে থাকার কঠোরতার বিষয়গুলো উঠে আসেনি কারো লেখায়।

এখানেই শওকত আলীর ব্যতিক্রম। চরিত্রগুলি তিনি আবিস্কার করতেন। যেমনটি ঘটেছে, কান্ত মোড়লের ক্ষেত্রে। কান্ত মাটিতে কান পেতে থাকে। মাটির গান শোনে। বুঝতে পারে মাটির অভ্যন্তরে কিভাবে জীবনের উন্মেষ ঘটছে এবং এই হচ্ছে চরিত্র। বাস্তবতা হোক, স্বপ্ন-বাস্তবতা, অর্ধ বাস্তবতা, যাই হোক- এই একেকটি জীবন্ত চরিত্র। এর মাঝে শওকত আলীর তত্ত¡টা হচ্ছে, মানুষের সংগ্রামের। মানুষের মুক্তির সংগ্রামের যে কাহিনী, সেটিই জেগে ওঠে মাটির গানের মধ্যে। মুক্তির বিষয়টি থাকে মানুষের মাঝে গান হয়ে, ছবি হয়ে, স্বপ্ন হয়ে। সেখান থেকেই মানুষ মূলত: উদ্দীপনা পায়।

এটিই বাস্তবতা। কিন্তু স্বপ্ন-কল্পনার মাঝের অবস্থানটা প্রত্যক্ষ বাস্তবতা নয়। শওকত আলী মনে করছেন, এটিই সুরিয়ালিজম। রিয়ালিটি ও কল্পনার এই যে একত্র সমাবেশই মানুষকে আর সব থেকে আলাদা করে তোলে। এর সাথে লড়াই-সংগ্রামের মিথ্গুলি যুক্ত হয়ে বাঁচার লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা তৈরী করে। সেজন্যই তার লেখায় ব্রাত্যজন, অন্তজ বা সাধারনরা কখনও পরাজিত হয়না।

এজন্যই তিনি শওকত আলী। আমাদের সাহিত্যের ‘প্রদোষ’ কালের মানুষ। প্রগতিশীল বামপন্থী হয়েও গতানুগতিক নন। বড় লেখকরা কখনই নির্দিষ্ট ধারায় আটকে যান না। সেজন্যই তার প্রতিটি কাজ তাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তিনি মার্কসীয় সাহিত্য রচনা করেননি, যা করেছেন তা মানুষের জন্য। শিল্পের জন্য শিল্প নয়, মানুষের জন্য শিল্প। এ ব্যাপারে তার নিজেরই মত ছিল, মানুষের জন্য রচিত সকল সৎ সাহিত্যই হচ্ছে সত্যিকাবের মার্কসীয় ধারার সাহিত্য।

এই ধারায় সবচেয়ে সুনিপুন কারিগর ছিলেন শওকত আলী। সুরিয়ালিজম আর মিথ্’র সমাবেশীকরন দেখতে পাই ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ। সেজন্যই এটি বিশ্ব সাহিত্যতুল্য। আর সেখানেই তিনি প্রায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তার তুলনা করা যায় সমকালীন বাংলা সাহিত্যের আর দু’জনের সাথে। একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অপরজন হাসান আজিজুল হক। এই তিনজনের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শওকত আলী চলে গেছেন; আছেন হাসান আজিজুল হক।

এদের মাঝখানে প্রাক ষাট পর্বটি শওকত আলীর। সেকাল থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যের এই ধারায় তাদের হাত ধরেই কাজগুলি এগিয়েছে। তার ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’, হাসান আজিজুল হকের, ‘বিধবাদের কথা’ সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন-বাস্তবতার মহত্তম উদাহরন। আর এখানেই শওকত আলী আমাদের সমকালীন বাংলা সাহিত্যে ‘প্রদোষকালের পান্থজন’।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

১.‘সাপ্তাহিক’ পত্রিকায় প্রকাশিত শওকত আলীর সাক্ষাৎকার;

২. ৩০ জানুয়ারি ২০১৮ ‘প্রথম আলো‘য় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ;